২৩ এপ্রিল ২০২৬
দূরত্বের ভেতর জন্ম নেওয়া ভালোবাসা ও এক সার্বিয়ান কবির সন্ধান
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
নাজমীন মর্তুজা
কথাসাহিত্যিক
53

নাজমীন মর্তুজা
কথাসাহিত্যিক

53

দূরত্বের ভেতর জন্ম নেওয়া ভালোবাসা ও এক সার্বিয়ান কবির সন্ধান

Serbian
“Ne, nemoj mi prići! Hoću izdaleka da volim i želim tvoja oka dva.”

বাংলা
“না, কাছে এসো না
আমি দূর থেকেই ভালোবাসতে চাই, শুধু তোমার দু’টি চোখকে চেয়ে।”

দেশছাড়া হয়ে বাইরে আসার পর, আমি যেই জায়গায় যাই, যেখানে কাজ করি সেখানেই বুঝতে পারি, মাল্টিকালচারাল পরিবেশের এক অদ্ভুত সুবিধা আছে। একধরনের সীমাহীন পরিচয়, সীমাহীন আলাপ। বিভিন্ন দেশের মানুষদের সঙ্গে ছোট ছোট মুহূর্ত – দু’চারবার একসাথে কফি খাওয়া, গল্প করা এইসবেই শুরু হয় সাহিত্যিক আলাপ। আমি জানতে পারি ওদের দেশে কোন বই বিখ্যাত, কোন লেখকদের নাম সবাই চেনে। পুরো পৃথিবী আমি একা জানতে পারব না, কিন্তু এই আলাপেই ছোট ছোট জানার দ্বার খোলে।

আমার একজন কলিগ আছেন, নেবুজা ট্রেভিক, যাকে আমি সংক্ষেপে নাব বলি। তিনি সার্বিয়ান বংশোদ্ভূত, যদিও জন্ম এখানে। সার্বিয়ান সাহিত্যকে তিনি খুব ভালোবাসেন। মাঝে মাঝে আমরা সাহিত্য নিয়ে কথা বলি। তাঁর কাছ থেকে আমি জানতে পারি ডেসাঙ্কা মাকসিমোভিচ-এর কথা। তারপর থেকেই আমি ডেসাঙ্কার বই ও কবিতা পড়তে শুরু করি।

প্রতিটি পৃষ্ঠা, প্রতিটি লাইন আমাকে মুগ্ধ করে। একজন নারী, যার সৃষ্টিশীলতা, জীবনবোধ, পারিবারিক জীবন, প্রেম সবই অসাধারণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও যে সাহিত্যের ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তা সত্যিই অবিস্মরণীয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে ডুবে থেকেও যে কত নিখুঁতভাবে সবকিছু গুছিয়ে রাখা যায় ডেসাঙ্কার জীবন এবং কবিতা সেটির জ্বলন্ত উদাহরণ।

আজ আমি শুধু আমার মুগ্ধতা শেয়ার করছি। আর বিশেষ ধন্যবাদ নেবুজা ট্রেভিককে, যিনি আমাকে এই সাহিত্যিক জগতে প্রবেশ করিয়েছেন, যিনি আমাকে ডেসাঙ্কার সৌন্দর্য দেখিয়েছেন।

ডেসাঙ্কা মাকসিমোভিচকে সার্বিয়ার এক প্রখ্যাত কবি হিসেবে মনে করা হয়, যিনি প্রেম, দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং ইতিহাসের স্মৃতিকে কবিতায় চিরস্থায়ী করেছেন।
তাঁর বিখ্যাত কাজ: শিশু হত্যা ও যুদ্ধের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লেখা “ক্র্ভাভা বায়কা”। প্রেম, দেশপ্রেম ও মানবিকতার কবিতার জন্য প্রসিদ্ধ।
পেশা: ১৯২৩–১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ান ভাষার শিক্ষক। বিভিন্ন স্কুলে কাজ করেছেন, যেমন ওব্রেনোভাচ জিমনেসিয়াম, থার্ড ফিমেল জিমনেসিয়াম ইন বেলগ্রেড, ফার্স্ট ফিমেল জিমনেসিয়াম ইন বেলগ্রেড।
জন্ম: ১৬ মে ১৮৯৮, রাব্রোভিকা, ভ্যালিয়েভোর কাছে।
মৃত্যু: ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩, বেলগ্রেড, ৯৫ বছর বয়সে; সমাহিত ব্রাঙ্কোভিনায়।
উত্তরাধিকার: ডেসাঙ্কা মাকসিমোভিচ ফাউন্ডেশন, যা তাঁর নামে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে।

১৯৩৩ সালে তিনি রুশ বংশোদ্ভূত লেখক ও অনুবাদক সের্গেই স্লাস্তিকভকে বিয়ে করেন। তিনি যুগোস্লাভিয়ায় বসবাস করতেন এবং সাহিত্য সংস্কৃতির মানুষ ছিলেন। তাদের সম্পর্ক ছিল গভীর বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক সান্নিধ্যের উপর দাঁড়ানো। খুব প্রচারবিমুখ, শান্ত এক দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন তারা।

তাদের কোনো সন্তান ছিল না। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে— ডেসাঙ্কা শিশুদের ভীষণ ভালোবাসতেন। শিশুদের জন্য গল্প ও কবিতা লিখেছেন অনেক। অনেকেই বলেন, তাঁর ছাত্রছাত্রীরাই ছিল তাঁর বড় পরিবার।

“ক্র্ভাভা বায়কা” শিরোনামের এই কবিতাটি লিখেছিলেন ডেসাঙ্কা মাকসিমোভিচ। কবিতাটির পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক ভয়াবহ ঘটনা। ১৯৪১ সালে Kragujevac শহরে জার্মান বাহিনী শত শত স্কুলশিশু ও সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। সেই ট্র্যাজেডির প্রতিক্রিয়ায় লেখা হয় এই কবিতা।

কবিতার সারমর্ম— এটি এক ধরনের শোকগাথা, আবার প্রতিবাদের কবিতাও। কবিতায় আমরা দেখি, একটি সাধারণ স্কুলের সকাল। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, বই খাতা নিয়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। হঠাৎ যুদ্ধ এসে সেই স্বাভাবিক সকালকে ভেঙে দেয়। শিশুরা বুঝতেই পারে না তারা কেন মারা যাচ্ছে। তাদের অপরাধ শুধু তারা শিশু, তারা ভবিষ্যৎ।

কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি হলো — নিষ্পাপতার হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধের অমানবিকতা, স্মৃতি ও শোকের অমরতা। এই শিশুদের মৃত্যু বৃথা নয়। তাদের স্মৃতি ইতিহাসে রয়ে যাবে, মানুষের বিবেকে রয়ে যাবে। কবিতাটি অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিল।

Bloody Tale Movie Poster
Bloody Tale (Krvava bajka, 1969), directed by Branimir Janković. Source: IMDb

Krvava bajka (1969)

ডেসাঙ্কার বিখ্যাত কবিতা “Krvava bajka” (Bloody Fairy Tale) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬৯ সালে একই নামের একটি যুগোস্লাভ যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। Yugoslavia (বর্তমান Serbia অঞ্চল) পরিচালক: (Branimir Janković) ব্রানিমির ইয়ানকোভিচ। চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু যুদ্ধ। ফিল্মটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় Kragujevac massacre (1941) কে কেন্দ্র করে তৈরি।

ঘটনাটা খুবই মর্মান্তিক। জার্মান বাহিনী প্রতিশোধ হিসেবে শত শত সাধারণ নাগরিক ও স্কুলের ছাত্রদের হত্যা করে। কবিতা “Krvava bajka” মূলত সেই হত্যাযজ্ঞে নিহত স্কুলশিশুদের স্মরণে লেখা। ফিল্মটিও সেই ট্র্যাজেডির গল্পই তুলে ধরে।

আরেকটি ইন্টারেস্টিং তথ্য — এই ১৯৬৯ সালের ফিল্মটির উপর ভিত্তি করেই পরে জাপানে মাঙ্গা কমিক অভিযোজনের অধিকারও নেওয়া হয়েছিল। কবিতা জাতীয় শোকের প্রতীক। সেই কবিতা থেকেই পূর্ণদৈর্ঘ্য যুদ্ধচলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিল।

অনুবাদ —

রক্তাক্ত উপকথা

একদিন ছিল সাধারণ এক সকাল,
ঘণ্টা বাজছিল স্কুলের উঠোনে।
খাতার ভাঁজে লুকানো স্বপ্ন,
বইয়ের পাতায় ভবিষ্যতের আলো।
শিশুরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিল
কেউ ডাক্তার হবে, কেউ কবি,
কেউ শুধু বড় হয়ে উঠবে
এই ছিল তাদের অপরাধ।

হঠাৎ বন্দুকের ঠান্ডা মুখ
শীতের বাতাসের মতো নেমে এলো।
পাঠ্যবই বন্ধ হয়ে গেল,
অঙ্কের খাতা রক্তে ভিজল।
শিশুরা তখনও বুঝতে পারেনি
কেন পৃথিবী এত নিষ্ঠুর হয়
তারা তো কেবল স্কুলে এসেছিল,
যুদ্ধ শিখতে নয়।

মাটির বুক নীরবে কেঁদেছিল,
আকাশ ঝুঁকে দেখেছিল নিচে
একটি প্রজন্ম পড়ে আছে নিশ্চুপ,
অপূর্ণ জীবনের পাশে।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়
তাদের নাম বাতাসে ভাসে,
প্রতিটি বসন্তে নতুন পাতায়
তাদের স্বপ্ন আবার জন্মায়।
কারণ ইতিহাস মনে রাখে
যে শিশুরা বই হাতে এসেছিল,
আর ফিরে গিয়েছিল
মানবতার বিবেক হয়ে।

(Krvava Bajka) “ক্র্ভাভা বায়কা” কবিতাটি ডেসাঙ্কাকে শুধু খ্যাতির মুকুট এনে দেয়নি, এর চেয়ে অনেক গভীর কিছু এনে দিয়েছিল। এই একটি কবিতা তাঁর জীবন বদলে দেয়। জাতির কণ্ঠ হয়ে ওঠা এই কবিতার পর তিনি শুধু প্রেমের কবি নন জাতির স্মৃতির কবি হয়ে যান।

যুদ্ধের ভয়াবহতা যে ভাষায় মানুষ অনুভব করছিল, সেই ভাষা তিনি লিখে দেন। ফলে মানুষ তাঁকে নিজেদের কণ্ঠ হিসেবে গ্রহণ করে।

নৈতিক সাহসের প্রতীক

যুদ্ধের সময় এমন লেখা প্রকাশ করা সহজ ছিল না। কবিতাটি যুদ্ধ শেষে প্রকাশিত হলেও সবাই জানত এই কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ। তিনি সাহসী লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পান। পান স্থায়ী সাহিত্যিক মর্যাদা। এই কবিতা তাঁর সাহিত্যজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি শুধু জনপ্রিয় নন ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা পান সার্বিয়ায়। সমষ্টিগত স্মৃতির অংশ হয়ে যাওয়া এই কবিতা আজও সার্বিয়ার স্কুলে পড়ানো হয়। যে শিশুদের স্মরণে কবিতাটি লেখা, তাদের স্মৃতির সঙ্গে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।

ব্যক্তিগতভাবে কী এক ধরনের বেদনার উত্তরাধিকার। খ্যাতি এসেছে, সম্মান এসেছে। কিন্তু এর ভিতর আছে গভীর শোক, যা তাঁর কবিতাকে আরও মানবিক করেছে। এই একটি কবিতা তাঁকে শুধু বিখ্যাত করেনি, তাঁকে ইতিহাসের অংশ বানিয়েছে।

এই সার্বিয়ান কবির কিছু উল্লেখযোগ্য কবিতার ভাবানুবাদ দিচ্ছি । সার্বিয়ার মহান কবি ডেসাঙ্কার কবিতা প্রেম, স্মৃতি, দেশ, যুদ্ধ, মানবতা, সবকিছুর মিশ্রণে তৈরি। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত কবিতার ছোট পরিচিতি নিচে দিলাম।

Предосећање (Anticipation) — পূর্বানুভূতি

কবিতার কেন্দ্রীয় অংশের মর্ম তুলে ধরলাম। এই কবিতায় একজন নারী অনুভব করছে— কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, প্রেম ঘটিত। এখনও প্রেম শুরু হয়নি, কিন্তু হৃদয় আগে থেকেই তা টের পাচ্ছে। প্রেমের পূর্বাভাস বলা যায়। সে বুঝতে পারছে, কেউ তার জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তার পৃথিবী বদলে যাবে। চারপাশের প্রকৃতি, বাতাস, নীরবতা সবকিছু যেন আগাম খবর দিচ্ছে। এক ধরনের মিষ্টি অস্থিরতা, অজানা আনন্দ, হালকা ভয় সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি। কবিতা তো নয় যেন আবেগের সারাংশ। প্রেম আসার আগের মুহূর্ত, অজানা সুখের পূর্বাভাস, হৃদয়ের গোপন উত্তেজনা, অপেক্ষা ও অস্থিরতা।

এই কবিতার সৌন্দর্য হলো— এখানে প্রেম ঘটছে না, প্রেমের আগমনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
একটি প্রেমের কবিতা, কিন্তু খুব সূক্ষ্ম। এখানে প্রেম শুরু হওয়ার আগের সেই অদ্ভুত অনুভূতি; কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এই অস্থির অপেক্ষার সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। যেন হৃদয় আগে থেকেই জানে।

এবার আরও একটা কবিতার কথা না বললেই নয়। কবিতার নাম ‘কাঁপন’।

Стрепња (Tremble) — কাঁপন
ভাবানুবাদ (আংশিক)

আমি তোমাকে ভালোবাসি
কিন্তু সেই ভালোবাসার কথা বলতে ভয় পাই।
যেন শব্দে উচ্চারণ করলেই
ভেঙে যাবে নরম কোনো স্বপ্ন।

আমি চাই তুমি থাকো
কিন্তু এতটা কাছে নয়,
যে তোমার উপস্থিতি
আমার এই মধুর কাঁপনকে থামিয়ে দেয়।
কারণ অপেক্ষার ভেতরেই আছে সুখ,
অপ্রাপ্তির ভেতরেই আছে আলো।

যখন তুমি দূরে থাকো
আমার হৃদয় তোমাকে কল্পনায় আরও সুন্দর করে তোলে।
আমি চাই না সবকিছু সহজ হয়ে যাক,
চাই না সব রহস্য শেষ হয়ে যাক।

এই অদ্ভুত ভয়, এই নরম কাঁপন
এটাই তো প্রেমের সবচেয়ে গভীর মুহূর্ত।

এই কবিতা প্রেমের ভয়ের কথা বলে। ভালোবাসা যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি হারানোর ভয়ও তৈরি করে। প্রেমে পড়া মানে শুধু সুখ নয় একটা নরম কাঁপুনিও।

 

Пролећна песма (Spring Poem) — বসন্তের গান
ভাবানুবাদ (আংশিক)

বসন্ত এসে গেছে
পৃথিবী যেন নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে।
গাছের ডালে ডালে আলো জেগে উঠেছে,
মাটির ভেতর থেকে উঠে আসছে সবুজের গান।
হৃদয় হঠাৎ অকারণে হালকা লাগে,
যেন অজানা সুখ ডাক দিচ্ছে দূর থেকে।

বাতাসে ভেসে আসে নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি,
অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
এই ঋতু শুধু প্রকৃতির নয়
মানুষের ভেতরেও বসন্ত জাগে।
পুরোনো দুঃখ ঝরে পড়ে পাতার মতো,
নতুন স্বপ্ন জন্ম নেয় নীরবে।

কারণ বসন্ত মানে
আবার শুরু করা,
আবার বিশ্বাস করা,
আবার ভালোবাসতে শেখা।

এখানে বসন্ত শুধু ঋতু নয়, নতুন জীবনের প্রতীক। প্রকৃতি জেগে ওঠার সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের জেগে ওঠার মিল দেখানো হয়েছে। খুব প্রাণবন্ত ও আশাবাদী।

 

Опомена (Warning) — সতর্কতা
ভাবানুবাদ (আংশিক)

শোনো
মানুষকে আঘাত কোরো না,
কারণ প্রতিটি আঘাত ফিরে আসে
অদৃশ্য কোনো পথে।
যে চোখে তুমি অশ্রু এনে দাও,
একদিন সেই অশ্রুই
তোমার পৃথিবী ভাসিয়ে দিতে পারে।

অহংকারে ভর করে
কাউকে ছোট কোরো না
সময় খুব নীরবে
সব হিসাব রেখে দেয়।
ভালোবাসা নষ্ট করা সহজ,
বিশ্বাস ভাঙা আরও সহজ
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি
দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।

মনে রেখো
পৃথিবী শুধু শক্তির নয়,
এটি স্মৃতি আর বিবেকেরও।

এটি মানবিকতার কবিতা। মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে অহংকার, নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধ এসব শেষ পর্যন্ত মানুষকেই ধ্বংস করে। নৈতিক ও দার্শনিক সুর খুব শক্তিশালী।

 

На бури (In the Storm) — ঝড়ের মাঝে
ভাবানুবাদ (আংশিক)

ঝড় উঠেছে
আকাশ অন্ধকার, পথ অচেনা,
সবকিছু কেঁপে উঠছে হাওয়ার তীব্রতায়।
তবু আমি দাঁড়িয়ে আছি
কারণ বিশ্বাস এখনো ভাঙেনি।
দূরে কোথাও আলো আছে,
যদিও চোখে পড়ে না।

ঝড় সবকিছু কেড়ে নিতে পারে
ছাদ, পথ, নিশ্চিন্ত ঘুম
কিন্তু ভেতরের সাহস
কেউ নিতে পারে না।

যারা ঝড় পেরিয়ে যায়,
তাদের চোখে অন্যরকম আকাশ থাকে।
কারণ প্রতিটি ঝড়ের শেষে
একটা শান্ত সকাল অপেক্ষা করে।

ঝড় এখানে বাস্তবও, আবার প্রতীকও। জীবনের জটিল সময় সংগ্রাম, দাঁড়িয়ে থাকার সাহস এই কবিতার মূল কথা ও শক্তি।

 

Тражим помиловање (I Seek Amnesty) — ক্ষমা চাই
ভাবানুবাদ (আংশিক)

আমি ক্ষমা চাই
শুধু নিজের জন্য নয়,
আমার ভুল, আমার অহংকার
যা অন্যের উপর চাপিয়েছে, তার জন্যও।
আমি চাই ন্যায়
কিন্তু সেই ন্যায় শুধুই বিচার নয়,
এটি বোঝার, মেনে নেওয়ার, সহানুভূতির ন্যায়।

যুদ্ধ ও অশান্তির স্মৃতি ভাঙে না,
অতীত এখনও আমাদের চোখে ঝলসে।
তবু আমি বিশ্বাস করি
ক্ষমা হলো শক্তি, ক্ষমা হলো মুক্তি।
শ্রদ্ধা, দয়া, এবং শান্তির পথ খুঁজে
আমি ভ্রান্তির দায় স্বীকার করি,
কারণ শুধুই ক্ষমার মধ্য দিয়ে
মানবতার সঙ্গে শান্তি সম্ভব।

এটি তাঁর সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক কবিতাগুলোর একটি। ক্ষমা, বিচার, ন্যায় এই প্রশ্নগুলো নিয়ে লেখা। ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের সংলাপও বলা যায়।

 

Покошена ливада (Sheared Meadow) — কাটা ঘাসের মাঠ
ভাবানুবাদ (আংশিক)

কাটা ঘাসের মাঠ যেন
জীবনের অমর ক্ষণগুলোর প্রতীক।
যেখানে একসময় সবুজ ছড়ানো ছিল,
সেখানে এখন নিস্তব্ধতা, খালি জায়গা।
এটি শুধু প্রকৃতির নয়,
মানুষের অভিজ্ঞতারও চিত্র।

যতই সময় এগোয়, যতই জীবন কাটে,
কিছু স্মৃতি কেটে পড়ে যায়, কিছু ছেঁড়া থাকে।
তবু ঘাসের নিচে লুকানো
নতুন শিকড় জন্ম নেয়
প্রদীপ জ্বলে নতুন শুরুতে,
যেন ক্ষয়কে জয় করার আশা।

সব মিলিয়ে তাঁর কবিতার জগৎ খুব মানবিক। প্রেম আছে, ভয় আছে, দেশ আছে, ইতিহাস আছে, আর আছে মানুষের প্রতি গভীর বিশ্বাস। চাইলে নির্দিষ্ট কোনো কবিতা নিয়ে আরও গভীরে যেতে পারি।

ডেসাঙ্কা মাকসিমোভিচের প্রধান কবিতার বই

পেসমে (Pesme) – ১৯২৪, ভরত দেন্তিঞ্জস্তভো, পেসমে (Vrt detinjstva, pesme) – ১৯২৭, জেলেনি ভিতেজ, পেসমে (Zeleni vitez, pesme) – ১৯৩০, গোজবা না লিভাদি, পেসমে (Gozba na livadi, pesme) – ১৯৩২, নোভে পেসমে (Nove pesme) – ১৯৩৬, রাসপেভানে প্রিচে (Raspevane priče) – ১৯৩৮, শারেনা তোরবিকা, ডেচ্জে পেসমে (Šarena torbica, dečje pesme) – ১৯৪৩, ওস্লোবোডজেনজে চভেতে অ্যান্ড্রিচ, পোএমা (Oslobođenje Cvete Andrić, poema) – ১৯৪৫, পেসনিক ই জাভিচাজ, পেসমে (Pesnik i zavičaj, pesme) – ১৯৪৫, ওতাজ্ববিনা উ প্রভোমায়স্কাজ পোভোরচি, পোএমা (Otadžbina u prvomajskој povorci, poema) – ১৯৪৯, ওতাজ্ববিনো, তু সাম (Otadžbino, tu sam) – ১৯৫১, ভেত্রোভা উসপাভাঙ্কা (Vetrovа uspavanka) – ১৯৫৩, ওটভোরেন প্রোজর, রোমান (Otvoren prozor, roman) – ১৯৫৪, মিরিস জেমলে, ইজাবরানে পেসমে (Miris zemlje, izabrane pesme) – ১৯৫৫, বাইজকা ও ক্রাতকভেচনোই (Bajka o Kratkovecnoj) – ১৯৫৭, আকো জে ভেরোভাতি ময়োজ বাকি, প্রিচে (Ako je verovati mojoj baki, priče) – ১৯৫৯, জারোবলজেনিক স্নোভা (Zarobljenik snova) – ১৯৬০, গোভারি টিখো, পেসমে (Govori tiho, pesme) – ১৯৬১, পাটুলজকোভার তায়না, প্রিচে (Patuljkova tajna, priče) – ১৯৬৩, পটিজসে না চেসমি, পেসমে (Ptice na česmi, pesme) – ১৯৬৩, ত্রাজিম পোমিলোভানজে, লিরস্কা ডিসকুসিয়া (Tražim pomilovanje, lirska diskusija) – ১৯৬৪, হোচু দা সে রাদুজেম, প্রিচে (Hoću da se radujem, priče) – ১৯৬৫, জিয়াচ্কো সার্সে (Đačko srce) – ১৯৬৬।

এগুলো প্রধান কবিতার বই। কিছু বই শিশুদের জন্য লেখা, আবার কিছু জাতীয় চেতনা, প্রেম ও মানবিকতার উপর কেন্দ্রিত। কেউ চাইলে ইংরেজি অনুবাদ পড়তে পারেন।
তার সেরা লাইন যা সার্বিয়ান প্রেমিক / প্রেমিকারা বলেন লিখেন। সরাসরি প্রেমিককে বলা অনুভূতি হিসেবে খুব আলোচিত—
Serbian (মূল)
“Jer sreća je lepa samo dok se čeka, dok od sebe samo nagoveštaj da.”

বাংলা ভাবানুবাদ
“কারণ সুখ সুন্দর থাকে শুধু অপেক্ষার ভেতর
যখন সে নিজেকে পুরো দেয় না, শুধু আভাস দেয়।”

এটাই ডেসাঙ্কার আসল প্রেমের দর্শন। প্রেম মানে শুধু পাওয়া নয়, অপেক্ষা, দূরত্ব আর আকাঙ্ক্ষার সৌন্দর্য।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত