২৫ এপ্রিল ২০২৬
নো রয়াল রোড টু রিডিং
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
খান রুহুল রুবেল
কবি ও প্রাবন্ধিক
191

খান রুহুল রুবেল
কবি ও প্রাবন্ধিক

191

নো রয়াল রোড টু রিডিং

বই পড়া তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়, বই যারা পড়েন তারা আদতে বাড়তি কিছুই করেন না, কিংবা বই পড়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে আদতে কিছুই পরিবর্তিত হয় না—এরকম কথা বলবার একটি প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একক কেউ নন, অনেকেই এমন বলছেন, ফলে ধরে নিতে পারি প্রবণতাটা সামষ্টিক। এই গড়পড়তা ধারণা প্রথমত ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে একেবারে ভুল। দ্বিতীয়ত এইরকমের ধারণা কিংবা এইরকম ধারণা করার যে প্রেক্ষাপট, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কেন সে কথা বলার আগে বলি, এই ধরণের কথা শুনলে আমার আরব্য রজনীর একটা পরিচিত গল্প মনে পড়ে। হেকিম দুবান ও সুলতান ইউনানের গল্প। সুলতানের কুষ্ঠরোগ সারিয়ে তুললেন হেকিম। উজীরের ষড়যন্ত্রে সুলতান ভাবলেন—যে হেকিম এই মহারোগ সারিয়ে তুলতে পারে সে চাইলেই সুলতানকে মেরেও ফেলতে পারে। সুলতান হেকিমকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেন। দণ্ড কার্যকর হবার আগে হেকিম একটা পুরনো বই সুলতানকে দিলেন। বললেন, আমার মৃত্যুর পর বইটা পড়বেন, তাহলে আমার কাটা মাথাও কথা বলবে। শিরশ্ছেদ করা হলো। সুলতান বইটা পড়তে গিয়ে দেখেন পাতাগুলো কোণা দিয়ে লেগে আছে আঠায়। জিভে হাত দিয়ে দিয়ে তিনি পাতা ওল্টাতে লাগলেন। পাতাগুলো সাদা। আদতে বইয়ের কোণায় ছিল আঠালো বিষ। ফলে অকৃতজ্ঞ সুলতান মারা যান। হেকিম জ্ঞানী ছিলেন। জ্ঞানীর প্রতিশোধ বই।

বই পড়া আপাতভাবে ব্যক্তিগত বিষয় মনে হতে পারে। এবং সেটা আংশিকভাবে সত্যও। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে বইপড়া ব্যক্তিগত নয়। দুপায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করায় আদি মানুষ অনেকগুলো সুবিধা পেয়েছিল। যা তাকে আলাদা করেছে অন্য প্রাণীদের তুলনায়। আগুন কিংবা চাকার আবিষ্কার, অথবা কৃষির আবিষ্কার নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে ‘ভাষা’। একটা বানর, একটা শিম্পাঞ্জি, একটা হাতি, হরিণ, জেব্রা বা জিরাফের দিকে লক্ষ করুন। আজ থেকে এক লক্ষ বছর আগে জন্ম নেয়া একটি শিম্পাঞ্জি তখনও যে বোধ নিয়ে জন্ম নিত, এখনো তাই। জন্মাবার পর তার জন্মগত কিছু বৈশিষ্ট তাকে বেঁচে থাকতে এবং টিকে থাকতে প্রেরণা দেয়। তার খিদে পায়, আত্মরক্ষা করতে হয়, খাবার সংগ্রহ করতে হয়। একসময় সে মরে যায়। এক লক্ষ বছর পর একটা শিম্পাঞ্জি এখনো ঠিক এই কাজগুলো করে। এবং সম্ভবত আরো কয়েক লক্ষ বছর ধরে এই কাজ করে যাবে। অর্থাৎ, দশ হাজার বছর আগে জন্মানো একটা শিম্পাঞ্জি আর এখনকার একটা শিম্পাঞ্জি আদতে একইরকম। এই কথা প্রাণিজগতের প্রায় সকল প্রাণীর জন্য কমবেশি সত্য। শুধু একটি প্রাণীর জন্য এ কথা সত্য নয়। সেটা মানুষ। কারণ মানুষের ভাষা আছে। এমন নয় যে অন্য প্রাণীরা ভাষা ব্যবহার করে না, কিছু অঙ্গভঙ্গী কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের আওয়াজ দিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে পারে বটে, কিন্তু তাতে খুব কম পরিমাণ তথ্যই বিনিময় করা যায়। কেবল টিকে থাকার স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কাজে সে ভাষা বিশেষ উপযুক্ত নয়। কেবল মানুষেরই রয়েছে এমন এক বিনিময় মাধ্যম যার মাধ্যমে সে তার পূর্বতনদের সকল তথ্য-জ্ঞান-প্রযুক্তি বহন করে পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশিক্ষিত করতে পারে। এজন্য লক্ষ বছর তো অনেক দূরের ব্যাপার, মাত্র বিশ বছর আগে জন্মানো মানবশিশুর বেড়ে ওঠা বিশ বছর পরের মানব শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে অনেক তফাত। প্রতি মুহূর্তে, প্রতি দিনে, প্রতি সপ্তাহে, প্রতি বছরে, প্রতি শতাব্দীতে মানুষ বদলে যাচ্ছে আগের মানুষের থেকে।
এই ভাষাই হচ্ছে মানুষের প্রথম বই। ভাষা এমন এক গ্রন্থ যা সকল মানুষ মিলে একসাথে রচনা করে চলেছে শত সহস্র বছর ধরে।

ভাষার ব্যবহার সভ্যতার ইতিহাসে প্রজাতি হিসেবে মানুষের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আদিতে ভাষা ছিল কেবল শ্রুতি। তখনকার সকল বই শ্রুতিনির্ভর। ধর্মগ্রন্থ, মহাকাব্য, চিকিৎসাপুস্তক, আইনপুস্তক বহুকিছুই শ্রুতি আকারেই বিলি হয়েছে জনপদ থেকে জনপদে। ভাষা ব্যবহারের দ্বিতীয় ও সুন্দরতম বিপ্লব হচ্ছে বর্ণমালা। বর্ণমালা আবিষ্কারের পর থেকে আরহিত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা মনে রাখার কিংবা মুখস্থ রাখার প্রয়োজন গেল কমে। এবং জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে এলো। আপনি যদি বর্ণমালা জানেন, তাহলে বহু বছর আগে লিখিত কিংবা সংরক্ষিত কোনো কিছু অনায়াসেই পড়ে ফেলতে পারবেন। যিনি লিখেছিলেন তার সেখানে হাজির থাকার প্রয়োজন নেই, এমনকি জীবিত থাকারই প্রয়োজন নেই।
মেসোপটেমিয়া, মিশর কিংবা গ্রীসের তুলনায় বৈভবে, ইতিহাসে সীমিত হয়েও অমরত্ব পেয়ে গেছে ফিনিশীয়রা। সুব্যবহার্য বর্ণমালার উদ্ভাবন এই সভ্যতাকে অক্ষয় করেছে।

দুপায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করায় আদি মানুষ অনেকগুলো সুবিধা পেয়েছিল। যা তাকে আলাদা করেছে অন্য প্রাণীদের তুলনায়। আগুন কিংবা চাকার আবিষ্কার, অথবা কৃষির আবিষ্কার নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে ‘ভাষা’

এবার হোজ্জা নাসিরুদ্দীনের কথায় আসা যাক। এটাও জানা গল্প। তার কাছে গিয়ে এক লোক বলল আমার এক আত্মীয় পাশের গ্রামে থাকে। তাকে একখানা চিঠি লিখে দিন। বলা বাহুল্য সে লোক লিখতে জানে না। নাসিরুদ্দীন বললেন আমার পায়ে ব্যথা, লিখতে পারব না। লোকটি বলল পায়ে ব্যাথা তো লিখতে অসুবিধা কী? লিখবেন তো হাতে। নাসিরুদ্দীনের সোজা উত্তর — বাপু যে গাঁয়ে চিঠিখানা যাবে, সেখানে কেউ পড়তে পারে না। তা আমাকেই তো পায়ে হেঁটে চিঠিটা পড়ে দিয়ে আসতে হবে।
এখনকার দিনে নাসিরুদ্দীনের ঝামেলা নিশ্চয়ই কমেছে। এমন গ্রাম আর নেই যেখানে পড়তে পারা লোক নেই। গত শতাব্দীর শেষে, এবং এ শতাব্দীর একেবারে শুরুতেও সাক্ষরতা আন্দোলন ও তাতে সরকারি উদ্যোগ, একটু যারা ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বয়স পার করেছেন, তারা মনে করতে পারবেন। তো, শুধু লিখতে পড়তে পারার যোগ্যতা যদি একটা জনপদকে বদলে ফেলতে পারে, তাহলে বই পড়তে পারাটা আলাদা যোগ্যতা বা দক্ষতা নয় কোন কারণে? আমাদের প্রবাদ প্রবচনে আছে, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে।’ অর্থাৎ সামাজিক বাস্তবতায়ও রয়েছে যে ঠিকঠাক পড়াশোনা করার গুণ বেশ লাভজনক।

বই পড়া কোনোকালেই সর্বৈব মামুলি বা নিরীহ ব্যাপার নয়। এটা একটা দক্ষতা। যেমন সাঁতার কাটা একটা দক্ষতা, সাইকেল চালানো একটা দক্ষতা, পোশাক বানানো একটা দক্ষতা, বাড়ি নির্মাণ একটা দক্ষতা। বই পড়লে জগত উলটে ফেলা যায় না যদি সত্য হয়, সে কথা অন্যসব দক্ষতার ক্ষেত্রেও সত্য। কোনো একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা থাকলে আপনি পৃথিবী পরিবর্তন করে ফেলবেন এমন নাও হতে পারে, কিন্তু যে কোনো উপযুক্ত দক্ষতা আপনাকে বাড়তি কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই দেবে। বরং কিছু কিছু দক্ষতা না থাকলে আপনি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ বা সীমিত হয়ে পড়বেন, ক্ষেত্রবিশেষে বিপদেও পড়বেন।
যেহেতু সাক্ষর লোক মাত্রই আমরা বই পড়তে পারে বলে ধরে নিই, এবং প্রায় সকলেই কমবেশি পড়তে জানেন, তাই এই দক্ষতাকে আমরা আলাদা করে টের পাই না। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও অমন সরল নয়। মোটামুটি পর্যায়ের সাক্ষর হতে, অর্থাৎ সব না হলেও অধিকাংশ বই পড়ার পরিণতি বোধ জোগাড় করতে প্রায় এক যুগ লেগে যায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করাকে যদি ওই পরিণতিবোধ অর্জনের সমতুল্য ধরে নিই। এর থেকে আরো বেশি দক্ষতা অর্জনে লেগে যেতে পারে আরো অনেক বছর। এখন দেখুন তো, পৃথিবীতে টিকে থাকতে আর কোন দক্ষতায় এতটা সময় ব্যয় করতে হয়?
তাছাড়া বই পড়তে পারাটা বা সাক্ষর হতে পারাটাকেই বই পড়ার দক্ষতা ভাবা ভুল। বই ঠিকঠাক পড়তে পারা আরেকটি বিশেষ পর্যায়ের দক্ষতা। ইংরেজি জানলেই শেকসপিয়ার পড়ে ওঠা সম্ভব নয়, পাটিগণিত বা বীজগণিত কিছুটা জানলেই রাসেলের ‘প্রিন্সিপালস অফ ম্যাথেমেটিক্স’ পড়ে আত্মস্থ করার সক্ষমতা জন্মায় না। বহুরকমের বই যারা পড়েন, বহু ধরণের বিদ্যা যারা আত্মস্থ করতে চান, তাঁদের বই পড়ার কৌশল ও নিবেদন গড়পড়তা মানুষের চেয়ে আলাদা। এবং সেসব বই পড়ে বোধ, প্রজ্ঞা নির্মাণ ও পরবর্তীক্ষেত্রে সেটা প্রয়োগের ক্ষমতা অর্জন প্রায় জীবনব্যাপী ব্যাপার। এ ব্যাপারে যারা খুব সফল তাঁদের সংখ্যা হাজার হাজার নয়। ফলে, আমি বই পড়তে পারি মানেই আমি বই পড়ায় অসামান্য দক্ষ বা প্রচুর বই পড়ার সক্ষমতা আমার আপনা-আপনি আছে এই ভাবনা কারো থাকলে সেটা ভ্রান্ত। সমুদ্রের তীরে, পাহাড়ের পথে, বিশেষত শাওয়ারের ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে আপনি গুনগুন করে গান গাইতেই পারেন, কিন্তু সেটা আপনাকে মিয়াঁ তানসেন হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না, এবং আপনি সেটা মনেও করেন না। কিন্তু বই পড়ার ক্ষেত্রে আমরা সকলে ধরে নিই, আমি সম্ভবত বই পড়ার ক্ষেত্রে দক্ষ। বই কিভাবে পড়তে হয়, সেটা স্বয়ং আলাদা একটা শাস্ত্রও বটে। হালে এ বিষয়ে বইপত্র আমাজনে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ বই কিভাবে পড়ে তার ওপরে বই।

রাজা টলেমি মহান ইউক্লিডকে বলেছিলেন, আমি জ্যামিতি শিখতে চাই। জ্যামিতি শেখার যদি একটা সহজ রাস্তা আমাকে বাতলে দিতেন…। ইউক্লিড বললেন “there is no Royal Road to geometry”। জ্যামিতি শেখার কোনো রাজকীয় আরামদায়ক পথ নেই। গল্পটা অন্যদের নামেও প্রচলিত। কিন্তু কথা একটাই, দেয়ার ইজ নো রয়েল রোড… কোনো রেশম পথ আপনার জন্য অপেক্ষা করে নেই।

“প্রতিটি দগ্ধ গ্রন্থ সভ্যতাকে নতুন আলো দেয়”, এই মত হুমায়ূন আজাদের। বই পড়ার এবং লেখার ইতিহাস এমনই অগ্নিগর্ভ। বই লেখা ও পড়ার জন্য পুড়ে যেতে হয়েছে বহু মহৎ ও মামুলি মানুষকে। পাণ্ডুলিপির শরীরে পাতায় পাতায় লেগে আছে বহু শতাব্দীর রক্তের দাগ। বই এতটাই ক্ষমতাবান যে ঈশ্বরকেও বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকতে হয়। আদিগ্রন্থ যদি ঐশ্বরিক হয়, তাহলে আদি লেখকও তিনি।
বই পড়ে জগৎ উলটে ফেলা যায় কিনা, সে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে দেখি। সকল সময় না গেলেও বই পড়ে ও লিখে সত্যিই জগত উলটে ফেলা গেছে। ১৬৬৪ সালে মহামারীর প্রাদুর্ভাবে কেমব্রিজ ছেড়ে গ্রামে চলে গেলেন এক খ্যাপাটে আত্মমগ্ন তরুণ, সেখানে বসে যে বই লেখার সূচনা সেটা প্রকাশ পেল ২৩ বছর পরে, আইজ্যাক নিউটন নামক তরুণের লেখা বইটির সংক্ষিপ্ত নাম প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা; কিংবা ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ডের ডেভেনপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে বেরিয়ে ১৮৩৬ সালে ফিরে আসা জাহাজ বিগল, যাতে ছিলেন ভূতত্বে কৌতূহলী প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন নামক যুবা, ফিরে এসে তিনি লিখলেন ভয়েজ অফ বিগল, বিগল যাত্রীর ভ্রমণকথা; কিংবা অফিস ফেরতা এক ক্লান্ত কেরানি, যার কাছে প্রিয় ও পবিত্র বই ইউক্লিডের এলিমেন্টস, ১৯০৫ সালে একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে জার্মানীর প্রথিতযশা গবেষণা সাময়িকীতে কুরিয়ার করবেন চারটি গবেষণাপত্র, পরবর্তীকালে সেসব ঘষামাজা করে বই হয়ে বেরোবে, ঠিক ১৬ বছর পরে নোবেল পাওয়ার পর যিনি জানাবেন জুতো সেলাইয়ের কাজের জন্য নোবেল না দিলেও পারত, যিনি শার্লক হোমসের পর সবথেকে বিখ্যাত শৌখিন বেহালাবাদক, ১৯১৬ সালে লিখেছিলেন Relativity: the special and the general theory, হিটলারের তাড়া খাওয়া লোকটির নাম অ্যালবার্ট আইনস্টাইন; কিংবা আরেক জার্মান দাড়িওয়ালা, ১৮৬৭ থেকে ১৮৯৪ পর্যন্ত তিন খণ্ডে প্রকাশিত একটা বই লিখলেন, নাম দিলেন দাস ক্যাপিটাল, পুঁজি, বই লিখতে লিখতে ভাবছিলেন যতগুলো চুরুট ধ্বংস হয়েছে বই বেচে তো সে পয়সাই উঠবে না, এবং বইয়ের সবগুলো খণ্ড প্রকাশিত হবার আগেই ও চুরুটের পয়সা না উসুল করেই ১৮৮৩ সালে লন্ডনে কার্ল মার্ক্স নামে তিনি সমাহিত হন। এখানে যে চারটি বইয়ের কথা বলা হয়েছে, এই বইগুলো লেখা বা পড়ার পর পৃথিবী আর আগের মতো থাকেনি। আগের মতো থাকা সম্ভব ছিল না। কথা হচ্ছে এমন বইয়ের সংখ্যা কিন্তু এই চারটিই নয়। হয়তো চারশো, হয়তো চার হাজার হওয়াও বিচিত্র নয়।

বই পড়া কোনোকালেই সর্বৈব মামুলি বা নিরীহ ব্যাপার নয়। এটা একটা দক্ষতা। যেমন সাঁতার কাটা একটা দক্ষতা, সাইকেল চালানো একটা দক্ষতা, পোশাক বানানো একটা দক্ষতা, বাড়ি নির্মাণ একটা দক্ষতা। বই পড়লে জগত উলটে ফেলা যায় না যদি সত্য হয়, সে কথা অন্যসব দক্ষতার ক্ষেত্রেও সত্য

কি হবে বই পড়ে যদি বই পড়ে পড়ে ভালো মানুষ না হওয়া যায়? কিংবা বই পড়া লোকেরা অহংকারী অতএব খারাপ লোক…। বই পড়ে কেউ ভালো মানুষ হবেনই এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার বই না পড়লেও যে ভালো মানুষ হবেন এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে বই পড়লে কতগুলো অসাধারণ বোধ ও সক্ষমতা তৈরি হতে পারে, যেটা বই না পড়লে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু অহংবোধ তৈরি হওয়া নিয়ে মনে হয় দু’কথা বলা যায়। এ দেশে রাস্তাঘাটে, হাটে-মাঠে-ঘাটে-অফিসে-বাজারে আমরা প্রচুর দুর্বিনীত বা অহমবোধ সম্পন্ন লোকজন দেখি। এ দেশে বইপড়া লোক খুব বেশি নই, বইপড়ার চল এদেশে সামান্যই। এই লোকগুলো বই না পড়েই দাম্ভিক হয়েছেন। বইপড়া লোকমাত্রই দাম্ভিক কিনা, এমন ধারণার পেছনে বোধ হয় কারণ আছে। জ্ঞানের একটা বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে সে নতুন ধারণা তৈরি করতে চায়, কিংবা প্রচলিত বিষয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। হাঁটু মুড়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে আহত নিগৃহীত গ্যালিলিওর ভাষায় ফিসফিস করে বলে —E pur si muove, তবুও পৃথিবীই ঘোরে (সূর্য নয়)। সম্মিলিত জনতার বিপরীতে এই বিরুদ্ধমতের অভ্যাস অনেক সময় দম্ভের মতো মনে হয়। বই পড়া দাম্ভিক লোক কম নয় নিশ্চয়ই। কিন্তু তিনি বই পড়েই দাম্ভিক হয়েছেন, এমন না-ও হতে পারেন। তাছাড়া এ দেশে আরেকটা সংকট খুব প্রবল। যিনি জানেন, তিনি যদি অনবগত ব্যক্তিকে জ্ঞাত করতে চান, তাহলে অনবগত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রেই আহত বোধ করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি যে জানেন না এটা স্বীকার করতে চান না। ফলে, সম্মুখের অবগত লোকটির বিদ্যা অনবগত লোকের কাছে অহম হিসেবে চিহ্নিত হয়।

যা হোক, প্রথমেই বলেছিলাম বই পড়াকে মামুলি বিষয় মনে করা, আলাদা করে এটাকে কোনো সক্ষমতা মনে না করা খুবই বিপজ্জনক ধারণা। এ কারণে বিপজ্জনক যে আমাদের ঢাকায় (ঢাকা বলতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি অর্থে আবার ঢাকা শহর অর্থেও, ঢাকার বাইরে এই প্রবণতা আমি কম দেখেছি) অনেক ক্ষেত্রেই কোনো কিছু শেখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়। এখানে অনেকেই লেখেন, যারা বাংলা ভাষাটা ঠিকঠাক জানেন না। অনেকেই এমন সব বিষয়ে বলেন, যে বিষয়ে তার আদতে প্রাথমিক ধারণাও নেই। বানান, ব্যকরণ, ভাষা না জানা এখানে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। না জানা ও না চেনা এখানে জনপ্রিয় হবার জন্য জরুরি। এই সামাজিক মাধ্যমেই আপনারা দেখবেন, ‘না জানা’ যোগ্যতায় অনেকেই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিন্তক’ হিসবে মর্যাদা পাচ্ছেন। না জানা অবশ্যই সীমাবদ্ধতা, তবে না জানা কোনো অন্যায় নয়। কিন্তু জানার প্রয়োজন নেই, শিখে আসার প্রয়োজন নেই, এমন ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করা, এবং অজ্ঞতাকে মহিমান্বিত করা রীতিমতো অপরাধ।
এখানে সৃজনশীল কাজ করা অনেকেই মনে করেন কাঠামোবদ্ধ পড়াশোনা করা লোকেরা অপ্রয়োজনীয়। পৃথিবী ও পরিপার্শ্ব সম্বন্ধে তাদের প্রাথমিক জ্ঞানও অনুপস্থিত। আপনি কাতল মাছ চেনেন না খুব ভালো কথা, কিন্তু কাতল মাছকে জাতীয় মাছ হিসেবে রচনা লিখলে সেটা খুব সুখকর বিষয় নয়। এবং যিনি কাতল মাছ ও ইলিশ মাছ দুটোই চেনেন এবং ইলিশ মাছকে জাতীয় মাছ হিসেবে জানেন, তার এই জানাটাকে তুচ্ছ করাটা অপরাধ। এই জিনিস এ দেশে ঘটে। যারা অভিজ্ঞ আছেন তারা জানেন। ফলে বইপড়ার দক্ষতাকে গুরুত্বহীন ভাবা কিংবা অপ্রয়োজনীয় করে তোলা পরোক্ষভাবে ওই অজ্ঞতাবান্ধব গোষ্ঠীকে পুষ্টি জোগাতে পারে।

তাহলে বই পড়া লোকদের নিয়ে আমরা কী করব? এ বিষয়ে সবথেকে লাভজনক সমাধান দিচ্ছেন স্বয়ং মুজতবা আলী। আরব পণ্ডিতের কাছ থেকে ধার করে তিনি লিখছেন—

‘ধনীরা বলে, পয়সা কামানো দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কর্ম কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন, না, জ্ঞানার্জন সবচেয়ে শক্ত কাজ। এখন প্রশ্ন, কার দাবিটা ঠিক, ধনীর না জ্ঞানীর? আমি নিজে জ্ঞানের সন্ধানে ফিরি, কাজেই আমার পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ করেছি, সেইটে আমি বিচক্ষণজনের চক্ষুগোচর করতে চাই। ধনীর মেহন্নতের ফল হলো টাকা। সে ফল যদি কেউ জ্ঞানীর হাতে তুলে দেয়, তবে তিনি সেটা পরমানন্দে কাজে লাগান এবং শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, জ্ঞানীরা পয়সা পেলে খরচ করতে পারেন ধনীদের চেয়ে অনেক ভালো পথে, ঢের উত্তম পদ্ধতিতে। পক্ষান্তরে, জ্ঞানচর্চার ফল সঞ্চিত থাকে পুস্তকরাজিতে এবং সে ফল ধনীদের হাতে গায়ে পড়ে তুলে ধরলেও তারা তার ব্যবহার করতে জানে না। বই পড়তে পারে না।’

অর্থাৎ যারা বই পড়ে তাদের টাকা পয়সা দিয়ে দাও, খরচ করুক। আমি বই পড়ি না, ফলে মুজতবার ব্যবস্থাপত্রে অর্থযোগের সম্ভাবনা আমার নেই। এই ব্যবস্থায় মুশকিলও আছে। জ্ঞানী ব্যক্তি উত্তম পন্থায় খরচের উপায় জানতে পারেন, আবার সবথেকে খারাপ উপায়ে আত্মসাৎ করার উপায়ও তিনিই জানেন।
যা হোক, বই পড়ে অর্থলাভ হোক বা না হোক, একটা ব্যাপার কিন্ত হয়। এবার ফেরত যেতে হচ্ছে সক্রেটিসের কাছে। তিনি বলছেন ‘আমি জানি যে আমি জানি না’। বই পড়ার এই এক মস্ত লাভ, যিনি পড়ুয়া তিনি জানেন যে তিনি জানেন না। বই যিনি পড়েন না, তিনি জানেন না যে তিনি জানেন না।
জানা ভালো নাকি না জানা সে খবর অবশ্য আমি নিজেও জানি না। আমি নিজে বই তেমন পড়ি না। যারা পড়েন, তাঁদের আমি ঈর্ষা করি এবং প্রার্থনা করি আমার ঈর্ষা করার যোগ্যতাটুকু যেন বজায় থাকে।

পুনশ্চ: বিশ্ব বই দিবসে বই নিয়ে প্রচুর সুন্দর কথা পড়েছি ও বন্ধুদের বইয়ের ছবিপত্র দেখেছি। আমি বরং একটা সিনেমার খবর দিই। অনেকেই দেখেছেন। স্টিভেন ডাল্ড্রি পরিচালিত দ্য রিডার (২০০৮)। পড়বার আকাঙ্ক্ষা, শোনার আকাঙ্ক্ষা, তা থেকে এক অসম অপূর্ণ প্রেম, কর্তব্যবোধ ও ন্যায়বোধের দ্বন্দ্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কয়েজন মানুষের জীবন। সেলুলয়েডে এক অসামান্য নির্মাণ। সিনেমাটা অর্থাৎ বইটা তৈরিও হয়েছে আরেকটা বই থেকে। একটা জার্মান উপন্যাস। কেট উইন্সলেট বোধ হয় তার অভিনয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন এই সিনেমায়। সতর্কতা এই যে, সিনেমাটা বড়দের। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্কদের এবং প্রাপ্তমনস্কদের। ছোটোদের বই পড়া শেখাতে না দেখানোই ভালো।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত