২০ মার্চ ২০২৬
লেখক লিখবে নাকি বই বেচবে?
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
47

গুঞ্জন রহমান
গল্পকার

47

লেখক লিখবে নাকি বই বেচবে?

  • ফেব্রুয়ারির বাইরে বছরের অন্য এগারো মাসে বই প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের ক’জন লেখকের?
  • তারকা খ্যাতি নেই, কিন্তু ভালো লিখেন — এমন কতজন জীবিত লেখকের বই পাঠক নিজ আগ্রহে খুঁজে নিয়ে কেনেন?
  • যেসব লেখক তারকাখ্যাতি নিয়ে বইমেলায় দাপিয়ে বেড়ান, তাদের ক’জন ‘বই লিখেই’ তারকা হয়েছেন?
  • গান গেয়ে ও গান লিখে, অভিনয় করে, নাটক-সিনেমা করে, টিভিতে চেহারা দেখিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ হয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে আলোচিত বা সমালোচিত হয়ে প্রাপ্ত জনপ্রিয়তা ছাড়া, কেবল লেখার জোরে পাঠকের কাছে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন কতজন লেখক?
  • পদক-পুরস্কারের জোরে কিংবা অন্য কোনোভাবে তারকাখ্যাতি জুটে যাওয়ার পরও, বইমেলায় সশরীর উপস্থিত না থাকলে কজন লেখকের বই দেদারসে বিক্রি হয়?

হুমায়ূন আহমেদ যদি বিটিভির হুমায়ূন আহমেদ না হতেন, যদি নাটক লিখে খ্যাতি অর্জন না করতেন, তিনিও বইয়ের বিক্রি লাখের ঘরে নিতে পারতেন কি না, সন্দেহ আছে। ইমদাদুল হক মিলন তো পুরোটাই টিভি নাটকের নাট্যকার পরিচিতি ভাঙ্গিয়ে বেস্ট সেলার লেখক হয়েছেন। তবে এই দু’জন অবশ্য টিকে গেছেন তাঁদের লেখার জোরেই। টিভির মাধ্যমে অর্জিত জনপ্রিয়তার জোরে যখনই বইয়ের কাটতি বাড়তে শুরু করেছে, তাঁরা ওই হাওয়াটাকে চিনে নিয়েছেন, বছরের পর বছর সেই হাওয়ায় পাল খাটিয়ে তরতর করে এগিয়ে গেছেন। হুমায়ূন তবু আলস্য ভেঙ্গে কিছু ভালো বই লিখেছেন, কিন্তু মিলন এক নূরজাহান লিখেই ধরে নিয়েছেন যে, বাংলা ভাষার সর্বকালের সবচেয়ে বড় মাস্টারপিসটা তিনিই লিখে ফেলেছেন, অতএব, বাকি জীবন এটাকে ভাঙ্গিয়ে খেলেই চলবে। ভাবতে পারেন, একজন লেখক তাঁর নিজের লেখা গল্পের চরিত্রের মুখ দিয়ে প্রশংসা করিয়ে নিচ্ছেন নিজেরই লেখা বইয়ের! আমি তাঁর একাধিক বইয়ে পড়েছি, গল্পের একটি চরিত্র নূরজাহান বইটা হাতে নিয়ে বলছেন— এ এমন এক বই, শেষ না করা পর্যন্ত হাত থেকে নামিয়ে রাখা যায় না, বাংলা ভাষায় এমন কালজয়ী সৃষ্টি বহুদিন হয়নি… ইত্যাদি ইত্যাদি! … আমার সেরেফ হাসি পেয়েছিলো লোকটির বোকামিতে।

হুমায়ূন-মিলনদের কথা থাক। আমাদের সময়ের কথা বলি। এই কালের কোনো প্রকাশক তাঁর প্রকাশিত বইটি বিক্রির জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেন না। লেখক বই লিখে আনেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম্পিউটারে কম্পোজ করে, প্রকাশনা সংস্থার গ্রাফিক ডিজাইনার বড়জোর ফর্মা সেট করে প্লেট বানিয়ে দেয়। পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করা, বানান সংশোধন — ইত্যাদি নিয়ে প্রকাশক একেবারেই মাথা ঘামান না। কেবল তাই নয়, বইটা বিক্রি করার জন্যও তিনি তেমন কোনো ব্যবস্থা করেন না। বিপণন বলে একটা ব্যাপার সকল ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। বিপণন কিন্তু বিক্রি নয়, এটা হলো বিক্রির জন্য আদর্শ বাজার, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, মাধ্যম ইত্যাদি সৃষ্টি করা। আমাদের দেশের পুস্তক ব্যবসায়ে বিপণন তেমন চোখেই পড়ে না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। পশ্চিমা দেশগুলোর অনুকরণে এমনকি পাশের দেশ ভারতেও কোনো বইয়ের প্রকাশনা উদ্বোধন ও বিপণনের জন্য প্রকাশক কর্তৃক বুক রিডিং সেশন আয়োজন করা হয়। লেখক স্বয়ং তাঁর বই থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ পড়ে শোনান। পাঠকরা উপস্থিত থাকেন, লেখকের মুখ থেকে তাঁর বইয়ের অংশবিশেষ শুনতে পারেন, কখনও কখনও প্রশ্নোত্তর পর্বও থাকে। পাঠ ও আলোচনা শেষে লেখকের অটোগ্রাফসহ বই কিনতে পারেন। সুযোগ থাকলে সেলফিও তুলতে পারেন লেখকের সাথে। লেখক অনেক বড় তারকা হলে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিতির জন্য পাশ/প্রি-রেজিস্ট্রেশনও আবশ্যক হয়। এবং জনপ্রিয় লেখক বা আলোচিত গ্রন্থের জন্য প্রকাশক এই অনুষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে নানান শহরে আয়োজন করে থাকেন। লেখক নানান শহরে ঘুরে ঘুরে ভক্তদের সাথে মিলিত হতে পারেন, তাদের কথা শুনতে পারেন, নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন, পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারেন। এই অনুষ্ঠানের সুবাদে বইটি ও তার লেখক সম্পর্কে মিডিয়ায় কাভারেজও চলে আসে। বইয়ের বিক্রি যেমন বাড়ে, তেমনি লেখক নিজেও সম্মানিতবোধ করেন। … আমাদের দেশে এমন কোনো আয়োজন হয় কি? হয়ে থাকলে, ক’জন লেখককে নিয়ে?

বইমেলা উপলক্ষে প্রতি বছর মাসব্যাপী লেখক-পাঠক মিলনমেলা হয় — এটা অমর একুশে বইমেলার খুবই ইতিবাচক দিক। কিন্তু নেতিবাচক দিক হলো, সেই বইমেলাতে লেখককে রীতিমতো দোকানদারি করার মতো করে নিজের বই বিক্রি করতে হয়। গড়পড়তা লেখকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন, তিনি উপস্থিত থাকলে তাঁর বই বিক্রি হয়, না থাকলে কেউ তাঁর বইয়ের খোঁজও নেয় না। লেখক কেন বই বিক্রি করবেন? কেন তাঁর নিজের পরিচিতজন, আত্মীয়-বন্ধুদের ডেকে ডেকে নিজের বইয়ের প্রচার, বিজ্ঞাপন করতে হবে লেখককে?

বিপণন বলে একটা ব্যাপার সকল ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। বিপণন কিন্তু বিক্রি নয়, এটা হলো বিক্রির জন্য আদর্শ বাজার, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, মাধ্যম ইত্যাদি সৃষ্টি করা। আমাদের দেশের পুস্তক ব্যবসায়ে বিপণন তেমন চোখেই পড়ে না

পশ্চিমা দেশের প্রকাশকেরা একজন সুলেখককে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। কারণ, তাঁরা বিশ্বাস করেন, বই বিক্রিই তাঁদের ব্যবসার একমাত্র উপায়। বিক্রি যত বাড়বে, তাঁদের মুনাফা তত বেশি। আর বিক্রি হবে সেই বইটাই, যে বইটা সত্যিকার একটি ভালো বই। সুপাঠ্য, দরকারি, সাহিত্যমানে উন্নত। তেমন বই লিখতে পারেন যে লেখক, তাঁকে যেকোনো মূল্যে লেখালেখিতে ধরে রাখতে হবে। তাঁর লেখার বিনিময়ে প্রাপ্য যোগ্য সম্মানী ও সম্মান—দুটোই তাঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে, যাতে তিনি নতুন সৃষ্টির জন্য উৎসাহ পান, লেখালেখির কাজটাকে উপভোগ করতে পারেন। তাঁর যেন কিছুতেই মোটিভেশনের ঘাটতি না হয়। সেসব দেশে নতুন লেখকের জন্য প্রকাশকের চোখে পড়াটা একটা চ্যালেঞ্জ বটে। কিন্তু একবার যদি কোনো প্রকাশক বুঝতে পারেন যে, এই লেখকের ভেতরে কিছু আছে, এর হাতে আরও অনেক ভালো কিছু সৃষ্টি হতে পারে, তাহলে সেই মুহূর্ত থেকে সেই লেখকের দায়িত্ব নিয়ে ফেলেন প্রকাশক। লেখক যদি তখন পেশাদার লেখক নাও হয়ে থাকেন, লেখালেখির বাইরে অন্য কোনো পেশায় তিনি প্রতিষ্ঠিত ও যথেষ্ট পরিমাণে উপার্জনকারীও হয়ে থাকেন, তবুও প্রকাশক তাকে ছাড়েন না। তার পেছনে লেগে থেকে অন্য পেশা থেকে তাকে ছাড়িয়ে এনে ফুলটাইম লেখালেখির টেবিলে বসিয়ে দেন। কারণ তারা জানেন, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ব্যবসায়ী ইত্যাদি যে-কেউ চেষ্টা করে হতে পারে, কিন্তু চেষ্টা করেও কখনো লেখক হওয়া যায় না। এটা ভেতরে থাকতে হয়। লেখালেখির দক্ষতাটা ব্যক্তির সহজাত, যার ভেতরে থাকে, তার ভেতরে থাকে। যার ভেতরে থাকে না, তার ভেতরে শত চেষ্টাতেও এটা স্থাপন করা যায় না। পৃথিবীতে সুলেখকের অভাব সর্বকালে, সকল ভাষাতেই অতি প্রকট। তাই কালেভদ্রে একজন প্রকৃত লেখকের সন্ধান মিলে গেলে, তাকে বাকি জীবনটা লেখালেখি নিয়েই অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াটা প্রত্যেক প্রকাশকের অবশ্য-কর্তব্য।

বাংলাদেশের ক’জন লেখক এমন প্রকাশকের দেখা পেয়েছেন? ক’জন প্রকাশক প্রকৃতই কাউকে ‘বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে’ সুলেখক বলে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন এবং তাঁদেরকে নির্ভার হয়ে শুধু লেখালেখি করে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন? সেই যে হুমায়ূন আহমেদ বিদেশ যাত্রা করছেন জানতে পেরেই কাকলী প্রকাশনীর মালিক মহিষের দুধের দই আর অ্যাডভান্সড পেমেন্টের চেক নিয়ে গদগদ হয়ে হাজির হয়েছিলেন, কারণ, বিদেশ থেকে ফিরেই তো একটা ভ্রমণকাহিনী তিনি লিখবেন এবং ভাগ্যে থাকলে সেটা তাঁকেই প্রকাশ করতে দেবেন—এমন প্রকাশক ক’জন লেখকের ‘ভাগ্যে জোটে?’ (চেকের কথা অবশ্য হুমায়ূন তাঁর বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেননি, তবে কেবলই মহিষের দুধের দই দিয়ে তাঁকে পটানো যে প্রকাশকের সাধ্যে ছিলো না, তা বলাই বাহুল্য)।

খুব সহজ একটা হিসাব দিই। ৫০০ টাকা মলাটমূল্যের একটি বই থেকে ১৫% হারে লেখকের রয়ালটি আসে ৭৫ টাকা। ৫০০ টাকা মুল্যের একটি বই এক হাজার কপি ছাপতে সর্বোচ্চ খরচ হতে পারে ৭৫ হাজার টাকা। আমি গত মাসেই প্রেস থেকে বই ছেপে এনেছি, তাই একদম হালনাগাদ হিসাবটা বললাম। অর্থাৎ বইপ্রতি খরচ ৭৫ টাকা। এর সঙ্গে প্রকাশকের সর্বপ্রকার ‘ওভারহেড খরচ’, যেমন— যোগাযোগ , যাতায়াত, পরিবহন, কর্মচারীদের বেতন, অফিস ভাড়া, ইউটিলিটি বিল ইত্যাদি এবং বিজ্ঞাপনের বিল যোগ করলে, আনুসঙ্গিক খরচ বড়জোর আরও ৫০ টাকা। ৭৫+৭৫+৫০=২০০ টাকা। বইমেলার এবং বইমেলা শেষে রিটেইলারের ২৫% কমিশন বাবদ আরও ১২৫ টাকা ছেড়ে দিলে প্রতি বই থেকে প্রকাশকের মুনাফা ৫০০-২০০-১২৫=১৭৫ টাকা। খুচরো বিক্রেতাকে কমিশন আরও বাড়িয়ে দিলেও লেখকের চেয়ে প্রকাশকের আয় কিন্তু প্রায় দ্বিগুন বেশিই থাকে। তথাপি প্রকাশক সেই বই বিক্রির দায়িত্ব লেখকের উপর চাপিয়ে দিতে চান কেন? পাঁচশো টাকা দামের ওই বইটা যদি এক হাজার কপি বিক্রি হয়, লেখকের আয় হয় পঁচাত্তর হাজার টাকা, প্রকাশকের মুনাফা কিন্তু এক লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা। প্রতি হাজারে লেখকের চেয়ে এক লাখ বেশি! আয় যার বেশি, বিক্রির জন্য চেষ্টাটাও তারই বেশি করা দরকার নয়? লেখক তো তাঁর সর্বোচ্চটা শুরুতেই দিয়ে দিয়েছেন—দুর্দান্ত একটা পাণ্ডুলিপি লিখে দিয়ে। সেটাকে বইয়ে পরিণত করে বিক্রি করার জন্যও যদি সর্বোচ্চটা লেখককেই দিতে হয়, সেই বই বিক্রি করার জন্য নিজেকে (লেখালেখির বাইরে অন্য কিছু করে) তারকায় পরিণত করতে হয়, ভাইরাল করতে হয়, ‘মিডিয়া স্যাভি’ হতে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ার সেলিব্রিটি হতে হয়— তাহলে প্রকাশকের কাজটা কী? … আর এই যে ‘তারকা’, ‘ভাইরাল’, ‘মিডিয়া স্যাভি’, ‘সেলিব্রিটি’ ইত্যাদি ইত্যাদিতে পরিণত হওয়া — এসব কি এমনি এমনিই হওয়া যায়? এসবের পেছনেও তো যথেষ্ট সময় দিতে হয়, মেধা খাটাতে হয়, নানান মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়াতে হয়, খরচ-খরচা করতে হয় — এসব করতেই যদি লেখককে তাঁর অর্থ-বিত্ত-মেধা-সময়-দক্ষতা-কৌশল-উদ্যম সবকিছু খরচ করতে হয়, তাহলে তিনি বই লিখবেন কখন?

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত