আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তা অপরে তৈরি করে, যে বস্ত্র পরিধান করি তাও অপরের প্রস্তুত, যে গৃহে বাস করি অপরেই তা নির্মাণ করে। অপরের দ্বারা জ্ঞান ও উপলব্ধির প্রায় সমস্ত অংশের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে ভাষার মধ্য দিয়ে — সে ভাষা অপরেই সৃষ্টি করেছে। —আইনস্টাইন
১.
আমাদের আলোচ্য Text-এর বিষয়বস্তুর পরিধি ও গভীরতা ব্যাপক — জ্যামিতি ও দর্শন। আলোচনার সুবিধার্থে প্রথমেই আমরা দর্শন এবং জ্যামিতি বলতে কী বুঝব কিংবা বুঝেছি সে সম্পর্কে একটু আলোকপাত করে নেয়া প্রয়োজন। কেননা তাদের পরস্পরের অন্তঃসম্পর্ক বিষয়ক যে কোনো আলোচনাতেই তা অপরিহার্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের আলোচনায় ‘অবরোহী যুক্তি’ ব্যবহার করব।
[ক]
দর্শন কী?
দর্শনচর্চার উদ্দেশ্য কী?
মানবসমাজের প্রগতির জন্য দর্শনচর্চার অবদান কোথায়?
বিষয় হিসেবে দর্শনের যে কোনো সংজ্ঞাই হয় অসম্পূর্ণ নয় ত্রুটিপূর্ণ—এই কথা মনে রেখেও আমরা সম্মুখে অগ্রসর হব। কেননা চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া আর চেষ্টা করতে ব্যর্থ হওয়ার মাঝখানে ব্যবধান প্রচুর।
দুটি গ্রিকশব্দ Philo ও Sophia থেকে ইংরেজি ভাষায় Philosophy শব্দটির উদ্ভব, যার বাংলা আক্ষরিক অর্থ ‘জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ’। প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘দর্শন’। কোনো ব্যক্তি দর্শনচর্চা করতে সক্ষমই হবেন না যদি তাঁর জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ না থাকে। এই অনুরাগই একজন ব্যক্তিকে দর্শনের ব্যাপক বিষয়বস্তু—জ্ঞানতত্ত্ব, মূল্যতত্ত্ব, অধিবিদ্যা সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে উৎসাহিত করে। ফলে তিনি বিজ্ঞ থেকে প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠেন, হয়ে ওঠেন একজন প্রকৃত দার্শনিক।
দর্শনের কাজ হল প্রশ্ন করা অর্থাৎ দর্শন বিনা প্রশ্নে কোনো কিছুকে মেনে নেয় না। তাই একজন দার্শনিক কোনো মত, পথ কিংবা বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত ধরে না নিয়ে তার যথার্থতা, উপযোগিতা, বৈধতা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে উত্তর পাবার চেষ্টা করেন। উত্তর পাওয়ার এই প্রচেষ্টায় তিনি দেখেন বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতাই তার সহায়। অবশ্য কেউ কেউ শ্রুতি বা স্বজ্ঞার কথাও বলেন।
কর্তৃত্বের কোনো স্থান—রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়—দর্শনচর্চায় নেই। এই প্রক্রিয়াতেই দার্শনিকরা পূর্ববর্তী চিন্তকদের সিদ্ধান্তকে গ্রহণ বা বর্জন করেন। প্রায়শই আবার আংশিকভাবেও গ্রহণ ও বর্জন করেন। দর্শনচর্চা এভাবেই মানব সমাজের যে কোনো পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
অনেকে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘দর্শনের কাজ হচ্ছে অন্ধকার রাতে অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল খুঁজে ফেরা, যার আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই।’ দর্শনকে বিষয় হিসেবে হেয় করার এই প্রচেষ্টায় তাঁরাই অংশগ্রহণ করতে পারেন যাঁদের ‘জ্ঞানতত্ত্বে’ ন্যূনতম ধারণা নেই। দর্শনের একটি শাখা হিসেবে ‘অধিবিদ্যা’ সৃষ্টিকর্তা, আত্মা, আদি উপাদান ইত্যাদির অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব ও স্বরূপকে জানার বোঝার চেষ্টা যুক্তি দিয়ে করে বটে তবে এটাই দর্শনের একমাত্র বা প্রধানতম কাজ নয়।
আমাদের অতি অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, দর্শন একইসঙ্গে অন্যান্য বহু বিষয়ের উৎস এবং অন্তিম গন্তব্যও বটে। যেমন: রাজনীতি দর্শন, সমাজ দর্শন, ইতিহাস দর্শন, অর্থনীতি দর্শন, বিজ্ঞান (ভৌত এবং সামাজিক) দর্শন ইত্যাদি দর্শনেরই অংশ। একমাত্র অধিবিদ্যা বাদে দর্শনের সকল শাখাই ইন্দ্রিয়জ ও ইন্দ্রিয়লব্ধ বিষয় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে দিক-নির্দেশনাও দেয়। তবে এটা বাস্তব যে, অধিবিদ্যার সকল সিদ্ধান্তই অনুমাননির্ভর প্রকল্পমাত্র, যাদেরকে শুধুমাত্র অবরোহী যুক্তির প্রয়োগেই কেবল পাওয়া সম্ভব। তাই পরবর্তীকালে অনেক দার্শনিক একে ‘বিশ্বাসেরই অন্যরূপ’ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
[খ]
জ্যামিতি কী? জ্যামিতিচর্চার উদ্দেশ্য কী?
মানবসমাজের প্রগতির জন্য জ্যামিতিচর্চার অবদান কোথায়?
জ্যা শব্দের অর্থ ভূমি। আর মিতি শব্দের অর্থ পরিমাপ। তাই জ্যামিতি শব্দের আক্ষরিক অর্থ ভূমির পরিমাপ। অতএব যে শাস্ত্র ভূমির পরিমাপ নিয়ে আলোচনা করে তাকে জ্যামিতি বলে। জ্যামিতির এই সরল সংজ্ঞা বর্তমানে জ্যামিতির সকল বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং জ্যামিতির একটি পরোক্ষ সংজ্ঞা এরূপ হতে পারে— ‘অপেক্ষাকৃত সরল ও স্পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে অপেক্ষাকৃত জটিল সিদ্ধান্তকে যুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত অথবা ভুল দেখিয়ে দেয়াই হচ্ছে জ্যামিতি, যেখানে প্রস্তাবগুলো বিধৃত হতে হবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ভাবে। প্রস্তাবনার মধ্যে যে উপাদান ও শব্দগুলো থাকবে তাদের যে অর্থ ধরে নেয়া হবে তার বাইরে তাদের কোনো অর্থ থাকবে না এবং প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে যুক্তির সাহায্যে কোনো ধারণাকে যত দূরই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তাতে পদ্ধতির মধ্যে কোনো স্ববিরোধ তৈরি হতে পারবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, দ্ব্যর্থবোধক কোনো প্রস্তাবনা বিবেচনা যোগ্য হবে না।’
একেক সময়ে একেক উদ্দেশ্যকে হাসিলের নিমিত্ত জ্যামিতিচর্চা করা হয় বা হত। প্রাচীন মিশরীয়রা জ্যামিতিচর্চা করত ভূমির পরিমাপের, পিরামিডের উচ্চতা নির্ণয়ের সুবিধার্থে। প্রাচীন ভারতীয়রা করত পূজার বেদি বা মঞ্চের তৈরি ও সৌকর্য বর্ধনকল্পে। বর্তমানে জগৎকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য। কিছুদিন আগে নীতিবিদ্যা বিশ্লেষণে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণে।
বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, খণ্ডের মধ্যে সমগ্রের সমস্ত গুণাবলি হয়তো নেই কিন্তু খণ্ডের সমন্বয়ে সমস্তের অবয়ব ও কাঠামো তৈরিতে জ্যামিতির [ইউক্লিডিয়ান এবং নন-ইউক্লিডিয়ান অথবা অন্যান্য] ভূমিকা, প্রয়োজনীয়তা, উপযোগিতা অনস্বীকার্য। আমাদের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, শ্রুতি ও সংজ্ঞা পৃথক পৃথকভাবে কিংবা একত্রে কিন্তু তাই বলে।

by লিয়াকত আলি
প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা: কাইয়ুম চৌধুরী, প্রকাশক: বাংলা একাডেমি
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ১৯৮৫
২.
এইবার আমরা আমাদের আলোচ্য Textটিতে কী বলা হয়েছে,কীভাবে বলা হয়েছে, কী জন্য বলা হয়েছে, কী পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, বয়নে-বিশ্লেষণে মৌলিকত্বের স্বরূপ কী ইত্যাদি বিষয় অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হই।
[ক]
পাঠ সমাপনান্তে বোঝা যায়, Textটিতে জ্যামিতি ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে নির্মোহ, নিস্পৃহভাবে। আলোচনা করা হয়েছে এদের পারস্পরিক অন্তঃসম্পর্ক নিয়ে। মানব ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য পাশ্চাত্য-চিন্তানায়কদের জগৎ সম্পর্কিত চিন্তা কীভাবে জ্যামিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে তা নিয়েও অনুপুঙ্খ আলোচনা করা হয়েছে। এই আলোচনা করা হয়েছে ইতিহাসের ধারাক্রম—থেলিস (৬৪০-৬২০ খ্রিস্টপূর্ব), পিথাগোরাস (পিথাগোরীয় সম্প্রদায়) (৫৭২-৪৯৭ খ্রিস্টপূর্ব), প্লেটো (৪২৯-৩৪৭ খ্রিস্টপূর্ব), অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্ব), ইউক্লিড (৩৩০-২৭৫ খ্রিস্টপূর্ব), দেকার্তে (১৫৯৬- ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ), স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দ), লিবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬ খ্রিস্টাব্দ), অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ: লক (১৬৩২-১৭০৪ খ্রিস্টাব্দ), হিউম (১৭১১-১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দ), কান্ট (১৭২৪-১৮০৪ খ্রিস্টাব্দ) অথবা প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ, আধুনিকযুগ কিংবা ইউক্লিডায়ান, নন-ইউক্লিডায়ান মেনে। জ্যামিতির দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পরিপদ স্বীকার্য (Axiom) ও স্বতঃসিদ্ধ’র দার্শনিক ভিত্তি নিয়েও লেখক আলোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায় জ্যামিতিতে স্বীকার্য হচ্ছে—
[…] এমন কিছু যা স্বীকৃত বা প্রমাণিত বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, অথবা এমন কিছু যাকে অন্য প্রমাণের ভিত্তি হিসাবে ধরে নেওয়া হয়েছে।
[পীথাগোরীয় সম্প্রদায়, পৃ. ২১]
স্বতঃসিদ্ধ সম্পর্কে (পিথাগোরীয়দের বয়ানে) তিনি জানান—
[…] এটি (কোনো প্রস্তাবনা) এত স্পষ্টভাবে সত্য যে, এর কোনো প্রমাণেরই প্রয়োজন পড়ে না।
[পূর্বোক্ত, পৃ. ২১]
জ্যামিতির চরিত্র সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য:
[…] জ্যামিতিতে কোনো পূর্বতঃসিদ্ধ যৌক্তিক উক্তি [A Priori Synthetic Judgment] নেই; জ্যামিতি হয় পূর্বতঃসিদ্ধ, এবং তাহলে তা গাণিতিক অর্থাৎ বিশ্লেষিক [Analytic], অথবা জ্যামিতি যৌগিক [Synthetic] এবং তখন তা ভৌত ও অভিজ্ঞতা সাপেক্ষ। জ্যামিতির বিবর্তন শেষাবধি পূর্বতঃসিদ্ধ যৌগিক বিধানকে ভেঙে দিয়েছে।
[জ্যামিতির চরিত্র, পৃ. ৮১]
[…] দৃষ্টিগতভাবে জ্যামিতিক সম্পর্কসমূহ কল্পনা করার অর্থ হচ্ছে এমন সব অভিজ্ঞতার কল্পনা করা যা আমরা পেতাম সেই জগতে বাস করলে, যেখানে ওই সম্পর্কগুলো বাস্তব। দৃষ্টিগ্রাহ্যতার এই চমৎকার ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী হেলেমহোগঞ্জ। তিনি আরো বলেছেন যে, যা আসলে আমাদের অভ্যাসের সৃষ্টি তাকে বুদ্ধির বিধান বা মূলনীতি কিংবা অন্তর্দৃষ্টি বলে দার্শনিকেরা মনে করেছেন।
[পূর্বোক্ত, পৃ. ৮১]
তিনি মূলত Textটিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ এই বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন যে—
[…] বুদ্ধির অমোঘ বিধিবিধান বলে বুদ্ধিবাদীরা এমন কিছুকে [বুদ্ধিবাদী দার্শনিক মত, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন যা আসলে মানুষের কল্পনার এক প্রকার অভ্যাস। যে দেশ বা পরিবেশে মানুষ বাস করে তার ভৌত অবয়ব দ্বারাই ওই অভ্যাস তৈরি হয়।
[শেষকথা, পৃ. ৮৪]
[…] অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকেরা যুক্তি দিয়ে একে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেও পারেননি। গণিতজ্ঞরা পক্ষে থাকায় বুদ্ধিবাদীরা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন এবং যুক্তি দিয়ে তাঁদের পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে হয়ে উঠেছিলো।
[শেষকথা, পৃ. ৮৩]
[…] অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে গণিতজ্ঞরাই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিলেন। তাঁরা বললেন: আমরা প্রমাণ করতে পারি শুধুমাত্র গাণিতিক সম্পর্কের প্রক্রিয়াকে; জ্যামিতির স্বীকার্য ও স্বতঃসিদ্ধ থেকে আরম্ভ করে তার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত একটা ‘যদি তবে’ সম্পর্কই আমাদের প্রমাণের বিষয় ওই স্বীকার্যগুলো যে সত্য সেই দাবি আর তাঁরা করলেন না, বরং সে প্রশ্ন ছেড়ে দিলেন পদার্থবিজ্ঞানীদের ওপর। এভাবে গাণিতিক জ্যামিতি একটি বৈশ্লেষিক সত্যে পরিণত হলো এবং জ্যামিতির যৌক্তিক দিকটি একটি অভিজ্ঞতানির্ভর বিজ্ঞানের নিকট আত্মসমর্পণ করলো। বুদ্ধিবাদী দার্শনিক তার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে হারালেন…।
[শেষকথা, পৃ. ৮৩-৮৪]
[খ]
১.
দর্শন সংশ্লিষ্ট Textটির বক্তব্য উপস্থাপনের কৌশল Ethico-Cognitive Parallelism দোষে দুষ্ট। যেমন—
[…] কল্পনার আকাশে বল্গাহীনভাবে পাখা মেলেছিল যে অনুমান তাকে তিনি (থেলিস) বাস্তব জগতে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
[থেলিস, পৃ ১৪]
[…] বুদ্ধি যদি নিজেরই সৃষ্ট বাঁধ দ্বারা নিজের উচ্ছল ঝর্ণাধারাকে স্তব্ধ করতে চায়, তাহলে কল্পনা স্ফূতি পাবে না, বুদ্ধির ঝর্ণাধারা যাবে শুকিয়ে।
[শেষ কথা, পৃ ৮৪]
এগুলো সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে কিন্তু দর্শনের যে কোনো আলোচনায় এটি Ethico-Cognitive Parallelism দোষে দুষ্ট বলে বিবেচিত হবে। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, বাংলায় লেখা দর্শন বা দর্শন সংক্রান্ত Text-এর প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এই বিচ্যুতি নিতান্তই স্বল্প ও গ্রহণযোগ্য মাত্রাতেই রয়েছে।
২.
Textটির ৮৪টি পৃষ্ঠায় ১৫/১৬টি অধ্যায় বিন্যস্ত। এর ভেতর লেখক মোট ৭৫ পৃষ্ঠায় তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এই ৭৫ পৃষ্ঠার মধ্যে আবার তিনি ১৭টি পৃষ্ঠাই ব্যয় করেছেন বিভিন্ন দার্শনিক ও গণিতবিদের মতবাদের উদ্ধৃতি উপস্থাপনে। Textটিতে এমন অধ্যায়ও আছে যেখানে তিনি সম্পূর্ণভাবে গণিতবিদদের গণিত ও জ্যামিতি সংক্রান্ত চর্চার বিষয়বস্তুই উপস্থাপন করেছেন। আবার কোনো অধ্যায়ের অর্ধাংশের বেশিই ব্যয় করেছেন এই কাজে। বিষয়টি একটু দৃষ্টিকটু নয় কি!
৩.
Textটিতে তিনি কম করে হলেও ১৪ জন দার্শনিকের দর্শন ও ৯ জন গণিতবিদের গণিত নিয়ে আলোচনা করেছেন। উল্লেখ করেছেন এঁদের রচিত কমপক্ষে ৭টি গ্রন্থেরও। অবাক করার মতো বিষয় হল এদের মধ্যে এমন একজনও নেই যিনি কিনা প্রাচ্যের দার্শনিক বা গণিতবিদ। নেই এমন একটি গ্রন্থের উল্লেখও যার রচয়িতা প্রাচ্যদেশীয়। এখান থেকেই বোঝা যায়, লেখকের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান (Epistemological Point of View) পাশ্চাত্যের, প্রাচ্যের নয়। জ্যামিতির উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি আমাদের জানিয়েছেন এর উদ্ভব মিশরে। অবশ্য তিনি ব্যাবিলনের কথাও উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বিস্তারে যাননি। ইতিহাস কিন্তু বলে ভারতীয়দের জ্যামিতির অঙ্কন প্রণালীর সারগ্রন্থ শুল্বসূত্রগুলো’র বয়স আনুমানিক আটশো খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা তারও বেশি। অপর দিকে লেখকের মতে, ‘জ্যামিতির ক্ষেত্রে প্রমাণের ধারণা দেওয়া’ থেলিসের জন্ম ৬৪০ থেকে ৬২০ খ্রি. পূর্বাব্দের মধ্যে, পিথাগোরাসের জন্ম ৫৭০ খ্রি.পূর্বাব্দে, ইউক্লিডের ৩৩০ খ্রি.পূর্বাব্দে। (এই সংক্রান্ত বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে প্রদীপ কুমার মজুমদারের প্রাচীন ভারতে জ্যামিতি চর্চা—প্রকাশক: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যপুস্তক পর্ষৎ, প্রকাশকাল: জানুয়ারি ১৯৯২ খ্রি., T. A. Sarswati Amma-র Geometry in ancient and Medieval India, Dr. A. K. Bag-র Mathematics in ancient and Medieval India, B. B. Datta-র Science of Srilba ইত্যাদি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য) এ-ছাড়া আধুনিক বিশ্লেষিক জ্যামিতির জনক দেকার্তের জ্যামিতিতে মূল বিন্দু চিহ্নিত করা হয় (০,০) দ্বারা। অনেকে বলেন শূন্যের ধারণার জন্ম নাকি ভারতে। এ-ছাড়াও কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, প্রমাণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের লোক যেমন আরোহী এবং অবরোহী যুক্তির ব্যবহার করেন তদ্রূপ আমাদের উপমহাদেশেও কিন্তু প্রমাণ-প্রমেয়ার প্রচলন আছে। এই বিষয়গুলো নিশ্চয়ই সুবিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে!
Textটিতে তিনি কম করে হলেও ১৪ জন দার্শনিকের দর্শন ও ৯ জন গণিতবিদের গণিত নিয়ে আলোচনা করেছেন। উল্লেখ করেছেন এঁদের রচিত কমপক্ষে ৭টি গ্রন্থেরও। অবাক করার মতো বিষয় হল এদের মধ্যে এমন একজনও নেই যিনি কিনা প্রাচ্যের দার্শনিক বা গণিতবিদ
8.
Textটির কিছু উপস্থাপন-ত্রুটি এর বক্তব্যকে হৃদয়ঙ্গমের ক্ষেত্রে অল্প হলেও বাধার সৃষ্টি করে, তা ছাড়া এর সার্বিক নন্দনের জন্যও এটি মঙ্গলজনক কিছু নয়। যেমন—
[…] তুমি নিশ্চয় জানো জ্যামিতি, গণিত এবং জ্ঞানের অনুরাগ শাখার শিক্ষার্থী মাত্রই জোড় এবং বিজোড় সংখ্যা, জ্যামিতিক চিত্র, কোণের শ্রেণিবিভাগ এবং অনুরূপ… কতগুলো সূত্রকে গোড়া থেকেই ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়।
[পীথাগোরীয় সম্প্রদায়, পৃ. ৩০]
[…] কৌণিক সেকশনের ওপর গ্রন্থ লিখে ইউক্লিড অত্যন্ত দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন বলতে হবে। তিনি সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছেন, যদিও তা Elements গ্রন্থে নয় । কৌণিক সেকশন (Conic Section)-এর উপর তিনি পৃথক একটি গ্রন্থ লিখেছেন।
[ইউক্লিড, পৃ. ৪৫]
কী লঙ্ঘন করেছেন?
[…] বস্তুর প্রকতিতে এমন কিছু নেই যার জন্য এ জাতীয় সত্যের ব্যতিক্রম হতে পারে না বলা চলে।
[লিবনিজ, পৃ. ৫৫]
বস্তুর প্রকৃতিতে…
[…] সেহেতু শুধুমাত্র বৃদ্ধি বস্তুজগতের সাধারণ গুণাবলি আবিষ্কার করতে সক্ষম…
[কান্ট, পৃ. ৬২]
সেহেতু শুধুমাত্র বুদ্ধি…
[….] কিন্তু জ্যামিতির স্বীকার্যগুলোকে ‘ধরে নেওয়া’ প্রমাণ করা ততটা সহজ ছিল না।
[বিপ্লবের পূর্বশর্ত, পৃ. ৬৭]
কিন্তু জ্যামিতির স্বীকার্যগুলোর/গুলোতে…
[…] জ্যামিতিক চিত্রের সঙ্গে সংখ্যার সম্পর্ক দেখে তাঁরা [পিথাগোরীয়] বললেন যে, প্রত্যেকটি আকৃতি এবং তাই প্রতিটি প্রাকৃতিক বস্তুর রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সূচক সংখ্যা।
[পীথাগোরীয় সম্প্রদায়, পৃ. ২১]
বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ মতে বাক্যটির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ আছে।
[…] কেননা তাহলে Lএর ওপর p1 বিন্দুতে দুটো লম্বা (Lও L2) অবস্থান করবে।
[সমান্তরাল স্বীকার্য, পৃ: ৭১]
কেননা তাহলে Lএর উপর p1 বিন্দুতে দুটো লম্ব (L1 ও L2)…
ভুক্তি আরো বাড়ানো যায়। আমরা বিরত থাকলাম।
[গ]
১.
Textটিতে মূলত যা আলোচনা করা হয়েছে তা হল Epistemology। নামকাওয়াস্তে আধিবিদ্যার (Meta Physics) উল্লেখ থাকলেও লেখক এর বিস্তারে যাননি, যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন এমনও মনে হয়নি। আর Axilogy-র (মূল্যবিদ্যা) নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি। অতএব এটা মোটামুটি পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায় যে, লেখক মূলত এই Textটিতে দর্শন বলতে Epistemology-কেই বুঝেছেন। শুধু অধিবিদ্যা যেমন পূর্ণ দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে না (অবশ্য আমাদের দেশে বা বাংলাভাষায় দর্শন নিয়ে আলোচনা আর অধিবিদ্যার (Metaphysic) আলোচনা যেন সমার্থক। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এটি দর্শনের একটি অন্যতম শাখা মাত্র) ঠিক তেমনি শুধু Epistemology-ও পরিপূর্ণ দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করার কথা নয়।
অবশ্য আমাদের আলোচ্য Textটিতে দর্শনের একটি অতি উঁচু ও সূক্ষ্ম পর্যায়ের তাত্ত্বিক বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে যা শুধুমাত্র সাহিত্যের পঠন অভ্যাস ও যোগ্যতা দ্বারা টের পাওয়া অতি দুরূহ। বিষয়টি একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক—
ডারউইন কি কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ছিলেন?
কিংবা তিনি কি ধর্ম সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের (অর্থাৎ ধর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে) আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন প্রজাতির উৎপত্তি গ্রন্থে?
এর উত্তর হবে অতি আবশ্যিকভাবেই না। তাহলে ধর্মতাত্ত্বিকেরা ডারউইন বা তার তত্ত্বকে অপছন্দ করেন কেন? কারণ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধর্মতাত্ত্বিকেরা যে ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, ডারউইনের পদ্ধতি ও সিদ্ধান্তকে মানলে তা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয় কিংবা নিদেনপক্ষে তাদের বক্তব্যের যৌক্তিক পারম্পর্যহীনতা ও অতিসরলীকরণ দিবালোকের মতোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের আলোচ্য Textটির লেখক প্রায় একইরকম কাণ্ড ঘটিয়েছেন কান্টশিয়ান জ্ঞানতত্ত্ব ও মূল্যবিদ্যার (নীতিবিদ্যার) বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে। তিনি বিস্তারিতভাবে ও পদ্ধতি মেনে আলোচনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে বুদ্ধিবাদী দার্শনিকেরা তাঁদের জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত মহাপ্রস্তাবনায় ইউক্লিডীয় জ্যামিতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাঁর মত হচ্ছে, অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির আবিষ্কারের পরে তাদের এই জ্যামিতির প্রয়োগ তার বৈধতা হারিয়েছে। তিনি কান্টের জ্ঞানতত্ত্বের (Epistemology) বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে ও আলোচনা করে জানালেন, কান্টের মতে জ্ঞান হচ্ছে এমন কিছু যা “পূর্বতঃসিদ্ধ যৌক্তিক প্রস্তাবনা।” পূর্বতঃসিদ্ধ ব্যাপারটা ঠিক কেমন?
কান্টের ভাষায়—
[…] ইউক্লিডের স্বীকার্যগুলো আসলে আমাদের অভিজ্ঞতায় আবশ্যকীয় শর্ত—ওগুলো আমাদের মনের মধ্যেই সহজাত অবস্থায় রয়েছে। জ্যামিতিক জ্ঞান মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতেই কেবল সংগঠিত হতে পারে।
[বিপ্লবের পূর্বশর্ত, পৃ. ৬৪]
[…] আবার জ্যামিতিক জ্ঞানগুলো যেহেতু আমাদের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়া বস্তুজগতের সাথে মিলে যায়, সেহেতু সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় এই যে, প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞানলাভের জন্য ইউক্লিডিও স্বীকার্যগুচ্ছ অপরিহার্য অর্থাৎ ওই স্বীকার্যগুলো হচ্ছে পূর্বতঃসিদ্ধ ও যৌক্তিক মূলনীতি, যার ভিত্তিতেই কেবল আমাদের জ্ঞানের মিনার গড়ে উঠতে পারে ।
[পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৫]
অতএব—
[…] ধ্রুব এক বাস্তবতার ওপরে মানুষ কার্যকারণ বা জ্যামিতির সূত্রগুলোকে শুধুমাত্র প্রতিস্থাপন করে, তাহলে এই বাস্তবতা নিজে মুক্ত এবং তা বিজ্ঞানের কার্যকারণ সম্বন্ধীয় সূত্রের পরিবর্তে এক নৈতিক সূত্র অনুসরণ করতে পারে।
[কান্ট, পৃ. ৬৪]
কিন্তু আমাদের আলোচ্য Textটির লেখকের বক্তব্য (তিনি অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট, আবির্ভাব ও আবির্ভাবের পরবর্তীকালের মানব চিন্তায় এর প্রভাব ইত্যাদি বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন)—
[…] অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির পুরোধাগণ এই প্রথম দেখালেন যে, ইউক্লিডীয় স্বীকার্যগুলো জ্যামিতির আবশ্যিক শর্ত নয়… সেজন্য আমাদের জ্ঞানলাভের জন্যও পূর্বতঃসিদ্ধ কোনো মূলনীতি নয়।
[বিপ্লবের পূর্বশর্ত, পৃ. ৬৭]
লেখকের এই সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখলে অবশ্যই এটা মানতে হবে সর্বজনীন কোনো নীতিবিদ্যা বা বাক্য কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। লেখক অবশ্য এই কথা সরাসরি না বলে অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে পরোক্ষভাবে বলেছেন, প্রত্যক্ষভাবে কোনোমতেই নয়।
আমাদের এই ভূখণ্ডে ও ভাষায় দর্শন যেন অধিবিদ্যারই (Metaphysics) সমার্থক। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, অধিবিদ্যা দর্শনের একটি অংশমাত্র। আমাদের আলোচ্য Textটি এই ক্ষেত্রে একইসঙ্গে এর উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ও দৃষ্টান্ত—Textটি লিখিত হয়েছে জ্ঞানতত্ত্বের (Epistemology) ওপর
২.
নীতি বা মূল্য (Value) সম্পর্কে এইরূপ সিদ্ধান্তে পৌঁছলে নীতিবিদ্যায় একধরনের নৈরাজ্যের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শুধুমাত্র ব্যবহারিক উপযোগের হাতে ছেড়ে দিলে নীতি সংক্রান্ত এই নৈরাজ্যিক অবস্থা থেকে উত্তরণ খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। অল্প বিস্তারে গিয়ে ব্যাপারটাকে এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়—এক জন লোক সত্যবাদী কিন্তু নিষ্ঠুর প্রকৃতির। কিন্তু অপরজনের সত্য বলা নিয়ে লোকজন সন্দিহান হলেও সে দয়ালু বলে স্বীকৃত। এই দুইজনের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিতে বললে একজন এক ব্যক্তিকে, অপরজন হয়তো অন্য ব্যক্তিকে বেছে নেবে। কিন্তু মূল্য-তালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেন্দ্রে মূল্যের অবস্থানের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে তো একজন ব্যক্তি আসেনই, হয় সেটা সত্যবাদিতা অথবা দয়ার্দ্রতা। এই Textটিতে লেখকের এই রূপ কোনো সিদ্ধান্ত (অর্থাৎ মূল্যতালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল্যের অবস্থান সংক্রান্ত) নেই। কিন্তু এই না থাকার কারণে তার কিছু সিদ্ধান্ত দার্শনিকভাবে তেমন কোনো অর্থ বহনে অক্ষম। যেমন—
[…] বিজ্ঞানের একটি মহৎ উপকারও …
[পীথাগোরীয় সম্প্রদায়, পৃ. ১৮]
দার্শনিকভাবে মহৎ একটি মূল্য, উপকার আরেকটি মূল্য। কোন মূল্যটির অবস্থান মূল্যতালিকার কেন্দ্রে তা নির্ধারণ ব্যতীত এই ধরনের উক্তি উদ্দেশ্যবিহীন পথচলার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। অবশ্যই সাহিত্যিক দৃষ্টি দিয়ে দেখলে মনে হবে উপকারকে ‘মহৎ’ শব্দটি দিয়ে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
[…] কিছুটা ধূর্তও বটে…
[প্লেটো, পৃ. ২৯]
এই ধরনের বাক্য একটি সাহিত্যিক প্রয়াস। দার্শনিক প্রয়াস হতে গেলে একে অবশ্যই ‘বিশ্লেষণযোগ্যতা’ ও ‘সত্যবাদিতার মধ্যে কোনটির অবস্থান মূল্যতালিকার কেন্দ্রের দিকে বা কেন্দ্রে সেটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পাঠকের একটু সতর্ক পর্যবেক্ষণ লেখকের এইরূপ অনেক উক্তির সঙ্গে নিশ্চয়ই তাকে পরিচয় করিয়ে দেবে।
[ঘ]
Textটিতে প্লেটোপূর্ব সময়কাল থেকে ১৮শ শতকের কান্ট পর্যন্ত দার্শনিকদের দর্শন ও এর সঙ্গে জ্যামিতির অন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পাঠ সমাপনান্তে বোঝা যায় এই আলোচনা হয়েছে কম্পাইলেশেনর (সমন্বয়ের) মাধ্যমে। তবে এর মাঝে একপ্রকার ইনোভেশন (আবিষ্কার)-প্রবণতাও প্রক্রিয়ায় রয়েছে। হয়তো এই কারণেই প্রত্যেকটি দার্শনিকের দর্শন আলোচনা সমাপনান্তে তার সীমাবদ্ধতাও নির্দেশ করা হয়েছে। অবশ্য এইসব নির্দেশনা সার্বিকভাবে মানবচিন্তার ইতিহাসে তেমন নতুন এবং মৌলিক কিছু না হলেও বাংলা ভাষা এবং বাংলাদেশে দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বটে। যেমন: থেলিসের দর্শন ও জ্যামিতি নিয়ে আলোচনার পর তাঁর সিদ্ধান্ত—
[…] প্রকৃত পক্ষে থেলিস স্বতঃস্পষ্ট ও সুবিন্যস্ত কোনো প্রাথমিক প্রস্তাবনাগুচ্ছ দিয়ে যেতে পারেননি। নিজের প্রয়োজনমাফিক তিনি একেক সময় একেকটি প্রস্তাবনার আশ্রয় নিয়েছেন—আবার আকৃতির সামঞ্জস্য দেখে যখন যেটিকে তার স্বতঃস্পষ্ট মনে হয়েছে, প্রায়শ তাকেই তিনি প্রাথমিক প্রস্তাবনা হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
[থেলিস, পৃ. ১৭]
প্লেটোর দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে—
[…] দর্শনের ইতিহাসে যেনো একটি অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত লেখা এবং তা কিছুটা ধূর্তও বটে।
[প্লেটো, পৃ. ২৯]
[…] প্রাকৃতিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে সক্রেটিসের যুক্তি অচল। সেটা বুঝেই প্লেটো জ্যামিতিকে বেছে নিয়েছিলেন।
[পূর্বোক্ত, পৃ.৩০]
[…] শেষ পর্যন্ত এ্যারিস্টটলের ‘রূপ’ প্লেটোর ‘ভাব’-এর মতই পরাতাত্ত্বিক (Metaphysical) একটি ধারণায় পরিণত হয়েছে।
[এ্যারিস্টটল, পৃ. ৩৯]
[…] প্রমাণ হচ্ছে যুক্তির বিষয়, পর্যবেক্ষণের বিষয় নয়।
[কান্ট,পৃ-৬১]
[…] ইউক্লিডের একমাত্র কাঠামোর (পূর্বতঃসিদ্ধ) জায়গায়… জ্যামিতিতে একধরনের ‘বহুত্ব’ (Plurality of Geometry) (অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির আবির্ভাবের কলে) সৃষ্টি হল।
[অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির উদ্ভব, পৃ. ৭৫]
[…] গাণিতিক দিক দিয়ে বলতে গেলে জ্যামিতিক কাঠামো বা সিস্টেমের সংখ্যা অনেক। ওগুলো প্রত্যেকটিই যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায্য ও স্ববিরোধমুক্ত। [গাণিতিক ও ভৌত জ্যামিতির (Physical Geometry) পার্থক্য প্রসঙ্গে]।
[জ্যামিতির চরিত্র, পৃ. ৭৯]
[…] বিরোধ থাকলে কোনো ব্যবস্থা মিথ্যা প্রমাণ হয় ঠিক। কিন্তু বিরোধের অনুপস্থিতি সত্য সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
[জ্যামিতির চরিত্র, পৃ. ৮০]
অবশ্য কী কী গুণাবলি অথবা বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে সত্য গঠিত বা গঠিত হতে পারে সে সম্পর্কিত কোনো আলোচনা তিনি এই বইতে করেননি।
[ঙ]
১.
স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত Textটির আলোচনায় আমরা কমবেশি সিকি শতাব্দী পরে কেন প্রবৃত্ত হলাম। এর উত্তরে বলা যায়—বাঙালির ধর্ম-কর্মের, শিল্প-সাহিত্যের ঐতিহ্য আছে। কিন্তু পদ্ধতি মেনে নির্মোহ, নিস্পৃহ ভাবে দর্শন চর্চার তেমন কোনো ঐতিহ্য নেই। আমাদের এই ভূখণ্ডে ও ভাষায় দর্শন যেন অধিবিদ্যারই (Metaphysics) সমার্থক। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, অধিবিদ্যা দর্শনের একটি অংশমাত্র। আমাদের আলোচ্য Textটি এই ক্ষেত্রে একইসঙ্গে এর উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ও দৃষ্টান্ত—Textটি লিখিত হয়েছে জ্ঞানতত্ত্বের (Epistemology) ওপর। তাই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও Textটির শক্তিশালী ও দুর্বল দিকের অনুসন্ধান নিঃসন্দেহে সময়-উপযোগী ও কার্যকরী।
২.
Textটির লেখক ‘চিকিৎসাবিদ্যার’ অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, সক্রিয়ভাবে দর্শনচর্চাকারী। তিনি ‘চিন্তার ইতিহাস’ নামক দর্শনচক্রেরও প্রাণপুরুষ। এই দর্শনচক্রটিকে ঘিরেই গড়ে উঠছে ‘সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র’—বর্তমান সময়ের শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের অন্যতম পাঠ ও পীঠস্থান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যামিতি ও দর্শন পাঠ করলে পাঠ সমাপনান্তে মনে হতে পারে যে দাতা মনে করিলে অর্ধেক রাজ্য ও এক রাজকন্যা দান করিতে পারেন, সে মুষ্টিভিক্ষা দিয়া ভিক্ষুককে বিদায় করিয়াছে’। কিন্তু আমাদের Textটিকে দেখতে হবে আজ থেকে সিকি শতাব্দী আগের টগবগে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এক যুবকের ‘আত্ম নির্মাণের দলিল’ হিসেবে। তাহলে সহজেই অনুধাবন করা যাবে যে, কেন দর্শনের নাম করে শুধুমাত্র জ্ঞানতত্ত্বই (Epistemology) এখানে আলোচিত হয়েছে। কেন Textটির লেখক জ্যামিতির একটি স্বীকার্যের বিবর্তনকে উপস্থাপনের জন্য ৭৫ পৃষ্ঠার Textটির ১১টি পৃষ্ঠা ব্যবহার করেছেন। কেনইবা আছে ৭৫ পৃষ্ঠার বয়ানে ১৭ পৃষ্ঠা উদ্ধৃতি।
৩.
‘জ্যামিতির প্রভাব দর্শনে গভীর—গভীরতার অনুসন্ধানই এই বই।’ বাংলা ভাষায় এই ধরনের Text অতিবিরলপ্রজ। দার্শনিক কান্টের (১৭২৪-১৮০৪ খ্রি.) জ্ঞানতত্ত্বের সমালোচনা সম্ভবত এই Textটির সর্বাধিক শক্তিশালী দিক। কিন্তু এ সকল সত্ত্বেও Textটির নাম ‘জ্যামিতি ও দর্শন’ হলেও এটি মূলত বিজ্ঞানের দর্শন-ঘেঁষা একটি Text। লেখক Textটির ছত্রে ছত্রে বিজ্ঞানের জ্ঞানতত্ত্বের দার্শনিক বৈধতা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন কিছুটা ‘সূক্ষ্ম’ ও ‘যান্ত্ৰিক’– উভয় প্রকারেই।






















































2 Comments. Leave new
এক কথায় দারুন।!!
Text টির লেখক একজন দার্শনিক। অসাধারণ এই লেখায় তার গভীর দর্শনচর্চা এবং বিশ্লেষণের অনন্য শৈলি ফুটে উঠেছে।