১.
এপ্রিলের রাত। খোলা ছাদ।
ও উঠে আসে। আমি আগে থেকেই ছিলাম। চেয়ারে। চা ঠান্ডা।
পাশে বসে। আকাশের দিকে তাকায়।
আমি জিগাই— অফিস কেমন করলা?
ও আকাশ থেকে চোখ সরায় না।
কয়— একটু চুপ থাকো। অফিসে কথা, বাসায় কথা, এত কথা ভালো লাগে না।
আমি চুপ থাকলাম।
আব্বাও এইভাবে বসতো। চেয়ারে। চা ঠান্ডা।
তারপর লক্ষ্য করলাম — ওর হাত। কোলের উপর রাখা। আঙুলগুলো শিথিল।
বাতাস আসে। ওর শাড়ির আঁচল ওড়ে। ও ধরে না।
আঁচল ওড়ে। থামে। আবার ওড়ে।
আমি ভাবি— আঁচলটা যদি উড়তেই থাকে?
২.
কিছুদিন পর।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আছি। টেবিলে একটা পোড়া দাগ। ওর দিকের কোণায়।
ও ভাত বাড়ে। পাতিল দাগের উপর রাখে না। পাশে রাখে।
আমি চুপ। ও চুপ।
ও ডালের বাটি আমার দিকে ঘুরায়ে দেয়। হাতা আমার দিকে।
চামচের শব্দ। থালার শব্দ।
হঠাৎ দেখি— ওর কপালে একটা চুল এসে পড়েছে।
ও সরায় না।
আমি সরাতে চাই।
হাত টেবিলে। আঙুল চামচে।
ও মাথা নিচু করে খায়। চুলটা নড়ে।
আমি চামচ রাখি।
হাত ওঠে। থালার উপর।
ও মুখ তোলে না।
হাত নামাই।
ভাত খাই।
চুলটা ওর কপালে পড়ে থাকে।
সকালে ও রান্নাঘরে। ডিম ভাজে। ওর পিঠ আমার দিকে।
ও জানে না আমি দরজায় দাঁড়ায়ে আছি।
ঘুরল। আমাকে দেখে থামল।
জিগাইল— কতক্ষণ দাঁড়ায়ে আছো?
বললাম— এইমাত্র এলাম।
মিথ্যা বললাম।
পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটা বাচ্চার কান্না আসে। তারপর কারো গলা— চুপ করো, বাবা আসছে।
ও ডিম প্লেটে রাখে। আমার সামনে।
৩.
একরাতে ও কয়— চলে যেতে চাই। তোমার এই চুপ থাকাটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে।
আম্মা কখনো এইটা বলে নাই।
আমি বলি— তুমি চেয়েছিলে।
ও কয়— এইটা চাইনি।
তারপর জানালায় তাকায়। বারান্দায় দড়িতে একটা শার্ট। একটা কামিজ। পাশাপাশি।
বাইরে বৃষ্টি।
৪.
পরদিন সকালে ও চা বানায়।
দুটো কাপ।
আমার সামনে রাখে।
আমি কাপটা ধরি। গরম। দুধ আলাদা। যেমন আমি খাই।
ও কাপ ঠোঁটে নেয়। নামায়। আবার ঠোঁটে নেয়। চা খায় না।
কিছু বলে না।
আমিও না।
ও উঠে যায়। সিঙ্কে কাপ রাখে। ওর কাপটা ভরা।
রাতে ও লাগেজ গোছায়।
নীল শাড়ি। যেটা আমি বিয়েতে দিয়েছিলাম।
ও শাড়িটা ভাজ করে। লাগেজে রাখে। রাখে না। রাখে।
সকালে ও বলে— যাচ্ছি।
আমি তাকাই।
ওর চোখে কী ছিল— বলতে পারব না। ঘৃণা না। দুঃখও না। এমন কিছু যেটা আমি চিনি— কিন্তু নাম জানি না।
ও দরজা খোলে।
থামে।
ঘুরে ডাইনিংয়ে যায়। টেবিলে পোড়া দাগটার উপর হাত রাখে। একটু। তারপর হাত সরায়।
আমি দাঁড়ায়ে থাকি।
ও আমার পাশ দিয়ে যায়। তাকায় না।
দরজা বন্ধ হয়।
পাশের চেয়ারটা খালি। চায়ের কাপ নাই।
মেঝেতে জানালার রোদ।
রোদটা ধীরে ধীরে সরে যায়।
আমি তাকায়ে থাকি।
৫.
বৃষ্টি নামে।
আমি ছাদে বসে থাকি। চেয়ারে। চা ঠান্ডা।
ওর কপালের সেই চুলটার কথা মনে পড়ে।
যেটা আমি সরাইনি।
ও সেই রাতে উঠে যাওয়ার আগে আমার হাতের দিকে তাকায়েছিল। তখন বুঝিনি।
সরালে কিছু হত?
কিছু হত না।
অথবা সব বদলে যেত।
বাতাস আসে। আমি ভাবি— আঁচলটা যদি উড়তেই থাকে?
বৃষ্টি পড়ে।





4 Comments. Leave new
সুন্দর!
সুন্দর!
সুন্দর। সত্যিই, সময়ে না হলে আর হয়তো হয়ে ওঠেনা কখনোই!
রহস্যময় সুন্দর ❤️
বেশ লাগতেছিলো ; হঠাৎ শেষ !!
মনে হলো বেলকনিতে একটা কাক / কবুতর এসে বসলো, দেখতেছি, কিছু একটা ভাবতে না ভাবতে ই উড়ে গেলো !! গল্পটা ঐ কাক অথবা কবুতর আর আমার না বলা ভাবনা !!