২৮ ডিসেম্বর ২০১৮
প্রচ্ছদ :
রাজিব রায়
জাভেদ হুসেন
অনুবাদক, প্রাবন্ধিক
4718

জাভেদ হুসেন
অনুবাদক, প্রাবন্ধিক

4718

মির্জা গালিবের গজল থেকে

প্রিয়র লীলাময় বিচরণের পদচিহ্ন হয়ে পড়ে আছি

একজন কবি একা একটা ভাষা আর সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, এমন খুব বেশি দেখা যায় না। আর মাঠও ফাঁকা নয়, এখানে মীর তকি, ইকবালের মতো কবি আছেন। উর্দু ভাষার সেই কবি মির্জা গালিব। ইকবাল বলতেন গালিবের একমাত্র দোসর শুয়ে আছেন ভাইমারের বাগানে— গ্যেটে। মোগল সাম্রাজ্য অস্ত যাওয়ার কালে ছিল উর্দু কাব্যের সবচেয়ে অহঙ্কারের যুগ। এর কারণ বোধ হয় এই যে, উর্দু কাব্য বাইরের প্রকৃতির চাইতে মানুষের মনোজগতের প্রকৃতির দিকেই বেশি মনোযোগী। আর দীর্ঘ দিনের শাসনের, সংস্কৃতির অধিকার থেকে সরে যাওয়ার এমন দুর্যোগ ভারতবর্ষের বুকে কমই নেমেছে। মির্জা গালিব সেই বেদনার শ্রেষ্ঠ রূপকার। তিনি ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষদের একজন। একজন মান্য কাব্য আলোচকের মতে- ভারতবর্ষে দুটো মাত্র প্রেরিত পুস্তক আছে, একটি পবিত্র বেদ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে গালিবের কাব্য সংকলন

 

১৭৯৭ সালে আগ্রায় জন্ম নিয়েছিলেন মির্জা আসাদুল্লাহ খান। কবি নাম ‘গালিব’, যার অর্থ বিজয়ী। কৈশোরের পর জীবনের বাকি অংশ কাটিয়েছেন দিল্লিতে। বলা হয়— কাব্য যদি ধর্ম হয়, তবে গালিবকে না বোঝা মানে কাফের হওয়া! গালিব দৃশ্যকল্পের কবি। মাত্র ২৩৫টি গজল আছে তাঁর চলতি কাব্য সঙ্কলনে। তাতেই তিনি উর্দু কাব্যের অধীশ্বর।

 

ভূমিকা ও ভাষান্তর: জাভেদ হুসেন

১.
সিনে কা দাগ হ্যায় ও নালা কি লব তক না গ্যায়া
খাক কা রিযক হ্যায় ও কাতরা কি দরিয়া না হুয়া

যে আর্তনাদ ঠোঁটে এলো না সে বুকে দাগ কেটে বসে
যে জলবিন্দু নদীতে পৌঁছলো না তাকে মাটি শুষে নেয়

 

২.
গর নিগাহ গর্ম ফরমাতি রহি তালিমে যবত
শোলা খস মে জ্যায়সে খুঁ রগ মে নিহা হো জায়েগা

তোমার নির্দয় দৃষ্টি যদি এভাবেই সংবরণ শিখিয়ে যায়
শিরায় রক্তের মতো শুষ্ক তৃণে আগুন লুকিয়ে যাবে

 

৩.
জান দি দি হুয়ি উসি কি থি
হক তো য়ে হ্যায় কি হক আদা না হুয়া

যে প্রাণ দিলাম তোমায় সে তো তোমারই দেয়া
আসল কথা এই – তোমাকে কিছুই দেয়া হলো না

 

৪.
দর্দ মিন্নতকশে দাওয়া না হুয়া
হাম না আচ্ছা হুয়ে বুরা না হুয়া

বেদনা নিদানের জন্য মিনতি করেনি
আমি ভালো হলাম না, মন্দ হয়নি

 

৫.
ম্যায় অওর বযমে ম্যায় সে য়ুঁ তশনাকাম আউঁ
গর ম্যায় নে কি থি তওবা সাকি কেয়া হুয়া থা

মদিরা আসর হতে এমন তৃষ্ণার্ত ফিরে এলাম কি না আমি!
আমি না হয় তওবা করেছিলাম, সাকির কী হয়েছিল!

 

৬.
যিন্দেগি য়ুঁ ভি গুযার হি জাতি
কিঁউ তেরা রাহগুযার য়াদ আয়া

জীবন তো এমনি কেটে যেত
কেন যে তোমার পথের কথা মনে পড়লো

 

৭.
ফির তেরে কুচে কো জাতা হ্যায় খায়াল
দিলে গুমগশতা মাগার য়াদ আয়া

ভাবনা আবার তোমার গলিতে যেতে চায়
বোধ হয় হারানো হৃদয়ের কথা মনে পড়েছে

 

৮.
গো ম্যায় রাহা রহিনে সিতমহায়ে রোযগার
লেকিন তেরে খায়াল সে কাভি গাফিল নেহি রাহা

প্রত্যহের তুচ্ছতার কাছে যদিও বন্ধক ছিলাম
তবু তোমার ভাবনায় অবহেলা হয়নি কখনো

 

৯.
যিক্র উস পরিওশ কা অওর ফির বয়াঁ আপনা
বন গ্যায়া রকিব আখির থা জো রাজদা আপনা

একে সেই পুষ্পমুখির আলাপ, তাতে আমার বয়ান নিপুণতা
যে ছিল প্রাণের দোসর সেই হলো প্রতিদ্বন্দ্বী আমার

 

১০.
হাম কাঁহা কে দানা থে কিস হুনারপে য়াকতা থে
বেসবব হুয়া গালিব দুশমন আসমাঁ আপনা

এমন কি চৌকশ, কী এমন অনন্য গুণ ছিল আমার!
গালিব, এই ভাগ্য অহেতুক শত্রু  হলো আমার

 

১১.
হ্যায় মুঝে আবরে বাহারি কা বরস কর খুলনা
রোতে রোতে গমে ফুরকত মে ফানা হো জানা

বসন্ত মেঘের বর্ষণ শেষে উন্মুক্ত আকাশ আমার কাছে
যেন বিরহ বেদনার অশ্রুতে নিজেই ভেসে যাওয়া

 

১২.
খানা বিরাঁ-সাযিয়ে হ্যায়রাত তামাশা কিজিয়ে
সুরতে নকশে কদম হুঁ রফতে রফতারে দোস্ত

বিস্ময়ে সব কিছু হারানোর এই তামাশা দেখে যাও
প্রিয়র লীলাময় বিচরণের পদচিহ্ন হয়ে পড়ে আছি

 

১৩.
আতা হ্যায় ইক পারায়ে দিল হর ফুগাঁ কে সাথ
তারে নফস কমন্দে শিকারে আসর হ্যায় আজ

প্রতি দীর্ঘশ্বাসে হৃদয়ের টুকরো বের হয়ে আসে
নিঃশ্বাসের সুতোয় প্রতিদান শিকারে ফাঁদ পেতেছে আজ

 

১৪.
শাম্মা বুঝতি হ্যায় তো উসমে সে ধুঁয়া উঠতা হ্যায়
শোলায়ে ইশক সিয়াহপোশ হুয়া মেরে বাদ

প্রদীপ নিভে গেলে তা থেকে ধোঁয়া ওঠে
আমি নেই তাই প্রেমের আগুন কালো পোশাক পরেছে

 

১৫.
ঘর জাব বানা লিয়া তেরে দর পর কহে বাগ্যয়র
জানেগা আব ভি তু না মেরা ঘর কহে বাগ্যয়র

তোমার দরজার সামনেই ঘর বানিয়ে নিয়েছি আমি
এবারও কি বলবে আমার ঘরের ঠিকানা জানো না তুমি!

 

১৬.
কিঁউ জ্বল গ্যায়া না তাবে রুখে য়ার দেখ কর
জ্বলতা হু আপনি তাকতে দিদার দেখ কর

প্রিয়র রূপের বিভায় কেন জ্বলে ছাই হলাম না!
নিজ দৃষ্টির শক্তি দেখে এখন নিজেই জ্বলে মরি!

 

১৭.
ইন আবলো সে পাঁও কে ঘাবরা গ্যায়া থা ম্যায়
জি খুশ হুয়া হ্যায় রাহ কো পুরখার দেখ কর

পায়ের এই ফোস্কা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম
পথ ভর্তি কাঁটা দেখে মন খুশি হয়ে গেল

 

১৮.
লরযতা হ্যায় মেরা দিল য্যাহমতে মেহরে দরখশা দেখ কর
ম্যায় হু ও কাতরায়ে শবনম কি হো খারে বাঁয়াবা পর

উদার সুর্যের কষ্ট দেখে বিচলিত হৃদয় আমার
আমি যে মরুর বুকে কাঁটার ওপরে পড়া শিশির!

 

২৯.
নাদান হো জো ক্যাহতে হো কিঁউ জিতে হো গালিব
মুঝ কো তো হ্যায় মরনে কি তামান্না কোই দিন অওর

কেন বেঁচে আছো গালিব – এই প্রশ্ন অবুঝের
আমার ভাগ্যে লেখা মৃত্যুর বাসনা নিয়ে আরো কিছু দিন বেঁচে থাকা

 

২০.
থা খোয়াব মে খায়াল কি তুঝ সে মুআামলা
জাব আঁখ খুল গ্যায়ি না যিয়া থা না সুদ থা

স্বপ্নে আমার ভাবনায় তোমার মুখোমুখি ছিলাম
চোখ খুলে দেখি লাভ নেই, লোকসানও হয়নি কিছু

 

২১.
ইশক সে তবিয়ত নে যিস্ত কা মযা পায়া
দর্দ কি দাওয়া পায়ি দর্দ লাদাওয়া পায়া

প্রেমে স্বভাব পেয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দ
ব্যাথার পেয়েছে ওষুধ আর পেয়েছে সেই ব্যাথা যার কোন ওষুধ নেই

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত