সকালটা শুরু করেছিলাম হাটহাজারীর অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে। মিষ্টি মরিচের খোঁজে বাজারের ভেতরেও ঢুঁ মারলাম। মরিচের পাশাপাশি খাজা, গজা, চালভাজা, মুড়িভাজা – কিছুই বাদ রাখিনি। এরপর যাত্রা বোয়ালখালির পথে।
মেইন রোড ছেড়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই! এই গলি থেকে ওই গলি, সেই গলি থেকে আবার অন্য গলি। গুগল মামাও গুলতি পাকিয়ে অনবরত ঘুরছিল। তার সঙ্গে আমিও গোলকধাঁধায় পাক খাচ্ছিলাম। চওড়া রাস্তা, সরু রাস্তা, নামকা ওয়াস্তে রাস্তা–পিচঢালা পথ শেষ হয়ে এল ইট বিছানো পথ, সেটাও ফুরিয়ে গিয়ে শুরু হলো নিখাদ মাটির রাস্তা। দুরন্ত ঘূর্ণির মতো কেবল পাক খাচ্ছিলাম।
একসময় গাড়ি চলাচলের অনুপযুক্ত একটি রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। গাড়ি ফেলে এবার পদযাত্রা। লাল খোয়া বিছানো পথ। কিছুদূর পরপর কালভার্ট, মাঝখানে বেশ ভালোই ফাঁক। লাফিয়ে লাফিয়ে সেগুলো পার হতে হলো। দুপাশে সবুজ বনানী। দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে, অথচ আমি তখনো পথেই ঘুরে মরছি।
‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি,
সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি…’
পথের এই গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতেই এবার দেবী দুর্গার মর্ত্যলোকে পদার্পণের গল্পটা বলি।

দেবী দুর্গার আগমন ও মেধস মুনির আশ্রম
পুরাণকথা অনুযায়ী, সত্যযুগে রাজা সুরথ মেধস মুনির নির্দেশনায় দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। কালিকাপুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণে এই পূজার প্রসঙ্গ রয়েছে। রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় দেবীর আরাধনা করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি বসন্তকালে পূজার আয়োজন করেছিলেন বলে এর নাম হয় বাসন্তী পূজা। পরবর্তী সময়ে শরৎকালে দুর্গাপূজার প্রচলন ঘটে।
রামায়ণের কাহিনিতে আছে, ত্রেতাযুগে রাবণকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন। অর্থাৎ, প্রচলিত বসন্তকালের বাইরে শরতে দেবীকে জাগ্রত করে পূজা। সেই পৌরাণিক আখ্যানের সূত্রেই শরৎকালের দুর্গাপূজার সঙ্গে রামচন্দ্রের নাম জড়িয়ে আছে।
পুরাণের এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর করলডেঙ্গা পাহাড়ে অবস্থিত মেধস মুনির আশ্রম। স্থানীয় ঐতিহ্য ও প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় ১৩৩ বছর আগে শ্রীমৎ বেদানন্দ স্বামী দীর্ঘ তপস্যা ও অনুসন্ধানের পর কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া একটি দুর্গামন্দির আবিষ্কার করেন। তাঁর উদ্যোগেই মেধস মুনির আশ্রমটি পুনরাবিষ্কার ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ১৯৭১ সালে আশ্রমটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলেও পরে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তদের সহযোগিতায় এটি আবার গড়ে ওঠে।
পুরাণ, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য মিলেমিশে জায়গাটিকে দিয়েছে এক বিশেষ মাহাত্ম্য। প্রায় ৬৮ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই আশ্রমে চণ্ডী মন্দির, শিব মন্দির, কামাখ্যা মন্দির, কালী মন্দির ও সীতা মন্দিরসহ মোট ১০টি মন্দির এবং সীতা পুকুর রয়েছে।

পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে
মূল ফটক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার এগিয়ে পাহাড়ে ওঠার সিঁড়ি। সেখানেও চমৎকার একটি প্রবেশদ্বার। প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৪টি সিঁড়ি পেরিয়ে পৌঁছালাম মেধস মুনির মন্দিরে। বিশ্বাস করা হয়, এখানেই মেধস মুনি তপস্যা করেছিলেন। মন্দিরের সামনে পুণ্যার্থীরা মোমবাতি ও ধূপ জ্বালান। পাশে রয়েছে বসে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বড় একটি বেঞ্চ।
কিছুটা সমতল জায়গা পেরিয়ে আবার সিঁড়ি। দুপাশে তিনটি বিশাল আর্চ, আর সেগুলো ঘিরে রঙিন বোগেনভিলিয়ার ঝাড়। যেন পাহাড়ের বুকজুড়ে প্রকৃতি নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছে প্রবেশপথ।
এরপরই শ্রীশ্রী চণ্ডীমাতার মন্দির। পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত এই মন্দিরের চারপাশে সীমানাপ্রাচীরঘেরা বিশাল খোলামেলা চত্বর। মূল মন্দিরের সামনে ভক্তদের বসার জন্য বড় হলঘর। সেখানেই শ্রীশ্রী চণ্ডীমাতার বিগ্রহ। চারপাশে রয়েছে বিশ্রামের বেঞ্চ। পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য দোতলা আবাসন এবং নির্দিষ্ট সময়ে প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থাও আছে।
রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকাতেই আবার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। গোধূলির আলোয় আকাশের কী বিচিত্র রূপ! নিচে ধোঁয়ামাখা সবুজ বনানী। দূরের গাছপালা যেন সন্ধ্যার কুয়াশায় ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে। অপূর্ব!
এক পাশে রেলিং দেওয়া সিঁড়ি নেমে গেছে আরও নিচের দিকে। সেখানে রয়েছে বাকি মন্দিরগুলো, সীতার পুকুর ও ঝরনা। কিন্তু দিনের আলো ফুরিয়ে আসায় সেদিকে আর যাওয়া হলো না। কিছুটা আক্ষেপ তো থেকেই গেল।

শেষের কথা
প্রায় ৬৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই মেধস মুনির আশ্রম সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। প্রতিবছর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়; এরপর আসে দুর্গাপূজার নানা আচার-অনুষ্ঠান। এই পাহাড়ের ধর্মীয় মাহাত্ম্য, পুরাণকথা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার।
চন্দ্রনাথ মন্দিরে গিয়ে যেমন মনে হয়েছিল–অবশেষে আসতে পেরেছি, মেধস মুনির আশ্রমে এসেও ঠিক তেমনই মনে হলো। এত দুর্গম পথ পেরিয়ে এখানে প্রতিদিন অসংখ্য পুণ্যার্থী ও আমার মতো দর্শনার্থী আসেন। তাঁদের কারও টান ধর্মবিশ্বাস, কারও ইতিহাস, কারও নিছক প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা।
অপূর্ব এই মন্দির ও পাহাড়ি পরিবেশ দেখতে অবশ্যই আসবেন। তবে একটা কথা–পথের গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে যদি মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে, তার জন্য আমাকে কিন্তু দায়ী করা যাবে না!













