২ মে ২০২৬
দুঃস্বপ্নের ভেতর
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
দেবাশীষ ধর
কবি, গদ্যকার ও অনুবাদক
25

দেবাশীষ ধর
কবি, গদ্যকার ও অনুবাদক

25

দুঃস্বপ্নের ভেতর

এপ্রিলের তীব্র গরমে ভবনটির ছাদ ফেটে যাচ্ছে, রোদের তেজ ছাদের তলা দিয়ে পনেরো তলার টপ ফ্লোরের সবকটা ফ্ল্যাট পর্যন্ত পৌছায়। গরমের ঘামক্ত শরীর বেয়ে বিন্দু বিন্দু জলে স্নান হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দক্ষিণের নারিকেল গাছটির ডালের কখনো হালকা নড়া দেখে মনে হয় বুঝি একটু বাতাস এলো। এই গরমে আশেপাশের বেশিরভাগ ফ্ল্যাটের জানালা সব খোলাই রেখেছে। অন্তত একটু ঠান্ডা হাওয়ার আশায় শরীরটা জুড়াতে পারলে!

আর তখনি সেই ছয় তলার ফ্ল্যাটের দরজায় ভীষণ শব্দ। রুমের জানালা দিয়ে অবিরত ধোঁয়ার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে ফিরোজ শুয়ে বাহিরের জানালার দিকে চেয়ে স্টিক ফুঁকেই চলেছে। দরজার শব্দ যেন তার কানেই আসছে না। নাক-মুখ দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়ায় রুমটা ঝাপসা হয়ে গেছে। এত বড় ফ্ল্যাটে সে একাই থাকে। গত তিনমাস ধরেই সে এখানে একাই থাকছে। এখনো পর্যন্ত তিনটা শেষ করল টেনে। এদিকে দরজা ভেঙে ফেলছে কিন্তু তার ওঠার কোন ইচ্ছে নেই, সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি। একটু শক্তি নেই, যেন শরীরটা বেশ দুর্বল। ঘুমাতে গেলে চোখ বন্ধ করতে দুঃস্বপ্নগুলো তাঁকে আর ঘুমাতে দেয় না। সে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে তারপর সিগারেট জ্বালায়। এরপর বাইরে বেরিয়ে যায়। নিচের দারোয়ান তারে ভালো করেই চেনে, প্রতিরাতে সে বের হয়ে গভীর রাতে ফেরে।

স্টিকটার শেষ টান দিয়ে নাক দিয়ে সব বের করে উঠে বসলো সে। কিছুক্ষণ এভাবে বসেই থাকলো। তারপর ডান পাশ হয়ে শুয়ে বালিশের ভেতর মাথাটা গুঁজে দিয়ে দুহাত দিয়ে কান চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলো। সেদিন সে গাড়িটা ভীষণ জোরে চালাচ্ছিলো। ফাঁকা রাস্তা, শহর থেকে একটু দূরে। পেছনের সিটে বসা বাবা-মা। তার বাবা তাকে নিষেধ করছিলো। আস্তে চালাতে বললো। কানাডার ট্রাফিকের নজরে পড়লে নিশ্চিত অনেক টাকার ফাইন। এটা শহর থেকে দূরে বলে এখানে ট্রাফিক পুলিশ তেমন থাকে না এটা বুঝেই ফিরোজ গতি বাড়িয়ে চালাচ্ছে। ওরা যাচ্ছিল দূরের একটা গ্রামের দিকে ফিরোজের এক বোনের বাড়িতে ঘুরতে। ফিরোজের ভার্সিটির সেমিস্টার শেষ। তাই এবার ঘুরতে যাওয়া। ঠিক সামনের দিকে রাস্তার মোড় ঘুরতেই গতি কমালো, আর তখনি একটা লরি এসে জোরে ধাক্কা! সাথে সাথে ফিরোজ পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। গাড়ি পাশের খাদে উল্টে গিয়ে বেশ কয়েকবার গাছের সাথে ধাক্কায় গাড়ির জানালার কাঁচ ভেদ করে বাবার মাথাটা পুরো থেতলে গেলো, আর মায়ের শরীর খাদে গিয়ে পড়লো। ফিরোজের মাথা, পা, হাত জখম হয়ে ঘাসের উপর শুয়ে, চেতনহীন অবস্থা।

বেশ কিছুক্ষণ পর; রক্তাক্ত শরীর, হাতের কব্জি ভেঙে গেছে, পায়ের মাথা উঠে গেছে— এই অবস্থায় রক্ত হাতে জানালার দিকে তাকালো। জানালার গ্রিল ধরে চিৎকার করতে লাগলো। আর তখনি মেইন দরজায় জোরে আঘাত করলো, কারা যেন ঘরে ঢুকলো দ্রুত। ফিরোজকে তারা সেই তখন থেকে ডেকেই চলছে কিন্তু ফিরোজ উঠছে না। সে রক্তমাখা হাতে গোঙাচ্ছে শুধু…

ফিরোজ ঘাসের উপর শুয়ে খাদের দিকে চেয়ে আছে। তার গালের মাংস ছিঁড়ে গেছে, চোখের কোণা থেকে রক্ত বের হচ্ছে। কে যেন তার বাঁ হাতটি ধরে রেখেছে। হাতের শিরাতে সুঁই ফোটার মতো ব্যথা করলো। তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে গেলো। এবার সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো।

৬ মার্চ ২৬

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত