৩০ এপ্রিল ২০২৬
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
মাহমুদুর রহমান
কথাসাহিত্যিক
27

মাহমুদুর রহমান
কথাসাহিত্যিক

27

বিক্ষুব্ধ সময়ে শিল্প ও শিল্পীর দায়

একটা প্রচলিত বিতর্ক আছে, শিল্প কেবল শিল্পের জন্য নাকি সমাজ ও মানুষের প্রতি শিল্প ও শিল্পীর দায় আছে? এ বিতর্ক চলছে বহু আগে থেকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সমাজের চলতি নানা সংকট এমনকি সামাজিক পরিস্থিতিতে শিল্পীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেন। যেমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রম। ২০২৪ সালের বন্যা পরিস্থিতিতে দেখা গেল অভিনেতা-অভিনেত্রী, সংগীতশিল্পীরা এগিয়ে গেছেন বন্যার্তদের সাহায্যে। কেউ নিজে গেছেন ত্রাণ নিয়ে, কেউ তহবিল সংগ্রহ করেছেন, কেউ সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বিপরীত চিত্রও আছে। ভাইরাল হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ-চ্যাট থেকে দেখা গিয়েছিল, গণ-আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রদের ওপর গরম পানি ঢালতে বলা হচ্ছিল, তাদের মারতে বলা হচ্ছে। এ সবই বলেছেন ‘শিল্পী’রা।

প্রশ্ন হলো শিল্প বা শিল্পীর আদৌ এসব ক্ষেত্রে কোনো দায় আছে কি? সহজ করে বা একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়—শিল্পের কোনো দায় নেই। কেননা শিল্প নিজে থেকে কিছু করে না। শিল্প বিমূর্ত, তাকে মূর্ত করেন শিল্পী। শিল্পের মাধ্যমে শিল্পী হয়ে ওঠেন সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সমাজের মানুষই তাকে নতুন পরিচয় দেয়, তাকে তুলে ধরে। ফলে স্বাভাবিকভাগেই সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি তাদের দায় থাকে। সে দায় থেকেই শিল্পীরা নানা সময় সমাজ ও মানুষের জন্য কথা বলেন। মূলত সমাজ যখন তাকে স্বীকৃতি দেয়, সমাজের প্রতি তার এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কেউ সেটা পালন করে, কেউ করে না।

ভারতে ২০২৪ সালের আগস্টে আরজি কর হাসপাতালে একজন ডাক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করার ঘটনায় পুরো পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল হয়েছিল। এ ঘটনার পর টালিগঞ্জের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দেখা গেছে বিচিত্র প্রতিক্রিয়া। কেউ সরাসরি এর প্রতিবাদ করেছেন, কেউ আরজি কর, ধর্ষণ, বিচারের দাবি উল্লেখ না করে আকারে ইঙ্গিতে কিছু বলেছেন আবার কেউ একদমই বলেননি। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকরা প্রকাশ করেছেন ক্ষোভ। তারা চাইছিলেন শিল্পীরা কিছু বলুক। কেননা তাদের কথার দাম আছে। তাদের কথার গুরুত্ব আছে। দিল্লিসহ অন্যান্য স্থানে মুসলিমদের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাচারের সময়ও অনেকে চেয়েছিলেন, বলিউডের তারকারা কিছু বলুক। সেখানেও খুব বেশি সাড়া আসেনি। এখানে প্রশ্ন, শিল্পীদের এ নীরবতা বা এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কী?

পশ্চিমবঙ্গের দিকেই তাকানো যাক। মমতা ব্যানার্জি ও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে প্রায় সবই ক্ষমতার চর্চা। অভিনেতারা অভিনয়ের চেয়ে বেশি মনোযোগী রাজনীতিতে। তাদের বহু জনপ্রিয় শিল্পী গত কয়েক বছরে যোগ দিয়েছেন রাজনীতিতে। কেউ হয়েছেন এমএলএ। ফলে সরকার বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ তাদের নেই। ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে চান তারা। ক্ষমতার চর্চা করতে চান। ফলে ক্ষমতার বিরাগভাজন হতে চান না। কেউ কেউ আবার বলে বিরাগভাজন হয়েছেন। জাতীয় রাজনীতি তো পরের বিষয়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য ব্যানড হয়েছেন ফেডারেশনের বিরুদ্ধে কথা বলায়। বলিউডের বিষয়টা সম্ভবত আরো সঙ্গিন এবং খানিকটা ভিন্ন।

শাহরুখ, সালমানদের বয়স হয়েছে। সালমানের ওপর কয়েকবার হত্যাচেষ্টা হয়েছে। আমির খান বেশিরভাগ সময় চুপই থাকেন। শাহরুখ খান বেতালে ছিলেন তার পুত্রকে নিয়ে। অনেকে বলে থাকেন, খান সাম্রাজ্যকে চাপে ফেলতেই শাহরুখের ছেলেকে নিয়ে এই কাণ্ডটা করেছিলেন সামির ওয়াংখেড়ে। করানো হয়েছিল আরকি। এরপর আরিয়ান খান নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ততদিনে অনেক কিছু বদলে গেছে। শাহরুখও এসব নিয়ে বেশি ঘাটাতে জাননি। নিজেকে আন্তর্জাতিক করে তুলেছেন। কিন্তু তার মধ্যেও নানা সময়ে হিন্দুত্ববাদীরা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে থাকে দুবাইয়ে চলে যেতে। অবস্থা এমন হয়েছিল, প্রতি বছর ঈদে ভক্তদের সামনে আসার রেওয়াজ থাকলেও শাহরুখ এই বছর শুভেচ্ছা জানান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ভারত ভাগ, বিট জেনারেশন, কমিউনিস্ট আন্দোলন ইত্যাদি ছিল রাজনীতির সুবর্ণ সময়। সেই সময় তরুণরা আদর্শের জন্য, আদর্শ থেকে রাজনীতি করত। শিল্পীরাও সেই আদর্শের টানেই রাজনীতি করতেন। পরবর্তী সময়ের রাজনীতি হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের মাধ্যম। শিল্পীরা রাজনীতিতে তখনই গেছেন যখন তার মুনাফা প্রয়োজন হয়েছে। সেই কারণেই তারা মান্টোর মতো প্রতিবাদী না। এমনকি নকশাল মিঠুন চক্রবর্তী এখন বিজেপির রাজনীতি করেন।

শিল্পের মাধ্যমে শিল্পী হয়ে ওঠেন সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সমাজের মানুষই তাকে নতুন পরিচয় দেয়, তাকে তুলে ধরে। ফলে স্বাভাবিকভাগেই সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি তাদের দায় থাকে

বাংলাদেশের ঘটনাও অনেকটা এরকমই। উল্লিখিত বহুল আলোচিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কাণ্ডের মূল কারণ ক্ষমতার সুবিধাভোগী হওয়া ও হওয়ার চেষ্টা করা। গরম পানি ঢালতে বলা অরুণা কিংবা গ্রুপে থাকা অন্য সবাই ছিলেন সরকারের সুবিধাভোগী। ছিলেন সরকারের সবচেয়ে নতুন এমপি, অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। তারা চেয়েছিলেন আন্দোলনের বিপক্ষে, সরকারের পক্ষে থেকে নিজেদের লাভালাভ নিশ্চিত করা। চব্বিশের আগস্টে ঘটনার মোড় ঘোড়ার কাছাকাছি সময়ে শিল্পীদের অনেককে হঠাৎ ভোল পাল্টাতে দেখা গিয়েছিল। এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের আমলেও দেখা গেল এই সরকারের সমর্থক অনেক শিল্পী সরকার ও ক্ষমতার নিকটে যেতে চাইছেন। সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্যও কয়েকজনকে নানা রকম কথাবার্তা বলা, কাজ কারবার ও সমর্থন উৎপাদনের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

কিন্তু শিল্পীদের চরিত্র এমন ছিল না। বিশেষত এ অঞ্চলের শিল্পীদের। প্রথমেই নাম করা যাক জহির রায়হানের। প্রতিবাদের কী অসাধারণ নিদর্শন তিনি রেখেছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’তে। মানুষের কথা লিখে রাখতে নির্মাণ করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। আমজাদ হোসেনও ছিলেন সময়ের কণ্ঠস্বর। এ সময় আশফাক নিপুন রাষ্ট্রের বিধিনিষেধের মধ্যেও নির্মাণ করেছেন ‘মহানগর’, ‘সাবরিনা’র মতো সিরিজ। যদিও নির্দিষ্ট সময়েই তিনি বলেন, অন্য সময় বলেন না। চলতি ইস্যুকে নির্দেশ করে নাটক, সিরিজ নির্মাণ করেছেন আরো অনেকে। ফুল, পাখি, লতা, পাতায় আটকে থাকেননি তারা। বরং সে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশই করোনার পর বেশি রাজনীতি সচেতন কনটেন্ট নির্মাণ করেছে।

পশ্চিমে তাকানো যাক। হলিউডে এআই নির্ভরতা নিয়ে যখন রাইটার্স গিল্ড আন্দোলনে নামল, প্রথমে অভিনেতা, নির্মাতারা নীরব ছিলেন। এরপর তারা সমর্থনও দিয়েছেন অনেকেই। ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেন হলিউডের বহু তারকা। পোশাকের মাধ্যমে কান উৎসবের মঞ্চে ফিলিস্তিনের পতাকা তৈরি করে প্রতিবাদ করেছিলেন কেট ব্ল্যানচেট। মার্ক রাফালো, হাভিয়ের বারদেমসহ বহু তারকা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন। বারদেম প্রতিবাদ করেছেন অস্কারের মঞ্চ থেকে। শিল্পীর দায় তারা মেটাচ্ছেন।

বস্তুত, শিল্পের কোনো দায় নেই। কিন্তু শিল্পী যখন গুরুত্বপূর্ণ ও শিল্প একটা বড় মাধ্যম হয় মানুষকে প্রভাবিত করার, তখন শিল্পও দায়বদ্ধ হয়। কখনো শিল্পীরাই করেন। কেননা সিনেমার মধ্য দিয়ে সিস্টেমকে কষাঘাত করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন এমনকি সত্যজিৎ রায়। মৃণাল স্পষ্টই বলেছেন, সিনেমাকে তিনি করেছেন হাতিয়ার। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিছু গানের ভূমিকা ছিল আরো বেশি। বলশেভিক বিপ্লবে কৃষকের গান থেকে শুরু করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান নিয়ে এখনো আলোচনা হয়। এমনকি চব্বিশের আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকায় এসেছিল র‍্যাপ। কারারুদ্ধ হয়েছিলেন র‍্যাপার হান্নান। সেসব বাধা ডিঙিয়ে প্রতিদিন কার্টুন এঁকেছেন, কবিতা লিখেছেন, গান গেয়েছেন শিল্পীরা।

রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান সবসময়ই খড়্গহস্ত। শিল্পীকে সবসময় দাঁড়াতে হয় তার বিরুদ্ধে। তিনি যদি কেবল আনন্দ দেয়ার জন্য শিল্প করেন তাতে দোষের কিছু নেই, কিন্তু ক্ষমতা, বিশেষত গণহত্যা, অত্যাচার ইত্যাদি তোষণ শিল্পীর কাজ নয়। অবশ্য নানা সময় পৃথিবীর বহু শিল্পী ফ্যাসিজম, যুদ্ধ ও হত্যার পক্ষে ছিলেন। পিটার হান্ডকেকে নিয়ে কিছুদিন আগেও হয়েছিল বিতর্ক। তিনি স্লোভোদান মিলোসভিচের পক্ষ নিয়েছিলেন। আদিত্য ধরের মতো সিনেমা নির্মাতারা সিনেমায় বিজেপির ন্যারেটিভ প্রচার করে যাচ্ছে। তাতে অভিনয় করছেন রণবীর সিং, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয় খান্নারা। ইতিহাস কোনো না কোনো সময় তাদেরকে নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।

দেশে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিক্ষুব্ধ সময় আসে। সেইসব সময় মানুষের জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। শিল্পীরাও সেই মানুষের অংশ। বিক্ষুব্ধ সময়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন একজন শিল্পী, কিন্তু হত্যা ও দমনের প্ররোচনা দিলে তিনি সমালোচিত হবেনই। তবে এ কথা নিশ্চিত, তারা মনে করেন না তাদের কোনো দায় আছে সমাজের প্রতি। কেননা তারা নিজেদের করেছেন ক্ষমতার দোসর, তাদের শিল্পও মানুষের জন্য নয়।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত