:
Days
:
Hours
:
Minutes
Seconds
Author Picture
সেলিম মোরশেদ

কথাসাহিত্যিক

বাঘের ঘরে ঘোগ
শিল্পকর্ম: ঢালী আল মামুন

বাঘের ঘরে ঘোগ

মৃত্যু অথবা মৃত্তিকার এক অপূর্ণতা বা অবধারিত এরকম ধূসর বা হরিদ্রাভ সবকিছুই যেন আকস্মিক ছিটকে পড়েছে দূর আকাশ থেকে বিস্তৃত দিগন্তে; বিরাট অরণ্য আর ধু-ধু ভূখণ্ড। অনুপম এই প্রান্তরে কোনো কুমারীর জাল থেকে ছিঁড়ে পড়া আহত দৈত্যের পায়ে কৃষ্ণতায় মৃত্যু আসে সোনালি শীতে, আর তাড়িত হাওয়ায় ধু-ধু মেঘের উজ্জ্বল রোদে, গভীর অরণ্যে বা পাতার আন্তসবুজে। রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ দক্ষিণের ঢালে—নদীর শীর্ণতায় বেড় স্রোতের ঊনতায় শুকিয়ে যাওয়া সত্তার জাল ফেলে, ঋতুমতি পুঁটি আর ডানকানা মুঠোভরা শক্ত হাতে-হাতে বিনিময়ে এবেলা-সেবেলা; পরে সামান্যই মনে হয়—অচিরেই বৈশ্যিকতা যূথবদ্ধতায় উষ্ণতা হারিয়ে দিলে কোন্ সেই রোদ—যে আলোয় উদ্ভাসিত হবার মতো তখন কেউ-বা বিহ্বল! প্রশমিত হয় প্রবলতায়—জলের কুণ্ডলি বধ করে ছুটে আসে আতীব্র ঢেউয়ে; আশ্লেষে!

নিষ্প্রাণ মাটির তালের সাথে মানুষের হাতগুলো লড়াই করে যে অনিবার্য সৃজনে—তো তারই ছায়া—মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্যে সমুদয় শাসনমুক্ত; অসাধারণ সবলতা আর তীক্ষ্ণবুদ্ধিতে এই লড়াই নিয়তি—বেঁচে থাকে মৃত্যুর ছায়া নিয়ে, জীবনে ছায়া তার অমোঘ শত্রু, ইতি ও নেতিকে ফড়িংয়ের ডানায় রেখে নির্ঘুম জাগরণে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এ দুনিয়ার চাকায় দুইহাতই লাল, তবু একা না, হাত বাড়িয়ে, লাল সেই দুই হাত উঠিয়ে সিক্ত আবেগে অস্বাভাবিকভাবে বা অবাস্তবতায় ছোটে সপ্রাণ, কে যেন ঠেলে, গন্তব্য অজানা অথচ গতি অরুদ্ধ! দাঁড়াতে হয় অচেতন গোত্রভঙ্গে—হাঁক পাড়ে—কে তুমি? আমি; আমি কে—নাম? বলে না! পদশব্দের ক্ষীণ ধ্বনি আশঙ্কা জাগায়। হেরিংবন্ড রাস্তা ধরে শহরমুখী পথের বামদিকে দক্ষিণের শুরুতেই ক্ষুদ্র বিল। ভাসমান দাম আর ফেউলির জলজ অবয়বে বালিহাঁসের পাশে জলপিপি, র‌্যাডিশাল ডাক বা পরিযায়ী পিনটেইল ডাকে দিনভর। অন্ধকারে জোড়া জোড়া পা চলে এসেছে বিল ঘুরে লোকচক্ষুর অলক্ষে। গতিশীলতায় তাদের শ্বাস বাড়ে! ভুল, না কি ছেলেমানুষি নেহায়েত, না কি কালের প্রয়োজন এই অন্ধকারে? রক্তের গুপ্তটান ধরে খুনের ধনুকে! কে? আমরা। আমজাদ নাম বলে না। শ্যাওড়া গাছের পাশে শ্বাস থামায়। প্রতিপক্ষ আপন নানা উঠোনের কোণায়। ছুরিগুলো এগিয়ে যায়। আর্তচিৎকার আর গোঙানিতে বোরোপুর আতঙ্কে থাকে। অনেকদিন পর আমজাদ বুঝেছিলো, ছুরির ব্যবহারে সে অপটু। অবাক করে ক’দিন পরে প্রতিপক্ষ বেঁচে ওঠে। সে আর সামসুজ্জোহা মানিক, তারা পরস্পরকে মৃত্যু চিনিয়েছিলো; বিশ্ব ভূখণ্ডের ন্যায্যতা আর সমতার প্রশ্নে জড়ো করেছিলো মানুষ। চলতে চলতে খুঁজেছে সুসম’র অবয়ব। নানা বেঁচে ওঠার পরই সে ওয়াজেদ মিয়া আর রুমিকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যয় বাড়ায়। নলডাঙা রাজবাড়ির চুনসুরকির গুঁড়ো তখনও প্রান্তরের ঘাসগুলোকে বাড়তে দেয়নি। কয়েকদিন আগে তারা আইয়ুব খানের ডিকেড অব রিফর্ম—উন্নয়নের দশ বছরের বিরোধিতা করেছিলো। কী, উন্নয়ন কই? কোমল তারুণ্য মারমুখী হয়, বিডি মেম্বার (বেসিক ডেমোক্রেটিক) চাঁদ আলী মিয়া যশোরের কালিগঞ্জ মহকুমার প্রভাবশালী। রাজবাড়ির পাশে চাঁদ আলীর নিজের আবাস। ভরদুপুরে বের হওয়ার সময় সে হঠাৎ মুখোমুখি; প্রতিবাদীরা রাম দা উঁচিয়ে ধরে অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে পড়ে ধুলোয় ভরা রোদে। চাঁদের সঙ্গী দু’জনকেও আটকায় তারা। একজনের হাত এমন জোরে মোচড়ায় যে তার কাঁধের দুইদিক সামনে আর পেছনে ঝুলতে থাকে, দ্বিতীয় জনের পালা এলে সূর্যের আলোর দিকে চোখ রেখে প্রতিবাদীরা তার গলা চেপে ধরলে মুহূর্তে উঠে দাঁড়াতে চায়; প্রবল শক্তির মুষ্টির আঘাত তখন তার নাকের ওপর পড়ে; চাঁদ হঠাৎ সরে যায় বৃত্তের বাইরে, পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন চাঁদ আলীর পায়ে রডের বাড়ি দিয়ে শুইয়ে দেয়; বুকে-পেটে লাথি মারে। পাঁজরে দুটো গুলিতে চাঁদ আলী মারা যায়। ছাপ্পান্ন হাজার একশো ছাব্বিশ বর্গমাইলে ৭০-এর আগস্ট, পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির শ্রেণীশত্রু খতমের লাইনের চিহ্নিত প্রথম অ-লোক হলেন চাঁদ!

বাবলুর মনে বেশ ক্ষত আছে : সাতষট্টিতে কানু স্যান্যালের নকশাল বাড়ি, আটষট্টিতে আমজাদ ভাইয়ের বিপ্লবের লাইন নিয়ে চিন্তা—পিকিং রেডিও বললো, ভারতের বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। দেশব্রতী পত্রিকা বড়ো ভূমিকা রাখলো; দম নিলো সে, বিপ্লব কীভাবে শুরু করবে, কেমন হবে, কৃষক বাহিনী গঠন হলো, জোতদার প্রধান আর কিছু সামন্ত-প্রভু খতম হলো—ফলাফল কই?
রুমি বাবলুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেন : চারু মজুমদারের সঙ্গে আমার দেখা হতে গিয়েও হয়নি। আমার মুগ্ধতা ছিলো যেমন, তার প্রতি প্রশ্নও ছিলো। বাবলুর ক্ষতটা ঠোঁটে এসে জমে : বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূস্বামীরাই ছিলো উত্তরে, অপারেশন এতো দক্ষিণে হলো? উত্তরবঙ্গের ভূস্বামীদের বাঁচানো হয়েছে। রুমি দেয়ালের দিকে তাকালেন—সেখান থেকে দরোজা, সিলিংয়ের কোণায় চোখ পড়লে খসে পড়ায় উন্মুখ পলেস্তরা, তৃণবিচালি আর চড়ুই।—দক্ষিণের এই উত্তর-পূর্ব অংশে খতমের লাইন শুরু করেছিলাম আমজাদ হোসেন আমি আর ওয়াজেদ ভাই। ৭৩-এর শেষে এই এলাকায় অঘোষিতভাবে খতমের লাইন আমরাই উইথড্র করি, কন্ট্রোল করা খুবই কঠিন হচ্ছিলো। যে যার মতো খুন করছিলো—বলেন কমরেড, শত শত কৃষক—চোখে ঘৃণা—বলেন, মোলাকাত হোক রক্তাক্ত হাতে। আমরা বন্ধ করার অনেক পরে সেন্ট্রাল কমিটি এটা গ্রহণ করে। হক-তোয়াহা ভাইদের সঙ্গে যুক্ত হতেও চাইলাম। খতমের লাইন উইথড্র করে চাইলাম এক হতে। চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান না। রুমি ক্লান্ত স্বরে বললেন। আমরা পরে বারবার এই কথাগুলো সবাইকে বলেছি।

বাবলু তার যুক্তির ভঙ্গিতে বলে, পার্টির সিদ্ধান্ত ছিলো কালিগঞ্জের সতীশরঞ্জন নাথকে মারা। নলডাঙ্গার মাথাই বলে একজন সতীশরঞ্জনকে পাস্ করে দিলে সিদ্ধান্তটা ঘুরে যায় চাঁদ আলীর দিকে। শুরুতেই এসব অনীতি হলে দাঁড়ায় না। কেন হয়েছিলো, তোমার ধারণা কী বলে? রুমি ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন।
ওইসময় দলে হিন্দু নেতারা বেশি ছিলো। তারা সতীশরঞ্জন নাথকে বাঁচালো। একটু থামলো বাবলু। চাঁদ আলী মিয়া আমার দাদা বলে বলছি না। আমার পর্যবেক্ষণটা জানাচ্ছি। আমি মনে করি আমি এখনও টিপু বিশ্বাসের লোক। বাবলু তখনও বলে চলে… আমার শ্বশুর আর চাচা-শ্বশুর সাদ আলী খাঁ আর সাত্তার আলী খাঁ। মণ্ডলরা কমিউনিস্ট পার্টিতে গিয়ে কমরেড হয়েছে, উদ্দেশ্য খাঁ-দের মারা। তা-ও দেখলাম। অনেক প্রশ্নেরই জবাব আজও পাইনি আমরা। রুমি উত্তর না দিয়ে চুপ থাকা শ্রেয় মনে করেন। যদিও বাবলুর কথায় তার যথার্থ উত্তর থাকে না, তৈয়েব মিয়াদের পঁয়তাল্লিশ বিঘে জমি পার করে দক্ষিণে নলডাঙ্গা রাজবাড়ির উত্তরে চাপাডাঙ্গার পুবে কাঁকরাইল ঘাট। সেখানে মাখনরা থাকে। কেমন থাকে হঠাৎ অনেকক্ষণ ভাবেন। কী যেন তার সঙ্গে মেলে না!

দক্ষিণের এই উত্তর-পূর্ব অংশে খতমের লাইন শুরু করেছিলাম আমজাদ হোসেন আমি আর ওয়াজেদ ভাই। ৭৩-এর শেষে এই এলাকায় অঘোষিতভাবে খতমের লাইন আমরাই উইথড্র করি, কন্ট্রোল করা খুবই কঠিন হচ্ছিলো। যে যার মতো খুন করছিলো—বলেন কমরেড, শত শত কৃষক—চোখে ঘৃণা—বলেন, মোলাকাত হোক রক্তাক্ত হাতে।

দেয়ালচাপা পড়ে মরে রাজমিস্ত্রী ভাটা বিশ্বাস। মাখন তখন ছোটো। মরণোত্তর সেখানে অবলোকনে নিরাপত্তাহীনতা; বউর নাম বিটি, মেয়ের নাম পাবদা, ছেলের নাম মাখন, বিটি গেরস্থ বাড়িতে রান্না করে, পাবদা মাছ পছন্দ করে না, মুখ সুন্দর কিন্তু বয়সেও বিয়ে হয় না ঊর্ধ্বাঙ্গ পুষ্ট না বলে। মাখন টো টো করে বেড়ায়।
শীতকাল। সমতলে সব্জির পূর্ণ সম্ভার।
হাওয়ার চাপে ঝুঁকে পড়ে উজ্জ্বল রোদ অদ্ভুত ছায়া ফেলে এক জায়গা থেকে অন্যখানে সরে। লম্বা লম্বা ঘাসের ঢেউয়ের ওপর কুটি পাখির ছুটোছুটি। রাতে স্বপ্ন দেখার ওই হৃদয় দিনে হয় লুপ্ত! সেই হাঁফ-ধরানো শোঁশোঁ শূন্যতায় শব্দহীন অন্তহীন স্বপ্ন-সমুদ্রের উপকূলে মাখনের আবেগ ছোটে। নানাধরনের সব্জির তীব্র গন্ধে মাখন যে গতিতে এগোয় উপবন ভেঙে পড়ার উপক্রম। অন্তরাত্মার সুরে চমকে ওঠে সরু নদীর কালো জল। ক্ষেতের পাশে খোলা জায়গায় কয়েকটি গাছে ঘেরা বড়ো একটি বাড়ি। গায়ে নীল পোশাকে একটি মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায়। চুলগুলো তার অবশ্য বেড়ে গেছে। তাতে সোনালি ফিতে। মোটা চোখের পাতায় আস্তে আস্তে প্রকাশ হয়ে পড়ে অদ্ভুতরকমের চোখদুটো। মাখনের দিকে তাকিয়ে যেন শিউরে ওঠে। অমন চোখ সে আগে দেখেনি। সে দেখে, মাখন কোথায় যেন আন্দোলিত; দুইহাত এবং ঘাড়ের অংশের পেশির ওপর তরঙ্গ উঠছে, দেহের প্রতিটি অঙ্গ সবেগে এগিয়ে আসছে প্রাণঢালা প্রেরণা-প্রাখর্যে! অনিবার্য উৎসারণে।

কিছু বলবি—আস্তে আস্তে বাঘি বলে।
শোবো—মাখন বলে।
চমকে উঠে লুকোয়, শোনেনি সে, আর্তনাদের মতো বলে, কী?
তোর সাথে শোবো।
বাঘির সারা গায়ে তারাবাজি জ্বলে—
মা-বুনির সঙ্গে শোগে।
পারলি তাই কত্তাম।—বলে মাখন ভাবে। ওদের দিকি কি তাকানো যায়? কী করে পারবো?

অনেকক্ষণ বাঘির দিকে তাকায় মাখন। চুড়ির টুং-টাং আওয়াজ তুলে কোমল কমনীয় হাত বাড়িয়ে কথা বলছে। হাতে সুতোয় বাঁধা একটা ছোটো থলি। তাতে কাঁচা কুল। তামাটে রঙের মুখ, সতেজ সিক্ত ত্বক, চোখ মেঘের মতো বিস্তৃত আর ফোলা। রাগে নাকের ছিদ্র দুটি কাঁপছে! কণ্ঠার শির খুব অস্থির।

গাছপালা ক্ষেত পেরিয়ে কখনও সমতল কখনও মেঠোপথে বনঘাসের ভেতর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে মাখন। গণ্ডারের ভয়াবহ ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ ভেতরে। যৌবনের সরল আশাবাদিতা তার মনটাকে সবল করছে। স্বপ্নের দেশ থেকে হঠাৎ মাখন পড়ে গেছে মা-বোনের কথা শুনে। অপমানে সে ঢ্যাড়া দিঘির কোণার লম্বা নারকেল গাছে তরতর করে উঠে গিয়ে মাথায় পৌঁছয়, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে নিচের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সক্রোধে দ্রুত ঝাঁপ দেয় দিঘিতে। সাঁতরিয়ে মধ্যেখানে চলে গেলে ফিরতে পারবে কি না ভয় পাচ্ছে মাখন। সন্ধেয় শেয়ালের হুক্কা-হুয়া চারিপাশে। সে অন্ধকারে মাঠের ভেতর ভয়াবহ ব্যাপার। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে হাড়ভাঙা আর দাঁতখিঁচুনির শব্দ। গ্রামবাসীরা জেগে ওঠে। তৈয়ব মিয়ার দুই ডজন মুরগির অর্ধেক জবাই করা আর অর্ধেক মাথা মোচড়ানো। কথক চৌকিদারের বর্ণনায় সংঘটিত এরকম অবিশ্বাস্য কাজের বর্ণনা শুনে গ্রামবাসীরা মৃদু চিৎকারে তাদের বিস্ময় ও আতঙ্ক প্রকাশ করে। দ্বিতীয় ঘটনাটি পূর্বটিকে আরো শক্তিশালী করে। সারা গ্রামে উচ্চারিত হতে থাকে। ওবায়েদ মোল্লা, যাকে সবাই রুগ্ণ ফকির বলে তার ক্ষুদ্র আতরের দোকানের পেছন থেকে চাটাই কেটে ঢুকে শিশিগুলো টুকরো টুকরো করে ভাঙা হয়েছে!

সাতচল্লিশ বলো একাত্তর বলো যা হবার তা হয়েছে। প্রেক্ষিত ছাড়া আর অন্যকিছু নেই।
প্রেক্ষিতকে গুরুত্ব দিতে হয়। আমরা সেটা কখনো বুঝতে চাই না।
না রুমি ভাই—মেহেদুর বলে—আপনারা যারা মাইগ্রেটেড পিপল তাদের নিয়ে প্রশ্নও আছে। একটা এলিট ক্লাস তৈরি করা ছাড়া আর একটা নাগরিক মনন ছাড়া আর কিই-বা দিলেন? কোথায় যেন গ্লামারের প্রতি ঝোঁক আছে আপনাদের। রুমি উষ্ণকণ্ঠে বললেন, একটা উদাহরণ দাও। বিষয়টা সেক্ষেত্রে পরিষ্কার হবে।
১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্টে খুলনা হিন্দুস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কলকাতা বন্দর থেকে ভাগাভাগির মালামাল নিয়ে যারা জাহাজে করে পাকিস্তানের ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলো, খুলনার পাশ দিয়ে যাবার সময় বন্দে মাতরম এবং জয়ধ্বনি শুনেছিলো তারা। মুর্শিদাবাদ ছিলো মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুসারে মুর্শিদাবাদ থাকার কথা পাকিস্তান ভূখণ্ডে। খুলনা থাকার কথা হিন্দুস্থানে। একান্ন পার্সেন্ট হিন্দু ছিলো খুলনায়। মুসলিম লীগের নেতা খান-এ সবুর কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে খুলনাকে পাকিস্তানভুক্ত করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জেলা মুর্শিদাবাদ চলে যায় হিন্দুস্থান অংশে। খান-এ সবুরের নিজ ভূমির প্রতি এই প্রগাঢ় ভালোবাসা বাংলাদেশীদের দিয়েছে বাণিজ্যের অন্যতম নৌপথ এবং অনবদ্য ভূবৈচিত্র্যের অনন্য সুন্দরবন। পাশাপাশি যশোর জেলার মহকুমা বনগাঁ ওইপাশের মুসলিম নেতৃত্বের দুর্বলতার ফলে হিন্দুস্থানভুক্ত হয়। নেতা সিরাজুল ইসলাম বনগাঁর বণিক সম্প্রদায়ের আনুকূল্য পাননি। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বনগাঁকে পাকিস্তানভুক্ত করতে পারেননি। বনগাঁর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি বজ্রপাতের মতো ঘটায়। আমিনুল ইসলাম রুমি ওই উদ্বাস্তু মুসলিম বণিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তার বাবা-চাচারা এখানে এসে টালির কারখানা দেন।
মেহেদুর বলে, এখানে একটা কথা চালু আছে, ওয়েস্ট বেঙ্গলের লোকের পাশে বাড়ি বানিয়ো না। কথা চলে অনেক সময় ধরে।
গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট থেকে রুমি বের হন মধ্যদুপুরে। কিন্তু ভেতর থেকে বের হওয়া তার জন্যে কষ্টের। কোনো পরিণতির দিকে তারা কাউকে নিতে পারেননি। না জনগণকে না নিজেদের; বহুগুণের দায় নিয়ে তাকে চলতে হয়তো সারাজীবন। তার মানে এ পরাজয় কি তার একার? কেন? তাও-বা হবে? বিষয়টি যৌথ।

সুদক্ষ ধনুর্ধর এক অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সাইরাস বিজয় অভিযানে বের হন। তার সৈন্যরা এসেছিলো কৃষক পরিবার থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০ অব্দে মৃত্যুর আগে তিনি জয় করেন এশিয়া মাইনর, ব্যাবিলনিয়া, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট নেবুসাদ নেজার। অলিম্পিয়া পাহাড়ের ত্রিশ ফুট উঁচু জিউসের মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন ফিডিয়াস। মহান আলেকজেন্ডার বিশিষ্ট পিতামাতার বিশিষ্ট সন্তান। তার পিতা মেসিডোনিয়ায় দ্বিতীয় ফিলিপ ছিলেন ক্রীড়াবিদ, আবেগপ্রবণ ও মদ্যপ্রিয় ব্যক্তি। তার মা অলিম্পিয়া ছিলেন অধ্যাত্মবাদী ও দেবতা ডাইওনিডানসাসের বিশেষ ভক্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সেনানায়কদের একজন হ্যানিবল। তার পিতা কার্থোজও বীর হ্যামিলকার বার্কাত্ত ছিলেন বিশ্বস্ত সেনানায়ক। মিশর শাসনকারী টলেমি বংশের শেষ শাসক ছিলেন সপ্তম ক্লিওপেট্রা। দ্বাদশ টলেমির কন্যা ক্লিওপেট্রা ছিলেন অতিশয় বুদ্ধিমতী, শিক্ষিতা এবং শিথিল নৈতিকতাসম্পন্ন নারী। ফরাসি বিপ্লবের সময় এবং অব্যবহিত পরে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গঠিত প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধজোটের পরে ১৮০৪ সালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তৃতীয় যুদ্ধজোট গঠিত হয়। ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট ফ্রান্সের সম্রাট উপাধি ধারণ করার পর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ভেঙে গুড়িয়ে দেবার জন্যে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তৃতীয় যুদ্ধজোট গঠিত হয়। ১৮৪৮ সালে দু’জন জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এই দুইজন মিলে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো রচনা করেন। এই রচনা শেষ হয়েছে এইভাবে—শেকল ছাড়া শ্রমিকদের হারাবার কিছু নেই। জয় করার জন্য আছে সারাবিশ্ব। দুনিয়ার মজদুর এক হও। ইতিহাসের চল্লিশ হাজার বছরের খেরোখাতা দিলীপ দেবনাথের পর্যবেক্ষণে।

এই পরাজয় আমার বা আমজাদ হোসেনের নয়। বিশ্বে রাজনীতির পরাজয়। তার দায়ভার পুঁজিবাদ আলগোছে কমিউনিস্টদের ঘাড়ে চাপিয়েছে। রুমি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবেন। নিজেও বিভ্রান্ত, কমিউনিস্ট দলগুলোর বিভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেন। অবশ্য তাকেও তারা হয়তো নগণ্যভাবেই দেখে। একটা ফিউড্যাল পিওরিটি থেকে সবাই স্যাক্রিফাইস সেল করা শুরু করেছে। তো দরকার শুধু সায়েন্টিফিক্যাল মরালিটি। তিনি দাঁত চাপলেন। বিড়বিড় করলেন। যেখানে দরকার বিজ্ঞানমনস্ক বাস্তবতাভিত্তিক নৈতিকতা, সেখানে সামন্ত-শুদ্ধতা নিয়ে পুঁজিবাদের সঙ্গে লড়াই করা ভুল, একদম ভুল। স্যান্ডেল সু’তে বেরিয়ে পড়া নখে অন্যমনস্কতায় রাস্তায় একটা খোয়ার সঙ্গে ঠোকর খেলে চশমাটা নড়ে ওঠে রুমির। আমজাদ হোসেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় বই লিখে। কিন্তু তিনি—আমিনুল হক রুমি, সাম্প্রতিক নানান ব্যবসায় ঘুরে গায়ে লোভের কালিও মেখেছেন। তার পরিচয় কী? তিনি শুনলেন—রু…মি ও রু…মি; রোদে মাথাটা তার এলোমেলো হয়ে যায়। কী হয়েছিলো? হেরে-যাওয়া মানুষগুলোর সামনে কালো পর্দা নাচছিলো। পড়ে যাচ্ছে একেবারে পড়তে পড়তে শেষ, অচেতন নাকি অজ্ঞান কিংবা উদভ্রান্তের মতো তারা বেঁচেছিলো; বিশেষ ঊষর মরুভূমিতে তখন যেন জল এলো, তখন জমাট রক্ত বইতে শুরু করলো জলের মতো। মনে হয়েছিলো বৃষ্টি নামবে যে কোনো মুহূর্তে, শীতল ওই জল উত্তপ্ত হাওয়ায় শুকিয়ে যাওয়া সবহারা মানুষদের জীবন রক্ষা করবে।
চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান না।
কিন্তু কোনোদিনই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রেসিডেন্ট না।

রুমি হঠাৎ বলেন—আমজাদ ভাই শুধু না, কেউই আমরা প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করায় সক্ষম না। ভালোবাসা, জ্ঞান, স্বাস্থ্য জীবন এই তিনটে ছিলো ভাবনায় গুরুত্বের। আমার কাছে এখন স্বাস্থ্য বিষয়টি ইমপর্টেন্ট। শুধু স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্যের ভেতরই সব। সবসময় মনে হয়েছে, স্বাস্থ্যের সঙ্গে সেক্সের গভীর সম্পর্ক। সারা পৃথিবীর একটা ক্রাইসিসই শেষমেশ সমাধানঅযোগ্য—তা হলো হেলদি সেক্স, পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল সমস্যা, স্বর্গের প্রথম পাপ!

নিস্তরঙ্গ আকাশে দূরে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখছিলো বাঘি। এক তীব্র ক্লান্তি-আনা কামনার দুহাত বাড়িয়ে, কখনো মাটিতে পা যেন ছুঁয়ে, হেঁটে চলছিলো সুলতার ভঙ্গিমায়; বাঘি ছিলো আনমনা। হঠাৎ সেইসময় মাটি খুঁড়ে মাখন সামনে এলো। জলের মসৃণতায় বা হাওয়ার ছন্দে বাঘির শরীরের রেখাগুলো অপলকে দেখলো, অতঃপর অনিবার্য চাঞ্চল্যে মাখনের বুকে প্রবলতায় জেগে উঠলো মাংস, জল, স্বপ্ন আর গতি।
ধনুকের মতো পেছন দিকে ঘুরে সরে গেলো বাঘি। তারপর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় মাখনের কোণাকুণি দাঁড়ালো। হাঁফালো ভীতিমিশ্রিত উৎকণ্ঠায়। ধরা পড়বে না তাই, কি রে—বলে মাখনের হাতদুটির দিকে তাকিয়ে বাঘি অবাক। তার নীল পায়জামাটা মাখনের হাতে। মুখটা করুণ। দাঁড়িয়ে থাকে নিষ্পলকে।
শোবো—বলে মাখন পায়জামাটা নিজের মুখের কাছে নেয়।
অস্বস্তিতে উগ্র হয়ে বাঘি বলে, বেশ্যার কাছে যাতি পারিস নে?
আমি কুমার—কুমারীর কাছে যাবো।
দাঁড়া বাপের কাছে বলবো—লোক দিয়ে টুকরো টুকরো করবে নে!
লোক তো আমরা—বলে মাখন চলে গেলো খুব নির্বিকার হেঁটে।

নিমগাছের তলে পাটি পেতে শুয়েছিলো মাখনের মা। সারারাত ঘুম আসে না, কেমন যেন ছাড়াছাড়া, একই চিন্তা, গেরস্থবাড়ি কাজ করে কিছু টাকা জমিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে টিনের ঘর তোলা। অবশ্য এই পাতলা ঘুম সেই মাখনের বাপ মরার সময় থেকে। মেলা দিন মরণের সঙ্গে লোকটা যুঝাযুঝি করেছে—এই বুঝি মাখনের বাপ বেঁচে উটলো, ডাক্তার বললো, বাঁচতেও পারে। মাখনের মা’র মনে পড়লো, পাবদা কত্ত ছোট্টো, তা-ও বলে, বাপ মরে গিলি যাবানে কনে? মাখনের বড়ো চাচা এসে খবর দিলো, ভাই আর বাঁচপেনানে, মানুষ বড্ড মায়ার দাস, দুনিয়ার আসার সময় আসতি চায় না আবার যাবার সময় যাতিও চায় না—কও দিন? সে গেলো, পাবদার এদিকে এই অবস্থা, মাখনের নিয়ে কত্তো যে চিন্তা ও বোজে! নিজির ছেলেডার দিকি তাকাতিই ভয় লাগে! এ্যাতো রাগ ক্যান? কোন্ জ্বালায় পড়িছিস তুই ক? আল্লা দিলি তো চালায়ে নিচ্ছি। তোগের কি বুঝতি দিচ্ছি? তা অতো মিজাজ ক্যান? পাশের বাড়ির বাদলের টিবি না ক্যান্সার কি জানি হয়েছিলো, কদিন আগে সেরে উটেছে। বাদল বাসের দরোজার গুড়ায় দাঁড়ানোর কাজ করে। বল্লাম, বাদলের শরীরডা ভালো হএছে ওগের সংসারডা এখন বাঁচপেনে। বাদলের দেখতি গিইলি? না গেলি যা বাপ্। মাখন তাকিয়ে কথা শুনে মাথা ঘুরিয়ে বলে, ও বাঁচলি আমাগের কী? আমারে কী দেবে? কও দিন? শুনে হা। এ কি কথা, এ তো হিংসে না মেলা বিষির ব্যথা। এ ক্যামনতর চিন্তা?

মাখন আর বাঘি। দুজনেই কুঁড়ি! বাঘি ষোলো, মাখন কুড়ি চন্দ্রবিন্দু বাদে। বাঘি সচ্ছল, সে গ্রামের স্কুলে পড়ে, মাখনের প্রচুর জ্ঞান লেখাপড়া না করেও। তবে সে আবেগপ্রবণ বলে ঝুঁকিপূর্ণ তার চলাফেরা। গ্রামের সবাই সেগুলো জানে। বাঘি এমনি তার মনে এঁকেছিলো কল্পিত এক তরুণের ছবি। যাকে দেখে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুভবের সুষমায় শিহরিত হবে। কিন্তু এখন কাকে দেখলো? তার কল্পনা এমন ভাগ্যাহত, এতো নোংরা আর পাথুরে হলো? কোনোভাবে কল্পনাকে সে বাস্তবের সঙ্গে মেলাতে পারছে না। মাখনকে আগে থেকেই চিনতো। কী হলো ওর? ভাবতে গিয়ে আত্মঘাতী এক কদর্য জেদ তার মাথায় চাপে। বয়ঃসন্ধির কম্পন দেহের অণু-পরমাণুতে যা ঘটাতো বাঘি তা নিয়ে এগোচ্ছিলো নন্দনে। ভেঙে দিয়েছে মাখন। ক্ষিপ্র হয়ে কয়েকটা গালি দিলো। দুইদিনই সে মাখনকে কাছ থেকে দেখেছে। নারকেলের পাতায় তখন ভীষণ নীরবতা। দিঘির ঢেউয়ে পাকা মাছের পাক। মাখন উন্মাদনায় উদ্বেল যদিও দিঘি তার দৃষ্টির বাইরে। বাঘি উৎকণ্ঠিত হলেও হাওয়া তাকে আস্থা দিলো। তারা দুজনের কেউই সমতলের উপরে ছিলো না। দুপুরের বাঁকা আলোয় দিঘির পানি ফুটছিলো কলকল করে। হাওয়ায় উঠে এসেছিলো মৃদু ঢেউ। রোদে ছিলো তপ্ততা। পাতায় মুখরিত সবুজ। আকাশ ছিলো আলোকিত মেঘের কিনারে। নির্ধারিত নীল ডানায়। বাঁকা রোদ দিঘির বুক থেকে সরে। হাওয়া শুষ্ক থেকে শীতল। বাঘি পুবে তাকিয়ে দেখে নীল আগুন, মাখন চেয়ে দেখে সবুজ ঘোড়া। তখন মাখন বীজ, বাঘি হলো রস। বাঘি ফল হলে মাখন জল। পথহারা হলে ও দুধেভেজা কিসমিসের মৌনতা! পরে, পানি পানি আর পানি, কিছুই নেই পানি ছাড়া, দূর থেকে বিন্দুর মতো কিছু যেন দানা হয়ে পানির তলা থেকে উঠে আসে। আস্ত একটা ডিমের মতো শীতল শাদা ধীরে ধীরে ফাটে; অবিমিশ্র সত্তা অণু থেকে অংশ হলো। কুসুম সূর্যে দুটো সত্তা বেরিয়ে আসে, বাঘি নিজেকে শুধু চিনতে পারে, কিন্তু তার পাশে যাকে ভাবে সে তো স্বর্গীয়! মাখনের কথা মনে এলে গা রি-রি করে। স্বর্গীয় মানুষই সবসময় তার সঙ্গী। যেন তাদের একসাথে হবে জন্ম একই রক্ত আর রুচিতে; আত্মার অবিভক্তিতে, অবধারিত ঐক্যে।
পরের দিন সকালে রুমি এসে সবাইকে ডাকলেন। আমজাদ হোসেনের হাওয়া পরিবর্তন দরকার। সভায় জানানো হয় অনতিবিলম্বে তাকে শীঘ্রই সমুদ্র সৈকতে পাঠানোর জন্যে কার্যকরী কমিটি গঠন করা হবে। তাদের সিদ্ধান্তটি খুবই সক্রিয়।

আনমনা কিছু যেন ভাবছিলেন আমজাদ হোসেন, এলোমেলো, অসংলগ্ন। দেখতে চাচ্ছিলেন তিনি বারবার, আমি কে?

পঁয়ষট্টিতে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন-মতিয়া)। পরবর্তীকালে মস্কো-পিকিং ভাঙলো—হক-তোয়াহা (ইপিসিপিএমএল), মণিসিং-খোকা রায়রা (ইপিসিপি)। ইপিসিপিএমএল-এর হক-তোয়াহা থেকে মতিন-আলাউদ্দিন আর দেবেন সিকদার মিলে বানালেন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল। মেনন পিকিংয়ে গেলো মতিয়া মস্কোতে। মাহবুল্লা ও মোস্তফা জামাল হায়দাররা মেনন থেকে আলাদা হলো। পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি হিশেবে থাকলো মতিন-আলাউদ্দিন আর টিপু বিশ্বাস। মেনন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিরাজ সিকদার মাও রিসার্চ সেন্টার বানিয়ে বহুদিন পর সর্বহারা পার্টি বানালেন। আরও কতো ভাঙলো! সব লেখা তার বইয়ে আছে। বাংলাদেশে নকশাল আন্দোলনের প্রচার নিয়ে ভাবলেন : ঢাকার এক ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশ, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) পার্টির মুখপত্র ‘দেশব্রতী’তে বলা হয়েছে যে, নকশালপন্থীরা পশ্চিমবঙ্গে আশিজন শ্রেণীশত্রুকে উৎখাত করেছেন।… গোপনে প্রকাশিত ঐ পত্রিকাটিতে আরো বলা হয় যে, জোতদার মহাজন প্রভৃতি শ্রেণীশত্রু ও তাদের দালালদের উৎখাত সম্পর্কীয় গেরিলা সংগ্রামের কর্মসূচি এখন রাজ্যের ১৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

‘গত ১৫-১৬ই মে তারিখে কোনো এক জায়গায় গোপনে অনুষ্ঠিত সিপিআই (এম-এল)-র প্রথম কংগ্রেসকে চেয়ারম্যান মাওসেতুংয়ের চিন্তাধারা ও ভাইস চেয়ারম্যান লিন পিয়াও-এর সঠিক তত্ত্বের বিরাট জয় বলে ঘোষণা করা হয় এবং ভারত ও বিশ্ববিপ্লবের ইতিহাসে এই কংগ্রেস চিরদিনের মতো স্থান পাবে বলে পত্রিকাটিতে উল্লেখ করা হয়। ‘সিপিআই (এম-এল) ও কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেস নিশ্চিতভাবে ভারতীয় জনগণকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশব্রতীতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে কমরেড চারু মজুমদার ভারতের গ্রামে গ্রামে গেরিলা যুদ্ধ জোরদার করার জন্যে দলীয় সকল ক্যাডারদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কমরেড মজুমদার বলেন, কমরেডগণ, চেয়ারম্যান মাও-এর আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো দুর্জয় ও সাহসী হও, সকল দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলে দাও, এ সংগ্রাম ছড়িয়ে দাও ভারতের প্রতিটি গ্রামে। আত্মরক্ষার কথা ভুলে যাও, কারণ, এ যুগ আত্মোৎসর্গের যুগ, এ যুগ বিশ্বের মুক্তির যুগ। ‘দেশব্রতীর সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘পুলিশের অকথ্য নির্যাতন সত্ত্বেও আমরা আমাদের পথ থেকে সরবো না, উপরন্তু শ্রেণীশত্রু উৎখাতের কর্মসূচিকে আরো জোরদার করব। আমাদের প্রিয় কমরেডদের হত্যার বদলা আমরা নেবই নেব।’

সমুদ্রের ধারে আমজাদ হোসেন ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকেন।
তার অনুভবগুলো কাব্যমমতায় ব্যক্ত হয়ে ওঠে।

রাতে একাদশীচাঁদ এসেছিলো নেমে
তারাগুলো ছিলো ক্লান্ত জরির ভেতর
দিগন্তরেখায় গতিপথ বিশাখায়
জ্যোৎস্নার আলোয় সিক্ত প্রতীক্ষায়।

আকাশ জ্বলছে মজমায়!

অবশ্যই তিনি দেখলেন বৃহস্পতি
দূরান্তে তাকান মঙ্গলতারায়
আলোকে দেখেন স্রোতের ধারায়।

বাজপাখির ছায়ায়।

হাঁটছিলেন বালির ওপরে
বুক চলছে, দাঁড়িয়ে আছে ‘পা
হাহাকার থাকে না এ আত্মায়
অন্তবৃত্তে নিদারুণ ব্যথিত।

এই দার্শনিকতায়!

সমুদ্রের ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিলো
ফেনাগুলো ছিলো ঘোলাটে আখের রসে
ছ’টায় জোয়ার জেগেছে ভাটার শেষে।

কাঠের চেয়ারে ঘুম এসেছিলো খুব
বাতাসে এখন শীতেরসৃষ্ট ভয়
তন্দ্রায় থাকে স্মৃতিরই স্মরণছবি
নির্জ্ঞান তলে খুনের অভ্যুদয়!

সূর্যোদয়ে ভিড় জমেছিলো শেষ রাতে
জেলেরা জালগুলো ছুঁড়ে দিচ্ছিলো জলে—
রক্ষীদের ক্ষিপ্র হুইসেলের ভেতর।

পরিচিত কিছু মাছ, উঁকিঝুকি দেয়
দুটো গাঙচিল এগোয় অদূরবর্তী
জলাশ্রিত সে হাওয়ার অনুস্বরে।

শিশুরা ঘুমের ঘোরে পা রাখে বালিতে।

সমুদ্রের এই দীর্ঘ ঢেউয়ে
অবশেষে ঝিনুকের আগমন;
ছুটে আসা সুসিক্ত হাওয়ায়
নারিকেলের গোত্রবন্ধনী;
ঝাউয়ের অবিন্যস্ত ছায়ায়
উপকূলে রূপ ছিলো পরমে।

শিশুরা সেদিন তীরে খেলছিলো মগ্নে
সুতীক্ষ্ণ নজর ছিলো বাবা-মায়েদের
নিষেধ ছিলো, ভাটায় যেনবা না নামে।

যদিও সমুদ্র শুধুই ডাকছিলো স্বপ্নে
ভিজিয়ে দিচ্ছিলো ঝাউয়ের সবুজ রঙে
লুটোপুটি তার কোমল অনুভবগুলো
স্পর্শিত ছায়ায় নৈকট্য পেলো প্রান্তের।

কমলার খুলে যাওয়া খোসায়
সূর্য এলো এ-সমুদ্রের আলোয়
ঊষার অবোধ্য নীরবতায়।

বিচরণশীল ঘোড়াদের পিঠ থেকে
দুইজন অশ্বারোহী ডাকলো তাকে
অসম্মতি জানিয়েও তবু হাসলেন
কারণ এ-সত্তা সমুদ্রের অবয়বে
আকাশী ছায়ায় হংসনীলের বঙ্গে
উদ্দামে আসা ঢেউয়ের অন্তরঙ্গে।

বালির লাবণ্যে বেশ স্মৃতিবিজড়িত
হাওয়ার পুত্ররা সঙ্গে অনেকদিন
ফোপলের লুকোনো নিস্পৃহতায় তবু
সক্রিয়তায় নামতে হয়েছিলো যুদ্ধে।

মাশুল না নিয়েই কেউ কেউ
প্রতিবিপ্লবের সঙ্গে একাত্ম
ভীতসন্ত্রস্ত ক্রীতদাসেরা।

পুত্রদের মৃত্যুর কারণে আমি কতো দায়ী?
খুঁজে দিতে চেয়েছিলাম সোনারই মালভূমি
সমতার ভাগ নেবে হাওয়ার সুপুত্র।

শ’ শ’ ট্রলার এসেছে অস্তে টুকরো কাঠে
বাঁকানো লোহায় ফোলা শিকারির (অ)দেহ
রক্ষিত মাছেরা তবু বাঁচে
নি ষ্কৃ তি র
         জ লে।

নিজের পরেই যেন বিরক্ত হলেন আমজাদ হোসেন। হঠাৎ একটা বিষয় মনে হলে; আশ্চর্য ওরা, পার্টি করবে অথচ ঠিকমতো মুখপত্র বের করে না। দল করবে তার কর্মসূচি নেই, রাজনীতি মানে শুধু মিটিং-মিছিল না, মধ্যবিত্তের মনন যেভাবে বাঁক নিচ্ছে সেগুলো নিয়ে ভাবার সময়ও এসেছে; কারা সামন্ত, কারা লুম্পেন, বুর্জোয়া বলতে মূলত আমরা কী বুঝছি? সত্যিকারভাবে একটা বড়ো আন্দোলন দেখতে পেলে অন্তত ব্যক্তিগত হতাশাটা কমতো; জীবন এতো দ্রুত আর অনিবার্য হতে হতে এগোচ্ছে যে ভবিষ্যতের বিশ্লেষণই যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তিত হচ্ছে যেন প্রায় সব কিছুই। নিজের যাপনের এই রহস্যের আড়ালে নিজেকেও কি সে ঠকায় না? এগিয়ে এসে কাজ করার অনাগ্রহ কি তৈরি হয়নি? আপন অভিজ্ঞতা তিক্ততায় ছেঁড়া জুতোর মতোন কি গালে পেটায়?
মেহেদুর বলে—আমজাদ ভাই নানার গায়ে হাত দিয়েছিলেন বলে একটা গ্লানি বোধহয় তাঁর হয়, কেমন যেন গোত্রপ্রীতি তৈরি হয়েছে তাঁর ভেতর। ইদানিং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ছাড়া কারো সঙ্গেই থাকেন না।
রুমি হঠাৎ বলেন—আমজাদ ভাই শুধু না, কেউই আমরা প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করায় সক্ষম না। ভালোবাসা, জ্ঞান, স্বাস্থ্য জীবন এই তিনটে ছিলো ভাবনায় গুরুত্বের। আমার কাছে এখন স্বাস্থ্য বিষয়টি ইমপর্টেন্ট। শুধু স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্যের ভেতরই সব। সবসময় মনে হয়েছে, স্বাস্থ্যের সঙ্গে সেক্সের গভীর সম্পর্ক। সারা পৃথিবীর একটা ক্রাইসিসই শেষমেশ সমাধানঅযোগ্য—তা হলো হেলদি সেক্স, পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল সমস্যা, স্বর্গের প্রথম পাপ!

রাজবাড়ির একটা অংশের পেছনে নদীর ঢাল ক্রমশ বেড়েছে। আর সেই চওড়া পথ এবড়োখেবড়ো হয়ে বুকসমান বুনো ঘাসের ব্যাপক বিস্তৃতি নিয়ে গভীর রহস্যের আধার হয়েছে যেন। প্রান্ত সীমানার পেছনের অর্ধেক ঝুলে আছে নদীর দিকে; চুন-সুরকির ভেতরে শ্যাওলা, আঁকাবাঁকা গজিয়ে ওঠা কিছু অজানা গাছের বহু শেকড়—ডালপাতা; রাজবাড়ির জানলা-দরোজার ঘন আস্তরণ। এই বাড়ির দক্ষিণ দিকটা পরিচ্ছন্ন, এখানের একটা ঘর পরিষ্কার করে আন্নাবুড়ি থাকতো। নয় দিন আগে মারা গেছে। সরু বাঁশের অল্প দূরত্বের সেতু পুবে, নদীর ওই পারে তৈয়ব মিয়ার শান-শওকাতের ঘর-বাড়ি জমিজমা।

শীৎকার না প্রতিবাদ মাখন বোঝে না। সে উগ্রগতিতে মাংসের ফলাটাকে একটা সোজা সিঁথির অন্বেষণে ভাগ করা গন্তব্য গুহার দিকে এগিয়ে দেয়। তখন মাখন দ্যাখে, হেমন্ত বাইরে কোথায়, গ্রীষ্ম বাইরে কোথায়, বর্ষা বাইরে কই; সবই তো বাঘির ভেতরে। ফল-ফুল-রূপ-রস গন্ধে হাওয়ায় ভেজা উষ্ণতায় একক হৈমন্তী।

বিচিত্র কিছু বুনোফুল আনন্দে তুলছিলো বাঘি, বেছে বেছে সযত্নে; সবুজ আকন্দের ডালের বিস্তার চারিপাশে; উচ্চতা মানুষ সমান; গাছভরা অজস্র শাদা ফুল; আকন্দ ফুলের শাদা পাপড়িগুলো খুলে খুলে দিয়ে ভেতরের নানান রঙের মুণ্ডুগুলো বের করে মালা বানাবে বাঘি। লাল-বেগুনি-কালো-হলুদ—কষের গন্ধটা পাপড়িগুলো দিয়ে ঘষলে চলে যায়। কী তাজা আর ভেজা রঙ মনোরমায়! বনের থমথমে আবহাওয়ায়, নিজের উপস্থিতি, টুকরো-টুকরো চিন্তা আর আনমনায় মালা গাঁথার আবছা উত্তেজনার ভেতরে বাঘি গোপনে যেন নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো। বেলা হয়েছে। একটু যেন ভয়। ভয় আর অস্বস্তি। তবু এই মুহূর্তে জায়গাটাকে ভালো লাগছিলো। বেশ যুতসইভাবে মালা গাঁথবে বলে বাঘি একটা হিশেব করছিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে ছায়ার মতোন মাখন পাশে এসে সবলে বাঘির ডানহাতটা ধরে। কাঁপে বাঘি। কাঁপছে ভয়াবহ। ভয় আর বিস্ময় সমানভাবে ভেতরে। এলোমেলো হতে গিয়েও মুহূর্তে বাঘি ভাবে, শেষমেশ সে এর শেষ দেখবে। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আলোড়ন কতোটুকু সে লুকোতে পারে এমন প্রমাণ দেয়া এখন জরুরি। হাতটা জোরে ছাড়াতে চাইলে মাখন শিথিল হয়; লজ্জা আর ব্যথায় নিজের বুকটা আড়াআড়ি দু’হাতে ঢেকে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মাখনের পাথরের মতো মুখভঙ্গিমা অনেকক্ষণ থাকে না বা সে ধরে রাখতে পারে না। সেও উত্তেজিত। তার মাজার পাজামার ভেতরে ক্ষুদ্র একটা ছুরি, জোঁক-কাটা থেকে ফলমূল কাটার জন্যে সে এটা ব্যবহার করে। একটা কাঁচা শশা পকেট থেকে বের করে নিয়ে গালে ঢোকায়, তারপর বাঘির হাত ধরে আন্নাবুড়ির ঘরের দিকে নিতে নিতে বলে, হয় আজ মরবো নাই বাঁচপো, তুই এ্যাখন কথা দিবি। ভেতরের কাঁপুনিটা লুকোনোর চেষ্টা করে এবং এটা যে আস্তে আস্তে কমছে বুঝে বাঘি শান্ত হয় কিছুটা। তার বুদ্ধিমত্তা, সে খেয়াল করে দ্যাখে, এগোচ্ছে চিন্তাশীলতার দিকে। ভাবে, কী এমনই-বা কথা বলবে মাখনের সাথে?

মাখন বহু কিছু বলে চলে, বাঘির এইপাশে আরেকবার অন্যপাশে গিয়ে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আবেগগুলো প্রকাশ করে; বাঘি অস্বাভাবিক বিপদ মোকাবেলা করার জন্যে অতিশয় চেতনে নিজ পক্ষে নিতে চায় পরিস্থিতি। মানুষ এতো তুচ্ছ হতে পারে এই দেহের জন্যে! না-কি নারী-পুরুষের দেহবিনিময় পরস্পরের কাছে অনিবার্য দাবি; যদি হয়, তাহলে ধরে রাখার এই অনন্ত গৌরব, স্বমর্যাদায় ক্রোধ, লোক-লজ্জায় সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া—তো আরো তুচ্ছ! না হলে সে ঘৃণায় চিৎকার করছে না কেন? বাঘির নীতিই শুধু অগ্রাহ্য করছে এটা না, বরং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে; তবু কোথায় যেন স্থির। বুদ্ধিমতী সে, বই পড়ে, বোঝে কিন্তু এতো বিস্ময়, এতো চাঞ্চল্য, এই মরণ এতো নতুন, রঙিন এতো, অদ্ভুত রোমাঞ্চ আগে দেখেনি! সে মাখনের চোখে প্রেম দেখেছে। তা নিয়ে সংশয় বা দ্বন্দ্বের অবকাশ নেই। কিন্তু সে জানে, মাখনের সাথে তার বিভেদ কোথায়। তার অহংকার করার মতো জায়গাগুলো তো নিজের না; পরিবার তাকে শিখিয়েছে। সে সুন্দর, গুণী। প্রেমের জন্য এতো নিচে ছাড় দেয়া যায় না। আর দশটা মেয়ের মতো ভালোবাসা দেখলেই সম্মতি দিয়ে দেবে, নিজেকে বিকিয়ে দেবে, না। তবু উঠতে পারে না; মনে হয়, কোনো-না-কোনোভাবে প্রকৃতি তাকে পথ করে দেবে। ভাবে, তার মন অনেক মুক্ত, কিন্তু তার দেহও তার না, সমাজের, দেহের শুদ্ধতা সমাজের শুদ্ধতা, কিন্তু ভালোবাসা, ভালোবাসলে সে কেন দেবে না? পরস্পর বিপরীত চিন্তায় হঠাৎ বাঘি সিদ্ধান্ত নেয়, সে মূল্যবোধেই। যদি ভুল হয় তার আত্মা চারপাশকে ধিক্কার জানাবে। মাখন বলে, শালা আমারে লোকে পাগল বলে, সব শালারই মেয়ে আছে, আমারই নেই। আমার সময় হিশেব-নিকেশ! পুরনো ক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাঘি দ্যাখে সেই পরিচিত মুখ, মাথার ওপর চুল এলোমেলো, পাতলা লোমের দাড়ি; রুক্ষ্ণ চেহারা আর মলিন পোশাকে কতো হালকা করে জীবনের সবচেয়ে জটিল কথাটা বলছে। বাঘির মনে হয় চারিপাশে রাস্তা বন্ধ। একটা বিব্রত বিষয়কেও মাখন অন্তরঙ্গে নিচ্ছে। তীব্র অনুভূতি প্রকাশ করার এমন শক্তি সে কোথায় পেলো? চাইতে হয় কি এতো নির্মমতায়? এই সরলতা সুন্দর কি-না জানে না বাঘি, কিন্তু সভ্য কি? ভ্রু কুঁচকে নিচের ঠোঁটটা ওপরের দাঁতের সঙ্গে নাড়াতে নাড়াতে ভাবে। শশাটা চিবোতে চিবোতে মাখন বলে, অভিশপ্ত আমি, পরের ক্ষেতের শশা চুরি করে খাচ্ছি! পাপ খেলাম। হঠাৎ মাখনের মনে হয় তারপরেও সে এখন সোনালি বিবরে! আলো ঝলমল মণিমুক্তায় স্থান সংকুলানে এতো বিস্তৃতি! একটা পট পরিবর্তন হয় মাখনের মনে। এখন সে কী করবে? বাঘির গা ঘেঁষে বসে ঠোঁট দুটোই নিজের জোড়া ঠোঁটে চাপে লালার পেলবতায়। বাঘি কুঁকড়ে গিয়ে মাথাটা নাড়ায়। সামান্য না থাকে। মাখন বহুবার বহুভাবে অনেকক্ষণ জড়িয়ে বাঘিকে চুমু খায়। অসহায় ঔদ্ধত্য মাখনের ওপর ভর করে। বাঘির জামার ভেতর থেকে নিচের দিক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ওপর দিকে এগিয়ে গেলে অবিশ্বাস্য কম্পনে ভারসাম্যহীন হতে থাকে। কী শিহরণ? কাচ লাগানো ব্রেসিয়ারের ভেতরে হাত দিতেই এক অতীন্দ্রিয়তা হাতের তলা ভরিয়ে দিয়ে উপচে ওঠে; কোমলতাগুলো আলোর গতিতে সক্রিয় তালে ঘুরপাক খেতে খেতে স্থানান্তর হতে থাকে বিরামহীন। প্রতিমুহূর্তেই কোষের অনুভব তাকে আগ্রাসী করে তোলে। বাঘির দ্বিতীয় স্তনটি বের করে মাখন মুখ রাখে বোঁটায়। গাল ঘষে। মুখের ভেতর পোরে। স্তন: মানুষের প্রথম পিপাসা—তীব্র দাবি! বাঘি স্তব্ধ! সব দেখছে। রক্তস্রোতের ভেতর বিষের গুমরানি। এমন পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত না। কাঁদতে ইচ্ছে করে। রাগ ও ঘৃণায় জ্বলে ওঠে, কিছুটা নিজের ওপর। হয়তো মাখনকে বুঝতে চেয়েছিলো, কোনো অসতর্ক মুহূর্তেও এমন হতে পারে তার কল্পনাতেও আসেনি। রক্ত কি বিশ্রী এক বাসনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? মাখন এক স্তনের বোঁটা দিয়ে অবিরত সারামুখ লেপে নেয়, আরেক হাতে অন্যটি ধরে থাকে। পরে, পায়জামার বন মাখন খুলতে চাইলে বাঘি বাধা দেয় রুক্ষতায়। পারে না। মাখন পাজামা খুলে নগ্ন করলে বাঘির ঊরুসন্ধিতে তখন রেবতী : দুই জানুর শিরা শিরশির করে। লোমগুলোর তলে ত্বক ধীরে ধীরে লাল। বাঘি আহ্ উহ্ করে। শীৎকার না প্রতিবাদ মাখন বোঝে না। সে উগ্রগতিতে মাংসের ফলাটাকে একটা সোজা সিঁথির অন্বেষণে ভাগ করা গন্তব্য গুহার দিকে এগিয়ে দেয়। তখন মাখন দ্যাখে, হেমন্ত বাইরে কোথায়, গ্রীষ্ম বাইরে কোথায়, বর্ষা বাইরে কই; সবই তো বাঘির ভেতরে। ফল-ফুল-রূপ-রস গন্ধে হাওয়ায় ভেজা উষ্ণতায় একক হৈমন্তী। বাঘি চোখ বন্ধ করে প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন; যদিও তার দুই চোখে বোঁজা পাপড়ির ভেতর সরু উন্মুক্ত রেখা লক্ষ্যযোগ্য হলে সচেতনই মনে হয়। ওই আচ্ছন্নতার ভেতর বাঘি চোখ খোলে, ভাবে, সে সমাজের—যা হলো তাতে তার সমর্থন আছে রক্তে, নেই নীতিতে।

পানি পানি আর শুধু পানি। বাঘি ডিঙ্গি নৌকায় ভাসতে চেয়েছিলো স্বর্গীয় পুরুষ নিয়ে। হয়নি। মাখনের দীপ্ত মুখটা বাঘির মায়া কাড়েনি। এই কলঙ্ক নিয়ে কি এগোতে পারবে? এই আন্নাবুড়ির ঘর থেকেও কি বেরোতে পারবে? মাখনের শ্রেণী অবস্থান এতো নিচু যে তার সঙ্গে কোনো পরিণতি চাইলে বাবা-মা কেটে কুচি কুচি করে ফেলবে। ডিঙ্গির ওপরে প্রবলভাবে ভাসতে ভাসতে চোখ খোলে। মাখনের সঙ্গেই সে। কিন্তু না, মাখন তার কোনোদিকেই সম না। মাখন কি ঘোগ? ইংরেজিতে যাকে বলে হায়েনা ডগ। বাঘির ডিঙ্গি নিয়ে মাখন সমুদ্র মন্থনে উন্মাতাল! মিলিয়ে তারুণ্যে ছাতুই গুড়ের আপ্লুত স্বাদ। বাঘির রেবতী নক্ষত্রের আলো মাখনকে পুড়িয়ে দিচ্ছে—লাফ দিয়ে ওঠা কাতলা মাছের ঠোঁটের মতো মুখ বন্ধ করে আবার খুলে মাংসের ফলাটা নিয়ে অবিরত খেলছে। হঠাৎ দুই ঊরু আর নিম্নাঙ্গ দ্রুতভাবে বাঘি নাড়াতে থাকে! ওঠা-নামা করায়। ঢেউয়ের মুখোমুখি মাখন পাগল! সামলাতে পারছে না। বাঘি পাশে মাখনের পায়জামাটা যেখানে রাখা ছিলো সেখান থেকে দ্রুত কিছু একটা নিয়ে সজোরে মাখনের পিঠ জড়িয়ে ধরে। বাঘির শরীরের মতো ওই হাতও মাখনের পিঠের ওপর ওঠা-নামা করে। স্বল্প সময়ের ভেতরে মাখনের মুখ থেকে অনর্গল কিছু বের হতে থাকে। পিঠে হাত দিয়ে বুঝতে হয় না মাখনের, শ্বাস-প্রশ্বাসই বুঝিয়ে দেয়। ক্লান্ত মাখন হাত দুটো নিয়ে বাঘির বুকের ওপর থেকে যেন অচেতনেই কণ্ঠার ওপরে রাখে। শ্বাস কমে আসতে থাকে আর তার ব্যাপক চাপটা মাখনের হাতদুটোর ওপর থেকে বাঘির কণ্ঠায় চলে যায়। বাঘির নিঃসাড় শরীর থেকে সরতে গিয়ে মাখন লক্ষ করে নিম্নাঙ্গের চারপাশ জুড়ে নিজের পেটের তলদেশ ঘিরে অনেক লোম পর্যন্ত রসে ভেজা। সিক্ত জল নামছে। ভেজা উষ্ণতায় আর কিছু দেখে না। শুধু ভাবে, বাঘি শুধু রক্তই নেয়নি, পানিও দিয়েছে। নিকাশ হয়েছে আটকে থাকা তৃষ্ণা।

তৈয়ব মিয়ার বাড়িতে শামিয়ানা টাঙানো। সেখানে কয়েকজন মৌলভী দোয়া-দরূদ পড়ছে। মাখনের মা এক জায়গায় নীরবে বসে। পাবদা ভাবে, ভাইয়ের কী হয়েচে? বাঘি কই? তৈয়ব মিয়া মুখটাকে গম্ভীর রাখেন। ভেতরে ফিসফিসিয়ে কান্নার শব্দ। মুখ খোলার কেউ চেষ্টা করে না।
আমজাদ হোসেন ভাবেন, তৈয়ব ভাইয়ের আরো স্ট্রিক্ট হওয়া উচিত ছিলো। সময়টাকেই দোষ দিতে হয়। কী আর করা!

রুমি বলেন না কিছু—আমি জানতাম। নিজের ভেতরে রাখেন।

খুব সাহসী একজন পুঁথি লেখক সে তার শিষ্যকে বলে, এটা নিয়ে লেখা যাবে না।
প্রেমের পুঁথিতে যে নান্দনিক শর্ত থাকে, এই আখ্যান তা সমর্থন করে না।

লেখকের কৃতজ্ঞতা: কমরেড আমজাদ হোসেন, মোহিত রায়, মেহদিউর রহমান টুটুল।

 

পত্রিকা: অনিন্দ্য। গ্রন্থভূক্ত: বাঘের ঘরে ঘোগ

Meghchil   is the leading literary portal in the Bengali readers. It uses cookies. Please refer to the Terms & Privacy Policy for details.