১০ মে ২০২৬
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
হারুন রশিদ
গল্পকার
3

হারুন রশিদ
গল্পকার

3

কিশোর বেলায় কমিউনিস্ট হবার নেশায়

রাত প্রায় বারোটা, ঘুটঘুটে আন্ধার। আব্দার মাস্টারদের বাগান থেকে বনবিড়াল মাপ মাপ করে ডাকছে। খুপির মোরগমুরগি ভয়ে ডানা ঝাপটা দিল। বনবিড়ালের ডাকে বুকের ভিতর কেমন হিম মেরে আসে। বাড়ির সবাই ঘুমায়ে গেছে। আমি হেরিকেনের আলোয় আদোচালা গোলপাতার ছাউনির ঘরে একা একা ছোটদের অর্থনীতি হাভাতের মতো গিলছি। দুইদিন আগে কলেজে ক্লাসে বেঞ্চির তলা দিয়ে দীপক আমারে বইটা পড়তে দিছে। ও বইটা ইন্ডিয়া থেকে ওর মাসির বাড়ি থেকে এনেছে। ও আমারে বলেছে আর কাউরে দেখাবি না। একদম গোপন।

বইটা বিকেল থেকে পড়তেছি। একবার শেষ করে আবার পড়ছি। কঠিন কঠিন সব দাঁতভাঙ্গা শব্দ। পুঁজিবাদী উৎপাদন, সাম্রাজ্যবাদ। কিছুই ভালো বুঝি না। তবু এই বই পড়ে আমি গরম খেতে থাকি। বাইরে মানিক মোল্লার কালা গোগা কুকুরটা ডাকাডাকি করছে। জোরে জোরে ঘেউঘেউ করছে। বাড়ির সবাই ঘুম। মোল্লাবাড়ির এই তল্লাটের সবাই ঘুম। সন্ধ্যার পর খেয়েদেয়ে সবাই চেরাগ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। আমি বাড়ি আসলে রাত জেগে পড়ি। এতোকাল পড়েছি দস্যু বাহারাম, বনহুর, দেবদাস, আনোয়ারা, মনোয়ারা, ব্যাথার দান, প্রেমের জোয়ার। এখন পড়তেছি রাজনীতি নিয়ে বই। শরীরের ভিতর আলাদা অনুভব। বুকের ভিতর আগুন।

কুকুরটার ডাক বেড়ে গেলো। একবার ভাবি সুপারি চোর এলো নাকি। এমনিতে মোল্লাবাড়ি কোনো চোর আসে না। সবাই ঘরের দরজা হাট করে খুলে রেখে ঘুমায়। মোল্লাবাড়ি ঘন বসতি।

আমি হেরিকেন নিয়ে বাইরে এসে আমাদের লিচুগাছতলায় দাড়াই।

বড়ো একটা কালো মটকি কাঁন্ধে করে সাঈদ হাফাতে হাফাতে এসে বলে, তাড়াতাড়ি ধর। মটকি ধরে মাটিতে নামায়ে দে। আমি একা পারবো না। মেলা ভার। সাঈদ খালি গায়ে লুঙ্গি কাছা মারা। সে খুব হাফাচ্ছে।

আমারতো আক্কেলগুড়ুম। সাঈদ এবার মেট্টিক ফেল করেছে ইংরেজিতে। ইংরেজি সেকেন্ড পেপার সাবজেক্টের পরীক্ষা হবে তা সে জানতো না। এজন্য সে আমাকে কয়েকবার দোষারোপ করে বলেছে, তুই আমারে ইংলিশ সেকেন্ড পেপারের কথাতো কোনোদিন বলিসনি। সে আবার পরীক্ষা দিবে। খুবই ডানপিটে। তাকে দেখলে আমার দাদি খেঁকিয়ে ওঠে। তবু সে আমার খুব জানিবন্ধু।

সাঈদ ও তার কাঁধের প্রকাণ্ড ভারী মটকি দেখে আমার বুকের ভিতর ধুকধুকানি শুরু হলো। আমি ভাবছি কী কেলেঙ্কারি কাণ্ড আবার ঘটে। এর আগেও অনেক কাণ্ড সে ঘটিয়েছে। একবার ফকরুলের মা মানে তার ফুপুর বাঁশের খুটির ফোকরে জমানো টাকা খুটি কেটে নিয়ে এসে আমার কাছে রেখেছিলো।

আমি মটকি ধরে নামাতে হাত লাগাই। দেখি মটকি ভর্তি ধান। কালো শ্যাওলা ধরা কুচকুচে।
— আমি বললাম কার ধান চুরি করিছিস?
— আরে আমাগে বীজধানের মাইট। পরের ধান না, নিজিগে। মুরগির খুপির উপর ছেলো।
— কি এরবি এই ধান?
— বেচতি হবে। তুই যে কইলি টাকা লাগবে বই কিনতি হবে। রাজনীতি শিখতি হলি বই কেনা লাগবে। তোর কাছে তো টাহা নেই। তাই এই কাজ করলাম।
— তা ধান চুরি এরবি? তাও বাড়ির ধান?
— তুই এই কয়দিন কী বুঝোলি। গরীব বড়োলোক সব সমান করতি হবে। মোজাম হাজি, জামাল মাতব্বরগে শত শত বিঘে জমি। আর মাছো ডাঙা, মাটাম, নমোডাঙার মানুষ না খায়ে শুটকো মারে যাচ্ছে। এল্লা বুড়ির যুবতী মায়েডারে গায়েব করে দেলো।
— তাতো সত্যি। বড়লোকদের শায়েস্তা করতি হবে। খালিদ ভাইগে পার্টি করতি হবে।
— আমিও পার্টির কাজ আরম্ভ করে দিছি।
— বই কেনার টাকা লাগবে তা ঠিক আছে। তা ধান চুরি করে?
— আরে থাম নিজিগে ধান, পরেরতো আর না। পানি খাবো, গলা সুখোয় গেছে। তাড়াতাড়ি পানি আন।

আমি তারে কাসার গ্লাসে করে পানি এনে দিলাম। ঢকঢক করে খেয়ে বললো— কী সিগারেট আছে তোর কাছে, বগলা না স্টার?
আমি একটা স্টার সিগারেট জ্বালায়ে কয়েক কষা টান দিয়ে তারে দিলাম।
আমি ভয়ে আছি। মা, দাদিমা যদি জেগে ওঠে তাহলে নির্ঘাত চুরি কেচ। ভারী একটা ফ্যাকড়ামাইছিং।

আমি সাঈদকে বললাম ধান কোথায় রাখবি?
সে ধানগুলি বস্তায় ভরে আমার খাটের নীচে ঠেলে দিয়ে তারপর বললো— কাল রাতে মোসলেম সর্দার আসে নিয়ে যাবেনে। চিন্তা করিসনে।
— মা যদি দেহে ফেলে?
— আরে না আমি আগে আসবানে। তোর দাদিরে কবানে তোর কাছে ট্রানস্লেসন করতি আইছি।
— তা ফাংশনাল ইংলিশ আর খাতা বগলদাবা করে নিয়ে আসবি।
— তা আনবো কি এরে! ফাংশনাল ইংলিশ হাটখোলায় ছালাম খাঁর দোকানে বন্ধক রাখিছিলাম বিড়ি-সিগারেট কিনতি। এই জন্যিতো ইংরেজিতে ফেল মারিছি।
— তুই একদম বেদের বাইর। বিড়ি খাতি বই দিস বন্ধক। এক কাজ করবি মোটা যেকোনো একখান বই আর খাতা নিয়ে আসবি। আমার দাদি কী ন্যারেশন-কারেকশন উল্টোয় দ্যাখবে নাকি?
— বুড়ি এসব বোঝবে না। খালি আমারে মোটে দেখতি পারে না। কাল রাতি মোসলেম সর্দারের কাছে ধান ব্যাচবো।
— ও তোগে বাড়ির পিছনের কান্দর দিয়ে আসবেনে। আগে টাকা নেবো পরে ধান। একদম নগদছগদ। ও হারামজাদা ধানাইবাজ । খালি মিঠে কথার গাইড় মারে। টাকা না দিয়ে ধান নিতি চেষ্টা এরতি পারে। আমার সাথে এসব টাল্টুবাল্টু চলবেনানে।

আমি শিহরিত হতে থাকি। আরো আগ্রহ জাগে। গোপন জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। আমার চোখে তখন সূর্যসেন, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা জ্বলজ্বল করছে। উত্তেজনায় আমার মুত চলে আসে। হাত দিয়ে নুনু চেপে রাখি

সাঈদ বস্তার থেকে কিছু ধান লুঙ্গীর কোরসে করে নিলো। এবার খালি মটকি কাঁধে নিয়ে বের হলো।
আমি তার সাথে বাইরে বের হলাম। কুকুরটা এসে গা ঘেঁষে হাঁটছে। নারকেল গাছ থেকে একটা বাদুর পতপত করে উড়ে যায়।
দুইজনে গায়ে গায়ে হাঁটছি।
— সাঈদ বলে, মটকির মধ্যি তুষ দিয়ে উপরে এই কয়ডা ধান ভরে দেবো। তারপরে মালসা দিয়ে ঢাকে রাখবানে।
— তোর মা টের পাবে না?
— আরে ম্যাজিক খেলা দেখিসনি। আমাগে নমোডাঙ্গার সুধন্য ডাকাত ম্যাজিক দেখানোর সময় কী কয় জানিস?
— তুই ক কী কয়?
— ম্যাজিক ইজ নাথিং বাট হ্যান্ডট্রিক্স। এসব হলো হাতসাফাই বুঝলি। কাল কি কলেজে যাবি?
— যাবো। খালিদ ভাইদের কাচারি ঘরে আমাগে ছাত্র ইউনিয়নের মিটিং আছে।
— রাত্রি খুলনেয় থাকিবি না বেলা থাকতি বাড়ি চলে আসবি?
— দেখি কি করি এখন কতি পারতিছি না। যদি রাত হয় খুল্লেয় নানাবাড়ি থাকপো

দুই.
আমি এবার আযম খান কমার্স কলেজে ফাস্ট ইয়ারে। কলেজ নির্বাচন শেষ। নির্বাচনে আমি গ্রাম্য বড়ভাই সোবহান গোলদারের পক্ষে কাজ করেছি। সে ছাত্রলীগের। ভিপিতে এবার সে-ই জিতেছে। কিছুদিন হলো আমি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছি। কলেজের সামনে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা খালিদভাইদের বাড়ি। তার ছোটভাই ওলিদ আমার মডেল ইশকুলের বন্ধু। তাই আগের থেকে চেনাজানা ছিল। গরীব বড়লোক সমান বানাবে এইকথা শুনে আমি খালিদ ভাইদের দলে ভিড়িছি। সোবহান ভাইরা কয় সিক্স পয়েন্ট, প্যারোটি। এসব মনে ধরেনি। তাই তার চোখ ফাঁকি দিয়ে কমিউনিস্ট হবার পায়তারা করতিছি।

খালিদ ভাইদের একতলা বাড়ির পাশে একটা কাচারি ঘর। দোচালা গোলের ছাউনি। একপাশে একটা বালির বস্তা ঝুলানো। খালিদভাই, বাচ্চুভাই, মঈন সর্দার আরো কয়েকজন বস্তায় ঘুসি মেরে বক্সিং শেখে। একখান বাংলা খাট, মাদুর বিছানো। দুইখানা হাফ বেঞ্চ। সেখানে আমাদের মিটিং হয়। খালিদভাই, বাচ্চুভাই, রসিদ ভাই দুইদিন আমাদের সাথে আলোচনা করেছে। লেনিন, কার্ল মার্ক্স, গোর্কি অনেক নাম জানতে পারলাম। ধনীদের শোষনের কথা। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অনেক কথা। লেনিন রাশিয়ার বড়লোকদের তাড়িয়ে গরীবের রাষ্ট্র কিভাবে বানাইছে সেসব কাহিনি। এইসব কথা শুনলি গায়ের রক্ত গরম হয়ে যায়। খালিদভাই আমাদের সবাইকে একটা বই কিনতে বললেন, মার্ক্স এঙ্গেলসের লেখা। বইটার নাম কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। বইটা পিকচার প্যালেস মোড়ে কারেন্ট বুকস্টল বা রেলওয়ে স্টেশনের বইয়ের স্টলে পাওয়া যাবে। দাম মাত্র বারো আনা।

মিটিং থেকে কলেজে ফিরে আসার পথে ফজলু কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে, লিয়াকত ভাইদের কাছে বেশি ঘেষবিনা। ওরা হচ্ছে সব গ্যাড়গেড়ে কোম্পানি।
— গ্যাড়গেড়ে মানে?
— হঠকারী। ওরা হচ্ছে পিকিংপন্থী।
— ফজলু, সেইডা আবার কি?
— তুই নতুন আমাদের দলে ভিড়িছিস। কেবলতো নুলেবাছুর। শোন আমি ক্লাস নাইন থেকে খালিদ ভাইয়ের ক্যাডার।
— তা ভালোতো। আমারে শেখায়ে পড়ায়ে নিবি। দেখিস আমিও ঠিক পারবো।
— তুই লিয়াকত ভাই, মজিদ মল্লিক ওগে সাথে এতো কী গুজুরগুজুর ফুসুরফাসুর করিস?
— সিনিয়র ভাইরা ডাকে তাই যাই, তারাওতো ছাত্র ইউনিয়ন।
— শোন আমরা হচ্ছি অরজিনাল। কমরেড লেনিন আর রাশিয়ার পথ হচ্ছে আসল পথ।
— আর মজিদ মল্লিক, লিয়াকত ভাইরা?
— সব নকল। ওরা আইয়ুব খানের চামচা।

আমার মাথা ঘুরে এলো। কিছুই বুঝতেছি না। লিয়াকত ভাইয়ের বগলে দেখি কার্লমার্ক্সের একখান মোটা ইংরেজি বই।
খুব তেজস্বি বক্তা। ভিপি পদে মাত্র এক ভোটে হেরে গেছেন। আমাকে দেখলে জড়িয়ে ধরেন। সাহীন হোটেলে তাদের মিটিংয়ে আমারে যেতেও বলেছেন। তাদের দলবল বেশ তেজী। সব কেমন গরম ভাব।
— তাহলে কী করবো ফজলু?
— শোন তোরে সত্যি কথা কই। ছাত্র ইউনিয়ন দুই ভাগ হইছে। আমাদের নেতা অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী।
— খবরদার মেনন গ্রুপের কাছে ভিড়বিনে। ওরা নারোদনিক বাম হটকারী।

আমি বালের মাথা কিছুই বুঝলাম না। শুধু মাথা কাত করে বললাম ঠিক আছে।
বিজনেস মেথড ক্লাস শেষ হবার পর কলেজ ক্যাফেটেরিয়ায় চা খেতে যাই। সেখানে দেখা হয়ে যায় দলবল পরিবৃত সদ্য নির্বাচিত আমার এলাকার সিনিয়র ভাই ছাত্র সংসদ ভিপি আব্দুস সোবাহান গোলদারের সাথে। সেখানে প্রাক্তন ভিপি ইউসুফ ভাইও আছে।

তিনি একপ্রকার ছো মেরে হাত ধরে বাইরে একটা নারকেলগাছের নিচে আমাকে নিয়ে আসেন। তারপর কাঁধের উপর হাত রেখে বলেন, ভাইডি তোমারে আমি জাবসোর হাট থেকে ডাকে এনে কমার্স কলেজে ভর্তি করালাম। কাকা তোমারে আমার উপর সোপর্দ করে দেলো। তুমি আমার ইলেকশন করলে। তা এখন আবার খালিদগে দলে ভিড়িছো।
— ভিড়লাম কই? ঐ তারগে মিটিংয়ে যাই। সমাজতন্ত্রের কথা শুনি। আপনারা কি সিক্স পয়েন্ট কন আমিতা ভালো বুঝিনে। তারাতো কয় রাশিয়ার মতো সমাজতন্ত্র কায়েম করতি হবে।
— আরে রাহো তোমার সমাজতন্ত্র। সব নাফরমানি কাজ। শোনো ভাইডি ওরাতো ঐক্য ঐক্য করে চ্যাঁচায়। ঐক্যের এখন পোঙায় বাঁশ। একদিকে মতিয়া আর অন্যদিকে মেনন। আর আমরা ছাত্রলীগ এক আছি।
— ভাই মতিয়া আপাতো অগ্নিকন্যা।
— কিসের অগ্নিকন্যা? আগুন নিভে যাবে। খালিদ একটা গুণ্ডা। ওর বাপ, মামু সব মুসলিম লীগ।
— তাতে কী, খালিদভাইতো আর মুসলিম লীগ করে না। তাছাড়া খালিদ ভাইয়ের ছোটভাই ওলিদ আমার ইশকুল জীবনের বন্ধু। আমি আগেরতে খালিদভাইরে চিনি।
— শোনো ভাইডি, তুমি জিহুত মানুষ। এখনো আক্কেল দাঁত উঠিনি। ওরা তোমারে নিয়ে কালি মন্দিরে আমাবশ্যার ঘোর আন্ধারে রাত দুপোরে নিয়ে সফত করাবে।
— কী সফত করাবে?
— সব গোপন ব্যাপার, বুঝলে ভাইডি। একদম আন্ডারগ্রাউন্ড। সব মুখ বান্ধা, কাউরে চিনতি পারবা না।

আমি শিহরিত হতে থাকি। আরো আগ্রহ জাগে। গোপন জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। আমার চোখে তখন সূর্যসেন, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা জ্বলজ্বল করছে। উত্তেজনায় আমার মুত চলে আসে। হাত দিয়ে নুনু চেপে রাখি।

— গভীর রাতে এক বাগানের ভিতর নিয়ে তোমারে অস্ত্র দিয়ে কবে, যাও ওমক বড়োলোকরে গুলি মারে আসো। বুইছো। এইভাবে তোমার পরীক্ষা নেবে। তারপরে তোমারে কমিউনিস্ট বানাবে। তোমার ল্যাখাপড়া শ্যাষ। আমি তোমার আব্বারে কী জবাব দেবো তহন? তুমিতো বিএল কলেজে ভর্তি হচ্ছিলে আমি তোমারে কন্সেশন করে কমার্স কলেজে ভর্তি করায়লাম।
— ভাই ওরা কি খালি বড়োলোকগে মারতি কবে?
— কবে তা শুধু মিয়াগেই মারবে। মশাইগে কিছু কবে না। আর তোমারে বুঝাবে আল্লা খোদা কেউ নেই। নামাজ রোজা ফালতু কাজ। আর কবে আদম-হাওয়া সব ভুয়া। মানুষ বানরেরতে হইছে।

রাখালরা চার পাঁচজন চলে এলো। গরুদের তেঁতুল গাছের কাছে জড়ো করা হলো। বেশ মজমা মজমা ভাব। যেমন কোর্টের সামনে ধ্বজ্বভঙ্গের ঔষধ বেঁচার মজমা হয় সেইরকম। আমি ভাষণ শুরু করলাম। বেশ উচুস্বরে গলা কাঁপিয়ে। প্রিয় রাখালভাইয়েরা, আমার বন্ধুরা ও গরু ভাইবোনেরা

এই কথা শুনে কমিউনিস্টদের পরে আরো আকর্ষণ বেড়ে গেলো। আমার কান গরম হতে থাকে।
— সোবহান ভাই আমি যাই, আমার পেচ্ছাব চাপিছে। পরে আপনার সাথে দেখা করবো।
— যাও। সময় করে আমার হোস্টেলে দ্যাখা করবা। আর এট্টা কথা কই, তোমারে হাফ ফ্রি করাতি পারি কিনা সেইডা দেখবানে। তুমি আমার এলাকার ছোটভাই। আরে আমিতো এখন কলেজের ভিপি। আমার একটা পাওয়ার আছে না।

তিন.
করেন্ট বুকস্টল, রেল স্টেশনে কোথাও মার্কস এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার বইটা পেলাম না। যা আইছিলো সব বিক্রিবাটা শেষ।
সাঈদ বললো— তাহলি কী পড়ব আমরা? কমিউনিস্ট হতি গেলিতো এই বই পড়া লাগবে সেই কথা খালিদ ভাই সেদিন কয়ে দেলো।
— খুলনা রেলস্টেশনের এক বইয়ের দোকানদার সেদিন আমারে কইছে তারগে যশোর রেল স্টেশনে আর একটা বইয়ের দোকান আছে। সেই দোকানে এই বইডা পাওয়া যাবে। আরো ম্যালা বই আছে। সে একখান চোথা লিখে আমারে দিছে।
— কই দেহি কিরম চোথা? সাঈদ চোথা দেখতে চায়।
— এইডে দ্যাখালি দাম এট্টু কন্সেশন করবেনে। বই পড়ে আগে সব বোঝবো।
— কী বুঝবি?
— কী করে বড়োলোকদের শায়েস্তা করতি হবে। তারগে জমিজমা বিলিবাট করতি হবে। গরীবগুরোগে নিয়ে কী করে দল বান্ধবো।
সাঈদ বলে— কারগে দলে নিতি হবে একটু ক দি।
— দক্ষিণডাঙার আনসার মোল্লা, গেদো মোল্লা, মোসেন, চহিল এগে সব কইছি। নমোডাঙার নালা, বীরেন, বিমলরে বুঝোইছি। নুরো হাওলাদার, দিদার খাঁ। আর আমাগে বন্ধু মোক্তার, আলতাপ, বীরেন, লিয়াকাত সব কয়ডারে রাজি করাইছি।
— কীরম রাজি?
— গরীব সব এক কত্তি হবে। বড়োলোকগে জমির ধান কাটে আনতি হবে।
— তারা রাজি হইছে?
— তুই কী কইস, রাজি হবে না মানে। নোয়াঢালিও দলে আসতি চাইছে।
— তাই নাকি। তাহলি আমাগে সামনে এই এলাকার কেউ ভিড়তি পারবে না। নোয়াঢালি একাই ছয়ডা সড়কি চালাতি পারে। দুই হাতে চারখেন। দুই পায় দুইখেন। গতমাসে দ্যাখলাম তার হাতের নিরিখ। কানধরে আমাগে সব কয়ডারে দল বান্ধে ঢাল ধরা আর সড়কি মারার ট্রেনিং দেলোনা! আমরা চিল্লেয়ে ডাক ছাড়িলাম তোর মনে আছে সে কথা?
— আছে। ট্রেনিংয়ি আমিতো ছিলাম।
— মাটিতি একসাথে সগলে থাবা মারে লাফায়ে চিল্লেয় কইলাম, আল্লাহ — আ ল্লা হ ও—ই সব চলে আয়রে…। চলে আয়…।
— আরে বাব্বাহ এরে কয় কাজেকাজির একশান। নোয়াঢালি যা লাফ মারে ছয় সড়কি নিয়ে। বুইছিস একদম গা গরম হয়ে যায়।

চার.
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। গরুরা সব ঘাস খেয়ে মাটামের নীচের দিকে বিলের উঁচু টেকে মঁচকানো বুড়ো তেঁতুল তলায় ঘুটো বেঁধেছে। বড়ো হোলওয়ালা এড়েগরুটা হ্যাক্কা মেরে সিঁদুরে বকনাটাকে বাগে আনার চেষ্টা করছে। তার লকলকে উন্মোচিত রাঙা নুনু থেকে লোল ঝরছে। কয়েকটা দামড়া ঢুসোঢুসি করছে। মোষে রঙের দুধভর্তি ভারী ওলানের গাইটা ছ্যাড় ছ্যাড় করে মুতে দিলো। ঝাঁজালো গন্ধ বাতাসে মেখে যায়। বুড়ো চুপসানো হোলের লম্বা ঠ্যাঙের ঘাড়ে দাঁদওয়ালা দামড়াটা হেলেপড়া মোটা তেঁতুলের বাকল ওঠা শাখায় মাথা নীচু করে ঘাড় ঘষতে থাকে। দোয়ালে খালের জোলার পাশে নরম মাটিতে কয়েকজন রাখাল হালের নড়ি দিয়ে গাদগাদ খেলছে।
আমি বললাম— সাঈদ ধলা, মান্দার, মানিক, সাহেব আলি, জগা ওগেসব এখানে ডাক দে। গরু কয়ডারে এক জায়গায় করুক।
— ক্যান কী এরবি?
— এট্টা ভাষণ দেবো শুনবি। লিয়াকাত ভাই কলেজে ভোটের সময় এইরম দেতো। ছাত্রলীগের টুকুভাইও দেতো। একজন ছেলো ছাত্রগে লিডার আলি তারেক। তার লিকচার আমি শুনিছি। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন চিল্লায়ে কতো তখন তার গলার শির ফুলে উঠিতো। আমি এট্টু সেইরম ভাষণের রিহার্সেল দেব।
— তা গরুর পালের সামনে ভাষণ দিবি?
— আরে নাড়াবনে গরুর পালের সামনে লেকচার দিয়ে ট্রেনিং পাকা করতি হবে না! আর তুইও আমারে দেহে শিখতি পারবি।

পড়ন্ত বেলা। মকছেদ, আলতাফ, কানা সামাদ, কুদ্দুস, মোতাল তাদের গরু নিতে বিলে আইছে। মকছেদ এবার আমার সাথে ম্যাট্টিক পাশ করেছে।
এদেরও ডেকে মাটামের হেলেপড়া তেতুল তলায় আনি। এরা এখন উৎসুক এড়েগরুর যৌনমিলন দেখতে। মাটাম নামেরও একটা শানে নাযুল আছে।
এক ঝাঁক চ্যাগা, কোড়া জোলার পাশে হোগলা বনে ঝাপাটা-ঝাপটি করছে।

রাখালরা চার পাঁচজন চলে এলো। গরুদের তেঁতুল গাছের কাছে জড়ো করা হলো। বেশ মজমা মজমা ভাব। যেমন কোর্টের সামনে ধ্বজ্বভঙ্গের ঔষধ বেঁচার মজমা হয় সেইরকম।
আমি ভাষণ শুরু করলাম। বেশ উচুস্বরে গলা কাঁপিয়ে।

প্রিয় রাখালভাইয়েরা, আমার বন্ধুরা ও গরু ভাইবোনেরা, আজ আমি তোমাদের সামনে বাধ্য হয়ে ভাষণ দিতে আইছি। আমাগে কানুল্লোর বিল, নাংলার বিল, নোয়াশের বিলে ধান ফলায় কারা? লাঙল টানে কারা? গরু রাখে কারা? বাগুন, তিল, উস্তে, কুমড়ো ফলায় কারা?
সব তোমরা গরু ভাইরা, রাখাল ভাইরা আর চাষা ভাইরা সবাই।
এই বিলির জমির মালিক কারা?
সব বড়োলোকগে। মোজাম হাজি, মোমিন হাজি, মোমরেজ হাজি, জামাল মাতব্বর, খারাবাদের আকুঞ্জিরা। গরীবদের কোনো জমি নেই। যা কিছু ছেলো সব ফাঁকিজুকি দিয়ে বা জ্বাল দলিল করে তারা নিয়ে নিছে। গরীব চাষী ভাইরা সব কাজ করে আর না খেয়ে থাকে। এটা চলবে না। রাশিয়া চিনের মতো আমরা গরীব-ধনী সব সমান করে ফেলবো।
লাঙল যার জমি তার।
পাঞ্জাবীরা আমাদের চুষে খাচ্ছে। আদমজী, বাওয়ানী, দাদা বাইশ পরিবার আমাগে পাট। পাট মানে কি তোমরা বুঝিছো? কুষ্টা। যে কুষ্টা দিয়ে তোমরা গরুর দড়ি বানাও। চা, তামুক সব তারা পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছে। দ্যাশটারে চোষন করে ছোবড়া বানায়ে দিচ্ছে। আমরা বাঙালিরা সেনাবাহিনীতে চাকরি পাইনে। আমরা এসব হতি দেবো না। আইয়ুব খানের গদিতে আমরা আগুন জ্বালায়ে দেবো।

সব রাখাল আর সাঈদ, আলতাফ, মকছেদ হাতে তালি দিয়ে ওঠে। মকছেদ দৌড়ে এসে আমারে কোলে নিয়ে উঁচু করে ধরে বলে, ওরে আমার লিডাররে কি ভাষণ দিলি তুই!
এড়ে আর দামড়া গরুগুলো লাফাতে থাকে। চ্যাগা ও কোড়া পাখির ঝাঁক হোগলাবনের থেকে বেরিয়ে মাথার উপর কয়েকবার পাকমেরে উড়তে থাকে।

চলবে…

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত