আমার শৈশবকাল কেটেছে জন্মস্থান কক্সবাজারে। আমাদের এলাকার এক দূর-সম্পর্কের নানাভাই ছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি প্রায়ই আমাকে দেখতে আসতেন বাসায়। প্রায়শই ধাঁধার ছলে কিছু প্রশ্ন করতেন। এরকম একটা ধাঁধা পাড়লেন তিনি একদিন— ‘একবার এক নানী তার নাতিকে প্রশ্ন করল: বলতো নাতি কোন মাছ খেতে সবচেয়ে সুস্বাদু? নাতি একবার ইলিশ, একবার রুই, একবার বোয়াল, একবার শিং এভাবে অনেক মাছের নাম বলে ফেলল। অবশেষে নানী বললেন: সুস্বাদু মাছ বলতে আসলে কোন মাছ নেই। মাছের স্বাদ নির্ভর করে মূলত রাঁধুনির রন্ধনশৈলীর উপর। সুতরাং রন্ধনশিল্পীই মূল কারিগর, মাছ নয়।’
এই প্রশ্নের অবতারণা করার কারণ হলো, আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে পৃথিবীর কোন জায়গা সবচেয়ে সুন্দর? আমি বলব: নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সিংহভাগ নির্ভর করে ভ্রমণসঙ্গীর উপর, শুধুমাত্র জায়গা নয়।
মাস কয়েক আগে বড় এক দুর্ঘটনায় শরীর ও মন বিপর্যস্ত ছিল। শারীরিক অসুস্থতা সেরে ওঠেনি পুরোপুরি। পাশাপাশি মানসিক ট্রমাও কোনোভাবেই ছেড়ে যাচ্ছিল না। আমার প্রিয় দুই বন্ধু যারা বাস্তব জীবনে দম্পতি তারা একরকম জোর করে রাজি করালো—হাওয়া বদলের জন্য তাদের সাথে যেন কোথাও যাই। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, সংশয় ছিল। দীর্ঘদিন চার দেয়ালে বন্দী থাকলে যা হয়; সেই জড়তা পেয়ে বসল। কিন্তু নাছোড়বান্দা বন্ধুরা আমার! যেতেই হবে। তারা যেহেতু ভ্রমণসঙ্গী তাই সাত পাঁচ আর চিন্তা করলাম না কোথায় যাচ্ছি। গন্তব্যস্থল ঠিক করল তারাই: শ্রীলঙ্কা! ১৯৯৬-এর ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কার খেলার কৈশোর স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল! অর্জুনা রানাতুঙ্গা-অরবিন্দ ডি সিলভা-চামিন্দা ভাসের নৈপুণ্যে তাদের বিশ্বজয়। পরবর্তীকালে কুমারা সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে-লাসিথ মালিঙ্গা! আমার শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে যাবতীয় সাধারণ জ্ঞানের সবটাই ক্রিকেট! এছাড়া সাম্প্রতিক খেয়াল ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপাকসেকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল সেদেশের জনগণের প্রতিবাদের মুখে। এই অল্পকিছু জ্ঞানের বাইরে আর কোনো কিছুই জানি না। শ্রীলঙ্কা নিয়ে ছিল না কোনো বাড়তি ফ্যান্টাসি, ছিল না কোনো অতি আগ্রহ! একেবারে সাদা খাতার মত মন আমার। কোন পূর্বানুমান আর আকাঙ্খা ব্যতিরেকেই যাত্রা শুরু করলাম।
মোট চারটা শহরে গিয়েছিলাম। কিন্তু যে শহরটা মনে গভীর দাগ কেটেছে সে শহর নিয়েই মূলত এই লেখাটা। আহাংগামা সেই জায়গার নাম। সবকিছু বাদ দিয়ে এই জায়গার ধীর লয় আমাকে মুগ্ধ করেছিল। মানুষ ও প্রকৃতির বাইরে এই জায়গায় একটা বিষাদী সংগীতের দ্যোতনা আছে যা আমাকে সারাজীবন আবিষ্ট করে রাখবে। ঠিক কিভাবে সেই আবেশের বশবর্তী হয়েছি তারই শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছি এই লেখায়।
১.
আহাংগামা যেদিন পৌঁছেছি, সেদিন ছিল শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের চতুর্থ দিন। এয়ারবিএনবির বাসা থেকে বের হয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য ঘুরছি পাশের রাস্তায়। রাস্তা নিয়ে একটু বলা দরকার তা না হলে আহাংগামা নামক জায়গার ধীরলয়ের সৌন্দর্যের প্রশান্তি বোঝানো যাবে না। একটা ট্যুরিস্ট শহরের কথা চিন্তা করলে যেসব দৃশ্য আমাদের মনের কোণে উঁকি দেয় তার সাথে আহাংগামার ঠিক ঐভাবে মেলে না। ভিড়ভাট্টা নেই, নেই হাজার হাজার মটরগাড়ির হর্নের আওয়াজ, নেই কোন বিশাল মধ্যস্বত্বভোগী নানান পদের পেশাজীবীদের হাঁকডাক কিংবা বিচরণ, নেই হালের ট্রেন্ডি খাবার-দাবারের সর্বস্ব হাঁকানো প্রচারমুখী চিৎকার চেঁচামেচি। এমন না যে তা নেই, আছে কিন্তু একটা সৌন্দর্য নিয়ে হাজির আছে। একটা নান্দনিকতা আছে তাতে। ধীরতা আছে।
রাস্তার কথা বলছিলাম। গ্রামের বাড়ির রাস্তার মতন একটা ভাব আছে যেন সে রাস্তায়। আশেপাশে সাধারণ মানুষের বাড়ি। নানান রকমের ফুলগাছে সুশোভিত চারদিক। দু’পাশেই ৭/৮ মিনিট হাঁটলে চোখে পড়বে ২৫/৩০ রকমের ফুলে ফুলে সজ্জিত অবিন্যস্তভাবে বিন্যস্ত সংসারী পথ। সংসারী পথ বলছি কারণ এই রাস্তায় চোখ মেললেই বোঝা যায় একজন পর্যটক যেন একটা বাড়িতেই এসেছেন। যত দূরদেশ থেকেই আসুক না কেন, এ রাস্তায় এসে মনে হবে সে তার বাড়ির আশেপাশে কোথাও আছে। ঠিক যেভাবে বাড়িতে আমাদের জন্য কেউ অপেক্ষা করে, বাড়ি থেকে বেরোলে আমাদের বিদায় দেয়, যেভাবে বাড়িতে আমরা হাত পা এলিয়ে পৃথিবীর সব দৈনন্দিনতা নিয়ে আরামসে বসে সময় থামিয়ে রাখি, ঠিক তেমন অনুভূতি আমাদের মনের মধ্যে অনুরণন দিয়ে যায় এই রাস্তা। শুধু আহাংগামা নয়, পুরো শ্রীলঙ্কাই যেন মনের মাঝে ঠিক তেমনই একটা ছাপ দিয়ে যায়।

সকাল ১০টার দিকে নাস্তার খোঁজে রাস্তায় ঘুরছি শহুরে যাযাবরের মতো। কিছুদূর পর পর কিছু খাবার জায়গা কিংবা কফিশপের খোঁজ আমরা পেয়েছি যার সাথে সেই মালিকের বাড়িও লাগানো অর্থাৎ বাড়ির সাথেই তাদের খাবারের দোকান। প্রায় ৪/৫টা এমন দোকান থেকে ফেরত এলাম আমরা। তারা তখনো দোকান খোলেনি। কেউ খুলবে ১২টায়, কেউ দুপুর ২টায়, এরকম। এবং খুব হাসিমুখে তারা জানাচ্ছে আমাদের এই ব্যাপারটা। অন্য ট্যুরিস্ট শহরের মতন তাড়াহুড়ো নেই। এখানেই অন্য জায়গার চেয়ে আহাংগামার ভিন্নতা। তাদের কাছে এটা মূল কাজ না। তাদের মূল ধর্ম-কর্ম হল পরিবার। সকালবেলা পরিবারের দায়িত্ব-কর্তব্য-ধর্ম পালন শেষে তারা মন দিবে রেস্তোরাঁর কাজে।
‘এ কোথায় এসে পড়লাম? ওদের কোন ভাবান্তর নেই কেন? এত স্লো কেন ওরা?’
এসব যে আমরা ভাবছিলাম তার পেছনে কোন বিরক্তি ছিল না। বরং ছিল অন্যকিছু। বুঝতে চাইছিলাম আহাংগামা এমন আলাদা অনুভূতি দিচ্ছে কেন? এটা ঠিক অন্য পর্যটন শহরের মত নয় কেন? এই শহর কেন অন্য এক পৃথিবীর ইঙ্গিত দিয়ে যায়? টালমাটাল দ্রুত লয়ের জীবনের হাঁসফাঁসের মাঝে আহাঙ্গামা কানে কানে বলে বসে যে, ‘একটু ধীরে চল।’ একটু বিশ্রাম নাও, নিজের মনের দিকে তাকাও। সমুদ্রের ঢেউয়ের আত্মায় কান দিয়ে শোনো প্রকৃতি কী বলতে চায়।
২.
শ্রীলঙ্কায় কেউ ভ্রমণ করতে চাইলে আহাংগামা শীর্ষ পাঁচে আসবে না। কলম্বো, এল্লা, সিগিরিয়া, গল, ক্যান্ডি এসব ফেলে সোশ্যাল মিডিয়া-সর্বস্ব সময়ে আহাঙ্গামা ট্রেন্ডি জায়গার কাতারে পড়তেই পারে না। দৃষ্টি কাড়ে এমন অ্যালগরিদম আহাংগামার নেই। আহাংগামার যা আছে তা আরো গভীর ও প্রশান্ত। অতল গহ্বর থেকে তুলে আনতে হয় আহাংগামার রূপ! কোন ধারণাই নেই কি আশ্চর্য নীরব অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল!
আহাংগামা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণস্থ গল জেলার একটা শহর। শান্ত, সুনিবিড় নীল সমুদ্রের এই সমুদ্র শহরের ট্র্যাজিক একটা পরিচিতিও আছে: ২০০৪ সালের সুনামিতে এই শহর বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই শহরের সমুদ্রের সৌন্দর্যের জন্য অনেকে ‘সিক্রেট বালি’ ও বলে থাকে। তথাকথিত ট্যুরিস্টদের জন্য এই শহরের দেয়ার আছে অনেক কিছু: সার্ফিং, স্টিল্ট ফিশিং, নয়নাভিরাম সমুদ্রোচিত ক্যাফে/রেস্তোরাঁ ইত্যাদি।
কিন্তু এত পর্যটন-সুলভ কোনোকিছুর বর্ণনা দিতে এই লেখা নয়। কিংবা এসব কারণেই যে আহাংগামা ভাল লেগেছে তা নয় মোটেও। আহাংগামা আমার মধ্যে নতুন কিছু ভাবের সঞ্চার করেছে যার সুবাদে আমি জীবনকে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছি। এমন প্রযুক্তি-অস্থির সময়ে এই ভাবনাগুলো আরো বেশি হৃদয়স্পর্শী হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি নিয়ে যতই অভিযোগ উঠুক না কেন, একটা প্রচ্ছন্ন কিন্তু প্রভাবশালী একটা কারণ বোধ করি চূড়ান্ত মনুষ্য-ঘৃণা! জেনজি বলি কিংবা মিলেনিয়াল; প্রযুক্তির অতি-নির্ভরতার পেছনে মনুষ্য-ঘৃণার অবদান কিন্তু কম নয়। মনুষ্য-ঘৃণার যুগে মানুষেরই প্রেমে পড়েছি দেখে আহাংগামা আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

৩.
ভিদুরা নিশান্ত, যে ভদ্রলোকের বাড়িতে উঠেছি তার নাম। সমুদ্র থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটা দূরত্বে সেই বাসা। যে রাস্তার কথা বলছিলাম বাড়ির মতো, সেই রাস্তা ধরেই সে বাসা। একতলা একটা বাড়ি। আশেপাশে ছোট উঠোনের মতো জায়গা। বিভিন্ন রকম ফুলগাছ, পেয়ার গাছ দিয়ে বসতবাড়ির আঙিনা। আমাদের দেশের ৬০/৭০ দশকের ঢাকার বাড়িগুলো এমন ছিল। বাড়িটাতে ঢুকতেই একটু অস্বস্তি লাগল। কারণ, যে অংশটায় আমরা থাকব, তার পাশেই লাগোয়া রুমে থাকে ভিদুরা নিশান্ত ও তার স্ত্রী। পর্যটক-সুলভ যে প্রাইভেসির প্রত্যাশা সেই থাকার জায়গায় ব্যত্যয় হওয়াতে একটু মেজাজ খারাপ হলো।
ভিদুরার বয়স প্রায় ৫০ এর কাছাকাছি। তার স্ত্রীর বয়স ৪০-এর মতো হতে পারে। ইংরেজি বলতে পারে না ভালোমতো। ভাঙা ভাঙা কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করে ইংরেজি চালিয়ে নিতে পারে। চেহারায় সবসময় সরল একটা হাসি লেগে থাকে। তার স্ত্রী ইংরেজি কোনো শব্দ ঠিক ঐভাবে বলতে পারে না। কিছু বললেই অতি সরল আদর মাখানো একটা হাসি দেয়। মায়াবী হাসি। ভিদুরার সাথে ভাঙা ইংরেজিতে কিছু কথা বলতেই তাকে বেশ ভালো লেগে গেলো। যাই বলি সেই দ্রুত সমাধান করে দেয়ার চেষ্টা করে। একটু আগে যে মেজাজ খারাপ হচ্ছিল তা ভিদুরার ভাঙা ইংরেজির আড়ালে মানবিক আন্তরিকতার ছোঁয়া ও তার স্ত্রীর মায়াবী হাসির জোরে ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছিল।
বিকাল তখন ৫টা ছুঁইছুঁই। সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখার লোভ সামলানো কঠিন। তাই রুমে লাগেজ রেখেই হালকা কাপড়-চোপড় পরে বেরিয়ে পড়লাম। বেরোতেই ভিদুরার বাড়ির উঠানে গেটের পাশে এক কোনায় চোখ পড়ল একটা ছোট গোল দেয়ালের দিকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি যা ভাবছি এটা কি তাই?
কাছে যেতে যেতে দেখলাম একটা কূয়া। দেয়ালটা পুরনো, আমাদের ৯০ দশকের গ্রাম বাংলার পুরনো দেয়ালগুলোর মতন। কূয়ার প্রতি আমার অন্যরকমের একটা ফ্যাসিনেশন আছে। সেই ফ্যাসিনেশন ছোটবেলা থেকেই। ট্রেন দেখলে যেরকম একটা নস্টালজিয়া ভর করে ঠিক তেমনি কূয়া দেখলেও একটা হারানো সময়ের কাতরতা অনুভব করি। সেই ছোটবেলায় কোথাও কূয়া দেখেছিলাম। অনেক অনেক বছর আগে। কূয়ার প্রতি কাতরতা কিংবা নস্টালজিয়া থেকে হুররে করে উঠলাম দেখার পরে।
শুধু এসব কারণেই নয়, আরো একটা কারণে কূয়া আমার কাছে চিন্তামগ্নতার অর্থ হাজির করে। খুব সম্প্রতি জাপানিজ ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির ‘The Wind-up bird Chronicle’ পড়ছিলাম। সেখানে মূল চরিত্র তরু ওকাদার জীবনে অদ্ভূত রহস্যময় ঘটনা ঘটতে থাকে। উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায় তার স্ত্রীর বিড়াল হারিয়ে যায় এবং সে খুঁজতে থাকে। একটা সময় দেখা যায় তার স্ত্রী নিরুদ্দেশ হয়ে যায় বাড়ি থেকে। এতসব অদ্ভুত রহস্যময় ঘটনা ঘটার পর থেকে তরু ওকাদা কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। স্ত্রীকে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তার বাড়ির পাশের কানাগলিস্থ একটা পুরনো পরিত্যক্ত কূয়ায় তরু ওকাদা সিঁড়ি দিয়ে নেমে পড়ে। দুই-তিন দিন ধরে সে নির্বিঘ্নে ভাবতে থাকে ধ্যানের মতন। ভাবতে থাকে তার জীবনে এসব আশ্চর্য ঘটনাগুলো কেন ঘটছে। ভাবতে ভাবতে একসময় সে অবচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। উপন্যাসে তরুর এই কূয়াযাত্রা ছিল অন্তর্যাত্রার মতন। Introspective journey যাকে বলে আরকি! এরপরে তরু যা করতে থাকে তার অনেকখানিতেই এই অন্তর্যাত্রার চিন্তামগ্নতার প্রভাব ছিল। কূয়ার পাশে যেতে যেতেই আমার স্ট্রিম অফ কনসাশনেসে এই চিন্তাগুলো ভর করছিল।
ভিদুরা নিশান্তের বাড়ির কূয়োটা পুরনো নয়, পরিত্যক্ত নয়। মোটামুটি গভীর আছে। সেই কূয়ো থেকেই এই বাড়ির পানি সরবরাহ হয়। নিশান্তের বাড়িটার এটাই বিশেষ ভালোলাগা যে এখানে আমাদের বসতবাড়ির অনুভূতিটা পাচ্ছিলাম। বাড়ির সামনে চৌকাঠের মতো চেয়ার মাদুর পেতে বসার জায়গা আছে যেমনটা দাদাবাড়িতে দেখতাম। দাদাবাড়িতে সেই ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে যখন যেতাম তখন সেই মাদুরপাতা উঠানে সময় থেমে থাকত। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কোনো রুটিন আমাদের যেন আটকে রাখতে পারত না। স্কুলের পরীক্ষার রুটিনকে মনে হতো আমাদের ধীরলয়ের জীবনকে গ্রাস করে নেয়ার প্রাথমিক এক্সপেরিমেন্ট যেন। ভিদুরা নিশান্তের কূয়ো, উঠান-আঙিনা, পাখির ডাকের নীরবতা, টং দোকানের ২০মিনিট পর পর ক্রেতার আবির্ভাব, সবকিছুতে টাইম ল্যাপ্সের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম।

এ তো গেলো নিশান্তের বাড়ির আলাপ। যে সময়ের কথা আমি বলছি নিশান্ত নিজেই তো সে সময়ের মানব প্রতিনিধি! তার সাথে প্রথম দিন নেহাৎ কেতাবি কথাবার্তা হয়েছে যেমনটা একজন ট্যুরিস্ট আর একজন হোস্ট বলে থাকে। কথাবার্তায় ভদ্র বাচনভঙ্গি, একটা মাপা হাসি অর্থাৎ সার্ভিস ইকোনমিতে যতটুকু আলাপ দরকার পড়ে ঠিক ততটুকু। কিন্তু যতই মিশছিলাম ততই তার সরলতায় মুগ্ধ হচ্ছিলাম। নিশান্ত সম্প্রতি বুকিং ডট কমে তার বাসাটাকে হোমস্টে’র জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছে। ইংরেজিতে তিনি যেহেতু দুর্বল এবং ইন্টারনেটে খুব একটা পারদর্শিতা নেই, তাকে তার সব কাজে সাহায্য করেন তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাতিজা। ভাঙা ভাঙা বিচ্ছিন্ন শব্দ দিয়ে তিনি আমাকে এটা-সেটা অনেক কিছুই বলছিলেন। ধীর লয়ে বলছিলেন তার জীবনের গল্প। তার বড় ভাই সরকারি কর্মকর্তা। ছোট বোন ডাক্তার। গর্বে তার বুক ভরে যাচ্ছিল এসব বলার সময়। শ্রীলঙ্কায় সরকারি চাকরি ও ডাক্তারি পেশা হিসেবে অত্যন্ত সম্মানের। এসব বলার সময় নিশান্তের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা ঠিকরে পড়ছিল তার ভাই বোনের প্রতি। পেশাগত দিক বিবেচনা করলে ভাই বোনের তুলনায় তার অবস্থা তুলনামূলক দুর্বল কিন্তু তার এটা নিয়ে ভ্রূক্ষেপ নেই। নিজে নিজেই বলছিল এসব। সে এসব বর্ণনার সময় আমি ভাবছিলাম তার ত্যাগের কথা। পরিবারে এমন অনেক সময় হয় যে, কিছু ভাইবোনের সাফল্যের জন্য অন্য একজনের প্রতি ঠিক তত নজর দেয়া হয় না। তথাকথিত সাফল্যের রাস্তায় পা না মাড়িয়ে তারা গড়পরতা জীবন বেছে নেয়। যেন একজনের ত্যাগের উপর ভর করে বাকিদের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে। কি জানি, এমন না-ও হতে পারে।
উঠানে বসে রোদ পোহাচ্ছিলাম। এমন সময় দেখি নিশান্ত টুক-টুক (আমাদের দেশের সিএনজির মতো) চালিয়ে বের হচ্ছে। আমি একটু অবাক হলাম। সে টুক-টুকও চালায়। সে কোনো একটা কাজে যাচ্ছিল। তাকে থামালাম। থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘তুমি টুক-টুকও চালাও?’ সে তার সারল্য মাখা হাসি দিলো। বলল: ‘আমি আরেকটা কাজ করি। চশমাও বানাই। এখন চশমার একটা অর্ডার এক কাস্টমারকে দিতে যাচ্ছি’। আমি বললাম: ‘বাহ! তোমার একসাথে চারটা আয়ের উৎস: হোমস্টে, টংয়ের দোকান, চশমা, টুক-টুক।’ নিশান্ত বলে উঠল: ‘এছাড়া আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কয়েকটা উপায় ছাড়া আসলে আমাদের অনেক কঠিন হয়ে যায়।’
রোদ পোহাতে পোহাতে বই পড়ছিলাম।
নিশান্ত বলল: ‘তুমি কি অনেক বই পড়?’ আমি বললাম: ‘হ্যাঁ। তা পড়ি, আবার লেখারও চেষ্টা করি।’
নিশান্ত: ‘তোমার ত তাহলে মার্টিনের মিউজিয়ামে যাওয়া উচিত।’
আমি: মার্টিন মানে? কে বা কি এটা?
নিশান্ত: মার্টিন বিক্রমাসিংহে পুরো নাম। উনি শ্রীলংকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক। তাঁর জন্ম এই আহাংগামার পাশের শহর কোগালা-তে। উনার নামে একটা ফোক আর্ট মিউজিয়ামও আছে কোগালাতেই।
আমি: বলো কি! কতদূর এই মিউজিয়াম? ওখানে কিছু কি আছে ঐ লেখকের?
নিশান্ত: ওটাই তার বাড়ি। ঐখানেই ফোক মিউজিয়ামটা করা হয়েছে।
আমি: তুমি নিয়ে যাবা আমাকে ঐখানে?
নিশান্ত: হ্যাঁ অবশ্যই। দাঁড়াও আমি এই চশমাটা দিয়ে আসি তারপর যাচ্ছি। এখান থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের পথ।
৪.
মার্টিন বিক্রমাসিংহের কথা শোনার পর থেকে আমার ভালোলাগা আরো বেড়ে গেলো। এই যে আহাংগামা কিংবা শ্রীলঙ্কা, একে জানতে বা বুঝতে একজন লেখকের উপর ভরসা করার চেয়ে ভাল কিছু হতেই পারে না। সে জায়গায় নিশান্তের সাথে আলাপের সূত্রে একেবারে যেন হাতেনাতে রত্ন পেয়ে গেলাম। যেন তেন লেখক নয়; একেবারে জাতীয় মর্যাদায় আসীন লেখকের সন্ধান পেয়ে গেলাম। নিশান্তের জন্য অপেক্ষা করতে করতে গুগলে ঘাঁটাঘাঁটি করে নিলাম মার্টিন সম্পর্কে। উইকি জানালো তিনি আধুনিক সিংহলি সাহিত্যের জনক। তিনি শুধু একজন সাহিত্যিক নন, জাতীয় চিন্তাবিদ। জার্মানিতে যেমন গ্যেটে, ভারতবর্ষে যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মার্টিন বিক্রমাসিংহে ঠিক সেই সারিরই একজন, শ্রীলঙ্কানদের জাতীয় জীবনে। তিনি বেড়ে উঠেছেন এই আহাংগামা শহরেই, এর আশপাশে, এই সমুদ্রতটে, এই আধা গ্রাম-আধা শহরের প্রাকৃতিক নিসর্গভূমিতে।

বলে রাখা ভালো, এই সেই নিসর্গভূমি যেখানে আমি জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করার আগে ভাবতে এসেছি। ভাবনার জন্য যে নিশ্চিন্ত অবসর আর প্রশান্তির দরকার হয় তার জন্য আহাংগামাই ছিল যেন যথার্থ জায়গা। কেনই বা আমি আহাংগামাতেই এলাম, এ কি নিয়তি নাকি আমার যুক্তিবাদী বোঝাপড়া, নাকি অন্যকিছু তার হদিস খুঁজতে গেলাম না। কি অবলীলায় সব দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যাচ্ছিল। বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী যেই হই না কেন; যেকোনো জগতেই এই ব্যাখ্যা মিলিয়ে নিতে পারব কেন আহাংগামার মত ধ্যানী জায়গাতেই আমি দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করতে গেলাম। সাধারণের মধ্যে দিয়ে অসাধারণত্বের ছোঁয়া পাচ্ছিলাম যেন। নিশান্তের হাত ধরে চলে যাচ্ছিলাম মার্টিন বিক্রমাসিংহের শান্ত সুনিবিড় সাহিত্যাকাশে।
নিশান্ত তার টুকটুক নিয়ে যাত্রীবাহী সেবা সাধারণত দেয় না। শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজনে নিজে চালিয়ে ব্যবহার করে। আমাকেও তেমনি সে নিয়ে যাচ্ছিল মার্টিনের ডেরায় যেখানে মার্টিনের বাড়ি ও শ্রীলংকার ফোক মিউজিয়াম আছে। সন্ধ্যা তখন ছুইঁ ছুঁই। নিশান্ত বলছিল যে মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমার তর সইছিল না। অন্তত দেখে আসি কোথায় সেটা। তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিশান্ত আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটাই অনেক বেশি নাটকীয় আমার কাছে। এইযে আমার হাতের একটা বই থেকে আটপৌরে নিশান্তের প্রশ্ন আমি সাহিত্যচর্চা করি কি না। এবং সেই সূত্রে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিকের সাথে। সাহিত্য কিংবা অক্ষরবন্দী জীবন কিভাবে সাধারণ জগতকে অসাধারণ জগতের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেয় তা বোঝার জন্য আমার এই ঘটনা কম আকস্মিক নয়। যা ভাবছিলাম তাই। মার্টিনের নামখচিত মিউজিয়াম বন্ধ। পরের দিন সকাল ১০টায় যেতে হবে। কিন্তু দেখে এলাম। এটাই সান্ত্বনা। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি পরের দিন যাবই; তা না হলে শ্রীলঙ্কার সাথে আত্মার যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। খুব কাকতালীয় ভাবে সেই পুরো সময়টাতেই কাল্পনিক এক অশরীরী জুড়ে ছিল আমার মাঝে । আহাংগামার এই আত্মিক যোগাযোগের পুরো ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল সে অশরীরী। কাল্পনিক সেই অশরীরীকে মনে হচ্ছিল আমার দ্বিতীয় জীবনের তরী ভাসানো ভেলা! অশরীরীর রহস্য অন্য কোনো লেখায় হয়তো খোলাসা করা যেতে পারে, মুরাকামীয় ঢংয়ে। আপাতত আমি আহাঙ্গামার জীবনে মৃদু সাঁতারে ব্যস্ত থাকি।
ফোক মিউজিয়াম কিংবা মার্টিনের বাড়ি দেখার সুযোগ মিস করে একরাশ হতাশা নিয়ে ফেরত যাচ্ছিলাম। আমার মন খারাপ দেখে নিশান্ত বলল: কোনো রেস্তোরাঁয় যাবা? আমি বললাম: হ্যাঁ, নিয়ে চলো। একেবারে সমুদ্রের পাড় ঘেঁষা একটা রেস্তোরাঁয় আমাকে সে নামাল। সমুদ্রের পাড়ে একটা বসার জায়গায় চলে গেলাম। উঁচু চেয়ারে বসতেই মেনু এগিয়ে দিল ওয়েটার।
মেনুর বইটাতে চোখ আটকে গেল। ওয়াল্টার হোয়াইটের চেহারা সেই মেনুর বইয়ে। হ্যাঁ, ব্রেকিং ব্যাডের ওয়াল্টার হোয়াইট। ক্যান্সার আক্রান্ত হাইস্কুল কেমিস্ট্রি শিক্ষক। নিজের চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে যে আবিষ্কার করল তার সারাজীবনের কেমিস্ট্রি জ্ঞান মেথাম্ফেটামিন নামক এক নেশাবস্তু বানাতে কাজে লাগাতেই যেন সে সার্থকতা পেল জীবনের। নিপাট ভদ্রলোক ও পরিবারপ্রেমী হোয়াইট ধীরে ধীরে হয়ে উঠল মাদক জগতের গ্রেটেস্ট কুক কিংবা কেমিস্ট। টাকা কিংবা ধনসম্পত্তির চেয়ে তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো অহমিকা ও যুক্তিবাদী চিন্তার নিষ্ঠুর প্রয়োগ। হোয়াইটের অধঃপতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেই কালজয়ী সিরিজ। হোয়াইটের অভিনয়ে অতিশয় মুগ্ধ হয়ে জগদ্বিখ্যাত অভিনেতা স্যার এন্থনি হপকিন্স সিরিজ শেষ করে মাঝরাতে হোয়াইটকে ইমেইল লিখতে বসে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন: তাঁর সারা জীবনে এমন শ্বাসরুদ্ধকর অভিনয় তিনি দেখেননি।
ইমেইলের শেষের অংশ:
“…Thank you. That kind of work/artistry is rare, and when, once in a while, it occurs, as in this epic work, it restores confidence. You and all the cast are the best actors I’ve ever seen. That may sound like a good lung full of smoke blowing. But it is not. It’s almost midnight out here in Malibu, and I felt compelled to write this email.
Congratulations and my deepest respect. You are truly a great, great actor.
Best regards,
— Tony Hopkins”
যে চেয়ারে বসে মেনুটা দেখছিলাম তার সাথে সমুদ্রের পানির মাত্র ছুঁই ছুঁই দূরত্ব। মেনু থেকে সমুদ্রের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল স্টিল্ট ফিশিং-এর বাঁশের কাঠামোগুলোর দিকে। সারি সারি করে সাজানো সমুদ্রের পাড়ে। এটা শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এটা বাঁশের উল্লম্ব একটা কাঠামো যেখানে আড়াআড়িভাবে আরেকটা কাঠামো থাকে, যেখানে জেলেরা বসে বড়শি দিয়ে সাগর থেকে মাছ ধরতে পারে। এটা একেবারে অনন্য একটা দৃশ্য। আমরা সাধারণত দেখি খালে বিলে পুকুরে বড়শি দিয়ে ভূমি বরাবর বসে মাছ ধরতে। আর এই স্টিল্ট ফিশিংয়ের মূল কারসাজিটাই হলো সমুদ্রের পাড়ে উঁচু কাঠের কাঠামোতে বসে মাছ ধরা। ইন্টারনেট ঘেঁটে জানতে পারলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দক্ষিণ শ্রীলঙ্কার মিরিসা, আহাংগামা, কোগালা এবং আরো কিছু জায়গায় এই অনন্য চর্চা শুরু হয়েছে। প্রথমদিকে মনে হতে পারে এটার মূল কারণটা কি? আমার হালকা চিন্তায় মনে হয় এখানে কয়েকটা ব্যাপার কাজ করতে পারে: এক, আরামসে বসে বসে মাছ ধরা, দুই, সাগরের ভূমি বরাবর জেলেদের উপস্থিতি যেন সাগরকূলের প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে এবং তিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে অন্য পেশায় কাজ হারিয়ে অনেকেই এই জেলে পেশায় এসেছিল। যেহেতু তারা তথাকথিত জেলে নয় সেহেতু একটা অনন্য উপায় বের করলো মাছ ধরার।
তথাকথিত বড়শি দিয়ে মাছ ধরা এক ধরণের শখের কাজ এবং দারুণ একটা শখ। আবার তথাকথিত সাগরের জেলেদের জাল দিয়ে মাছ ধরার কাজ কিন্তু বেশ কষ্টসাধ্য। সুতরাং আমার কাছে স্টিল্ট ফিশিংটা শখ ও পেশার মাঝামাঝি কিছু একটা যাতে শখের সুখটাও থাকলো আবার রিজিকের কাজটাও সিদ্ধি হলো। মানুষের উদ্ভাবনী কল্পনার এটা ভাল একটা দৃষ্টান্ত। প্রায় ৮০-৯০ বছর আগের কারো কিংবা সেই সমাজের মানুষের কল্পনাপ্রসূত একটা কর্মকাণ্ড আজ একটা কালচারাল হেরিটেজ। এই স্টিল্ট ফিশিং গত ২০০৪ সালের সুনামির পর থেকে পারতপক্ষে বন্ধই হয়ে গেছে। স্টিল্ট ফিশিং এখন মূলত একটা ট্যুরিস্ট এক্টিভিটি। বিদেশি পর্যটকেরা একটা ফি-এর বিনিময়ে এই মাছ ধরা দেখে এবং কিছু বেশি ফি-এর বিনিময়ে কোন পর্যটক চাইলে নিজেই সেখানে বসে মাছ ধরতে পারবে।

ওয়াল্টার হোয়াইটের রূপান্তরের দৃশ্য থেকে স্টিল্ট ফিশিংয়ের নয়নাভিরাম ল্যান্ডস্কেপে চোখ রাখতে গিয়ে আব্বুর কথা মনে পড়ে গেলো। আব্বুর প্রিয় শখ ছিল বড়শি দিয়ে মাছ ধরা। বিদেশ বিভুঁই থেকে নানান কলেবরের বড়শি আনাতেন, মাছের খাবারের জন্য নানান রকমের আয়োজন করতেন। বাসায় রীতিমতো ধুমধাম লেগে যেত সেসব সফরের আগের দিন। ঘন্টার পর ঘন্টা ঠায় বসে থেকে তিনি অপেক্ষা করতেন মাছ শিকারের আশায়। চার-পাঁচ কেজির মাছ তুলতে পারলে তা বাসায় এনে আমাদের ভাই বোনদের মধ্যে গিফট হিসেবে ভাগ করতেন। আব্বু অসুস্থ হবার পর আমি ফ্লাইটে যখন আসছিলাম তখন মনের এক কোণায় একটু আশা ছিল যে আমি আব্বুর সাথে কথা বলতে পারব। আফসোস, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সেই ধৈর্য আব্বুর সেদিন ছিল না। আমি নামলাম বিমান থেকে। আব্বু আইসিইউতে। আমি আসার ৮ ঘন্টা পরে জরুরি বিভাগের ডাক্তার ডেকে পাঠালেন ভিতরে। লাইফ সাপোর্ট খুলে দিবেন নাকি জানতে চাইলেন। আর কোন কিছুতেই তার কিছু হবে না। আমি সম্মতি দিলাম খুলে ফেলার। ঠান্ডা মুখে আদর দিলাম, ঘ্রাণ নিলাম। আনুষ্ঠানিক কাজ সারার জন্য বাইরে বেরিয়ে দরজায় রোগীর তালিকায় আব্বুর নামের পাশে দেখলাম ক্রস চিহ্ন দেয়া। ক্রস চিহ্নটা একেবারে তাজা কালির মতো লাগল। আমি ভেতরে থাকা অবস্থাতেই হয়তো ডাক্তার হাসপাতালের এই আমলাতান্ত্রিক কাজটা সেরে নিলেন। ভাবছিলাম স্টিল্ট ফিশিংয়েও আব্বু দারুণ পারদর্শী হতেন। শার্টটা খুলে ঝুলিয়ে রাখতেন সেখানে। স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে ডান হাতে বড়শি আর বাম হাতে সিগারেট টানতে টানতে আড্ডায় মশগুল থাকতেন।
৫.
একটা ঘটনা যখন ঘটে যায় আমাদের জীবনে কোন পূর্ব-জ্ঞান ছাড়া অথবা কোন সাক্ষাৎ; যেসবের রেশ আমাদের পরবর্তী জীবনেও রয়ে যায় অথবা বয়ে চলি; সেসব ঘটনা কিংবা সেসব সাক্ষাৎ ঘটার মুহুর্তগুলো যখন পিছন ফিরে ভাবতে থাকি এই ঘটনা কিংবা সাক্ষাৎটা কিভাবে হলো — আশ্চর্য না হয়ে উপায় থাকে না। আজকে আমার ভালোবাসার মানুষ— যার সাথে আমি দিনাতিপাত করছি; যখন মনে করার চেষ্টা করি কিভাবে কোনদিন তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল কিংবা ঠিক কোন জমায়েতে, কোন মিছিলে আমি তার হাতে হাত রেখেছিলাম সেসব মনে পড়লে অবাক লাগে যে সেই ক্ষণের কোনোকিছুর মধ্যে কি সেই আলামত কিংবা পূর্বশর্তগুলো ঠিক কিভাবে হাজির ছিল যার কারণে এমন প্রভাববিস্তারী একটা ঘটনা কিংবা সম্পর্কের পরিণতির দিকে যায়? সেরকম কোন ঘটনা কিংবা সম্পর্কের কথা এখানে উল্লেখ করছি না। বরং উল্লেখ করছি একেবারে সাদামাটাভাবে ঘটে যাওয়া একটা সমুদ্র সৈকত আবিষ্কারের আখ্যান।
কলম্বাস যেভাবে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল, ঠিক সেভাবে না, কিন্তু অন্য এক অবশ্যম্ভাবী ঈশ্বরের হস্তক্ষেপে একটা বীচ আবিষ্কার করে বসলাম, আহাংগামাতেই। কলম্বাসের আবিষ্কার তো দখলদারীত্বের গল্প ঠিক যেমন হালের ট্রাম্পের সহযোগিতায় ইসরাইল গড়ে তুলছে আধুনিক উপনিবেশ: ভেঙে চুড়ে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। লেখাটা যখন লিখছি তখন ইরানের বিপ্লবী সামরিক বাহিনী তাদের সর্বোচ্চ নেতা খামেনী হত্যার প্রতিবাদে একের পর এক মিসাইল হামলা চালাচ্ছে আমেরিকা ও ইসরাইলের মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে। পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন অগ্নিগর্ভ। মধ্যপ্রাচ্য থেকেই বিশ্বায়িত পৃথিবীর সকল কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যেন।
বিশ্বায়িত পৃথিবীর স্যাটেলাইট শিশু বাংলাদেশে বসে সেই অগ্নিগর্ভের আঁচ পেতে বেগ পেতে হয়নি। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে তেলের সংকটের অস্থিরতা। পেট্রোল পাম্পের বাইরে ২/৩ কিলোমিটারের লম্বা সারি যানবাহনের। সরকার থেকে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিছু পেট্রোল পাম্প তেল স্টক করে সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। যেকোনো সময় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বে এর আঁচ ইতিমধ্যে লেগে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ ফ্লাইট ট্রানজিট হয়। সেখানে শুরু হয়েছে বিপর্যয়। নিস্তরঙ্গ আহাংগামাতেও সেই ছোঁয়া লেগেছে নিশ্চিত। হয়তো ট্যুরিস্ট আসা কমে গেছে বা কমে যেতে পারে নিকট ভবিষ্যতে।
আমি যখন আহাংগামাতে, এই যুদ্ধের দামামা লাগেনি তখনো। ভিদুরা নিশান্তের বাড়ি থেকে ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে এমন এক বীচ আবিষ্কার করলাম যেটা আমার সারাজীবনের চিরস্থায়ী মণি হয়ে থাকবে।
সাধারণত বীচের পাড় তো খোলা থাকে। একটা জায়গায় দেখি দেয়ালের সীমানা দেয়া এবং গেইট আছে। আমি সেদিক দিয়ে আর ঢোকার চেষ্টা করলাম না। পাশে যে ছোট জঙ্গলের মতো আছে সেখান থেকে গিয়ে সমুদ্রের দেখা পেলাম। যে সীমানা ফেলে এলাম সেখানেও সেই সীমানা ছড়িয়ে ছিল অনেকটা Secluded zone-এর মতো। একটু দূরে গিয়ে দেখতে পেলাম দেয়ালের সীমানা শেষ। খোলা সমুদ্রের সীমানা আর সেটা মিলে গিয়েছে। আমি এই পাড় থেকে সেখানে ঢুঁ দিলাম। ঢুঁ দিতেই দেখলাম ১০-১৫ জন ইউরোপীয় ট্যুরিস্ট সেখানে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করছে। এক মুহুর্তে ভেবে নিলাম যে এটা নিশ্চিত ইউরোপীয়ানদের জন্য তৈরি করে রাখা আলাদা জায়গা যেখানে তারা নির্বিঘ্নে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে।
নিজেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ রাজপ্রভুদের দরবারে নিযুক্ত বাঙালি পাইক পেয়াদা মনে হলো। হায় হায়! প্রভুদের ডেরায় ঢুকে গিয়ে তাদের সমুদ্র-ধ্যানের ব্যাঘাত ঘটালাম না তো? কিন্তু জায়গাটা দেখেই একটা খায়েশ চেপে বসলো কারণ সেখানে একটা শান্ত, সুনিবিড়, একান্ত একটা ব্যাপার আছে। কোন কারণ ছাড়াই আমি নিজে ওখানে যাবার মতো স্বস্তি বোধ করলাম না। তাই অপেক্ষা করলাম আমার বন্ধুদের জন্য। দল ভারী করে জায়গা দখল করার পাঁয়তারা আর কি!
সেইদিন সন্ধ্যাবেলাতেই আমরা আসন পেতে বসলাম সেই দেয়াল ঘেরা জায়গায়। একেবারে প্রাইভেট বীচের মতো যেন আয়োজন। টানা ৪দিন; যেকয়দিন আহাংগামা ছিলাম, এটা যেন আমার ব্যক্তিগত মসনদ হয়ে রইল। দিনের শুরুতে, সূর্যাস্তের সময় এবং রাতের নিস্তব্ধতায় এই ডেরার ফটক খুলে ঢুকে পড়ে নিজের মতো করে সমুদ্র-ধ্যানে বসে জীবনের হিসেব নিকেশ মিলাতে বসতাম। মাঝেমধ্যে কল্পনার পাহাড়তলীতে ঘুরে আসতাম কবি-সাহিত্যকদের আশ্রয় করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই ছোট্ট .২৫ একরের একটা জায়গা কী এমন ভূমিকাই রাখতে পারে? এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালতার কাছে এই চার আনা জমির কিইবা গুরুত্ব?

স্মৃতিসর্বস্ব আমার সকল অতীত যেন সেই ছোট্ট সমুদ্রের পাড়ে কষ্টিপাথরে শান দিচ্ছিল। এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীতে যেন আসা যাওয়া করছিলাম। হয়ে উঠছিল আমার কনফেশন রুম। হয়ে উঠছিল আমার পরবর্তী পৃথিবীর সেতু। পুরনো পৃথিবী ছেড়ে নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের পুলসিরাত। এই পাশার দানে সবচেয়ে বড় দানটা মেরেছিলাম Rapid-fire word association game খেলার সময়। এক দশক আগের জনপ্রিয় হিন্দী সিনেমা জিন্দেগী না মিলেগি দোবারাতে তিন প্রধান চরিত্র এই শব্দখেলাটা খেলেছিল। খেলাটার নিয়ম সাধারণভাবে এটা: একটা শব্দ বলবে একজন এবং তার সাথে সম্পর্কিত করে যাকে বলা হচ্ছে সে খুব দ্রুত উত্তর দিবে সেই শব্দের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে। খেলাটার উদ্দেশ্য মূলত যে উত্তর দিচ্ছে তার জীবনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার উঠোনে ঢুঁ মারা। অর্থাৎ যে শব্দে এসে উত্তরদাতা আটকে যাবেন বা কিঞ্চিৎ বিহবল হয়ে পড়বেন, ধরে নেয়া যায় সেই বস্তু, ব্যক্তি কিংবা স্থানের সাথে তার জটিলতর সম্পর্ক আছে। যেমন: কোনো একজন ‘বাবা’ শব্দের পরে একটু থেকে গেছেন বা তাড়াতাড়ি কিছু বলে উঠতে পারছেন না, বুঝে নিতে হবে বাবাকে নিয়ে তার বোঝাপড়াটা জটিল, হয়তো কষ্টের কিংবা ট্রমার অথবা এর চেয়ে গাঢ় কিছু।
আমার সদ্য দখলীকৃত উপনিবেশে বসে এই খেলা যখন খেলছিলাম তখন অনেক কিছুর সাথে আমার সম্পর্ক নতুন করে আবিষ্কার করছিলাম। অনেক কিছু আমি জানতাম না ঠিক কিভাবে তারা বা সে কিংবা ঐ জায়গা আমার জীবনের ঠিক কতটুকু জমিন জুড়ে ছিল। আমার বন্ধু আমাকে প্রথমেই বলল: ‘হাসপাতাল।’
মনের মধ্যে উথাল-পাথাল শুরু হয়ে গেল। পাঁচ সেকেন্ডের একটা সাইক্লোন বয়ে গেল। আমার স্মৃতিতে শোঁ শোঁ করে মনের বাহনে ঘুরে আসলাম এভারকেয়ার হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, ইমার্জেন্সি রুম, এনেস্থেশিয়ার পূর্ব মুহুর্ত, ডাক্তার সাদমান স্যারের মুখ, ওয়ার্ড বয়, আমার ভাইয়া, বোন, এবং আরো যত প্রাসঙ্গিক মুখ সব বিদ্যুৎ গতিতে সংশয়ী সংগীতের মূর্ছনায় প্রবাহিত হতে থাকল। ধুম করে বলে বসলাম: হাসপাতালের কথা ভাবলে আমার মাথায় কফির ঘ্রাণ চলে আসে।
হাসপাতালের সাথে কফির সমান্তরাল গল্পটা আসলে অবান্তর কিছু নয় আমার জীবনে। এইতো মাসখানেক আগে একটা বড় দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ছিলাম মাসখানেকের মতন। কয়েকটা সার্জারি সহ হাসপাতালের ওয়ার্ডে সেই মাসখানেক আমার সাথে সারা পৃথিবীর যোগাযোগ ছিলই না বলতে গেলে। সেই দুর্ঘটনার ট্রমা থেকে নিস্তার পেতেই হাওয়া বদলে শ্রীলঙ্কায় আসা আমার বন্ধুদ্বয়ের জোরাজুরিতে।
এনেস্থেশিয়া, সার্জারি, ঔষধপত্রের উচ্চ মাত্রার কারণে সারাদিন ঘুমিয়েই যন্ত্রণাদায়ক দিন পার করতাম। দুর্ঘটনাটা বেশ ভয়াবহ ছিল যার কারণে জীবন মৃত্যুর দার্শনিক প্রশ্নগুলোও আমাকে বেশ গভীরভাবে তাড়িত করছিল। আমার মৃত্যুও হতে পারতো। এটা ভেবে মনে হচ্ছিল একেকটা দিন যেন আমার নতুন আশীর্বাদ। অনুশোচনা, আফসোস, গ্লানির দেয়াল ডিঙ্গিয়ে এই যে শ্বাস নিতে পারছি এটাই মনে হচ্ছিল ঐ মুহুর্তে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। প্রায় মাসখানেক স্বাভাবিক খাবার দাবারের বাইরে তখন আমি। হাসপাতাল থেকে যেদিন আমাকে ছাড়া হলো, দুপুর দেড়টার দিকে ভাইয়া আমাকে হুইল চেয়ারে করে ওয়ার্ড থেকে বের করে লিফটের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। ওয়ার্ড থেকে বের হতেই ব্ল্যাক কফির পাগল করা কড়া ঘ্রাণ আমার নাকে এসে পৌঁছালো। কিছু ভাবার আগেই আমার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ালো নিজের অজান্তে।
‘আমি আবার কফি খেতে পারব’ এই সুখানুভূতির অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো তখন। আমার ভালোবাসার কফি খেয়ে বেঁচে থাকার দিন ফুরিয়ে যায়নি, এটা ভেবেই হয়তো কেঁদে দিয়েছিলাম। হাসপাতালের ব্যস্ততম ওয়ার্ড, কফির ঘ্রাণ, আমার নতুন জীবন সব মিলিয়ে আমার জগতে জীবন নিয়ে নতুন আখ্যানের একটা চিরস্থায়ী ইমেজ হয়ে রইল যেন কফি আর হাসপাতাল।
হাসপাতালের সমার্থক যেখানে খুব প্রাসঙ্গিকভাবে মৃত্যুর চিহ্ন সামনে চলে আসে, আমার আখ্যানে চিহ্ন হল মৃত্যু নয়, বরং জীবন সঞ্চারী ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। এই বোধ আমার এলো আহাঙ্গামায় বসে আমার প্রিয় উপনিবেশি সমুদ্র পাড়ে। হাসপাতালের সমার্থক যে কফি হতে পারে সেই ভাবনা এলো সেখানে বসেই শেষরাতের ভারত মহাসাগরের হাওয়ায় নিজেকে এলিয়ে দিতে দিতে।
কফি যে শুধু কফি না এখানে; কফি এখানে জীবনের স্রোত। কফি এখানে জীবন বয়ে নেয়ার বাহন। কফি এখানে স্মৃতির পেয়ালায় কৈশোরের একগুচ্ছ গল্প। হালের আমেরিকান কবি ম্যাথিউ ডিকম্যানের ‘কফি’ কবিতার স্মৃতিময়তা আর জীবনের চলমানতার ইশারা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে যেন।
কবিতাটার শেষের দিকের অংশ ছিল এমন:
…The world stops at the window while I take my little spoon and slowly swirl the cream around the lip of the cup.
Once, I had a brother who used to sit and drink his coffee black, smoke his cigarettes and be quiet for a moment before his brain turned its Armadas against him, wanting to burn down his cities and villages, before grief became his capital with its one loyal flag and his face, perhaps only his beautiful left eye, shimmered on the surface of his Americano like a dark star.
আহাংগামার এই আদুরে সমুদ্র পাড় যে এত গভীরভাবে আমাকে ভাবাবে বা নতুন কোনো অর্থ নিয়ে হাজির হবে তার কিছুই তো আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না সেখানে যাওয়ার আগে। যেকোনো বস্তু কিংবা স্থানের সাথে আমাদের যে হৃদ্যতা তৈরি হয় তা মনে হয় মানুষের অনন্য এক ব্যাপার। আজকাল কত শত আলোচনা হচ্ছে মানুষের ঠিক কোন কোন দিকগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাস করে নিতে পারে তা নিয়ে! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সবকিছু গ্রাস করে ফেললেও এই স্থানের বা বস্তুর প্রতি আমাদের হৃদ্যতার বোধকে মনে হয়না গ্রাস করতে পারবে। ভালোবাসা আর ঘোর কিংবা আচ্ছন্নতার মধ্যে বোধ করি খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য (ইংরেজিতে যাকে বলে Obsession)। ঘোর, ভালোবাসা, বস্তু এসবের মিশেল নিয়ে বলতে গিয়ে প্রিয় সাহিত্যিক ওরহান পামুকের দোহাই দিয়ে বলতেই হয়: ‘Every encounter between a person and the object contains a story’। তার লেখা উপন্যাস ‘Museum of Innocence’-এর পরতে পরতে এই হৃদ্যতা। ‘কেমাল’ নামধারী মূল চরিত্র তার ভালোবাসার আরাধ্য ‘ফুসুন’-এর প্রতি তীব্রতম ঘোর ও আচ্ছন্নতা থেকে সংগ্রহ করতে থাকে ফুসুনের স্পর্শ করা ও ব্যবহার করা সবকিছু: সিগারেটের ফেলে দেয়া অংশ, চুলের ক্লিপ, লবণদানী, ছেঁড়া কেডস, কতকিছু। সাহিত্যের জগৎ নিয়ে যাদের বিস্তর আগ্রহ আছে তারা হয়তো জানেন, ওরহান পামুক সেই সমস্ত ভালোবাসার বস্তু নিয়ে ইস্তাম্বুলে সাক্ষাৎ একটা জাদুঘরই বানিয়ে ফেলেছেন। পৃথিবীর তাবৎ প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য সেই জাদুঘর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে। প্রেমের প্রসঙ্গ আসতেই উশানের কথা না বলে পারছি না। উশানের সাথে পরিচয় আহাংগামার ঠিক পার্শ্ববর্তী শহর গলে যাবার সময়।

৬.
আহাংগামার ধীরলয়ের জীবনে নিজেকে এতই ধ্যানস্থ করে ফেলেছি যে সামান্য ভিড়বাট্টা, নাগরিক কোলাহল ইত্যাদি মনে হচ্ছিল রীতিমতো অসহনীয়। তা টের পেলাম গল শহরে যাবার সময়। তুলনামূলক বেশি ট্রাফিক!
গল বলতেই স্মৃতিতে উঁকি দেয় ছোটবেলার ক্রিকেট টেস্টের ঐতিহাসিক মাঠ। তখনকাল দৈনিক ভোরের কাগজের খেলার পাতায় পাকিস্তান বনাম শ্রীলঙ্কার টেস্টের খবরাখবর নিতাম। কোণায় লেখা থাকত ‘গল টেস্ট’। গলের নাম ক্রিকেট সূত্রেই শোনা। গল শহর শ্রীলংকার পর্যটন আকর্ষণের শীর্ষ পাঁচে থাকবে। এই শহর একেবারে ইউরোপীয় আদলের শহর। পর্তুগীজ উপনিবেশ আমলে গড়ে ওঠা এই শহরের মূল আকর্ষণ ‘গল ফোর্ট বা দুর্গ।’ অসাধারণ বাতিঘর আছে যেখানে ট্যুরিস্টদের সেলফি না থাকলে সেখানে যে গিয়েছে তা বোঝানোই ব্যর্থ! উইকিপিডিয়া ঘেঁটে জানলাম, ১৫৮৮ সালে এই শহরের গোড়াপত্তন পর্তুগীজদের হাত ধরে হলেও পরে ডাচ ও ব্রিটিশদের হাত ধরে পরিণতি লাভ করে এই শহরের স্থাপত্যশৈলী, রাস্তাঘাট, ও সাংস্কৃতিক ফিউশন।
আহাংগামার চেয়ে এই শহরে খুব স্বাভাবিকতই ভিড় বেশি। তবে যেকোন সামুদ্রিক এলাকার যে একটা আলস্য লোনা ভাব আছে তা গল শহরের আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল। নানান পদের ও দেশের খাবারের রেস্তোরাঁ ঘেরা রাস্তাগুলো ঘুরতে ঘুরতে ইংল্যান্ডের ব্রাইটন শহরের নর্থ লেইনের দৃশ্য মনে পড়ে যাচ্ছিল। নর্থ লেইনের যে মার্কেট ছিল তা ছিল এন্টিক নানা জিনিসের সমারোহ। সেই মার্কেট বেশ বিখ্যাত। স্থানীয় বাজার যাকে বলে সেরকম। ইউরোপিয়ান ধাঁচের প্রশস্ত পাথুরে রাস্তাজুড়ে জুয়েলারি, চা-কফি, পানীয়দ্রব্য, উপহার সামগ্রী, স্যুভেনির শপ ইত্যাদির ভিড় বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনেই হচ্ছিলো না দক্ষিণ এশিয়ার কোনো শহরে আছি। ইউরোপীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার মিশেলে পর্যটক-বান্ধব একটা শহর।
শ্রীলঙ্কার মানুষের সরলতার নজির গল শহরেও পেয়ে গেলাম। একটা লোকাল ও বিদেশি ফিউশন রেস্তোরায় লাঞ্চের সময় অর্ডার দিলাম প্রন কোকোনাট কারি। অর্ডার করেছিলাম মাত্র ১টা। দেখি ২টা দিয়ে গেলো। যখনি বললাম যে ‘১টা অর্ডার করেছিলাম মশাই’, তখনি একটু ভেবে ওয়েটার বলে উঠল ‘Please keep it. It’s on us’। একটা এরকম লাঞ্চ ডিশ একেবারে ফ্রি দিয়ে দেয়া তো চাট্টিখানি কথা না! চার ঘন্টার মধ্যে গল শহর মোটামুটি একটা ঢুঁ মেরে নিলাম। আদতে মনেপ্রাণে আহাংগামার মানুষ বনে গেছি। কখন আহাংগামা ফিরে যাব তার জন্য তর সইছিল না।
গল থেকে আহাংগামা ফেরার সময় উবার ঠিক করলাম। ক্যাব চালকের নাম উশান। শরীর-স্বাস্থ্য মোটাসোটা ধরণের। শ্রীলংকার বেশিরভাগ মানুষের রঙ আর গড়নের সাথে যায়। উবার চালকদের নানান কিসিমের মধ্যে এক টাইপ হলো বেশ ইন্টারেক্টিভ। উশান সেই ধরণের। ক্যাবে উঠার সাথে সাথেই আলাপ শুরু করে দিলো। প্রথমে আন্দাজ করল আমরা ভারতীয়। আমরা বাংলাদেশী বলার পরে সে ভাঙা বাংলায় বলে উঠল: ‘তাই? কেমন আছেন ভাই ও বোনেরা’?
শত ক্লান্তি উপেক্ষা করে উশানের বাংলা বুলি শুনে চক্ষু ছানাবড়া! উশানের বাংলা বুলির পেছনের গল্প শুনতে শুনতে আহাংগামা পৌঁছুতে লাগলাম:
উশান ২০১০ থেকে ২০২০ সাল অব্দি বাংলাদেশের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ব্যবস্থাপক পদে চাকুরি করত। চট্টগ্রাম শহরে ছিল তার বসবাস সেই সময়ে। বেশ জমজমাট একটা সময় কাটিয়েছে সে সময়। কিন্তু এটাই বাংলা ভাষা পারার মূল কারণ নয়। সে সময়ে উশান প্রেমে পড়েছিল এক বাংলাদেশী নারীর। একই ফ্যাক্টরিতেই কাজ করতো তারা দুজনেই। তুমুল প্রেমে মশগুল ছিল উশান। বিয়ে করবে বলে কথাবার্তাও এগোচ্ছিল। ২০২০-এর সময়ে কোভিড এবং অন্যান্য নানা অস্থিরতার কারণে ফ্যাক্টরির কিছু পরিবর্তন আসে এবং উশান অন্যান্য কোম্পানিতে চাকুরির চেষ্টা করতে থাকে। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কাস্থিত অন্য এক কোম্পানিতে তাকে চাকুরির ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয় এবং সে বাংলাদেশের চাকুরি ছেড়ে শ্রীলংকায় চলে আসে। কিন্তু এসে দেখে সেই চাকুরি তার মনমতো ছিল না এবং কোথাও ছলচাতুরির ব্যাপার ছিল। ওদিকে বাংলাদেশী যে ফ্যাক্টরি তাতে সে আবার যোগদানের চেষ্টা করেছিল কিন্তু কর্পোরেট জটিলতার দরুণ ব্যর্থ হয়। মোটকথা, শ্রীলঙ্কায় এক ধরণের বেকার জীবন যাপন শুরু হলো তার। মাঝে ছোটখাটো নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও কোথাও ঠিক স্থায়ীভাবে থিতু হতে পারেনি। সাম্প্রতিক অবস্থা হল: সে কোনো প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে চাকুরি করছে না। উবারে গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। তার বাসায় সে এই ব্যাপারটা গোপন রেখেছে মান-সম্মান-মর্যাদার কথা বিবেচনা করে। তার জীবনের এতো অস্থিরতা ছাপিয়ে সে গল্প করছিল তার বাংলাদেশী প্রেমিকার ব্যাপারে। তার সাথে কোথায় কোথায় ঘুরতে গিয়েছিল, কিভাবে জন্মদিন পালন করেছিল, কী উপহার দিয়েছিল, তাকে সে বাংলাদেশী কোন কোন পদের খাবার রান্না করে খাইয়েছিল ইত্যাদি। খুব আগ্রহ ভরে গল্প করছিল সে।
কে জানতো এই Slow days-এর কাব্যভূমি আমি বিচরণ করব শিশুর মতো! অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই আমার জীবনে আহাংগামা এলো। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে বসলে পরাবাস্তব দোটানায় পড়ে যাব
গল্পের এক পর্যায়ে গাড়ির ডিসপ্লেতে দেখি তার ফোন আসছে। আইফোনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী ‘সিরি’ বলে উঠছে ‘সানজানা ওয়াইফ কলিং’। বারবার কেটে দিচ্ছিল। বাংলাদেশী প্রেমিকার গল্প আর সিরির গলায় ‘সানজানা ওয়াইফ কলিং’ কেমন যেন বেসুরো তালের মতো শোনাচ্ছিল। বেচারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছিল বারবার। তৃতীয়বারে গিয়ে সে সানজানা ওয়াইফের কলটা রিসিভ করলো। লাউড স্পিকারে সিংহলিজ ভাষায় অল্প যা বুঝেছি তার সারমর্ম এই:
উশান সানজানাকে বলেছে সে তার চাকুরিতে আছে। একটা পার্টির সাথে আজকে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। মিটিং শেষ করে বাসায় ফিরতে দেরি হবে। আহাংগাম প্রায়ই পৌঁছে গেছি এমন সময়ে উশান বলল: ‘তোমাদের সাথে কথা বলে এত ভালো লাগছে! আসলে বাংলাদেশে আমার সময়টা এত ভালো কেটেছিল! বিশেষ করে আমার প্রাক্তন প্রেমিকার কারণেই সময়টা মধুর হয়েছিল।’
উশান বেশ মিশুক। তাছাড়া তার আলাপে বোঝা যাচ্ছিল বাংলাদেশের প্রতি টানটা গভীর। চোখমুখের আভায় খেলা করছিল প্রাক্তনের সাথে কাটানো সময়ের উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটা। মাত্র আধা ঘন্টার মাঝে উশানের গল্পের সুবাদে জীবনের কত শত জগতের ভেলায় চড়ে আসলাম। পরদেশে চাকুরি, পরদেশীর সাথে প্রেম, কোভিড মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, চাকুরি হারানো, চাকুরির নামে নিজ দেশে ফিরে প্রতারণার শিকার, পরদেশী প্রেমিকাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে না পাবার চাপা যন্ত্রণা, বর্তমান পেশা সম্পর্কে প্রকাশ না করার জীবন-নাটিকা। উশানের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় তাকে বাংলাদেশে বেড়াতে যাবার আমন্ত্রণ জানালাম।
আহাংগামায় পৌঁছে ছোট্ট দ্বীপে নেমে পড়লাম। শেষ সন্ধ্যা ও শেষ রাত্রি!
৭.
আমাদের দেশের গ্রাম-গঞ্জে যেমন ‘মায়ের দোয়া’ ‘ভাই ভাই’ নামে প্রচুর খাবার দোকান দেখা যায়, আহাংগামায় তেমন প্রচলিত নাম: Slow days। খেয়াল করলাম সেখানে এই নামে প্রচুর খাবার দোকান, ক্যাফে, রিসোর্ট, পানীয় দোকান, স্যুভেনির শপ আছে। আহাংগামায় ঘুরে ফিরে যে জীবন দর্শন টের পেলাম তা বেঠিক হলো না দেখে দিলখুশ লাগছিল। সেই জীবনে তাড়াহুড়ো নেই, প্রতিযোগিতা নেই, দৌড়াদৌড়ি নেই, হুড়োহুড়ি নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই। একটা ছোট্ট নমুনা: খাবার দোকানে কিছু অর্ডার করলে তারা সেটা সতেজ উপকরণ দিয়েই তৈরি করে যার জন্য ১৫-২০মিনিট সময় লেগে যায় খাবার আসতে। অনেকে এই জীবনটা নিয়ে অভিযোগ করে; বলে থাকে এরা Laid back. এর অর্থ একটু আরাম-প্রিয়, একটু ধীর গতির। পুঁজিবাদের চরম প্রতিযোগিতার যুগে এদেরকে একটু পিছিয়ে পড়া বলেই ধরে নেয় সামাজিক পরিসরে। কিন্তু আহাংগামার মানুষের এই ধীর জীবন নিয়ে মোটেও আপত্তি নেই। বরং তারা সচেতনভাবেই যেন এই জীবনকে সেলিব্রেট করে। ‘স্লো ডেজ’ নামকরণের মধ্যে দিয়ে যেন সেই জীবন চর্চারই একটা নান্দনিক প্রচারণা চালায়।
এই জীবন-যাপন ভবিষ্যতের দিশারী হতে যাচ্ছে এবং এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিক ইতিমধ্যেই স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কা এ বছরেই চালু করেছে Digital Nomad ভিসা। প্রযুক্তি-সর্বস্বতা, ভার্চুয়াল জগত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফ্রিল্যান্সিং অর্থনীতির যুগে কর্মস্থল হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা। যেকোনখানে বসে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে কাজ করতে পারলেই আর কিছু লাগে না। সেইসব Digital Nomadদের জন্য শ্রীলঙ্কা বর্তমানে পছন্দের গন্তব্যস্থল। এবং শ্রীলঙ্কার মধ্যে আহাংগামা আরো বেশি পছন্দনীয়। এর কারণ: এর ধীরগতির নির্জঞ্ঝাট জীবন, সাধ্যের মধ্যে থাকার জায়গা-খাবার খরচ, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, নিদারুণ সুন্দর দৃশ্য, সার্ফিং: একেবারে যুতসই মেলবন্ধন।
কে জানতো এই Slow days-এর কাব্যভূমি আমি বিচরণ করব শিশুর মতো! অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই আমার জীবনে আহাংগামা এলো। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে বসলে পরাবাস্তব দোটানায় পড়ে যাব। জীবনের অনেক বড় দুর্ঘটনা, তা থেকে সেরে ওঠা, পরিবার আর কতিপয় আত্মার বন্ধুদ্বয়ের খোঁজ পাওয়া, তাদের সুবাদে হাওয়া বদলের জন্য মার্টিন বিক্রমাসিংহের দেশে পা রাখা, আদমের পাহাড় চূড়ায় নিজের পুনর্জন্মের আশীর্বাদ নিয়ে আসা, আহাংগামার মানুষের সরল হাসিতে মনুষ্যজাতিতে বিশ্বাস ফিরে পাওয়া, ভিদুরা নিশান্তের কুয়োর জলে ধ্যানস্থ জীবন প্রার্থনা করা, সবুজ-নীল জলের ভালোবাসার ছোট্ট দ্বীপে কাল্পনিক অশরীরীর সাথে দ্বিতীয় জীবনের ভালোবাসার ডেরায় নীরবে প্রবেশ করা, উশানের জীবন আখ্যানে পৃথিবীর অস্থিরতায় মর্ত্যে নেমে আসা ও সাগরপাড়ে ঢেউ গুনতে থাকা: সব যেন রিচার্ড লিংকলেটারের কাব্যিক সিনেমার মতন লাগছিল।
শেষদিন ঘুম ভেঙে গেল ‘ছুন পান’ এর সংগীতে। ‘ছুন পান’ শ্রীলঙ্কার দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। একে অনেকটা চলন্ত বেকারি বলা যায়। বেশ দীর্ঘকাল ধরেই শ্রীলঙ্কার সকল শহরে গ্রামে-গঞ্জে ‘টুক-টুক’ এ করে বিক্রেতা-চালক তার গাড়িতে বেকারি দ্রব্য বিক্রি করেন একেবারে সকালে ও শেষ বিকেলের দিকে। তারা যে বিক্রি করছে তার সংকেত দিতেই গাড়িতে ব্যবহার করে বিটোভেনের বিখ্যাত সংগীত ‘Für Elise’-এর সংগীত। এই সংগীত-সহ পাউরুটি বিক্রির পুরো আয়োজনটাকেই তারা বলে ‘ছুন-পান’। যেকেউ প্রথমে শুনলে অবাক হবে এটা ঠিক কী! এটা ঠিক দৈনন্দিন নৃবিজ্ঞানের খুঁটিনাটি সৌন্দর্যের মতন।
একটা মিষ্টি পাউরুটি ‘কিমবুলি’ কিনে খাওয়া শুরু করলাম একেবারে আরাম করে! আহাংগামা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। উবার ঠিক করলাম। আহাংগামা ছেড়ে কলম্বো, তারপর ফ্লাইট ধরে সোজা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন! উবার থেকে নেমে হঠাৎ বন্ধুদ্বয় হাঁটা ধরল সবুজ-নীল ভালোবাসার ছোট্ট দ্বীপে। একেবারে ‘দিল চাহতা হ্যায়’ সিনেমার ঐ দৃশ্যের মতো আমরা তিনজন বসে পড়লাম। চুপচাপ। আবার কবে আসা হবে কি জানি। এমনও হতে পারে সেই ছোট্ট দ্বীপ দখল করে তৈরি হবে বিলাসবহুল রিসোর্ট কিংবা ফাইন ডাইন রেস্তোরাঁ! তখনকার কেউ কি জানবে এই ছোট্ট দ্বীপ আমার ও আমাদের জীবন কিভাবে পাল্টে দিয়েছিল!
অনেকটা শেষবারের মতোই ধ্যানস্থ হয়ে ভারত মহাসাগরের দূর দূরান্ত থেকে আছড়ে আসা সুখ-দুঃখের ঢেউয়ের মৃদু-মন্দ গর্জনে কান পেতে শুনলাম। মনে পড়ে গেল ওরহান পামুকের Istanbul বইয়ের শুরুর দিকে লিখে রাখা উক্তিটা: The beauty of a landscape resides in its melancholy.







6 Comments. Leave new
শুভকামনা রইল লেখকের জন্য।
মন ছুয়ে যাওয়ার মত লেখনি। শুভকামনা রইল লেখকের জন্য।
লেখকের সাথে পাঠক হিসেবে আমারো কল্পনার ক্যানভাসে আহানংগমার একটা নোনা বাতাসের জলরং ছবি আকা থাকল!
লেখকের জন্য একটা থাকল এক কফির আমন্ত্রণ এবং শুভেচ্ছা
লেখকের সাথে সাথে মনে হলো ঘুরে এলাম আহাংগামার সেই ধীরগতির জীবনে। লেখকের শৈশব থেকে শুরু করে বর্তমান জীবনের একটা আলোকচ্ছটা হয়ে ধরা দিলো লেখনিটা ।
অনেক শুভকামনা থাকলো আপনার জন্য। এমন অসাধারণ লিখা দিয়ে আশা করি ভবিষ্যতেও আমাদের মতো ক্ষুদ্র পাঠকদের মনের খোরাক জোগাবেন।
লেখার মধ্যে এত কিছু থাকতে পারে এই লেখকের লেখা না পড়লে বুঝতে পারতাম না…… লেখা পড়তে পড়তে মনে হলো ঘুরে আসলাম এই অচেনা শহরে আবার শৈশবে .
আপনার লেখার সাথে সাথে এই অচেনা শহর আবার নিজের শৈশব ও ঘুরে আসলাম,,এমন লেখা আরো পড়তে চাই…