২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এমন প্রবচনের ইতিহাস লম্বা দিনের। বিশ্বসাহিত্যে কি বাংলাসাহিত্যে কম নেই দৃষ্টান্ত। আমাদের হাতের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে আছে ফরাসি লা রোশ ফুকো-র ‘ম্যাক্সিম’ এবং হুমায়ুন আজাদের ‘প্রবচনগুচ্ছ’। সম্প্রতি আরো অনেকে লিখেছেন, লিখছেন চমকপ্রদ সব প্রবচনতুল্য কথা, ইংরেজিতে যাদের বলে ‘অ্যাফোরিজম’, বাংলা অর্থ ‘সংক্ষিপ্ত জ্ঞানগর্ভ বাণী বা প্রবচন’।
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
হামীম কামরুল হক
কথাসাহিত্যিক
21

হামীম কামরুল হক
কথাসাহিত্যিক

21

দ্বিতীয় পর্ব

আন্দাজি কথা

আন্দাজি কথা’র কথামুখ

‘আন্দাজি কথা’ দুটো দিক থেকে আন্দাজি। একটা হলো—অনুমানের দিক থেকে— যা সত্য কি মিথ্যা দুই-ই হতে পারে। আরেকটি হলো, লোকে বলে না যে, ‘লোকটার আন্দাজ আছে’। যেমন, একটা ঢিল মারা হলো, আর ঠিক জায়গামতো ঢিলটা লাগল। কোনো কোনো সময় অন্ধকারে ঢিল মারাটাও জায়গামতো লেগে যায়। ফলে বুঝে-শুনে বা আন্দাজে যাই হোক— কথাগুলো একেবারে জীবনের ভেতর থেকে উঠে এসেছে। নানান ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ জেগেছে এক একটা কথা। কোনো কোনো কথা একটু ছড়িয়ে বলা— মানে, অনুচ্ছেদের মতো হয়ে গেছে। তবে বেশিরভাগ কথাই প্রবচনের ভঙ্গি মেনে। এমন প্রবচনের ইতিহাস লম্বা দিনের। বিশ্বসাহিত্যে কি বাংলাসাহিত্যে কম নেই দৃষ্টান্ত। আমাদের হাতের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে আছে ফরাসি লা রোশ ফুকো-র ‘ম্যাক্সিম’ এবং হুমায়ুন আজাদের ‘প্রবচনগুচ্ছ’। সম্প্রতি আরো অনেকে লিখেছেন, লিখছেন চমকপ্রদ সব প্রবচনতুল্য কথা, ইংরেজিতে যাদের বলে ‘অ্যাফোরিজম’, বাংলা অর্থ ‘সংক্ষিপ্ত জ্ঞানগর্ভ বাণী বা প্রবচন’।

২৬.
বানানো হলেও প্রত্যেকের একটা প্রতিপক্ষ চাই। তার কোনো না কোনো খেলা চাই। একা একা খেলা যায় না। সঙ্গমে যেমন সঙ্গী। নইলে সবই স্বমেহন। স্বমেহন থেকে কোনো কিছুর উৎপাদন হয় না। সন্তোষ বা সৃষ্টি কোনোটাই দ্বন্দ্ব (খেলা) ছাড়া ছন্দ পায় না—এই হলো জগতের আসল আখ্যান। কিন্তু এই খেলার হাতেই যদি কেউ ক্রীড়ানক হয়ে পড়ে তাহলে তো আরেক বিপদ। কৃষ্ণ শকুনিকে বলেছিল, কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে, শকুনি পাশাকে, নাকি পাশাই শকুনিকে? এভাবে কেউ কেউ যা নিয়ে খেলে এবং যার সঙ্গে খেলে তার নিয়ন্ত্রণেও চলে যায়।

২৭.
শরীরে থাকা অঙ্গপ্রতঙ্গের অবস্থানই যেন বলে দেয় কোনটার কী কাজ। জিভ মুখের ভেতরে থাকে, থাকে ওৎ পেতে। এর ভেতরে গভীর ইঙ্গিত আছে। চোখ সামনে থাকে, কারণ সামনের দিকেই তাকাতে হয়। পা সামনের দিকে তাক করা, কারণ যেতে হবে সামনে। কান মাথার দুপাশে, তাও ইঙ্গিতময়। ‘ছয় ইঞ্চির জিভ ছয় ফুট উচ্চতার লোককে হত্যা করতে পারে’ বহুল প্রচলিত প্রবাদ। ‘কোমর ভেঙে’ দেওয়া কী জিনিস আর ‘মেরুদণ্ডহীন লোক’—এসবের মানে সবারই জানা। মানুষের পুরো শরীর চিত্রে (নগ্নকরা, ইংরেজি অভিধানে বা কোনো ইলাস্ট্রেটেড ডিকশনারিতে, বা কোনো হাসপাতাল বা হোমিওপ্যাথির দোকানে দেওয়ালে টানানো) পরিচয় করার সময়ও জিভ বের করা ছবি আমরা কি খুব দেখি? বাকি সবই দেখা যায়, মানে যে অঙ্গপ্রতঙ্গগুলো নিত্য ব্যবহার করা হয় (হৃদপিণ্ড, পাকস্থলী, বা ফুসফুস ইত্যাদি—সেসবও নিত্য ব্যবহৃত, কিন্তু তা তো বাইরে একেবারেই দেখা যায় না), সবই সেই অঙ্গসংস্থানচিত্রে প্রকাশিত, কেবল জিভ থাকে ভেতরে।
জিভ মানে কথা। জিভ মানে স্বাদগ্রহণ। কথায় অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ হয়, কথা অন্যকে দেওয়া হয় (সময়, কথা আর সুযোগ— এই তিন, একবার বেরিয়ে গেলে, ছুটে গেলে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।)। আর স্বাদ নিজের জন্য। সাবধানতা আর গোপনীতায়ই বোধ হয় জিভের প্রধান ধর্ম ও কর্ম। যত বেশি বলতে হয় তারচেয়ে বেশি গোপন করতে হয়। আর স্বাদের কথা তো আরো গোপন। জীবনের স্বাদ, সাধ ও সাধ্য নিজের ছাড়া আর কারো বাধ্য হওয়ার কথা ছিল না—কিন্তু এই বিষয়গুলিই এখন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের স্বাদ, সাধ, সাধ্য কত না কিছুর বাধ্য। কতরকমের বাধা মেনে এরা ধুকে ধুকে কোনোমতে টিকে থাকে, তবে বেশিরভাগই গায়েব হয়ে যায়।

২৮.
রবীন্দ্রনাথ পড়লে মাঝে মাঝে মনে না করে পারি না— কী চরম এক নিঃসঙ্গ লোক ছিলেন তিনি। মনে হয় নিঃসঙ্গতাই তাঁর সমস্ত সাহিত্য সৃষ্টির উৎস। কথাটি এক বন্ধুকে জানালে তিনি বলেন, নিঃসঙ্গতা নয়, দুঃখ—দুঃখই হল তাঁর সমস্ত সৃষ্টির শেকড়। তারপরও আমার মনে হল— নিঃসঙ্গতা আর দুঃখ একই মুদ্রার দুই পিঠ। এই দুইকে যিনি সত্যিকার ভাবে কাজে লাগাতে পারেন তিনি স্রষ্টা হয়ে ওঠেন। জেমস বল্ডউইন বলেছিলেন, যে-নির্জনতা, নিঃসঙ্গতা মৃত্যুর মতো— তাই মানুষকে সৃজনশীল করে তোলে। নিঃসঙ্গতা ও দুঃখের অনুভব যার যার আছে সে সে তার কাছে তার তার মতো মৌলিক। কারো সঙ্গে কারো মিলবে না।
শহীদুল জহির বলেছিলেন, যে নিঃসঙ্গ নয়, সে হতভাগ্য। রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘দুঃখটা হয়তো মানুষের পক্ষে অত্যন্ত দরকারি জিনিস। যুদ্ধ করা, চেষ্টা করা, সহ্য করা, ত্যাগ করা— হয়তো সুখী হওয়ার চেয়ে বেশি আবশ্যক।’ রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে এসে যে ব্যক্তি দুঃখ পেল না সে লোক ঈশ্বরের কাছ থেকে তার সব পাওনা পেল না—তার পাথেয় কম পড়ে গেল।’ যে কষ্ট না করলো, সহ্য না করলো, নিজের সঙ্গে নিজে যুঝল না— সে তো আসলে কিছুই পেল না। বলা বাহুল্য, এই নিঃসঙ্গতা ও দুঃখের গভীরতর দিকটি তথাকথিত একা থাকার নিঃসঙ্গতা নয়; চাওয়া-পাওয়া, হারানো-ফুরানোর দুঃখ নয়, সাফল্য-ব্যর্থতার দুঃখ নয়। এই দুইকে যারা গভীরভাবে পায়, তারা জানে জগতের কী সম্পদ তাদের মনে এসে ঠাঁই নিয়েছে— এই বেদনার বিস্ময় অপার। আর সেই বিস্ময়ই সব সৃষ্টির মূলে কাজ করে।

২৯.
কেউ অপেক্ষা করে না, দাঁড়ায় শুধু। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তারপর চলে যায়। কিন্তু সবাই তো আর ‘কেউ’ নয়। যারা অপেক্ষা করে তারাই আলাদা হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে বিশিষ্ট। কারণ অপেক্ষার চাইতে কষ্টকর কাজ কমই আছে। এই কষ্ট যে সহ্য করতে পারে তারই ‘কেষ্ট’ মেলে। একটি মানুষের জন্ম দিতে নারীকে ৯/১০ মাস ধৈর্য ধরে নানান নিয়মকানুন মেনে অপেক্ষা করতে হয়। এমন অনেক কিছুর জন্য আবার সবাইকেই কম-বেশি অপেক্ষা করতে হয়। এভাবে আরো অনেক কিছু মানুষের জন্য অপেক্ষা করে— অর্থ, বিত্ত, (পুরুষের জন্য) নারী / পুরুষ (নারীর জন্য), প্রেম, নাম-খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা আরো কত কী, কেবল মৃত্যু ছাড়া। মৃত্যু যেকোনো সময়, যেকোনো অপেক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে পারে।

(‘কেউ অপেক্ষা করে না, দাঁড়ায় শুধু।’—কথাটি বলেছিলেন আমাদের প্রিয় ফিরোজ ভাই, শুনে চমকে উঠেছিলাম। ফিরোজ সরোয়ার, আমাদের প্রাক্তন সহকর্মী, কথাটি লিখেছিলেন, তাঁর ‘দাঁড়াও’ উপন্যাসে। বলে রাখা ভালো, ‘চারদিক’-এর মতো নান্দনিক একটি প্রকাশনী তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরে সেটি বিক্রি করে দেন। কারণ প্রকাশক হয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা হল— প্রকাশক মানে ‘প্রকাশিত শোক।’)

৩০.
কাজের জাঁক তখনই বোঝা যায়, ঝাঁজটা টের পাওয়া যায়, যখন লক্ষ্যে পৌঁছানো নয়, লক্ষ্যই নিজে এসে পৌঁছে যাবে কারো কাছে। জেন অস্টেন, জুল ভার্ন বলে ঘর থেকেই বের হতেন না। কান্ট যেখানে থাকতেন তার আঠারো মাইলের বাইরে কখনো বলে যাননি। তাতে মনে হয়, এঁরা লক্ষ্যে পৌঁছাননি, লক্ষ্যই তাদের কাছে পৌঁছেছে। অবশ্য লোকে বলতেই পারে— এঁরা ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম কোনো উদাহরণ নয়। (‘ব্যতিক্রম কোনো উদাহরণ নয়’— এর চেয়ে হাস্যকর, ‘কাশ্যকর’— [মানে, শুনলে কাশি পায়/বা আসে] কথা আর কী হতে পারে)

৩১.
ধর্ম বলে: আমার কথাই ঠিক। আমিই সত্য।
বিজ্ঞান বলে: না, আমি। আমার কথাই ঠিক।
মন বলে: দুয়ের কথা একসঙ্গে কী করে ঠিক হয়?
মানুষ বলে: মনের কথাও তো ঠিক।

৩২.
জীবন হল প্রচণ্ড শীতে গরম কাপড় গায়ে দেওয়ার মতো— তাতে নিজের গায়ের তাপই ধরে রেখে নিজেকে উষ্ণ রাখতে হয়। অন্যের গায়ের উত্তাপ দিয়ে নিজেকে ওম দেওয়া যায় না। অনেক আগে একটা ছড়ার মতো লিখেছিলাম— সেখানে একটা পংক্তি ছিল, ‘যে বাঁচে / সে বাঁচে / নিজেরই আঁচে।’ ‘আঁচ’— এই শব্দটির দুটো অর্থ। একটি হল ‘অনুমান’, যেমন মনের আঁচ, ভবিষ্যত সম্পর্কে আঁচ; আরেকটা হল ‘আগুনের আভা’, ঝাঁজ— চুলার আঁচ। নিজকে ওম দেওয়াটা মানুষের নিজেকে বুঝতে, জানতে কাজে দেয়— অন্তর্দৃষ্টি দেয়। আর ভবিষ্যতের আঁচ করতে পারাটা দেখিয়ে দেয় জীবনের প্রকৃত জাগরণ কোথায় নিহিত আছে— তাকে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন করে। অন্তর্দৃষ্টি (ইনসাইট) ও দূরদৃষ্টি (ফোরসাইট)— এই দুয়ের অভাব সবখানেই এখন প্রকট— তাই মনে হয়, ওই দুই আঁচ এখন খুব একটা মানুষকে ওম দিচ্ছে না।

৩৩.
ভালোবাসা অসীম, ফুল সীমিত। আরো যোগ করতে চাই। ফুল পয়সা দিয়ে কিনতে পাওয়া যায়। আর ভালোবাসা? উত্তরটা সবারই জানা। ফুল কিনতে পয়সা লাগে, কিন্তু ভালোবাসা পেতে পয়সা লাগে না, যদি তেমন ভালোবাসা হয়।

৩৪.
ক্ষমতার রাজনীতির একটা মজার খেলা আছে, নাটকও বলা যায়। পালাবদল হলেই মালাবদল। ফুলের মালার বদলে জুতার মালা।

৩৫.
অপরিচ্ছন্ন আয়নায় কোনো কিছু ঠিকমতো প্রতিফলিত হয় না, প্রতিসরণও ঘটে না। তেমনি অপরিচ্ছন্ন মন নিয়ে লেখালেখি করলে কিছুই সেখানে ধরা পড়ে না। লেখার জন্য স্বচ্ছ-সরল একটা হৃদয় চাই—যেখানে ঘটবে জীবনের বিচিত্র রহস্য ও জটিলতার প্রতিসরণ। যারা লেখালেখি করেন—তাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত— হৃদয়ের সেই স্বচ্ছতা, সেই সরলতা তার আছে কিনা। তার ঘনিষ্ঠজন জন বা বন্ধুরা সে যে ‘সরল’ সেটা তাকে বলে কিনা— যদি না বলে তাহলে বুঝতে হবে, লিখে তিনি খুব বেশি একটা কিছু করতে পারবেন না। (এমন তথাকথিত লেখক-কবির মিডিয়াবাজি আর লাইনবাজিই সম্বল।)

৩৬.
‘আলোকিত মানুষ’ চাই না; ‘মাটির মানুষ’ চাই। আর কত চাইবো? আমি নিজে কি ‘মাটির মানুষ’ হতে পেরেছি? নাকি হয়ে গেছি মরা-কাঠ; পরিণতি আর কিছু নয়, ছাই। (আমরা সবাই মিলে একে অন্যকে দিনে দিনে কেবলই জটিল করে চলেছি, কাঠ-কংক্রিটের মানুষ হয়ে উঠেছি।) মাটির মানুষ কী? অহংকারশূন্য মানুষ।
যুধিষ্ঠির— নৈতিকতা
ভীম— শক্তি ও সাহস
অর্জুন— কৌশল
নকুল— সৌন্দর্য
সহদেব— জ্ঞান / পাণ্ডিত্য
এঁদের প্রত্যেকেরই নানান দুর্বলতা ছিল। এমনকি যেটি তাদের গুণ—সেটিও একেকজনের অহংকারে পরিণত হয়েছিল, আর অহংকার পতনের মূল। ফলে মহাপ্রস্থানিকপর্বে যুধিষ্ঠির ছাড়া প্রত্যেকেরই পতন হয় তাদের নিজেদের ওই গুণ নিয়ে মনে ভেতরে পোষণ করা অহংকারের কারণে। একমাত্র যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে যেতে পারেন। তাই দেখা যাবে নানান দুর্বলতা স্বত্ত্বেও নৈতিকতাকে যিনি সবার ওপরে রাখতে পারেন, তিনি অহংকার মুক্ত থাকতে পারেন। কারণ মানুষের প্রধান গুণটাই দম্ভ বা অহংকারের কারণে তার প্রধান দোষে পরিণত হয়— যা হয়ে ওঠে রীতিমতো আত্মক্ষয়কারী। ফলে তার শক্তিটাই হয়ে ওঠে তার প্রধান দুর্বলতা। এটাই এক একটি মানুষকে নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ট্রাজেডির দিকে ঠেলে দেয়। তাই নৈতিকতার প্রধান দিক হল অহংকারহীনতা। অহংমুক্তিই স্বর্গ বা মোক্ষ অর্জনের একমাত্র পথ। অন্তত মহাভারত পড়ে তো এ-ই মনে হয়।

৩৭.
নীতি যদি অর্থহীন হয়, তাহলে অর্থও নীতিহীন হয়ে যায়— তখনই অর্থ হয়ে ওঠে সমস্ত অনর্থের মূল।

৩৮.
বালিঘড়িকে পানপাত্রের মতোই দেখায়। কেউ কেউ সময়ের মদ পান করে বেঁচে থাকে। কাউকে কাউকে সময়ই পান করে ফেলে।

৩৯.
প্রেম এক প্রেত বিশেষ। (ম-এর জায়গায় ত-বসানোতেই কেবল এর পার্থক্য ঘটে না।) কারো ঘাড়ে ভূতের মতো চেপে বসার পরও (ভার অনুভব করেও কিন্তু ) কোনোদিন সে তার দেখা পায় না।

৪০.
যৌনতা বিষয়ক মৌনতা আমাদের অনেক সর্বনাশের কারণ। যৌনতা বিষয়ক মুখরতা ‘তাহাদের’ অনেক সর্বনাশের কারণ। এর মাঝামাঝি বিষয়টা কী? নাকি বিষয়টাই এমন— এক্সট্রিম / চরমভাবাপন্ন— মাঝমাঝি কোনো দশা নেই; হয় এসপার, নয়তো ওসপার।

৪১.
জীবন জটিল হয়ে উঠতে থাকে সময়ের স্বল্পতার জন্য। প্রেমের জন্য সময় নেই, সৃষ্টির জন্য সময় নেই,—এমন অনেক কিছুর জন্যই সময় নেই। এমন সময়হীনতাই মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে, নিজেকেও নিজের কাছে পরিষ্কার করে দিতে পারে না।

৪২.
প্রতিটি প্রেম আমাকে নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর করে দিয়েছে। কামসুখের তো প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি কোনো স্পর্শও নয়, কেবল হৃদয়ের গভীরে নিরন্তর অনুভব আর অনুভব। অনুভবেরাই নানান অনুভবের দরোজা খুলেছে। দরোজার পর দরোজা খুলে দিয়েছে। নিজের অজান্তেই আমি সেসব পেয়েও হারিয়েছি। তবুও নিজের ভেতর থেকে ভালোবাসার শক্তিটা হারাতে দেইনি। কারণ, প্রেমের পথে যত দেওয়াল, তত দরোজা—এটা যেমন বিশ্বাস করি, ততটাই মনে করি যে, ভালোবাসার শক্তি নিজের মধ্যে থেকে হারিয়ে ফেললে আমি হয়ে যাবো একেবারেই একা— যে-একাকিত্বকে হয়তো আমি ভয়াবহ ভাবে ভয় পাই। কিন্তু মনে প্রেম নিয়ে, হৃদয়ভরা ভালোবাসা নিয়ে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গতাকেও আমি নিজের মতো উদ্যাপন করতে পারি। কিন্তু সব সময় কি পারি? বুদ্ধিমত্তা হলো— আমি যা জানি-বুঝি তা ঠিকমতো জানি ও বুঝি কিনা— নিজেকে বার বার সেই প্রশ্ন করা। করি কি নিজেকে সেই প্রশ্ন সব সময়?

৪৩.
কাম্যু হলেন দস্তয়েভস্কির উত্তরাধিকারী। দস্তয়েভস্কি হলেন গদ্যে লেখা শেক্সপিয়র। আর শেক্সপিয়র? ইউরোপীয় মানসের তাবত প্রবণতার সন্নিবেশকারী লেখক।

৪৪.
অল্পই শিল্প। পরিমিতিবোধের সেই জাদু-পাখি আজো ধরা হলো না।

৪৫.
উঠলে অনেক উঁচুতে ওঠো। পারলে অনেক দূরে যাও। সেখানে বেশি লোকের ভিড় নেই।

৪৬.
‘যখন কিছুই নেই লুকোবার, তখন দুনিয়াকে আছে অনেক কিছু দেখাবার।’—ক্লিয়ার— কথাটা নায়িকা (যার কোনো অভিনয় করার গুণই নাই, শরীর সর্বস্ব, অভিনেত্রী নয়) এবং লেখক (যে কবি ও লেখকের লেখায় শৈল্পিক গুণ নেই, ভিক্ষুকের মতো পুরস্কার ও খ্যাতি কুড়ানো যার ধান্দা, ধান্দাসর্বস্ব, সাহিত্যিক নয়)— এই দুয়ের জন্যও বেশ জুৎসই। আসলে তো কতটা দেখলাম, আর কতটা প্রকাশ করলাম, তার বদলে কতটা দেখালাম না এবং প্রকাশ করলাম না— সেখানেই শিল্প। অনেকটা দেখানোও নয়। কিছুটা, ওই যে ‘অল্পই শিল্প’। শরীর ও তার অভিব্যক্তি— যতটা প্রকাশ করার তার চেয়ে বেশি আড়াল করবার, ভাষাও যতটা প্রকাশ করবার, ততটাই গোপন করবার। আর বিশ্রী শরীর যদি নগ্ন হয় ও কুৎসিত ভাষা যদি তার সর্বস্ব প্রকাশ করে— তার চেয়ে জঘন্য আর কী!

৪৭.
সত্যিকারের লেখক ও তার লেখা গোটা সভ্যতাকে ফাঁদে ফেলে, জগতের প্রত্যেকটি মানুষকে ফাঁদে ফেলে!

৪৮.
কাউকে মাথায় তোলার আগে জগতে কয়জন বুঝতে পারে সে তার মাথায়ই মুতে দিবে কিনা?

৪৯.
যখন কেউ ভালোবাসে তখন রীতিমতো অসুন্দরকে অপূর্ব সুন্দর মনে হয়, ছোট ও তুচ্ছ জিনিসকে বড় মনে হয়, সামান্য সম্ভাবনাময় মানুষকেও মনে হয় বিপুল প্রতিভাবান।

৫০.
বড়লোকেরা চায় ছোটলোকেরা তাদের জন্য ছোট ছোট কাজগুলি করে দিক, যেমন: মাটিতে পড়ে গেলে কোনো কিছু হাতে তুলে দেওয়া, ঘর ঝাড়ু দিয়ে দেওয়া থেকে দোকান থেকে ছোট্ট কিন্তু দরকারি জিনিসটা এনে দেওয়া ইত্যাদি। আর ছোটলোকেরা চায় বড়লোকেরা তাদের জন্য বড় বড় কাজগুলি করে দিক, যেমন: তার জন্য একটা হাসপাতাল করে দেওয়া থেকে তাকে একটা গাড়ি উপহার দেওয়া ইত্যাদি। তাই ছোটলোক যদি বড়লোককে গাড়ি উপহার দেয়, সে বিরক্ত হবে। আর বড়লোক যদি ছোটলোকের ঘর ঝাড়ু দিতে আসে তাতে ছোটলোকটাও যার পর নাই বিরক্ত হবে।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত