আশির শক্তিমান কবি সৈয়দ তারিকের একটি প্রশ্ন

‘এই দাঁড়িয়ে থাকা, এতোগুলো মানুষের প্রীতির বন্ধন বোধহয় একটা গতিপথ খুঁজছিলো’: সেলিম মোরশেদ

সৈয়দ তারিক: প্রিয় সেলিম মোরশেদ, যে লক্ষ্য ও আবেগ নিয়ে নিজের নিজের লেখার পাশাপাশি ছোটকাগজ চর্চা শুরু হয়েছিল, এখন তার অবস্থা, অর্জন ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তোমার মতামত বিস্তৃতভাবে বলো, ভাই।

সেলিম মোরশেদ: প্রিয়, তোমার প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তুমি নিজেও ছোটকাগজ আন্দোলনের একজন। সবসময় ছোটকাগজের সঙ্গে ছিলে, এখনও আছো। অবলোকনও যথেষ্ট মজবুত।

মধ্য-আশি পর্যন্ত রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা চারপাশ নিয়ে যতটা ভাবিনি আমরা, শুধু লেখালেখি আর বাজে লেখকদের এড়িয়ে চলাটাই ছিলো মুখ্য, বাঁকবদলটা শুরু নানান কারণে, কাগজগুলো নিয়ে আমাদের একটা বসার জায়গা ছিল না। ১৯৮৭’র ফেব্রুয়ারির বইমেলায় যখন চর্যাপদ আর গাণ্ডীব একসঙ্গে বের হয়, একই সঙ্গে প্রথম প্রকাশ ঘটলো দুটি পত্রিকার, বাংলা একাডেমির পরিচালককে হুমকি-ধামকি দিয়ে রাতারাতি অভ্যুদাহরণে স্টল নিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া হলো ছোটকাগজের পক্ষে। হাবিব ওয়াহিদের অনিন্দ্য আগে থেকে বের হতো। ওই সময় আযাদ নোমানের মুখ্য নেতৃত্বে হাবিব ওয়াহিদ, শোয়েব শাদাব, শান্তনু চৌধুরী, সাজ্জাদ শরিফ, বাহার রহমান, বদরুল হায়দার আমরা সবাই মিলে ছোটকাগজের স্টল প্রাপ্তির এই ধারাবাহিকতার সূচনা তৈরি করি। ‘৯২ সালে বইমেলায় ছোটকাগজের লেখক অসীম কুমার দাসের প্রথম কবিতার বই নিজের স্টল থেকে ছুঁড়ে দিয়েছিল এক অধ্যাপক (ইনআর্টিস্ট)। সাংঘাতিক ভূমিকা নিয়েছিলে তুমি। ড্রাফট করে জনমতের সই জোগাড় করছিলে যখন, বয়রাতলায় আমার আর আসাদুল করিম শাহিনের ওপর আক্রমণ করল সেই অধ্যাপকের ছাত্র নামধারী গুণ্ডারা। তার কয়েক ঘণ্টা পর টিএসসি’র কোনায় তোমাকে এবং আমাকে কয়েকজন পিস্তল নিয়ে হুমকিও দিলো। হয়তো প্রাসঙ্গিক না করলেও পারতাম এগুলো, কিন্তু তোমার প্রশ্নে ‘শুরুর যে ‘আবেগ বা অর্জন’’-এর যে উল্লেখ, আজ যারা লিটল ম্যাগাজিন করবেন তাদের জন্যে বলবো, কথাগুলো ফালাফালা করা ইতিহাস। এগুলো একদিনের ঘটনা না। আপোস বা করুণায় এই স্টলগুলো বাংলা একাডেমি দেয়নি।

সালমান রুশদি থেকে বাবরি মসজিদের ঘটনায় যখন সম্পৃক্ত হচ্ছি এমন এক সময় সম্ভবত প্রশ্নগুলো এসেছিলো; এই দাঁড়িয়ে থাকা, এতোগুলো মানুষের প্রীতির বন্ধন বোধহয় একটা গতিপথ খুঁজছিলো; কোনো একটা দর্শনে হাত রেখে বা পারিপার্শ্বিক অসংলগ্নতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে অটল চিৎকারে যেন নিজে কেঁপে ওঠা। পালটা কথার সূত্রমুখ… বা ব্যক্তিগত ইস্তেহার যখন লিখি, এই হ্যান্ডবুকটা ছিলো নিজের জন্যে। এইটুকু বুঝেছিলাম চারপাশের শ্যাওলাগুলোয় পাথর জমেনি। সেই সময় আমি যা যা ভাবতাম এটা ছিল সবচেয়ে পারফেক্ট। আর এইসব ঘটনা, অভিজ্ঞতা, তোমাদের নৈকট্য আমার অনুভব এবং প্রত্যয়ে শুধু অনিবার্যতা আনেনি, দীক্ষিত করেছিল। তবে একটা কথা, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে অনিন্দ্যে প্রথম প্রবন্ধ লেখেন।

আজকে যারা ছোটকাগজের চর্চা করেন, এর ‘অবস্থা’ ‘অর্জন’ আশি নব্বই বা শূন্য দশকের মতো অবশ্যই হবে না। এখন অনেক কাগজ বের হয়। চিন্তাটাও একা করতে হয় না। ওদের সব চিন্তার সঙ্গে একমত না হলেও ওরা যে তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক কার্যক্রম নিয়ে ভাবার চেষ্টা করছে, পুঁজিবাদী অবস্থাকে বোঝার চেষ্টা করছে, এটাই সম্ভাবনা। ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ – চাওয়াটা আমার এখনো আছে এবং সবসময় থাকবে।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত