:
Days
:
Hours
:
Minutes
Seconds
Author Picture
সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

কথাসাহিত্যিক

সেলিমের জঙ্গনামা
শিল্পকর্ম: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

সেলিমের জঙ্গনামা

রাত ভেঙে আমরা জেগে উঠি, আরেকটা দিন, এইভাবে দিনের পর দিন রাত ভেঙে।

এই জাগরণের ভেতরেও আরেক জাগরণ থাকে—এখানে দেবতা আলাদা। আর কে না-জানে, দেবতার জন্য থাকে স্তব ও স্তুতি এবং বলা বাহুল্য যে, বিরুদ্ধকথা, মন্দ আলাপও জুড়ে বিস্তার করলেও ক্ষুদ্র জনসমাগম আরো ক্ষুদ্র হয় আর দেবতার আশ্চর্য হাসি হর্ষ ও বিষাদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে অন্য কথা কয়।

এই তো, ট্রেন থামার ইস্টিশানটা নিরালা ছিল, ঘুটঘুটে অন্ধকারে ইঁদুরের দৌড়ানি, ঝাঁপানি ছিল। তবু জোনাকির ঝিকিমিকি ছিল,—দূরে কোথাও কোনো কুটিরে ভালোবাসার আয়োজন ছিল এবং সেখানেও নারীটির ঘরে রাত্রি।

মানুষটা শরীরভর্তি জোনাকি নিয়ে এই অন্ধকারে সাঁতার করতে করতে অথবা চোখের রঞ্জনরশ্মি নিক্ষেপ খুঁজে পেল নিজের আয়তন।

এখানে সৌন্দর্য আছে গল্পে; গল্পের শেষ সৌন্দর্য নিয়ে মানুষটা শেষ ইস্টিশানে—এইখানে যেন অন্ধকার ভেদ করে নিজের জারি রাখল। বুকের কান্না চেপে সাহস যোগায় নিজের। যে আয়নাটা বুকের ভেতর থাকে, তাতে অনেক মুখ প্রতিফলিত এবং সৌন্দর্য জায়মান।

সৌন্দর্যের ভেতর আলোকবিস্তার আছে; আলোর ভেতরে অবলোকনের প্রতিশ্রুতি আছে।

মানুষের গল্প তো মানুষই লিখবে।
দেবতা হয়ে উঠবে মানুষ। আর মানুষের ভেতর থেকে উন্মোচিত হবে দেবতার মুখ।

গল্পে সৌন্দর্য দিতে পারে কেবল সে, দেবতা যে, কখনো ক্রোধ-হিংসায়, হিংস্রতায় খারিজ করতে পারে না সে অন্যের কথন।

সকলের কথনই মিলেমিশে নানা সৌন্দর্য নির্মাণ করে চলে: এই সূত্র ক্রমে বিকশিত হতে থাকে, পাল্টে যেতে থাকে পারিপার্শ্ব।

মানুষটা টুইনচাকে দেখে ফেলল। হেমাঙ্গিনীর জন্য তার অশ্রুজল জমা রইল।

আর্দ্র চোখে শেষের পর আরেক সূচনা, স্তব্ধতার পর কলরব, নগ্নতার মধ্যে আকার, ভালোবাসার মধ্যে অব্যয় ধ্বনি—একসময় সূত্র থাকে না, উৎস নিয়ে মাথার ভেতরে তোলপাড় হয় না।

ধ্যানের ভেতরে যেমন প্রাপ্তি থাকে, অলৌকিকের আশীর্বাদ থাকে, অশ্রুত কথামালার উচ্চারণ থাকে—তেমনি ঠিকমতো, এইভাবেই নিমগ্ন মানুষটা নিশ্বাসে টের পায় উৎসবের।
এই উৎসবে দেখা মেলে অনেকের। মিলিত উৎসবে তখন হৈ-হল্লা, তখন আলোড়ন তখন প্রাণের কথা, এইভাবে এক নতুন সৌন্দর্য নির্মাণের পালাগান, যাত্রা, আখর।

এইভাবে না-হয় অনুভব করা গেল, একান্ত নিজস্ব বিষয় কিন্তু তারপরও কথা থাকে। বলতে হবে কথা, যদিও নীরবতার চেয়ে ভালো কোনো উচ্চারণ থাকতে পারে না। এবং আশ্চর্য যে, মৌনতার ভেতরেও যে সংগীত তা অনুরণিত করতে শব্দযোজনা অতঃপর।

কোন অভিধা উপযুক্ত হবে তাঁর জন্য, তা নির্ণয় করা না গেলেও যদি বলা হয় কথাওয়ালা তিনি বটে, তবে অত্যুক্তি হবে না।

কাহিনির নাম সেলিম মোরশেদ এবং কাহিনিকারও তিনি এক নির্মাতা যিনি। আর কে না-জানে, কথক-ই-ছিলেন গদ্যের আদি উপাসক। গদ্যের উপাসনা সেলিমকে বিমূর্ত করে তুললে সেই কঠিনের এক প্রকাশ দ্যূতিময় ও নির্মম। সেলিম মোরশেদ, তাঁর গদ্য জুড়ে রচনা করে স্বভূমি,—বলা যেতে পারে, গদ্যে জড়িয়ে আছে স্বভূমি; তিনি গদ্য কাতরতায় রচনার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেন নাই এমন জমিটি—যা পাঠে আবিষ্কার করা যায় বটে; একটি স্থানিক পরিধি সেখানে থাকে যার ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় লেখক মানুষটিকে,—কিন্তু কী হয়, তাঁর গদ্য-ভাষা-যতিচিহ্নের প্রশ্রয়ে?—খুঁজে পাওয়া যায়: বিস্তারিত হয়ে থাকে স্বভূমির আয়তন অজস্র অক্ষরপাতে।

কথক বটে সেলিম,—উচ্চারণের মধ্যে, লিখনের ভেতরে দারুণ দাপুটে ও তেজি। তাঁর উচ্চারণে; কথনের রেশে যে বোল ধ্বনিত তা কলমে কী দারুণ গৌরবে অন্তঃশীল থাকে সাদা পাতায়।

আপাদমস্তক শিল্পী। শিল্পীর কোনো দেশ থাকে না; এবং থাকে না হিংস্রতা ও দ্বেষ। সেলিম মোরশেদ নিজের পরিচয় সবচে’ বড় করে তুলেছেন যেমন একজন শিল্পীকে মানায়; অনুদার চারপাশে একদঙ্গল সাহিত্য-হল্লাকারী যখন মাতোয়ারা—এই পাষণ্ড-উপদ্রুত সময়ে তাঁকে ধ্যানী এক শিল্পীর মতো সব থেকে ক্রমে ঊর্ধ্বে উঠে যেতে দেখা যায়। যাবতীয় পরশ্রীকাতর আক্রমণের শিকার হয়েও দেখা গেল, অপরের কুশ্রী রূপের ভেতর শুধুমাত্র শ্রী-টুকু তিনি নিয়েছেন।

না, সেলিম মোরশেদকে কেউ চিঠি লেখে নাই, যে চিঠিতে থাকবে আশাপূর্ণা; তিনি অপেক্ষা করেন নাই সেই চিঠি যা উত্তাপময় অক্ষরসম্পন্ন এক ভবিষ্যতের হাতছানি। অকাতরে তিনি রুমাল দুলিয়েছেন আর উড়ে গেছে অজস্র কবুতর অথবা হয়তো শঙ্খচিল—বলে গেছে, আবার ফিরে আসবে। অন্তর্ধান ও প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে তাঁর স্বভূমি আরও বিস্তৃত হতে থাকে। এবং এখন তা হচ্ছে, সেলিম মোরশেদে আঁকা এক মানচিত্র,—যে ভূগোলের পরিচয়, আবহাওয়া, ঝড়-প্রলয়, বৃষ্টি-বজ্র সৃষ্টি করেন যেমন তিনি, তেমনিভাবে মানুষের মানচিত্র অমূলক নয়। স্বভূমি তাঁর এই মানুষের মানচিত্র। এই মানচিত্রে মানব ও দানব পাশাপাশি থাকে।

এখানে PRELUDE এই যে, তা সেলিম মোরশেদকে নিয়ে; এবং এই মূর্চ্ছনার প্রয়োজন ছিল। এই মূর্চ্ছনা ছড়িয়ে দিতে দিতে অনেক মুক্তা কুড়িয়ে নিলাম সত্যি—আর যে তোমরা পেলে না কিছু, দেখলে অন্তঃসার সব-ই তাদের জন্য আপাতত করুণা রইল।

এখন সময় মন্দ যাচ্ছে। চোরেরা ছাত্রদের পাঠদান করছে। জাতের নামে চলছে বজ্জাতি। সাহিত্যসমাজে পুরস্কারের অর্থ দাতা ও গ্রহীতা ভাগ করে নিচ্ছে। কলম বাদ  দিয়ে মুষ্ঠাঘাতে সহযাত্রীর চেহারা রক্তাক্ত হচ্ছে। লেখক নারী হলে যোনিসর্বস্ব চেতনা দান করছে সাহিত্যের বড় ভাইরা। দুর্নীতি-রাজনীতি-অর্থনীতি সাহিত্যের বিষয় না হলেও সাহিত্যিকের চশমাধারীদের কবচ হয়ে উঠেছে।

সেলিম মোরশেদ, তাঁর গদ্য জুড়ে রচনা করে স্বভূমি,—বলা যেতে পারে, গদ্যে জড়িয়ে আছে স্বভূমি; তিনি গদ্য কাতরতায় রচনার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেন নাই এমন জমিটি—যা পাঠে আবিষ্কার করা যায় বটে; একটি স্থানিক পরিধি সেখানে থাকে যার ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় লেখক মানুষটিকে,—কিন্তু কী হয়, তাঁর গদ্য-ভাষা-যতিচিহ্নের প্রশ্রয়ে?—খুঁজে পাওয়া যায়: বিস্তারিত হয়ে থাকে স্বভূমির আয়তন অজস্র অক্ষরপাতে।

এই নষ্ট সময়ে ভ্রষ্ট বন্ধুত্বেও ক্ষত-বিক্ষত হয়েও  নিজস্ব রক্তপাতের ভেতর ভিন্ন এক জমিন খুঁজে নিয়েছেন—ইদানীং সেলিম মোরশেদ।

ফিরে যাই পেছনে; মনে করতে পারি, ‘কাটা সাপের মুণ্ডু আপনি চলে’ বলে লেখা গল্পটিকে—প্রকাশিত হয়েছিল মধ্য-আশিতে।

হেমাঙ্গিনীকে সর্পচক্ষে আখ্যায়িত হওয়া দেখি; তিনি কি সাপের চোখের ভেতর দিয়ে দেখেছিলেন যে,—

‘গরম উনুনে ন্যাতানো কলমি শাক কি ভাবে ফড়াৎ করে গলা গলিয়ে পেটের নাড়িতে পেঁচিয়ে যায়।’

উদ্বুদ্ধ হয়েছিল সাপ অথবা সর্পিলাকার ক্ষুধার মতো জ্যান্ত শয়তানের বাচ্চা—হয়েছিল সমর্পিত এবং যোগান হয়েছিল ক্ষুধার। এবং তখন,—

‘নাকের ওপর দু’টো মশা সঙ্গমে বিভোর হল শূন্যে উড়ে উড়ে।’

হেমাঙ্গিনীর সাপ দেখা কিংবা সাপ দেখছে যেন সেলিমের কলমের বিন্দুর মতো চোখ দেখতে থাকে বলেই মন্দ্র কণ্ঠ শোনা যায়—লেখকের ঠোঁট নড়ে;

‘বিজ্ঞান বলে সাপ মাঝেমধ্যে খোলস ছাড়ে।
নির্মমভাবে দেশপ্রেমিকদের হত্যা করা হয়েছে।
সর্বোপরি সূর্যের বয়স দুই লক্ষ সহস্র বছর আর অফেন্সকে বেস্ট ডিফেন্স এখন।’

লেখকের চোখ, ঠিকরে পড়া জ্যোতি রশ্মি ভেদ করতে করতে অন্তর্ভেদী পৌঁছে যায়।

সেই পর্যন্ত—সাপটিকে খামচে ধরার পর

‘তার হাতের ভেতর জমাট বরফের ঝটপটানি চরম ক্রুদ্ধতায়।’

লেখকের বিবেচনা,—তাঁর সত্য হেমাঙ্গিনীর যাপিত জীবনের আরেক সত্য হিসেবে প্রচারিত হল: ভয়ঙ্কর সাহসী হলেই খেতে পাওয়া যায়।… দাঁতে কেটে গালে লবণ ছিটিয়ে, অতি ধীরে চিবিয়ে চিবিয়ে খে-লো।

অন্তর্ভেদী চোখ ঘুরতে ঘুরতে থাকে।
লেখকের চোখ,—সর্পিলাকারে দৃষ্টি প্রক্ষিপ্ত হয়ে চলে,—হয়ে ওঠে সুতীব্র—কলমের ডগায় সেই চোখ লেখকের।

যা দেখেছে লেখক,— করেছে অবলোকন,—তাই শেষ পর্যন্ত পাঠকের জন্য তৈরি নতুন এক নয়ন,—অতিরিক্ত এক জগৎ চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো—তাতে লেখক দেখান এই ভাবে, যে,

‘হেমাঙ্গিনী কাটা মুণ্ডুটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ঠাণ্ডা মাটিতে, বহুদিন পরে ঘুমুতে চাইল নিশ্চিন্তে।
তখন গভীর ঘুমের ভেতর হেমাঙ্গিনী জেনে গেল, কাটা উরঙ্গের মুণ্ডুটা হেমাঙ্গিনীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত, এক পাক পৃথিবীর মত ঘুরে, জ্বাজ্জ্বল্যমান খুপরি ছেড়ে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে।’

এখানে থামতে হয়।
কথা বলার ক্ষেত্রে, সেলিমের ডায়ালেক্ট খুঁজে পাওয়া গেল ‘আপনি চলে’—এই ঝোঁকের ভেতরে এই বোলটি পরিষ্কার হয়ে লেখকের জাত চিনিয়ে দিল।

উত্তরহীন হয়ে পড়ি যখন দেখা হয়ে যায় গ্রন্থিক সেলিম মোরশেদ এই নামটি বিসর্জন দিলেন। ডায়ালেক্টের মধ্যে শেকড়ের দিকে ঝোঁক তা যেন অবলীলায় শিখরের দিকে ছুটল। জানি না, অফেন্স-এর বদলে তাতে কী ধরা পড়ল ডিফেন্সমূলক প্রতিক্রিয়া। সেলিম মোরশেদ জেনে গিয়েছিলো সাবলটার্ন উপসংহার এবং তখন, শুরু হয়েছিল হিস্টরিওগ্রাফিক সাবলটার্ন মাতামাতি, অন্যত্র। আবার দেখলাম, সুব্রত সেনগুপ্ত ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ!

উৎপাদন ব্যবস্থা, সমাজকে যে অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল, তা থেকেই এক প্রতিক্রিয়া সুব্রত সেনগুপ্ত: চেতনার শেকল, বৃত্তবন্দি এই শেকল হঠাৎ বিচূর্ণ হয়েই তো এনাটমি পঠন-গড়ন-ক্ষেপণ শুরু করলেন সেলিম মোরশেদ। অনিবার্যভাবে, সুব্রত সেনগুপ্ত উপলক্ষ না হয়ে অন্য কোনো দিশা মিলল না। সমাজের আক্রমণ থেকে রাজনৈতিক আক্রান্ত মানুষ কীভাবে পৃথক হয়ে ওঠে যে, নিজের মানসিক অস্থিরতার মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার কোনো যোগ নিজে থেকে দেখে না সুব্রত।

সুব্রত, বঙ্গসমাজ জয় করতে না পারলেও বিবিধ রাজনীতিস্পৃষ্ট সমাজদংশিত এক উপাখ্যান যেন সুব্রত-ব্যবচ্ছেদ। গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বে আদিম সংস্করণে, প্রথম দেখায়, গল্পের শরীরে ফটোফ্রেম জুড়ে দেয়া হয়েছিল এই পরোয়ানা দিয়ে যে, যার যার ছবি সেঁটে দেয়া হবে তো কোনো ফারাক পাওয়া যাবে না।
গল্পের সেই প্রকাশিত চেহারা ছিল দুর্ধর্ষ—জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন সেলিম।

কিন্তু হায়, সেলিম ফটোফ্রেমটা সরিয়ে দিলেন তাতে চেহারাবিহীন মানুষের স্বর, তাপ-উত্তাপ, রক্ত প্রবাহ গল্প বয়ানের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলল।

সমাজের কি চেহারা আছে? নাই।
মানুষের? না, তা নাই।— কেবল লক্ষণ প্রকাশিত থাকে।
তাই, লেখক দেখেছেন— আমি দেখি নাই, আবার সুব্রতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নাই—কেবল বর্ণে বর্ণে পরিচয় তবু দেখি যৌনজীবনে একে-একে জুড়ে যাচ্ছে সকলে, কথাবস্তু সকলের এদিক-ওদিক করলেও থাকে ধর্মের মতো শাশ্বত।

বিশেষ পরিস্থিতিতে সমপ্রেমের অধিকারী সুব্রতের মধ্যে যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল—শিশুরা মায়ের নিতম্ব দিয়েই ভূমিষ্ঠ হয়,—তা কেন যেন মিথ্যা মনে হয় না; এই যে মানুষ, মুখে একটা মনে আরেকটা তাদের সম্পর্কে কখনো এমন ধারণা কি হানা দেয় না যে, মাতৃদ্বার নয়—তাদের আগমন ধরণীবুকে পায়ুদ্বার ভেঙে। যথাযথ পদ্ধতিতে, এই সমাজ–সংসার—অর্থনীতিক—রাজনৈতিক মঞ্চে কোনো আবির্ভাব না—কেবলই প্রাদুর্ভাব,—যথাতথা।

সমাজটা, সুব্রত বোঝে; যেহেতু দেবীপ্রসাদ–মাও জে দং–রাহুল সাংকৃত্যায়নকে পড়া হয়ে গিয়েছিল তার। কিন্তু, ইলিয়াস যেহেতু তার কাছে র‍্যাম্বো হয়ে ওঠে, ফলত, ইলিয়াসের কাছ থেকে ট্রিগার তুলে নিল সুব্রত।

সুব্রতের জীবনে মানুষখতম থেকে শুরু করা থেকে INCEST আচার সিঁড়ির ধাপ অতিক্রমের বদলে সরল পথ হয়ে ওঠে।

যে কেউ এবার কাল্পনিক কোনো ফটোফ্রেমে বার বার মানুষের চেহারা পাল্টাই না-কেন, — ইতরবিশেষ হবে না — সকলের মধ্যে সমিল বিদ্যমান এই ক্যাঙারু উৎপাদন ব্যবস্থায়। যথাযথ পথে ও পদ্ধতিতে কোনো প্রকার উৎপাদন হচ্ছে না।

ART IS SUBJECTIVITY,—মশিয়ে সার্ত্র-এর কথা মানতেই হচ্ছে। এই তো কথা, নইলে কি আর সুব্রতের ৪ রকমের ৪ জন বোন থাকে। যে বোন থাকে, সেই তো অন্যের প্রেমিকা।
চেতনার শেকল ছিঁড়লে,—বোনের স্তন দেখে প্রেমিকার যুগলবন্দি যেমন পরিকল্পিত হয় তেমনি বোনের স্তনই হয়ে ওঠে অন্যের প্রেমিকার স্তন। সকলেই স্তনভারে নত হয়।
এই গল্পের মধ্যে যে SUBJECT বহমান—পাঠক, চিনে নেই।

সুতরাং সেলিম মোরশেদের কোনো স্পন্সর থাকে না। এমন কোনো বুকের পাটা থাকে না, যে কিনা পেছনে গিয়ে কামড়-মারা ব্যতীত অন্য সক্ষমতা রাখে না। শত্রুর দল হাঁড়িমুখ করে রাখে আর পেছনে গিয়ে মুখ ভ্যাংচায়।

একদিকে যেমন স্খলিত মানুষ অন্য ধারে নিম্নবর্গের মানুষজন সেলিম মোরশেদের কলমে ধরা পড়েছে। স্খলিত মানুষও তো নিম্নবর্গীয় হয়ে থাকে।

আশির দশকে ইতিহাসমালায় যখন নিম্নবর্গ নিয়ে ব্যাপক শোরগোল,—রোমান্টিসিজমের প্রকাশ থেকে মুক্ত হয়ে সেলিম মোরশেদের সাহিত্যে নিম্নবর্গের অস্তিত্ব জারি থাকে এবং তার-জন্য THEORIZATION -এর প্রয়োজন পড়ে নাই।

সাহিত্যের মধ্যে বরাবরই ছিল নিম্নবর্গের অবস্থান এবং সেলিম মোরশেদের মতো কথাসাহিত্যিকের জন্য সেটা কোনো ফ্যান্টাসি তো নয়ই বরং অনায়াস এক প্রচ্ছন্ন অধিকার।
সেলিম মোরশেদের কলমে নিম্নবর্গ জারি থাকে। নিম্নবর্গের কথা শোনার নাই কেউ, আবার, তাদের প্রাণপাত চিৎকারের মধ্যে অব্যয় ধ্বনি ছাড়া আর কিছু মেলে না।

কে এই নিম্নবর্গ? সেলিম মোরশেদ আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।

চরিত্র পাল্টে যাবেই—তাতে আদি রূপটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কেন্দ্র হতে প্রান্তবর্তীর দূরত্ব থাকছে তবে লেখকের শ্যেনদৃষ্টি এড়ায় না। উদযাপিত সময় এখন,—এর বহমান প্রবাহে চরিত্রহীন একেকটা প্রহর, লগ্ন, সেকেন্ড সব-ই মানুষকে নগ্ন ও মগ্ন করে করে কোন নিরুদ্দেশে চলেছে। অবিরাম অক্ষরপাতের মধ্য দিয়ে এই কালবেলায় সেলিম ‘রেডিয়াম’ হরফে অন্ধকারে আলো তুলে আনেন।

নিম্নবর্গ মানুষের বয়ান, তাদের আকাশ-বাতাস—বেঁচে থাকা সংগ্রাম—ক্ষয়-জয়, তৃতীয় বিশ্বের লেখকের কলম দিয়ে সাদা পাতা ভরিয়ে তুলবে,—এবং তা যে, বিরল এমনটা দাবি করা যায় না বটে, তবে, মানতে হবে, এই যে তলায় পড়ে থাকা মার খাওয়া মানুষ কিভাবে বিস্তার করবে আমাদের গরিবের কলমে তা নির্ণয় করে রেখেছেন সেলিম মোরশেদ।

সমাজের মধ্যলতার মানুষের হতাশামূলক এক ধরনের অহংকার, উন্নাসিকতা, উপরে দেখানো ভালোমানুষটির ভেতর দিয়ে যে এক পলাতক জীবন আছে, প্রতারণা আছে, কাকস্য পরিবেদনার চেয়েও মর্মান্তিক আপনার গোশত-হাড়-মজ্জা চর্বণ-চোষণ আছে—তাকে সচল করতে সেলিমের কলম নিষ্ঠুরতার অগ্নিঝরানো আক্রমণের বদলে পরম মমতায় দগদগে ঘা, ক্ষতচিহ্নকে উপুড় করে দিয়ে লজ্জায় মুখ ঢেকে দিয়েছে আমাদের।

বলি যে, গল্পে লজিক থাকে; কিন্তু সেলিমের কলমে গল্পে-গল্পে লজিকের অধিক থাকে কখনো ম্যাজিক ও মিউজিক। আর তাতে, অন্ধকারে—রাতে অপরাজিতা ফুল নয় বরং অপরাজিতা গাছে ফুল ফুটতে থাকে। আমরা রক্তগোলাপের পড়াশোনা করেছিলাম,—এবার তা উৎরে গিয়ে আবিষ্কার করি, কী রকম এক বিশ্বাসের অঙ্গীকার সেখানে।

অপরাজিতা, আমাকে জিতিয়ে দে বোন আমার, ফুলে ভরিয়ে দে, তরতর করে বেড়ে চারপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়া।

বাস্তবের ভেতরেই অবাস্তবতা থাকে; তাই —

‘নদীর উপর দিয়ে ভেসে আসছে হৈচৈ আর চ্যাঁচামেচি। আজ রাতে যাত্রা ভণ্ডুল মানে এ দলের বিদায় রজনী। শীত আর কুয়াশা বাড়ে। ঠিক সেই সময় স্টিকে শেষ টান দিয়ে বাড়ির দিকে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে থাকে পিন্টু। অপরাজিতা গাছে ফুল ফুটেছে।’

বাড়ি ফেরা > বাস্তবতা
স্টিকের ভেতর দিয়ে দেখা > ইউফোরিয়া
অপরাজিতা গাছে ফুল ফোটা > বাস্তবতা + ইউরোফিয়া।
এইভাবে বাস্তবতার ভেতরে আরেক বাস্তবের প্রহর থাকে।

বাস্তবতার খামচি এমনই যে,—মিনা তাই জানাতে পারল: এমন সংসারে বিয়ে হলে যে বাচ্চা নিতে ভয় হয়। খাওয়াব কী? দেখা যাবে এরপর বাচ্চা নেবার ক্ষমতা হারিয়ে…; বিয়ে করাটাই উচিত হয়নি সন্তান নেবার প্রশ্ন সেখানে কীভাবে আসে?

বাস্তবে-বাস্তবে লড়াইয়ের ভেতরে থেকে, বাড়ি যেতে যেতে শীতরাতে তবু তো অপরাজিতা গাছে ফুল ফুটল।
অবিরাম ঘটে যাওয়া গল্পের ভেতরে আরেকজন মানুষ,—দ্য পার্ভার্টেড হয়েও গোপনে এক উৎস মানুষ শক্তি-সুরা-কামের ভেতরে জেগে থাকে।

আবার দেখা হয়, অন্ধকার শহরের কথামালার ভেতর দিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া যায় ঝাঁ-চকচকে রোদ্দুর যখন অভিমানী মেয়েটি আবিষ্কার করল নিজেকে ঘরের ভেতর; রোদ এসে মেয়েটিকে সূর্যমুখী করলে, অভিমানী চোখের অশ্রুকণা খুঁজে ফেরে বালিকণা। বালিকণা অশ্রুবিন্দু হয়ে ঝরে পড়েছিল, আরো আগে তার জন্য।

সেলিম মোরশেদের গোয়েন্দা চোখ যেন বিবিধ সত্যের উপস্থিতির অন্তরালে একেকটা সত্যকে আঁজলায় ভ’রে নিয়ে এসে বিস্তৃত করে সত্যের অধিক আরেক জগৎ এইভাবে স্রষ্টার শিরোপা সেলিম মোরশেদের। নিজস্ব বিষয় নিয়ে, গড়ে তোলা জগতের ঈশ্বর তিনি, সেলিম মোরশেদ,—সত্যকে ভেঙেচুরে আরেক সত্যের ব্যাখ্যাকার, কথাকার।

সত্য বড় কঠিন, এই সত্যকে ছোট-বড় কেউ, রবীন্দ্রনাথ থেকে সেলিম মোরশেদ, নির্মমতার ভেতরে মমতা ঢেলে দিয়েছেন।

চরিত্র-বিকানো লেখকের দল শেয়ালের মতো চতুর এবং ততটুকু দেখে, এবং পাঠককে দেখানোর জন্য রাজি থাকে যা সমাজ-সংসার-রাষ্ট্রের স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে না।— এক্ষেত্রে সেলিম মোরশেদ ব্যতিক্রম। চলমান স্থিতাবস্থা, বেঁচে-বর্তে থাকার আয়েসি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ রীতি ও স্থিতিকে দোহাই করে কোনো ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা তার শব্দে–বাক্যে- কথায় দেখা হয় নাই।

কথা ওঠে, বিকল্প ধারায় লেখার। অথচ, সংস্কৃতি যখন বিকৃত,—বর্তমান দশায় তা সমষ্টি-স্বার্থ হতে দৌড়ে মুখ ফিরিয়ে নির্দিষ্ট কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের কুক্ষিগত হয়ে মানুষকে সমাজ থেকে আলগা করে রাখছে,—এই কার্যধারায় যারা অনর্থ এক সংস্কৃতি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আয়তন দিচ্ছে, লোকসমাজকে মশগুল-মাতোয়ারা বানাচ্ছে— এহেন নিজ স্বার্থে বলি দেয়া সংস্কৃতি যেন আখ্যায়িত না হয় প্রতি-সংস্কৃতির তকমা নিয়ে—এমন আশংকা রুখতেই ‘বিকল্পধারা’ হিসেবে উদযাপন করতে চায় সেই সংস্কৃতিপীঠকে যা উৎসারিত ও বিকশিত হয়ে আসছে লিটল ম্যাগাজিন ধারণা ও প্রত্যয়ের সংঘাতে, বোঝা-পড়ায় ও বিপ্লবে।

প্রতি-সংস্কৃতি, প্রকৃতপক্ষে, মূলধারার সম্ভাব্য লক্ষণ ও প্রবণতাকে ‘বিকল্প’ লেবেল জুড়ে উল্টে দেয়। মূলধারা উল্টে হয়ে যায় বিকল্প ধারা।

অর্থ-ক্ষমতা সেই সংস্কৃতিকে লালন করে, গোড়ায় পানি ঢেলে পোক্ত করে তোলে যেমন–তেমন সংস্কৃতিধারাকে যা কিনা স্থিতাবস্থার পক্ষে জরুরি এবং আমজনতাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে নানা দুঃখ-কষ্ট-হাসি-কান্না-সুখ-দুঃখ ভ’রে দিয়ে সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে রেখে, ব্যস্ত-ত্রস্ত-ব্যতিব্যস্ত করতে অর্থ-ক্ষমতাধারকদের দুষ্কৃতির পক্ষে এক আড়াল তৈরি করে, — বাতাবরণটা মূল বলে তখন বোধ হয় আর যা কিছু জারি রাখে এই ভাঙনের পরোয়ানা তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতেই বিকল্প বলে ঘোষণা দিয়ে অপপ্রচারে একপ্রকার বিভ্রান্তির কুণ্ডলী দিকচক্র আচ্ছন্ন করে, করে আচ্ছাদিত।

এইসব মুরুব্বিয়ানার বিরুদ্ধে অবস্থান দৃঢ় করেছেন গদ্যে— ও সংকল্পে, সেলিম মোরশেদ; কোথাও কোনো দাসত্ব থাকে না চেতনার।

বিকল্পধারা বলে অভিহিত মূলধারার স্রোতে ভাটার তাগিদেই নানা আয়োজন ও মতলববাজি আছে বলেই যে লেখক তাকে শুধু লিখতে পারলে চলে না বরং তাকে কর্ম হিসেবে লেখালেখিকে এক সক্রিয় সত্তা দিতে হয়।

আমরা সেলিম মোরশেদকে এই চেহারায় পেয়েছি।

কোনো প্রকার আধিপত্যকে নিরঙ্কুশ বলে মান্য করা তার পক্ষে অসম্ভব বলেই সময়ের প্রবাহে  ও আবহে আলোড়িত-তাড়িত-স্পৃষ্ট তিনি অবিরাম অক্ষরপাতের মধ্য দিয়ে এক প্রকার ভাঙনের ডাক শোনান আমাদের— প্রস্তুত যেন থাকি। থিসিস থেকে সিনথেসিস, সব-ই মানুষের হাতে।

কমিটমেন্ট থাকলে খবরের কাগজের পিঠ চুলকাতে হয় না, তাদের ঘোষিত বর্ষসেরা কিংবা অন্যায্য পুঁজির ভিক্ষামূলক পুরস্কারকে মান্য করতে হয় না বরং অন্তর্বস্তুতে বসবাস করে এই ভিখিরিপনার বিরুদ্ধে স্বপ্ন, আদর্শবাদ ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী। এই সবকিছু দুর্মর হয়ে উঠেছেন সেলিম মোরশেদ।

বিকৃত সংস্কৃতির অনিবার্য খাদ্য কিংবা মুনাফার জন্য পণ্যপ্রতিভা না-হয়ে প্রতিরোধ-প্রতিবাদ ও স্বপ্ন দেখার সাহস যোগায় তাঁর লেখা,—কখন যেন ছোবল দেবে সেইসব ঘুণপোকার মতো উপনিবেশের চোয়ালে,— এমন মধুময় বিষমাখা কলমে তিনি রসদ যোগাচ্ছেন তাদেরকে,—যারা জাগতে চায় এবং জাগাতে চায় অপরকে।

সুতরাং সেলিম মোরশেদের কোনো স্পন্সর থাকে না। এমন কোনো বুকের পাটা থাকে না, যে কিনা পেছনে গিয়ে কামড়-মারা ব্যতীত অন্য সক্ষমতা রাখে না। শত্রুর দল হাঁড়িমুখ করে রাখে আর পেছনে গিয়ে মুখ ভ্যাংচায়। সেলিম মোরশেদের জিত এইখানে যে, ভেংচি দিতে থাকা শিরদাঁড়াহীন যাবতীয় জাতকগণ ভেংচিকাটা বদনটাকে মুখশ্রী বানিয়ে ফেলেছে স্থায়ীভাবে।— এইভাবে অপর, আক্রমণকারীও ছদ্মধারী বন্ধু থোতা মুখ ভোঁতা হয়ে ঝুলে থাকে পুঁজির পাহারাদার ল্যাম্পপোস্টের গায়ে।

সেলিম মোরশেদের লেখায় রীতি, ভাষ্য ও মনোবৃত্তি আধাসামন্ত-আধা-পুঁজিবাদী উপরন্তু বিশ্বায়নে জর্জরিত, টেকসই উন্নয়নের গোলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তজ্জনিত পুষ্ট ও বলিষ্ঠ সুবিধাভোগীদের মূল কথা হয়ে থাকে। আঙ্গিক তাঁর কলমে বিষয় হয়ে ওঠে। বিষয়কে আঙ্গিক হিসেবে সাবলীল মনে হয়। সব অসম্ভবই সম্ভব হয়, কোনোভাবেই চমক থাকে না ভাষায় ও আঙ্গিকে, বিষয় ও আঙ্গিকে; বিষয়-আঙ্গিক-ভাষা-চিন্তার দোটানায় কেবল একটিই ছোবল,—প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা!

যারা মনে করে চমক সৃষ্টির আয়োজন বলে কথা; জেনে গেছেন যে, চমক–ঠমক বলে প্রকৃতপক্ষে সর্পকে রজ্জু বলে ভ্রমাত্মক এক সান্ত্বনা খোঁজা তাদের।

সুবিমল মিশ্রের আলোচক অনুপম কাঞ্জিলাল–এর কথা কেড়ে নিয়ে সেলিম মোরশেদ অবলম্বনে বলতে হয় যে, জটিল আঙ্গিকের রচনা কোনোভাবেই গিমিক নয়, প্রথাবদ্ধ ন্যারেটিভ রীতিতে তাঁর দখল যে কী সুদূর তা জ্বাজ্জ্বল্যমান হয়ে আছে শিলা দৃষ্টান্তে; চেনাজানায় কিংবা আমি, মীরা ও সুশীলদায়।

চিতার অবশিষ্টাংশ দেখে ফেললেন সেলিম মোরশেদ। চিতা জ্বালালে পরে ভস্মাধারে ছাই ছাড়াও থাকে এমন কোনো একটা,—কিছু যা নয় শূন্যতা কিংবা পূর্ণতা, বরং অপূর্ণতা। নাভিকুণ্ড পোড়ে না যেমন চিতা-ও জ্বলে জ্বলে কেবল শূন্যতার বিস্তার নয় বরং ছায়ার ছবি শূন্যতায় দেখা হল,—অমাবশ্যা কিংবা পূর্ণিমাতে; শ্রাবণে কিংবা পৌষে।

সাম্প্রতিক ছোটগল্প দু’টি শিবিরে বিভক্ত; ব্যক্ত ও অব্যক্ত। একদল গালগল্পে মেতে আছে, তাতে আমোদের আয়োজন,—আনন্দের মধ্যে মাতোয়ারা থাকা যায়,—এখানে ছাগল-গরুর মতো চলাচল করে, তাদের লেখার জমিনে হেসে-খেলে বেড়ায় ভোঁতা শক্তির মুক্তিযুদ্ধ-রাজনীতি-সমাজনীতি ইত্যাদি ইত্যাদি যেন নরোত্তমের শ্রেষ্ঠ উপহার এই সমাজ-সংসারে আপাত-কল্যাণে। প্রকৃতপক্ষে নিজেদের হাঁড়িকাঠের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে প্রজনন উৎসব তথা জনক পদকপ্রাপ্তির গর্বিত উপসংহার।

ছোটগল্পের আরেক শিবির সেরকম কথা আখ্যায়িত করে যেখানে অর্থবোধক পূর্ণতা এই যে, এস্টাব্লিস্টমেন্ট কখনো হতে পারে না আধুনিকতা, পারে না হতে তিমির বিনাশের আয়োজক, মানুষের জন্য লেখা মানুষের গল্প লেখার প্লাটফর্ম। ছোটগল্পের এই দর্পিত ধারার প্রধান এক গল্পকার, কথাওয়ালা হিসেবে সেলিম মোরশেদ বাঙালি পাঠককে অভিবাদন জানিয়ে আসছেন। পাঠক সম্মানিত হয়ে সেলিমকেও করেছে উদযাপিত এক লেখক-শিল্পী।

ফিরি চিতার অবশিষ্টাংশে। মনে পড়ল সুব্রত’র কথা। সুব্রত ছিল এক দর্পণ যেখানে বিম্বিত হতে থাকবে মানবিক ইতিহাস।

প্রসারমান পর্যবেক্ষণ সেলিমকে দাঁড় করিয়ে দেয় দর্পণ হতে, উল্টোকথায় যথা, উঠে-আসা সেইসব চরিত্রবিন্যাসের আয়োজনে—যা তাঁর লেখার রেখা ধরে আমাদের তাড়া করতে থাকবে। রেখাপাত করে চিতার অবশিষ্টাংশ পাঠকের মর্মমূলে। মানুষ নির্মূল হয় বলে চিতায় সমাপ্তি যেখানে—স্মৃতির উদ্বোধন যুগপৎ তাতে আবির্ভাব হয় বলেই চমৎকার নকশার কবরের মতো স্মৃতিসৌধ। ফলে কে বা কাহারা রাজা প্রতাপ। দিত্যের কাল হতে বিদ্যমান শ্মশানপ্রান্তরে বাংলা ও অঙ্কে, অক্ষরে ও তারিখে মরা ভৈরব নদীর কিনারায় কূলের কথা ঘোষণা করে চলেছে। নদীটা মৃত্যুর দিকে চলছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অবিলম্বে আয়োজন দরকারি হবে। নদীর সৎকার করতে পারবে যখন চিতার অবশেষ তাতে ধুয়ে যাবে—কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত ভাঙা মন্দিরগুলো স্মৃতিনির্ভর এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো এক প্রকার কালেকটিভ স্মৃতিবস্তু মানবজন্ম পাপের জন্য ক্ষমা মার্জনার আবেদন করবে।

আমরা আবার মানবিক ইতিহাসের সন্ধান পাচ্ছি এই গল্পে। কার্তিক-কালিদাস-দিলীপ-পুষ্প-সাঈদা-লিলিরা হানা দেয় আবার।

না, সেলিম মোরশেদকে কেউ চিঠি লেখে নাই, যে চিঠিতে থাকবে আশাপূর্ণা; তিনি অপেক্ষা করেন নাই সেই চিঠি যা উত্তাপময় অক্ষরসম্পন্ন এক ভবিষ্যতের হাতছানি। অকাতরে তিনি রুমাল দুলিয়েছেন আর উড়ে গেছে অজস্র কবুতর অথবা হয়তো শঙ্খচিল—বলে গেছে, আবার ফিরে আসবে। অন্তর্ধান ও প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে তাঁর স্বভূমি আরও বিস্তৃত হতে থাকে।

এইসব মানুষের ইতিহাস লেখা থাকবে না ইতিহাসের মসৃণ পৃষ্ঠার শরীরে,— কারণ এবড়ো-থেবড়ো জীবন এক বাক্য ছাড়া কল্পনাহীন প্রকাশ করা ভিন্ন আর কোনো সক্ষমতা থাকে না। ইতিহাস লেখকের বলেই মানবিক ইতিহাস লিখতে হয় সেলিম মোরশেদকে। উঠে আসে, মানবিক ইতিহাসে, বড়ই চমৎকার যে,— মানুষ প্রবৃত্তির দাস বলেই স্মৃতিনির্ভর।

এমন মানুষ লেখকের কলমে বড়-ই চিত্তাকর্ষক। এমনকি নৈশ অন্ধকারেও। জন্মজয়ে নারীরা এখানে চিৎ হয়ে জন্মগ্রহণ করে,—পুরুষ ভুট করে জন্মদ্বার অতিক্রম করে, তাই বুঝি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার তাগিদ পাওয়া যায় যতটা বড় হতে থাকে সে,—সেই বেলায়।

কালিদাসীরা মরলে চিতায় উঠবে চিৎ হয়ে; কার্তিক নানা কথায় সম্মোহিত করবে এইভাবে; মরার আগে পর্যন্ত বারোটা বেড়ালকে আদর করে খাওয়াতে পারুক, — এই প্রার্থনারত থাকে সে।

দিলীপকে পঙ্গু বলে করুণাভিক্ষা লাভ করতে হয় না বরং কোনো নারীর দিকে তাকালে গভীর নিশিতে কৈফিয়ত দিতে হয়।

গল্প এমনই অজস্র,—সব মিলিয়ে মানবিক ইতিহাস, আর কলমটা সেলিম মোরশেদের হাতে থাকে।

সেলিম মোরশেদ, কম্পিউটারে তোলার আগে কালি-কলমে লেখেন,—সাদা পাতায় পাণ্ডুলিপির করেছে আয়োজন।

তাঁর কলম সাদা পাতায় খেলা করলেও অবিরাম অক্ষরপাতের মধ্যে সাপের মাথায় পা রেখে নৃত্য যেন মানস আলোয় চমকাতে থাকে।

তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত ও প্রবাহিত কালি কেবল এক বিন্দুতে ঠায় হয়ে থাকে—গভীরতর হয় কিংবা পরিক্রমণ করে নানা জগৎ, জগতের মানুষ ও ঈশ্বরের ধরা-ছোঁয়ার সব কিছু হতে সীমানার ওপারে অবস্থিত বিরতিহীন উৎসব: কলম কোনো বিন্দুতে স্থির না থেকে বিভিন্ন মাত্রায় আসমানদারি, জমিনদারি করে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধান ও পর্যটন করে যে গল্প লেখায় নিরঙ্কুশ তাঁর উপস্থিতি দেখি কান্নাঘর গল্পে এবং রক্তে যতো চিহ্নে। বানিয়ে গল্পের ফ্যানায় পাঠককে পিচ্ছিল পথ্য সরবরাহ করেন না তিনি।

কথা প্রকাশের জন্য যে মাধ্যমটাকে অনিবার্য বলে সাব্যস্ত করেন তাতেই মুক্তি ঘটে।

আমরা তাঁর কাছ থেকে ‘গল্প’ নয়, আরো পেয়েছি,—সঙ্গে থাকছে: নভেলা, নাটক, ছড়া-কবিতা, গান ও রঙ-তুলির চিত্রমালা।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলায় রচিত অন্যতম প্রধান নাট্যকারের মর্যাদা-ও দিতে পারি তাঁকে, যদি অন্য কোনো লেখা নয়, বরং নাটকমাত্র পাঠ করি যখন। ‘মানুষ উত্তম’ বাংলায় এক নাটক যাকে শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে এগিয়ে রাখতে হয়; নাটকে আমরা আবিষ্কার করি ঈসা নবীকে, — যিনি সত্তাকে বিভাজিত করে দুই ধর্মের জনমণ্ডলীর পারস্পরিক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ-প্রতিপক্ষ। ঈসা কিংবা যিশুকে দেখে নিতে গিয়ে আকাশপানে কোনো সম্ভাবনার সংকেত কিংবা তজ্জনিত আশংকা ও ভয়ের কথা।

সোনার কাঠি-রুপার কাঠি নয়, কলম তাঁর জীয়নকাঠির মতো কথাবস্তুতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে চলেছে।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অগ্রপথিক হিসেবে নিজেকে উন্মূল করে অজস্র বাক্য, বাক্যের পেছনে দর্শন, নেপথ্যে  জারিত অঙ্গীকার তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে অমোঘ কথামালা।

ফিরে দেখি, সেই লিপিকা;

বহুলোক মনে করেন অপেক্ষাকৃত সৎভাবে স্বচ্ছল থাকাটাও বোধ হয় প্রাতিষ্ঠানিক জীবন যাপন। তারা মনে করেন, না খেয়ে থাকা, উস্কোখুস্কো চুল, অপরিচ্ছন্ন ও অপরিষ্কার প্যান্ট-শার্ট পরে সারাদিনক্ষণ উঞ্ছবৃত্তি আর গাঁজা-মদ-হেরোইনে আসক্ত থেকে, কোনো যূথবদ্ধ শ্রমের সাথে যুক্ত না-থেকে জীবন পারাপারই বোধ হয় প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। … এগুলো আসলে ক্রেজ। ঠিক কোথায় আঘাত করতে হবে আমরা সেই লক্ষ্যমুখ শনাক্ত করব ক্রিয়েটিভ এক্সপ্রেশান দিয়ে। ফলে একজন প্রতিষ্ঠানবিরোধী যথেষ্ট সচেতন। … প্রতিষ্ঠান একদম প্রছন্দ করে না সচেতনতাকে। …

প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা একটা মনোভঙ্গি, একটা এটিচ্যুড একটা নিরন্তর কোশ্চেন, নিজেকে ভাঙা, নিজের বিরুদ্ধে লড়া, নিজস্ব রুচি তৈরি করা। আর তার প্রয়োজনে নিজস্ব নন্দনের প্রয়োজনীয়তা বোঝা।

সেলিম মোরশেদ আরো যোগ করেন —

একজন প্রাতিষ্ঠানিক লেখক আমাদের বলেছিলেন, একজন পাগল তোমাদের চেয়েও প্রতিষ্ঠানবিরোধী। কেননা সে সমাজের সবকিছুতে উদাসীন। বোঝা যায় পাগলের উদাসীনতা প্রাতিষ্ঠানিক লেখকটির পছন্দ। অথচ এই উদাসীনতা কোনো সচেতন লেখকের কাম্য নয়। সে সমাজে বাস করলেও সামাজিক ভালো-মন্দের দায়-দায়িত্ব সে নেয় না। ফলে পাগল সামাজিকভাবে শিকার। তার সচেতন কোনো বিরোধিতা নাই।

তিনি আরো জানাচ্ছেন—

আমরা মনে করি পরিবার হল সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। আমাদের সমাজে মা’কে সংসারে সবচেয়ে বেশি এক্সপ্লয়েট করা হয়। মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া বুকের চাম,—আর সন্তানেরা দাবির দোহাই দিয়ে দিনের পর দিন মাকে শুষে নিয়ে রক্তচোষার মতো বড় হয়েছে। মায়ের ব্যক্তিজীবন—একটু বয়সে ধর্মের কাছে নুয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুর ভেতর নাই। এইসব যা-কিছুর ভেতর দিয়ে পরিবার যে মূল্যবোধগুলো নিয়ে এগোয়, সেগুলো সামাজিক প্রথার প্রথম স্কুল। পরিবারের প্রতি আমাদের বিরোধিতা রয়েছে। পরিবার, পরিপার্শ্ব, মিডিয়া এই সবকিছুর প্রতি শুধুমাত্র বিরোধিতাই কি প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা?… পরিবার, পরিপার্শ্ব মিডিয়ার বিরোধিতা এই কারণে যে মূল্যবোধের যোগফল দিয়ে তাদের এই সিস্টেম— তা যেভাবে তৈরি হয়েছে এবং তাকে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে অজস্র মানুষের রক্তের বলির ভেতর দিয়ে। আর মিডিয়ায় ব্যক্তি-লেখকের স্বাধীন সত্তার বিকাশ ইচ্ছেমতো কখনই হয় না। মিডিয়া সুকৌশলে নির্ধারণ করে লেখকের সত্তাকে।

… তারা লেখককে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। পুরস্কার দেয়। পুরস্কারগুলো খ্যাতিমান হিসেবে লেখককে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়। এই পুরস্কারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এরা প্রথাবিরোধী কোনো লেখককে সচরাচর সম্মানিত করে না। মনোরঞ্জনকারী আর ম্যাড়া লেখকদের ডেকে  এনে পুরস্কৃত করে—উদ্দেশ্য— জনগণের সামনে একটা আইডিয়াল হিসেবে ও ম্যাড়া লেখককে রাখা। বেশ কয়েকবার এই রকম চলার পর গুঞ্জন উঠলে প্রতিষ্ঠান তখন একজন সম্ভাবনাময় লেখককে হঠাৎ রাজি করিয়ে পুরস্কার দিয়ে দেয়, যাতে সবার মুখ বন্ধ থাকে। … পুরস্কার যেখান থেকে দেয়া হয় সেটা—প্রথাসম্বলিত প্রতিষ্ঠান। যারা বিচারক তারা চলমান মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই বিচার করে। … আমরা আমাদের সম্পর্কে জানাতে চাই তথ্য অর্থে, সংবাদ অর্থে আর অবগত অর্থে — সেই জানানো মানে কেবল বলা, প্রচার কিংবা পণ্য অর্থে নয় — এই জানানোটুকু এই জন্যই যে, আমরা যেন কখনো এন্টি-পিপল না-হই। …… প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা পুরো জীবন দেখার আর জীবনপ্রক্রিয়া বোঝার একটি মনোভঙ্গি। … শক্তি কথাটি অসীম শব্দ—এর কোনো পরিমাপ নেই। দেশ বা আনন্দবাজার একমাত্র স্টাবলিশমেন্টের আদর্শ না। … আর যদি একাত্তরের মতো আরেকটা যুদ্ধ হয় … সেক্ষেত্রে আমাদের প্রথম যুদ্ধ হবে আভ্যন্তরীণ মিডিয়া কেড়ে নেবার জন্য — এই ছাড়া সংস্কৃতি নিয়ে মিডিয়ায় যাওয়ার প্রশ্ন নাই। … … যুক্তির শৃঙ্খলা দিয়ে কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে কিংবা অহেতুক ধোঁয়াসে কিছু বলার মতো প্রয়োজন বা অবকাশ নেই … … অজস্র বিষয় নিয়ে প্রশ্ন আছে আর আছে প্রতর্ক- বিতর্ক। … … আমাদের যুক্তির পাল্টা যুক্তি — ইঁদুরের সামনে বিড়াল দেখিয়ে ভয় দেখানো নয়…

উপরের সমস্ত কথাবার্তা, ভাবনা—কী আশ্চর্য, এখনও বড় সমসাময়িক ও প্রাসঙ্গিক। এই অনুভবমালা, প্রকাশিত বয়ান আজকের নয়।—১৯৯৩ সালের। সেলিম মোরশেদ এভাবেই পাল্টা কথার সূত্রমুখ অথবা বুনো শুয়োরের গোঁ, প্রতিশিল্প কর্তৃক প্রকাশিত সেই গ্রন্থে নপুংশক সাজঘর বারবার ভেঙেছেন। অনেক আগেই এই কথাবার্তায় নানা প্রকার উন্মোচন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার একটি অধ্যায়কে সংশ্লেষণ কিংবা বিশ্লেষণ করে গেছেন।

এখনও দেখছি, এঁঢ়ে তর্ক চলছে একপ্রকার; ফাজলামি করতে করতে কবি-গল্পকার এক দল হয়ে উঠেছে মোটাতাজা যারা কিনা পড়ে নাই যা দরকার ছিল পড়ার, আগ বাড়িয়ে কথা বলার আগে। পাঠ করে নাই অথবা পাঠ করলেও বুঝতে পারার কোনোরকম তওফিক দ্যায় নাই সৃষ্টিকর্তা। এক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তাকে দোষ দেয়া যেতে পারে।

আগের জমানায় দেখেছি, দৈনিক কাগজে লেখা ছাপাবার জন্য লিটল ম্যাগাজিনকে গালি দিয়ে নজর কাড়ার পাঁয়তারা,—এখনও তাই দেখা যাচ্ছে,— ফেসবুকে আত্মপ্রকাশ ও মনোযোগ কাড়ার জন্য বেছে নিয়েছে কেউ কেউ লিটল ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে চোগলখোরগিরি। বানচোতামি করা বন্ধ হয়ে যাবে যদি সে পড়ে, ‘স্বপ্নের সারসেরা’ কিংবা … বুনো শুয়োরের গোঁ।

দ্বিতীয় গ্রন্থটি সেলিম মোরশেদের কথাবার্তা ও অনুভবমালার সমাবেশ। আর ‘স্বপ্নের সারসেরা’ তাঁর অনবদ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পঁচিশ বছর পূর্তির স্মারক দলিলগ্রন্থ।

অর্বাচীন তর্ক এত কিছুর পরেও থামে না এই জন্য যে, লিটল ম্যাগাজিনকে ধারণ করার মধ্যে প্রাপ্তিযোগ দুরূহ বিবেচনায় এই লক্ষ্যটিকে সামনে রেখে লিটল ম্যাগাজিনকে অবলম্বন মান্য করা, ফলে, এঁঢ়ে কথাবার্তা বাজিয়ে-সাজিয়ে, ঘেঁটে দিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি।

যত দোষ লিটল ম্যাগাজিনের! বউ পালিয়েছে, বোন গর্ভবতী হয়েছে, প্রেমিকার ভ্যাজাইনা রুদ্ধ হয়েছে তো সবকিছুর জন্য দায়ী লিটল ম্যাগাজিন যেন,—অবস্থা এমনই যে, করুণা মাংতে হয়।

সেলিম মোরশেদ কর্তৃক যৌথভাবে সম্পাদিত ‘স্বপ্নের সারসেরা’ এবং ‘পাল্টা কথার সূত্রমুখ’ আরো বহুকাল প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যময় থাকবে বলে বিশ্বাস করি। কারণ, জলঘোলা সময়ে প্রয়োজন এখন—

Belief represent the Information individuals have concerning social dilemma Attitudes are learned predispositions towards something. Intention like beliefs are influenced by three components : personal attitude toward performing the behavior, perceived social pressure to perform or not perform it and perceived behavioral control.

এখানে কথা শেষ নয় বরং কথা শুরু…
Writing — Benefit ratioটা বুঝে নেবার জন্য। ফলে, সেলিম মোরশেদ সম্পর্কে কথা অসমাপ্ত রাখতে হচ্ছে।

 

(লেখাটি ‘অনিন্দ্য’ সম্পাদক হাবিব ওয়াহিদের সৌজন্যে প্রাপ্ত।)

Meghchil   is the leading literary portal in the Bengali readers. It uses cookies. Please refer to the Terms & Privacy Policy for details.