২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Allamaprabhu was a 12th-century Lingayat-saint and Vachana poet (called Vachanakara) of the Kannada language, propagating the unitary consciousness of Self and Shiva. কবি ও ভাবুক সৈয়দ তারিক-এর গদ্য ও অনুবাদ— মেঘচিল।
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক
58

সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক

58

ভাবের দেশ

আল্লামা প্রভু: কন্নড়ভাষী সন্ত ও কবি

আল্লামা প্রভু (Allama Prabhu) দ্বাদশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত কন্নড়ভাষী সন্ত ও কবি। তিনি দক্ষিণ ভারতে লিঙ্গায়ত বা বীরশৈব ধর্মীয় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁকে প্রায়শই ‘মহাযোগী’, ‘আধ্যাত্মিক মায়েস্ত্রো’, ‘শূন্য-দর্শনের সাধক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি বাসবেশ্বর, চেন্নাবসবণ্না, অক্কা মহাদেবী সহ বহু শক্তিশালী ভক্ত-দার্শনিকদের সাথে একযোগে কাজ করেন এবং তাঁদের গুরুও ছিলেন। তাঁর রচনাগুলি মূলত ‘বচন’ নামে পরিচিত।

তাঁর জীবনীতে অনেক কিংবদন্তি ও রহস্যময় ঘটনা জড়িত, যা তাঁকে ভক্তি আন্দোলনের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব করে তোলে। আল্লামা প্রভুর কবিতা বচন সাহিত্য নামে পরিচিত। এগুলো গভীর দার্শনিক ও রহস্যময়। তাঁর কবিতায় সামাজিক রীতিনীতির সমালোচনা রয়েছে। তাঁর কবিতা শিব-ভক্তির মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধির পথ দেখায়। তাঁর দর্শন শিব-অদ্বৈতবাদ ভিত্তিক। এই দর্শন আত্মা ও ঈশ্বরের অভেদত্বের কথা বলে।

আল্লামা প্রভু ১২শ শতাব্দীর প্রথম দিকে কর্নাটকের এক গ্রামে পিতা নিরহঙ্কার ও মা সুজ্ঞানির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা এক নৃত্যশালার প্রধান ছিলেন। সঙ্গীতের তিনটি শাখাতেই তিনি পারদর্শী ছিলেন। আল্লামা নিজে মাদ্দলে নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে পারদর্শী ছিলেন। তিনি মন্দিরের বাদক হিসেবে কাজ করতেন।

স্ত্রীর অকাল মৃত্যুর পর এক গভীর আধ্যাত্মিক সংকটের মধ্যে তিনি পড়েন। সেখান থেকেই তাঁর জ্ঞানানুসন্ধান শুরু হয়। স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকার্ত হয়ে আল্লামা জাগতিক বন্ধন ত্যাগ করেন এবং চিত্তশান্তির আশায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন।

তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি এক পরিত্যক্ত গুহা-মন্দির খুঁজে পান। সেখানে তিনি গভীরভাবে ধ্যানে মগ্ন এক যোগীকে দেখতে পান। সেই যোগী আল্লামার হাতে শিবের প্রতীক লিঙ্গ তুলে দিয়ে দীক্ষা দেন এবং যোগসাধনার পথ দেখান। আল্লামা সেখানে বোধি বা জ্ঞানালোক লাভ করেন। তারপর তিনি ভ্রমণ শুরু করেন এবং বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তাঁর ‘শূন্যতত্ত্ব’ প্রচার করতে থাকেন।

তিনি লিঙ্গায়ত আন্দোলনের প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে আবির্ভূত হন। বাসবন্না, মহাদেবী আক্কা প্রমুখ সাধক-কবির সাথে তিনি যুক্ত হন। তাঁকে প্রায়শই ‘প্রভু’ বা ‘গুহেশ্বর’ নামে ডাকা হতো— এটি তাঁর গুহা-মন্দিরে বোধি লাভের ঘটনাকে নির্দেশ করে।

তিনি গান গেয়ে ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে তাঁর বাণী প্রচার করতেন। তাঁর জীবনের শেষ অংশে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশিলার কাছে কাদালিবনায় দেহরক্ষা করেন। কিংবদন্তি অনুসারে তিনি সেখানে লিঙ্গের সাথে একীভূত হন। তাঁর সমাধি কর্নাটকের গাদাগের কাছে মুলগুন্ডে অবস্থিত। আল্লামার জীবনীতে অনেক কিংবদন্তি আছে, যেমন তিনি গণপতির অবতার হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন।

Anubhava Mantap–এর চিত্রে ১২শ শতকের Basaveshwara ও অন্যান্য শরণদের প্রাণবন্ত আলোচনায় মগ্ন দেখা যায়, যার সভাপতিত্ব করছেন Allama Prabhu.Image source: The Hindu
Anubhava Mantap–এর চিত্রে ১২শ শতকের বসবেশ্বর ও অন্যান্য শরণদের প্রাণবন্ত আলোচনায় মগ্ন দেখা যায়, যার সভাপতিত্ব করছেন ​আল্লামা প্রভু Image source: The Hindu

​আল্লামা প্রভুর দর্শন ছিল লিঙ্গায়ত ধর্মের মূলনীতির উপর গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর চিন্তাধারার একটি মূল বিষয় হলো ​অদ্বৈতবাদ ও ঐক্য চেতনা। তাঁর দর্শনের প্রধান ভিত্তি হল আত্মা (Self) ও শিবের তথা ঈশ্বরের মৌলিক ঐক্য। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর বা শিব বাইরে কোথাও নেই, বরং প্রত্যেক মানুষের অভ্যন্তরেই বিরাজমান। তাঁর মতে, জীব ও শিবের এই একত্বের প্রত্যক্ষ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করাই হলো জীবনের চরম লক্ষ্য।

তিনি অদ্বৈতবাদী দর্শনকে শিব-ভক্তির সাথে যুক্ত করেন। তাঁর মতাদর্শে, ঈশ্বর নির্গুণ বা বিমূর্ত, কিন্তু সগুণ ভক্তির মাধ্যমে তাঁকে উপলব্ধি করা যায়। তাঁর দর্শন পঞ্চাচার (পাঁচটি আচরণবিধি) এবং ষটস্থল (শিবের সাথে একত্বের ধাপসমূহ) এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, যা ভক্তি থেকে শুরু করে শিবের সাথে চূড়ান্ত একত্ব পর্যন্ত পথ দেখায়।

​আল্লামা প্রভু শাস্ত্রের নিছক অনুসরণ বা আচার-অনুষ্ঠান কঠোরভাবে পালনের চেয়ে সরাসরি ও ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বাইরের ধর্মীয় প্রতীক, অলৌকিক শক্তি (সিদ্ধি), মন্দির পূজা এবং প্রথাগত ধর্মীয় রীতিনীতিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর আদর্শে সত্যিকারের ভক্তি হলো হৃদয়ের গুহায় ঈশ্বরকে খোঁজা।

​তাঁর দর্শন জাতিভেদ প্রথা, লিঙ্গ বৈষম্য ও সামাজিক ভেদাভেদের ঘোর বিরোধী ছিল। তিনি একটি ন্যায় ও সমতাপূর্ণ সমাজের পক্ষে কথা বলতেন, যা তাঁর সমসাময়িক লিঙ্গায়ত আন্দোলনের একটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল।

তিনি জাগতিক বিষয়সমূহ ও তার প্রতি মানুষের আসক্তি, যা ‘মায়া’ দ্বারা সৃষ্ট, তাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, মোক্ষলাভের জন্য এই অস্থির ও ক্ষণস্থায়ী জগৎ থেকে মুক্তি পাওয়া অপরিহার্য। তিনি মায়া বা ভ্রান্তিকে সুপারফিশিয়াল ইল্যুশন হিসেবে দেখেন, যা সত্য জ্ঞানের মাধ্যমে অতিক্রম করা যায়।

দর্শনে তিনি যোগ, জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের সংশ্লেষণ করেন, যা শিবযোগ নামে পরিচিত। আল্লামা বিশ্বাস করতেন যে ভাষা দিয়ে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা বা অনুভবকে পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। তাই তাঁর কবিতা রহস্যময় ও প্যারাডক্সিক্যাল।

তাঁর দর্শন উপনিষদ, বৌদ্ধধর্ম ও শৈব আগম থেকে প্রভাবিত, কিন্তু লিঙ্গায়ত ধর্মের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন: “যেখানেই পা পড়ে, সেখানেই তীর্থস্থান।” এটি তাঁর অদ্বৈতবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

আল্লামা প্রভুর জীবন ও দর্শন শুধু দ্বাদশ শতকেই নয়, বরং পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা ও সাহিত্যের ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করেছে। তিনি কেবল একজন কবি নন, ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক বিপ্লবী, যিনি সমাজের গতানুগতিকতা ও কৃত্রিমতার বিপরীতে একটি সর্বজনীন ও মানবকেন্দ্রিক অধ্যাত্মপথের সন্ধান দিয়েছিলেন

​আল্লামা প্রভু দ্বাদশ শতাব্দীর লিঙ্গায়ত আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি ছিলেন। তিনি লিঙ্গায়ত আন্দোলনের ‘ত্রিত্ব’ তথা তিন রত্নের একজন। অন্য দুজন ছিলেন বসবন্ন ও আক্কা মহাদেবী। বসবন্ন ‘অনুভব মন্তপ’ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এটি লিঙ্গায়ত সন্তদের আলোচনা ও আধ্যাত্মিক বিতর্কের কেন্দ্র ছিল। আল্লামা এতে আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দেন।

আল্লামা অন্যান্য সন্তদের দীক্ষা দিয়েছেন। বিবরণ আছে, তিনি যোগের মাধ্যমে— স্পর্শ, দৃষ্টি বা কথার দ্বারা— আধ্যাত্মিক শক্তি প্রেরণ করতে পারতেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি মুক্তায়ী, বসবা ও সিদ্ধরামাকে নির্বিকল্প সমাধিতে দীক্ষিত করেন।

তাঁর বক্তব্য ও কবিতাগুলি প্রথাগত আচার, সামাজিক ভেদাভেদ ও আড়ম্বরপূর্ণ পূজাপদ্ধতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। লিঙ্গায়ত আন্দোলনকে সমতা-ভিত্তিক করে তোলার জন্য তিনি ভূমিকা পালন করেন, যা ১২শ শতাব্দীর এক বিপ্লবী পদক্ষেপ ছিল।

কন্নড় ​সাহিত্যে আল্লামা প্রভুর প্রধান কাজ হলো তাঁর রচিত কবিতা বা বচন। প্রায় ১,৩০০টি বচন তাঁর নামে প্রচলিত আছে। এই বচনগুলি লিঙ্গায়ত সাহিত্যের এক মূল্যবান অংশ। ​তার কবিতাগুলো এক অনন্য কাব্যশৈলীর অধিকারী। এই কাব্যশৈলী রহস্যময়, মরমি, গূঢ়ার্থক ও বিপরীতার্থক উপাদানে সমৃদ্ধ। এই শৈলী ‘বেডাগু মোড’ (Bedagu mode) নামে পরিচিত, যা পাঠককে গভীরভাবে চিন্তা করতে এবং আপাত-বিপরীত অর্থ থেকে সত্যকে আবিষ্কার করতে উৎসাহিত করে। এগুলো একরকম ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘উলট ভাষা’। ​তাঁর বচনগুলির প্রধান বিষয়বস্তু হলো ​শিবের প্রতি ভক্তি এবং শিবের সঙ্গে আত্মার মিলন। পরবর্তীকালে তার বাণী ‘শূন্যসম্পাদনে’ (Shunya Sampadane) সংকলিত হয়, যা লিঙ্গায়ত ধর্মের মূল গ্রন্থ।

আল্লামা প্রভুর জীবন ও দর্শন শুধু দ্বাদশ শতকেই নয়, বরং পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা ও সাহিত্যের ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করেছে। তিনি কেবল একজন কবি নন, ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক বিপ্লবী, যিনি সমাজের গতানুগতিকতা ও কৃত্রিমতার বিপরীতে একটি সর্বজনীন ও মানবকেন্দ্রিক অধ্যাত্মপথের সন্ধান দিয়েছিলেন।

আল্লামা প্রভু এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ও কবিতা ভক্তি আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর রচিত বচনসমূহ আজও আধ্যাত্মিকতা-সন্ধানী ও সাহিত্যরসিকদের জন্য প্রেরণার উৎস। তাঁর দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক, যা সমতা, আত্ম-উপলব্ধি ও ঈশ্বর-ভক্তির মাধ্যমে মানবজীবনকে উন্নত করে। তাঁর বচনগুলো কালজয়ী। এগুলো ভারতীয় দর্শনের এক অমূল্য সম্পদ।

Bhaber Desh-Special Sufi Series by Poet Syed Tarik-Meghchil

আ ল্লা মা  প্র ভু র  কি ছু  ব চ ন

১.
আমি গন্ধকে পালাতে দেখলাম
যখন ভ্রমর এল;
কি অদ্ভুত!
আমি বুদ্ধিকে পালাতে দেখলাম
যখন হৃদয় এল।
আমি মন্দিরকে পালাতে দেখলাম
যখন ঈশ্বর এল।

২.
বাঘের মাথাওয়ালা হরিণ,
হরিণের মাথাওয়ালা বাঘ,
কোমরে কোমরে যুক্ত।
দেখো, অন্য একটি এসে কাছাকাছি দাঁত চালাতে লাগল
যখন মাথাহীন শুঁড় শুকনো পাতায় চরে বেড়ায়।
দেখো, সবই মিলিয়ে যায়,
হে গুহেশ্বর!

৩.
তুমি যদি বলো শিব মন্দিরেই আছেন,
তবে সর্বত্র কে রয়েছেন?
তুমি যদি বলো শিব মূর্তিতেই আছেন,
তবে এই বিশ্ব কে সৃষ্টি করল?

৪.
যখন চেতনা শূন্য হয় সকল চিন্তা থেকে,
তখন প্রভু প্রবেশ করেন।
মন্ত্র নয়, আচার নয়—
শুধু নিঃশব্দতাই তাঁকে ডাকে।

৫.
তাঁর কৃপার সামনে আমার জ্ঞান ধূলিমাত্র।
তাঁর মৌনের পাশে আমার যোগ অহংকার মাত্র।
তাঁর সুরের মধ্যে আমার শব্দ নিছক কোলাহল।

৬.
জাত কিংবা কর্মফল নিয়ে প্রশ্ন করো না।
যখন হৃদয়ে প্রেম জেগে ওঠে,
তখন জন্ম-মৃত্যু সব বিলুপ্ত হয়—
থাকে শুধু প্রিয়তম।

৭.
আমার কী প্রয়োজন শাস্ত্রের?
কী দরকার মন্ত্র আর পুরোহিতের?
যে জানে অন্তরের শূন্যতা,
সে জানে সবকিছু।

৮.
এই শরীরই মন্দির,
আর প্রাণই সেই ঈশ্বর।
তবে বাইরে কেন খোঁজো তাঁকে,
যখন তিনি রয়েছেন তোমার নিঃশ্বাসেই?

৯.
কেউ বলে: তিনি আছেন আসমানে,
কেউ বলে: গভীর পাতালে।
কিন্তু যে দেখে নিজের ভিতরে,
সে দেখে, তিনি বসে আছেন, চেয়ে আছেন।

১০.
প্রভু নাই কোনো তীর্থে,
নাই শাস্ত্রে বা আচারে।
তিনি আসেন কেবল—
যখন ‘আমি’ মিলিয়ে যায়।

১১.
আমি পরেছিলাম উপবীত,
কিন্তু তা সত্যে পৌঁছায়নি।
আমি তা ফেলে দিয়েছি—
এখন নিঃশব্দতাই আমাকে বেঁধেছে।

১২.
জপমালা গুনে গুনে নয়,
উপবাসে নয় বা উৎসবেও নয়—
মনকে গলিয়ে ফেললেই,
প্রভুর সঙ্গে মিলন ঘটে।

১৩.
শূন্যতার ঘরে তিনি থাকেন,
নাম নেই, রূপ নেই তাঁর।
তুমি যাকে ‘ঈশ্বর’ বলো—
তা শুধু তোমার আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি।

১৪.
ওহে মন, ফেলে দাও চাতুর্য তোমার,
ভাবনাতে মন্দির নির্মাণ করো না।
দেবতা থাকেন না নকশায়—
থাকেন উপস্থিতিতে।

১৫.
যতক্ষণ খুঁজেছি,
তিনি ছিলেন অদৃশ্য।
যখন খোঁজা থামালাম,
তিনি এসে বসলেন আমার ভিতরে।

১৬.
তোমরা জিজ্ঞেস করো না আমার জাত,
আমার নাম, আচার, নিয়ম।
বরং জানতে চাও— কী জ্বলছে আমার ভিতরে,
আর জ্বলে গিয়ে কী থাকে অবশিষ্ট।

১৭.
শাস্ত্র বলেছে তাঁর কথা,
কিন্তু দেখাতে পারেনি।

গুরু বলেছে তাঁর কথা,
অথচ পৌঁছে দিতে পারেনি।

কিন্তু নিঃশব্দতা—
সে তাঁকে ডেকে এনেছে।

১৮.
শব্দ হচ্ছে বেড়া,
চিন্তা হলো ফাঁদ।
তিনি প্রবাহিত হন এই দুইয়ের মধ্যকার শূন্যতায়।

১৯.
কেন মাখো পবিত্র ভস্ম,
যদি হৃদয় ঢেকে থাকে অহংকারে?

২০.
আমি খুঁজেছি তাঁকে মন্ত্রে,
পবিত্র অগ্নিশিখায়,
পাহাড়ি গুহায়—
কিন্তু তিনি ছিলেন সেই নিঃশ্বাসে,
যাকে আমি অবহেলা করেছি।

২১.
কাঠ না শুকালে আগুন জ্বলে না।
আমিত্ব না শুকালে ভক্তি জাগে না।

২২.
না আমি জন্ম, না মৃত্যু—
আমি তাদের মধ্যকার বিস্তৃত শূন্যতা।
আমি ঢেউ নই—
আমি সেই সমুদ্র।

২৩.
তাদের এত খোঁজাখুঁজি সত্ত্বেও,
তারা দেখতে পায় না
আয়নার ভেতরের সেই প্রতিচ্ছবি।

২৪.
এটি জ্বলজ্বল করে
দুই ভ্রূর মাঝখানে আজ্ঞাচক্রে।
যে এই সত্য জানে—
সে-ই ঈশ্বরকে ধারণ করে।

২৫.
যদি আগুনের বৃষ্টি ঝরে
তবে হতে হবে তোমাকে জলের মতো।

যদি জলেরই প্লাবন আসে,
তবে হতে হবে বাতাসের মতো।

যদি সেটি হয় মহাপ্রলয়,
তবে হতে হবে আকাশের মতো।

আর যদি সেটি হয়
সকল জগতের চূড়ান্ত মহাপ্লাবন,
তবে আত্মকে বিসর্জন দিয়ে
হয়ে যেতে হবে পরমেশ্বর।

২৬.
আলো গিলে ফেলল অন্ধকারকে।
আমি একা ছিলাম ভেতরে।
দৃশ্যমান অন্ধকার ঝরিয়ে ফেলে,
আমি হয়ে উঠলাম তোমার লক্ষ্যবিন্দু,
হে গুহার প্রভু।

২৭.
তোমার আলো খুঁজতে বের হলাম আমি।
তা যেন হঠাৎ একটি ভোর,
যেখানে কোটি কোটি সূর্য উদিত।
বিদ্যুতের স্নায়ু-জাল যেন বিস্ময়ের আবরণে ঢাকা।
হে গুহার প্রভু,
তুমি যদি আলো হয়ে থাকো—
তবে আর কোনো উপমা চলে না।

২৮.
দেখো, দুটি পা হলো দুটি চাকা,
দেহটা একটা মালগাড়ি।

পাঁচজন চালক চালায় তাকে,
তাদের একটিও অন্যটির মতো নয়।

যদি তুমি এই রথ চালাতে না জানো,
তবে তার চক্রভ্রংশ অনিবার্য।

হে গুহেশ্বর!

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত