২০ এপ্রিল ২০২৬
খায়রুল আলম সবুজ
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
কামরুল হাসান
কবি ও গদ্যকার
3

কামরুল হাসান
কবি ও গদ্যকার

3

জীবনের মুখগুলি

খায়রুল আলম সবুজ

যৌবনে তিনি চলে গিয়েছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফির দেশ লিবিয়ায় আরবদের ইংরেজি পড়াতে। সঙ্গে ছিলেন নুরুল করিম নাসিম, হারুনুজ্জামান প্রমুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তিন সহপাঠী একসঙ্গে পাড়ি দিয়েছিলেন মরুর দেশ লিবিয়ায়। কিছুকাল আরবদের ইংরেজি পড়িয়ে তিনি ও হারুনুজ্জামান দেশে ফিরে এলেও নুরুল করিম নাসিম পাড়ি জমিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। অবশেষে একদিন তিনিও মাতৃভূমির টানে ফিরে আসেন। তিন বন্ধু বাংলার মাটিতে পুনর্বার একত্রিত হন। আমার সৌভাগ্য হলো আমি কর্মসূত্রে নুরুল করিম নাসিম ও হারুনুজ্জামান ভাইকে আমার সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি যথাক্রমে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে। খায়রুল আলম সবুজের সাথে তেমনটা ঘটেনি, তবে তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি ওই দুজনের ঢের আগে। কারণ, খায়রুল আলম সবুজ আমার আত্মীয়। আমরা পরস্পরের বেয়াই।

এই তিনজনের ভেতর প্রবল পরিচিত ও জনপ্রিয় একজনই। তিনি খায়রুল আলম সবুজ। টেলিভিশনের কল্যাণে তার মুখ ও অভিনয়শৈলী পৌঁছে গেছে বাংলার কোটি কোটি ঘরে। তিনি একজন প্রতিভাবান অভিনেতা। নাটকের দর্শকগণ যা জানে না তা হলো খায়রুল আলম সবুজ একজন শক্তিমান লেখক ও অনুবাদক। অনুবাদের জন্য লাভ করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। কেবল নাটকের দর্শক নয়, লেখক বুদ্ধিজীবীদের ভেতর তিনি যে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব তা বোঝা যায় কোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এলে। এটা আমি বারংবার দেখেছি ঝর্না রহমান পরিচালিত ‘পরণকথা’, মোহন রায়হান পরিচালিত ‘দিকচিহ্ন’ অনুষ্ঠানে। একবার গল্প নিয়ে পরণকথার একটি অনুষ্ঠানে তিনি এলে গল্পকার ও গল্পের সমালোচকগণ সোৎসাহে প্রায় নেচে উঠেছিলেন। তার পরিচিতির যদিও প্রয়োজন ছিল না, তবু সেদিন ফল্গুধারার মতো ছোটগল্প লেখা কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার বলেছিলেন, খায়রুল আলম সবুজ ছোটগল্পের বড় কারিগর। কেবল সংখ্যাতীত নাটকে তিনি দক্ষতার সাথে অভিনয় করেন নি, প্রচুর নাটক বাংলায় অনুবাদ করেছেন। মনি হায়দার বিশেষ করে উল্লেখ করেছিলেন খায়রুল আলম সবুজের করা সোফিয়া লরেনের আত্মজীবনীর অনুবাদ। এক বিস্ময়কর উত্থানের কাহিনী সেটি; যথার্থ অর্থেই from rags to riches এই ভুবনকাঁপানো অভিনয়শিল্পীর জীবনের না-জানা অধ্যায়গুলো তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন।

সে অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক মিলা মাহফুজার একটি গল্পের শ্যালিকা-দুলাভাই নিয়ে যখন সরস গল্প হচ্ছিল, তখন সবুজ ভাই তার জানা কেবল নয়, স্বচক্ষে দেখা একটি ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। সময়টা ১৯৭৭/৭৮, তিনি ঝালকাঠি কলেজে, তার ভাষায়, ‘মাস্টারি’ করেন। ঘটনাটি তার এক সহকর্মীর, যিনি একদিন স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে ফেলে শ্যালিকাকে নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। মফস্বল শহরটিতে ঐ তোলপাড় তোলা কাণ্ডটি যিনি ঘটিয়েছিলেন, তাকে দেখে কখনো মনে হয়নি নিরীহ মানুষটি অমন ঘটনার জন্ম দিবেন, ঐ রোগের কোন সিম্পটম ছিল না। তারপর? শ্রোতারা ব্যাকুল হয়ে সিনেমার পরের অংশে কী ঘটলো তা জানতে চেয়েছিল। সবুজ ভাই জানিয়েছিলেন একদিন পলাতক দুজন ফিরে এলে বড়বোন ছোটবোনকে সতীন হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জীবন আসলে প্রেমের চেয়ে বড়― এ কথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন পর্দায় অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করা খায়রুল আলম সবুজ।

টিভি নাটকের দর্শকশ্রোতারা জানেন তাঁর কণ্ঠ যেমন ভরাট, কথা বলার ভঙ্গিও তেমনি শিল্পসম্মত। সেদিন আসরে পঠিত মনি হায়দারের গল্পটিকে এবসার্ড ধরণের গল্প বলে অভিহিত করে বলেছিলেন, সেটি একটি স্বার্থক ছোটগল্প। সেখানে গল্পকার যা বলতে চেয়েছেন তা বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, সময়টা শ্বাসরুদ্ধকর। স্বৈরাচারী সময়ে সবকিছু সোজাসুজি বলা যায় না, আড়ালে যেতেই হয়। রূপকের আড়ালে এই কাজটি করেছেন লেখক। যে সময়ে আমরা বাস করছি সে সময়ের দুরারোগ্য ব্যাধিগুলোর কোন নিরাময় আমরা করতে পারছি না। অভ্যাসের পরিবর্তন যে দেহে সয় না এর উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ধূমপায়ীরা যখন সিগারেট ছেড়ে দেয় তখন নানারকমের উপসর্গ দেখা দেয়, আবার শুরু করলে সব ঠিক। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, সবাই যে গল্প দুটি নিয়ে আলোচনা করেছেন এটা ভালো। কী বলবেন না বলবেন সেটা আলোচকের ব্যাপার। বল্লেন, ‘A writer should not hold his pen until he believes what he is going to write.’ মানিক বন্দোপাধ্যায়ের গল্পের সাথে মনি হায়দারের গল্পের মিল প্রসঙ্গে বলেছিলেন, চিন্তার মিল থাকতেই পারে। হোমারের ইলিয়াড আর বেদব্যাসের মহাভারত যোগাযোগহীন দুই ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন সময়কালে লেখা হয়েছিল, অথচ তাদের মাঝে চিন্তার আশ্চর্য মিল রয়েছে। এখন আমরা যে জাদুবাস্তবতার কথা বলি, যার সকল কৃতিত্ব দেই লাতিন আমেরিকার লেখকদের, তা তো বাংলা সাহিত্যে ছিল, কেবল আমরা তার নামকরণ করিনি। আমাদের ছোটবেলায় আমরা এমন সব গল্প পড়েছি যেগুলো আসলে জাদুবাস্তবতার গল্প।

জীবনের মুখগুলি, কামরুল হাসান

কবি ওবায়েদ আকাশ পরিচালিত ‘শালুক’ এর একটি অনুষ্ঠানের কথা মনে আছে। মঞ্চে এসে তিনি দাঁড়ানো মাত্র হাতিতালির একটা ঢেউ উঠেছিল। খায়রুল আলম সবুজ, দীর্ঘদেহী কান্তিমান পুরুষ। উপস্থাপিকা পলি পারভীন বলেছিলেন ‘তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি।’ অনেকক্ষণ ধরেই তিনি মঞ্চে বসেছিলেন, ততক্ষণে শরীরে খিল ধরে যাবারই কথা বিশেষ করে এই পড়ন্ত বেলায়। কিন্তু তিনি এসে দাঁড়িয়েছিলেন ঋজু ভঙ্গিমায়, আর যিনি সর্বদাই কথা বলেন সুন্দর, শিক্ষকতা করতে গিয়ে যাকে অজস্র কথা বলতে হয়েছে, তিনি বলেছিলেন পড়ন্ত বয়স একটা অঘটন ঘটিয়েছে। স্মরণশক্তি কমিয়ে দিয়েছে ঢের, যা অনেকটা গোল্ডফিশের পর্যায়ে চলে গেছে।

কবি ও কবিতার সে অনুষ্ঠানে খায়রুল আলম সবুজ বলেছিলেন, কবিরা কখনো একা থাকে না, মাল্টিপ্লাই করলেই এটা ধরা পড়ে। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত পশ্চিমবঙ্গের অতিথি কবিদের সম্পর্কে বলেছিলেন, তাদের সাথে পরিচয় নেই কিন্তু বাংলা তো। সুতরাং তারা আমাদের স্বজন। এ সম্পর্ক আগেও ছিল, এখনো আছে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে আমরা শুরু করি বটে, তবে যে জিনিস সত্যিকার তার জন্য আয়োজন লাগে না। শালুকের প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন ওবায়েদ আকাশ অল্প বয়সেই অবাক সব কাণ্ড করে ফেলেছে। খায়রুল আলম সবুজ তার কথামালা শেষ করেছিলেন ৯০ দশকে লেখা তার কবিতা ‘উপেনের জমি’ আবৃত্তি দিয়ে। এ কবিতায় দ্ব্যর্থবোধক কথাটি হচ্ছে ‘জমি আমার’। আমার একপাশে বসেছিলেন কবি আবদুর রাজ্জাক, অন্যপাশে কবি মতিন রায়হান। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, সবুজ ভাইয়ের কণ্ঠস্বর কী সুন্দর, কী যাদুকরী! তারা একমত হয়েছিলেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বাতিঘর’ আয়োজিত কবি সরকার আমিনের আত্মজীবনী ঢঙ্গের লেখা ‘এ জার্নি বাই লাইফ’ বইয়ের পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি তার কথামালা শুরু করেছিলেন ঘরোয়া আড্ডার মেজাজে। তাঁর ভঙ্গিটি সর্বদাই ওইরূপ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি অসীম সাহার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘অসীম আমার চেয়ে ৪ দিনের বড় কিংবা আমি অসীমের চেয়ে ৪ দিনের বড়।’ সরকার আমিনের সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, আমিনকে দেখে তার প্রথমেই মনে হয়েছিল আরেকজন বাউলের দেখা তিনি পেয়েছেন। চিনতে তার ভুল হয়নি, কেননা তিনি নিজেও বাউল স্বভাবের। তার মতে আমিন একজন অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ, মমতার মানুষ; তার একটি সতেজ অন্তর আছে, আছে একটি সহজ সত্তা। সে যা বলে নিজের মতো করেই বলে, তাতে uniqueness আছে, শুনে ক্লান্তি আসে না। গান নিয়ে ওর পাগলামি আছে, নাম দিয়েছে গানলামি, তার অফিসে গানের যাবতীয় সরঞ্জাম আছে। খায়রুল আলম সবুজ বলেছিলেন, আমিনদের মতো মানুষ আমাদের প্রয়োজন।

২০২০ সালে টাঙ্গাইলে কবি মাহমুদ কামাল আয়োজিত বাংলা কবিতা উৎসবে প্রথম দিনের শেষ পর্বের (তখন সন্ধ্যারাত) প্রধান অতিথি ছিলেন কবি মাকিদ হায়দার আর সভাপতি নাট্যব্যক্তিত্ব খায়রুল আলম সবুজ। তারা দুজনেই সেবছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন― মাকিদ হায়দার কবিতায়, খায়রুল আলম সবুজ অনুবাদে। তারা বসেছিলেন তিনদিকে পাতা কাপড়ে ঢাকা নিচু বেঞ্চির মধ্যভাগে, যেখানে তাদের বসার কথা। সভাপতির কথামালা শেষ হলে খায়রুল আলম সবুজ পড়েছিলেন ত্রিশ বছর আগে লেখা তার কবিতা ‘উপেনের জমি’। বুঝলাম এটি তার প্রিয় কবিতা। রবি ঠাকুর লিখবার পরেই উপেন নামটি বাংলা কবিতায় বিখ্যাত হয়ে যায়, আর ভূস্বামীরা প্রায়শই অন্যের জমি কেনার সময় সহচর উপেনকে বার্তাটি আগাম জানিয়ে দেন। কবিতার জমিনও তো কেউ কেউ কেনেন, না জানিয়ে অবশ্য।

তার শৈশব কেটেছে বরিশালে। কথাসাহিত্যিক নূর কামরুন নাহারের সাথে ‘জায়া নন্দিনী’ টিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তখন পৃথিবীর চেহারা অন্যরূপ ছিল। দেশের চেহারাও অন্যরূপ ছিল। তখন নদীগুলো কেউ দখল করেনি।’ প্রকৃতির মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চারিপাশে সবুজ আর সবুজ, আকাশটা দারুণ নীল। বটতলায় তার বাড়ির কাছে ছিল অক্সফোর্ড মিশন। গির্জার উঁচু চূড়া, সবুজ প্রাঙ্গণ, টলটলে পানির এক দীঘিসম পুকুর, দেয়ালের ওপাশে লাল সুড়কির সড়ক, শহরের পাশে ছিল কীর্তনখোলা নদী। সরল কিছু মানুষের মধ্যে, নির্মল এক প্রকৃতির মাঝে বেড়ে উঠেছেন তিনি।

খায়রুল আলম সবুজের জীবনপাত্র ভরে আছে অসংখ্য মুখ, ঘটনা, নাটক ও গল্পে। একটি লেখায় তা তুলে আনা বা ধারণ করা অসম্ভব। বস্তুত খায়রুল আলম সবুজের জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত হতে পারে একাধিক উপন্যাস, অনেকগুলো নাটক!

জীবনের প্রথম পাঠ ‘আদর্শ বিদ্যালয়’ নামের বিদ্যায়তনে। গোলপাতায় ছাওয়া ছাদের স্কুলটি ছিল বিরাট এক মাঠের ভেতর। মেধার স্ফূরণ ঘটেছিল সেই কচি বয়সেই। সাড়ে ১২ বছর বয়সে স্টেজে উঠেছিলেন। আরও আশ্চর্য সেবয়সেই তিনি একটি নাটিকা লিখেছিলেন সমবয়সী সহপাঠীদের অভিনয়ের জন্য। ছাত্র বয়সেই স্কুল ম্যাগাজিনে কবিতা ও গল্প ছাপা হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে করাচিতে বড় ভাইয়ের কাছে তাকে পাঠানো হয়। সেসময় থেকেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতি ও লেখালেখিতে। করাচি থেকে লেখা পাঠাতেন ‘চাঁদের হাট’-এ। করাচির একমাত্র বাংলা কলেজে নির্বাচন করে সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুবছর পড়েছিলেন। তিনি ঢাকা ফিরে আসেন ১৯৭১ এর অগ্নিগর্ভা মার্চে। তারিখটি সুস্পষ্ট মনে আছে তার―১৮ই মার্চ। পাকিস্তানী হানাদাররা নিরস্ত্র বাঙালির উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে তিনি চলে যান বরিশালে। এমনিতেই টগবগে সাহসী যৌবন, উপরন্তু তিনি রাজনীতি সচেতন মানুষ, মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ছিল অনিবার্য ঘটনা। তার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। নূর কামরুন নাহারের সাথে আলাপনে বললেন, ‘নিজ দেশের স্বাধীনতা দেখা বিরাট ব্যাপার।’

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দুবছর পড়েছিলেন তা ঐ ইংরেজিতেই। ঐ সাক্ষাৎকারেই তিনি বললেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল টিএসসিতে আর তা ছিল ইংরেজিতে লেখা। লিখেছিলেন তার সহপাঠী নুরুল করিম নাসিম। ডাকসুর নাট্যচক্রের প্রথম সেক্রিটারি ছিলেন খায়রুল আলম সবুজ। তখন বিটিভি ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বি, একমাত্র গণমাধ্যম। বিটিভি ও মঞ্চে শুরু হয় নাটকের স্বর্ণযুগ। মঞ্চে ছিলেন প্রতিভাবান কিছু নির্মাতা। এরা হলেন সেলিম আল দীন, আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, আবুল হায়াৎ, আল মনসুর প্রমুখ। তখন সবকিছু রুচিশীল ছিল, টাকার ঝনঝনানি ছিল না। আফজাল হোসেন, হুমায়ূন ফরিদী, সুবর্ণা মোস্তফা, আসাদুজ্জামান নূর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আল মনসুর প্রমুখ সকলেই সেসময়ে বিটিভি ও মঞ্চে অভিনয় করতেন। তারা ছিলেন অভিনয়দক্ষ ও মেধাবী।

বহুমাত্রিক মানুষটির আর একটি পরিচয় এখন সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অনেকেই জেনে গেছে আর তা হলো চমৎকার তাঁর গানের গলা। তার সঙ্গে যারা ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন তারা জানতেন এই গানের কথা, জানতেন তার অনুপম ভরাট কণ্ঠটি গানের জন্য আদর্শ। অথচ তিনি প্রথাগত বিদ্যালয়ে গিয়ে গান শেখেননি। গান ছিল তার রক্তে। এখন কোনো অনুষ্ঠানে গেলে শ্রোতাদের আবদার ওঠে গান শোনাবার। তিনি তা মেটানোর সাধ্যমতো চেষ্টাও করেন।

তবে নাটকই তার প্রধান পরিচয়। নিজে নাটক লিখেছেন প্রচুর, যার ৪০ টি প্রচারিত হয়েছে (on air), অভিনয় করেছেন অসংখ্য নাটকে, অনুবাদ করেছেন বিদেশি নাটক। সবচেয়ে বেশি অনুবাদ করেছেন নরওযের বিশ্বখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের ১৩টি নাটক। অনূদিত প্রথম নাটক Enemy of the People করেই তিনি ইবসেনের ভক্ত হয়ে যান। তাঁর মতাদর্শ ভালো লাগে। ইবসেন হলেন রিয়ালিস্টিক নাটকের জনক। ইবসেনের সবচেয়ে আলোচিত নাটক A Doll’s House এর প্রধান চরিত্র নোরার মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম নারীর স্বাধীনতা তুলে ধরেন। ইবসেন সত্য ভালোবাসতেন যা মিলে যায় খায়রুল আলম সবুজের প্রকৃতির সাথে। সত্যিকারের মুক্ত মানুষ তিনি। বলেন, কোনো লক্ষ ছিল না জীবনের, আজো নেই।

আমি দেখেছি বেশিরভাগ সৃষ্টিশীল মানুষের পছন্দ ছোট পরিবার। তারা সাংসারিক দায়িত্ব কর্তব্য যথাসাধ্য সংক্ষিপ্ত রাখেন সৃষ্টিশীল কাজে সময় দেবার লক্ষে। খায়রুল আলম সবুজেরও একটিই সন্তান। প্রতীতি নামের বাবার আদুরে কন্যাটিকে কাঁধে চড়িয়ে তিনি একুশে বইমেলায় আসতেন। বেশ কিছুবছর এটাই ছিল বইমেলায় খায়রুল আলম সুবজের আইকনিক চেহারা বা চিত্র। একই কাণ্ড বা চিত্র তৈরি করেছিল কবি মারুফ রায়হান, তার কাঁধেও চড়ে থাকত কন্যাশিশু। কালক্রমে প্রতীতি বড়ো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবেশ করেছে কর্মক্ষেত্রে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমরা ছিলাম সহকর্মী। অনেকদিনই তাদের রুটের গাড়িতে চড়ে গিয়েছি, প্রতীতিকে বলেছি একদিন আসব সবুজ ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। বহুকাল ধরেই তিনি বসবাস করছেন মগবাজার এলাকায়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কাছাকাছি এ অঞ্চলটি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শিষ্যদের জন্য আদর্শ। সবুজ ভাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই এর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন।

সাওল হার্ট সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে পেছনের সারি থেকে সমুখে এসে বসেছিলেন খায়রুল আলম সবুজ। আমার পাশে এসে বলেছিলেন, ‘কামরুলের পাশে বসলে অসুবিধা। ও সব টুকে রাখে।’ তার মনে পড়লো মুহম্মদ জাফর ইকবালের কথা। তিনিও নাকি সর্বক্ষণ লেখেন, এমনকি হাঁটতে হাঁটতেও লেখেন। একদিকে ভক্তদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন, অন্যদিকে লিখে চলেছেন। একসময় বইমেলার সাম্রাজ্যটি ভাগাভাগি করে নিজেদের দখলে নেওয়া ভ্রাতৃদ্বয়কে সারাক্ষণ লিখতেই হতো। এ ছাড়া উপায় কী? আমার সম্পর্কে সবুজ ভাইয়ের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, ‘কামরুল সর্বত্র আছে।’ খায়রুল আলম সবুজের জীবনপাত্র ভরে আছে অসংখ্য মুখ, ঘটনা, নাটক ও গল্পে। একটি লেখায় তা তুলে আনা বা ধারণ করা অসম্ভব। বস্তুত খায়রুল আলম সবুজের জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত হতে পারে একাধিক উপন্যাস, অনেকগুলো নাটক!

মার্চ ২০২৬

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত