১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Han Kang (born 27 November 1970) is a South Korean writer. From 2007 to 2018, she taught creative writing at the Seoul Institute of the Arts. Han rose to international prominence for her novel The Vegetarian, which became the first Korean language novel to win the International Booker Prize for fiction in 2016. Han is the first Asian woman and Korean to be a recipient of the Nobel Prize in Literature, receiving the award in 2024 in recognition of her "intense poetic prose that confronts historical traumas and exposes the fragility of human life".
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
জাভেদ ইকবাল
অনুবাদক
49

জাভেদ ইকবাল
অনুবাদক

49

হান কাংয়ের অণুগল্পগুচ্ছ

চন্দ্রাকৃতি চালের পিঠা

কোরীয় ভাষায় সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০২৪ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিকা হান কাং। তিনি কোরীয় ভাষার ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। সেই সাথে এশিয়ার প্রথম নোবেলে সম্মানিতা লেখিকা। তার এই অর্জন এশীয়, বিশেষত কোরীয় ভাষায় সাহিত্যচর্চার জন্য, নারী সাহিত্যিকদের জন্য এক নতুন মাইলফলক।

এবারের নোবেল কমিটি ফর লিটারেচার-এ বিচারকদের মতে—
‘তার গভীর ও প্রগাঢ় কাব্যিক গদ্য, যা পাঠককে রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক সংকট-সংঘাত, ঘাত-প্রতিঘাত ও মানসিক আঘাতের মুখোমুখি করে এবং মনুষ্য জীবনের ভঙ্গুরতা-নশ্বরতাকে উন্মোচিত করে।’

হান কাং’য়ের গদ্য বাহুল্য-বর্জিত ও তীক্ষ্ণ; প্রতিকী জটিলতা ও প্রগাঢ় আবেগিক গভীরতাসম্পন্ন। দেশের অশান্ত, আলোড়নপূর্ণ ইতিহাসের পটভূমিকায় সহিংসতা, প্রতিরোধ, মানসিক আঘাত, অস্তিত্ব ও অস্তিত্ব সংকট, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, পিতৃতান্ত্রিকতা, স্মরণ ও স্মৃতিচারণ— এসব তার রচনার মূল বিষয়বস্তু। অনন্যসাধারণ কাব্যিক ভাষা-শৈলীতে তিনি মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশা, সহনশীলতা এবং মানিয়ে নেবার সক্ষমতার যে আখ্যান তুলে ধরেছেন, তা পৃথিবীজুড়ে পাঠকের জীবন ও অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে অনুরণিত করে।

শুধু বিষয়বস্তুর গভীরতার জন্যই নয়, লিখন-শৈলীর নতুনত্ব ও উদ্ভাবনীর জন্যও তার সাহিত্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তার কাব্যিক গদ্য ও নিরীক্ষাধর্মী লিখন-শৈলী আধুনিক সমসাময়িক গদ্যসাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কাব্যিক ভাবব্যাকুলতায়, সংঘাত-প্রতিঘাতের অদম্য ও অবিকম্পিত এক বর্ণন-কৌশল তাকে সমসাময়িক সাহিত্যিকদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। পাঠককে তিনি ইতিহাসের, মানবতার এবং তারই নিজের কঠিনসব সত্যের মুখেমুখি হয়ে উঠতে চ্যালেঞ্জ করেন; এরই মাঝে সৌন্দর্য আর মুক্তির ঝলক দেখান।

তার সাহিত্য সম্ভার দারুণ সমৃদ্ধ ও জটিল। সাহিত্যের কয়েকটি ধারায় তিনি অত্যুত্তম কাজ করেছেন। লেখিকা হিসেবে শরীর ও আত্মার সম্পর্ক ঘিরে, জীবিত আর মৃতের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে তার দুর্লভ এক বোঝাপড়া, অনন্য এক সচেতনতা রয়েছে। গল্পে ও উপন্যাসে তিনি নিয়মিতভাবে নামহীনকে ‘নাম’ দিয়েছেন, কণ্ঠহীনকে ‘কণ্ঠ’ দিয়েছেন।

তার সাহিত্য সম্ভার দারুণ সমৃদ্ধ ও জটিল। সাহিত্যের কয়েকটি ধারায় তিনি অত্যুত্তম কাজ করেছেন। লেখিকা হিসেবে শরীর ও আত্মার সম্পর্ক ঘিরে, জীবিত আর মৃতের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে তার দুর্লভ এক বোঝাপড়া, অনন্য এক সচেতনতা রয়েছে। গল্পে ও উপন্যাসে তিনি নিয়মিতভাবে নামহীনকে ‘নাম’ দিয়েছেন, কণ্ঠহীনকে ‘কণ্ঠ’ দিয়েছেন

তিনি যে ধরনের তীক্ষ্ণ কাব্যিক গদ্য লেখেন, তা একই সাথে কোমল ও কঠিন; মাঝেমধ্যে পরাবাস্তবধর্মী। বিষয়গত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি বৈচিত্র্যময়তা ও লিখন-শৈলীগুণে একেকটি বই হয়ে উঠেছে অনন্য। একেকটি উপন্যাস হয়ে উঠেছে তার মূল থিমের নতুন এক কালজয়ী অভিব্যক্তি।

হান কাংয়ের জন্ম ১৯৭০ সালের ২৭ নভেম্বর, দক্ষিণ কোরিয়ার গুয়াংজু শহরে। তার বাবা হান সেউং-ও্যন একজন লেখক, ঔপন্যাসিক ও ভূতপূর্ব স্কুল শিক্ষক। কোরিয়ার প্রধানতম নদী, হান নদীর নামে তিনি তার মেয়ের নামকরণ করেন। ‘হান’ মানে ‘বড়’, বা ‘মহৎ’।
লেখিকার পরিবারে সাহিত্যচর্চার মজবুত ভিত আছে। তার বড় ভাই হান ডং-রিম একজন ঔপন্যাসিক। ছোটভাই হান কাং-ইন একজন ঔপন্যাসিক ও কার্টুনিস্ট।

দশ বছর বয়সে ১৯৮০ সালে, কাংয়ের পরিবার সিউলে চলে আসে। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে তার বাবা তখন পুরোপুরি সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। গুয়াংজু ত্যাগের মাত্র চার মাস পর সেখানে ঐতিহাসিক গুয়াংজু গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রকামী জনতার এই রক্তাক্ত আন্দোলন শিশু কাংকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। সিউলে চলে যাওয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে তার মনে এক ধরনের ‘সারভাইভারস্ গিল্ট’ তৈরি করে। অন্তর্মুখী তিনি নিজেকে আরো গুটিয়ে নেন। বেড়ে ওঠেন লেখক পিতার বিশাল বইয়ের ভাণ্ডারে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে। তার কাছে বই ছিল জীবন্ত মানুষের মতো, যারা সর্বক্ষণ বহুগুনে তাদের সংখ্যা ও সীমা বাড়িয়ে চলেছে। প্রায়-প্রায়ই আবাস ও স্কুল বদলের ধাক্কা তিনি বইয়ের মধ্য ডুবে সামলে গিয়েছেন। অপরিচিত পরিবেশে বন্ধুত্ব জমে ওঠার আগে বইকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। শিশুতোষ কোরিয় লেখক কাও সো-চিয়ন, মা হেই-সাং এবং লিম চালয়্যু তাকে আলোড়িত করে। কৈশোরে তিনি সুইডিশ শিশুতোষ লেখক অ্যাসট্রিড লিন্ডগ্রেন, রাশিয়ান ফিওদর দস্তেয়ভস্কি ও বরিস পাস্তেরনাক দ্বারা প্রভাবিত হন। আধুনিক কোরিয় সাহিত্যের ক্ষণজন্মা প্রবাদপুরুষ, কবি ও ঔপন্যাসিক কিম হেজিয়ং (যিনি তার লেখক নাম ‘ইয়াই স্যাং’ নামে অধিক পরিচিত) তাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। জাপানি ঔপনিবেশিকতার সহিংসতা, বর্বরতা ও পাশবিক আচরণের প্রতি খড়গহস্ত ইয়াই স্যাং-য়ের একটা কথায় তিনি দারুণ প্রভাবিত হন: ‘আমি বিশ্বাস করি, মানুষদের সব গাছ হয়ে যাওয়া উচিত।’

The nine-year-old Han Kang had left Gwangju four months before the massacre, when her family moved to Seoul
Arrested students are led away in Gwangju, 1980 Credit: Bettmann (via The Telegraph)

কাং ১৯৯৩ সালে সিউলের ইয়ন্সেই ইউনির্ভাসিটি থেকে কোরিয় ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। লেখাপড়াশেষে কিছুদিনের জন্য মাসিক পত্রিকা সেইম্টেও-এ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সেবছর, ‘লিটারেচার অ্যান্ড সোসাইটি’ নামক ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকার শীতকালীন সংখ্যায় তার পাঁচটি কবিতা প্রকাশিত হয়। পরের বছর তিনি তার প্রথম ছোটগল্প ‘দি স্কারলেট অ্যাংকর’-এর জন্য কোরিয়ার ‘নিউ ইয়ার্স লিটারারি কনটেস্ট সম্মাননা’ জিতে নেন। ’৯৫ সালে ছয়টি ছোটগল্পের সংকলন ‘ইয়োসু’জ লাভ’ তার প্রথম প্রকাশিত বই। তিনি ১৯৯৮ সালে ইউনির্ভাসিটি অব আইওয়া’য় ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে অংশ নেন। সে বছর তার প্রথম উপন্যাস ‘ব্ল্যাক ডিয়ার’ প্রকাশিত হয়। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিউল ইনস্টিটিউট অব আর্টসের ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিভাগের অধ্যাপিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৮ থেকে ’২৪ সালের নোবেলে ভূষিত হওয়ার আগপর্যন্ত, হান কাং ও তার ছেলে ইয়্যুন ইয়ে-জি মিলে সিউলের হান নদীর পারে একটা বইয়ের দোকান পরিচালনা করে এসেছেন।

হান কাংয়ের স্বামী হং-ইয়ং-হি ছিলেন কায়্যুই হি সাইবার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও শিল্প-সাহিত্যের একজন সমালোচক। দু’জনে একই বিশ্বদ্যিালয়ে পড়তেন। ছিলেন সাহিত্যানুরাগী ও গল্পপ্রেমি। তারা প্রেম করে বিয়ে করেন। পরে অবশ্য বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর থেকে হান কাং তাদের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে আলাদা বসবাস শুরু করেন।

এক নজরে হান কাংয়ের সাহিত্যকর্ম ও সম্মাননা

(বইগুলোর ইংরেজি নাম ব্যবহার করা হয়েছে)
উপন্যাস: ‘ব্ল্যাক ডিয়ার’ (১৯৯৮), ‘ইয়োর কোল্ড হ্যান্ডস’ (২০০২), ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ (২০০৭), ‘দ্য উইন্ড ব্লোজ, গো’ (২০১০), ‘গ্রিক লেসনস্’ (২০১১), ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ (২০১৪), ‘দ্য হোয়াইট বুক’ (২০১৬), ‘উই ডু নট পার্ট’ (আরেক নাম— ‘আই ডোন্ট সে গুডবাই’, ২০২১)
ছোটগল্প সংকলন: ‘ইয়োসু’জ লাভ’ (১৯৯৫), ‘দি ফ্রুট অব মাই ওম্যান’ (২০০০), ‘দ্য ফায়ার স্যালাম্যান্ডার’ (২০১২), ‘টিয়ার বাস্কেট’ (২০০৮)
ছোট উপন্যাস/নভেলা: ‘বেবি বুদ্ধা’ (১৯৯৯), ‘মাই নেম ইজ সানফ্লাওয়ার’ (২০০২), ‘দ্য স্টোরি অফ দি রেড ফ্লাওয়ার’ (২০০৩), ‘কনভ্যালেসেনস্’ (২০১৩)
প্রবন্ধগ্রন্থ: ‘লাভ, এন্ড থিংস্ সারাউন্ডিং লাভ’ (২০০৩), ‘কোয়ায়েটলি সাঙ সংস্’ (২০০৭)
শিশুতোষ গ্রন্থ: ‘লাইটনিং লিটল ফেইরি’ (২০০৭)
কবিতা সংকলন: ‘আই পুট দ্য ইভিনিং ইন দি ড্রয়ার’ (২০১৩)
কালেকশান: ‘হান কাং সিরিজ: দ্য এসেনশিয়্যল কালেকশান।’

উল্লেখযোগ্য সম্মাননা
হান কাং তার জীবনের প্রথম গল্প থেকে শুরু করে সর্বশেষ উপন্যাসের জন্যও রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা: কোরিয়ান নভেল এ্যাওয়ার্ড, কোরিয়ান মিনিস্ট্রি অব কালচার এ্যাওয়ার্ড, ই স্যাঙ লিটারারি এ্যাওয়ার্ড, ডংরি লিটারারি এ্যাওয়ার্ড, হুয়াং সান-ও্যন লিটারারি এ্যাওয়ার্ড, কিম ইউ ইয়্যুং লিটারারি এ্যাওয়ার্ড, হো-এ্যাম প্রাইজ ফর আর্টস এবং পনি চাং ইনোভেশান এ্যাওয়ার্ড।
আন্তর্জাতিক সম্মাননা: ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ, মানহে লিটারারি এ্যাওয়ার্ড, সাঁ ক্লিমেন্তে লিটারারি প্রাইজ, প্রিমিও মালাপার্তে প্রাইজ, পিঁ মেডিসিস লিটারারি এ্যাওয়ার্ড, এমিল গ্যিমে প্রাইজ ফর এশিয়ান লিটারেচার এবং সাম্প্রতিকতম নোবেল সাহিত্য পুরস্কার, ২০২৪।

এখানে প্রকাশিত গল্পগুলো হান কাং-এর সপ্তম উপন্যাস ‘দ্য হোয়াইট বুক’ থেকে অনূদিত। ছোট ছোট ৬১টি গল্প দিয়ে সাজানো ‘দ্য হোয়াইট বুক’ ভাষাগত দিক এবং লিখন-শৈলীতায় হান কাংয়ের সবচেয়ে সাহসী ও নিরীক্ষাধর্মী রচনা।

• ভূমিকা ও অনুবাদ: জাভেদ ইকবাল

Han Kang was commended by the Swedish Academy for her ‘intense poetic prose’
Han Kang. Image source: Alamy (via The Telegraph)

 

চন্দ্রাকৃতি চালের পিঠা

গত বসন্তে, একটা রেডিও ইন্টারটিউয়ে কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, ‘আমার ছোটবেলায় এমন নির্দিষ্ট কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিল কিনা, যা আমাকে দুঃখের নিকটবর্তী করেছে।’

প্রশ্নটার মুখোমুখি হয়ে, সেই মৃত্যুটার কথা আমার মনে উঠে এসেছিল; যে মৃত্যুর গল্প শুনে শুনে আমি বেড়ে উঠেছি। প্রাণীকূলের সকল নবজাতকের মধ্যে সবচেয়ে অসহায়, ছোট্ট, নিখাদ-সুন্দর শিশু, চন্দ্রাকৃতি চালের পিঠার মতো সাদা। আমি কীভাবে জন্ম নিয়েছিলাম, আর সেই মৃত্যুর স্থলাভিষিক্ত হয়ে যেভাবে প্রতিপালিত হয়েছিলাম।

আমার ছয় বছর বয়সের আগপর্যন্ত, ‘চন্দ্রাকৃতি চালের পিঠার মতো সাদা’—বাক্যটার কোনো সুস্পষ্ট অর্থ আমার জানা ছিল না। তখন আমার ছয় বছর বয়স; চুসোক* উৎসবের সময় সাদা চালের পিঠা বানানোয় মাকে সাহায্য করার মতো যথেষ্ট বড়। চালের আটা ছেনে, ছোট ছোট অর্ধচন্দ্রাকৃতি পিঠা বেলতে মাকে সাহায্য করলাম। ওগুলো সিদ্ধ করার আগে, চাল-পিঠার উজ্জ্বল-সাদা খামির এতোটাই সুন্দর ও মনোরম যে, ওদেরকে ইহজগতের কিছু বলে মনেই হয় না। পরে, সিদ্ধ করে, প্লেটে পাইন পাতা দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করলে ওটা হতাশাজনক রকম সাধারণ দেখায়। তাপানো তিলের তেলে চকচকে; তাপে-বাষ্পে ওদের রঙ ও বুনন পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। কোনো সন্দেহ নেই, ওগুলো সুস্বাদু ছিল। কিন্তু শুরুর সেই শুভ্রতা, সেই মোহনীয় কমনীয়তা পুরোপুরি উবে গিয়েছিল।

তাই আমার মা যখন বলতো, ‘চালের পিঠার মতো সাদা’, আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে, পিঠা সিদ্ধ করার আগের, কাঁচা চালের পিঠার কথাই মা বলছেন। ওরকম বিস্ময়কর, আদি-অকৃত্রিম একটা মুখ! এসব চিন্তা-ভাবনাগুলো আমার বুক আঁকড়ে চেপে ধরতো; যেন এক বিকট লৌহভার আমার বুকে চেপে বসেছে।

গত বসন্তে, রেকর্ডিং স্টুডিও’য় আমি এসবের কোনোকিছুই উল্লেখ করিনি, বলিনি। পরিবর্তে, আমি আমার পোষা কুকুরটার কথা বলেছিলাম— যেটা আমার পাঁচ বছর বয়সে মারা গিয়েছিল। ওটা অসম্ভব বুদ্ধিমান একটা কুকুর ছিল। আমি বলেছিলাম— একটা সংকর জাতীয় কুকুর— প্রসিদ্ধ জিনদো জাতোদ্ভুত। আজো আমার কাছে ওর সাথে তোলা দুজনের একটা ছবি আছে—পাশাপাশি অন্তরঙ্গ দুজনের একটা প্রাণবন্ত মুর্হূত। কিন্তু ব্যাপারটা বেশ আশ্চর্যের যে, ওটার জীবিতাবস্থার একটা কোনো স্মৃতি আমার নেই! ওর সাথে আমার একমাত্র ঝকঝকে স্মৃতি সেই সকালের, যেদিন ও মারা গিয়েছিল। সাদা লোম, কালো চোখ, তখনো ভেজা ভেজা নাক। সেদিন থেকে আমার ভেতরে কুকুরের প্রতি ঘৃণা-বিতৃষ্ণা জন্ম নিলো; যা আজব্দি যায়নি। এলোমেলো, নরোম লোমের দিকে হাত বাড়িয়ে দেবার বদলে, আমার হাত দুটো শরীরের পাশে বিবশ আটকে থাকে।

* চুসোক— উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান ফসল উৎসব, বা প্রাক-শারদিয়া উৎসব

 

চিরতুষার

দৃষ্টিসীমায় শুধু তুষার আর চিরতুষার— এমন কোনো একটা জায়গায় বসবাসের কথা সে চিন্তা ভাবনা করে দেখেছে। যেখানে, তার জানালার বাইরের সারি সারি বৃক্ষরাজি দূরের চিরন্তন তুষারাবৃত পর্বতমালার অপরিবর্তনীয় পটভূমিকায় প্রত্যেকটা ঋতুর পরিবর্তন তাকে প্রত্যক্ষ করাবে, অনুভব করাবে। স্কুলের দিনে জ্বর বাঁধিয়ে ঘরে শুয়ে থাকা অবস্থায়, কপালে দুটো হাত রাখার মতো স্নিগ্ধ ও শীতল।

১৯৮০ সালে এদেশে একটা সাদা-কালো চলচ্চিত্র বানানো হয়েছিল। ছবির প্রধান চরিত্র সাত বছর বয়সে তার বাবাকে হারিয়ে, তার ধীর-স্থির, নম্র ও শান্ত মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠে। (দূর্ঘটনায় পতিত হবার সময় ওর বাবার বয়স মাত্র ২৯ বছর ছিল। বন্ধুবান্ধবদের সাথে দলবেঁধে হিমালয় পবর্তমালায় চড়তে গিয়েছিল। তার দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি)। ছেলেটা প্রাপ্তবয়স্ক হবার সাথে সাথে তার মায়ের বাড়ি ছাড়লো; আর ব্যক্তিগত জীবনে অবিশ্বাস্য কঠোরসব নীতি-নৈতিকতা মেনে চলতে লাগলো। যখন তার কোনো সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন হতো, সে তার মনশ্চক্ষে একটা পীড়াদায়ক ভূ-দৃশ্য দেখতে পেতো: বরফাচ্ছাদিত হিমালয়ের উপর অবিরত নতুন তুষার পড়ে চলেছে; আর তার মনের মধ্যে তখন পুরোপুরি শ্বেতময়তা—হোয়াইট আউট! প্রতিবার সে যে সিদ্ধান্তগুলো নিতো, সেসব তার জন্য কঠোর-কঠিনতম হতো। নিজেদের জন্য অমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেকে ভয়ে পিছিয়ে যেতো।

দুর্নীতি ও অনিয়ম যখন ব্যাপক ও বহুলপ্রচলিত হয়ে দেশের ‘স্বাভাবিক নিয়ম-নীতি’ হয়ে উঠলো, সে একাই ঘুষ গ্রহণে অস্বীকার করলো। সেজন্য তাকে সমাজচ্যুত ও একঘরে করে ফেলা হলো; এমনকি শারিরীকভাবে আক্রমণ-হামলাও করা হলো।
পরিশেষে, তাকে ফাঁদে ফেলে, নিজ কর্মস্থল থেকে তাকে কুকুরের মতো খেদিয়ে দেয়া হলো। একাকি, সে তার বাড়িতে ফিরে আসলো। সেখানে নিজস্ব ভাবনায় সে মগ্ন-বিভোর হয়ে যেতো; দৃষ্টিসীমা জুড়ে থাকতো দূরের ঐ পর্বতমালার তুষারাবৃত চূড়া আর গিরিখাতগুলো। যে জায়গায় সে যেতে পারে না। বরফের সেই দেশ, যেখানে তার বাবার বরফজমাট লাশটা লুকিয়ে আছে; যেখানে মানুষকে অন্যের পদতলে দলিত হতে হয় না।

 

লবণ

একদিন, একমুঠো অমসৃণ মোটা লবণ হাতে নিয়ে সে খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখেছিল। দানাগুলোর একটা উপভোগ্য সৌন্দর্য ছিল; সাদার মধ্যে হালকা ধূসরতার ছোঁয়া। আর তখনই প্রথমবারের মতো সে লবণের মধ্যেকার শক্তিমত্তাকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে পেরেছিল: লবণের সংরক্ষণ ক্ষমতা, জীবাণুনাশের ক্ষমতা, আরোগ্য ও নিরাময়ের ক্ষমতা।

এরও বেশ আগে, একদিন খাবার প্রস্তুত করার সময়, ক্ষত হাতে সে লবণ তুলে নিয়েছিল। ছুরি পিছলে আঙুলের উপর উঠে যাওয়া যদি তার প্রথম ভুল হয়—যেহেতু সে ব্যস্ততার মধ্যে ছিল, হাতে একদম সময় ছিল না—কাটা ক্ষতের উপর ব্যান্ডেজ না করে লবণ স্পর্শ করা ছিল তার দ্বিতীয় ও সবচেয়ে খারাপ ভুল। ক্ষতে লবণ লাগতেই, তীক্ষ্ণ-তীব্র যন্ত্রণায় জ্বলতে-পুড়তে সে ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়া’ প্রবাদটির যথার্থতা অনুভব করতে পেরেছিল।

পরে, ইনস্টলেশন আর্টের একটা ফটোগ্রাফে সে দেখেছিল যে— কৃত্রিমভাবে লবণের একটা পাহাড় বানিয়ে, দর্শনার্থীদের সেখানে খালি পায়ে বসার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। ওখানে পেতে রাখা চেয়ারে বসে, জুতো-মোজা খুলে আপনি দুই পা লবণের উপর রেখে বসে থাকবেন; যতক্ষণ খুশি বসে থাকবেন। ফটোগ্রাফে কিছুটা অন্ধকার-মতো একটা প্রদর্শনীর স্থান দেখা যাচ্ছে; যেখানে কম্পমান আলো লবণ-পাহাড়ের চূড়া নির্দেশ করছে। অবশ্য সেই চূড়া একজন স্বাভাবিক মানুষের উচ্চতা থেকে সামান্য একটুখানি উঁচু। ছবিতে একজন দর্শনার্থী—যার মুখটা ছায়ার মধ্যে ডুবে আছে—চেয়ারে বসে পা-দু’টো সামান্য এগিয়ে লবণের ঢালের উপর মেলে রেখেছেন। সম্ভবত ওভাবে অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকার কারণে, শ্বেত লবণ-পাহাড় আর মহিলার শরীরটা মনে হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে, যন্ত্রণা ও বেদনাদায়কভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

ফটোগ্রাফটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে সে ভাবছিল— ‘ওরকমটা করতে গেলে, তোমার পায়ে কোনো কাটা, ক্ষত বা ঘা থাকলে চলবে না। আমার পা-দুটো যদি পুরোপুরি সেরে যেতো, কেবল তাহলেই আমি লবণের ঐ পাহাড়ে অমন পা মেলে বসে থাকতে পারতাম। ওখানকার শ্বেতশুভ্রতা যতোই চকচক করুক, ঐ ছায়াময়তার মধ্যে এক ধরনের গা হিম করা ব্যাপার আছে।

 

সাদা পাখিরা

শীতার্ত সৈকতে এক ঝাঁক সাদা গাংচিল। প্রায় বিশটা; হবে বোধহয়?
সাগরপানে, ঐ দূর-দিগন্তে, হামা দিয়ে ডুবতে থাকা সূর্যের দিকে মুখ করে ওরা বসে ছিল। যেন, নীরব কোনো রীতি পালন করছে; নিশ্চল-স্তব্ধ হয়ে, হিমাঙ্কের নীচে নেমে যাওয়া ঠান্ডায় বসে দিনের যবনিকাপাত প্রত্যক্ষ করছে।

সে দাঁড়িয়ে পড়ে ওদের দৃষ্টির দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে দিলো—নিস্তেজ সেই আলোক-উৎসের দিকে, যেটা এই মুহূর্তে অরুণাভ, টকটকে লাল হতে চলেছে। বাতাস তখন এমনই ঠান্ডা যে, মনে হচ্ছিল শীত তার হিংস্র দাঁত একেবারে হাড়ের মধ্যে ফুটিয়ে দিচ্ছে। তবু সে জানতো যে, সূর্যালোকের ঠিক এই উষ্ণতাটুকুই তাকে জমে বরফ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

সিউলের এক গ্রীষ্ম সকাল; পানির ধারে একটা সারস পাখি দাঁড়িয়ে আছে। উজ্জ্বল লাল পা-দুটো বাদে পুরোটুকু অমল-ধবল। পানির মধ্যে বেছে বেছে পা ফেলে, ওটা একটা প্রশস্ত ও মসৃণ পাথরের দিকে এগোচ্ছিল। সে যে ওরই দিকে তাকিয়ে দেখছে, সারস কি তা বুঝতে পারছে? সম্ভবত। আর এটা কি বুঝছে যে, কোনোপ্রকার ক্ষতি করার মতলব তার নেই? এজন্যই বোধহয় ওটার অমন হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিমা, অমন মুগ্ধকর হাবভাব—তীরের আরেক পাড়ে তাকিয়ে, সূর্যের আলোয় লাল লাল পা-দুটো শুকিয়ে নিচ্ছে।

অন্য পাখিরা যেভাবে পারে না—সাদা পাখিরা কেন তাকে এতো নাড়িয়ে যায়, দোলা দিয়ে যায়? কেন, সে জানে না। বিশেষভাবে ওদেরকেই এতো সৌষ্ঠবপূর্ণ-মাধুর্যময় মনে হয় কেন? সময়ে সময়ে পুরোপুরি বিশুদ্ধ-পবিত্র লাগে কেন?

উড়ে উড়ে দূরে চলে যেতে থাকা একটা সাদা পাখিকে মাঝেমাঝেই সে স্বপ্নে দেখে। সেই স্বপ্নে, সাদা পাখিটা তার খুব কাছাকাছি থাকে; এতোটাই কাছে যে, পালকে তির্যক সূর্যালোক মেখে, ডানার নীরব ঝাপটানিতে উড়ে যাবার সময় হাত বাড়ালেই যেন সে ওটাকে ধরে ফেলতে পারবে। নীলাকাশে উড়ে উড়ে পাখিটা অনেকদূর চলে যায়; তবু কখনো তার দৃষ্টিসীমা পেরোতে পারে না; বাতাস কেটে কেটে, ভেসে ভেসে চিরন্তন দৃশ্যমানতায় আটকে থাকে। ওটার চকচকে ডানা দুটো উঠছে… নামছে… দুলছে।

সে এই ঘটনার কি মানে ধরে নেবে যে— সাদা পাখিটা উড়ে এসে স্বল্প সময়ের জন্য ওরই মাথার ওপর এসে বসলো; পরমুহূর্তে আবার উড়াল দিলো? তাও আবার এই শহরেই!
কিছু একটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় অধীর-অস্থির হয়ে সে বাড়ির পথ ধরেছিল। পার্কের ভিতর দিয়ে, স্রোতস্বিনীর কিনার বরাবর, ক্লান্তিভারে পা টেনে টেনে। আচমকা আকাশ থেকে কিছু একটা নেমে আসলো; আর বড়সড় সেই ‘কিছু’ তার মাথার উপর বসে পড়লো! এরপর, ভারসাম্যের চেষ্টায় ডানা দুটো মেলে দিয়ে, তার মুখমণ্ডল কয়েকমুহূর্তের জন্য সন্ন্যাসিনীর মুখাবরণের মতো ঢেকে ফেললো। ডানার পালক-প্রান্তগুলো প্রায় তার মুখে-গালে আঁচড় কেটে গেল। এর পরপরই পাখিটা শূন্যে উঠে গেল। আর এক উড়ালে ধারে-কাছের একটা ভবনের ছাদে এমন হাবভাব নিয়ে বসলো, যেন ওটা তার সাথে কিছুই করেনি।

 

সাদা কাগজে লেখা কালো কালো অক্ষর

প্রতিবার হৃতস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হবার প্রক্রিয়ায় সে অনুভব করতে পারে যে, জীবন এখন অমোঘ এক শীতলতা, এক সহজাত নিস্তেজতা নিয়ে এসেছে। এ এমন এক অনুভূতি, যাকে ‘ঘৃণা’ বা ‘অসন্তুষ্টি’ বলাটা কম কম হয়ে যাবে; আবার ‘তীব্র ঘৃণা’, বা ‘বিদ্বেষ’ বলাও বেশি বেশি হয়ে যাবে। যেন, যে তাকে চারপাশ থেকে যত্নে-পরিচর্যায় মুড়ে রেখেছে, আর প্রতিরাতে তার কপালে এঁকে দিয়েছে শুভরাত্রির চুম্বন, আচমকা সে-ই আবার তার উপর ন্যালা-খ্যাপা হয়ে উঠলো। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে তাকে ঘরের বাইরে বের করে দিলো। নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়কভাবে তাকে বুঝিয়ে দিলো যে, ঐসব ঝলমলে হাসির সবটুকুই আসলে মেকি ছিল।

আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে, কখনো কিন্তু সে বিস্মৃত হয়নি যে, এই মুখের ঠিক পেছনে ঘাপটি মেরে আছে মৃত্যু। মৃদু অথচ অনমনীয় ও একগুঁয়ে; যেন পাতলা কাগজে কালো লেখাগুলো চুইয়ে চুইয়ে ঝরে পড়ছে।

জীবনকে পুনর্বার ভালোবাসতে শেখাটা এখন দীর্ঘ ও জটিল এক প্রক্রিয়া।
কেননা, কোনো না কোনো একসময় তুমি অবধারিতভাবে আমাকে পরিত্যাগ করবে, দূরে ঠেলে দেবে।
আমার দুর্বলতম অবস্থায়, যখন আমার সাহায্যের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন,
তখন তুমি আমাকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, মুখ ঘুরিয়ে নেবে; কঠোর ও চূড়ান্তরূপে।
আর সেকথা আমার কাছে একদম পরিষ্কার।
এই জানাটুকুর আগের অবস্থায় এখন আমি আর কোনোক্রমেই ফিরতে পারি না।

 

সীমানা

ও এই গল্পের মাঝেই বেড়ে উঠেছিল।
ওর অকাল জন্ম হয়েছিল; অপরিণত, অপরিপক্ক; মাত্র সাত মাস বয়সে। যখন প্রসব-যন্ত্রণা উঠেছিল, ওর বাইশ বছর বয়সী মা তখন একেবারে অপ্রস্তুত ছিল।
অন্য বছরের তুলনায় সেবার আগে ভাগে তুষার ঝরতে শুরু করেছিল। বাসায় তখন ওর মা একা ছিল। পৃথিবীর আলো দেখার পর, বাচ্চাটা অল্প একটু সময়ের জন্য কেঁদে উঠেছিল। একটা ক্ষীণ, দোদুল শব্দ কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত উবে নিঃশেষ হয়ে গেলো। রক্তাক্ত ছোট্ট শিশুটাকে ওর মা নবজাতকদের একটা জামা পরালো। অতি যতনে, অতীব সতকর্তায় একটা তুলোর লেপে জড়িয়ে নিলো; যেন ওর দম বন্ধ না হয়ে যায়। প্রথমবারের মতো ওকে যখন রিক্ত-নিঃস্ব স্তনে মুখ দেওয়ানো হলো, সহজাত প্রবৃত্তিতে সে ক্ষীণ, নিস্তেজভাবে দুধ টানতে চেষ্টা করলো। অল্প সময়ের মধ্যে সেই চেষ্টাও থেমে গেল। উষ্ণ করে রাখা মেঝের উষ্ণতম স্থানে, আলতো করে ওকে রেখে দেওয়া হলো। কিন্তু এতক্ষণে ও আর কান্নাকাটি করছে না। ওর চোখ দুটোও আর খোলা নেই।

এক ভাবী অমঙ্গলের আশঙ্কায় তাড়িত হয়ে, ওর মা থেমে থেমে লেপের এক কোনা আলতো করে টান দেয়। বাচ্চাটা সামান্য সময়ের জন্য চোখ খোলে। কিন্তু, আবার চোখ ছোট করতে করতে বন্ধ করে নেয়। একটা সময়ের পর থেকে সেই সামান্যতম সাড়াটুকুও বন্ধ হয়ে যায়।

তারপরও, ভোরের আগে, শেষপর্যন্ত ওর মায়ের বুকে যখন প্রথম দুধ আসলো, মা তার স্তনবৃন্ত ওর ছোট্ট-নরম দুই ঠোঁটে চেপে ধরলো। মা অনুভব করলো— সবকিছুর পরও বাচ্চাটা এখনো শ্বাস চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও ততক্ষণে ও হুঁশ-জ্ঞান থেকে ছিটকে পড়েছে, তবু মুখের ভেতরের স্তনবৃন্ত ও আলতো চুষতে উদ্দীপনা পায়। স্তন্যের গলধকরণ আস্তে আস্তে জোরালো হয়। পুরোটা সময় ধরে ওর চোখ বন্ধই থাকে। ও জানে না— ঐ মুহূর্তে সে কোন্ সীমানা অতিক্রম করে করে চলেছে।

 

সকলি শ্বেতশুভ্রতা

তোমার ঐ দুচোখ দিয়ে আমি একটা সাদা বাঁধাকপির চকচকে, চোখ ধাঁধানো, অন্তরঙ্গতম ও দ্যুতিময় অশংটুকু দেখবো— ওটার গহীন অন্তরে লুকিয়ে থাকা চমৎকার নবীন পুষ্পদলকে।
তোমার চোখ দিয়ে দিনের আকাশে ঝুলে থাকা আধখানি চাঁদের ঠান্ডা শিহরণ দেখে নেবো।
একসময় ঐ চোখ দুটো একটা হিমবাহ দেখতে পাবে। হিমবাহের প্রকাণ্ড সেই বরফ-শরীরে দৃষ্টি মেলে দিয়ে, চোখ দুটো এমন ‘পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়’ কিছু একটা দেখে ফেলবে, জীবন যাকে কলঙ্কিত-কলুষিত করতে পারেনি।

চোখ দুটো বার্চ গাছের বিস্তীর্ণ শ্বেতশুভ্র আরণ্যক-নীরবতার ভিতরটা দেখে নেবে। জানালার নিশ্চল নিস্তব্ধতা দেখে নেবে; যেখান দিয়ে শীত-সূর্যের আলো চুইয়ে চুইয়ে ঢুকে পড়ে। দেখে নেবে সিলিংয়ের উপর এসে পড়া একটুকরো তির্যক রোদের মধ্যে দুলতে থাকা, চিকচিক করতে থাকা ধূলিকণার গহীনটুকু।
সেই শ্বেতশুভ্রতায়, সেই সকল শ্বেতবস্তুর মধ্যে, তোমার ছেড়ে যাওয়া শেষ-নিঃশ্বাস আমি আমার শ্বাসে টেনে নেবো।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত