:
Days
:
Hours
:
Minutes
Seconds

পাপ

উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে দেখছিল সুজয়। ক্রমাগ্রত সাঁতার কেটেই যাচ্ছে। নদীর গভীরে যাচ্ছে না। পাড়ছোঁয়া জল থেকে এমন দূরত্বে যাচ্ছে, যেখানে সে পায়ের নিচে মাটির নাগাল পাবে। তার সঙ্গে যে কজন স্নান সারছিল, স্নানপর্ব মিটলে তারা উঠে যাচ্ছে জল ছেড়ে, সেখানে ছেলেটির ওঠার কোনো লক্ষ্ণ নেই। যেন আজন্মকাল এই নদীতেই সে সাঁতার দিতে চায়।  ছেলেটিও লক্ষ করেছিল সুজয়কে।

সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে একই স্থানে। লোকজনের চলাচল দেখছে। গলা তুলে দেখছে ওপারের মানুষজন। পতিতপাবনী গঙ্গা এখানে এতই ক্ষীণ যে ওপার দেখা যায়। সেখানে বালি কেটে নেওয়া চলছে। ঘাটের মাথায় ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আইসক্রিমওলা বলছিল, এই নদীও শুকিয়ে যাবে একদিন। তখন মানুষ পাপ ধুতে আসবে কোথা?

ঘাটের সিঁড়ি যেখানে নেমেছে, সেখানে নদীর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নদী সরে গেছে অনেকটা। এদিকে জেগে উঠেছে চর। সেখানে বড় বড় গাছ জন্মে গেছে। একটা লোক খালি গায়, লুঙ্গি এঁটে সেই সব গাছের ফাঁকে পড়ে থাকা উর্বর জমিতে হলুদ হয়ে আসা ধান কাটছে সে। নদীর বাঁধানো পাড় ধরে হেঁটে বেড়ানোর সময় তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছে কয়েকবার। শেষে ঘাটের মাথায় বসে সে একটি আইসক্রিম খেল।

সে গলির মুখে একটু পায়চারি করে, ঢুকব কি ঢুকব না করতে করতে সোজা চলে এল গঙ্গার ঘাটে। কদমতলা গলির মুখ ছাড়িয়ে দুই কদম এগোলেই গঙ্গার ঘাট। গলির মুখ থেকেই ঘাটের মাথার সুদৃশ্য কারুকাজ করা সেই তোরণ দেখা যায়। সেখানেই আইসক্রিমওয়ালা তার পসরা নিয়ে দাঁড়িয়ে। সুজয়কে দেখেই বলল, এই মাত্তর একটা নৌকা ঘাট ছেড়ে গেল। পরের নৌকা আধঘণ্টা পর। এখন বসুন। ভালো করে একটা আইসক্রিম বানিয়ে দিই আপনাকে।

মতামতের অপেক্ষা করল না সে। কমলা রঙের যে জিনিসটা বানিয়ে দিল, দাম পড়ল কুড়ি টাকা। খেতে বেশ। প্রাণ ঠান্ডা হলো।

আত্মীয়বাড়ি এসেছেন বুঝি?

খদ্দেরপাতি নেই। বারমুডা আর গোলাপি গোলগলা পাতলা গেঞ্জি পরা, কাঁধে লাল চেক গামছা আইসক্রিমওয়ালা তাকে সিমেন্টের চাতালে বসতে বসতে বলল। বাইরে যতই গরম থাক, নদীর বাতাস শরীর জুড়িয়ে দেয়।

এই একটু ব্যবসার কারণে…। কাজ শেষে ভাবলুম গঙ্গার বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাই— কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে কথাগুলো নিচুস্বরে বলে গেল সুজয়।

যাই। মা গঙ্গাকে একটা প্রণাম করেও আসা যাবে, বলে সুজয় উঠে পড়ে। বালি-কাদা-মাটি-ঝরাপাতা ঢাকা সিঁড়ি বেয়ে নদীগর্ভে নামতে যাবে, আইসক্রিমওয়ালা চাপা গলায় বলল, খুব সোন্দর এক মেয়ে এসেছে বাবু; পাহাড়ি মেয়ে। গায়ের রং যেন ফেটে পড়ছে। হেব্বি ফিগার। যদি বলেন ত—।

বেশ করেছেন। কালনার গঙ্গার বাতাস খুব মিষ্টি। লোকটা যেন তাকে সমর্থন করতে চাইল। তারপর এটা-সেটা নানা কথা বলে যেতে লাগল। সুজয় তাই সব কথায় কান না দিয়ে নদীকে দেখছিল। ক্রমে ক্রমে চোখে পড়ল ছেলেটিকে। দশ-বারো বছরের ছেলে। রোগা শরীর। শ্যামলা। জলের ভেতর নানা কসরত করছে। যারা তার থেকে একটু দূরে স্নান সারছে, তাকে কোনো আমল দিচ্ছে না।

চোখাচোখি হলে সে জল থেকেই চিৎকার করল, কাকু, মা গঙ্গাকে পুজো দাও। মা তোমার সব পাপ ধুয়ে দেবে।

নিচু গলায় আইসক্রিমওয়ালা বলল, জ্যাঠা ছেলে।

অনেকক্ষণ জলে আছে।
যান না, পাপ ধুতে এত করে ডাকছে।

যাই। মা গঙ্গাকে একটা প্রণাম করেও আসা যাবে, বলে সুজয় উঠে পড়ে। বালি-কাদা-মাটি-ঝরাপাতা ঢাকা সিঁড়ি বেয়ে নদীগর্ভে নামতে যাবে, আইসক্রিমওয়ালা চাপা গলায় বলল, খুব সোন্দর এক মেয়ে এসেছে বাবু; পাহাড়ি মেয়ে। গায়ের রং যেন ফেটে পড়ছে। হেব্বি ফিগার। যদি বলেন ত—।

সুজয় প্রায় ছিটকে সরে এল। নদীগর্ভে বড় লাফ দিয়ে নামতেই স্যান্ডেলের ভেতর অনেকটা বালি ঢুকে গেল। গঙ্গার ভেতর চর জেগে উঠেছে। তার মধ্যে বড় বড় হোগলার ঝোপ। দৃষ্টি সরিয়ে সে একেবারে জলছোঁয়া পাড়ে চলে এল। খালি পায়ে নিচু হয়ে এক আঁজলা জল তুলে মাথায় ছিটিয়ে দিল। মাথা ঠান্ডা করা দরকার। আইসক্রিমওয়ালা কি অনুমান করেছে কিছু? নইলে তাকে এমন কথা বলবেই বা কেন।

কিন্তু রেগে গেল কেন। নাকি ভড়কে গেল? যে কারণে এসেছে, সেটা শুনতে তার যে প্রতিক্রিয়া হলো , সেটাতে সে নিজেই অবাক। নদীর ছোঁয়ায় তার মনে হলো হ্যাঁ, সুযোগ একটা ছিল বটে। লোকটা ঘুরপথে পৌঁছে দেবে বলেছিল। প্রতিবাদ না করে সে যদি মুখে কিছু না বলে চুপ করেও থাকত… ।

মনে হতে সে আড়চোখে পাড় দেখে নিল। আইসক্রিমওয়ালা বসে আছে। তাকে দেখছে না। এতক্ষণ সুজয়ের মনে হয়েছিল, হয়তো তাকেই দেখছে লোকটা আর মনে মনে বলছে, কেমন দিলুম? এখানের সব হাওয়া খাওয়া মালকে আমি চিনি। ওপরে হাওয়াখোর, কিন্তু আসলে সব বালবেটা মাগিখোর।

লোকটা যে তাকে দেখছে না, এই ভাবনা মাথায় আসতে তার মনটা অনেক হালকা হয়ে গেল। বারবার মনে হচ্ছিল, দুজোড়া চোখ যেন তার পিঠে বিঁধছে।  কিন্তু এখন সে আশ্বস্ত হলো, না, লোকটা তাকে দেখছে না। খবরের কাগজ পড়ছে।

ছেলেটি পাড়ের কাছের জলে গা ডুবিয়ে আছে। জল থেকে মাথা উঁচু করে বলল, জলে টাকা দাও কাকু। মা গঙ্গাকে পুজো দেওয়া হলো, তোমার পাপও ধুয়ে গেল।

আমি পাপী তোকে কে বললে?

দাও না—সে অনুনয় করে।

পকেট থেকে একটাকা জলে ছুড়ে দিয়ে বলল, নাম কী রে তোর?

শিশু।

থাকিস কোথা?

হুই—বলে সে যে পাড়ার দিকে আঙুল নির্দেশ করল, সেদিকেই কদমতলা। সেই পল্লিতে তার দুজন বন্ধু আসে। এই মেয়েদের সম্পর্কে অনেক কাহিনি তাদের মুখে শুনেছে সুজয়। এখানে তিন শ-সাড়ে তিন শ মেয়ে থাকে। বেশ কিছু সুন্দরী মেয়ে আছে। তাদের চাহিদা বেশি। মধ্য তিরিশ সুজয় কখনো নারী সংসর্গ করেনি। এই নিয়ে বন্ধুরা কম তাকে হ্যাটা দেয়। সে ওই সব মেয়ের যৌনজীবনের নানান মজাদার কাহিনি শোনে আর অলৌকিক স্বপ্ন গড়ে তোলে মনের ভেতর। একসময় সে সিদ্ধান্ত নেয়, আসবে একবার। দুই বন্ধুর একজন কার্তিক পাল বলে, কত পয়সাওলা লোক, কত শিক্ষিত মানুষ ওখানে গিয়ে এক এক সুন্দরীর পিছনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে, জানিস? আর তুই শালা কে? চল, জীবনের মজা নিয়ে আসবি।

হা হা করে হাসে সুজয়।

দেখ সুজয়, হাসির কথা নয়। বিয়ের আগে দেখে নেওয়া দরকার তোর দম কত।

তুই তো এখনো চালিয়ে যাচ্ছিস।

এতে দোষের কী? যৌন উত্তেজনা ওরা কেমন জাগায়, সে আর তোকে কেমনে বলব। সেটা মাথার ভেতর ইলেকট্রিক শকের মতো কাজ করে। সেই শক মাঝে মাঝে না পেলে তুই জীবনে বাঁচবি কী করে? জীবন যে মরুভূমি হয়ে যাবে।

গলির মুখটায় ঢুকতে গিয়েও সে থমকে দাঁড়াল। বন্ধুদের সঙ্গেই আসার কথা থাকলেও আচমকা ঝোঁকের বশে চলে এল। আজ সোমবার। তাঁতের কারিগরদের হপ্তা ছুটি। সকালে কালনায় এক ব্যাপারীর কাছে যাব, এই বলে সে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু প্রথমবার নিষিদ্ধ কোনো জিনিস খাওয়ার মেতা ভেতরে ভেতরে এক উত্তেজনা হচ্ছিল তার। না জানি তারা কেমন করে দাঁড়ায় লাইনে। মনে এল কার্তিক পালের কথা। সে বলেছিল, গলির মুখে প্লাস্টিকের লাল-নীল টুলে তারা বসে থাকে। হাতে প্লাস্টিকের পাখা। পরনে শাড়ি-কাপড়। কেউ ঢুকলে ডাকাডাকি করে। কার্তিক বলেছিল তিনজনের কথা। শ্যামলী, নূরজাহান আর রেশমা। এরাই নাকি এখন কালনার টপ।

এতে দোষের কী? যৌন উত্তেজনা ওরা কেমন জাগায়, সে আর তোকে কেমনে বলব। সেটা মাথার ভেতর ইলেকট্রিক শকের মতো কাজ করে। সেই শক মাঝে মাঝে না পেলে তুই জীবনে বাঁচবি কী করে? জীবন যে মরুভূমি হয়ে যাবে।

কিন্তু সব খবর নিয়ে এলে কী  হবে, সে কদমতলার গলির মুখে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। কার্তিক বলেছিল, তিনজনের কাকে কেমন দেখতে, কী পোশাক পরে, কেমন করে ডাকে। তাদের সাজগোজ, তাকানো, হাসির কায়দার কথাও তার অজানা নয়। যেকোনো একজনের ঘরে গেলেই চলবে।

রোদের দিকে তাকানো যায় না। সব সময় গা দিয়ে দরদর করে ঘাম গড়িয়েই চলেছে। জামা আর শুকায় কই। ট্রেন থেকে নেমে সে রিকশাতেই এসেছে। কার্তিক বলে, হেঁটেও যাওয়া যায়। কিন্তু ইস্টিশন থেকে তা লাগবে ধর না কেন আধঘণ্টা। তার চেয়ে আমরা যেমনটি করি, পৌরসভার কাছে এসে রিকশা ছেড়ে দিই। ওখান থেকে কদমতলার গলির মুখ হেঁটে পাঁচ মিনিট মাত্র।

সুজয় সেভাবেই এসেছে। সে চারদিকে তাকাতে তাকাতে আসছিল কেউ তাকে দেখছে কি না। দোকানদার, পানওলা—সব নিজের কাজে ব্যস্ত।  পৌরসভার উল্টো দিকের গলিতে কয়টা দোকান পর গলিটা পড়বে, সেটাও তার মাথায় ছবির মতো ভাসছিল। গলির ভেতর গলি। তাকিয়েই সে দেখতে পেল হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে নানা চেহেরার চার-পাঁচটা মেয়ে চড়া লিপস্টিক মেখে বসে আছে।

আইসক্রিম-শীতল ছায়া-গঙ্গার বাতাস সব নিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সুজয়। ছেলেটা জল থেকে উঠে বালিতে বসল। ভিজে বালি। বলল, কিছু খাওয়াবে, বড্ড খিদে পেয়েছে।

বাপ কী করে তোর?

বাপ নাই।

ও। মা?

আছে। মা বলে, গঙ্গায় চান করলে পাপ ধুয়ে যায়। তুমি কী করো?

তাঁতের কাজ।

এখানের কাজ মিটল?

কেন বল দিকি?

তবে একটু পাড়াটাতে ঘুরে যাও।

কোন পাড়া?

ওই যে, তখন দেখালুম—বলে সে আবার দেখায়। পাড় বাঁধানো রাস্তার গায়ে পরপর ঘর। লাল-নীল চুন গোলা রং।

একটা ঝাঁকুনি খেল সুজয়। সে কি ঠিক শুনল? সে ভুল বুঝছ না তো? কি জানি কী হলো তার, স্যান্ডেল পেতে বালির ওপর উবু হয়ে বসল সুজয়। তা পায়ের পাতা ডুবে থাকে নদীর জলে। একটু ভাবল সে। এই সুযোগ আর হাতছাড়া হতে দিতে রাজি নয় সে। চুপিচুপি বলে, তোদের পাড়ায় সবচেয়ে সুন্দরী কে?

সুমতী।

কেমন দেখতে? উত্তেজনা চাপতে পারল না সে।

তুমি যেমন চাও, ঠিক তেমন। একেবারে সোজা গলায় কথা বলল শিশু। বলল, যেকোনো মেয়েকে আমার নাম বলবে, কেউ বিরক্ত করবে না, সোজা পৌঁছে সুমতীর ঘরে পৌঁছে দেবে।

আর রেশমা?

ঠোঁট উল্টে সে বলে, দূর। ও তো বুড়ি হয়ে গেছে।

আঁজলা ভরে গঙ্গার জলই তুলে নিল সুজয়। পান করে নিল সবটা। নিজেকে বলল, পাপ হবে না তো?

আচ্ছন্ন ভাব নিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সুজয়। সে ইচ্ছে করলে প্রথমবার গলির যে মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান দিয়ে সটকান দিতে পারত। সেখানে আইসক্রিমওয়ালা নেই।  কিন্তু কী এক টান তাকে সেই গঙ্গার দিকের গলিতেই বার করে আনল। খুব ক্লান্ত লাগছিল। বুকের ভেতর বাতাসের অভাব বোধ ছিল। জোরে শ্বাস নিলে বুকে এক বেদনা জন্মায়। যেন কোথাও পাড় ভেঙে ভেঙে নদী সরে সরে যাচ্ছে।

নদীগর্ভে ফিরে এসে দেখল, এখানের সময় সেই একই আছে। সেই লোকটা এখনো ধান কেটে চলেছে। মানুষজন নদীতে স্নান সারছে। সুজয় যে পায়ে পায়ে আবার তাদের মধ্যে হাজির হয়েছে, সেদিকে কারও খেয়াল নেই। সে কি তবে কোথাও যায়নি? কতটা সময় সে ছিল ওখানে? সময়ের হিসাব তার মুঠোয় নেই।  পেছন দিকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, সেই আইসক্রিমওয়ালা এখন নতুন খদ্দের পেয়েছে।

জলের দিকে চোখ পড়তেই সে চমকে উঠল। শিশু এখনো তেমনিভাবে সাঁতার দিয়ে যাচ্ছে। থমকে গেল সুজয়। মনের মধ্যে এক দ্বিধা, এক অপরাধবোধ, এক অজানা রক্তস্রোত বয়ে যেতে থাকল। শিশুর কোনো ভাবান্তর হলো না। আগের মতো স্বাভাবিক গলায় বলল, ঝাঁপাও।

এত গরম চলছে। আসার পথে ট্রেনে অফিসযাত্রীদের মুখে শুনছিল, গরমের চোটে কোথায় কোথায় রাস্তায় লোক মারা যাচ্ছে। কালনা শহর ঘুরে তার শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এত পিপাসা পাচ্ছে যে বলার নয়। এইমাত্র সে জল পান করেছে সুমতীর ঘরে। তবু বুকের ভেতর পিপাসা রয়ে যায়।

শিশুর হাতে টাকাটা ধরিয়ে সুজয় হাঁটতে থাকল। স্টেশনের দিকে নয়। কদমতলার গলির মুখ দিয়ে সে পাড়ার ভেতর প্রবেশ করল। দুদিকে মেয়েরা বসে আছে।  কেউ তার হাত ধরে টানল না, কিছু বলল না। রোদের আড়াল থেকে মাথা বাঁচিয়ে নিজেদের ভেতর গল্পে মগ্ন। সুমতীর গলিটা চিনতে কোনো ভুল হলো না তার। যেন কত চেনা, এমনিভাবে ঢুকে গেল সে ঘরের ভেতর। জানে সুমতী তাকে দেখে অবাক হয়ে যাবে।

আন্ডারপ্যান্ট পরে জলে নামতেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। হয়তো এটাই পাপ ধুয়ে নেবার আনন্দ। তার ভেতরটা চমকে চমকে উঠছিল। কিন্তু তবু মনে হলো, সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। কত মেয়ে বসে ছিল। রোদ থেকে বাঁচতে টালির ঘরের ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। শিশুর কাছে এসব কোনো ব্যাপার নয়। কোমর অবধি জলে সে নামতে শিশু গলা তুলে বলে, এবার সাঁতার দাও।

পারাপার করিস? সুজয় স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে।

করি। তবে সব সময় নয়। এমন গরমের দিনে করি। তবে মা বারণ করে।

ঘরে ফিরে কী করবি?

ভাত খাব। তারপর পাড়ায় ঘুরব। দিনু কাকার মুদিদোকানে বসব। পল্টুদার মদের দোকান থেকে বাবুদের জন্য মাল এনে দিই। বাবুরা টাকা দেয়। সবাই দেয় না। একবার এক বাবু দেছিল এক শ টাকা।

টাকা পেলে কী করিস?

আইসকিরিম খাই। চপ, তেলেভাজা খাই। বেশি পেলে মাকেও দিই।

গঙ্গায় এইভাবে সাঁতরে কি সত্যি সব পাপ ধুয়ে যায়? তার পাপ কি ধুয়ে যাচ্ছে? কত পাপ আছে তার? আজ যে নীল ঘরে সে এক স্বাদ নিতে গেছিল, সেটা পাপ? পেটের তাড়নায় মানুষ কী না করে। তেমনি শরীরের তাড়নায় সে যদি অর্থের বিনিময়ে কোনো নারীশরীরের ভেতর আশ্রয় নেয়, তার কি পাপ হতে পারে?

সাঁতার শেষ হলে উঠে পড়ল সে। রুমালে যতটা সম্ভব গা-মাথা মুছে ভিজে আন্ডারওয়্যারের ওপরই পোশাক পরে নিল। যা রোদের তাপ, শুকাতে বেশি সময় লাগবে না।

শিশু বললে, আইসকিরিম খাওয়াবে বাবু?

বাবু শব্দটাতে এক ধাক্কা খেল সুজয়। সে ঘাটের মাথায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথার ওপর গনগনে আঁচ। ঠান্ডা গা ইতিমধ্যেই গরম হতে শুরু করেছে। কত দিন যে বৃষ্টি হয় না। ফাটা মাটি জোড়ে না। চাতক পাখির মতো মানুষও হাঁ করে আছে একফোঁটা বৃষ্টির জন্য।

এসবের প্রতি শিশুর কোনো দৃষ্টি নেই। এক ছুটে গিয়ে পছন্দমাফিক আইসক্রিম তুলে নিয়েছে। আইসক্রিম মুখে পুরে শিশু আর দাঁড়াল না। কিছু বললও না। লাফাতে লাফাতে বাজারের দিকে গলির মুখটার কাছে গিয়ে এক পানওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে থাকল। সুজয় আইসক্রিমওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দামটা নিয়ে চাপা গলায় লোকটা বলে, কত ভালো জিনিস ছিল, বললাম, শুনলেন না।  ওই বুড়ির কাছে আজকাল আর কেউ যায় না। তাই ওর ছেলেটা ওইভাবে খদ্দের ধরে। দিনে জলে, রাতে এই ঘাটে কি পাড়ায়…।

সুজয় হাঁ করে ওর কথা শুনছিল। এমন যে হতে পারে, কেউ তাকে বলেনি। সে ধপ করে সিমেন্টের উঁচুটায় বসে পড়ল। আইসক্রিমওয়ালা আর তার অনুমতি নিল না। জম্পেশ একটা আইসক্রিম বানিয়ে তার হাতে দিয়ে বলল, আপনাকে আমি সেরা জিনিস দোব। শহরের নির্জন এক হোটেলে। গাছপালা আছে, পাখি ডাকবে, আনন্দ পাবেন। আমার ফোন নম্বর লোড করে নিন ভাই বলে। বাইরের কত লোককে আমি সাপ্লাই দিই, জানেন? তারা সব ভদ্দরলোক, এ পাড়া মাড়ায় না। ভালো জিনিস, ভালো হোটেল, ভালো পয়সা। আপনি তো রোজ আসছেন না।

আর বাবু শব্দে ধাক্কা খেল না সুজয়। সে ধীরে ধীরে আইসক্রিম শেষ করছিল। কলকাতার রাস্তায় আজও কি গরমের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ল? কত দিন যে মেঘ ছায়া দেয় না। বৃষ্টি মেরে দেয় না ধুলোদের।

আইসক্রিমওয়ালা বলল, ও এবার গলির মুখ থেকে খদ্দের ধরবে।

নদীর ওপারে এখনো বালি কাটা চলছে দাঁড়া কোদালে। তিনজন লোক কাটছে, একজন পাশে দাঁড়িয়ে কোথা থেকে কাটা হবে, তার তদারকি করছে। আবার একটি নৌকা ছাড়ল এপাড়ের ঘাট থেকে। নদীর মাঝে চর জেগে ওঠা, চরের বড় ঘাসের এলাকাকে পাশ কাটিয়ে সে চলল তা গন্ত্যবে।

সুজয় দীপ্ত পায়ে দোকানটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, শোন শিশু।

থতমত খেয়ে পান দোকান থেকে বেরিয়ে এল শিশু। বলে, কী?

মানিব্যাগ বার করে একটা নোট শিশুর হাতে দিয়ে বলল, নে…।

শিশুর হাতে টাকাটা ধরিয়ে সুজয় হাঁটতে থাকল। স্টেশনের দিকে নয়। কদমতলার গলির মুখ দিয়ে সে পাড়ার ভেতর প্রবেশ করল। দুদিকে মেয়েরা বসে আছে।  কেউ তার হাত ধরে টানল না, কিছু বলল না। রোদের আড়াল থেকে মাথা বাঁচিয়ে নিজেদের ভেতর গল্পে মগ্ন। সুমতীর গলিটা চিনতে কোনো ভুল হলো না তার। যেন কত চেনা, এমনিভাবে ঢুকে গেল সে ঘরের ভেতর। জানে সুমতী তাকে দেখে অবাক হয়ে যাবে।

গঙ্গায় সব পাপ ধুয়ে ফেলে শরীর-মন তরতাজা তার। এখন কিছু খাবার আর ঘুম দরকার।

Meghchil   is the leading literary portal in the Bengali readers. It uses cookies. Please refer to the Terms & Privacy Policy for details.