ওমর শামস। সামগ্রিক বিচারে তিনি ৭০ দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিদের একজন। আঙ্গিক ও বিষয়-বৈচিত্র্য স্বকীয়তার কারণে তিনি তার সমসাময়িকদের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন শুরু থেকেই। ৭০ দশক ধরলেও তিনি দশকের সংকীর্ণ বাউন্ডারিতে কখনওই আটকে থাকেননি। প্রতিনিয়ত নিজেকে নবায়নের মধ্য দিয়ে কনটেম্পরারি কবিই হয়ে থেকেছেন সকল সময়।
তিনি মূলত কবি হলেও তার আরও পরিচয় তিনি একজন প্রবন্ধকার ও অনুবাদক। আর পেশাগতভাবে একজন বিজ্ঞানী ছিলেন।
সে যাইহোক, শুরুতেই তার একটা কবিতা পড়ি, কবিতার নাম ‘পৃথিবীতে বসবাস’:
আমার ঘরে থেকে
জমে যে আন্ধার
তোমার ঘরে বাস
করে যে রোদ্দুর
আমার ঘরে ভাসে
সফেদ মেঘ আর
তোমার ঘরে নীল
খেলে সমুদ্দুর।
আমরা দুজনই— ঘরে থাকি না! ঘরে থাকি না! ঘরে থাকি না!
তোমার বনে ফোটে
ব্যাকুল বকুলই
আমার বনে জ্বলে
রুদ্র কিংশুক
আমার বনে বাস
করে যে ব্যঘ্র
তোমার বনে ফেরে
হরিণ সততই
আমরা কেউ-ই— বনে থাকি না! বনে থাকি না! বনে থাকি না!
তোমার খালে নড়ে
খলসে, চাঁদা মাছ
আমার নদী তলে
চিতল, পাঙ্গাস।
তোমার জলে বাস
চাঁদের জোছনার,
আমার নদে দোলা
বেদের বজরার।
আমরা আসলে— জলে থাকি না! জলে থাকি না! জলে থাকি না!
আমরা কেউই— বনে থাকি না! বনে থাকি না! বনে থাকি না!
আমরা দুজনই— ঘরে থাকি না! ঘরে থাকি না! ঘরে থাকি না!
তাইতো প্রেমের মরা ডোবে না! মরা ডোবে না! মরা ডোবে না!
২.
ওমর শামস জন্মেছেন ১৯৪৭ সালের ১৬ জুলাই, দিনাজপুরের বিরল উপজেলায়। ১৯৭২ সালে পড়াশোনার জন্যে আমেরিকায় চলে যান। তাঁর বিষয় ছিল পদার্থ বিজ্ঞান। পড়াশোনা শেষে নাসার বেল ল্যাবরেটরিতে তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।
কবি হিসেবে পরিণত ও প্রকাশ হতে থাকেন ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে। ১৯৮৪ সালে প্রথম বই প্রকাশ হয়, কবিতার বই। তখন তাঁর ৩৭ বছর বয়স। বইয়ের নাম ‘বোধিবৃক্ষতলে’। ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় কবিতার বই ‘খোয়াবনামা’। ‘সত্তুরের মিছিল’ বইটা প্রকাশ হয় ১৯৮৯ সালে। ‘রিলকের আসা যাওয়া’ ১৯৯২ সালে। ছয় বছর পর ১৯৯৮ সালে প্রকাশ হয় ‘কৃতি-প্রতিকৃতি এবং অন্যান্য কবিতা’ বইটা। তারপর ১২ বছর পর বের হয় একই বছর ২০১০ সালে একই সঙ্গে দুটো কবিতার বই, ‘ইন্টারনেট গায়ত্রী’ ও ‘বাবরের পদ্ম অশোকের চাকা’। পরের বছর ২০১১ সালে ‘অনন্তর পান্না’। তারপর ‘নিউ ইয়র্কে যিশু’ বইটা প্রকাশ হয় ২০১২ সালে। পরের বছর ২০১৩ সালে ‘ও ওমর ও বোর্হেস’ বইটা প্রকাশ হয়। ২০১৪ সালে বের হয় তাঁর ১০টা বইয়ের সংকলন একমলাটে, নাম ‘উনিশশো অনন্তর দিকে’। একই বছর প্রকাশ নতুন কবিতার বই ‘হাইব্রিড মুরগি’।
২০১৭ সালে প্রকাশ হয় জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধের বই ‘কেন শুদ্ধতম’। একই বছর প্রকাশ হয় অনুবাদ কবিতা ও অনুবাদ বিষয়ক রচনা নিয়ে বই ‘কুয়াকাটা ও কালাহারি’।
তার পরের বছর ২০১৮ প্রকাশ হয় বাঙলাদেশের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ ৮জন কবি যথা শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হুমায়ুন আজাদ ও আবুল হাসানের কবিতা নিয়ে লেখা প্রবন্ধসংকলন ‘পঞ্চাশের পরে’।
৩.
ওমরের কবিতা একনাগাড়ে পড়া সহজ নয়, থেমে থেমে পড়া লাগে। পড়া শেষে অস্থির লাগে। আমাদের অচেতনকে তিনি তাঁর কবিতায় সাবলীলভাবে প্রকাশ করেন, যা আমাদের কাছে বেশিরভাগই অপ্রকাশিত থাকে। তাঁর কবিতার কোনো পরিণতি নেই, তাই কোনো চিন্তাগত সিদ্ধান্ত দেয় না, তবে ইঙ্গিত দেয়।
৩০-এর দশক থেকে ৭০-এর দশকের কবিদের কবিতার সঙ্গে তুলনামূলক বিচার করলে তাঁর কবিতায় ইউনিক অনেককিছুই এসেছে বলে আমার মনে হয়েছে। তাঁর কবিতা বিষয়বস্তুতে সময়কে ধারণ করে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন ইতিহাসচেতনা রয়েছে, তেমনই তিনিও তাঁর সময়কে ধরবার চেষ্টা নিয়েছেন। কেবল বাঙলাদেশ নয়, বৈশ্বিক পটভূমিতে ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি, বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তিও তাঁর কবিতায় প্রকাশ ও বিস্তারিত হয়। পক্ষান্তরে দেখা যায় তাঁর সমসাময়িক ৬০-৭০-এর দশকের বেশিরভাগ কবি দেশীয় ঘটনাকেই কবিতায় ধরেছেন।
তিনি ফর্মে স্তবকায়িত মাত্রা যেমন লিখেছেন, ফ্ল্যাট গদ্য-কবিতাও লিখেছেন। গদ্য থেকে মাত্রায় যাওয়া, মাত্রা থেকে গদ্যে ফিরে বিস্তার করা তাঁর অনেক কবিতার বিশিষ্টতা। এমন ব্যাপার ধ্রুপদি সংগীতে আছে, সেখান থেকেই অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর কবিতায় এসেছে বলে আমার মনে হয়েছে। তাঁর কবিতার ধ্বনিচরিত্র বা শ্রুতিকল্পের নিজস্বতা আছে, আছে বিষয়ের বৈচিত্র্য। শুধু ঘটনা বা আবেগ থেকেই নয়, জ্ঞান থেকেও কাব্য রচনা করেছেন তিনি। কিছু কবিতা যা চিত্রকল্প উত্তীর্ণ করে পুরোটাই কল্পনায়, অনেকটা ড্রিম বা ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো। অথবা পরাবাস্তব।
ওমরের প্রত্যেকটা কবিতার বইয়ের আঙ্গিক ও বিষয়ের ঠিক ব্যাখ্যা নয়, খুব সংক্ষেপে আমার ধারণার কথা বলছি এইখানে:
- তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘বোধিবৃক্ষতলে’-এর কবিতাগুলিতে মূলত আর্ট বা শিল্পের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়, পাওয়া যায় প্রেম, যুদ্ধ ও তার পরবর্তী অবস্থা। মানুষের স্বপ্ন কেমন করে আধুনিক চেতনার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তা এই বইয়ের কবিতা পড়লেই বোঝা যায়।
- ‘বোধিবৃক্ষতলে’-এর দুই বছর পরেই তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘খোয়াবনামা’ প্রকাশ হয়। এই বইয়ে বিদেশে থেকে দেশের জন্য আর্তি, নিউইয়র্ক ও বাঙালির বাঁচার স্বপ্ন বিধৃত হয়েছে। প্রথম বই থেকে দ্বিতীয় বইয়ে যে তাঁর সার্বিক উত্তরণ তা বেশ চোখে পড়বার মতো, নির্মাণকৌশল, শব্দের ব্যবহার ইত্যাদির, কিন্তু এরপরেও ‘হাইব্রিড মুরগি’ পর্যন্ত প্রতিটা কবিতার বইয়ের কবিতাই মনে হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধরন একটা ক্ষেত্র পর্যন্ত।
- ‘হাইব্রিড মুরগি’ বইয়ের কবিতাগুলিতে মূলত দেশের রাজনৈতিক সংকট, জনগণের দুরাবস্থা ও অন্যান্য বিষয় নানাভাবে উঠে এসেছে।
- ‘সত্তুরের মিছিল’ বইটাতে আমরা পেয়ে যাই বেশকিছু বক্রোক্তির কবিতা ও অ্যান্টি-পোয়েট্রি।
- ‘রিলকের আসা যাওয়া’ বইতে রয়েছে প্রেমের কবিতা রচনার সমস্যা এবং ৭ মাত্রার কবিতা। এই বইয়ের কবিতায় দেখা যায় ওমর তাঁর আগের তিনটি কবিতার বইয়ের কাব্যভাষা থেকে সরে চলে এসেছেন ভিন্ন এক জায়গায়। এই বইয়ে কবির মন্ময়তা, আপন অস্তিত্বকে ঘিরে সংকট, যাতনা ইত্যাকার ব্যাপার প্রকট হয়। যে কবি এইখানে এঁকেছেন তাঁর সত্তার অভাবনীয় রূপ।
- ‘কৃতি-প্রতিকৃতি এবং অন্যান্য কবিতা’ বইতে রয়েছে বিভিন্ন মানুষ চরিত্রের কবিতা।
- তাঁর ‘ইন্টারনেট গায়ত্রী’ বইয়ের কবিতাগুলিতে বিজ্ঞানের পথে মুক্তি কেমন করে ও নানা প্রসঙ্গ এসেছে। তিনি যেহেতু বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান, মহাকাশ বিজ্ঞান ইত্যাকার বিষয় তাঁর কবিতা লেখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বলে আমার মনে হয়। যদিও তাঁর কবিতায় বিজ্ঞানকে সরাসরি দেখা যায় না, প্রচ্ছন্নভাবে কদাচিৎ এসেছে কখনও শব্দে বা সিঙ্গল ইমেজে। কিন্তু ‘ইন্টারনেট গায়ত্রী’ ও ‘বিব্রত বর্ণমালা’ এই দুই কবিতার বিষয় হিসেবে প্রত্যক্ষভাবেই বিজ্ঞান ও বাঙালি এসেছে। অন্যান্য কবিতায় ইমেজারিতে, প্রসঙ্গে এসেছে। অনেক রুবাই কবিতার বিষয়ও বিজ্ঞানজড়িত। তাঁর মতে, বিজ্ঞান যেহেতু ইতিহাসে মানুষের অস্তিত্ব ও প্রগতির ব্যাপার, বিষয় হিসেবে তাই বিজ্ঞানকে কোনোভাবেই বাদ দেয়া যায় না। এ নিয়ে ওক্টাভিও পাজেরও চমৎকার একটা লেখা আছে।
- ‘বাবরের পদ্ম অশোকের চাকা’ বইয়ে রয়েছে নানা বিষয়ে লেখা রুবাইয়ের সমাহার।
- ‘নিউ ইয়র্কে যিশু’ বইয়ের প্রধান কবিতাগুলিতে জিওপলিটিক্স, প্রগতি সত্ত্বেও মানুষের গরিবি, সংকট, বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বিকাশ, অস্তিত্ব, সম্ভাবনা-সহ নানা বিষয় প্রকাশ পায়।
- ‘ও ওমর ও বোর্হেস’ বইয়ের কবিতাগুলিতে শিল্পীর আত্মজীবনীর কাব্যরূপ ও বিবিধ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

৪.
ফর্মে ছন্দ দিয়ে অক্ষর, মাত্রা, স্বরবৃত্তে যা হতে পারে তা প্রায় হয়ে গিয়েছে। আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ কৃতিত্ব সত্ত্বেও টেকনিকালি ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত, যা রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন। ‘বৈদেহী বিচিত্রা আজি সঙ্কুচিত শিশির সন্ধ্যায়’, সুধীন্দ্রনাথ-এর ১৮ মাত্রা। বিষ্ণু দে-সহ বহুজন লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরানের গহীন ভিতরে’ ১৮ মাত্রা। বিষয় ও ভাষা ভেদে পৃথকীকরণ। আর ১৪ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত, রবীন্দ্রনাথের ‘এক গাঁয়ে’ এটাও এক স্ট্যান্ডার্ড মাপকাঠি। অনেকেই এমন কবিতা লিখে খ্যাত, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাগুলো তো ধ্রুপদিই বলা যায়। শহীদ কাদরীর ‘অসঙ্গতি’, জয় গোস্বামীর ‘সৎকার গাথা’ আদতে এক জিনিস।
একালে ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশে এই জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড ছন্দকরণে খুব কম লেখা হয়। কেননা যা হবার হয়ে গিয়েছে। লাতিন ভাষার কবিদের দেখা যায় যেমন আলেকজান্ড্রাইনে মানে ১৪ সিলেবলের স্টাইলে শুরু করেছে কিন্তু পরে ভেঙে গদ্যের মতো চলে গেছে।
ওমর ফর্মে লিখেছেন, যেমন প্রথম বইয়ের ‘ক্লান্ত মনীষা’, তবে লিখেছেন কৌশলে। তিনি বেশি লেখেননি, তবে চর্চা করেছেন তা বোঝা যায়। প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতা, ‘পার্থিব বসবাস’ এভাবে শুরু করেছেন,
আমি মাটি হব।
কেননা স্তরে-স্তরে
ফসিল আছে
গুল্ম আছে
বৃক্ষ আছে
পাখি আছে
পাতা আছে,
হাওয়া আছে।
এই চলনটা ‘আছে’ ক্রিয়াপদের পুনরাবৃত্তি গদ্যে, ঠিক টালির ডিজাইনের মতো। এরপরেই, ‘সমীর শোনেনি যার মৃদু স্নান গান, তেমনই নদী আছে’। ধ্বনির দিকে একটা সারগামের প্যাটার্ন গড়াতে গড়াতে শেষে সুরের লম্বা ফ্রেইজে শেষ হচ্ছে। গদ্য থেকে মাত্রায় যাচ্ছে। তারপর আরও ৪ লাইন চিত্রকল্পিত গদ্য হয়ে:
ডাইনোসোরাস, ব্রন্টোসেরাস, ডিপ্লোডকাস
লুপ্ত হলো বারংবার—
অভ্র আছে,
পেট্রোলিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, রুবিডিয়াম,
অসংযত গ্লেসিয়ার।
সম্পূর্ণ অন্য ধ্বনির অক্ষরবৃত্ত বা দ্রুত পড়লে মাত্রাবৃত্ত। আবার গদ্য থেকে মাত্রায়। শেষ দুলাইন মাত্রাবৃত্তে।
সমারূঢ় পিণ্ড হতে খাদ্য ঝলসালো
আমি চলিষ্ণু চিরগতি চতুর্ময় আলো।
এই ধরনের চলনে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। ধ্বনির উচ্চাবচতা আছে, অথচ পড়তে গিয়ে হোঁচট খেতে হয় না। একই প্যাটার্ন বিষয়বস্তুর প্রয়োজনে তাঁর অনেক কবিতাতেই এসেছে, যেমন ‘খোয়াবনামা’, ‘ঘরে ফেরা’, ‘স্বপ্নের ফেরিঅলা’ ইত্যাদি কবিতায়। নিরেট গদ্য কবিতা যেখানে প্রয়োজন, সেখানে তিনি লিখেছেন। ‘প্রজেশ রায়’, কবিতাটি যেন দমকা হাওয়ার মতো। আমরা পড়ি:
আমি প্রজেশ রায়ের কথা বলতে এসেছি।
হে বাঙলার বুজর্গ, প্রজেশ রায়কে আপনাদের মনে নেই।
আপনারা কি তাকে চেনেন? জানেন?
চিনতেন?
জানতেন?
কোন স্তবক কি আপনাদের উচ্চারণে আছে তার?
বটেই! কেননা প্রজেশ রায় চার দশক আগে মরে গিয়েছে।
আমাদের ভাষায় কথ্য থেকে প্রমিতের মধ্যে অনেকখানি দূরত্ব। এই বিচিত্রতার সমাহার তাঁর লেখায় আছে, কিন্তু একেবারে সংলাপধর্মী ওই অর্থে কিছু লেখেননি। কেননা তা গদ্যের কাজ। তাঁর কবিতায় ধ্বনি শ্রুতিকল্পের বৈচিত্র্য আছে, চিত্র ও শ্রুতিকল্প কীভাবে যৌথ সমাহারে সার্থক হয়, তার বিবিধ নমুনা আছে।
ওমর শামস পাকিস্তান দেখেছেন, যুদ্ধ দেখেছেন, যুদ্ধ পরবর্তী ক্ষমতার রদবদল, ক্যু, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড-সহ সামরিক শাসন হয়েছে দেশে, সবই দেখেছেন। কিন্তু এইসবের সরাসরি কোনো প্রভাব তাঁর প্রথম বইটার কবিতায় পড়তে দেখা যায় না। কিন্তু ‘আগন্তুক’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিন্তানি হানাদার বাহিনীর গ্রাম আক্রমণের ব্যাপার, ‘জ্যা-হীন-তীর’ কবিতায় রাজাকারের কথা, ‘তদন্ত’ কবিতায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা, ‘ডিনার টেবিল’ ও ‘ক্ষুধা’ কবিতায় দুর্ভিক্ষের কথা, ‘বীথিদের বাড়ি, ‘হাত’ কবিতায় ধরা পড়েছে শ্রেণিবৈষম্য।
ওমরের কবিতার স্টাইল আলাদা। তিনি প্রত্যক্ষভাবে কবিতায় রফিক আজাদের মতো ‘ভাত দে হারামজাদা’, বা রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ’র মতো ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ টাইপ স্লোগান লেখেন না।
তাঁর সমসাময়িক আগে ও পরের দেশের বেশিরভাগ কবির কবিতাই স্লোগানধর্মী ছিল। তাঁর কবিতায় প্রায় সময় একটা আশাবাদের ব্যাপার দেখা যায়। মানুষ তো বাঁচতে চায়, টিকে থাকতে চায়। মানুষ চায় না পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাক, চায় না মহামারী বা বোমায় সব বিনাশ হয়ে যাক, মানুষ ইতিহাস ও সময়ের মানবতাবাদী পরিণতিই চায়। মানুষের জীবনযাপন আশা-নিরাশা নিয়ে বলেই তাঁর কবিতায় আশাবাদ বিদ্যমান বলে আমার মনে হয়েছে।
৫.
জালাল উদ্দিন রুমি, উইলিয়াম শেক্সপিয়র, আর্তুর র্যাঁবো, জীবনানন্দ দাশ প্রমুখের কবিতার উচ্চাঙ্গতায় এক এক জনের এক এক রকম বৈশিষ্ট্য। তাদের কবিতা আমরা এখনও পড়ি, এত কাল পরেও পড়ি বলেই তাদের কবিতা ধ্রুপদি। আরও কী কী কারণে ধ্রুপদি তা লিখতে গেলে গবেষণা সন্দর্ভ হয়ে যাবে বৈকি, কিন্তু অন্তর্দীপ্তি বাড়বে না। এই পর্যন্ত এসে বলছি যে ওমর শামসের কবিতার মধ্যে ঠিক ধ্রুপদি নয়, তবে দীর্ঘকাল টিকে থেকে পরে উচ্চাঙ্গের হতে পারে অন্তত একাধিকবার পড়ে ক্লান্তি আসে না এমন কবিতা অনেকই আছে। যেমন খোয়াবনামা’ কবিতায় মানুষের স্বপ্ন, ‘মাছ’ কবিতা প্রেমের ঐশ্বর্য দিয়ে আবৃত, ‘রিলকের আসা যাওয়া’ কবিতা মূলত প্রেমের কবিতার জটিলতাকে প্রকট করে, ‘বিব্রত বর্ণমালা’ কবিতায় প্রযুক্তির আর আমাদের পিছুটানের কথা, ‘অন্ধকারে লাফ’ কবিতায় বাসনা, ‘নিউইয়র্কে যিশু’ বর্তমানের মানুষ যে ভূ-রাজনীতির চক্রে ঘুরে মরে তার কথা, ‘স্বপ্নের ফেরিঅলা’ কবিতায় বাঙালির সত্তার কথা, ‘হাইব্রিড মুরগি’ রাজনৈতিক সংকটকে বর্ণনা করে। এমন আরও অনেক কবিতা পড়তে পড়তেই পাওয়া যায়।
৬.
এতক্ষণ যা বললাম তা মোটামুটি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের সীমানার মধ্যে ধরা পড়া কবি ওমর শামস ও তাঁর কবিতার জগৎ। তাঁর সঙ্গে আমি একদিন মূলত কবিতা নিয়েই কথা বলেছিলাম। সেইদিনের সেই আলাপচারিতার কিছু অংশ উপর্যুক্ত লেখাকে সমৃদ্ধ করবার জন্যে এইখানে রাখলাম।
আমি: ‘কবিতার কথা’য় জীবনানন্দ যে কল্পনা প্রতিভার কথা বলেছেন তাকে কীভাবে দেখেন? মানুষ মাত্রই তো কল্পনা করতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ আর একজন কবি বা লেখকের কল্পনা করার প্রক্রিয়া কী হতে পারে?
ওমর শামস: সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই কল্পনা করতে পারে কিন্তু তার কল্পনা কবিতা রচনার প্রক্রিয়ায় কাজে লাগে না, সে লাগাতেও পারে না। চিন্তাশক্তি ও জীবনের অভিজ্ঞতা থাকলে, কাব্য ঐতিহ্যের আহরণ থাকলে কল্পনা প্রতিভা, অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে কবিতা সৃষ্টি করতে পারে কেউ কেউ। এই প্রতিভা শুধু কবির থাকে, সবার নয়। নিরেট কাব্যবিকীরণেই নয়, কল্পনা নতুন চিন্তাসঙ্গ তৈরি করতে পারে, মনকে ঘুরিয়ে আনতে পারে, ভাবনার প্রতিধ্বনি ঘটাতে পারে, মানে ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পারে।
চিত্রকল্পের উদ্ভাবন কল্পনার দ্বারাই সম্ভব। বোদলেয়ারের কবিতাবোধের পরে একথা এখন সুপ্রষ্ঠিত যে, যা বলার তা পরোক্ষভাবে চিত্রকল্পের মাধ্যমেই বলতে হবে কবিতায়। কবিতায় গন্ধ, স্পর্শ, রং সকল ইন্দ্রিয়ের সম্যক সমাহারে বিস্তার কল্পনার দ্বারাই সম্ভব।
বাস্তব অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এমনকি অধীত জ্ঞান চরিতার্থ কবিমানসে কল্পনার দেশলাইয়ে মুহূর্ত জ্বলে ওঠে, চিত্রকল্পে, ইন্দ্রিয়সমাহারে এক আচ্ছন্ন রূপ-ধ্বনির সৃষ্টি হয়, সেই ধ্বনিতে যুক্ত হয় বিভিন্ন বোধ ও ছবির সমাগম, প্রতীপ, বিপ্রতীপ সঞ্চার। এই রাসায়নিক আগুনেই কবিতার জন্ম হয়। এক এক কবির কল্পনা প্রতিভার প্রয়োগে ভিন্নতা থাকতে পারে অবশ্যই। কিছু কবি-কবিতা-ইতিহাসের তথ্য দেয়া যেতে পারে। শেলি যুক্তি ও কল্পনার প্রসঙ্গ তুলে কল্পনাকে অধিক গুরুত্বের অধিকার দিয়েছিলেন।
কোলরিজ কল্পনাকে দুই স্তরের (Fancy, Imagination) ভেবে-চিন্তে কবিতা রচনার প্রক্রিয়ারও ইঙ্গিত করেছিলেন। কল্পনাই কবির চিন্তা, চিত্রকল্প, সমূহ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গ, সূক্ষ্ম ধ্বনি সঞ্চালন করে সেই রচনা করতে পারে যার পাঠোদ্ধারে ‘Willing suspension of disbelief’ সম্ভব।
ফরাসি কবি ভালেরি কবিতা কল্পনা বা রচনার প্রক্রিয়ার বিশদ আলোচনা করেছেন ‘দি আর্ট অব পোয়েট্রি’ বইতে। জীবনানন্দ দাশ কল্পনা ও কাব্য রচনার প্রক্রিয়ার যতটুকু আভাস দিয়েছেন, ‘তা এই খণ্ড-বিখণ্ড পৃথিবী, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত মৃদুতম সচেতন অনুনয়ও এক এক সময় যেন থেমে যায়, একটি পৃথিবীর অন্ধকার-ও-স্তব্ধতায় একটি মোমের মতন যেন জ্বলে ওঠে হৃদয়, এবং ধীরে ধীরে কবিতা-জননের প্রতিভা ও আস্বাদ পাওয়া যায়। নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তু-সঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতর, সেই প্রতিফলিত অনুচ্চারিত দেশ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে ওঠে যেন, সুরের জন্ম হয়, এই বস্তু ও সুরের পরিণয় শুধু নয়, কোনো কোনো মানুষের কল্পনা-মনীষার ভিতর তাদের একা, তা ঘটে কাব্য জন্ম লাভ করে।’
আমি: কবিতার কোনো সংজ্ঞা আছে আপনার কাছে, বা নিজস্ব কবিতাবোধ?
ওমর: ‘বাক্যং রসাকং কাব্যং’ এটা কবিতার আদি সংজ্ঞা। এই চরিত্রায়ণ এখনও টিকলেও, কাব্য গতিষ্ণু, মানে ‘ডাইনামিক’ তাই কবিতাবোধ পালটে যায় কালে, ইতিহাসে। আসলে প্রত্যেক মহৎ কবির কবিতার ধারণা তার নিজস্ব। কবিতার দায়িত্ব মানুষের জীবনের কোনো অচিহ্নিত তলকে আবিষ্কার করা। প্রেম তো আদি বিষয় কিন্তু প্রেমকেও নতুন চাহনিতে নিবদ্ধ করতে হবে। নব আবিষ্কার, অতএব কবিতার বিষয় হচ্ছে প্রথম শর্ত যা অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, জ্ঞান, কাল থেকে জেগে ওঠে। এবং এই অবলম্বন ঘিরেই কবিতার ক্রাফটসম্যানশিপ উপমা-চিত্রকল্প, ধ্বনি-শ্রুতিকল্প, ভাষা, সঙ্গত যত অনুষঙ্গ লতিয়ে-জড়িয়ে ওঠে এবং কবিতাকে সুষমা দেয়। কারও ধারণা আছে যে, কবিতার বিষয় লাগে না, প্রথম লাইন হলেই হয়। প্রথম লাইনও অভিজ্ঞতার অন্তস্থল থেকে উদ্গত হয়। অনেকে বলেছেন, ভাষাই কবিতা। জাঁ পল সার্ত ‘হোয়াট ইজ লিটারেচার’ বইতে লিখেছেন, ‘ভাষার জন্ম থেকেই কবিতার জন্ম’। আমি একমত নই। প্রথমে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বোধ। বোধের অনুভূতিতেই আগুন যার মধ্যে অন্য সব চিত্রকল্প, শ্রুতিকল্প, ভাষা, সুর, অনুষঙ্গ গলে রসায়নে একটি কবিতার বাকি কাজ সম্পন্ন করে। এই ক্রিয়ার প্রধান কারিগর কল্পনা। এমনকি লেখা শেষ হবার পর কবির বার বার মকশ, সেও কল্পনার কাজ। কিন্তু তখন সে অবচৈতন্যের নয়, সুস্থির চিত্তের। একই কথা অন্যভাবে বললে, আমি কনটেন্টের গুরুত্ব দিচ্ছি। ফর্ম কবিতার ঐতিহ্যবাহিত হয়ে আসছে এবং কবিতা রচনার প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হচ্ছে। কবিতার বিষয় যা খুশি হতে পারে, টুথপেস্ট অথবা জিওপলিটিক্স। কবিতা মাত্রাবদ্ধ হতে পারে, গদ্যেও হতে পারে। কিন্তু তার সংগীত থাকে।
কারও ধারণা আছে যে, কবিতার বিষয় লাগে না, প্রথম লাইন হলেই হয়। প্রথম লাইনও অভিজ্ঞতার অন্তস্থল থেকে উদ্গত হয়। অনেকে বলেছেন, ভাষাই কবিতা। জাঁ পল সার্ত ‘হোয়াট ইজ লিটারেচার’ বইতে লিখেছেন, ‘ভাষার জন্ম থেকেই কবিতার জন্ম’। আমি একমত নই। প্রথমে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বোধ। বোধের অনুভূতিতেই আগুন যার মধ্যে অন্য সব চিত্রকল্প, শ্রুতিকল্প, ভাষা, সুর, অনুষঙ্গ গলে রসায়নে একটি কবিতার বাকি কাজ সম্পন্ন করে
আমি: কবিতার ক্রাফটমেন্টশিপের যে-ব্যাপারটার কথা আপনি বললেন দেখা যায় সেটা অনেকেই পারেন না, অভিজ্ঞতাকে কল্পনা প্রতিভার বর্ণিল ডানা দিয়ে ওড়ানোর ব্যাপারটার কথা বলছি। দেখা যায় কবিতাকে বানাতে গিয়ে হয়ে গেছে ছন্দোবদ্ধ শব্দের খেলা, অনেকটা তাসের ঘরের মতো, একটু হাওয়া বা স্পর্শেই ধসে পড়ল। আপনার কী মনে হয়, কেন পারেন না?
ওমর: কবিতা কী, সে সম্পর্কে ধারণা হতে সময় লাগে। অনেকের হয় না। অনেকে সাম্প্রতিকতা দিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে যায়।
আমি: আধুনিক কবিতা বলতে আপনি কী বোঝেন, একটু বিস্তারিত ও সহজ করে বললে বুঝতে সুবিধা হয়।
ওমর: আধুনিক কবিতা বলতে তিনটা চিন্তা চালু আছে:
- বোদলেয়ারের কবিতাকর্ম ও চিন্তাভিত্তিক আধুনিকতার ধারণা।
- আভাগার্দ বা বিভিন্ন ইজমের ধারা: সুররিয়ালিজম, দাদাইজম, ফভিজম-বাহিত আর জারিত আধুনিকতার ধারণা।
- বৃহত্তর ইতিহাস-সামগ্রিক ধারণা: সতেরো শতক থেকে বিজ্ঞানের ভিত্তিভূমি এবং ফলিত প্রয়োগ থেকে থিউরি অব নলেজের থেকে যে ধাক্কা এসে লাগল ভিন্ন শিল্প মাধ্যমেও, তার থেকে জনিত ‘আধুনিকতা’র ধারণা।
আধুনিক কবিতার দুটো ডানা:
- জীবন-প্রকৃতি, সমাজ-ইতিহাসের বিবর্তন উদ্ভূত অঙ্গ।
- কবিতার প্রকরণের পরিবর্তন ও উদ্ভাবন থেকে অঙ্গ।
গ্যালিলিও গ্যালিলি, কোপার্নিকাস, আইজ্যাক নিউটনের নিরীক্ষাভিত্তিক বিজ্ঞান ধর্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দিল। আর চার্লস ডারউইন এসে তো থিওলজি প্রায় নির্মূল করে দিলেন। আমি ইন্টেলেকচুয়াল প্রদেশের কথা বলছি, গণ-মানসের নয়। এতে করে, খ্রিষ্টিয়ানিটি আর রেনেসাঁ জগতের শিল্পকলার ভিত নড়ে-সরে গেল। চিত্রকলার মধ্যেও, ধর্মীয় মিথের চরিত্র রূপায়নের বদলে পৃথিবীর রক্তমাংসের মানুষ চিত্রায়নে মনোনিবেশ ঘটল। দান্তের মধ্যে মানুষের মনের সংকট পাওয়া যায় কিন্তু স্বর্গ, নরক, খ্রিষ্টীয় মিথ টেকানো মুশকিল হয়ে পড়ল বিজ্ঞনের আবিষ্কার ও যুক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সেইজন্য, বোদলেয়ারের মানুষ সংশয়াপন্ন মানুষ, কিন্তু পৃথিবীতে, নগরের নরকে। তিনি উদ্ধার পেতে চান মানুষী স্বকর্মে, শিল্পে এবং পালিয়ে যেতে চান জনতা ও জরা থেকে দূরে কোনো নিরক্ষীয় দ্বীপে, অনন্তে তা যেখানেই হোক।
আঠারো শতক থেকে বিজ্ঞানের যে-ফলিত প্রয়োগ ঘটল জগৎ ও জীবনে— শিল্পবিপ্লব, নগরে জনসমাগম, প্যাস্টোরাল জীবনযাত্রার ধীর অবলোপন, যন্ত্র-শ্রমিক জীবন, পুঁজি-ট্রেইড-বাণিজ্যের বিকাশ, ঔপনিবেশিকতা, বিপ্লব, যুদ্ধ, প্রকৃতি কী করে কাজ করে তার রহস্য উন্মোচন— বিশ শতক পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় কবিতার উপজীব্য হতে লাগল। বিষয়-বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার প্রকরণেরও ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভাবন হলো। আধুনিকতার প্রথম পর্ব রোমান্টিসিজম। কিন্তু এর মধ্যে প্রকৃতি প্রেম ছিল ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, জন কিটসের কবিতায়, কিছুটা বিজ্ঞান-বিরোধিতা উইলিয়াম ব্লেইকের কবিতায়, এবং আবেগ বিলাস জন কিটসে যেমন তাঁর ‘নাইটিঙ্গেল’ কবিতায় ছিল। এই পর্ব কিছুটা সান্দ্র, পরিশোধিত হয়েই বোদলেয়ার থেকে আধুনিক চিন্তার শুরু। কিন্তু সে পথের পথিক বহু এবং নিজস্ব, নিজস্ব চলনের। ওয়াল্ট হুইটম্যান, ভালেরি, রাইনার মারিয়া রিলকে, ডব্লিউ বি ইয়েটস, ফ্রেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমত, জীবনানন্দ দাশ, মাহমুদ দারবিশ প্রত্যেকের আধুনিকতার চরিত্র আলাদা।
পয়েন্টগুলোর মধ্যে, তৃতীয়টিই প্রধান এবং যেহেতু বোদলেয়ারের নিজস্ব ধারণা বিজ্ঞানের সামাজিক ফলাফলের জন্যই সম্ভব হয়েছিল, তাঁকেও ঐ তৃতীয় তত্ত্বের আওতায় ফেলা যায়। নির্বেদ বা ennui-এর ব্যাপারটি অবশ্য তাঁর নিজস্ব মানসিকতার ভূগোল। দ্বিতীয় পয়েন্ট সুররিয়ালিজম, দাদাইজম, ফভিজম এগুলি মূলত টেকনিকের বিকাশে সাহায্য করেছে, যার শেষ ধাক্কা, ম্যাজিক রিয়ালিজম। যারা কবিতার বিষয়বস্তু (তার প্রণোদনার সারকেন্দ্র) পালটায় না, পালটায় শুধু প্রকাশভঙ্গী। যথার্থ নতুন কবি তার নিজের ভঙ্গীটি আবিষ্কার করেন মাত্র। এই মতে বিশ্বাসী, তারা ইতিহাসের সঙ্গে মানুষ ও সমাজের, গ্লোবাল সমাজের বিবর্তন এবং সাহিত্যে তার বিকীরণের অবহেলা অজান্তেই করেন।
আমি: বাঙলা কবিতার ঐতিহ্য নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ওমর: রবীন্দ্রনাথের পেছনে আর নাই গেলাম, তিনি একাই ব্রিটিশ রোমান্টিক কবিগোত্রের তুল্য। তা ছাড়া পয়ারের পরের বাঙলা ছন্দ পুরোটাই তাঁর তৈরি। মোটাদাগে তাঁর বিশাল রচনায় দুটি প্রক্রিয়া পাই:
- বিষয়ের মধ্যে একটি উপনিষদীয় সুর— বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে পরম পুরুষ মানে ব্রহ্মার বাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার সঙ্গে সুর মেলালে প্রকৃত কবিতা রচিত হয়। ‘জীবনকথা’ ও ‘মানুষের ধর্ম’ নিবন্ধে এই সূত্র তিনি পর্যাপ্ত করে বলেছেন। এই দিয়েই তাঁর রচনামালার মধ্যেকার সুতোটিকে ধরা যায়।
- কবিতার রূপ বা ফর্মকে সব সময় একাদিক্রমে বিকাশ করেছেন পয়ার থেকে গদ্য কবিতা অবধি। বৃষ্টি ঋতুরই কত রূপের কবিতা আছে তাঁর। আমি নিজে রবীন্দ্রনাথের একটি ফর্ম উপভোগ করি এবং ইউনিক ভাবি, তা হচ্ছে গীতাঞ্জলি বা গীতবিতানের প্রেম-প্রকৃতি-পরমপুরুষ সমন্বিত কাব্যগীতি, যেমন ‘আজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে’, ‘আমারে তুমি অশেষ করে’, ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে’। কাব্যগীতির এই ধারা কিন্তু পুরোনো, কবির, তুলসীদাস, মীরা-বাহিত ধারণা। কিন্তু বাঙলায় তাঁর ভাষা, স্তবকায়ন, সুর-প্রয়োগায়ন একটি বিশিষ্ট রূপ করেছে। ঠিক চিত্রকল্প নয় কিন্তু ‘হৃদয় রক্তরাগে’, ‘সন্ধ্যা স্বপনবিহারী’ জাতীয় যৌগিক সমাহারকে ইউনিক ব্যবহার করেছেন, ‘প্রদীপ ভেসে গেল অকারণে’। এই রাবীন্দ্রিক বলয়ের মধ্যে থেকেও নজরুল একটা অন্য সুর গাইতে পেরেছিলেন। তার পরের বড়ো দাগ ৩০-এর কবিরা। বাঙলায় এঁরা আধুনিক কবিতার স্রষ্টা। তারপর ৪০ থিতিয়ে ৫০-৭০-এর কবিরা তার পরের কাল।
আমি: কল্লোল যুগ মানে গত শতাব্দীর তিরিশ দশকের কবিদের সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ওমর: ‘চার রাজা’, নামে আমার একটি রুবাই আছে ‘বাবরের পদ্ম অশোকের চাকা’ বইয়ে তিরিশের চার কবিকে নিয়ে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশের কবিতার চারিত্র উল্লেখ করে। চার লাইন তাই পঞ্চম কবি অমিয় চক্রবর্তীকে টানা যায়নি।
রুবাইয়ের প্রথম লাইন সুধীন্দ্রনাথকে নিয়ে এমন: ‘বাকশিল্পে শব্দই মর্মর ইষ্টক, সুধীন্দ্রনাথ, স্থপতির মতো ব্রত ওঁর ব্যঞ্জনায়’। দ্বিতীয় লাইনে বিষ্ণু দে: ‘চূড়া থেকে খাদের নামায়, লয়তন্ত্রী বিষ্ণু দে- ছন্দ, বাণী, সুর গেঁথে প্রজ্ঞায় মেলায়’। বুদ্ধদেবকে নিয়ে তৃতীয় লাইন: ‘পরম নিভৃতি আর চরম পরিশ্রমে নিজস্ব নির্বাণ পান বুদ্ধদেব’। চতুর্থ লাইনে শেষ: ‘জীবনানন্দে শুনি শিশিরের পা’র ধ্বনি, প্রেম তবু অপ্রেম, দ্বিধাপন্ন ইতিহাস, চিত্ররূপময়তায়, কল্পপ্রতিভায়’।
এদের সঙ্গে সমর সেন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়কেও সমগ্র করা দরকার। আমাদের তিরিশের কবিরা প্রায় একই কালের ১৯২৯-এর স্প্যানিশ কবিগোত্রের আলবের্তি, লোরকা, আলেইহান্দ্রে, দামাসো আলন্সো, সালিনাস, গিয়েন প্রমুখের মতো রচনা, উদ্ভাবন ও শক্তির প্রাবল্যে। এঁরা আধুনিক, আধুনিকতার যে-সংজ্ঞা ওপরে দিয়েছি সেই পরিচয়ে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে ফর্মের কবি। এ-দুজনের ছন্দ রবীন্দ্রনাথ যা করেছেন তার থেকেই উদ্ভূত। তার ওপরে যা বাড়ানো যায়, দক্ষতা দেখানো যায় তা তাঁরা করেছেন। কাব্যের বিষয় ও বোধ রবীন্দ্রোত্তীর্ণ। বুদ্ধদেব বসু তাঁর শেষপর্বে বোদলেয়ার, রিলকে দিয়ে আক্রান্ত, সঙ্গে-সঙ্গে দক্ষ গদ্য কবিতা লিখেছেন। বোধ, বিষয় এবং শৈলীর ক্ষেত্রে জীবনানন্দ দাশ অবশ্যই সবচেয়ে গভীর। তাঁর ভাষা, সুর-লয়, ইতিহাসবোধ, বিচিত্র বিষয়, ব্যক্তিগত এবং সমাজগত এমনকি গ্লোবাল দৃষ্টি তাঁকে মহত্তর মাত্রা দিয়েছে। আমি রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দকে মহৎ কবি বলতে রাজি। আমার ‘কেন শুদ্ধতম’ গ্রন্থে আমি বলেছি, ‘জীবনানন্দ’র বোধ ও কবিতা-বিকাশের বিস্তৃতি আমি তাঁর কালের ইউরোপীয় কোনো কবির কাছে পাই না’।
একটা কথা মনে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথের কবিতা রচনা উপনিষদীয় পরমপুরুষের ধারণা দিয়ে একইসূত্রে সংগ্রথিত। জীবনানন্দ ১৮-২০ শতকের বিজ্ঞানবোধ বাহিত হয়ে এসে কোনো একাত্মবোধের নয়, পাহাড়ের ওপারের আলোক তিনি দেখেননি। যা দেখেছেন তা স্বচক্ষে বরিশালে, কলকাতায় এবং অধীত জ্ঞানের মাধ্যমে।
আমি: তিরিশের কবিদের পরের কবিরা মানে বিংশ শতাব্দীর শেষপর্যন্ত কবিদের সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ওমর: সুভাষ মুখোপাধ্যায় মার্ক্সবাদী কবিতার উদ্যোগী ছিলেন, যদিও তিনি ৩০ গোত্রেরই। তবে তাঁর প্রেমের কবিতা, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’-ই আমার প্রিয়। এ বাদে কথ্য ভাষায় তাঁর কিছু অ্যান্টি পোয়েট্রি আছে। সমর সেন, ৩০ গোত্রেরই, এলিয়টীয় ধাঁচের গদ্য কবিতা শুরু করেছিলেন। বেশিদিন লেখেননি।
পঞ্চাশের শেষ থেকে বাঙলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, পরে সমাজ-রাজনীতি এদেশের কবিতাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। পুরোধা শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। প্রেম নিয়ে সবাই লিখেছেন। শামসুর রাহমানের স্মরণীয়তা মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা সংক্রান্ত কবিতায়, আল মাহমুদের ‘ফসলের সুষম বণ্টনের’ এবং ‘সোনালি কাবিন’-এর কবিতায়। পরিবার-আত্মীয় স্বজন-গ্রাম নিয়ে মাহমুদের কবিতার স্বাদ স্বতন্ত্র ও সফল। শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান ও হুমায়ুন আজাদ নিজের নিজের স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। তবে প্রত্যেকেরই স্মরণীয় কবিতার সংখ্যা সীমিত। রফিক আজাদ এবং নির্মলেন্দু গুণ, আমার বিচারে, কালের তাড়নায় স্লোগান-উচ্চকিত ‘marvellous minor poets’.
উত্তরাধুনিকতা কী জিনিস আমি বুঝি না। তবে এই থিওরি আমি পড়েছি। তাতে বিশ শতকীয় সব সাহিত্যিককে ঢোকানো যায়। কিছু তরুণ এপার-ওপারের নিরর্থ বাক্যের কোলাজকে উত্তরাধুনিকতা বলে চালিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছেন, ঠিক কোট দিতে পারছি না, তবে মর্ম এই, যা কিছু বোঝা যায় না, তাই দিয়ে কবিতার কোনো মানে নেই
কলকাতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু এবং অন্যান্যরা ৫০ থেকে কয়েক দশকের প্রতিভূ। শক্তি, আমার মনে হয়, র্যাঁবোর নজির ধরে তাৎক্ষণিক অবচেতনের প্রকাশের চেষ্টা করেছেন, সুনীল লিরিক, ফর্ম ছেড়ে কথ্য ভঙ্গিতে নাটকীয়তা আনার পক্ষপাতী ছিলেন।
আমি: আপনি বহুকাল বিদেশে। উত্তর ৩০ বাঙলা কবিতার প্রেক্ষিতে অন্য ভাষার কবিতা নিয়ে কিছু বলেন।
ওমর: আমি ১৯৭২ সালে আমেরিকায় আসি। কিছু ইংরেজ কবি-সহ ফ্রেদেরিক গার্সিয়া লোরকা, রাইনার মারিয়া রিলকে, শার্ল বোদলেয়ার প্রমুখের সঙ্গে পরিচয় দেশে থাকতেই ছিল। ১৯৭৩-৭৪-এ আমি পাবলো নেরুদা ও সেসার ভায়্যেহর কবিতা পড়া শুরু করি এবং মুগ্ধ হয়ে যাই। টিএস এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, ডব্লিউবি ইয়েটসের কবিতা-ধারাটার পরিচয় বেশি ছিল বাঙালি কবিদের মধ্যে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সভ্যতার নেতি ও স্খলন ঘটছে, এই বোধ আর ‘Tradition and Individual Talent’ প্রবন্ধের কাব্যতত্ত্ব শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমানের ওপর ছায়া দিয়েছিল। তিরিশের কালে সমর সেন, বিষ্ণু দে তাড়িত ছিলেন। বিষ্ণু দে কবিতার শৈলী নিয়েছিলেন এলিয়টীয়, বোধ নয়। ফরাসি কবিতার বোদলেয়ার, র্যাঁবো, স্টিফেন মালার্মে, ভালেরির ঐতিহ্য। এলিয়ট, ইয়েটস উভয়েই ফরাসিদের কাছ থেকে ধার করেছিলেন। বিশ শতকী জার্মান কবিতার পুরোধা রিলকে। ইতালিয়ান, গ্রিক, পোলিশ, রাশান, জাপানি সব ভাষারই আধুনিক কবি ও কাব্য ছিল। এঁদের বিস্তৃত বিবরণ বাদ রাখলাম। তুর্কি কবি নাজিম হিকমত, পর্তুগিজ কবি পেসোয়া, ১৯২৭ সালে স্প্যানিশ কবিগোত্রের লোরকা, আলেইহান্দ্রে, সালিনাস, দামাসো আলনসো, গিয়েন, থেরনুদার বড়ো রচনা এবং অবদান ঘটে। এবং প্রায় সঙ্গেই লাতিন আমেরিকায় উইদোব্র, পাবলো নেরুদা, সেসার ভায়্যেহ, হোর্হে লুইস বোরহেস-সহ নব্য কবিদের নতুন চেতনা ও শৈলীর কবিতা আসে। পাবলো নেরুদা, ওয়াল্ট হুইটম্যান, শার্ল বোদলেয়ার, র্যাঁবোর ডিকশন মিশিয়ে এক নতুন কণ্ঠস্বর তৈরি করেন যা এলিয়টীয় সংশয়, বিষাদ, আয়রনির থেকে আলাদা। ভঙ্গীতেও, বিষয়েও। তারুণ্যের প্রেম, বিদেশে নিঃসঙ্গতা, স্পেনের গণযুদ্ধে মুক্তিকামিতা, লাতিন আমেরিকার জাতিসত্তা, ক্যাপিটালিজমের বাণিজ্য ও অমানবিকতার বিরুদ্ধতা, জীবনযাপনের তুচ্ছ জিনিস ইত্যাদি তাঁর কাব্যবিষয়। এবং তিনি বিচিত্র ক্রাফটম্যানশিপে এসব লিখেছেন। তিনি বলেছেন, কবিরা দুই জাতের— এক দল দরজা-জানালা বন্ধ করে লেখেন, অন্যরা খুলে লেখেন। তিনি দ্বিতীয় দলের, আর রিলকে প্রথম গোত্রের।
আমি: আপনার কখন থেকে মনে হলো যে আপনি আপনার সমসাময়িকদের থেকে আলাদা কাব্যভাষা তৈরি করবেন?
ওমর: পরিকল্পিতভাবে ভাষা আলাদা করবার কথা ভাবিনি। আগে দেখা, দেখা মানে শুধু চাক্ষুষ ইন্দ্রিয়জ দেখা না— ব্যক্তি, সমাজ, ইতিহাস, অতীত, স্মৃতি, জ্ঞান— সব দেখার থেকে যদি কোনো বোধ আসে, যদি জীবনের অনাবিষ্কৃত কোনো সংবিৎকে মনে নাড়াচাড়া করা যায় তা থেকে কবিতার মোমবাতি জ্বলে ওঠে। সেই মুহূর্তেই কবিতাটির ধ্বনি এবং ভাষা জেগে ওঠে। কবিতা কী, এই চিন্তাটি অন্য সমসাময়িকদের থেকে আমার পৃথক, তাই ভাষাও আলাদা।

আমি: দেশের কথা বাদ দিলাম, পৃথিবীর অনেক বড়ো বড়ো কবির কবিতাও অনেক সময় দেখা গেছে স্লোগানধর্মী আর স্পষ্টভাবে প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠেছে। তো সেইসব রাজনৈতিক কবিতাকে আপনি কী চোখে দেখেন?
ওমর: অনেক সময় সামাজিক, রাজনৈতিক কারণে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়ার কবিতার দরকার হয়। কিন্তু সময় সুস্থির হলে, কবিতার শিল্পগত দিকও দেখতে হয়। এটা আর্টস ফর আর্টস সেইক দৃষ্টি নয়। প্রতিবাদী কবিতায়, তদুপরি বাম-রাজনৈতিক অভিলাষের কারণে এই উচ্চাবচতা হয়।
নেরুদারও স্টালিন প্রশস্তির কবিতা আছে। কিন্তু নাজিম হিকমত, সেসার ভায়্যেহ, পাবলো নেরুদার ভালো কবিতা আছে যেখানে প্রতিবাদ শিল্পিত। এমন কি ম্যাজিক রিয়ালিজম বলা যায়। প্রত্যক্ষ ট্যাঙ্ক-বিমানের চেয়ে গভীর ও শক্তিশালী। একটা ছবি দিয়ে বোঝানো যায় ব্যাপারটা, যেমন দাভিদ সেকুইরিয়স-এর আঁকা যুদ্ধবিবাদী ছবি। জিনিসটা মনে ঘুরপাক খায়। জলের মতো না হয়ে ঝড়ের মতো হলেও, সে যদি ঘুরে ঘুরে কথা বলে তাহলে তার সার্থকতা বেশি।
আমি: বাঙলাভাষার বাইরের কারও কবিতা থেকে মানে যাদের নাম বললেন হিকমত, ভায়্যেহ, নেরুদার কোনো কবিতার একটা উদাহরণ যদি আনেন তবে কবিতার পাঠকদের ব্যাপারটা বুঝতে সহজ হয়।
ওমর: এই উদাহরণে বোঝা যাবে যে আমাদের কবিতা কোথায় যেতে হবে। এর আগে আমি প্রতিবাদী কবিতায় স্লোগানটাইপ না বলে বিমূর্তভাবে বলা নিয়ে বলেছি, আমার নিজের কবিতায় চিত্র-শ্রুতিকল্পের মিশ্র রূপ নিয়ে বলেছি, পুরো কবিতাটিকেই কল্পচিত্রে প্রকাশের কথা বলেছি, এই সূত্রকে স্পষ্ট করার জন্য আমি সেসার ভায়্যেহর একটি কবিতার উদাহরণ টানতে চাই। কবিতাটির নাম, ‘জনতা’, যা স্পেনের ডিক্টেটরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কালে ১৯৩৭-এ লেখা হয়েছিল। কবিতাটি সংকট, আশার থেকে লেখা, মৃতের জেগে ওঠা, অনেকটা কাফকার মেটামরফোসিস-এর মতো কল্পনায়। এই কবিতাকে আমি বলি জাদু-বাস্তবতার কবিতা এবং যা টেকনিকালি বোদলেয়ারের চিত্রকল্পস্তনিত কবিতার ধারণা থেকে আরেক ধাপ উপরে উত্তীর্ণ হয়েছে। Paul O’Prey-এর ইংরিজি অনুবাদ ‘Mass’ থেকে কবিতাটি ‘জনতা’ নামে বাঙলায় ভাষান্তর করে দিলাম:
যখন যুদ্ধ হলো শেষ এবং সৈনিক হলো মৃত,
একজন মানুষ তার কাছে এলো, আর বলল:
মরো না, তোমাকে এত ভালোবাসি।
কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, মরেই চলল।
দুজন তার কাছে এলা, আবার বলল:
আমাদের ছেড়ে যেও না! সাহস! ফিরে এসো জীবনে!
কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, মরেই চলল।
কুড়িজন কাছে এলো, একশো, এক হাজার, সহস্র,
চিৎকার করে: এত ভালোবাসা মৃত্যুর মুখে এত অসহায়!
কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, মরেই চলল।
কোটি কোটি লোক তাকে ঘিরে ধরল
একই অনুরোধ: থাকো, ভাই।
কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, মরেই চলল।
তারপর সারা পৃথিবীর লোক তাকে ঘিরে ধরল,
মৃতদেহ তাদের দিকে তাকাল— আর্ত, করুণ,
ধীরে ধীরে উঠে বসল, প্রথম মানুষটিকে
জড়িয়ে হাঁটা শুরু করল।
আমি: এবার ব্যাপারটা আরও সহজ হলো। কবিতার চিরন্তনতা বিষয়ে আপনার ধারণা কী? জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার কথায় যে-চিরন্তনতার বিপক্ষে কথা বলেছেন তা কথা বলছি না। বলছি যেইসব উপকরণের ব্যবহার একটা কবিতাকে চিরন্তন করে, যেমন জীবনানন্দ দাশ বা এলিয়টের কবিতা বা বিনয় মজুমদার বা ভাস্কর চক্রবর্তী বা আবুল হাসানের কবিতা বা অন্য অনেকের কবিতা আমরা নিয়মিতই পড়ি। কিংবা আপনি যে স্মরণীয় কবিতার কথা বললেন। আবার অনেকের কবিতা দরকারে মানে কোনো লেখার কাজে, রেফারেন্সের প্রয়োজনে পড়ি। এইসব ব্যাপার কেমন করে হয় বলে আপনার ধারণা?
ওমর: রবীন্দ্রনাথের চিরন্তনতার চিন্তা উপনিষদ থেকে। আধুনিক কবিতায় তা নেই। চিরন্তনতার জন্য কবিতার কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং নেই। টাইমের সঙ্গে জীবন পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনের মধ্যেও যা সারবত্তা হয়ে টিকে থাকে এবং জীবনের অনাবিষ্কৃত দিকের উদ্ঘাটনের মধ্যেই কবিতার টেকসইয়ের সত্য বা তথ্য।
আমি: কবিতার শুরু নাই, কবিতার শেষ নাই। কবিতা মানুষের অন্তর্বর্তীকালীন যাপনের একটা মন্ময় অবস্থানকে প্রকাশ করবে, তার সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আড়াল, যন্ত্রানুষঙ্গ, আভরণ হিসেবে সময়চেতনা প্রচ্ছন্নভাবে আসবে।
ওমর: অভিজ্ঞতা ছাড়া তো কোনো শিল্প বা সাহিত্য নেই পৃথিবীতে।
আমি: কনটেম্পরারি কবিতায় উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ওমর: উত্তরাধুনিকতা কী জিনিস আমি বুঝি না। তবে এই থিওরি আমি পড়েছি। তাতে বিশ শতকীয় সব সাহিত্যিককে ঢোকানো যায়। কিছু তরুণ এপার-ওপারের নিরর্থ বাক্যের কোলাজকে উত্তরাধুনিকতা বলে চালিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছেন, ঠিক কোট দিতে পারছি না, তবে মর্ম এই, যা কিছু বোঝা যায় না, তাই দিয়ে কবিতার কোনো মানে নেই।
আমি: সব কিছুকে যদি টেক্সট হিসেবে ধরি, তাহলে বোঝা যায় না এমনকিছু জগতে নেই। বুঝতে পারবার যে ক্ষমতা সেটা পাঠকের মধ্যে থাকতে হয়। আর সেই ক্ষমতা অর্জনের ব্যাপার। ফলে সবার মধ্যে থাকে না। আর সবার মধ্যে থাকতেই হবে, সকলকে কবিতার নির্যাস গ্রহণ করতে হবে এমন কোনো ব্যাপার নেই। যাইহোক, অন্য প্রসঙ্গে যাই, কবিতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আপনি ইন্টারনেটকে কীভাবে দেখেন?
ওমর: অসুবিধা নেই। যার যা পারার করুক। টাইম হচ্ছে আদি ঝাড়ুদার। ইংরেজি বা অন্যভাষায় অনেক শেখার জিনিস আছে ইন্টারনেটে, যেমন পোয়েট্রি সাইটগুলি।
আমি: আধুনিক গদ্যে বা ফিকশনে কাব্যিকতাকে অনেকেই নঞর্থক দৃষ্টিতে দেখেন। আপনি কীভাবে দেখেন?
ওমর: নেতির কিছু নেই। কী হয়েছে সেটাই বিচার্য। ইলিয়াসের উপন্যাসে কাব্যিক গঠন আছে, ভাষার বিভিন্ন স্তর আছে, সেগুলোকে বিভিন্ন অবস্থান, চরিত্র, প্রেক্ষিতে তিনি বৈচিত্র্য ও বিস্তারে ব্যবহার করেছেন। সহজ একমুখী কাজ নয়।
আমি: জালাল উদ্দিন রুমি কিংবা ফরিদ উদ্দিন আত্তার বা হাফিজ বা এ জাতীয় সুফি কবিদের কবিতার মূল্যায়ন আপনি কীভাবে করবেন?
ওমর: রুমি, আত্তার, হাফিজের কবিতা পড়েছি। মূল ভাষা না জানার কারণে যা লাভ করেছি তা আবছা। এরা সবাই ছন্দে লিখেছেন, কিন্তু পড়ছি গদ্য অনুবাদে। তবে এরা, বিশেষ করে রুমি কবিতার মধ্যে জন্তু-জানোয়ার, রূপকথা সব কিছুই ব্যবহার করেছেন, যা আমার কাছে শক্তিশালী মনে হয়েছে, অনেকটা যাদু বাস্তবতার মতো। এদের তো একটা সুফি দর্শন আছে, ইশক। তা ছাড়া মানবতাবাদী এবং কোনো বিশ্বাসের বিরোধী নন। আত্তারের ‘মানতিকুত তোয়ায়ের’ একটা মারভেলাস রূপক-প্রতীক, রচনা।
টেকনিকালি, ফারসি, আরবি কবিরা চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবিতা প্রকাশের আইডিয়া জানতেন, যা ২০ শতকে এসে আমরা ফরাসি কবিদের থেকে আবার করে জেনেছি।
কবিতায় অপ্রভাবিত বলে কিছু নেই, বলেছেন পাবলো নেরুদা। অতএব প্রভাবকে কে কেমনভাবে হজম করে সেইটেই সূক্ষ্মতা। আমি যখন কবিতার দালান তৈরি করি, তখন জমি, ইট, পিলার, রুয়া, বাটাম, লোহা, দরজা, জানালা সব আমার। প্রভাব শুধু সিমেন্টের মধ্যে। তার মশলা আর বিভাগের মধ্যে প্রভাব গোলানো
আমি: নিবেদিত কবিতার ব্যাপারটা কী যেমন আপনি কাউকে কোনো কবিতা উৎসর্গ করলেন এটা মানুষ কেন করে বা আপনি কেন করেন, আর কবিতার বাণীর সঙ্গে সেই ব্যক্তির সম্পর্ক-এর জায়গা কতটুকু? আর এই জাতীয় কবিতাকে আমার মনে হয় কবিতার শুদ্ধতার বিরোধী।
ওমর: যদি কারও লেখা থেকে, সেটা প্রকাশিত বইয়েই হোক বা ফেইসবুকেই হোক, আমার মাথায় কবিতার আইডিয়া আসে তাহলে আমি সেই কবিতাটি তাকে উৎসর্গ করি। এটি কৃতজ্ঞতা জানানোর প্রক্রিয়া।
আমি: কাউকে নিয়ে কবিতা লেখার বিষয়টা বলেন। আপনার একটা কাব্যগ্রন্থই আছে আপনার বন্ধুবান্ধব আর কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের নিয়ে কবিতা লিখেছেন এই স্মরণ বা বর্ণন কবিতা দিয়ে কেন করা লাগবে? তার সম্পর্কে তো গদ্য লিখলেই হয়। নাকি আপনার পূর্ববর্তীরা করেছেন বলেই আপনি করেছেন। যেমন বিনয় মজুমদার প্রমুখ। এক জীবনানন্দ দাশ নিয়েই আপনার তিন-চারটা কবিতা দেখলাম।
ওমর: ব্যক্তি বিশেষ কবিতার বিষয়। রবীন্দ্রনাথের কালে এভাবে লেখা হতো, ‘হে জগদীশ চন্দ্র, উদিলে পুবাকাশে সূর্যসম’। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অনেক চরিত্রের নাম আছে। তবে পরিচিত সুবিনয় মুস্তফিকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন। বোদলেয়ার কবিতা আছে ‘লে ফারেস’ যাতে রুবেন্স, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, রেমব্রান্ট ইত্যাদি চিত্রকরদের সারার্থ নিয়ে লিখেছেন। মালার্মের প্রণতি, অ্যালান পো, বোদলেয়ার, ভেরলেন, ভাগনার, শাভানেজের প্রতি একটি করে সনেট আছে। অতএব, এই বিষয় পুরোনো। কাজ সহজ নয়, চরিত্রের নির্যাস, কোনো বিশিষ্টতা বার করতে হবে। ব্যাপারটা কমলালেবুর মতো না, যে ছাল তুললেই মাংস। ব্যাপারটা কাঠবাদামের মধ্যে থেকে শাঁস বার করা। আবুল হাসান কবিতায় কবির চারিত্র, হুমায়ুন কবির কবিতায় কবির বাসনা ও মৃত্যু— অনেক আছে, একেকভাবে। দুটো বড়ো কবিতায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফেদেরিকো ফেলিনিতে তাদের আত্মজীবনীকে কবিতার ফরম্যাটে আটকাবার সংকল্প আছে। এই টপিকটাই একটা বিশদ ব্যাপার।
আমি: কবিতা শুরুর আগে অন্যের কোটেশন কেন থাকতে হবে? এইসব ছাড়া কবিতা লিখলে আমার মনে হয় কবিতার একটা স্বতন্ত্র জায়গা দাঁড়ায়। নাকি আপনার পূর্ববর্তীরা করেছেন বলেই আপনি করেছেন? যেমন টিএস এলিয়ট, হোর্হে লুইস বোর্হেস প্রমুখ।
ওমর: আমার অনেক কবিতার বিষয়ই যেমন অনেক রুবাই কবিতার বিষয় কারও বক্তব্য দিয়ে উদ্দীপ্ত। সে-ক্ষেত্রে কোটেশন না থাকলে পাঠক ধরতে পারবে না।
আমি: আমি নিজে যেহেতু খানিকটা লিখি। আমি কখনওই কবিতায় এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করি না, যেটা ফুটনোট দাবি করে। আপনার কবিতায় ফুটনোট দেখা যায়। এটা কেন? এটা না করলেই কি নয়। এইটা পাঠককে ডিসঅ্যাপয়েন্টটেড করে বলে আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক হিসেবে।
ওমর: বিষয়ের জটিলতায়, পাঠককে ধরিয়ে দেবার জন্য।
আমি: অন্যদের উপমা বা শব্দবন্ধ বা কোনো পঙ্ক্তি বা বাক্যাংশ নিজের কবিতায় ব্যবহার না করলেই কি নয়? যেখানে আপনি নিজেই তা আরও ভালোভাবে বানাতে পারছেন। অন্যদের কিছু দেখলে প্রথমেই তাদের কথা মনে পড়ে। যেমন আপনার কবিতায় ‘খড়ের গম্বুজ’ এই শব্দবন্ধ দেখে আমার আল মাহমুদের কথা মনে পড়েছে। হুমায়ুন আজাদের কবিতায় ‘খড়ের গম্বুজ’ পড়েও আমার মাহমুদের কথাই মনে পড়েছিল প্রথমে। কারণ এটা আমি প্রথম পড়ি তাঁর কবিতায়। এটা আপনি কেন করেন? আপনার পূর্ববর্তীরা করেছেন বলেই আপনি করেছেন। যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ।
ওমর: শব্দ কারও সম্পত্তি নয়। জীবনানন্দ দাশ অনেক শব্দ ব্যবহার করেছেন কথ্য ভাষার থেকে, অনেক শব্দবন্ধ যা তাঁর আগে ব্যবহৃত হতো না। লোকে বলে জীবনানন্দের শব্দ। সুধীন দত্ত অনেক তৎসম শব্দ তৈরি করেছেন। এগুলো ব্যবহার মানেই অনুকরণ নয়। কথা হচ্ছে, কন্টেক্সট কী, কী অন্যান্য শব্দের সমাবেশে সেটা লাগানো হয়েছে। ‘খড়ের গম্বুজ’, একটা কবিতার নাম দিয়েছি। এর সঙ্গে মাহমুদ-এর কবিতার কিছুই নেই। আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক ঘটনাকে সাততলা এক মিনারের বিভিন্ন থাকে ক্রমিক সাজানো হয়েছে। আসলে এটা ইয়েটস-এর টাওয়ার কবিতার প্যাটার্নে। বুদ্ধদেব বসু ‘আমার মিনার’ লিখেছেন একই স্ফুলিঙ্গ ধরে। ঘটনা বলি। আমার ‘খোয়াবনামা’ কবিতার শুরু:
নক্ষত্রর তলে কেউ জেগে নেই
জেগে নেই কেউ আজ রাতে।
সবাই ঘুমোয় ঢের
স্বনিদ্রায় সব্বাই স্বপ্নে বিভোর।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস শুনে বলল, ‘ঢের’ জীবনানন্দ’। সবাই অচেতন ঘুমোচ্ছে, এই ফ্যাক্টের ৮ মাত্রা দরকার আমার। অচেতন সব্বাই ঘুমে, আরও কিছু করা যায়, কিন্তু লয় শ্রুতিতে ফিট করে না। বললাম, ‘অসুবিধা নাই, ‘অঢেল সবাই ঘুমে’। বলেছিলাম ১৯৮৬ সালে। কিন্তু এখনও ছাপায় পালটানো হয়নি।
আমি: শব্দ অবশ্যই কারও সম্পত্তি নয়। আমি ওই অর্থে শব্দের কথা বলিনি। আমি মূলতই বলতে চেয়েছি অন্যের ব্যবহৃত বা বানানো শব্দের কথা নয়, বলতে চেয়েছি অন্যের বানানো শব্দবন্ধ, ফ্রেইজ, মেটাফোর ইত্যাকার বিষয়ের কথা। যাইহোক, কবিতার ক্ষেত্রে কোন কোন কবি আপনাকে বেশি প্রভাবিত করেছে বলে আপনার মনে হয়?
ওমর: কবিতায় অপ্রভাবিত বলে কিছু নেই, বলেছেন পাবলো নেরুদা। অতএব প্রভাবকে কে কেমনভাবে হজম করে সেইটেই সূক্ষ্মতা। আমি যখন কবিতার দালান তৈরি করি, তখন জমি, ইট, পিলার, রুয়া, বাটাম, লোহা, দরজা, জানালা সব আমার। প্রভাব শুধু সিমেন্টের মধ্যে। তার মশলা আর বিভাগের মধ্যে প্রভাব গোলানো।
আমি যেসব দেশি, বিদেশি কবিদের উল্লেখ করেছি তাদের প্রভাব আছে আমার চিন্তায়, কিন্তু কীভাবে কোন ডিটেইলে তা বলা মুশকিল। আবার অনেক কবিতা আছে যেখানে কোনো হাওয়াই লাগেনি, পুরোটাই স্বয়ম্ভূত, যেমন ‘সংগীত’, ‘স্তন্যপান’।
আমি: কল্লোল যুগের পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ কেমন করে অর্জুন হয়ে উঠলেন বলে আপনার মনে হয়? অন্য চারজনকে তো আমরা তাঁর মতো চর্চা করি না। কালে ভদ্রে, গবেষণা বা রেফারেন্স হিসেবে পড়ি বা উল্লেখ করি। কী প্রক্রিয়ায় জীবনানন্দ দাশ এমন চিরকালীন হয়ে গেলেন? অথচ তাঁর জীবদ্দশায় বুদ্ধদেব বসু ছাড়া অন্যকেউ তাকে ওই অর্থে স্বীকারই করত না। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তো তাকে কবিই মনে করতেন না, আপনার কী মনে হয় এটা ঈর্ষাপ্রসূত আচরণ নাকি, অজ্ঞতাবশত। অজ্ঞতা তো হতেই পারে না, কারণ সুধীনদত্ত বেশ শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। আপনি তো জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে একটা বইই লিখেছেন, ‘কেন শুদ্ধতম’। সেই বইয়ের আলোকে বা আরও নির্দিষ্ট করে যদি আপনি এই বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করতেন তাহলে ব্যাপাটার একটা সমাধান আসত।
ওমর: সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ফর্মের কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্টাইলকে আরও ফাইন করেছেন, কিন্তু তাঁর বিষয়বস্তু আলাদা। জীবনানন্দ দাশের বিলম্বিত লয়ের কবিতা তাঁর ভালো লাগেনি। রবীন্দ্রনাথেরও না। জীবনানন্দ তাঁর লয় বা সুর (বিলম্বিত) + বিষয়ের বিচিত্রতা + টাইম বা ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস বাঙালি রূপসী বাঙলায় মাতাল।
আমি: আপনার সমসাময়িক বাঙলাদেশি কবিদের যদি মূল্যায়ন করতে বলা হয় কেমন করে করবেন?
ওমর: আমার সমসাময়িক, কাল ধরে ধরে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান, হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে একালের মাসুদ খান প্রমুখ। আমি এখনও লিখি। ৮ জন কবি, ৬০-৭০-এর, নিয়ে বিশদ লিখেছি ‘পঞ্চাশের পরে’ বইতে। যেহেতু নিজের কথা বলেছি এখানে, জীবিত সমসাময়িকদের নিয়ে এখানে আর বলব না।
আমি: অনেক কথা বলে ফেললাম। এইবার শেষ পর্যায়ে এসে আপনার কবি হয়ে উঠবার কাহিনি জানতে মন করছে।
ওমর: স্কুলের খাতায় লেখা শুরু, কিন্তু প্রকাশ করিনি। ৬০-এর দশকের শেষের দিকে প্রকাশ শুরু হয়। কবি আহসান হাবীব আমার শিল্প সমালোচনা টাইপ প্রবন্ধ ছেপেছিলেন, কবিতা ছাপেননি। ১৯৭২ সালে পড়াশোনার জন্যে আমেরিকা চলে যাই। কিন্তু পাশাপাশি কবিতা লিখেছি। দেখেছি, শুনেছি, পড়েছি, ভেবেছি, লিখেছি, কেটেছি, লিখেছি। কীভাবে? সদুত্তর মুশকিল।
প্রথম বই ‘বোধিবৃক্ষতলে’ প্রেসে থাকতেই পাণ্ডুলিপি পড়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রিভিউ করেছিলেন। কবি আহসান হাবীব বই দেখে, পড়ে খুব খুশি হয়েছিলেন।
সব শেষে একটি ছবি দিয়ে আমার অপারগতার কথা বলতে চাই। ছবিটি দেখো:

আমাদের ৭০ শতাংশ মানুষের জীবন, অস্তিত্ব, হতাশা, সংকট, যন্ত্রণা, আশা, উদ্দীপনা, সংগ্রাম, আর আঘাতে জর্জরিত, এটাই রিয়ালিটি। এই রিয়ালিটি নিয়ে যে-অনুভূতি তাই নিয়ে কবিতা লিখতে চাই। কিন্তু হয় না, প্রত্যক্ষ বললে কবিতা হয় না। কবিতা রিয়ালিটির আরেক রূপ। এটাই আমাদের রূপ, অথচ কবিতায় তাকে ধরতে পারি না। এই অস্তিত্ব ধরবার জন্য যে-জাদু, তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি।
আমি: আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ সময় দেবার জন্যে। কবিতার সঙ্গে থাকুন। এই শুভ কামনা।
ওমর: তোমাকেও ধন্যবাদ।
৭.
কবি ওমর শামসের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষ হলো। তিনি ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমির প্রবাসী কবি ও লেখকদের জন্য প্রণীত ‘সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি মিডিয়াকে বলেছিলেন, ‘বাঙলাদেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবার জন্য কোনো কবি বা লেখক যদি কোনো ভূমিকা রাখেন, তবে ওই ব্যক্তির অবদানকে সেভাবেই মূল্যায়ন করতে হবে। প্রবাসে বসবাস করে বলে কাউকে যদি প্রবাসসূত্রে পুরস্কার দেয়া হয় তবে সেটা অসম্মানজনক’।

শেষে এই কবির ‘তদন্ত’ শিরোনামের কবিতা পড়ে আমার লেখাও শেষ করব। কবিতাটির কথা শুরুর দিকে বলেছি এই রচনার:
যখন জ্যোৎস্নার ভিতরে তাকে খুন করা হলো,
সেই হত্যাকাণ্ড তারা দেখেছিল।
এখন সবাই চুপ।
সবাই, মানে গুলির শব্দ শুনে
যারা মুখ বাড়িয়েছিল জানালায়,
শিশুদের টেনে যারা খিড়কি এঁটেছিল,
যারা দরোজা ধ’রে দাঁড়িয়েছিল,
বসেছিল উঠোনে—
যারা দেখেছিল
এবং যারা দ্যাখেনি অথচ জানত,
তারা সবাই চুপ।
বড়ো বেশি চুপ।
তদন্তের দায়িত্ব আমার:
সংবাদদাতাকে জিজ্ঞেস করলাম, ষড়যন্ত্রের কথা—
কোনো সংবাদই তিনি পাননি পথ ঘোরে।
পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা-বিবৃতির কথা—
কোনো ফাইলই তারা খুঁজে পান না এখন।
ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম পোস্টমর্টমের কথা—
তথ্যের বদলে তিনি দিলেন সংশয়।
অথচ সেই মধ্যরাত্রির সপ্তর্ষি সাতটি শপথ-সহ
সাক্ষী দিয়েছে পাশবিক হত্যার:
আমাকে জ্যোৎস্না জানিয়েছে আততায়ীর আনন,
শিশির জানিয়েছে তার পায়ের দাগ,
ঘাস দেখিয়েছে জমাট রক্ত।
গুলির শব্দ শুনে সচকিত হয়েছিল যে সারস,
সে আমাকে শুনিয়েছে হত্যার বিবরণী।
অথচ মানুষের চোখে কাচ
কানে শিশে
জিভে পাথর;
মাথায় মরুভূমির বিভ্রান্ত বালি।
যাকেই জিজ্ঞেস করি,
সে কিছুই জানে না
সে কিছুই জানে না।












