Bengali poet from India, Sukanta Bhattacharya, Meghchil Biography

সুকান্ত ভট্টাচার্য

কবি

অকালমৃত্যু ছিনিয়ে নিলেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পেতে দেরি হয়নি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের। স্বল্প সময়ের জীবনে অত্যাশ্চর্য কবিত্ব শক্তির পরিচয় দিয়ে অশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। তরুণ বয়সের ভাবাবেগ-নির্ভর তরল জীবনবীক্ষা তাঁর রচনার প্রধান সম্বল হলেও বাংলা সাহিত্যের বিশেষ সময়ে তাঁর রচনার প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি।

সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে তার কলম শাণিত হয়ে ওঠে।
যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তার কবিতার মাধ্যমে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণি বৈষম্য। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন মাত্র ২১ বছরের আর লেখালেখি করেন মাত্র ৬-৭ বছর। সামান্য এই সময়ে নিজেকে মানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তার রচনা পরিসরের দিক থেকে স্বল্প অথচ তা ব্যাপ্তির দিক থেকে সুদূরপ্রসারী।

একনজরে

কবি

জন্ম
১৫ আগস্ট ১৯২৬

মৃত্যু
১৩ মে ১৯৪৭

ভাষা বাংলা

উল্লেখযোগ্য বই
ছাড়পত্র
ঘুম নেই
হরতাল
গীতিগুচ্ছ


বিস্তারিত তথ্যের জন্য
বইয়ের নামে ক্লিক করুন

জন্ম ও পরিবার

সুকান্ত ভট্টাচার্য’র জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ই আগষ্ট (৩০শে শ্রাবণ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার কালীঘাটে, ৪২নং মহিম হালদার স্ট্রীটের মামার বাড়িতে। পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। তার পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত ঊনশিয়া গ্রামে।

তার বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুণাচল বসুকে লেখা। অরুণাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে।

পড়াশোনা, রাজনীতি ও সাহিত্যকর্ম

আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা, ‘কামলাবিদ্যামন্দির’ নামে একটি স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে। এই স্কুলেরই চতুর্থ শ্রেণির ছাত্ররা ‘সঞ্চয়’ নামের একটা হাতে লেখা পত্রিকা সেইসময় বের করতো। তিনি একটা মজার গল্প লিখেছিলেন এই পত্রিকায়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি, লেখক হিসেবে তার হাতেখড়ি ওই পত্রিকাতেই হয়েছিল।

পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে লেখেন বিবেকানন্দের জীবনী। মাত্র এগারো বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তার ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত।

১৯৩৮ সালে তাঁর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন তার বয়স মাত্র বারো বছর। সেইসময় তিনি দেশবন্ধু বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। যখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, সেই সময় সপ্তম শ্রেণি থেকে ‘সপ্তমিকা’ নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করা হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুকান্ত আর সহ-সম্পাদক ছিলেন তারই সহপাঠী বন্ধু অরুণাচল বসু।

১৯৪৪ সালে সুকান্ত ভট্টাচার্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। এ বছর ‘আকাল’ নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি ‘স্বাধীনতা’ নামে একটি বাংলা দৈনিক বের করতে থাকে ১৯৪৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর থেকে। ওই পত্রিকার ছোটোদের বিভাগ ‘কিশোর সভা’র সম্পাদক প্রথমে ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, পরে তার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুকান্তকে।

মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন।

সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশসহ সে সময়ের বড় বড় কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তার বয়সিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তার পরিণত ভাবনায়। ভাবনাগত দিকে সুকান্ত তার বয়স থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন।

বইপত্র

কবিতা

ছাড়পত্র  [The Passport]
ঘুম নেই
পূর্বাভাস
মিঠেকড়া
অভিযান

শ্রেষ্ঠ কবিতা
সুকান্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা [সম্পাদনা- আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ]
কবিতা সংগ্রহ

গল্প

হরতাল
সেরা কিশোর গল্প

অন্যান্য

পত্রগুচ্ছ  [অরুণাচল বসু ও সরলা বসুকে]
গীতিগুচ্ছ
সুকান্তের গল্পসমগ্র ও পত্রগুচ্ছ

নির্বাচিত সুকান্ত
নির্বাচিত সুকান্ত  [ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস]
সুকান্ত ভট্টাচার্য রচনাবলি  [সম্পাদনা- আবুল কাসেম ফজলুল হক]
সুকান্ত-রচনাবলি
সুকান্ত সমগ্র  [প্রকাশনী— শিকড়, উৎস প্রকাশন, শ্রাবণ প্রকাশনী, পত্রভারতী, সাহিত্য তীর্থ ]

সম্পর্কিত বইপত্র

সুকান্ত ভট্টাচার্য  [মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর]
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য  [লুৎফর চৌধুরী]
সুকান্ত  [জহুরুল আলম সিদ্দিকী]

প্রয়াণ

একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। অর্থাভাব, পার্টির কাজ ও নিজের শরীরের প্রতি অবহেলা– সব মিলিয়ে ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সুকান্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ইন্টেস্টিনাল টি বি (পেটের যক্ষা) আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। যদিও সেই বিধ্বস্ত স্বাস্থ্য নিয়েও সাহিত্যচর্চা বন্ধ করেননি তিনি।

১৯৪৭ সালের ১৩ই মে (২৯শে বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ) সকাল ১০টায় মাত্র ২১ বছর বয়সে কলিকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে মৃত্যুবরণ করেন।

 


তথ্য সহায়তা: বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিন বিভাগের উদ্যোগ— sukanta-rachanasamagra.nltr.org

পাঠকের ভালোবাসাই মেঘচিলের শক্তি।
এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন