১ মে ২০২৬
সন্ত তস্কর
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
রোমেল রহমান
কবি ও গল্পকার
73

রোমেল রহমান
কবি ও গল্পকার

73

সন্ত তস্কর

কিয়াঙে এক সন্ত মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাবার পর একটা শূন্য জলপাত্রের কাছে গেলেন। জলপাত্রটি ছিল লম্বা সরু নাল আর স্ফিত পেটের! যেন একটা ভুড়িওয়ালা মানুষের জিরাফের মতো গলা! সন্ত জল পাত্রটির নল নিরখ করে দেখতে লাগ্লেন! নাহ! দেখা যাচ্ছে না! তিনি আরও তীক্ষ্ণভাবে নজর করতে লাগলেন! আলোর মধ্যে নিয়ে গিয়ে দেখতে লাগলেন ভিতরে তিনি আছেন কি-না! কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। অসীম ধৈর্যের সন্ত অনুভব করলেন তিনি নিশ্চয়ই আছেন এবং একটু আগে তিনি স্বপ্নে তাকে জানিয়েছেন; হয়তো সন্ত ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছে না। ঠিক এই সময়ে এক চোর কিয়াঙে ঢুকে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছিলো! প্রার্থনা ঘরে পেল্লায় বুদ্ধমূর্তি দেখে তার গলা শুকিয়ে গেলো! এটা যদি সত্যিই স্বর্ণের হয় তাহলে সে কিভাবে এই মূর্তি চুরি করবে? এই সাইজের বুদ্ধকে ঘাড়ে করেও তো নেয়া সম্ভব না! তখন হঠাৎ চোর দেখলো প্রার্থনা ঘরে বুদ্ধের পেছন দিকে এক গেরুয়া বসন পরা ন্যাড়া মাথার লোক একটা জলপাত্রে চোখ লাগিয়ে নাড়াচাড়া করছে! কয়েকবার কানের কাছে এনেও শোনার চেষ্টা করছে! অদ্ভুত লাগ্লো লোকটার কাণ্ডকারখানা! চোর জানে রাতের এই সময়ে দুই শ্রেণির মানুষ জেগে থাকে — সাধুরা এবং তস্করেরা! এ লোকটাও সম্ভবত তারই মতন স্বর্ণের বুদ্ধমূর্তি চুরি করতে এসেছে! পা টিপে এগিয়ে কাছে যেতেই সন্ত লোকটা চোরকে দেখে জলপাত্রটি এগিয়ে দিয়ে বল্ল, দেখো তো ভাই ভিত্রে বুদ্ধকে দেখা যাচ্ছে কি-না! চোর পাত্রটি হাতে নিয়ে বল্ল, পাওয়া গেলে কিন্তু অর্ধেক তোমার বাকিটা আমার! সন্ত বল্ল, পুরোটাই তোমার, আমি শুধু চাই উনি বাইরে বেরিয়ে আসুন! আনন্দে চমকে উঠে চোর মনে মনে ভাব্লো, এই ন্যাড়া মাথার চোরটা তো ভীষণ বোকা! সোনা ফেলে তামার পাত্র চাইছে?! ভিতরে যে সোনার বুদ্ধ রাখা আছে সেটা সে বুঝে ফেলেছে, ফলে কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেলো চোর সন্তের মতো মনোযোগ দিয়ে জলপাত্রের নলের মধ্যে চোখ দিয়ে খুঁজছে! আলো ফেলে ভিতরে দেখার চেষ্টা করছে! কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না! এদিকে সন্ত তাকে বলেছে, ভিতরে উনি আছেন! আমাকে উনি একবার দেখা দিয়েছেন! ফলে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলো চোর। তবে তার নিবিষ্টতার অভাব নেই! এদিকে সন্ত তার পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছেন! ভোর হলে সন্ত জেগে উঠে দেখেন চোর তখনো খুঁজে যাচ্ছে! সন্ত তার কাছে গিয়ে বল্ল, এক কাজ করো তুমি অন্য একটি কক্ষে বসে উনাকে খুঁজতে লাগো। সকাল হয়ে গেছে তো, লোকজন আসবে, সন্তরা জাগবে! চোর বল্ল, ভালো বুদ্ধি। তাই করি চলো! তবে আমাকে তোমার মতো একটা গেরুয়া পোষাক আর মাথা ন্যাড়া করে দিলে সুবিধা হতো, কিয়াঙের লোকেরা বুঝতে পারতো না আমি আসলে সন্ত নই চোর! তোমার মতো মিশে যেতে পারতাম! সন্ত বল্ল, আসলে আমরা সবাই চোর! নিজেকে মুক্ত করার রাস্তা চুরিতে ব্যস্ত সবাই! ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করবো তোমাকে বস্ত্র দেবার আর মাথার কেশ ফেলে দেবার! এরপর অনেকদিন কেটে গেলো, দিন..সপ্তাহ.. মাস…বছর পেরিয়ে ছয় বছর! সেই চোরের নাম হয়ে গেলো, সন্ত তস্কর! দলে দলে ভক্তরা আসেন সেই সন্ত তস্করের কক্ষের সামনে। তারা ফুল রাখেন, ভালো খাবার রাখেন, উপহার রেখে যান সন্ত তস্করকে নিবেদন করে। সবাই জানে তিনি জলপাত্রে আটকে পড়া বুদ্ধকে দেখছেন, তাকে তুলে আনতে নির্ঘুম সাধনায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন বছরের পর বছর! আর সেই সন্ত যিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন জলপাত্রের মধ্যে বসে থাকা বুদ্ধকে! তিনি সন্ত তস্করের দিকে তাকালেই তার চোখে জল আসে। কারণ তিনি জানেন, তিনি তাঁকেই দেখছেন যাঁকে তিনি সে রাত্রে দেখেছিলেন জলপাত্রের মধ্যে ধ্যানস্থ!

১ মে ২৬

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত