বাংলাদেশের সাহিত্যে সুন্দরবন একটি রোমান্টিক, রহস্যময় এবং পর্যটন-উপযোগী ল্যান্ডস্কেপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। নাগরিক মানুষের কাছে এটি বাঘের গর্জন, হরিণের মায়াবী চোখ আর সুন্দরী গাছের শ্বাসমূলের এক নৈসর্গিক ক্যানভাস। কিন্তু এই বনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা, প্রতিনিয়ত প্রকৃতির রুদ্ররোষের শিকার হওয়া এবং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষদের গল্প মূলধারার সাহিত্যে খুব একটা জোরালোভাবে উঠে আসে না। কথাশিল্পী ও সাংবাদিক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমামের ‘বনের মানুষ মানুষের বন’ গ্রন্থটি সেই শূন্যতা পূরণের একটি প্রয়াস।
লেখকের নিজের ভাষায়, ‘এ বইয়ের সব গদ্য দেখা থেকে লেখা। গবেষণা নয়, প্রতিবেদনও বলা চলে না।’ মূলত এটি আখ্যানমূলক সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যিক গদ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। ২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘ আট বছর ধরে সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটা, কপোতাক্ষ থেকে বলেশ্বর পর্যন্ত লেখকের নিরন্তর যাত্রার ফসল এই বই। এখানে বনজীবীদের প্রাত্যহিক জীবনের সংগ্রাম, লোকায়ত বিশ্বাস, নারীস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব এবং মানুষের টিকে থাকার অদম্য স্পৃহা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে চিত্রিত হয়েছে।
বইটির প্রধান উপজীব্য হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে উপকূলীয় মানুষের জীবনমান, ভূগোল ও অর্থনীতিকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে। সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো শুধু ঘরবাড়িই ভাঙে না, মানুষের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং বংশপরম্পরায় গড়ে ওঠা শিকড়কেও উপড়ে ফেলে।
লেখক কপোতাক্ষ ও শিবসা নদীর করাল গ্রাসের চিত্র তুলে ধরেছেন। ‘নিঃস্ব হয়েও জীবনের রাজ উৎসবে’ গল্পে হীরা ও বিশ্বজিৎ দম্পতির জীবনের একটি নির্মম মুহূর্ত লেখক এভাবে তুলে ধরেছেন—
‘২০২০ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহের একদিন দুপুর থেকে জোর হাওয়া বইছে। সামান্য কিছু গুছিয়ে তোলার আগেই চোখের সামনে থেকে কে যেন এক টানে সরিয়ে নিল মাটির উঠানটা। এই উঠানের একপাশে বড়ো তিনটি আমগাছ, দুটো ছোটো পেয়ারাগাছে সদ্য সাদা ফুল হাসছে শিশুর দাঁতের মতো। প্রথমে বাতাসে চাল উড়ল তারপর পাতার মতো কাঁপতে থাকল দোকানের টিনের বেড়া। যমে-মানুষে টানাটানির মতো বাতাস টিনে টানাটানি চলল কিছুক্ষণ। জীবনের সব গল্প বদলে গেল মুহূর্তে। তলা থেকে চাক ধরে ধরে মাটি কেড়ে নিল কপোতাক্ষ। সামান্য একটা ঢোক গেলার শব্দের মতো শব্দ উঠল। কপোতাক্ষ টুক করে গিলে ফেলল সেই মিষ্টির দোকান।’
এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের বর্ণনা নয়; এটি প্রান্তিক মানুষের চরম অসহায়ত্বের একটি প্রতীকী চিত্রায়ন। লেখক এখানে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক রূপ বোঝাতে ‘যমে-মানুষে টানাটানি’ বা ‘সামান্য একটা ঢোক গেলার মতো শব্দ’-এর মতো উপমা ব্যবহার করেছেন, যা দৃশ্যটিকে পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে। কপোতাক্ষ নদ এখানে একটি অতিকায় দানবের মতো, যে মানুষের তিল তিল করে গড়া স্বপ্নকে এক মুহূর্তে গিলে খায়। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাচ্ছে সেইসব মানুষ, যাদের কার্বন নিঃসরণে কোনো ভূমিকাই নেই। হীরাদের মিষ্টির দোকানটি শুধু একটি দোকান ছিল না, সেটি ছিল তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন, তাদের মেয়ে পূজার ভবিষ্যৎ। কিন্তু প্রকৃতির কাছে মানুষের এই ক্ষুদ্র আয়োজন কতটা তুচ্ছ, তা এই অনুচ্ছেদে নির্মমভাবে ফুটে উঠেছে।
এরকম দুর্যোগের পর এই মানুষেরা পরিণত হয় ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুতে’। তারা নিজেদের ভিটা হারিয়ে বাঁধে আশ্রয় নেয়, কিংবা ‘বন থেকে নগরে’ আখ্যানে যেমনটি দেখা যায়, দাদন নিয়ে পাড়ি জমায় শহরের ইটভাটায়। তাদের এই অস্থায়ী অভিবাসন কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি তাদের আর্থসামাজিক মর্যাদাকেও ভূলুণ্ঠিত করে।

by সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা, প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৪, প্রকাশক: কথাপ্রকাশ, মুদ্রণ মূল্য: ৪০০ টাকা।
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/452601
সুন্দরবনের মানুষের জীবন এতটাই অনিশ্চিত যে, সেখানে কেবল যুক্তিবোধ দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। শ্বাপদসংকুল পরিবেশে, যেখানে পদে পদে বাঘ, কুমির আর সাপের ভয়, সেখানে মানুষ ভরসা খোঁজে অলৌকিক শক্তির কাছে। এই মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো ‘বনবিবি’। লেখক ‘সাধু মণ্ডলের বনবিবি উপাখ্যান’ এবং ‘লোকায়ত সুন্দরবন’ অধ্যায়ে এই মিথষ্ক্রিয়া গভীরভাবে তুলে ধরেছেন।
“ব্রিটিশ শাসনামলে নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী নিজেদের বহুকাল ধরে ফেলে রাখা দ্বীপে আবাদ শুরু করতে চেয়েছিলেন। সে জন্য কলকাতা শহর থেকে কয়েকটি নৌকায় করে পাঠানো হয়েছিল অল্প দামে পাওয়া শ্রমিকদের। …রজনী সেই শ্রমজীবীদের একজন। তাদের চোখে দেখা সুন্দরবনের বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। যেখানে বহু অভিজ্ঞতার পর তাঁরা সিদ্ধান্তে আসে, যে করেই হোক বড়ো করে বনবিবির পূজা না করে এ বাদায় কিছুই শুরু করা সম্ভব না। বনের ভেতর এক রাতে হয়েছিল সে পূজা। সবাই শ্রান্তিতে ঢলে পড়লে একজন শুধু দেখেছিল, জোছনার ভেতর কেউ একজন বনের ভেতর মিলিয়ে গেল। সে নারী। …ঔপন্যাসিক পাঠককে ধারণা দেন, এ হচ্ছে ভক্তের হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া ‘বনবিবি’।”
এই অনুচ্ছেদটি সুন্দরবনের লোকায়ত সংস্কৃতির মূল ভিত্তিটি ব্যাখ্যা করে। বনবিবির ধারণা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ফসল নয়, এটি প্রান্তিক বনজীবীদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে উদ্ভূত একটি মিশ্র মিথ। হিন্দু বা মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের বনজীবীরাই বনে প্রবেশের আগে বনবিবির থানে মানত করে। লেখক এখানে বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বনবিবি উপাখ্যান’ উপন্যাসের রেফারেন্স টেনে বুঝিয়েছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক বিত্ত বা ক্ষমতা (যেমন নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর মতো জমিদার) সুন্দরবনের প্রকৃতির কাছে অসহায়। সেখানে শাসন চলে বনের নিজস্ব নিয়মে। বনবিবি এখানে কেবল একজন রক্ষাকর্ত্রী নন, তিনি বনের ইকো-সিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানেরও নিয়ন্ত্রক। তিনি বনজীবীদের নির্দেশ দেন বনের সম্পদ মাত্রাতিরিক্ত লুণ্ঠন না করতে। সাধু মণ্ডলের জীবনে মাঝরাতে নৌকায় দেখা পাওয়া নারীমূর্তিটি আসলে তার অবচেতন মনের সতর্কতা, যা তাকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল। এই বিশ্বাসগুলোই তাদের ভয়াল বনে একা রাত কাটানোর সাহস জোগায়।
বইটির শক্তিশালী দিক হলো, লেখক নাগরিক সমাজের নৈতিকতার মাপকাঠিতে বনজীবীদের বিচার করেননি। ‘নোনাজলের তস্করেরা’ আখ্যানে নিত্যকানাই বা আজফার সরদারের মতো মানুষদের কথা বলা হয়েছে, যারা আইনত অপরাধী। তারা সুন্দরবনের গাছ বা মধু চুরি করে। বুকের নিচে আস্ত গাছ বেঁধে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটে।
কিন্তু লেখক তাদের ‘খুনি’ বা সাধারণ ‘চোর’-এর তকমা দিতে নারাজ। তিনি তাদের বলছেন ‘প্রকৃতিপুত্র’। অভাবের তাড়নায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যে চৌর্যবৃত্তি করে, সেটি আসলে ‘Crimes of Survival’ বা বেঁচে থাকার তাগিদে করা অপরাধ। বনবিভাগ বড় অপরাধীদের কমিশন নিয়ে ছেড়ে দেয়, আর ছোটো বনজীবীদের নামে মামলা ঠুকে দেয়—এই রূঢ় বাস্তবতায় নিত্যকানাইদের চুরি এক ধরনের প্রান্তিক বিদ্রোহের মতো শোনায়। এখানে নৈতিকতা সাদা-কালো নয়, বরং সুন্দরবনের কাদাপানির মতোই ধূসর।
নারীজীবন: বঞ্চনা, সংগ্রাম ও ক্ষমতায়ন
সুন্দরবনের নারীদের জীবন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। একদিকে তারা পুরুষের পাশাপাশি নদী ও বনে যায় মাছ বা কাঁকড়া ধরতে, অন্যদিকে দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারাই।
‘মা হাত ছাইড় না’ আখ্যানে সিডরের ভয়াল রাতে রানি বেগমের দুই সন্তান হারানোর ঘটনাটি যেকোনো পাঠকের হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে।
‘গর্তটা সম্ভবত বাড়ির পাশের নিচু জায়গার নরম মাটিতে পানির আঘাতে তৈরি। একমুখী স্রোতে বিচ্ছিন্ন হওয়া নিপুও সেখানেই পড়েছিল। হাবুডুবু খেতে খেতে এক হাতে সাঁতার কাটতে চেষ্টা করছেন রানি। অন্ধকার সেই গহ্বর থেকে সাঁতরে ওঠার সময় একবার পায়ের সঙ্গে স্পর্শ পেয়েছিল নিপুর। সেই শেষ স্পর্শ মা-সন্তানের। …অপুর মরদেহ দাফন করা হলো ভেসে যাওয়া বাড়ির একপাশে সামান্য জল কাদায় উজিয়ে থাকা সাড়ে তিন হাত জায়গায়। নিপুর মরদেহ পাওয়ার পর তুলে এনে ওকেও দাফন করা হলো ভাইয়ের কবরের সঙ্গেই। বাকহীন হয়ে গেলেন রানি। …ছোট শরীরটা নিয়ে কাদা-পানির রাজ্যে অভিমান নিয়ে আজীবনের মতো মুখ গুঁজে শুয়েছিল রানির রাজকন্যা নিপু।’
এই মর্মান্তিক দৃশ্যটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মানবিক মূল্য কতটা ভয়াবহ, তার একটি প্রামাণ্য দলিল। এখানে একজন মায়ের অসহায়ত্ব এবং প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ‘মা হাত ছাইড় না’—সন্তানের এই শেষ আকুতি উপকূলীয় এলাকার হাজারো বিপন্ন মানুষের আর্তনাদের প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকদের কাছে সিডরে মৃতের সংখ্যা কেবলই একটি পরিসংখ্যান হতে পারে, কিন্তু রানি বেগমের মতো মায়েদের কাছে এটি আজীবনের এক দুঃসহ ট্রমা।
যারা সুন্দরবনকে কেবল পর্যটকের চোখ দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত, এই বইটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রবলভাবে ধাক্কা দেবে। এটি পাঠককে বাধ্য করবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের স্বস্তি থেকে বেরিয়ে এসে কপোতাক্ষের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভিটেহারা হীরা, সুপেয় পানির জন্য অপেক্ষারত মানুষ, কিংবা বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসা কামালের জীবনের রুক্ষতাকে অনুভব করতে
অন্যদিকে, নারীদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবেই দেখানো হয়নি। ‘সরোজিনীর নিদানকাল’ আখ্যানে আমরা কৈলাসগঞ্জের ‘বুড়ির ডাবুর হাট’-এর কথা জানতে পারি, যেখানে ওয়াপদার রাস্তার দুপাশে বসে দোকানদারি করেন নারীরা। অনিতা সরকার বা কৃষ্ণা রায়ের মতো নারীরা এখানে স্বাবলম্বী। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা ব্যবসা করতে আসেন, দরদাম করেন, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে তারা সচেতন। এই হাটটি সুন্দরবনের নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আবার, ‘পালিয়ে যাওয়া নারীরা’ অধ্যায়ে আমরা দেখি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর কীভাবে মানবপাচার চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। অভাবের তাড়নায় মাজেদা খাতুনের মতো নারীরা সীমান্ত পার হতে বাধ্য হন। এই আখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব চরমভাবে লিঙ্গভিত্তিক।
বইটিতে এমন কিছু মানুষের গল্প আছে যারা নীরবে সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তারা অদৃশ্য।
সুকুমার বাউলিয়া (‘ছোটো পাঠশালার বড়ো শিক্ষক’)
১৯৭৮ সাল থেকে কয়রার হাজতখালীতে গোলপাতার ছাউনির নিচে পাঠশালা চালাচ্ছেন তিনি। নদীভাঙন, দারিদ্র্য কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তিনি শুধু শিশুদের অক্ষরজ্ঞানই দিচ্ছেন না, তাদের নীতিশিক্ষাও দিচ্ছেন।
টাইগার গনি (‘সুনাম যার কাল হয়েছে’)
যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঘের হামলায় নিহত বা আহত বনজীবীদের উদ্ধার করেন। শতাধিক মরদেহ তিনি পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই বীরত্বের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, বরং তাকে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়।
রাসেল (‘মানুষ কি পাখির মতো ভালোবাসা বোঝে’)
যে তরুণ নিজের শ্রমে মাইলের পর মাইল মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন বসিয়ে পুরো একটি গ্রামের মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে।
এই মানুষগুলো প্রমাণ করে যে, চরম অভাব এবং প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের ভেতরের মানবিক সত্তাটি মরে যায় না। তারা যেন সুন্দরবনের কেওড়া বা বাইন গাছের মতোই, নোনাজলে ডুবে থেকেও সবুজে বেঁচে থাকতে জানে।
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমামের গদ্য পরিমিত এবং মেদহীন। তিনি জটিল শব্দের ব্যবহার করেননি, আবার তার লেখাকে নিছক প্রতিবেদনও হতে দেননি। স্থানীয় উপভাষা, বুলি এবং মাছ বা গাছের নাম (যেমন: চরখাদা বা মোচড় মাছ, পায়রা মাছ) তিনি মূল আখ্যানের সাথে বুনে দিয়েছেন।
‘ভরা কটালে কাঁকড়া উঠে আসে পানির ধারে আর অন্ধকার রাতে বনের মাথায় আশ্চর্য এক আলো খেলা করে’—এ ধরনের বর্ণনায় লেখকের সাহিত্যিক মুন্সিয়ানা স্পষ্ট হয়। তিনি যখন বলেন, ‘যে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছ সে মৃত্যুকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও সে ফিরে যায় বনের কাছে,’ তখন তা কেবল একটি বাক্য থাকে না, সুন্দরবনের মানুষের জীবনদর্শনের স্লোগান হয়ে ওঠে।
একটি সফল অ-কল্পকাহিনী হিসেবে ‘বনের মানুষ মানুষের বন’ এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রামাণ্যতা। লেখক দূর থেকে বসে কল্পনা করেননি, তিনি বছরের পর বছর নিজে কাদা ভেঙেছেন, ট্রলারে রাত কাটিয়েছেন। ফলে তার লেখায় মাটির গন্ধ পাওয়া যায়।
বইটির কয়েকটি দিকে আরও একটু আলোকপাত করা যেত। যেমন—লেখক প্রান্তিক মানুষের দুর্দশার কথা বলেছেন, কিন্তু এই সংকট সমাধানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গলদ, বনবিভাগের দুর্নীতি বা আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ব্যবহার নিয়ে খুব বেশি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেননি। যদিও তিনি ভূমিকাতেই বলে নিয়েছেন যে এটি কোনো গবেষণাপত্র নয়, তবু আখ্যানের গভীরে এই বিষয়গুলো সামান্য স্পর্শ করলে প্রেক্ষাপট আরও পূর্ণাঙ্গ হতো। রানি বেগম বা টাইগার কামালের মতো ট্রমাটাইজড মানুষদের মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো সুযোগ সেই সমাজে আছে কি না, তা নিয়ে আরেকটু আলোচনা করা যেত।
‘বনের মানুষ মানুষের বন’ কেবল একটি ভ্রমণকাহিনি বা স্মৃতিকথা নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপন্ন মানুষের একটি সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক দলিল। সতীশচন্দ্র মিত্র যেমন শত বছর আগে ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ লিখেছিলেন, সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম যেন এই গ্রন্থে বর্তমান শতাব্দীর সুন্দরবন ও তার মানুষের টিকে থাকার ইতিহাসের একটি নতুন খণ্ড রচনা করলেন।
যারা সুন্দরবনকে কেবল পর্যটকের চোখ দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত, এই বইটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রবলভাবে ধাক্কা দেবে। এটি পাঠককে বাধ্য করবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের স্বস্তি থেকে বেরিয়ে এসে কপোতাক্ষের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভিটেহারা হীরা, সুপেয় পানির জন্য অপেক্ষারত মানুষ, কিংবা বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসা কামালের জীবনের রুক্ষতাকে অনুভব করতে। সাহিত্যের মূল কাজ যদি হয় মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও বোঝাপড়ার বিস্তৃতি ঘটানো, তবে সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমামের এই গ্রন্থটি সেই পরীক্ষায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ।





















































