সুলতান বাহু ছিলেন সপ্তদশ শতকের একজন প্রখ্যাত পাঞ্জাবি সুফি সাধক, কবি, দার্শনিক ও মুরশিদ। তাঁর কবিতা ও দর্শন আজও দক্ষিণ এশিয়ার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর জন্ম হয়েছিল বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলে। তিনি কাদিরিয়া সুফি সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিলেন।
সুলতান বাহুর দর্শন মূলত ঐশ্বরিক প্রেম, আধ্যাত্মিক একত্ব ও হৃদয়ের শুদ্ধতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তি আধ্যাত্মিক অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান এবং আল্লাহর সাথে মিলনের মাধ্যমে সম্ভব।
তাঁর কবিতা পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত। এগুলো কাফি ও কাওয়ালি গানের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে। তাঁর কার্যাবলি শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ একসাথে মিলিত হতে পারে।
সুলতান বাহুর জন্ম হয় ১৬৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি, মুঘল সাম্রাজ্যের লাহোর সুবাহের শোরকোটে। এটি বর্তমান পাকিস্তানের ঝাঙ্গ জেলা। তাঁর পিতা বায়াজিদ মুহাম্মদ ছিলেন মুঘল সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। তাঁর মাতা মাই রাস্তি-কুদস-সারা ছিলেন একজন ধার্মিক মহিলা। মা-ই তাঁকে প্রথম দিকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর পরিবার আওয়ান গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই গোত্র হজরত আলীর বংশধর বলে দাবি করে।
শৈশবেই তিনি ধার্মিকের প্রবণতা দেখিয়েছিলেন। তাঁর আত্মিক বিকাশের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন তাঁর মা। তিনি বলেছিলেন, “তুমি যদি খাঁটি ওলি হতে চাও, তবে এমন একজনকে খুঁজে নাও যিনি আল্লাহর প্রিয় (ওলি)।” কৈশোরে তিনি কৃষিকাজের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা ছেড়ে দিয়ে জঙ্গল আর কবরস্থানে ঘুরে বেড়াতেন। এইসময় সুফি হাবিবুল্লাহ খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনিই তাঁর প্রথম গুরু হন।
পরবর্তীকালে, প্রায় ১৬৬৮ সালে, তিনি দিল্লিতে গিয়ে সৈয়দ আবদুর রহমান জিলানি দেহলভির কাছে কাদিরিয়া তরিকায় দীক্ষা নেন। এই গুরু আব্দুল কাদির জিলানির বংশধর ছিলেন। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি পাঞ্জাবে ফিরে আসেন।
তিনি চারবার বিয়ে করেন। তাঁর ঔরসে আটটি পুত্রের জন্ম হয়। তাঁর জীবনের বিস্তারিত ঘটনা মূলত ‘মানাকিব-ই সুলতানি’ নামক জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, যেটি তাঁর মৃত্যুর সাত প্রজন্ম পর লিখিত। তিনি মুঘল সম্রাট শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেবের শাসনকালে সক্রিয় ছিলেন।
১৬৯১ সালের ১ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয় ঝাঙ্গে। তাঁকে গার্হ মহারাজায় সমাহিত করা হয়। চেনাব নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে তাঁর মাজার দুবার স্থানান্তরিত হয়েছে। এখনও তাঁর দেহ অক্ষত বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রতি বছর তাঁর ওরস উদযাপিত হয়। এতে হাজার হাজার ভক্ত যোগ দেন।
সুলতান বাহুর দর্শন সুফিবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদ তথা আধ্যাত্মিক একত্ব তথা সত্তার অখণ্ডতার ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন — যা ইবনে আরাবির দর্শনে ব্যাপকভাবে আলোচিত। তাঁর মতে, আল্লাহই একমাত্র সত্যিকারের অস্তিত্ব, আর সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তাঁরই প্রকাশ।
তাঁর দর্শনে ইশক বা ঐশী প্রেম কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। তিনি মানব হৃদয়কে আল্লাহর প্রেমের জন্য একটি পাত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মানুষ তার আত্মা শুদ্ধ করতে পারে। সুফি সাধনার শেষ লক্ষ্য হিসেবে তিনি ফানার ধারণাকে গুরুত্ব দিয়েছেন — যেখানে সাধকের ব্যক্তিত্ব আল্লাহর সত্তায় বিলীন হয়ে যায়।

তাঁর দর্শনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে প্রেম এবং ভক্তির গুরুত্ব বেশি। তিনি বলতেন যে, পণ্ডিত্য বা বইয়ের জ্ঞান দিয়ে আল্লাহকে পাওয়া যায় না, বরং অশিক্ষিত প্রেমিকের হৃদয়ের ভক্তি দিয়ে পাওয়া যায়। তাঁর মতে, মানুষের সত্তায় ‘নফস-ই-আম্মারা’ (নিম্নতর আত্মা) এবং রুহের মধ্যে সংঘর্ষ চলে; এই সংঘর্ষ জয় করতে হলে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলকতার উপর জোর দিতেন—সব ধর্মের মানুষকে ভালোবাসা এবং সম্মান করা। তাঁর দর্শনে ধর্মীয় সেক্টরিয়ানিজম (সুন্নি-শিয়া বিভেদ) কোনো স্থান পায় না; তিনি বলতেন যে এসব হৃদয়ে জ্বালা সৃষ্টি করে। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে আল্লাহ ‘রাব্বুল আলামিন’—সমস্ত বিশ্বের পালনকর্তা, এবং মানুষকে সব সৃষ্টির প্রতি করুণা দেখাতে হয়।
তিনি ধর্মীয় পণ্ডিতদের সমালোচনা করতেন, যাঁরা ধর্মকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে। তাঁর দর্শনে সুফিবাদ শুধু অলৌকিকতা নয়, বরং হৃদয়ে আল্লাহকে স্থাপন করা। তিনি ‘ফকির’ (দরিদ্র) শব্দটিকে আধ্যাত্মিক ধনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁর নাম ‘বাহু’ (অর্থ: তাঁর সাথে) এবং কবিতায় ‘হু’ (তিনি) শব্দটি আল্লাহর একত্বের প্রতীক।
সুলতান বাহুর সাধনা ছিল তীব্র ও গভীর। তিনি কাদিরিয়া সম্প্রদায়ের অনুসরণ করে ‘সারওয়ারি কাদিরি’ নামক একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আব্দুল কাদির জিলানির শিক্ষার উপর ভিত্তি করে। তাঁর সাধনায় জিকর (আল্লাহর নাম স্মরণ) কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে—বিশেষ করে ‘হু’ শব্দের পুনরাবৃত্তি। তিনি ‘নফি-ইসবাত’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) জিকিরের বিশেষ পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে শারীরিক মৃত্যুর আগে আধ্যাত্মিক মৃত্যু (ফানা) অর্জন করতে হয়, যা নবি মুহাম্মদের (সা.) বাণী ‘মরার আগে মরো’ থেকে উদ্ভূত।
সুলতান বাহু একজন যোগ্য মুরশিদ বা আধ্যাত্মিক গুরুকে অত্যাবশ্যকীয় মনে করতেন। একজন কামেল মুরশিদের নির্দেশনা ছাড়া আধ্যাত্মিক পথ চলা অসম্ভব। তিনি বলতেন যে, গুরুর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে হয় — নিজেকে মৃতদেহের মতো মনে করে। তাঁর সাধনায় গুরু বা মুর্শিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুর প্রতি তাঁর প্রেম ও শ্রদ্ধা এতটাই গভীর ছিল যে তিনি বলেন, “যদি আমার শরীরের প্রতিটি কোষে চোখ থাকত, তবু আমি আমার গুরুর দিকে তাকিয়ে থাকতাম নিরন্তর।”
তাঁর সাধনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল বিশ্ব-বিমুখতা, রোজা ও ধ্যান। তিনি নফসে আম্মারা তথা নিম্নতর আত্মার সাথে জিহাদের উপর জোর দিতেন, যাতে নেতিবাচক গুণগুলোকে ইতিবাচক করে তোলা যায়। তাঁর সাধনায় ভালো কাজ, হৃদয়ের পবিত্রতা এবং নিয়তের সততা অপরিহার্য। তিনি আচার-অনুষ্ঠানকে সমালোচনা করতেন যদি তাতে হৃদয় না থাকে—যেমন, জলে স্নান করে আল্লাহ পাওয়া যায় না, কারণ তাহলে মাছ এবং ব্যাঙও পেত।
সুলতান বাহু ছিলেন একজন সুফি সন্ত যাঁর জীবন ও শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর দর্শন প্রেম ও সম্প্রীতির মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর সাধনা এবং কবিতা মানুষকে আধ্যাত্মিক পথে চলতে সাহায্য করে। তাঁর কার্যাবলি আন্তর্ধর্মীয় সংলাপের উদাহরণ
তিনি শরিয়ত (বাহ্যিক আইন), তরিকত (আধ্যাত্মিক পথ), হাকিকত (আধ্যাত্মিক সত্য) এবং মারিফত (জ্ঞান)-এর মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। তবে তিনি তাঁর জীবনে বারংবার জোর দিয়েছেন অন্তর্জগতের উন্মোচনের ওপর, বাহ্যিক রীতিনীতির ওপর নয়। তিনি বলেন, “হৃদয় যদি আল্লাহর স্মরণে জেগে থাকে, তবে বাহ্যিক ভঙ্গি মূল্যহীন।” যদিও কিছু রক্ষণশীল আলেম তাঁর দার্শনিক ধারণার সমালোচনা করেছেন, তবে সাধারণ মানুষ ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানীদের মধ্যে তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
সুলতান বাহুর কার্যাবলি ছিল বহুমুখী। তিনি অসংখ্য শিষ্য গ্রহণ করেন, যাঁরা তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং উপস্থিতি থেকে অনুপ্রাণিত হতো। তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকাহ ছিল একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা কেন্দ্র, যেখানে সাধকেরা একত্র হয়ে প্রার্থনা ও সাধনা করতেন। তাঁর দরবার সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল — মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা সিনাগগ থেকে আসা মানুষ স্বাগত হতো। তিনি ‘লঙ্গর’ (ফ্রি খাবার) বিতরণ করতেন, যা হিন্দু, শিখ এবং মুসলিম সবার জন্য উপযোগী। এটি আন্তর্ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক ছিল। তিনি মুহাররমের প্রথম থেকে দশম দিন পর্যন্ত কারবালার শহিদদের স্মরণে ওরস আয়োজন করতেন, যা আজও চলছে।
লেখা ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ। তিনি ফার্সিতে ১৪০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। আবিয়াত-ই-বাহু তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ।
এছাড়া নূর-উল-হুদা, আকল-উল-বায়ান, তুহফাত-উল-আরেফিন, রিসালা-ই-রুহি, কালিদ তাওহিদ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।
সুলতান বাহুর কবিতা পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত। এগুলো সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমে জনপ্রিয়। তাঁর কবিতার শৈলী সরল, গভীর ও হৃদয়স্পর্শী।
কবিতার বিষয়বস্তু আধ্যাত্মিকতা, প্রেম, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়। তাঁর কবিতা হলো সহজ কথায় ঈশ্বরভক্তির গভীর উন্মোচন। তাঁর কাব্যে ঈশ্বর মানে কোনো নির্জন বা দূরবর্তী সত্তা নয়, বরং এক অন্তরাত্মার অভিজ্ঞতা।
তাঁর কবিতায় ঐশ্বরিক প্রেম, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ও একত্বের অনুভূতি প্রকাশ পায়। তাঁর কবিতা প্রায়শই ‘হু’ দিয়ে শেষ হয়, যা আল্লাহর প্রতীক।
কবিতায় তিনি প্রায়শই প্রতীক ব্যবহার করেন — যেমন পাখি (বাজপাখি, কোকিল), নদী এবং বেলা (দ্বীপ)। তাঁর কবিতায় বারবার আত্মজ্ঞান অর্জনের বিষয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি তাঁর কবিতায় ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ সব মানুষের সমতার কথা বলেছেন। তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থ ‘আবিয়াত-ই-বাহু’ এবং ‘দিওয়ান-ই-বাহু।’
সুলতান বাহু ১৬৯১ সালে জীবন সংবরণ করেন। তাঁর দরগাহ পাকিস্তানের গড় মহারাজা শহরে অবস্থিত। এটি একটি বিখ্যাত সুফি পুণ্যস্থান। প্রতিবছর মহররম মাসের ৯ তারিখে সেখানে ওরস পালিত হয়, যেখানে কয়েক টন গোলাপজল দিয়ে তাঁর মাজার শরিফ ধোয়ানো হয়। এই রীতি পরিচালনা করেন তাঁর বংশধর সাজ্জাদা নশীন।
সুলতান বাহু ছিলেন একজন সুফি সন্ত যাঁর জীবন ও শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর দর্শন প্রেম ও সম্প্রীতির মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর সাধনা এবং কবিতা মানুষকে আধ্যাত্মিক পথে চলতে সাহায্য করে। তাঁর কার্যাবলি আন্তর্ধর্মীয় সংলাপের উদাহরণ। তাঁর উত্তরাধিকার তাঁর মাজার এবং রচনার মাধ্যমে বেঁচে আছে, যা লক্ষ লক্ষ ভক্তকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর কবিতা ও দর্শন আজও সুফি সংগীত ও আধ্যাত্মিক আলোচনায় জীবন্ত রয়েছে, যা তাঁর চিরায়ত আবেদন প্রমাণ করে।

সু ল তা ন বা হু র ক বি তা
১.
প্রত্যেকেই খোঁজে নিখুঁত বিশ্বাস,
খাঁটি ভালোবাসা খোঁজে খুব কম জনেই;
বিশ্বাস চায় তারা, ভালোবাসা নয়,
আমার হৃদয়ে তাই জমে ওঠে রাগ;
দিব্য যে-স্তরে তুমি প্রেমের জোরে পৌঁছে যেতে পার, বিশ্বাস তার খোঁজও রাখে না।
হে বাহু, ভালোবাসাকে সজীব রেখো,
বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে বলি এই কথা।
২.
প্রভু আমাকে বুঝিয়ে দিলেন,
‘যখনই তোমার প্রভুর কথা ভুলে থাকো অবহেলায়,
তখনই তাঁকে অস্বীকার করা হয়।’
কথাগুলো খুলে দিল আমার চোখ,
আমার সকল মনোযোগ নিবদ্ধ হলো প্রভুর দিকে।
তারপর আমার আত্মাকে সংরক্ষিত রাখলাম,
এই প্রেমই চর্যা করেছি আমার হৃদয়ে।
এইভাবে আমার আত্মাকে তাঁর কাছে সমর্পণ করে,
মৃত্যুর আগেই মরে গেলাম আমি তাঁর মধ্যে বেঁচে রইতে।
কেবল তখনই আমি জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলাম, হে বাহু।
৩.
জেগে ওঠো, চাঁদ, ছড়াও কিরণ আকাশে-আকাশে,
নীরব প্রার্থনায় তারকারা স্মরণ করছে তোমাকে,
তাদের হৃদয় সংবিৎ হারিয়েছে প্রত্যাশায়।
ভিখারির মতো আমরা দুনিয়ার অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াই,
অথচ নিজদেশে আমরা মণি-মাণিক্যের সওদাগর।
হায়, কাউকে যেন আপন দেশ ছাড়তে না হয়,
বিদেশ-বিভুঁইয়ে কেউ তো খড়কুটোর সমানও নয়।
এই দুনিয়া থেকে আমাদের তাড়াতে হাততালি দেবার দরকার নাই,
হে বাহু, আমরা আমাদের সেই-কবে-হারানো ঘরে ফিরে যেতে এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছি।
৪.
সাগরের চেয়েও হৃদয় অনেক গভীর,
কেই-বা এর রহস্য মাপতে পারে?
এর উপর দিয়ে বয়ে যায় ঝড়-ঝঞ্ঝা,
যখন সব জলযান পাল তুলে যায় ভেসে,
নাবিকেরা দাঁড় বায়।
হৃদয়ের মধ্যে আছে চৌদ্দটা মোকাম,
ক্যানভাসের তাঁবুর মতন ছড়ানো।
কেবল যারা জানে হৃদয়ের এইসব ভেদরহস্য,
তারাই জানতে পারে স্রষ্টাকে, ওহে বাহু।
৫.
আমার ভিতরে পাঁচটি বিশাল দালান আছে,
পাঁচটিই উজ্জ্বলতায় জ্বলে,
আরেকটি প্রদীপ দিয়ে কী প্রয়োজন আমার?
আমার তো আর হিসাব দেওয়ার কোনোই দরকার নাই
পঞ্চপ্রভু আর খাজনাদারের কাছে,
যারা ভিতরপথের দিকে বাধা হয়ে রয়।
পাঞ্জেগানা নামাজের ইমাম ডাকে বিশ্বাসীদের,
ভিতরেই যে মসজিদ আছে পাঁচখানা সেইখানে জাগে ডাক,
আরেকটা মসজিদ দিয়ে আমি করবটা কী?
প্রভু যদি কল্লাটি চান তোমার,
একটুও দ্বিধা করো না, হে বাহু,
তক্ষুণি নিবেদন করে দিও।
৬.
আমার সারা শরীর যদি চোখ আর চোখে ভরা থাকত,
আমি আমার প্রভুর দিকে অপলকে চেয়ে রইতাম ক্লান্তিবিহীনভাবে।
আহা! আমার শরীরের সবকটা ছিদ্র যদি লাখ-লাখ চোখ হয়ে যেত,
তাহলে কোনো চোখে যদি পাপড়ি পড়ত তো অন্যটি যেত মেলে।
কিন্তু তখনও তাকে দেখবার তৃষ্ণা আমার রয়ে যেত অতৃপ্তই,
আমি আর কী তবে করতে পারি?
আমার কাছে, হে বাহু, প্রভুকে একপলক দেখাটাই
লক্ষ লক্ষবার হজ করবার চেয়ে উত্তম।
৭.
আমার হৃদয়ে আল্লাহর নামের জুঁইফুল রোপণ করেছেন আমার গুরু।
এই ফুলের শিকড় গেড়ে উঠেছে গভীরে—
সৃষ্টিকে বাস্তব বলে মানতে অস্বীকার এবং
স্রেফ আল্লাহকেই একমাত্র বাস্তব সত্য হিসেবে গ্রহণ—
এই দুই সত্তাই পুষ্টি দিয়েছে তাকে।
যখন রহস্যের কুঁড়ি খুলে প্রকাশের ফুল হয়ে ফুটলো,
তখন আমার সমগ্র অস্তিত্ব ভরে গেল আল্লাহর সুবাসে।
যিনি এই জুঁইফুল রোপণ করেছিলেন আমার হৃদয়ে—
সেই পরিপূর্ণ গুরুর জন্য চিরকালীন আশীর্বাদ বর্ষিত হোক,
হে বাহু!
৮.
অজস্রবার জিকির করেছ তুমি
আল্লাহর নাম,
মুখস্ত করেছ কোরান,
কিন্তু তাতে রহস্যের পর্দা
উন্মোচিত হয় নাই।
বরং তোমার বিদ্যা আর পাণ্ডিত্য
আরও শাণিত করেছে
পার্থিব বিষয়াদির লোভ;
সংখ্যাহীন পুস্তকপাঠ
তোমার পাশব অহমকে
বিনাশ করতে পারে নাই।
আসলে কেবল সাধু-সন্তরাই পারে
ভিতর ঘরের ওই চোরটিকে নিপাত করতে—
যে কিনা বসতঘরটিরই বিনাশ ঘটায়।
৯.
যখন একমাত্র প্রভু
আমার কাছে নিজেকে প্রকাশ করলেন,
তাঁর মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম আমি।
এখন আর নৈকট্যও নাই,
মিলনও নাই।
এখন আর পরিভ্রমণের কিছু নাই,
নাই কোনো গন্তব্য।
প্রেমালিঙ্গনে আমার শরীর ও আত্মা
এমনকি স্থান-কালের সকল সীমানা
আমার চেতনা হতে ঝরে গেছে।
আমার বিচ্ছিন্ন সত্তা এখন
পূর্ণতার সাথে একীভূত হয়ে গেছে।
হে বাহু,
এর মাঝেই তওহিদের রহস্য রয়েছে,
সেটিই আল্লাহ।
১০.
যখন আমি
আল্লাহর একত্ব অনুভব করলাম,
তাঁর প্রেমের শিখা উঠল জ্বলে
আমাকে পথ দেখানোর জন্য।
তীব্র তাপ নিয়ে জ্বলে সেটা
আমার হৃদয়ে,
আমার সকল পথে
তাঁর রহস্য প্রকাশ করতে করতে।
প্রেমের আগুন জ্বলে আমার মাঝে,
ধোঁয়া নাই তার,
প্রেমাস্পদের জন্য আমার ব্যাকুলতাই
তার জ্বালানি।
ভালোবাসার জনকে
আমি নিকটে পেলাম।
আমার প্রেমই
তাঁর মুখোমুখি করিয়ে দিয়েছে।
১১.
সৃষ্টির সময়ে আল্লাহ যখন
তাঁর থেকে আমাকে আলাদা করেছিলেন,
তখন বলেছিলেন তিনি,
‘আমি কি তোমার প্রভু নই?’
চিৎকার করে জবাব দিয়েছিল আমার আত্মা,
‘নিশ্চয়ই তুমি তা-ই।’
তখন থেকেই আমার আত্মা পুষ্পায়িত।
আপন ঘরে ফিরবার তাড়া
আমাকে একটুও অবকাশ দেয় নাই
পৃথিবীতে শান্ত থাকবার।
দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাক।
এইটিই আল্লাহর পথ হতে
আত্মাকে কেড়ে নেয়।
তাঁর প্রেমিকদের
দুনিয়া কখনও গ্রহণ করে না।
নিপীড়িত হয় তারা,
বেদনায় চিৎকার দিয়ে ওঠে।
১২.
আমি আল্লাহকে তখনই সত্যভাবে চিনেছি,
যখন প্রেম আমার সামনে ঝলসে উঠেছিল।
রাত-দিন প্রেমই আমাকে শক্তি জোগায়,
এবং আগামীর পথদিশা দেখায়।
আমার ভেতরই জ্বলছে আগুন,
আমার মধ্যেই লুকানো জ্বালানি আর ধোঁয়া।
আমার প্রিয়তমকে আমি পেয়েছি কেবল তখনই, বাহু,
যখন প্রেম আমাকে সচেতন করেছিল।
১৩.
প্রেমের প্রতিমা যদি লুকিয়েই থাকে, তাতে কী?
হৃদয় কখনোই দূরে থাকতে পারে না।
আমার পথপ্রদর্শক থাকেন বহু পর্বতের ওপারে,
তবুও তিনি আমার চোখের সামনেই বিরাজমান।
যার অন্তরে প্রেমের একটিমাত্র কণা আছে,
তারা হয় মদ্যপ — অথচ তারা পান করেনি কোনো মদ।
তারা-ই সত্যসাধক, বাহু,
যাঁদের কবর আজও জীবিত হয়ে আছে।
১৪.
তারা বিখ্যাত পণ্ডিত, বড় বড় আলেম—
তবু ‘প্রেম’ নামক একটি শব্দই বুঝতে পারেনি তারা।
তাই তারা ভাসে বিভ্রান্তির মহাসমুদ্রে,
প্রেম আর বুদ্ধির মাঝে বিরাট ব্যবধান।
এই জীবনে যারা প্রেম অর্জন করতে পারেনি,
পরকালেও তারা থাকবে পরাজিত।
১৫.
আমার হৃদয়ে বানিয়েছিলাম প্রিয়জনের জন্য ঘর।
যখন তিনি এসে বসবাস করলেন সেখানে—
আমি পেলাম চিরন্তন আনন্দ ও শান্তি।
এখন আমি শুনি তাঁর কণ্ঠস্বর—সব কিছুর মধ্যে,
এমনকি যেগুলো তাঁর কণ্ঠ নয়, সেগুলোতেও।
এই গোপন সত্য উপলব্ধি করে শুধু সে-ই,
যে প্রেমে পড়েছে গভীরভাবে—অন্য কেউ নয়।
১৬.
অন্তহীন রোজা, নামাজ আর ইবাদত—
আমাকে ক্লান্ত করেছে একান্তভাবে।
হাজারবার হজ করেছি আমি,
তবুও আমার মন ঘুরে বেড়ায়।
নির্জন সাধনায়ও পাইনি আমি কাঙ্ক্ষিত জ্ঞানপ্রভা।
কিন্তু জীবনের সব উদ্দেশ্য পূরণ হলো,
যখন আমি প্রেমে পড়ে গেলাম তাঁর।
১৭.
একজন সাধক, প্রেমে নিজেকে হারিয়ে ফেললে
দ্রুতই সাধুতে রূপান্তরিত হতে পারে।
তার অহং বিদায় নেয়, হৃদয় জেগে ওঠে,
কারণ সে বিলীন হয়ে যায় প্রিয়তমে।
তাই অহংকারকে ত্যাগ করো—
কারণ প্রেমে না মরে, মিলন ঘটে না কখনোই।
অগণিত পথ আমি চেষ্টা করেছি—সবই ব্যর্থ।
১৮.
হৃদয়ের মাঝে এক হৃদয় আছে—
যা উপলব্ধির ঊর্ধ্বে, অতল স্পর্শে।
যখন তোমার হৃদয় আল্লাহর ধ্যান করে,
তখন তা উপলব্ধি করতে পারে—
কীভাবে বহুত্বে একত্ব লুকিয়ে আছে।
হৃদয় হলো মানুষের মাঝে আল্লাহর সত্তার সার,
রূপ আর সৌন্দর্যে, এ-ই পূর্ণতার প্রতীক।
আমি যখন অন্তরে ধ্যান করেছি আমার প্রিয়জনকে,
তখন আমার হৃদয়ের মন্দির আলোকিত হয়েছে তাঁর নূরে।
১৯.
সুফিরা এই জগতে বেঁচে থাকেন “হু”–এর জীবন্ত রূপ হয়ে।
তারা অনুশীলন করেন সেই নাম, যা আল্লাহর আসল সত্তা।
তারা বেঁচে থাকেন “হু”-এর মাঝে—
ধর্ম, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস— সব কিছুর ঊর্ধ্বে;
জীবন-মৃত্যুর গণ্ডিও পেরিয়ে যায় তারা।
তুমি যদি নিজ অন্তরপথে অনুসন্ধান করো,
তবে খুঁজে পাবে আল্লাহকে খুব কাছে।
তিনি এখন আছেন আমার মধ্যে, আমি আছি তাঁর মধ্যে—
হে বাহু! তাঁর নিকটতা কিংবা দূরত্ব—উভয়ই হয়ে গেছে গৌণ।
২০.
প্রভু আছেন একেবারে কাছেই—তবুও লাগে দূরে,
কারণ তুমি জানো না— তাঁকে কীভাবে খুঁজতে হয়।
বাইরে তাকিয়ে কিছুই অর্জন হবে না,
তিনি বাস করেন তোমারই অন্তরে।
যখন সব পর্দা সরিয়ে ফেলবে,
তোমার হৃদয় ঝকঝক করবে আয়নার মতো।
২১.
যখন খোদাপ্রেম প্রবেশ করে তোমার হৃদয়ে—
তখন ধর্ম পড়ে থাকে রাস্তায়;
তখন তুমি হয়ে ওঠো এক কাফের,
তখন তোমার উচিত মূর্তি-উপাসকের সুতোর মালা পরা,
তাদের মন্দিরে বাস করা।
যেখানে প্রিয়তম প্রকাশিত নন,
সেখানে সেজদা অর্থহীন।
যেখানে মুখোমুখি দেখা হয় না প্রেমিকের,
সেখানে জিকিরও বৃথা।
২২.
হৃদয়ই তোমার উপাসনালয়,
যেখানে বসে আছেন আল্লাহ।
চুপচাপ বসে শোনো তার নিঃশ্বাস,
প্রেম ছাড়া কিছুই নেই এখানে।
যে নিজের ভিতর দেখেছে,
সে খুঁজে পেয়েছে চিরন্তন আলো।
২৩.
ভক্তি মানে শুধু জপ বা নাম নয়,
প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।
হৃদয় যদি তার কাছে উন্মুক্ত হয়,
শূন্যতা ভরে ওঠে আলোর আলোয়।
যে প্রেমে স্বার্থ নেই,
সে ভক্তি চিরন্তন।
২৪.
যে আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছে,
সে মানুষের জন্য হাত বাড়ায়।
দরিদ্র, অসহায়, দুঃখী—
তাদের মাঝে সে খুঁজে পায় আল্লাহ।
ভালোবাসা ছাড়া ধর্ম শূন্য,
সহানুভূতিই প্রকৃত সাধনা।
২৫.
ধ্যান হলো অন্তরের জাহাজ,
যা দিয়ে তুমি পাড়ি দাও চিরন্তন শান্তিতে।
যে এই জাহাজ চালাতে জানে,
সে সব দুঃখ ভুলে যায়।
২৬.
যে একত্ব খুঁজে পায়,
সে জীবনকে চিরন্তন বোঝে।
আল্লাহর প্রেমে মিলিত হলে,
সব ভেদ ও বিভাজন অদৃশ্য হয়।
২৭.
পাহাড়ে, নদীতে, আকাশে, বাতাসে,
সর্বত্রই তিনি আছেন।
যে চোখ সেটি দেখেছে,
সে চিরন্তন আলো খুঁজে পেয়েছে।
২৮.
প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি মুহূর্তে,
সে তোমার সাথে থাকে।
চেষ্টা করো তাকে দেখতে,
অন্তরে মিলনের আনন্দ পাবে।
২৯.
আত্মা যদি প্রেমে উন্মুক্ত হয়,
তবে ফানা সম্ভব হয়।
আপন অহং হতে মুক্তির মাধ্যমে,
আল্লাহর সাথে মিলন ঘটে।
৩০.
যে নিজেকে খুঁজে পায়,
সে আল্লাহকে খুঁজে পায়।
অহংকার ত্যাগ করলে,
চিরন্তন শান্তি আসে অন্তরে।
৩১.
হৃদয়ের দরজা খুলে দেখো,
প্রেমের আলোয় ভরে আছে চারদিক;
চুপচাপ বসো,
আলোর সাথে মিলিত হও।




















































































































































































