২৫ আগস্ট ২০২০
প্রচ্ছদ :
রাজীব দত্ত

অরূপ আলোর স্বরূপ চিনিয়েছেন সেমো

আজ এমন দিনের কথা শুরু করব যখন আমার কবিতা নামক পদ্যগুলো লিখছি আর ছিঁড়ে ফেলছি। তেমনই একজন মানুষ মহিন মৃত্তিক-এর সাথে দেখা, আড্ডা মাখামাখি সময় পার করা। মহিন মৃত্তিক তখন দেশে-বিদেশে লেখালেখি, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। খুলনা আর্ট কলেজে পড়াকালীন যশোর শহরের কিছু বন্ধুদের সাথে তাঁর সখ্য হয়। ঝিনাইদহ এসে আমার সাথে আড্ডার ফাঁকে বলে, তুই তো যশোরে যাস। তো ওখানে একটা বইয়ের দোকান আছে ‘কালপত্র বইসমাবেশ’ নাম। দড়াটানা ব্রিজ পার হলেই দেখতে পাবি। ওই দোকানি হাবিব একজন কবি, তার সাথে পরিচিত হয়ে লেখালেখি নিয়ে আলাপ করতে পারিস।

আমি তখন প্রতি সপ্তাহে সোমবার যশোরে যাই। একদিন ‘কালপত্র বইসমাবেশ’ খুঁজে পাই দড়াটানা ব্রিজ পার হয়ে সদর হাসপাতলের আগেই। বইয়ের দোকান ‘কালপত্র বইসমাবেশে’র সামনে দাঁড়ালাম। অনেক বই, বইয়ের সাম্রাজ্য। দোকানদার আমাকে বললেন, কী ভাই! কী কিছু লাগবে বইপত্র? আমি বললাম, না তেমন কিচ্ছু না, এই একটু দেখছি। তিনি নিজের কাজে মন দিলেন। আমি বই দেখছি, আমার বই কেনার উদেশ্য ছিল না। ওখানে একজন কবির দেখা পাবো এমনই এক পরিকল্পনা করে গিয়ে সঠিক মানুষ খুঁজে পেতে সময় ব্যয় করছি। আমি সৈকত হাবিব নামের বন্ধুকে খুঁজতে অভিনব কৌশল ব্যবহার করছি মাত্র।

খুঁজে পেলাম একটা বই, পছন্দ হল। দাম দশ টাকা। জা পঁল সার্ত্রের ‘দ্যা ফ্রাই’-এর বাংলা অনুবাদ। বইটি চাইতে দোকানির চোখে ভালোবাসার হাসি দেখতে পেলাম। আমার চিনতে অসুবিধা হল না বন্ধুটা কে। তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি এই বই কী করবেন? আমি বললাম, পড়ব। তিনি বললেন, কী করেন? বললাম, আমি ব্যবসা করি। তিনি বললেন, আর কী করেন? আমি সেই কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, আপনি কি হাবিব? তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, ভেতরে আসেন।

আমি ভিতরে বসে আলাপ শুরু করলাম। আমাদের সময় গড়িয়ে কখন বিকেল হয়েছে আমরা টের পাইনি। মহীন মৃত্তিক (টোকন ঠাকুর) প্রসঙ্গ এল পরিচয়পর্বে। প্রতি সোমবার যশোরে যাই আর কাজ সেরে চলে যাই আমাদের মনমন্দিরে। যেখানে অপেক্ষা করে আছে আমার বন্ধুত্বের কবিতাপাঠ। দারুণ আড্ডা, সারা সপ্তাহের লেখা কবিতা নিয়ে অপেক্ষার সোমবার যেন এসে যায়। নতুন দিনের কবিতা লিখে চলেছে সোমবারের কাঙ্ক্ষিত আড্ডায়।

একে একে আলোচনায় আসতে থাকে মারুফুল আলম, মহিউদ্দীন মোহাম্মদ, কবির মনি, মাসুমুল আলম, অসিত বিশ্বাস, শিমুল আজাদ, সাদি তাইফ, পাবলো শাহি, মাসুম ভাই সহ (এসএম সুলতানের ঘনিষ্ঠজন) নাম না-জানা অনেক বন্ধু। ওদের সাথে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমার পরিচয় হয়ে আপন থেকে আপনত্বের বন্ধু হয়েছিল। আমার জন্য ওরা অপেক্ষায় থাকত, আমি অপেক্ষায় থাকতাম ওদের জন্য। সোমবার আমার জীবন এক শুভদিন হয়ে আছে। ওরা তখন কেউ স্কুলে পড়ে, কেউ কলেজে পড়ে, কেউ ভার্সিটি-ফেরত। কিন্তু আমি সকলকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে মহানন্দা নদীর মতো কবিতা আলাপ শুরু করছি। কেউ কলেজ থেকে, কেউ স্কুল থেকে, কেউ মহাআড্ডার সোমবারে চলে আসত ‘কালপত্র বইসমাবেশে’।

আমরা দুপুরের আহার করতাম পাশের হোটেলে। অতি সাধারণ আহার, জীবন চলার মতো। কেউ আয় রোজগার করত না বলেই সামান্য খাবারের বিল আমি দিয়ে দিতাম। আমি তখন আয়-রোজগার করি। যাক, অনেক রাতঅবধি আড্ডা চলত। আড্ডা চলছে কেউ বলল, চল একটু চা-পর্ব সেরে আসি। অমনি ওঠা হল হাসপাতালের পাশের আলতাফের চায়ের দোকানে। খুব কম বিলে আমরা চা পান করতাম। দশটা চা, পনেরোটা করে পাঁচ টাকা দিয়ে আসতাম। মনে পড়ে সোনাঝরা সেই দিনগুলো।

আমাদের অচেনা মানুষটি সবথেকে চেনা বান্ধবে পরিণত হয়, আজো অন্য কেউ এত আপন হয়নি। শুধু তাঁর শেখানো পথ ধরে হাঁটব বলে আমরা ক’জন বন্ধু এক হয়ে গড়ে তুলি একটি কাগজ যার নাম ‘প্রতিশিল্প’। যা ছোট কাগজ আন্দোলনে নব্বইয়ের প্রতিনিধিত্ব করে চলছে বলে আপাত মনে হয়।

আমি তো ভুলেই গেছি সালটা ১৯৯২ সাল। আড্ডার জায়গা মাঝে মাঝে বদলে অন্য কোথাও চলে যেতাম। যশোরের চারুপীঠ-এ এস এম সুলতান-এর সাথে আড্ডা হয়েছে আমাদের সংঘবদ্ধতায়। ওখানে শামীম ভাই (ভাস্কর মাহবুব জামিল শামীম) ছিল আমাদের আরেক আড্ডাপ্রিয় মানুষ। কত দিন যে পার করে ফিরেছি মধ্যরাতে।

তখন মোবাইল-ইন্টারনেট এর যুগ নয়, তবুও আমরা খোঁজ পেয়েছি কোথায় ভালো আড্ডা হয় আর সেই আড্ডায় চলে আসেন এক-এক বটবৃক্ষ। আমাদের যশোরের আড্ডায় এসেছেন হাসান আজিজুল হক, কবি আজীজুল হক, এস এম সুলতান, সেলিম মোরশেদ। শুধু কালপত্র নয়, চারুপীঠ নয়, আমাদের আড্ডার জায়গা মাঝে মাঝেই চলে যেত হাসপাতালে চৌহদ্দি, পাবলিক লাইব্রেরি সহ যশোরের অলিগলিতে, আর আমাদের আলাপ ছিল পৃথিবীর সাহিত্য নিয়ে। আমরা কেউ পণ্ডিত মানুষ ছিলাম না তবে একজন যা জানত তা সবাইকে জানাত এবং মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গ্রহণ করতাম। আবার সেই বিষয়ে পড়ে পরে আবার আলাপে নতুন স্বাদ ও স্বরের খোঁজ পেতাম। এমনই চলত আমাদের মহা-সোমবার।

একদিন আলাপে উঠল সেলিম মোরশেদ ভাই-এর নাম। তিনি যশোরে আছেন। তিনি আসবেন আড্ডা দিতে ‘কালপত্র বইসমাবেশে’। একজন সুদর্শন যুবক এলেন। এসে আমাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকি তাঁর আলাপ, কথা চলতে থাকে পত্রিকা, ছোট কাগজ, কবিতা, লেখক। একজন লেখক কী পড়বে, কী শুনবে— আমাদের আড্ডার মাঝে শেখানোর জন্য তিনি দার্শনিক এর মতো আলোচনা শুরু করলেন।

আমাদের পরম পাওয়া মানুষ সেমো যেন এথেন্স থেকে এসে জানাচ্ছেন সেই নগররাষ্ট্রের কথা, মিশর, ব্যাবিলন-এর অরূপ কথনে যেন দেশ-রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে দেখতে পেলাম সত্যিকারের সাহিত্য। দূরপ্রাচ্য থেকে তুলে আনা ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এক অন্তর-আত্মার রূপ-রস-গন্ধ। এই পারে দাঁড়িয়ে দেখলেন সেইপারের সাহিত্য। আমরা আগে কখনো মোজার্ট-বেটোফেন-এর নাম শুনিনি, কিন্তু তিনি আমাদের দীক্ষা দিলেন। চমৎকার হয়ে উঠলাম। চৌরাসিয়ার বাঁশি, জাকির হোসেনের তবলা, বিসমিল্লাহ’র সানাই, আরো সংগীতের সংগীতে মুখরিত দিন যাপন করে এগিয়ে যেতে সাহায্য করলেন সেমো। একজন লেখক হতে গেলে পড়তে হয় কোন বই, কোন বই পড়তে নেই, সেটা আমাদের হাতে-কলমে শেখালেন তিনি। আমাদের চেনালেন কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সুবিমল মিশ্র। সেমো’র চেনালোকে ঢুঁ মারতেই পেয়ে যাই অসীম জগৎ চেনার অপূর্ব কৌশল।

পড়ে চলি জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, সোমেন চন্দ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহিরসহ বাংলাভাষার সাহিত্য ও বিশ্বের গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, কাফকা, স্যামুয়েল বেকেট, বোর্হেস, আমাস টুটুঅলা, মিলান কুন্ডেরাসহ আরো কত জনের বই। প্রণোদনা যোগাতেন সেমো। আরো অনেক কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ স্মরণে আনতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই অচিন ঘরে, অচেনা মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘কালপত্র বইসমাবেশে’।

আমাদের অচেনা মানুষটি সবথেকে চেনা বান্ধবে পরিণত হয়, আজো অন্য কেউ এত আপন হয়নি। শুধু তাঁর শেখানো পথ ধরে হাঁটব বলে আমরা ক’জন বন্ধু এক হয়ে গড়ে তুলি একটি কাগজ যার নাম ‘প্রতিশিল্প’। যা ছোট কাগজ আন্দোলনে নব্বইয়ের প্রতিনিধিত্ব করে চলছে বলে আপাত মনে হয়।

এই ‘প্রতিশিল্প’ কাগজে কে লিখবে, কেন আমাদের তৈরি হতে হবে, এসব নিয়ে আলোচনা হত আড্ডার ফাঁকে। আমরা সেদিন শিখেছিলাম লেখায় গ্রাম্যতা আর গ্রামীণতা কী। কবিতা লেখায়, শব্দ চয়নে নান্দনিকতা, শব্দ প্রয়োগে সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে কথা চলত সেলিম ভাইয়ের সাথে। আজো আমি ঋণী হয়ে আছি সেই কবিতার বিশালতা নিয়ে আলাপচারিতায়। যা কোনো বাহুল্য বিষয়।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত