:
Days
:
Hours
:
Minutes
Seconds
Author Picture
আহমেদ নকীব

কবি

মৃত্যুর গানের বোঝাপড়া
শিল্পকর্ম: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

মৃত্যুর গানের বোঝাপড়া

সাতটি মাত্রায়, মৃত্যুর গান নামে, কবিতার ঐকতানে সমৃদ্ধ লেখাগুলো, গানের সুরের আশ্রয়ে না গিয়ে যেভাবে অনুভূতির চূড়ান্ত দশাকে যোজিত করেছে, তা একজন কথাশিল্পীর মূল মাধ্যম না হলেও তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত টানাপড়েনের আর্তিকে মূর্ত করে তুলেছে, অত্যন্ত সরল ও স্বাভাবিক দ্যোতনায়। তবে সম্পূর্ণ অর্থে তা ব্যক্তিগত অনুভূতির নিগড়ে আর বন্দি থাকেনি; যদি কোনো মানুষের অল্পবিস্তর বেদনাবোধের সংবেদনশীলতা থেকে থাকে, এই লিখিত আর্তিগুলো পাঠ করলে কম-বেশি তাকে আক্রান্ত হতে হবে এবং তা পাঠকের মননে চিরন্তন মৃত্যুর যে ভাবনা, আরেকবার জাগিয়ে তুলবে। এই সংক্রমণের ধারাপাতের খাঁজে খাঁজে শুধু যে মৃত্যুচিন্তাই শাসনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে তা নয়, এই জর্জরিত মানস তা একজন কথাশিল্পীর আর অন্য কোনো মাধ্যমের শিল্পীর-ই হোক, একটা দ্বান্দিক অবস্থান যে এই অনুভূতিমালার ছত্রে ছত্রে অম্বিত হয়েছে তা সমান্তরালভাবে অনুভব না করে এই বলয় থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। বিশেষ করে মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর যে স্বগতোক্তি, ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার বা নতুন প্রজন্মের অকালমৃত্যুকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবোধের যে সংক্রমণ কিংবা অন্য প্রাণের সঞ্চারে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, তার কণায় খচিত এই ভাষিক অবয়ব। আর সে ভাষা শুধু ভাষার রকমারি ছন্দে আর নান্দনিক ঐশ্বর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার জন্য দাঁড়িয়ে যায় না, কবিতা-ভাষ্যের অতিরিক্ত চাতুর্যে না জড়িয়ে একজন কথাশিল্পী শুধুমাত্র তাঁর প্রখর অনুভূতিকে আবহমান কাব্যভাষার আঙ্গিকে ব্যক্ত করেছেন। কাব্যতত্ত্বের ব্যাকরণের দর্শন খোঁজ না করে শুধু চিরন্তন এক সত্যভাবনা ‘মৃত্যু’ এই চূড়ান্ত নৈয়ায়িক দশাকে নিজের ভেতরে, কখনও মননে, কখনো মনোদৈহিক আকরে এই আর্তনাদ মূর্তমান আকারে ছন্দিত হয়েছে—অসময়ে মোমের আলো আজন্ম নেভায় উত্তরাধিকার — একজন কথাশিল্পীর যৌক্তিক উচ্চারণ এখানে যেন ভেঙে পড়েছে কাব্যআশ্রয়ী অবয়বে; কিংবা প্রজন্ম প্রবণতায় আমি ডুবে যাই এই আক্ষেপ লক্ষ্যে লতিয়ে উঠলেও তাঁর মন জন্মান্তরবাদী অভিপ্রায়ে পরজন্মে যেন বৃষ্টি ফোঁটায় জন্মাই এই অনুভবে আবারও অন্য এক সচলতায় ফিরে আসতে চাইছে।

মৃত্যু যেন আরও কোনো বড় সত্য বেঁচে থাকা থেকে। কথাশিল্পীর শিল্পমানসে যেভাবে চরম সামাজিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে দেখার প্রয়াস চোখে পড়ে, এই সপ্তক খণ্ডগুলোতে এরই প্রতিবেশ আবর্তিত হয়ে দেখা যায় বারংবার। তাঁর দ্বন্দ্ব-সংক্ষুব্ধ মনোসংঘটন বলছে, শত্রুর পরিবেষ্টনের ভেতরেই মৃত্যুর অনুভূতি কিংবা মৃত্যুকে স্পর্শ করার অভিজ্ঞতার সাহস নিয়ে বেঁচে থাকা কেননা মেয়েগুলো বেশ্যা হয়ে গেছে/বেশ্যারা ভুলেছে রতিবিলাস/ যাদের প্রেমিকা হওয়ার কথা ছিলো হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন বন্ধু। আর বন্ধু? ধাপে ধাপে শত্রু হচ্ছে। প্রেমিকারা বন্ধুর ছদ্মবেশে শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে যা ঘটছে— গদ্য-ভঙ্গির সরাসরি আবহে একটা কনফেশনাল অভিজ্ঞান বিস্তৃত হয়েছে, কোনো বাতাবরণ ছাড়াই। সব প্রাণজ স্পর্শযোগ্য, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির পরশ একটু দূরেই যেন রয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর গানের রচয়িতার কাব্যিক সুষমায় মণ্ডিত মন যেন এই পার্থিব রোদ আর ফুলের আসরের একটু দূরেই অবস্থান করছে; তার হাঁটা থেকে, দাঁড়িয়ে থাকার পরিক্রমণ থেকে মৃত্যু এদেরকে দূরত্বে ঠেলে দিচ্ছে; মৃত্যুর ছায়া যেন আরও বড় কোনো শক্তি নিয়ে তার ঐকান্তিক ইচ্ছার প্রাণশক্তিকে আবৃত করে রেখেছে—জীবন সেখানে তুচ্ছাতিতুচ্ছ এক গরিমা। তার মৃত্যুর তেজ এত দীপনশক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে, ঘুম না আসার তাড়না এখানে চক্ষুহীন মুখাবয়ব দিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন— আঁতকে ওঠার মতো একটা চাপ যেন আমাদের শরীরে সঞ্চারিত হয়। মৃত্যুর গানের মূর্ছনা একবার বেদনার্ত ভঙ্গিতে আবার ভয়ঙ্করতম এক মন নিয়ে জাগরিত হয়ে উঠেছে। তাঁর শিল্পসত্তা মৃত্যানুভূতির সাথে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়েছে মৃত্যুর দূতকে চড় কষে দিয়ে আর এই উন্মাদাশ্রয়ী মানস মৃত্যুর পর সুদৃশ্য পিরিচে ফুলকেক হয়ে ফিরে আসার জন্য আকুল হয়ে আছেন। মৃত্যুকে অতিক্রমণের এক হাহাকার দানা বেঁধে উঠেছে আরেকবার।

বস্তু ও প্রাণসত্তা যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে কোনো যৌগিক প্রাণসত্তার, কোনো পৃথিবীর নিচয়ে স্থানান্তরিত হতে চায় সে যেন শেষমেশ মনুষ্যশরীর ও জৈব সংঘটনের আদল পেতে থাকে। প্রকৃতির সমস্ত কেলাসিত রঙ যেন কথকের যুগ যুগ ব্যাপী— মৃত্যুকে ঘিরে যে স্পিরিচ্যুয়াল নৈবেদ্য আবর্তিত হয়েছে এই আবহ তার লেখায় ভর করেছে সরাসরি— ঈশ্বর, মৃত্যুদূত এই শব্দসমূহ অন্তরকে রাঙিয়ে তোলে আর মৃত্যুর প্রতিরূপ যে বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্বের যে ছন্দস্পন্দন তা এতটাই গাঢ় যেন চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়ের নিয়মে সেই সুর জমাট হয়ে বাঁধা পড়ে ইতিহাসের আয়তনে। মৃত্যুর বোধকে কাছে নিয়ে শিল্পী একা, ভাস্করের আদল-দেয়া চরিত্রের মতই একলা চোখের পারমিতা— চুন-সুরকির রঙে প্রাচীন নিঃস্বতায়, চিত্রলতায় প্রাণ পেয়েছে, তা যেন স্পর্শযোগ্য, দৃশ্যগ্রাহ্য, হৃদয়ে ঘনীভূত হয়ে ওঠা এক মৃত্যুর রঙ।

মৃত্যুর গান চতুর্থ স্তবককে ভেঙে টুকরো করে ফেললে একজন চিত্রশিল্পী কিংবা ভাস্করের শিল্পীমন এই কথাশিল্পীর মনের সাথে যৌগিক স্বরের এক ব্যঞ্জনায় নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে:

শিল্পী একা,
তাঁর অংকিত পারমিতা তাঁর পাশেই একলা দুচোখের
কথাশিল্পীর আখ্যান কাব্যাখ্যানের সুরারোপে
একটা ছবির আদলে স্থির— শেষমেশ তা এক যুগলের বিমূর্ত চিত্র; কথাশিল্পী যেন চিত্রকরের তুলি হাতে তুলে নিয়েছেন:
সুপ্রাচীন চুন-সুরকিতে আঁকা তাঁর পারমিতার মুখ: স্পর্শযোগ্য,
দৃশ্যগ্রাহ্য, সব ইন্দ্রিয় যেন একীভূত হয়ে এক নিকেশ চালিয়ে যাচ্ছে
পারমিতার স্তনবৃন্ত দুটি যেন রক্তজবার জমাট রঙ
শুষে নিয়ে আকার পেয়েছে,
সফেদা ফলের গোলাপি দানার কোমলতা দিয়ে তৈরি তার ঠোঁট
তাঁর পারমিতার ঊরুসন্ধিতে তীলক কাটা— নিবিড় ইন্দ্রিয়ঘন
শব্দপ্রলেপ, নীল হংসডানার ঝাপটা সরোবরে, এতোটা
রঙিন তার দেহসৌষ্ঠব
আঙুলগুলো করমচার মতো গুটিসুটি— এই যে নিবিড়তা
মেশানো আঁচড়,

সমস্ত রঙিন, প্রাচীনতায় সিদ্ধ এই ভাস্কর্যের ফলাফল দুর্দান্ত
ভাবে রঙিন কবিতাকারে চিত্রশিল্পের কারুকাজে খচিত কিন্তু মৃত্যুর প্রতিতুল্য এই বিমূর্ত আনন্দঘন আরকে ফুলের সুরভি জন্মায় না।

শুধু কাব্যানুভূতিকে এখানে প্রখর করা নয়। মৃত্যু এক চিরন্তন রূপের আদলে তাঁর কথার গুচ্ছে রোপিত হয়েছে। কাব্যভাষার অলিগলি খুঁজতে না গিয়ে শুধুই যদি উপলব্ধিজাত মনীষার কথা বলা যায়, তাহলে এই লয় নির্বিবাদে পাঠককে ঘায়েল করবে, মনকে বেদনায় জর্জরিত করবে, কোনো রকম অহং-এর সংঘর্ষ ছাড়াই; কবি নয়, লেখক নয়, ভাষাবিদ নয়— সে শুধু মর্মন্তুদ ভাবনায় সেলিম মোরশেদের এই কথনের সাথে জড়িয়ে যাবে।

অন্ধকার, রাত্রি এই সচল চিরন্তন শব্দগুলো মৃত্যুর সমার্থক হিসেবে উঠে এসেছে বার বার। একজন কথাশিল্পীর উচ্চারণে, মৃত্যুর অনুষঙ্গে, এই চিরন্তন সহজ সাবলীল শব্দগুলো চলে আসাই স্বাভাবিক আর যখন তা নিজের মৃত্যুর অনুভূতির ছন্দে আছড়ে পড়ছে। কাব্যকৃতির গুণাগুণ কিংবা উৎকর্ষতার হিসাব এখানে অবান্তর। খুব সাবলীলভাবে রূপক এসেছে, প্রতীকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, কখনও তা ব্যক্তিগত বেদনার রসকে ঘন করে তুলেছে। তাঁর শিল্প-মানস আদিম মানুষের প্রতীকে পরিণত হয়ে নতুন প্রজন্মের সংগ্রামকে অন্য এক প্রতীকের গূঢ় অর্থে প্রকাশ করছে, যেন সেই প্রজন্ম কাঠবেড়ালির কোমলতায় চঞ্চলতায় জোয়ারের মধ্যে ঝাঁপ দিচ্ছে, তারা ভাটার টানে পিছিয়ে যাচ্ছে, সাঁতরে আসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা, আদিম মানুষ ওদের জন্য পথ চেয়ে চেয়ে অপেক্ষমাণ, তারা হয়তো আর তীরে ফেরেনি— মৃত্যুর সমার্থক যেন এই লেখনী স্তবক।

মৃত্যুর গানে মৃত্যুর কথা বলা ছাড়া আর কীই-বা থাকতে পারে? শুধু বেঁচে থাকার লড়াই হয়তো থাকতে পারে! এত প্রতিকূলতায় বেঁচে থাকাটাই অস্বাভাবিক নয় কি? মূল কথা আমাদের সময়ের একজন পাঁড় কথাশিল্পী যখন কাব্যিক স্বরে কথা বলতে চান এবং তাঁর মূল মাধ্যমের পাশাপাশি, তা নিয়ে যদি তাঁর মধ্যে কোনো বাগাড়ম্বরতা না থাকে, এই মাধ্যমকে ঘিরে তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো টানাপড়েন লক্ষ না করা যায় তবে তা একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে। তাঁর দিকে আলোর প্রক্ষেপ একটু আলাদাভাবে নিবদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। আমাদের মনে দোলা দেয় কোন ব্যক্তিক বা অতিব্যক্তিক তাড়নায় তাঁর এই মৃত্যুর গানের ভাষা গদ্যভাষাকে ছাপিয়ে বা গদ্য ভাষায় নিহিত তাঁর কাব্যতৃষিত মন ছটফট করে উঠেছে। কথাশিল্পী সেলিম মোরশেদের জন্য এটা একান্তই আলাদা দুনিয়া। প্রথমে যা অলক্ষে ছিল, তাঁর কথাসাহিত্যের তুমুল কর্মব্যাপ্তির পাশাপাশি, বিশেষ করে ছোটগল্প, পাল্টা কথার দর্শন সম্বলিত গদ্য, ছোট ছোট স্বগতোক্তিমূলক প্রতিক্রিয়াসমৃদ্ধ মতামত (চিত্রশিল্প), এমনকি সাক্ষাৎকারগুলো যা তাঁকে একটা অধিষ্ঠানের উপর দাঁড় করিয়েছে, একজন পুরোদস্তুর কথাশিল্পী যে তাঁর একান্ত ব্যক্তিক অনুভূতিকে সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মাধ্যমে প্রকাশ করার সুপ্ত অভিপ্রায় ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা আলাদাভাবে লক্ষণীয় কেননা এ নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চাশা নেই। আর এই মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে প্রতিযোগিতা যখন হররোজ চোখে পড়ে, এই কসরত কথাসাহিত্যিক সেলিম মোরশেদ সত্যিকার অর্থেই আলাদা। এই পরিচিতি যেন একান্তই তাঁর নিজের সাথে বোঝাপড়া। তবে এই বোঝাপড়ার মাঝেও তাঁকে দ্বন্দ্বে জর্জরিত হতে দেখা যাচ্ছে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেলিম মোরশেদের এই অনুভূতিমালা আর কথনের সৃষ্টির পেছনের কার্যকারণ নিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলাম; সমসাময়িক শিল্পী হিসেবে একটা অন্ধ ভালোবাসার প্রেক্ষিতে বলছিলাম— একজন শিল্পী কিভাবে তাঁর স্বমাধ্যমের নিকেশকে অন্য একটা মাধ্যমে সঞ্চালিত করেন? বিশেষ করে কথাসাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত কেউ যদি কবিতা অথবা চিত্রশিল্প বা অন্য মাধ্যমে তাঁর অনুভূতিকে প্রকাশ করে থাকেন এই স্থানান্তরের হিসাবটা আসলে কী?

আমরা কম-বেশি সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের পারস্পরিক আদান-প্রদানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে জ্ঞাত। যে কোনো শিল্পীই একটা মাধ্যমকে কেন্দ্র করেই তাঁর মনোনিবেশিক সাম্রাজ্যকে বিস্তারের মূল প্রকরণ হিসেবে বেছে নেন। আর আমরা যদি সাহিত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাকে লক্ষ করি একটা ব্যাপার লক্ষণীয় এই ধারার শিল্পীরা একান্ত নিজস্ব মাধ্যমের সীমানা আর মানেন না বা পাশাপাশি কেউ কেউ তার স্বমাধ্যমকে আঁকড়ে ধরে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকেন জেদি চারিত্রিক মানসে। সেলিম মোরশেদ অনেকটা সেই জেদি গোত্রেরই একজন— মৃত্যুকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছেন যিনি; এই অমোঘ সত্যের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন; তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে আর থেমে থাকা যায় না তাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবার ইচ্ছায়!

একান্তই ঐতিহাসিক, যখন একজন পাঁড় কথাশিল্পীর হাতে আবহমান কবিতার সুর ধ্বনিত হচ্ছে তা ইতিহাসের বিশেষ দিককেই উন্মোচিত করে। প্রগলভতার চাপ দিয়ে তাঁকে দেখিয়ে দেয়ার ইচ্ছা থাক বা না-থাক, অন্তত এর দিকে আলোর প্রক্ষেপ ফেলার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছা সজাগ হয়ে উঠতে পারে। অনেকেই বলতে পারেন, অহরহই তো একজন শিল্পী বিবিধ মাধ্যমে তাঁর চিন্তনপ্রক্রিয়াকে ব্যাপ্ত করেছেন। এ আবার নতুন কী? তবে আমার কাছে একটা প্রশ্ন প্রায়শই ঔৎসুক্যে পরিণত হয়— একজন কথাশিল্পী, একজন কবি, একজন চিত্রকর একজন চলচ্চিত্রকার তাঁদের মৌলিক মাধ্যমের ভিতরে বসে কিভাবে অন্য মাধ্যমের সুরকে আলাদা করে প্রকাশ করতে পারেন? কিভাবে এক মাধ্যমের প্রবণতা অন্য মাধ্যমের প্রকরণের ভেতর জ্বলে ওঠে?

এখানে সেলিম মোরশেদ একজন কথাশিল্পী হিসেবে কাব্যিক অনুভূতি প্রকাশ করছেন, তবে তো তাঁর কথাসাহিত্যের মূল প্রবণতাকে বুঝে উঠতে পারার একটা মানসিক সংঘটনকে প্রখর করে তুলতে হবে। হ্যাঁ, তাঁর কথাসাহিত্যের মূল প্রবণতাকে যদি এই অনুভূতিমালায় ধরতে চাওয়ার চেষ্টা করা হয়। খুব গুপ্তভাবে সাহিত্যিক আকরে যা ধরা পড়ে— তা হল তাঁর দ্বন্দ্বে জর্জরিত মানস-হৃদয় কিংবা নিদেনপক্ষে বিষয়কেন্দ্রিক মনোসমীক্ষণের আর্তি। বিষয়াঙ্গিক নির্ভর লেখার মূল প্রবণতা হচ্ছে তা কোনো এক কেন্দ্রে অঙ্গীভূত হওয়া, যদি ক্ষুধার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনো কথাসাহিত্যের প্রকরণ গড়ে ওঠে। এখানে কাব্যানুভূতির আরকে মৃত্যুর মতো বিষয় জন্ম হয়েছে আর কবিতার শ্বাশত ভাবপ্রকরণকে জিইয়ে রেখেছে। একটা ব্যাপার এখানে লক্ষণীয় যে, মানুষ তাঁর কথাসাহিত্যের মূল চরিত্র হিসেবে বার বার এসেছে, এই অনুভূতিমালায় সেই মানুষের একান্ত অন্তর্নিহিত মন যেন বার বার কথা বলে উঠেছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে একটা দূরাশ্রয়ী ক্ষেপ-আক্ষেপ একটা ঘনঘটায় সামিল হয়েছে; কথাসাহিত্যে শুধু যা জনসামষ্টিক মণ্ডলকে ঘিরে একটা টানাপড়েনে সংক্ষুব্ধ থেকেছে আর এই কাব্যাশ্রয়ী মননে তা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়-কেন্দ্রিক অভীপ্সার মানসে ব্যাপ্তি পেয়েছে। যদিও নামে তা বিষয়কেন্দ্রিক, তবে তার কান্না বিষয়কে ছাড়িয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে নিজের সাথে কখনও সামাজিক অপরাপর মানস সংঘটনের সাথে। মৃত্যু তো তাঁর কাছ থেকে নতুন প্রজন্মকে ছিনিয়ে নিচ্ছে— আখ্যানের ছোট ছোট খণ্ডে, কবিতার গাঠনিক আকারে তাঁর আহাজারি বার বার কথা বলে উঠেছে।

শুধু কাব্যানুভূতিকে এখানে প্রখর করা নয়। মৃত্যু এক চিরন্তন রূপের আদলে তাঁর কথার গুচ্ছে রোপিত হয়েছে। কাব্যভাষার অলিগলি খুঁজতে না গিয়ে শুধুই যদি উপলব্ধিজাত মনীষার কথা বলা যায়, তাহলে এই লয় নির্বিবাদে পাঠককে ঘায়েল করবে, মনকে বেদনায় জর্জরিত করবে, কোনো রকম অহং-এর সংঘর্ষ ছাড়াই; কবি নয়, লেখক নয়, ভাষাবিদ নয়— সে শুধু মর্মন্তুদ ভাবনায় সেলিম মোরশেদের এই কথনের সাথে জড়িয়ে যাবে। আর সে অনুভূতির সহজ প্রকাশ, চিত্রশিল্পের রঙের জমাট খেলা, একটা বিপন্ন দশায় মুচড়ে উঠেছে, এই মৃত্যুকে আরেকবার চিহ্নিত করার প্রয়াসে। মৃত্যু শেষ পর্যন্ত বিষয়াঙ্গিকে আটকে থাকেনি। নিজের সাথে কথা বলা, জয়-পরাজয়ের সন্ধিক্ষণ, এমনকি তাঁর কথাসাহিত্যে যা সাবলীলভাবে বার বার ধরা দিয়েছে, বিচ্ছিন্নতাবোধের কান্না— এখানেও তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। মৃত্যুর কথা উঠলেই বেঁচে থাকার কথা উঠে আসে; বেঁচে থাকার কথা উঠলেই সংগ্রামের কথা উঠে আসে আর সংগ্রামের কথা ব্যাপ্তি পেলে জয়-পরাজয়ের মীমাংসার দ্বন্দ্ব প্রকটিত হয়ে ওঠে।

Meghchil   is the leading literary portal in the Bengali readers. It uses cookies. Please refer to the Terms & Privacy Policy for details.

error: Content is protected !!