১ মে ২০২৬
আয়েশা জাহানের কথাশিল্প ‘আমি বনাম অন্য কেউ’-এর প্রতিনিধিত্ব করে
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
স্বরলিপি
কবি ও কথাশিল্পী
9

স্বরলিপি
কবি ও কথাশিল্পী

9

আয়েশা জাহানের কথাশিল্প ‘আমি বনাম অন্য কেউ’-এর প্রতিনিধিত্ব করে

সভ্যতার ক্রমবিকাশ ‘আমি বনাম আমি’ এবং ‘আমি বনাম অন্য কেউ’—এই বোঝাপড়াকে সামনে নিয়ে লেখক আয়েশা জাহান বিনির্মাণ করেন এক একটি নির্জন, সরব এবং অস্বস্তিকর চরিত্র। আয়েশা জাহানের নির্জন চরিত্রগুলো বেশি নির্জন, সরব চরিত্রগুলো বেশি সরব, আর অস্বস্তিকর চরিত্রগুলো অধিক অস্বস্তিকর। এতই অস্বস্তিকর যে সেগুলোকে কখনও কখনও অশ্লীল, কখনও কখনও অপ্রতিরোধ্য আলো মনে হয়।

আয়েশা জাহানের প্রকাশিত তিনটি বই—‘অন্য মানুষে’, ‘এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু’ এবং ‘সর্বনাশের আশায়—মরবো বলেই জন্মেছি, বাঁচবো বলে নয়’। এই তিনটি বইতেই লেখক বাড়ি-পালানো মেয়ের মতো একটি আশ্রয় খুঁজেছেন, আগুনে পোড়া হাতের মতো একটু শুশ্রূষা খুঁজেছেন, পথ হারিয়ে ফেলা মানুষের মতো খুঁজে পেতে চেয়েছেন গন্তব্য। সেই আশ্রয়, পথ আর সেবক হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন ‘রবীন্দ্রনাথকে’। ছোট্ট শিশু যেমন আঘাতপ্রাপ্ত হলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষের কোলে যায়, তেমনটাই যেন! রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, সুর—এসবকে আয়েশা জাহান ব্রিজ হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘সভ্যতার ক্রমবিকাশ বনাম আমি’ এবং ‘আমি বনাম অন্য কেউ’-তে পৌঁছানোর জন্য।

‘অন্য মানুষে’ উপন্যাসে আয়েশা জাহান মূল যে চরিত্র বিনির্মাণ করেছেন, তার নাম ‘বিভাস’। বিভাস একজন গায়ক; তিনি গান রচনা করেন এবং সুরও সংযোজন করেন। এর জন্য প্রকৃতিযোগ আর নির্জনতার খোঁজে ৩২ বছর বয়সী এই যুবক গ্রামে থাকা এক দিদির কাছে যান।

দূর সম্পর্কের আত্মীয়, বন্ধুর বন্ধু, তার বন্ধু—এরা কীভাবে একজনের সঙ্গে আরেকজন পরিচিত হয়, কীভাবে সম্পর্কটা এগোয়—তা দেখিয়েছেন আয়েশা জাহান।

‘দর্শন আর শিল্প’—নিয়ে তার সৃজন। রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে যেমন বলা হয়েছে, ‘বাক্য যেখানে শেষ হয়, সেখানেই গানের আরম্ভ।’ এরপর লেখক বলছেন, ‘দিবসও রজনী আমি যেন কার আশায় থাকি’—এই গানটির যে সুর, সেও কিন্তু দিবস-রজনীর আশায় থাকে।…

‘দার্শনিকের সূক্ষ্ম শিল্প থাকতে বাধ্য, এবং শিল্পীর তীব্র দর্শন থাকতে বাধ্য।’ তো হঠাৎ এই গুরুগম্ভীর কথা এলো কোথা থেকে?—এই যে মূল চরিত্র, সে এমন; তার ভাবনা এমন।

শুধু কি রবীন্দ্রনাথ? এসেছে হার্বার্ট স্পেন্সারের মতামতও—‘সচরাচর কথার মধ্যে যেখানে একটু হৃদয়াবেগের সঞ্চার হয়, সেখানে আপনিই সুর লেগে যায়। বস্তুত রাগ, দুঃখ, আনন্দ, বিস্ময়—আমরা কেবলমাত্র কথা দিয়ে প্রকাশ করি না; কথার সঙ্গে সুর থাকে।’

যে পাঠক সংলাপের মাধুর্য পছন্দ করেন, তার কাছে ‘অন্য মানুষে’ বইটি যত ভালো লাগবে—তেমনি যিনি কাহিনি পছন্দ করেন, তার কাছে ‘অন্য মানুষে’ বইটি শুধু নয়, লেখকের তিনটি বইই অস্বস্তিকর লাগতে পারে।

আয়েশা জাহানের তিনটি বইয়েরই প্রকাশক: শিখা প্রকাশনী।
আয়েশা জাহানের তিনটি বইয়েরই প্রকাশক: শিখা প্রকাশনীঅন্য মানুষে বইটির মূল্য: ২৯০ টাকা। এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু বইটির মূল্য: ১৫০ টাকা। সর্বনাশের আশায় বইটির মূল্য: ২০০ টাকা

বিভাস দূরসম্পর্কের দিদির বাড়ি থেকে বন্ধুর বন্ধু বিচিত্রার খোঁজে যায়। সে কোনো কাজ করে না; বাড়ি ভাড়া দিয়ে খায় আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। সেই বিচিত্রার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ফেরার সময় বলে আসে, ‘রাত বাড়ছে—হাজার বছরের পুরনো সেই রাত। আজ উঠি, মনে হচ্ছে আবারও আসতে হবে। তুমি যেমন শ্রোতার অভাবে ভোগো, আমিও তেমনি বক্তার অভাবে ভুগি। দ্বিতীয়বার এলে কি তুমি বিরক্ত হবে? মানে, তুমি নির্জনতা ভালোবাসো, তাই বলছি।’ প্রতিউত্তরে বিচিত্রার মন্তব্য, ‘বিরক্ত হব না। মানুষ নির্জনতা ভালোবাসে সুজনের অভাবে।’

বিচিত্রাকে বাইরের শব্দ নিয়ে ফের বলতে শোনা যায়, ‘মস্তিষ্ক এমনই বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় যে আমি যে আছি, সেটাই বুঝতে পারি না। মাঝে মাঝে শব্দ-পীড়নে আমার হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়, ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে যখন ভাবতে পারি না।’

বিভাস বিচিত্রার কাছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা জানতে চায়। সে বলে, ‘ঐকতানিক সমন্বয়।’

‘নায়ক’ চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় যেমন একজন নায়কের মনস্তত্ত্ব উন্মোচন করেছেন, আয়েশা জাহান তেমনি এক গায়কের মনস্তত্ত্ব উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি একই সঙ্গে উপন্যাসের সবগুলো চরিত্রকে কাটাছেঁড়া করেছেন। একের পর এক দীর্ঘ সংলাপ এসেছে বর্ণনায়।

আগে-পরে ওই সংলাপে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন শৈল্পিক যুক্তি আর দার্শনিক যুক্তির ওপর নির্ভর করে। সংলাপের জন্য পাতানো প্রেক্ষাপটের একটি উদাহরণ দিই— ‘অনুভব মাত্রই আনন্দ, এবং যেকোনো অনুভবেই একটা আদর মাখানো থাকে। ওই আদরটাই আমার দরকার। ওটা একটা বিশুদ্ধ, নির্মল শান্তি দেয়। বিধাতা মানুষকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যে, দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা অবদান ছাড়াই মানুষ একাকী সম্পূর্ণ হতে পারে। তার যা কিছু প্রয়োজন, তার সবটাই আত্মপ্রসূত হতে পারে।’

প্রেক্ষাপট-আশ্রিত সংলাপ:

বিভাস: তুমি কি স্নানেও আদর খুঁজে পাও? এই যে এখন রোদের গায়ে এলিয়ে আছ, স্বচ্ছ পাত্রে বর্ণপানীয় গ্রহণ করছ, একটু আগে একরাশ কাপড় ধুয়ে টানটান করে মেলে দিয়েছ রোদের বুকে—ওতেও কি আদর মাখানো?
বিচিত্রা: অবশ্যই, কেন নয়?

সংলাপের মাধুর্য এমন যে প্রতিটি সংলাপ খুলে খুলে আলাদা করে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। যেমন— ‘আসলে ঘুমের আনন্দটা ঘুমের আগের স্বল্পবিস্তীর্ণ সময়টুকুতে।’

প্রেমবোধকে যুক্তিবোধ দিয়ে খণ্ডানোর কাজটিও করেছেন আয়েশা জাহান।

‘তুমি কখনও ভালোবাসোনি?’—এই প্রশ্নের উত্তরে একটি গল্প থাকার কথা ছিল। লেখক এখানে গল্পের যে গল্প থাকে—তার ওপর নির্ভর করেছেন।
‘ভালোবাসা কেড়ে নেওয়াটাও একটা মস্ত বড় শক্তি। কারও যদি সে শক্তি থেকে থাকে, তবে তুমি তাকে ভালোবাসতে বাধ্য। বিনা আবেদনেই চারপাশ তাকে অনবরত ভালোবাসার যোগান দেয়।’

এই তিনটি বইতেই লেখক বাড়ি-পালানো মেয়ের মতো একটি আশ্রয় খুঁজেছেন, আগুনে পোড়া হাতের মতো একটু শুশ্রূষা খুঁজেছেন, পথ হারিয়ে ফেলা মানুষের মতো খুঁজে পেতে চেয়েছেন গন্তব্য। সেই আশ্রয়, পথ আর সেবক হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন ‘রবীন্দ্রনাথকে’

তারপর আবার বলছে— ‘ভালোবাসা কী, আমি জানি না। তবে এক বছর আগে কোনো এক বিদায়ঘন মুহূর্তে বিদায়প্রার্থীকে জড়িয়ে ধরেছিলাম প্রবলভাবে। প্রতিউত্তরে সেও আমাকে জড়িয়ে নিয়েছিল, এবং প্রতি মুহূর্তে তার সেই জড়ানোর নিবিড়তা ঘনতর হয়ে উঠেছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমার গায়ে অজস্র বাঁধুনি দিয়ে কে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিচ্ছে আরেকটা অবলম্বনের সঙ্গে। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম— একে কী বলে? অনেকবার প্রশ্ন করার পর শেষ মুহূর্তে একটা জবাবও পেয়েছিলাম— ‘এটাই বোধ হয় ভালোবাসা’। তারপর থেকে ‘ভালোবাসা’ শব্দটা শুনলে ওই বাক্যটা আর ওই মুহূর্তটা আমার মনে পড়ে।’—এই মন্তব্য বিচিত্রার, বিভাসের প্রশ্নের উত্তর।

মানুষের যখন সব বলা হয়ে যায়—এই বলা শরীরী নয়, এ কেবল কথার কথা, জীবনের গল্প—সব যে শুনেছে, তাকে কি মানুষ একসময় ত্যাগ করতে চায়? হয়তো চায়। এজন্যই দুজনের বোঝাপড়া দেখে মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো একজন আরেকজনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে; কিন্তু একটা পর্যায়ে দেখা গেল, বিচিত্রা গায়ক বিভাসকে বলে দিল, ‘তুমি আর এসো না।’ উত্তরে বিভাস বলে, ‘আমি এমনিতেই আর আসতাম না।’

এই চরিত্রদুটি এটাও প্রমাণ করে যে, অনিবার্য হয়ে ওঠা মানুষকেও কোনো এক ভয় থেকে মানুষ চিরজীবনের জন্য দূরে সরিয়ে দেয়। এই হাহাকারকে বর্ণনা করার জন্য লেখক শেষে আশ্রয় নেন।

লেখক মানুষ আর মানুষ্যসৃষ্ট সভ্যতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এরপর একে একে এসেছে আরও কয়েকটি চরিত্র, যেগুলো বিভাসের সঙ্গে কোনো না কোনো পর্যায়ে পরিচিত হয় এবং তাদের স্বরূপ প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন—অরিমা, সুদিবা, তমসা, অনিমেষ, অসীম—এই চরিত্রগুলো নিয়েও লিখব অন্য কোনো সময়। সংক্ষেপে বলে রাখি, ‘এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু’ বইটি অনেকটা আত্মজিজ্ঞাসামূলক এবং ব্যক্তির পরিচয়কে উন্মোচন করার বই। বর্ণনাত্মক রীতিতে লিখেছেন। এক পর্যায়ে বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে দীনতায়, হীনতায় নারী যত এগিয়ে, ততটা পুরুষ নয়।’

‘সর্বনাশের আশায়—মরবো বলেই জন্মেছি, বাঁচবো বলে নয়’ বইটিতে আলাদা দুটি বড় গল্প আছে। একে নভেলাও বলা চলে। শব্দের গাঁথুনি সামাজিক সংস্কৃতিকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। কখনও কখনও তা হয়ে উঠেছে আমাদের সামাজিক বিচারে অশ্লীল। কিন্তু এর পরতে পরতে বিছিয়ে আছে নারীর শরীরী সম্পর্কের ইতিবৃত্ত, ক্ষত, জিজ্ঞাসা। নারীর শরীরী ক্ষমতাকে দেখাতে মোটেও কার্পণ্য করেননি আয়েশা জাহান। অল্পতেই যাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তারা এই বই এড়িয়ে যাবেন। আয়েশা জাহানের বর্ণনায় নারী ‘সাবজেক্ট’, অবজেক্ট নন।

২৭ এপ্রিল ২০২৬

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত