১৪ মার্চ ২০২৬
নৈঃশব্দের সঙ্গী, নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গল্প
বইপ্রচ্ছদ :
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
সাদিয়া সুলতানা
কথাসাহিত্যিক
94

সাদিয়া সুলতানা
কথাসাহিত্যিক

94

নৈঃশব্দ্যের সঙ্গী, নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গল্প

নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের তুচ্ছ কথার জিরাফে পড়েছি, ‘ভাষা। সবকিছুই ভাষা। এমনকি পথে বা কোথাও পড়ে থাকা একটা সাধারণ পাথর বা কাঠের টুকরোও একটা ভাষা। সবকিছুই নিরন্তর নিজেকে প্রকাশ করছে। কে শুনছে না, শুনছে, কে বুঝতে পারছে কি পারছে না, তা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রকাশটাই আসল ব্যাপার।’ প্রকৃতির সর্বত্র জীব ও জড়কূলের প্রকাশের এই যে আয়োজন তা সমসময় নিবিড়ভাবে অনুসরণ করতে না পারলেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, একাধারে চিত্রশিল্পী ও কথাশিল্পী যেই মানুষটি সেই মানুষটির ভাষা ও গদ্যের প্রকাশভঙ্গি অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন লেখকের নিজস্ব স্বর তৈরি হতে কি তার পুরো একটা জীবন লেগে যায়? না কি প্রথম লেখা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার স্বতন্ত্র লেখনশৈলী? আমার মনে হয়, কারও কারও ক্ষেত্রে প্রথমটি ঘটে। আবার কারও কারও স্বল্প সংখ্যক লেখাতেই প্রবলভাবে থাকে তার স্বকীয়তার ছাপ। লেখক নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের ক্ষেত্রে তার শুরুর লেখাগুলোতেই যেন স্পষ্টতর হয়েছে তার নিজস্ব গদ্যভঙ্গি। দিন দিন আরও স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি। আদতে শিল্পী নির্ঝরের ভেতরে প্রবলভাবে একজন কবি থাকে, কবিতা যার কাছে ‘দৈনন্দিন কাজকর্মের মতোই ব্যাপার যেমন ঘুম, স্নান, খাওয়া, বাজারে যাওয়া ইত্যাদি।’ যদিও কেবল কবিতা নয়; গল্প, মুক্তগদ্য, প্রবন্ধ ও সম্পাদনার কাজেও তিনি হয়ে উঠেছেন অনন্য।

নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের জন্ম ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজারে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭ টি। প্রকাশিত বইসমূহের মধ্যে তার উল্লেখযোগ্য বই: পাখি ও পাপ (২০১১, কবিতা), শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য), ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প), কাপালিকের চোখের রং (২০১৩, কবিতা), পুরুষপাখি (২০১৪, মুক্তগদ্য), আরজ আলী: আলো-আঁধারির পরিব্রাজক (২০১৫, প্রবন্ধ), মহিষের হাসি (২০১৫, কবিতা), রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয় (২০১৬, গল্প), আকাশ ফুরিয়ে যায় (২০১৭, মুক্তগদ্য), হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস (২০১৭, কবিতা), উদ্ভিদ ও বৃন্দাবনী (২০১৯, কবিতা), কুসুমকুমার (২০১৯, মুক্তগদ্য), ফুলের অসুখ (২০২০, গল্প), কবিতালেখকের জার্নাল (২০২০, মুক্তগদ্য), আমি ও গেওর্গে আব্বাস (২০২০, মুক্তগদ্য), বনভাঙা গান (২০২১, স্মৃতি-আখ্যান), অপৃথিবীর অঘ্রাণ (২০২৪, গদ্য), ডিয়ার ট্রিনিটি (২০২৫, স্মৃতিগদ্য), তৃষ্ণান্ধ হরিণের চোখ (২০২৫, গদ্য)।

নির্ঝরের পাঁচটি গল্পগ্রন্থের মধ্যে ‘ডুবোজ্বর’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালের একুশে বইমেলায়। এই বইয়ের গল্পগুলো দৈর্ঘ্য বিচারে দীর্ঘ না হলেও গল্পগুলোর ব্যঞ্জনা কুসুমকুমারের আনন্দ আর বিষাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতার মতো অবিনাশী।

প্রথমে বইয়ের ‘জ্যামিতি বই’ গল্পের কথাই বলি। গল্পটা শুরু হয় অর্ধমিথ্যা কুসুমকুমারের ঘুমহীন মাথার ভেতরে জন্ম নেওয়া এক প্রজন্মের হু হু করা আনন্দগানের মধ্য দিয়ে। এরপর শহরতলিতে নেমে আসা এক পাল জানোয়ারেরা কী করে বুড়োর বাগানের আনারস কেটে নেয়, ইশকুলে ঢুকে পড়ে বাথরুম নোংরা করে, বইপত্র ছিঁড়ে ফেলে মৌলবি স্যার আর জ্যামিতি স্যারকে ধরে ধরে নিয়ে হাটে কেজি দরে বিক্রি করে দেয় সেসব গল্প আসতে থাকে। জ্যামিতি বই দিয়ে যেই অর্ধমিথ্যা কুসুমকুমারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় সেই কুসুমকুমারের সঙ্গে নির্ঝরের গল্পের ভেতরে কিন্তু বার বার দেখা হয়ে যায়।

‘উল্টাটান’ গল্পটা শুরু হয় জলোচ্ছ্বাসের স্বপ্ন দিয়ে। ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে একটি চরের ঘরবাড়ি, নৌকা, গাছপালা, গরুছাগল, হাঁসমুরগি। নিমগাছের ডালে জামার অংশ আটকে গেছে একটি বাচ্চা, সে কাঁদছে। জায়নামাজের মতো লাল একটা শাড়ি উড়ে যাচ্ছে। বেদনাবিধুর একটি দৃশ্য সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে অজস্র মানুষকে। এরপর আসছে একটা চর দখলের লাঠিয়ালদের গল্প, এ কোনো স্বপ্নদৃশ্য না। ‘উল্টাটান’ গল্পটা নির্ঝরের অনেক গল্পের চেয়ে আলাদা বলতে হয়। কারণ এখানে গতানুগতিক ঢঙে হাসমত আর জরিনার যুগলজীবনের গল্প বলেছেন গল্পকার। আরেকভাবে বললে, এই গল্পে নির্ঝরের নিজস্ব কায়দার শব্দের ঘোর বা বিভ্রম ছিল না, নিটোল গল্পই ছিল। যদিও নির্ঝরের কাছে কোনো ঘটনার বর্ণনা দেওয়া বা কাহিনি বলাই গল্প না বরং সত্যকে মিথ্যার অর্থাৎ কল্পনার আভরণে মহিমা দিতে পারলেই গল্প হয়।

‘আমি অন্ধকার আকাশের খাতায় নক্ষত্রের দীপ্ত কবিতাগুলি পড়ে পড়ে চোখ ক্ষয় করি, ওরা আমাদের তিরিশলক্ষ হারানো স্বজন’—‘করাতিয়াক্যাম্প’ গল্পের এই বাক্যটা পড়তে পড়তে ভাবি এই গল্প যুদ্ধের গল্পই বলবে হয়তো, শোনাবে লাল সবুজ স্বাধীনতা পাওয়ার কথা। কিন্তু গল্পটা যুদ্ধদিনের আবেগসর্বস্ব কাহিনির দিকে না নিয়ে আমাকে স্বাধীনতার অর্থ খোঁজার অর্থহীন চেষ্টার দিকে নিয়ে যায়। তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে দেখি এই দেশে স্বাধীনতা মানে গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে সাহায্য চাইতে আসা মুক্তিযোদ্ধার হাত, রোদেলা দুপুরে মধ্য পুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার কাটার সময় পুকুরপাড়ের সঘন কাশবনের আড়ালে এসিডের বোতল হাতে পশুর অপেক্ষার ক্ষণ, রাজাকারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সমাবেশে বরাদ্দকৃত চেয়ার আর বিজয়বেলার মঞ্চে বোমা হামলায় নিহত নাগরিকের বিকৃত লাশ।

‘ডুবোজ্বর’ গল্প পড়তে পড়তে বুঝি কল্পনার দরজা খুলে দিতে দিতে নির্ঝর গল্পে এমন এক ভুবন নির্মাণ করেন যার শুরু নেই, শেষ নেই, যেখানে পাঠক আমি আক্ষরিক অর্থেই খেই হারাই। অর্থবহ কোনো ব্যাখ্যা না খুঁজে তাই পড়ি ‘ডুবোজ্বর’ আর পাই নির্ঝরের সেই শব্দ শব্দ খেলা আর গরাদের গায়ে গায়ে ঝুলতে থাকা একানব্বই বছরের মরিচার চিহ্ন। এই গল্পে দুজন মানুষ মুখোমুখি হলে শুচিময় ভোর আসে, ক্লান্তিরাও হারায়, আকাশ থেকে মেঘ সরে সরে নীল রঙে ভরে যায় চারদিক। এরপর মুগ্ধতায় ডুবে যেতে যেতে দেখি একজোড়া ডানার উত্থান। আচমকা নির্ঘুম রাতের কলস ভেঙে গেলে ছলকে ওঠে জলস্বর আর মাথাভর্তি চুলের বন্যা নিয়ে অবিকল তার মুখের মতো মুখ নিয়ে একটি শিশু সামনে আসে।

আদতে শিল্পী নির্ঝরের ভেতরে প্রবলভাবে একজন কবি থাকে, কবিতা যার কাছে ‘দৈনন্দিন কাজকর্মের মতোই ব্যাপার যেমন ঘুম, স্নান, খাওয়া, বাজারে যাওয়া ইত্যাদি’

‘রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয়’ নির্ঝরের দ্বিতীয় গল্পের বই, যা ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বইয়ের নাম গল্পে একটি দিঘির গল্প আছে, যেই দিঘিতে অজ্ঞাত কোনো কারণে কখনও কোনো মাছ জন্মাতো না। একটা চাকরি চলে গেলে আরেকটা চাকরি পাওয়া যেখানে কঠিন সেখানে নিজেই নয়টা চাকরি ছেড়ে দিয়ে গল্পকথক বেকার যুবকটি শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে তার গ্রামে ফিরে গিয়ে এই দিঘির পাড়ে যায়। ওখানে গিয়ে যুবকটির মনে হয়, এটাই বুঝি রূপকথার দুধের দিঘি যেখানে শাদাপরীর হিরন্ময় স্নান অথবা দিঘির অতলে লুকোনো সিন্দুকে বন্দী ভ্রমরের বুকের ভিতর আছে রাজকুমারের প্রাণ। এরপর একটা ভয়ংকর ঘটনার মধ্য দিয়ে যুবকের কাকার খামারের রাজহাঁসগুলো দুধভর্তি দিঘির জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে একযোগে মাছ হয়ে যায়।

‘রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয়’ বইয়ের ‘অন্য মা ও রক্তজবা’ গল্পের মেয়েটির পরনে থাকে শাদাশাড়ি। মেয়েটি সারাদিন উঠানের ধারে বেড়ে ওঠা জবাফুলের বন থেকে রক্তজবা তুলে তুলে কাটিয়ে দেয়। মেয়েটির নাম যেই বইয়ের মধ্যে লেখা আছে সেই বইয়ের মলাট ধূসর হয়ে আছে উত্তরের দিগন্তের রূপ। এই গল্পে একজন কবিও আছেন যার গায়ের রং ঘোর রক্তবর্ণ। কবির সংসারে বিরাট অশান্তি, একটার পর একটা চাকরিতে টিকতে না পারার যন্ত্রণা, অভাব ইত্যাদি। এইসব চিন্তায় তার লেখালেখিই বন্ধ হয়ে যায়। সে এর কাছে, ওর কাছে চিঠি লিখেন চাকরির জন্য। টাকা ধার করেন। কম ভাড়ায় বাসাবাড়ির সন্ধান করেন। একদিন সন্ধ্যায় কবি অরুণিমা সান্যালের মুখ ভেবে ভেবে যখন হাঁটতে থাকেন তখন নিঃশব্দে একটা ট্রাম এসে তাকে চাপা দিয়ে টেনে হিচড়ে কয়েক মিটার টেনে নিয়ে যায়। পালস চেক করে কবির ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেন যিনি তিনি ডাক্তার আয়েশা আক্তার, কবিরই অরুণিমা সান্যাল। কিন্তু ঐ শাদাশাড়ি পড়া মেয়েটি কে? স্মৃতি কবির মৃত্যুতে কেন কারও স্মৃতি রক্তজবার বন হয়ে যায়? গল্পের শেষে প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে একটি কবিতার বই হাতে উঠে আসে, যার নাম পাখি ও পাপ।

অসুখে আক্রান্ত পৃথিবীর দুর্বিষহ এক দিনে পাঠ করেছি নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ফুলের অসুখ’। ‘ফুলের অসুখ’ গল্পগ্রন্থে আটটি গল্প আছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একমনে একটানা পড়ে গেলে মনে হবে ৯৫ পৃষ্ঠার বইটি বুঝি বা একটিই গল্প, কারণ বইটির সব গল্পই ফুলের বিবিধ অসুখ নিয়ে। এই ফুল কখনও পৃথিবী, কখনও দেশ, কখনও মা, কখনও প্রেমিকা কখনও বা আমি, আমরা নিজেরাই।

‘ফুলের অসুখ’ বইয়ের প্রথম গল্প ‘বীজ‘। ‘বীজ’ গল্পে নির্ঝর নৈঃশব্দ্য লিখে যাচ্ছেন, ‘মাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভাঙলে সারাদিন কেমন করে যেন বুক কাঁপে। আজ ভোররাতে দেখলাম একটা মাঠের মাঝখানে একটা অনেক উঁচা আকাশঢাকা গাছের নিচে মা বসে আছে।’ গল্পপাঠ শুরু করতেই মাকে স্বপ্নে দেখার অনুভবের মতো বুকের ভেতরে হু হু করতে থাকে। মা যেন হাতের তালুতে গুঁজে দেন গমের দানার মতো পেটকাটা, লাল রঙের একটা বীজ। ঘুম ভেঙে গেলে মুঠো থেকে বীজটা উধাও হয়ে গেলেও বুকের শূন্য খাঁচায় মাকে হারানোর হাহাকারটুকু লেপটে থাকে।

নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের লেখায় থাকে হাহাকারের হুহুপাখি, ঘুমগাছের বন, কাশবন, সূর্যফুল, রাত্রি নামের মা আর ডুমুরের ফুল।‘বীজ’ গল্পের গল্পকথকের নানির ডুমুরের ফুল দেখা, ডুমুর গাছের পেটফোলা অংশের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসা, মায়ের জন্ম—এসব কিছুই যেন আশ্চর্য এক ঘোরের ভেতরে ঘটে। একসময় সেই ঘোর সত্যি হয়ে যায় আর একদিন সত্যি সত্যি একান্নটা ঘুমগাছ বিক্রি হয়ে যায়, মায়ের কবরের ওপরে জন্ম নেয় ঘুমগাছের চারা।

‘শশী’ গল্পে কুসুমকুমার কাঁচা রক্তের রং আর গন্ধ নিয়ে বইমেলায় ঢুকে পড়ে। এই রক্ত অভিজিৎ রায়ের রক্ত। হুমায়ুন আজাদের রক্ত। এই রক্তের রং কেউ দেখতে পায় না। এই রক্তের গন্ধ কেউ টের পায় না। এই রক্তের ভার কুসুমকুমার একাই বহন করে, নিজের রক্তের ভেতর। কুসুমকুমার শশীকে দেওয়া কথা রাখতে পারে না, সারারাত জেগে দেয়ালে কবিতা লেখে, ‘ঘুম ঘুম চোখে দাও সূর্যস্নান, ভবঘুরে পায়ে দাও মুক্তির শান…’। কুসুমকুমারকে একদিন পুলিশে ধরে নিয়ে যায়, তার ডান হাতের আঙুল কেটে নেয়। কাটা আঙুলের ঘা শুকিয়ে গেলে সে আবার অন্ধকারের বিপক্ষে শহরের দেয়ালে কবিতা লেখে। ‘শশী’ গল্পটি কবিতায় মোড়া। যেই কবিতায় লেগে আছে রক্তের রঙ, ঘা শুকানো কাটা আঙুল দিয়ে সেই রক্তের রঙে লিখে চলে কুসুমকুমারেরা।

‘পরী’ গল্পের পরীর চোখের ভেতরে পৃথিবীর সকল বিষাদ কুয়াশায় মোড়া সমুদ্র হয়ে আছে। এই বিষাদ সমুদ্রের কাছে কেমন করে যেন বকুলের সমুদ্র ফুরিয়ে যায়, ছেলেটি জানে না। তাই মেয়েটির পিঠের দুইপাশে হাড়ের জায়গায় ছয় ইঞ্চি লম্বাটে শাদা দাগ দেখে ছেলেটি ভাবে, কেউ কি ওর ডানা কেটে নিয়ে গেছে? সত্যিই কি এই মেয়েটি পরী ছিল? পরীর ডানা কাটার আরেকটি গল্প ‘ডানা’। এই গল্পের প্রথম পাঁচ পর্ব একটু ভিন্ন স্বরে লেখা। এ যেন নির্ঝরের ছন্দে লেখা নয়, পরিচিত ফ্রেমে বাঁধা রেণুকা আর রফিকের দাম্পত্যজীবনের গল্প ‘ডানা।’ যে গল্পে রেণুকা সুতোছেঁড়া লাল ঘুড়ির মতো ভাসতে ভাসতে মাটিতে নামে। ফের দুই ডানার চিল হয়ে ওড়ে আকাশে। ‘ডানা’ গল্পের ষষ্ঠ পর্বে স্বয়ং গল্পকার আখ্যানের ভেতরের ঢুকে যান আর রেণুকার গল্প এগিয়ে যায় ভিন্ন এক সমাপ্তির দিকে।

নৈঃশব্দের সঙ্গী, নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গল্প
ডুবোজ্বর—[২০১২, ঋতবর্ণ], চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন  রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয়—[২০১৬, চৈতন্য], চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন
কুসুমকুমার—২০১৯, আগামী প্রকাশনী  ফুলের অসুখ—২০২০, আগামী প্রকাশনী
অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা—২০২১, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন  পোড়া আগুনের কিন্নর—২০২৫, প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স
আলোকচিত্র: তানভীর আশিক
নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের লেখায় কুসুমকুমারের সঙ্গে বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে মা। তাই ‘চিঠি’ গল্পের ‘বৈশাখী কুরিয়ার সার্ভিস’-এ চিঠিপত্র বিলির কাজ করা যুবকটি জ্বরতপ্ত দিনে কাঁথার মধ্যে ঢুকে মায়ের ঘ্রাণ পায়। সে জানে, ‘পার্থিব কোনো ঘ্রাণের সঙ্গে এর তুলনা চলে না, এ ঘ্রাণ অপার্থিব সুন্দর’। ‘চিঠি’ গল্পের শব্দের ভাঁজে ভাঁজে তাই শত শত বিষাদ ছুঁয়ে থাকে।

‘ফুলের অসুখ’ বইয়ের ষষ্ঠ গল্পটি মূলত গল্প নয়, আবার অন্য ভাবে বললে ১৫ টি ছবির সমন্বয়ে আঁকা আশ্চর্য এক ছবিগল্প এটি। এই ছবিগল্পের শিল্পগুণ আলোচনা করতে এই পাঠক ব্যর্থ হলেও প্রতিটি ছবিই তার দৃষ্টিসন্ধিতে অব্যর্থ তীরের মতো গেঁথে গেছে।

‘তৃষ্ণা’ গল্পে গল্প কোথায় ভাবতে গেলে তুমুলভাবে শব্দবৃষ্টিতে ভেজা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এই গল্পে আসা ‘জারুল পাতার চিঠি’ গানটি কানের কাছে রিমঝিমিয়ে বাজতে থাকে আর ‘এইভাবে তার সঙ্গে আমার, আমার সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। দেখা হলে গান হয়ে যায়। আর আকাশে মেঘ ভেসে যায়’। নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের অন্যান্য গল্পের মতো ‘তৃষ্ণা’ গল্পেও গল্প খুঁজলে কিন্তু ভুল হবে। তবে মনোযোগী পাঠক চাইলেই একটি গল্পে অজস্র গল্প খুঁজে পাবে, যেসব গল্প নির্ঝর এঁকেছেন বিমূর্ত সব শিল্পকর্মের মতো। তাই নির্ঝর নৈঃশব্দ্য যখন লেখেন, ‘সকালের অদ্ভুত চরিত্র’ তখন প্রকৃত অর্থে পাঠক অদ্ভুত সকালই খুঁজে পাবেন, যেই অদ্ভুত সকালে কদমের বনে কিছু ফুল সূর্যের প্রতিকৃতি হয়ে থাকবে।

‘ফুলের অসুখ’ বইয়ের শেষ গল্প ‘স্বপ্ন’। প্রথম স্বপ্নে আসে একটা অদ্ভুত দ্বিচক্রযান, দ্বিতীয় স্বপ্নে একটা অচেনা ঘর, তৃতীয় স্বপ্নে একটা অচেনা শহরের রাস্তা, চতুর্থ গল্পে আসে নয়নের বন্ধু খিজির। পঞ্চম স্বপ্নটা একটা দুঃস্বপ্ন, শ্রীমতীকে নিয়ে দেখা। এই স্বপ্নে দেখা মেলে সবুজ ঘ্রাণ ভরা পাতা বন, চাঁপাফুল, ডাকপাখি আর যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের তেজস্ক্রিয়তায় বিপন্ন মানুষের কৃত্রিম শরীরের। অভিনব সমাপ্তির মধ্য দিয়ে ‘স্বপ্ন’ গল্পের স্বপ্নযাত্রা ফুরালে মনে হয় এসব কুসুমকুমারেরই দেখা স্বপ্ন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের চতুর্থ গল্পের বই ‘অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা’ প্রকাশিত হয়েছিল। বইয়ের ১৩ টি গল্প প্রেম, মানুষের সম্পর্কের জটিলতা, অস্তিত্বের যন্ত্রণা ইত্যাকার মানবিক বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে। ইতিহাস, খবরের কাগজ, গণিত, বন, বাদাড়, মানুষের আচার, অনাচার, অত্যাচার-সবখানে খুঁজে পাওয়া গল্প নির্ঝর বলছে অনুসূর্যকে।

প্রথম গল্পই ‘অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা।’ কুইন এলিজাবেথ ইংল্যান্ড থেকে ঢাকায় আসা উপলক্ষে যেই বছর ঢাকাকে বিশ কোটি টাকা খরচ করে তিলোত্তমা ধরনের বানানো হয়েছিল সেই বছরের গল্পটা অনুসূর্যকে লেখা হচ্ছে। শিশুস্বর্গের সুলতানের সঙ্গে রানী দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করার পর যেই চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে তা পড়ে অনুসূর্য বিস্মিত হলেও গল্প পড়ে আমার ভেতরে শুধু সুলতানের কোনো জন্মদিনে কেন নারী হিসেবে নিজেকে, নিজের শক্তিকে একবার ফিরে দেখিনি—এই আফসোসটা ফড়ফড়িয়ে উঠেছে।

‘জীবনযন্ত্রণা ছাড়া আর্ট হয় না, বড়জোর ক্রাফট হতে পারে। জীবনযন্ত্রণা সকলেরই আছে। তবে সকল মানুষ তা যথার্থ টের পায় না, কেউ কেউ পায়। সুলতান জীবন যন্ত্রণা টের পেয়েছিলেন। তাই তিনি প্রকৃতঅর্থেই একই সঙ্গে একজন শিল্পী ও সন্তের জীবন যাপন করে গেছেন।’ আমার মনে হয় নির্ঝরও প্রবলভাবে জীবন যন্ত্রণা টের পান। তাই অনুসূর্যের প্রতি ‘নিমফুলের দেশে’র গল্পটা লিখতে গিয়ে তিনি ফাতিমার মতো মেয়ের গল্প লিখতে পারেন। ফাতিমা পাহাড়ের নিচে বড়ো রাস্তার ওপারে একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে আয়ার কাজ করে। ডিউটির সময় ওর দেড় মাস বয়সি বাচ্চা ওর পিঠের সঙ্গে কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় থাকে। ফাতিমার কপালের বাম পাশের কাটা দাগটার নেপথ্যে যেই ভয়ংকর গল্পটা আছে তা পড়তে পড়তে অনুসূর্যের কী হয় জানি না, ‘আমার বুকের ভেতর হু হু করে একটা প্রকাণ্ড সমুদ্র ভেঙে পড়ে রক্তের স্রোতে।’

অনুসূর্যকে লেখা রূপকথার পরের গল্প ‘আবলুশ কাঠের চেয়ার।’ গল্পটা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে পাওয়া একটা আবলুশ কাঠের চেয়ার, একটা লাল জুতা আর এক আশ্চর্য আফিম খাওয়া বুড়িকে নিয়ে লেখা। অভিনব সমাপ্তির জন্য এই গল্পটা রূপকথার বলে মনে হলেও গল্পের অভ্যন্তরে থাকা হাহাকার, বেদনা এত জীবন্ত যে ঝড়ে মৃত বা হারিয়ে যাওয়া অচেনা এক শিশুর একটা লাল জুতাও নিজের বলে মনে হয়।

কেমন করে কোথায় কোন রূপকথার দেশে কতক্ষণের জন্য শিরোপার সঙ্গে গল্পকথকের পুনরায় দেখা হয় তা ‘শঙ্খমালার শেষলাইন’ গল্পে না বললেও শিরোপা নামের যেই মেয়েটি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ ছাড়া এই কবির অন্য কোনো কবিতা পড়েনি সেই মেয়েটির সঙ্গে নির্ঝর নামের তরুণের যেই যোগসূত্র থাকে তার রহস্য শঙ্খমালার শেষলাইনে উন্মোচিত হওয়ার পর গল্পকার নির্ঝরের দিকে ঈর্ষার দিকে তাকাতে বাধ্য হই। ‘অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা’তে যদিও নির্ঝর বলেছে যে গল্প কীভাবে বলতে হয় তা সে জানে না কিন্তু এই বইয়ের প্রতিটি গল্পে নির্ঝর গল্প বলার নিজস্ব ধরনকেও ভেঙেচুরে একেবারে নতুন একটা সীমায় নিয়ে গেছে।

অক্টোবর, ২০২৫ এ নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের পঞ্চম গল্পের বই ‘পোড়া আগুনের কিন্নর’ প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে শাদাসন্ধ্যার গোরু, হংকং বারে সন্ধ্যা, পোড়া আগুনের কিন্নর, চোখ, অশ্রুদগ্ধ ফুলের উত্থান, ছোট্ট মাছ, শসার ভেতর নদী, রাত্রি মা, নরকের ইন্ধন, ছাতিমবনের রূপকথা, সোনার ছেলের মা, চাঁদ রান্নার রাতে, বিকল ডানার ভার শিরোনামের তেরোটি গল্প আছে।

বনপাহাড়ের বুকের ভেতরে বেড়ে ওঠা নির্ঝরের গল্পভাষা ঠিক গল্পের মতো নয়, বেদনার মতো যেখানে ঘুরেফিরে আসে মিথ, স্মৃতি, রাজহাঁস, মা আর ঘুমগাছ। বেদনার যেই জলসদৃশ রূপ, যেই হুহুপাখির ডানা সব যেন নির্ঝরের গল্পের অক্ষরে ফুলের মতো ফুুটে ওঠে

‘পোড়া আগুনের কিন্নর’ গল্পটি সাধু ভাষায় লিখিত। গল্পটি পড়তে পড়তে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ে যায়। গল্পটি বীরাঙ্গনা আয়েশা, তার মৃত পুত্র আর শিশু নাতনি রেনুকাকে নিয়ে। একটা জলন্ত বাসের মধ্যে আয়েশার ছেলে করিম দ্বগ্ধ হয়ে মারা যায়। আগুন থেকে আয়শা বেঁচে গেলেও আগুনের স্মৃতি তাকে তাড়া করে। শুধু স্মৃতি না, আগুনও আয়েশার পিছু ছাড়ে না। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সেনারা নির্যাতন করলে আয়েশার বিভীষিকাময় জীবনের শুরু হয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে একদিন আয়েশা পোড়া আগুনের ভেতরে নাচতে শুরু করে।

‘অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা’র ‘ইচ্ছেকুয়া’ গল্পে নির্ঝর রাত্রি মায়ের গল্পটা বললেও গল্পটা শেষ হয়নি। ‘পোড়া আগুনের কিন্নর’ বইয়ে আবার ‘রাত্রি মা’র গল্প এসেছে। যদিও নির্ঝরের মতো আমিও জানি সারা জীবন লিখে গেলেও মায়েদের গল্প লিখে শেষ করা যাবে না। হারিকেনের আলোয় মায়ের সেলাই করা নকশিকাঁথার মতো নিপুণ ‘রাত্রি মা’ গল্পটি ঘোরের জন্ম দেয়। এই ঘোর সহজে ভাঙে না। আমি জানি নানার কবরের বুকে পুঁতে দেয়া খেজুরের ডাল যখন হলুদ হতে হতে একদিন সজীব হয়ে ওঠে সেদিন নির্ঝরের মায়ের নামটি মনে পড়ে। মায়ের নামের মতোই রাত্রি মা গল্পটি বিষণ্নতায় মোড়া। গাঢ় কুয়াশার ভেতরে মুড়িয়ে রেখে নির্ঝর এখানে আমাদের এক দুখিনী নারীর গল্প শোনায়। যেই নারী বাবা, মা আর ভাইয়ের শোকে সুরা ইয়াসিন পড়তে পড়তে সুর করে কাঁদে আর তার কান্নায় কুরানশরিফের কালো অক্ষরগুলি শাদা হয়ে যায়, রেহেল কেঁপে কেঁপে ওঠে।

‘পোড়া আগুনের কিন্নর’ গল্পের মতো ‘নরকের ইন্ধন’ গল্পটিও সাধু ভাষায় লিখিত। এটি রাজা, রাক্ষস আর সিংহাসনের গল্প। রূপকথার মতো শোনালেও রাজার নিষ্ঠুরতা আর নিপীড়নে প্রজাদের ত্রাহি ত্রাহি চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠলে চেনা কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয় আমিও এই রাজ্যের প্রজাসাধারণের একজন যার ওপরে শত বছর ধরে পীড়ন-গাদন চলছে। আমাকে চমকে দিয়ে গল্পের একপর্যায়ে রাজার মৃত্যুর সুযোগে জল্লাদ এক বুদ্ধি আঁটে এবং সে কূটকৌশলে জেলদারকে হত্যা করে রাক্ষসদের মুক্ত করে দেয়। রাক্ষসগণ মুক্ত হয়ে সেই জল্লাদকেই নিজেদের রাজ্যের সিংহাসনে বসায়। এরপরেই রাজ্যের ওপরে নেমে আসে বিপদ। বিপদের আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নিয়ে নরকের হাওয়া সরগরম হওয়ার আগেই গল্পের রাজ্য থেকে পালিয়ে যাই। কিন্তু পালিয়ে গিয়েও রক্ষা পাই না ‘সোনার ছেলের মা’ গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়ে আয়েশা খালার মতো নিজের নাকটা হারিয়ে ফেলি।

আসলে গল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ঝর বিবিধ কৌশলের আশ্রয় নেন। কখনও কবিতা, কখনও বা রূপককে আশ্রয় করে তিনি গল্প তৈরি করেন। আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি যেই সময়ে সত্য বললে টুঁটি চেপে ধরা হয় আর মিথ্যা সত্যের মুকুট পরে রাজ্য জয় করে। মোট কথা নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে আমাদের স্বপ্ন, আমাদের কল্পনা। যাপিত জীবনে যখন সত্য উচ্চারণ করা অপরাধের সামিল হয়ে যায়, যখন আমাদের স্বপ্নের জগতেও দস্যুরা চকচকে ছুরি হাতে প্রবেশ করে তখন ঠাকুমার ঝুলির মতো নির্ঝরকেও তার ঝুলি থেকে নরকের ইন্ধন আর সোনার ছেলের মায়ের গল্প বের করতে হয়।

‘পোড়া আগুনের কিন্নর’ বইয়ের ‘হংকং বারে সন্ধ্যা’ গল্পটা ঠিক গল্প নয়। হয়তো লেখকের স্মৃতির কাছে ফেরা। হংকং বারটা কর্ণফুলি নদীর পাড়ে। বারের জানালা দিয়ে নদীর ওপর ভেসে থাকা জাহাজ থেকে হলুদ আলো জ্বলতে দেখা যায়। গল্পকথক ও আরিফ বারে ঢুকবার আগে শহরের রাস্তায় হাঁটছিল। ঐসময়ে চোখে পড়ে, স্টেশন রোডের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলিতে তাদের বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি খুলে শিমুলতুলার মতো বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে। আন্দরকিল্লার প্রেসগুলিতেও আর ছাপার কাজ হচ্ছে না। বরং মেশিনগুলি যেন নিজেরা নিজেদের মধ্যে কবিতা বলছে, হারানো দিনের গান গাইছে। একটা সময়ে দুজনের কথোপকথনে অমানুষ, মেরুদ-চুরি আর একটা আবলুশ কাঠের চেয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসে। আরিফের আশংকা আর সতর্কবার্তা শুনতে শুনতে ভেতরে ঝাঁকি লাগে আর লুকিয়ে রাখা স্মৃতির মতো মনে পড়ে কুসুমকুমারের কথা।

নির্ঝর নৈঃশব্দের ‘কুসুমকুমার’ বইটিকে মুক্তগদ্যের বইও বলা যায়, আবার গল্পের বইও বলা যায়। মূলত ধারাবাহিকভাবে নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গল্প পাঠ করলে বোঝা যায় নির্ঝর কেবল কুসুমকুমারের দেখা আর কুসুমকুমারের মধ্যে থাকা গল্পগুলোই লিখছেন। কখনও কখনও মনে হয় নির্ঝর নৈঃশব্দ্যই কুসুমকুমার, যার প্রতিটি গল্পের শুরু বা শেষ কিছুই গতানুগতিক না। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই যেন এই গল্পকার গল্প নির্মাণ করেন যেখানে থাকে না কোনো চেনা, জানা বা প্রচলিত ফ্রেম। পরীর ডানায় ভর করে এই গল্পগুলো এগিয়ে চলে, যেসব গল্পে সুনির্দিষ্ট কোনো আখ্যান না থাকলেও থাকে কবিতার অবয়ব। তাই গল্পের সমাপ্তিটা জেনে নিলেও নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গল্পের ভুবনে পুনঃপুন পরিভ্রমণ করা যায়, আটকে থাকা যায় নির্ঝরের আঁকা মনোরম ঘুমগাছের বনে।

বিন্দু পত্রিকার ‘দশকথা’য় নির্ঝর বলেছেন, তার লেখার অনুপ্রেরণা মূলত নারী-প্রেম, তারপর মানবিক যাতনা। তবে বনপাহাড়ের বুকের ভেতরে বেড়ে ওঠা নির্ঝরের গল্পভাষা ঠিক গল্পের মতো নয়, বেদনার মতো যেখানে ঘুরেফিরে আসে মিথ, স্মৃতি, রাজহাঁস, মা আর ঘুমগাছ। বেদনার যেই জলসদৃশ রূপ, যেই হুহুপাখির ডানা সব যেন নির্ঝরের গল্পের অক্ষরে ফুলের মতো ফুুটে ওঠে। রাজহাঁসের মাছ হওয়ার দিনে বা কোনো জ্বরতপ্ত দিনে নির্ঝর পাঠের সময়কে এমন ভেঙেচুরে দেয় যে শতবার উঠে দাঁড়াতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়ি। ওদিকে মনের ভেতরে আক্ষেপের বুড়বুড়ি ওঠে, এভাবেই কেন বিষাদের অঙ্কুরোদগম ঘটাতে হবে! তবু ডুবতে থাকি, ডুবতে ডুবতে কুসুমকুমারের স্বরে বিড়বিড় করি, ‘মুঠোর ভিতর গোধূলি পুরে এখনো লাল হয়ে আছি, যেমন গোলাপকে ধূলি দিয়ে ঘষলে হয়ে যায় আফিমের ফুল। সেই রূপ আফিমফুলের বনে দাঁড়িয়ে দেখি পায়ের নখ চিরে বের হয়ে গেছে দূরে সারমেয় গন্তব্য। আমাকে নিয়ে যাও এসে। কোথাও নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখে এসো। কোথায় বনে পাতার আড়ালে আমাকে রেখে এসো। কোথাও সমুদ্রে অজানিত মাছের পেটে তুমি আমাকে রেখে এসো। আমার আর ভালো লাগে না এইসব পৃথিবী।’

[প্রথম প্রকাশ: অনুপ্রাণন ‘সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা’—জানুয়ারি ২০২৬]

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত