৯ মে ২০২৬
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
কামরুল হাসান
কবি ও গদ্যকার
1

কামরুল হাসান
কবি ও গদ্যকার

1

জীবনের মুখগুলি

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমানের সাথে আমার চাক্ষুষ নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক দেখা হয়েছিল তার লেখা ছোটোগল্পের বইয়ের আলোচনা লিখতে গিয়ে। কাজটি আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন প্রথম আলো সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক। সে বছর বইমেলায় প্রকাশিত সেরা ১০ নতুন বইয়ের তালিকায় পাপড়ি রহমানের ‘লখিন্দরের অদৃষ্ট যাত্রা’ বইটি ছিল। আমি তার লেখায় গল্প ও শক্তি দুটোই খুঁজে পাই। নারী লেখক হয়েও, যাকে সমালোচনার ঢঙ্গে বলা হয়, ‘মেয়েলিপনা’, তা নেই তার লেখায়। আমার ওই পজিটিভ আলোচনা ঈর্ষাকাতর করেছিল কিছু সমসাময়িক ছোটোগল্প লেখককে আর আনন্দিত করেছিল পাপড়ি রহমানকে। আমি তার Good Book-এ ঢুকে গিয়েছিলাম।

তাঁর সাথে পরিচয়ের সেই শুরু। এরপর আমরা একসঙ্গে লখনৌতে সার্ক সাহিত্য উৎসবে যাই। সেই প্রথম ঝর্না রহমানের সাথে পরিচয়। পরিচয় করিয়ে দেন পাপড়ি রহমান। নামের শেষাংশের মিল ছাড়াও, দুজনেই কথাসাহিত্যিক, দুজনে ভারি মিল মনের ও গাত্রবর্ণের। লখনৌতে সার্ক সাহিত্য উৎসবটি কখনো ভুলব না। অমন জমজমাট সাহিত্য উৎসব কম দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে একটি বেশ শক্তিশালী ডেলিগেট যোগ দিয়েছিল সে উৎসবে― যাদের ভেতর ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক, মুস্তাফা জামান আব্বাসী, আসমা আব্বাসী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, ফকরুল আলম, শফি আহমেদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, ঝর্না রহমান, পাপড়ি রহমান, আলফ্রেড খোকন, লোপা মমতাজ, মার্জিয়া লিপি প্রমুখ কবি-লেখকগণ।

প্রফেসর নিয়াজ জামানের ‘গাঁথা’র সাথে বেশ কিছুকাল যুক্ত ছিলেন পাপড়ি রহমান। নারী লেখকদের সংগঠন সেটি, কিন্তু কিছু পুরুষ লেখকও যোগ দেন ‘গাঁথা’র অনুষ্ঠানে। তাদের একজন আমি। আমাকে গাঁথার সাথে গেঁথে রাখেন পাপড়ি রহমান। এর অন্যতম কারণ অনুষ্ঠান নিয়ে আমার ধারাবর্ণনা। পরে তিনি দলবল নিয়ে গাঁথা থেকে বেরিয়ে এলে তাকে দেখি বিদ্রোহী নেত্রীর ভূমিকায়। তিনি কেবল লেখেন না, প্রভাবিত করতে পারেন, সংগঠিত করতে পারেন লেখকদের। তার নতুন সংগঠন ‘কালি’র অনুষ্ঠানমালায় আমার কলমের কালি ঝরাতে থাকি। ভারি প্রাণবন্ত হয় অনুষ্ঠানগুলো আর হয় একই ভেন্যু MRK সেন্টারে। সেই একই সেট, জায়গাও এক, মনে হয় কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসিস্ট ভেঙে কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসিস্ট–লেনিনিস্ট হলো।

আমি প্রথম কুড়ি বছর শুধু কবিতা লিখেছি। গত কুড়ি বছর ধরে গদ্য লিখছি মূলত ননফিকশন—ভ্রমণকাহিনি, মুক্তগদ্য, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা ইত্যাদি। একে একে বেরুল পাঁচটি ভ্রমণকাহিনি, পাঁচটি অনুবাদ ও দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ। সময় যত বাড়ল তত লেখার পরিমাণ বাড়ল। টুকরো ভ্রমণ ‘দেখা হইল চক্ষু মেলিয়া’; জীবনকাহিনিভিত্তিক ‘জীবনের মুখগুলো’; সাহিত্য অনুষ্ঠান নিয়ে ‘এই নগরীর যত সাহিত্যবাসর’; বিবাহঅনুষ্ঠান নিয়ে ‘বিবাহকাহিনি’; ভ্রামণিকদের গল্প নিয়ে ‘ব্রেকফাস্ট আড্ডা’, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ‘দিনের কড়চা’ ইত্যাদি নানামুখী লেখা নিয়ে আমি নিজেই বিভ্রান্ত—কোনটি ছেড়ে কোনটি প্রকাশ করব।

জীবনের মুখগুলি, কামরুল হাসান

২০২৩ সালের বইমেলা ফাঁকা চলে গেল এইসব দ্বিধাদ্বন্দ্বে। একটি মূল্যবান বছর হারিয়ে আমি বিষণ্ণ। ২০২৪ এর অবস্থাও ওইরূপ হতো যদি না কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান এগিয়ে এসে আমাকে পরামর্শ দিতেন সাহিত্য অনুষ্ঠান নিয়ে বইটি প্রকাশ করতে। পরিবার পাবলিকেশনসের কর্ণধার তরুণ প্রকাশক শাওনকে আমি চিনতাম না। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন। ২০ ফর্মার গদ্যের বইটি গোছাতে যেটুকু সময়, বইমেলার ব্যস্তসময়ে, আমিই নিয়েছি, বই প্রকাশে শাওন সময় নেয়নি। আমাকে অবাক ও আনন্দিত করে অপ্রত্যাশিত দ্রুততম সময়ে ছাপাখানা থেকে বেরিয়ে এলো ‘এই নগরীর যত সাহিত্যবাসর’।

যাকে দেখানো প্রয়োজন ছিল প্রথমেই সেই পাপড়ি রহমানের কথা আমি যেন ভুলে গেলাম। ‘যাই যাই’ করে যাওয়া হলো না বেশ কটি মাস; অতঃপর কী এক অবরুদ্ধতা জমল, পেরুলো আরও কয়েকটি মাস। আমি ফোন করি না অপরাধবোধে ভুগে, তিনি ফোন করেন না অভিমানে। যা হোক আমার আচরণ ছিল অকৃতজ্ঞের মতো।

সেদিন বৃহস্পতিবার, দেশ যখন অনেক হত্যা-নিপীড়ন, ধ্বংসের তাণ্ডবে শোকাচ্ছন্ন ও বধির; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, বাড়ি থেকে বেরুতে হয় কারফিউর সময়সূচি দেখে তখন চলে গেলাম মিরপুর ৬ নম্বর সেক্টরে তার বাড়িতে। তখন বাজে বেলা এগারোটা, চায়ের আবদার জানাতে আমাকে অনুরোধ করলেন সিঙাড়া নিয়ে যেতে। পাঁচ সিঙাড়া ও পাঁচ সমুচা নিয়ে তিন নম্বর বাড়ির লিফটের তিনে উঠে তার দেখা পেলাম। দরোজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন পাপড়ি রহমান। তার জীবনসঙ্গী হাফিজুর রহমানকেও দেখা গেল নিকটে।

পাপড়ি রহমান সিরিয়াস কথাসাহিত্যিক। তিনি কম লেখেন কিন্তু ভালো লেখেন। জামদানীর তাঁতশিল্পীদের নিয়ে লেখা তার ‘বয়ন’ উপন্যাসটি বিদগ্ধমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি কলকাতা থেকে এর একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ওই একই প্রকাশনী থেকে তার ‘নির্বাচিত গল্প’ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি আনন্দের সঙ্গে যে খবরটি দিলেন তা হলো ‘বয়ন’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। ‘বয়ন’ নিয়ে তোলপাড় হলেও তিনি মনে করেন ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ অধিকতর সমৃদ্ধ উপন্যাস।

তার বসবার ঘরটির এক দেয়ালে নেত্রকোনা সাহিত্য সংসদ প্রদত্ত ‘খালেকদাদ সাহিত্য পুরস্কার’ ঝুলন্ত দেখতে পাই। পাপড়ি রহমানের পুরস্কার প্রাপ্তির ওই অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। ২০২৩ সালে তিনি যখন নেত্রকোণা সাহিত্য সংসদের বসন্তকালীন উৎসবে প্রদত্ত খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন তখন সে উৎসবে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কেবল উৎসবটি উপভোগ করার জন্য নয়, আমি যেন তার জীবনের একটি মূল্যবান পুরস্কার প্রাপ্তির সাক্ষী হই আর তৎসঙ্গে ধারাবর্ণনাটি লিখে রাখি। ‘ওরা ফ্রেমে বাঁধিয়ে দিয়েছিল বলে দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছি’ তার সলজ্জ কথা। আমি তো এতে সলজ্জ হবার কিছু দেখি না। কাছেই নিচু টেবিলে রয়েছে ‘শব্দঘর সাহিত্য পুরস্কার’; সেটিও ফ্রেমে বাঁধানো। আমি তাগিদ দেই সেটি দেয়ালে টাঙিয়ে রাখার।

কালি শক্তির প্রতীক। সে শক্তি পাপড়ি রহমান তার উপন্যাস ও ছোটোগল্পে দেখিয়ে চলেছেন। তার উপন্যাস ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল

মনে আছে আবু রুশদ সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ সৃজনশীল শাখায় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান। পরিচিতিমূলক বর্ণনায় বন্যা রহমান বলেছিলেন, পাপড়ি রহমান তার লেখালেখিতে স্বতন্ত্র একটি ধারা নির্মাণে প্রয়াসী। পুষ্পার্ঘ্য, উত্তরীয়, ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট ও অর্থ গ্রহণের পর প্রতিক্রিয়া জানাতে এসে পাপড়ি রহমান তার সাহিত্যিক জীবনের বিকাশে যে সকল গুণী মানুষেরা ভূমিকা রেখেছেন তাদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করলেন। প্রথনেই এলো তরুণ লেখক প্রকল্পের একজন পরিচালক কবি রফিক আজাদের নাম, যিনি ক্লাসে বলেছিলেন, সাহিত্য করতে আসা অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়ার সমান, কোথায় গিয়ে পড়বেন সাহিত্যিক জানেন না। ১৯৯৭ সালে কথাসাহিত্যিক বশির আল হেলাল তার গল্প নিয়ে একটি মূল্যায়ন করেছিলেন। সতত উৎসাহ জুগিয়েছেন কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, প্রথম গল্প প্রকাশের পর স্নেহভরে ডেকেছিলেন সুব্রত বড়ুয়া, নিরন্তর তার গল্প চেয়ে নিয়ে ছেপেছেন আবুল হাসনাত। তাদের সকলের প্রতি পাপড়ি রহমান কৃতজ্ঞ।

আরও মনে আছে পাঠক সমাবেশের কাটাবন কেন্দ্রে কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘আমার একলা পথের সাথি’ নিয়ে কথা বলছিলেন কবি মৃদুল মাহবুব। মৃদুলের কথা খুব স্পষ্ট, তাতে ভণিতা নেই। তিনি বলেছিলেন, পাপড়ি রহমান নিজেকে দেবতা (এখানে হবে দেবী) করে তোলার চেষ্টা করেননি। তবে তার মধ্যে একটা opportunistic বা সুবিধাবাদী ভঙ্গি আছে। তিনি বড়ো বড়ো সব প্রতিষ্ঠান—বাংলা একাডেমি বা প্রথম আলোর যে পাণ্ডাগিরি তার বিরুদ্ধে নিজের সংক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু সব কথা বলেননি। অর্থাৎ (আপোষের) একটি দরোজা খোলা রেখেছেন। এই গ্রন্থে একটি অনুচ্ছেদে পাপড়ি রহমান আমার সাথে তার সাহিত্যিক পরিচয়ের সূত্র থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের interactions এর একটি মনোগ্রাহী চিত্র এঁকেছেন। ‘আমার একলা পথের সাথি’ নিয়ে আমি তিন পর্বের একটি ধারাবাহিক লিখেছিলাম যা চিরস্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে আছে ‘এই নগরীর যত সাহিত্যবাসর’ গ্রন্থে। আমি তার পরিচালিত গাঁথাকালির কয়েকটি অনুষ্ঠানের বিবরণও গ্রথিত করি ওই নতুন জনরার গ্রন্থটিতে।

কাছের শো-পিস ভরা আলমারিতে তার অর্জন করা কয়েকটি পুরস্কারের ক্রেস্ট। শো-পিসের ভেতর তারা জনারণ্যে সাধারণ, বিশিষ্টজন নন। আমি পরামর্শ দেই একটি কর্নার ফার্নিচার বানিয়ে প্রতি তাকে একটি করে ক্রেস্ট রাখার। তিনি তেমন আগ্রহী নন। বল্লেন, এসব কিছুই থাকবে না, লেখাটাই থাকবে। আম ও পোয়ারা– দুপ্রকার ফল কেটে এনেছেন, সেই দশ সিঙাড়া-সমুচাও আছে, দুই লম্বা মগে দুকাপ চমৎকার রঙের দুধ চা। চায়ের মগ টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, এই মগ যেন লেখার ভেতর থাকে। বুঝলাম আমি একটা টাইপ হয়ে গেছি, আমার কাছে লেখকদের প্রত্যাশাও টিপিক্যাল।

কালি শক্তির প্রতীক। সে শক্তি পাপড়ি রহমান তার উপন্যাস ও ছোটোগল্পে দেখিয়ে চলেছেন। তার উপন্যাস ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ প্রসঙ্গে পাপড়ি রহমান বললেন, এ উপন্যাসের নারীরা একধরণের ধর্মীয় আচার পালন করে। এর নাম তালিম। সে এলাকায় তার একজন মামা থাকেন। মামীও তালিম নেন। উপন্যাসটি লিখতে তার ৩/৪ বছর লেগেছে। তিনি তালিম সদস্যদের সাথে মিশেছেন, তাদের অজস্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, অসংখ্যবার নদী পেরিয়ে ওপাড়ে গিয়েছেন তথ্য সংগ্রহ করতে। পাপড়ি রহমান বললেন, ‘এপাড়ে রাজধানী একরকম, বুড়িগঙ্গা পেরুলেই ভিন্ন এক জগৎ।’

সম্প্রতি তিনি বাংলা একাডেমির একটি শাখা পুরস্কার পেলেন। আশা করি একদিন মূল পুরস্কারটিও পাবেন। কালির কালো রঙের বিপরীতে এই কালোদের দেশে পাপড়ি রহমান একটু অতিরিক্ত ফর্সাই!

১৯ এপ্রিল ২০২৬

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত