গল্প আসলে কী? কেবলই কি মানুষের যাপিত জীবনের নিরেট প্রতিচ্ছবি, নাকি লেখকের অবচেতনের গহীনে সন্তর্পণে বোনা কোনো শৈল্পিক বুনন? সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে। গুহামানবের আঁকা চিত্রলিপি থেকে শুরু করে দাদি-নানির কোলে মাথা রেখে রূপকথার জাদুকরী জগতে হারিয়ে যাওয়ার যে চিরায়ত আকাঙ্ক্ষা, তা আধুনিক, যন্ত্রক্লান্ত মানুষের মনেও সমানভাবে বিদ্যমান। মানুষ আসলে গল্পের ভেতর দিয়ে নিজেরই নানা রূপ, নিজেরই না-বলা কথাগুলোর প্রতিধ্বনি শুনতে চায়, খুঁজতে চায় জীবনের অজানা সমীকরণগুলোর উত্তর।
তবে সময়ের আবর্তনে রূপকথার খোলনলচে আজ অনেকটাই বদলে গেছে। পঙ্খিরাজ ঘোড়ার জায়গা দখল করেছে আমাদের যান্ত্রিক জীবনের নিরন্তর দৌড়, আর রাক্ষস-খোক্কস কিংবা দৈত্য-দানবের স্থান নিয়েছে খোদ সমাজেরই ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলো। আজকের দিনের তেপান্তরের মাঠ হলো ইট-কাঠ-পাথরের কংক্রিটের জঙ্গল, যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের সাথে এবং পারিপার্শ্বিকতার সাথে এক অদৃশ্য যুদ্ধে লিপ্ত। আধুনিক জীবনের এই জটিল আবর্তে রূপকথার সেই চেনা স্বস্তিটুকু আর নেই, বরং সেখানে যুক্ত হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, নিঃসঙ্গতা আর অস্তিত্বের সংকট।
কথাসাহিত্যিক সাদিয়া সুলতানার ‘লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ’ ঠিক এমনই এক আধুনিক জীবনের আখ্যান, যেখানে জাদুর কাঠির বদলে রয়েছে বাস্তবতার তীব্র কশাঘাত। সাদিয়া সুলতানা নিপুণভাবে তাঁর এই লেখায় প্রাত্যহিক জীবনের চেনা ছকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অচেনা রহস্য আর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাগুলোকে তুলে ধরেছেন। তিনি এমন এক আখ্যান তৈরি করেছেন, যা একই সঙ্গে আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা।
‘ঘরবউনি সাপ’ বা বাস্তুসাপ—লোকজ বিশ্বাসে যা গৃহস্থের রক্ষক কিংবা অলক্ষ্য প্রহরীর প্রতীক, তা এই বইয়ে এক শক্তিশালী রূপক হয়ে ধরা দিয়েছে। এটি হতে পারে আধুনিক মানুষের জীবনে জড়িয়ে থাকা অদৃশ্য শেকল, অন্ধ সংস্কার কিংবা অবচেতনে লুকিয়ে থাকা কোনো গোপন ভয়ের প্রতিমূর্তি। আর ‘লিলিয়ানা’ যেন আমাদেরই এক প্রতিচ্ছবি, যে এই মায়াবী অথচ রূঢ় বাস্তবতার গোলকধাঁধায় নিজের পথ খুঁজছে।
গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক নিজেই গল্পের স্বরূপ অন্বেষণ করেছেন। তিনি গল্পের কাছে নিছক বিনোদন প্রত্যাশা করেন না; চান এমন এক ইন্দ্রিয়াতীত অনুভব, চায়ের টেবিলে রাখা কাপের উষ্ণতা জুড়িয়ে যাওয়ার মতো গভীর আবেশ।
‘এই যে ভেজা ভেজা অনুভব, স্যাঁতস্যাঁতে একটা বিষণ্ণতা থেকে ফের প্রসন্ন হয়ে ওঠা—গল্পের কারসাজি হয়তো এটাই। যেই গল্প এমন কারসাজি জানে সেই গল্পকে সহজে ভোলা যায় না, গল্পের চরিত্রগুলোও হঠাৎ হঠাৎ মগজের কোনে কোনে পায়চারি করতে থাকে।’
লেখকের এই নিজস্ব দর্শন পুরো গ্রন্থের মূল সুর নির্ধারণ করে দেয়। গল্প এখানে পাঠককে কেবল হাসায় বা কাঁদায় না, প্রবলভাবে অপ্রস্তুত করে। প্রতিটি আখ্যানের শেষে পাঠক এক ধরনের মানসিক ধাক্কা অনুভব করেন। এই ধাক্কাই সাদিয়া সুলতানার গল্পকথনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
নারীজীবনের অবদমন ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর
গ্রন্থের অধিকাংশ গল্প নারীচরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই নারীরা কেউ শোষিত, কেউ বিদ্রোহী, আবার কেউবা বাস্তবতার চাপে মানসিক ভারসাম্যহীন। ‘কিন্নর’ গল্পে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীর শরীর নিছক সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়। ব্যর্থতায় জোটে অকথ্য নির্যাতন। প্রধান চরিত্র হেনার মা ‘আম্মা’ অবিরত শারীরিক নির্যাতনের শিকার। তার গালে সবজি কাটার ছুরির দগদগে দাগ মূলত তার অবদমিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। স্বামী তাকে লাথি মেরে একাধিক সন্তান নষ্ট করেছে।
‘বুঝছোস হেনা। দুইটা বাচ্চা নষ্ট হইল এমনে। লাথি না খাইলে দুইটা বাচ্চাই টিক্যা যাইতো। তোর আরো বোন থাকতো।’
মায়ের এই ট্রমা উত্তরাধিকার সূত্রে হেনার জীবনেও প্রভাব ফেলে। হেনার প্রেমিক মুবিন তাকে গর্ভবতী করে পালিয়েছে। হেনার ভয়াবহ হ্যালুসিনেশনে বিকলাঙ্গ ভ্রূণ বা ‘কিন্নর’ আবির্ভূত হয়।
‘কিন্নরের কণ্ঠস্বর মুবিনের মতো। আমার প্রেমিক মুবিন। আমার গর্ভসঞ্চারের কথা জেনে আমাকে এক ঝটকায় ফেলে চলে গেছে।’
এই কিন্নর আসলে সেই বিষাক্ত পুরুষতন্ত্রের প্রতীক। নির্যাতিত মায়ের গর্ভে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের জন্ম অসম্ভব। পুরুষতান্ত্রিক শোষণের চক্র মায়ের পর মেয়ের জীবনেও একইভাবে আবর্তিত হয়।

by সাদিয়া সুলতানা
প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান, প্রকাশকাল: ২০২৪, প্রকাশক: জলধি, মুদ্রণ মূল্য: ৪০০ টাকা।
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/434814
অনুরূপ মাত্রার ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে ‘সাদা রক্ত’ গল্পে। স্বামী মিজানের হাতে সদ্যোজাত সন্তানের নির্মম মৃত্যু মা মায়াকে এক আদিম হিংস্রতায় জাগিয়ে তোলে। মিজানের পূর্বতন স্ত্রী চম্পা অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে যৌনকর্মীর খাতায় নাম লিখিয়েছিল। চম্পা একদিন মায়ার পথ আটকে অভিশাপ দিয়েছিল।
‘একদিন জুত মতো পাইলে হারামির গলাটা চিপ দিয়া ধরমু… খুব সুখ দিতাছে বুঝি হারামিটা। বুঝবি বুঝবি, বছরও ঘুরবো না।’
চম্পার এই অভিশাপ মায়ার জীবনে সত্য হয়ে ফেরে। মাতৃস্তনে জমে ওঠা দুধ বা ‘সাদা রক্ত’ এখানে সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা হাহাকারের প্রতীক। সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নিতে মায়া স্বামীর গলা চেপে ধরে। অবদমিত নারী রূপান্তরিত হয় ভয়ংকর রুদ্রাণীতে। গল্পের এই মোচড় পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়।
এই অবদমনের আরেক চরম রূপ দেখা যায় ‘মইওর বিবির ময়ূর’ গল্পে। বৃদ্ধ, কামুক মুকিমের সংসারে মইওর বিবি এক সন্তানহীনা, নির্যাতিতা নারী। মুকিমের প্রথম বালিকা স্ত্রী তাহেরা যৌন নির্যাতনের বলি হয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছিল।
‘প্রথম রাত থেকেই তাহেরার গোপনাঙ্গ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়েছিল… মুকিম উপগত হলেই ছোট শরীরটা আতংকে শক্ত হয়ে গেছে।’
এই অমানবিক বাস্তবতার হাত থেকে বাঁচতে মইওর বিবি জঙ্গলে পরিত্যক্ত মন্দিরে কল্পনার ময়ূর খুঁজতে যায়। ময়ূর এখানে তার জীবনের অপূর্ণ প্রেম, সৌন্দর্য ও উর্বরতার অলীক প্রতীক।
সামাজিক শৃঙ্খল ও দৃষ্টির কারাগার
সমাজ প্রতিনিয়ত মানুষের পায়ে অদৃশ্য শৃঙ্খল পরায়। ‘লোকে কী বলবে?’ গল্পটি এই সামাজিক ব্যাধির নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ। ঝিলির বড় বোন মিলি আপা মদ্যপ স্বামীর অকথ্য অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে।
‘লোকে কী বলবে? এই কথা ভেবে ভেবেই দুজনের জীবন কেটে গেল… মিলি আপাও মায়ের মতো কপাল পেয়েছে। মুখ বুজে মিলি আপা মদ্যপ স্বামীর সংসার করছে।’
সমাজের চোখে ‘ভালো মেয়ে’ বা ‘আদর্শ স্ত্রী’ হয়ে থাকার জন্য নারীরা বছরের পর বছর পারিবারিক সহিংসতা মেনে নেয়। ঝিলির বন্ধু বুলু কোচিং সেন্টারের শিক্ষকের লালসার শিকার। তার মা পুরো ঘটনাটি জেনেও সমাজের ভয়ে তাকে চুপ থাকতে বাধ্য করে।
‘বাড়িতে ফিরে বুলু ওর মাকে সব বলেছিল, বলতে বলতে খুব কেঁদেছিল। বুলুর মা বুলুর মুখ চেপে ধরে বলেছিল, ‘কাউকে বলিস না। শুনলে লোকে কী বলবে।’
সমাজ এখানে একটি ‘প্যানোপটিকন’ বা সর্বদর্শী কারাগার। সম্মানের ভয়ে মানুষ নিজের স্বাভাবিক অধিকার নির্দ্বিধায় বিসর্জন দেয়।
‘দোলনা’ গল্পেও এই অবদমনের সুর অনুরণিত। মধ্যবিত্ত নিপার জীবনে একটি সাধারণ দোলনায় বসার শখ চরম বিলাসিতা হিসেবে গণ্য হয়। স্বামী জাহাঙ্গীরের কাছে এটি নিছক অর্থের অপচয়।
‘খরচের নতুন বাহানা! আর কচি মেয়েদের মতো দোলনায় দোলার বয়স আছে তোমার? যত্তসব আদিখ্যেতা।’
শৈশবে দোলনায় দুলতে গিয়ে পাড়ার যুবক আনন্দের হাতে যৌন হেনস্তার শিকার হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি নিপার অবচেতনে লুকিয়ে আছে। নতুন ভাড়াটিয়া স্বাধীন মেয়েটির বারান্দায় দোলনা দেখে নিপার সুপ্ত বাসনা পুনরায় জেগে ওঠে। মধ্যবিত্তের সীমাবদ্ধতা তাকে আজীবন শিকল পরিয়ে রাখে। একটি সামান্য আসবাব নারীজীবনের অপূর্ণ ইচ্ছা ও মুক্তির রূপক হয়ে ওঠে।
প্রান্তিক মানুষের সংকট ও রাজনৈতিক দহন
সমাজের নিচুতলার মানুষদের কাছে আইন, বিচার ও রাজনীতি প্রহেলিকা সমতুল্য। ‘ঘুলঘুলি’ ও ‘নামঞ্জুর’ গল্পে আইনি জটিলতায় পিষ্ট দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্ব চিত্রিত হয়েছে। ‘ঘুলঘুলি’ গল্পের ছন্দা নিজের কন্যাসন্তান হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার প্রেমিক সবুজ মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে সহজেই জামিন পেয়ে যায়।
‘তাই না তোমারে দিয়া স্বীকারুক্তি করাইল। আমি ছাড়ান পাইলাম… শালার করুনা বিদায় হউক।’
জেলের বদ্ধ প্রকোষ্ঠে ছন্দা দেওয়ালে কয়লা দিয়ে মেয়ের নাম লেখে। ভুল বানানে লেখা এই নাম ছন্দার জীবনের বেসুরো পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে। অন্যদিকে ‘নামঞ্জুর’ গল্পে মিথ্যা হত্যা মামলায় ফাঁসানো ছেলে নবু চাঁদকে ছাড়িয়ে আনতে মা সন্নাতুনের নিদারুণ সংগ্রাম পাঠককে বিষণ্ণ করে তোলে।
‘রহমতুল্লাহ মুহুরি যে কইল, টাকা দিলেই জামিন হইবে। খালি ঢাকাত যাওয়া নাগবে। তুই টাকা পাইসা যোগাড় করি ঢাকা যা।’
উকিল, মুহুরি, আর রিমান্ডের ‘ডিম থেরাপি’—এই শব্দগুলো প্রান্তিক মানুষের জীবনে সাক্ষাৎ যমদূত। ন্যায়বিচার কেবল অর্থের মানদণ্ডে বিক্রিত পণ্য।
‘লাল পিঁপড়া’ গল্পে ধর্মীয় রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন রূপ উন্মোচিত। মাতৃস্নেহ বঞ্চিত, নির্যাতিত যুবক সিদ্দিককে টাকার বিনিময়ে মন্দিরে উসকানিমূলক বস্তু রাখার দায়িত্ব দেয় সোলাইমান।
“পিঁপড়ার সারি দেখলেই সিদ্দিকের শরীর রি রি করে ওঠে… গাছের গোড়ায় দলবদ্ধ লাল পিঁপড়াদের পায়ের নিচে পিষে মারতে মারতে প্রবল রোষে বলে, ‘মর শালার হিন্দু পিঁপড়া।’”
লাল পিঁপড়া সিদ্দিকের অবদমিত ক্রোধ, অপমান এবং রাজনৈতিক শোষণের প্রতীক। সমাজের উপরতলার মানুষেরা সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধায়। নিরীহ মানুষ রাজনৈতিক দাবাখেলার বোড়েতে পরিণত হয়।
আধুনিক শহুরে জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রচলিত ছক ভেঙে পড়ছে। ‘পুরুষ, পুরুষ নয়’ গল্পে এই পরিবর্তিত সমীকরণের চিত্র দেখা যায়। স্ত্রী মুনিরা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত আধিপত্য বিস্তারকারী। স্বামীর চোখে সে এক অপ্রতিরোধ্য সত্তা।
‘সবকিছুতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে ওঠা আমিও ওর আলোর কাছে পতঙ্গসদৃশ পড়ে থাকি। ওদিকে আমি উপযাচক হয়ে কখনও ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ছল খুঁজতে গেলে দুজনের সামনে মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ম্যালথাস এসে পড়ে।’
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ সর্বদা নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে অভ্যস্ত। স্ত্রীর এই প্রবল ব্যক্তিত্ব এবং বৌদ্ধিক শ্রেষ্ঠত্ব স্বামীর পুরুষত্বকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে। শারীরিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রক নারী হওয়ায় চিরায়ত ‘পুরুষ’ সত্তাটি সংকটে নিপতিত হয়।
গ্রন্থটির পাঠ শেষে পাঠক যখন বইয়ের মলাট বন্ধ করেন, তখন তার স্বস্তি মেলে না; বরং নিজেরই মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। এখানেই লেখকের চরম সার্থকতা। তিনি পাঠককে এক নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে গল্প শোনার সুযোগ দেননি
একইভাবে ‘পরী ও কুরুশকাঁটা’ গল্পে বিবাহবিচ্ছেদ পরবর্তী পুরুষতান্ত্রিক অহমের পতন দৃশ্যমান। স্ত্রী ফারহানা সুনীলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে চলে যাওয়ার পর স্বামী দীপু প্রতিশোধের কল্পনায় বিভোর থাকে। সে স্বপ্নে এক ডানাকাটা পরী দেখে।
‘আমি দেখি একটা ডানাকাটা পরী আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে… আমি দেখিওনি। এ ডানাকাটা রূপসী না, একেবারে পরী, যার ডানা দুটো পিঠের দিক থেকে কাটা।’
এই ডানাকাটা পরী দীপুর নিজের খণ্ডিত অহংকার এবং ফারহানার প্রতি তার অবচেতন আকাঙ্ক্ষার মিশেল। ফারহানার সঙ্গে পুনরায় দেখা হওয়ার সুযোগ এলে দীপু মনে মনে তাকে অপমান করার ছক কষে। বাস্তবে তার ভেতরের শূন্যতাই প্রকট হয়ে ওঠে।
নাগরিক জীবনের নিভৃত একাকিত্বের চিত্র ফুটে ওঠে ‘ব্লাডি হোর’ গল্পে। বিত্তবান আনজুর স্বামী ফরহাদ দামি চিত্রকর্ম সংগ্রহে ব্যস্ত, স্ত্রীর প্রতি চরম উদাসীন। আনজুর বাড়িতে শৈশবের বান্ধবী টুসির আগমন ঘটে। টুসি দরিদ্র দর্জির কাজ করলেও তার আত্মসম্মানবোধ প্রবল।
‘বায়নার বাম চোখের ওপরে একটা টিউমার হয়েছে, অপারেশন করতে হবে। এত সেনসেটিভ জায়গায় টিউমারটা, ভাবছি দেশের বাইরে যদি নিতে পারি।’
টুসির এই অদম্য জীবনসংগ্রামের বিপরীতে আনজুর বিলাসবহুল জীবন নিছক অন্তঃসারশূন্য মনে হয়। মানুষের মানসিক দূরত্বের অসাধারণ রূপায়ণ রয়েছে এখানে।
স্মৃতির দহন, অপেক্ষা ও মহাকালের ছায়া।
মানুষ মূলত স্মৃতির দাস। ‘কাজলগৌরী ইলিশ’ গল্পে দারিদ্র্য এবং ভাইবোনের অকৃত্রিম ভালোবাসার চিত্র ফুটে ওঠে। দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত পিতার সংসারে একটি ইলিশ মাছ কেনা বিশাল উৎসবের সমতুল্য।
‘আমাদের পাতে যখন গাদিখানেক তরকারির ফাঁক দিয়ে এক টুকরো পুঁটি বা টেংরা মাছ উঁকি দিতো তখন ভোমলা আমাদের পায়ের কাছে শান্ত চেহারায় বসে থাকতো… ছোট ঠিকই নিজের পাতের একমাত্র মাছটি ওর পাশে রাখবে।’
ছোট বোনের পোষা বিড়াল ভোমলার প্রতি মমতা এবং অভাবের সংসারে একটু ভালো খাবারের স্বপ্ন এই গল্পকে জাদুকরী নস্টালজিয়ায় মুড়ে দেয়।
অন্যদিকে ‘দুলিসুন্দরের ধূলি’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ট্রমা চিত্রিত। পাগলপ্রায় হাচিনা বিবি আজও তার নিখোঁজ ছেলে হানিকুল এবং মিলিটারির ভয়ে তটস্থ।
‘মিলিটারি আইছে, পালাও পালাও… এই ডাক শুনেই যেন হানিকুল ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসবে, মায়ের পাত বিছানো পাটির ওপরে হাত পা ছড়িয়ে বসে খেয়েদেয়ে কোমর বেঁধে যুদ্ধে নামবে।’
হাচিনার এই পাগলামি এক জাতির না-ভোলা শোকের প্রতীক। ধুলোমাখা পথে তার নিরন্তর অপেক্ষা শেষ হয় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ধূলিকণাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে হাচিনার শোকের মাতম গায়।
‘বিবাগী সুখ’ গল্পে এই অপেক্ষার আরেক ভিন্ন রূপ দেখা যায়। স্বামী নেয়ামত বারবার সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়। স্ত্রী নয়নতারা ধবল নদীর পাড়ে অনন্ত প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে। মালয়েশিয়া ফেরত যুবক মিলন নয়নতারাকে নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখায়।
‘যে বিবাগী, সে অভাগী। আমি এইবার সংসারী হমু, খেত-খামারি করুম, হাঁস মুরগি পালুম, লাউয়ের মাচা দিমু।’
নয়নতারা এই প্রলোভনে পা না দিয়ে তার বিবাগী সুখের প্রতীক্ষাতেই অটল থাকে। মানুষের অবিনাশী প্রেম ও অপেক্ষার এই অনন্ত রূপ মহাকালের ক্যানভাসে এক অপূর্ব সংযোজন।
সাদিয়া সুলতানার ‘লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ’ গ্রন্থটিকে প্রচলিত অর্থে কেবল একটি ‘গল্পসংকলন’ বলা চলে না। এটি মূলত আমাদের যাপিত জীবনের এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক অটোপসি। প্রতিটি গল্পের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা চরিত্রগুলো কোনো কাল্পনিক গ্রহের বাসিন্দা নয়। এরা আমাদেরই অবদমিত সত্তা, আমাদেরই পাপবোধ, আর সমাজের সম্মিলিত অপরাধের নীরব সাক্ষী। গ্রন্থটির পাঠ শেষে পাঠক যখন বইয়ের মলাট বন্ধ করেন, তখন তার স্বস্তি মেলে না; বরং নিজেরই মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। এখানেই লেখকের চরম সার্থকতা। তিনি পাঠককে এক নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে গল্প শোনার সুযোগ দেননি। তাকে টেনে নামিয়েছেন বাস্তবতার কাদাজলে। এই কর্দমাক্ত, ক্ষতবিক্ষত এবং রক্তাক্ত যাত্রাপথ অতিক্রম করার পর একজন পাঠকের পক্ষে আর আগের মতো নির্লিপ্ত থাকা সম্ভব হয় না। এই গ্রন্থ সময়ের এক জ্বলন্ত জবানবন্দি হয়ে পাঠকের স্নায়ুতে চিরস্থায়ী অনুরণন তৈরি করে।





















































