২৩ জানুয়ারি ২০২৬
Virgilio Piñera was a Cuban author, playwright, poet, short story writer, essayist and translator. Virgilio Piñera's Story 'The Meat' (Mangsho) Tr by Ahsanul Karim-Meghchil
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
আহসানুল করিম
কবি ও অনুবাদক
107

আহসানুল করিম
কবি ও অনুবাদক

107

বিরগিলিও পিনিয়েরা'র গল্প

মাংস

বিরগিলিও পিনিয়েরা (১৯১২–১৯৭৯) ছিলেন একজন কিউবান লেখক, নাট্যকার, কবি, ছোটগল্পকার, প্রবন্ধকার এবং অনুবাদক। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— কবিতা লা ইসলা এন পেসো (১৯৪৩), ছোটগল্পের সংকলন কুয়েনতোস ফ্রিওস (১৯৫৬), উপন্যাস লা কার্নে দে রেনে (১৯৫২) এবং নাটক ইলেক্ট্রা গারিগো (১৯৫৯)।
পিনিয়েরা কিউবান সাহিত্যের অন্যতম সেরা লেখকদের একজন হিসেবে স্বীকৃত। তার রচনায় এলিয়েনেশন, অ্যাবসার্ড এবং পাগলামির মতো বিষয়গুলো দেখা যায়।

• মার্ক শেফার-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায়ন: আহসানুল করিম

Virgilio Piñera Llera (August 4, 1912 – October 18, 1979) was a Cuban author, playwright, poet, short story writer, essayist and translator. Virgilio Piñera's Story 'The Meat' (Mangsho) Tr by Ahsanul Karim-Meghchil
Virgilio Piñera. Image source: Virgilio Piñera: Poesía, Nación y Diferencias (book cover)

ঘটনাটা ঘটেছিল খুব সহজভাবে, কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই। আপাতত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাচ্ছি না, কিন্তু কতগুলো কারণে শহরে মাংসের সংকট দেখা দিয়েছিল। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল আর চারদিকে বেশ তিক্ত সব মন্তব্য শোনা যাচ্ছিল। এমনকি প্রতিশোধের কথাও উঠেছিল। কিন্তু বরাবরের মতোই প্রতিবাদগুলো হুমকি-ধামকির বাইরে আর এগোয়নি। অল্প দিনের মাঝেই কষ্টে থাকা শহরবাসী নানারকম সবজি খেয়ে দিন কাটাতে শুরু করল।

শুধু মি. আনসালদোই নিয়ম মানলেন না। অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে তিনি রান্নাঘরের বিশাল এক ছুরি শান দিলেন, তারপর পরনের প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত নামিয়ে নিজের বাঁ নিতম্ব থেকে সুন্দর একতাল মাংস কেটে নিলেন। মাংসের এই কাটা টুকরো পরিষ্কার করে তাতে লবণ আর ভিনেগার মাখিয়ে সেটিকে ব্রয়লারে দিলেন এবং অবশেষে রবিবারে যে তাওয়ায় রুটি বানানো হয় সেই তাওয়ায় ভাজলেন। তারপর টেবিলে বসে নিজের শরীরের দারুণ মাংস উপভোগ করতে লাগলেন। ঠিক তখনি দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। আনসালদোর পড়শি। নিজের হতাশা উগরে দিতে এসেছে। আনসালদো বেশ মার্জিত ভঙ্গিতে পড়শিকে সেই সুন্দর মাংসের টুকরোটা দেখালেন। পড়শি যখন বিস্তারিত জানতে চাইল, আনসালদো কেবল নিজের বাঁ নিতম্বটি দেখিয়ে দিলেন। সত্য বেরিয়ে এলো। আবেগে অভিভূত হয়ে প্রতিবেশী কোন কথা না বলে বেরিয়ে গেলো এবং অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই শহরের মেয়রকে ধরে সাথে করে নিয়ে ফিরে এলো। মেয়র সাহেব আনসালদোকে জানালেন তাঁর গভীর ইচ্ছার কথা। তিনি চান তাঁর প্রিয় শহরবাসীও যেন আনসালদোর মতোই নিজেদের ব্যক্তিগত ভাণ্ডার অর্থাৎ প্রত্যেকে নিজের শরীরের মাংস থেকেই পুষ্টি অর্জন করতে পারে। বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি হল। কিছু সুশীল লোকজনের ক্ষোভ প্রকাশের পরও আনসালদো শহরের প্রধান চত্বরে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি উপস্থাপন করলেন তার নিজের ভাষায় ‘জনসাধারণের জন্য একটি ব্যবহারিক প্রদর্শনী।’

সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি ব্যাখ্যা করলেন, কীভাবে প্রত্যেক ব্যক্তি তার বাঁ নিতম্ব থেকে দুটি করে পাতলা টুকরো কাটতে পারবে। সাথে সাথে তিনি ঝকঝকে একটি মাংসের হুকে ঝুলিয়ে রাখা চামড়ার রঙের প্লাস্টারের তৈরি মডেল দেখালেন। দেখালেন কীভাবে একটি নয়, দুটি টুকরো কাটতে হয়। কারণ যদি তিনি নিজে তার বাঁ নিতম্ব থেকে একটা সুন্দর দেখে টুকরো কেটে নিতে পারেন, তবে কারও এক টুকরো কম খাওয়ার কোনো কারণ নেই। এই বিষয়গুলো ভালোভাবে দেখানোর পর প্রত্যেকে নিজের বাঁ নিতম্ব থেকে দুটি করে মাংসের পাতলা টুকরো কাটতে শুরু করল। সে এক গৌরবময় দৃশ্য। তবে এর বিস্তারিত বর্ণনা যেন না দেওয়া হয় সে ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর হিসাব করা হলো মাংসের এই যোগানে শহরের কতদিন চলবে। এক বিশিষ্ট চিকিৎসক ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে একশ পাউন্ড ওজনের একজন মানুষ (অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অন্যান্য অখাদ্য অংশ বাদ দিয়ে) দিনে আধা পাউন্ড হারে একশ চল্লিশ দিন মাংস খেতে পারবে। হিসাবটি অবশ্যই কিছুটা বিভ্রান্তিকর ছিল। আর আসল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, প্রত্যেকেই যেন নিজের চমৎকার মাংস খেতে পারে।

শিগগিরই নারীদের মুখে মি. আনসালদোর পরিকল্পনার সুবিধার কথা শোনা যেতে লাগল। উদাহরণস্বরূপ, যারা নিজেদের স্তন খেয়ে ফেলেছিল, তাদের আর শরীর কাপড়ে ঢাকার প্রয়োজন রইল না। ফলে তাদের পোশাক নাভির ঠিক ওপর পর্যন্তই নামল। সবাই না হলেও কিছু নারী একেবারেই আর কথা বলল না, কারণ তারা নিজেদের জিহ্বা গিলে ফেলেছিল (বলে রাখা ভালো, এককালে যা রাজাদের কাছে ছিল বিশেষ উপাদেয় খাবার)। রাস্তায় সবচেয়ে মজার যে দৃশ্যগুলো দেখা গেল তার মাঝে রয়েছে এমন কিছু: দুই নারী যারা বহুদিন একে অপরকে দেখেনি তারা একে অপরকে চুমু খেতে পারল না। কারণ দুজনেই নিজেদের ঠোঁট ব্যবহার করে দারুণ উপাদেয় কিছু পাকোড়া বানিয়েছিল। কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক একজন আসামির মৃত্যুদণ্ডে সই করতে পারলেন না, কারণ তিনি নিজের আঙুলের নরম ডগাগুলো খেয়ে ফেলেছিলেন, যা কিনা শ্রেষ্ঠ ভোজনরসিকদের মতে (যাদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক নিজেও একজন) বহুল ব্যবহৃত ‘আঙুল চেটে খাওয়া’ বাক্যাংশটির সার্থক ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।

আনন্দমুখর সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে বর্ণিল ঘটনাগুলোর একটি ছিল শহরের বিশিষ্ট ব্যালে নৃত্যশিল্পীর শরীরের শেষ মাংসটুকু কেটে ফেলা। নিজের শিল্পকলার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে তিনি তাঁর সুন্দর পায়ের আঙুলগুলো একেবারে শেষের জন্য রেখে দিয়েছিলেন

সামান্য কিছু প্রতিবাদ দেখা গিয়েছিল। নারীদের পোশাক তৈরির শ্রমিকদের ইউনিয়ন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের প্রতিবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেছিল। কর্তৃপক্ষ উত্তরে জানিয়েছিল যে এমন কোনো স্লোগান তৈরি করা সম্ভব নয় যা নারীদের আবার তাদের দর্জির কাছে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। এবং এই প্রতিবাদ কোন গুরুত্বই পেল না। অর্থাৎ কোনোকিছুই শহরবাসীর নিজেদের মাংস খাওয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারল না।

আনন্দমুখর সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে বর্ণিল ঘটনাগুলোর একটি ছিল শহরের বিশিষ্ট ব্যালে নৃত্যশিল্পীর শরীরের শেষ মাংসটুকু কেটে ফেলা। নিজের শিল্পকলার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে তিনি তাঁর সুন্দর পায়ের আঙুলগুলো একেবারে শেষের জন্য রেখে দিয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা লক্ষ্য করেছিল যে তিনি কয়েকদিন ধরে ভীষণ অস্থির। ততদিনে কেবল পায়ের একটি বুড়ো আঙুলের নরম ডগাটুকুই অবশিষ্ট ছিল তার। তিনি বন্ধুদের প্রক্রিয়াটি দেখতে আমন্ত্রণ জানালেন। রক্তমাখা নীরবতার মাঝখানে তিনি শেষ অংশটি কেটে ফেললেন এবং কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সেটি ঢুকিয়ে দিলেন সেই গহ্বরে, যা একসময় ছিল তাঁর সুন্দর মুখ। উপস্থিত সবাই হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে উঠল।

এদিকে জীবন চলতেই থাকে। সেটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর যদি কাকতালীয়ভাবে…? এই কারণেই কি নৃত্যশিল্পীর জুতো এখন ‘বিশেষ স্মারক জাদুঘর’-এর একটি কক্ষে পাওয়া যায়? নিশ্চিতভাবে শুধু এটুকুই বলা যায় যে শহরের সবচেয়ে স্থূলকায় মানুষদের একজন (যার ওজন চারশ পাউন্ডেরও বেশি ছিল) মাত্র পনেরো দিনের মধ্যেই নিজের ব্যবহারযোগ্য সমস্ত মাংসের ভাণ্ডার শেষ করে ফেলেছিল (লোকটা নাশতা ও মিষ্টি খাবারের ভীষণ ভক্ত ছিল, আর তাছাড়া তার পেট ভরতে বিপুল পরিমাণ খাবারের প্রয়োজন হতো)। কিছুদিন পর তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। স্পষ্টতই, সে আত্মগোপন করেছিল… কিন্তু আত্মগোপনে সে একাই যায়নি। আসলে আরও অনেকেই একই ধরনের আচরণ করতে শুরু করল। এক সকালে মিসেস অরফিলা যখন তাঁর ছেলেকে (যে তখন নিজের বাঁ কানটি খাচ্ছিল) জিজ্ঞেস করলেন কোনো একটা জিনিস সে কোথায় রেখেছে, কোন উত্তর পেলেন না। অনুরোধ কিংবা রাগারাগি কোনোটাই কাজে এল না। নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞকে ডাকা হলো। যেখানে মিসেস অরফিলা শপথ করে বলছিলেন প্রশ্ন করার মুহূর্তে তাঁর আদরের ছেলে ঠিক সেখানেই বসে ছিল, সেখানে শুধু একটা ছোটো মলের স্তূপ ছাড়া বিশেষজ্ঞ আর কিছুই দেখাতে পারলেন না। কিন্তু এই টুকটাক ঝামেলাগুলো শহরবাসীর সুখে বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটল না। যে শহরে জীবনধারণের নিশ্চয়তা আছে সেখানে আর অভিযোগ আসবে কোথা থেকে? মাংসের সংকট থেকে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সংকট কি স্থায়ীভাবে সমাধান হয়ে যায়নি? কিছু মানুষের এই উধাও হয়ে যাওয়া ছিল মূল সমস্যার পরিশিষ্ট মাত্র। মানুষের প্রয়োজনীয় আমিষের যোগান নিশ্চিত করার দৃঢ় সংকল্পকে তা কোনোভাবেই প্রভাবিত করেনি। এই উধাও হওয়ার সামান্য ঘটনাই কি প্রত্যেকের কাছ থেকে সেই মাংসের মূল্য আদায়? কিন্তু এখন আর এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা ছোটলোকি হবে। এই চিন্তাশীল সমাজ যেহেতু সমাধানটি নিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরিতৃপ্ত।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত