মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠন ও সমাজবাস্তবতার নিপুণ চিত্রায়ণ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কথাশিল্পী জায়েদ ফরিদের রচিত ছোটগল্পের সংকলন পাঠকালে এই সত্য নবতর রূপে পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত হয়। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘ত্রিভঙ্গ’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন। ইন্দ্রজিৎ ইসলামের লেখা ভূমিকা সম্বলিত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত গল্পসমূহ মানবজীবনের বিচিত্র স্তর, মনস্তত্ত্ব, শ্রেণিসংগ্রাম ও প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে। লেখকের বর্ণনাভঙ্গি সহজ, চরিত্রচিত্রণ নিখুঁত এবং সমাজবীক্ষণ অত্যন্ত প্রখর। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা বয়সের ভেদরেখা মুছে ফেলে এক অখণ্ড মানবসত্তার সন্ধান মেলে তার এই গল্পগুচ্ছে।
শ্রেণিবৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের দ্রোহ
‘তিনকপালি’ সমাজের একেবারে নিচুতলায় বসবাসকারী ঋষি বা মুচি সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম গল্পের মূল উপজীব্য। হাজার বছর ধরে সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নিচুতলার মানুষদের ওপর শোষণের স্টিমরোলার চালিয়েছে। গ্রন্থের ভূমিকায় আব্রাহাম লিংকনের পিতার জুতা তৈরির প্রসঙ্গ ও অজ্ঞাতনামা কবির মুচিকে নিয়ে লেখা কবিতার উদ্ধৃতি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। এই গল্পে পইখের ট্যাক, খালের পাড় এবং মুচিপাড়ার রূঢ় বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে। মরা গরুর চামড়ার অধিকার পেতে মুচিদের ছুটে চলা এবং ছোরা ছুড়ে মারার অদ্ভুত প্রতিযোগিতার বর্ণনা পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করে। অনাহারক্লিষ্ট এই সম্প্রদায়ের টিকে থাকার সংগ্রাম বড়ই অমানবিক।
ফুলমতি এই গল্পের এক প্রতিবাদী চরিত্র। সে মুচিপাড়ার মেয়ে হয়েও সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুকলাল নামক এক অসৎ যুবকের কুপ্রস্তাব ও জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে ফুলমতির প্রতিরোধ নারীবাদের এক লৌকিক রূপ। আত্মরক্ষার্থে চামড়া সেলাই করার ভোমর উঁচিয়ে ধরা ফুলমতি যেন শোষিতশ্রেণির পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতীক। অপরদিকে, রুইদাস কাপালি পেশায় ব্যবসায়ী হয়েও এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। গুরু রবিদাস ও ভক্তিকবি রামানন্দের প্রসঙ্গ টেনে সে সমাজের জাতপাতের অসারতা প্রমাণ করে। ফুলমতির সংলাপ, ‘পদবির পাছেই তো পলাই থাহে মাইনষের মধ্যে ভেদাভেদ, পদবি না থাকলে মানুষ অইত হমানে হমান’—এক সাম্যবাদী সমাজের আকাঙ্ক্ষাকেই তুলে ধরে। বিষ দিয়ে গৃহস্থের গরু হত্যার মতো গোপন ও জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে ফুলমতির অবস্থান তাকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করে।
প্রেম, স্মৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা
জায়েদ ফরিদের ‘ত্রিভঙ্গ’ গল্পটি মানবমনের এক দুর্ভেদ্য রহস্য ও প্রেমের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। অনুপম ও মরিয়মের সম্পর্ক কেন্দ্র করে আবর্তিত এই গল্পে পল্লিগ্রামের পরিবেশ, একটি হেলে পড়া বাবলা গাছ এবং একটি নির্জন ঘরের নিবিড়তা অসামান্য দক্ষতায় চিত্রিত হয়েছে। অনুপম শহরে চাকরি করলেও মাসে একবার গ্রামে ফিরে আসে। তার এই ফিরে আসার পেছনে মরিয়মের প্রতি প্রেমের চেয়েও বেশি কাজ করে এক ধরনের নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা। পুকুরপাড়ের হেলে পড়া ত্রিভঙ্গ বাবলা গাছটি এখানে একটি শক্তিশালী রূপক। অনুপম মরিয়মের সান্নিধ্যের চেয়েও গাছটির সোজা করার ব্যর্থ চেষ্টায় বেশি মগ্ন থাকে।
মরিয়ম একজন একাগ্র ও সমর্পিত প্রেমিকা। তার সাজানো-গোছানো উঠান, সাবিত্রী কচুর টব, লাল নকশি কাঁথা—সবকিছুর মধ্যেই অনুপমের জন্য অপেক্ষার ছাপ স্পষ্ট। অনুপম যখন মরিয়মকে জড়িয়ে ধরে, তখন তার মনের ভেতরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়। সে বুঝতে পারে না, মরিয়মের হৃদস্পন্দন শোনা যাওয়া দিকটি তার নিজের, নাকি শান্ত ও শীতল দিকটি। ব্লাউজের বোতাম ও সায়ার ফিতা নিয়ে অনুপমের দার্শনিক মন্তব্য পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত প্রকাশ। মেয়েলি পোশাকের জটিলতাকে সে পৌরাণিক ধাঁধার সঙ্গে তুলনা করে। ট্রেন আসার শব্দ অনুপমের মনে বাস্তবতার বোধ ফিরিয়ে আনে। স্মৃতিলেখা নামক অন্য কোনো চরিত্রের উপস্থিতির ইঙ্গিত গল্পের সমাপ্তিকে এক রহস্যময় অনিশ্চয়তায় ঢেকে দেয়। শারীরিক নৈকট্য সত্ত্বেও মানসিক দূরত্বের এক নিখুঁত আখ্যান এই ‘ত্রিভঙ্গ’।
আদিম প্রেম ও প্রকৃতির মেলবন্ধন
প্রেমের বন্য, একরোখা ও আদিম রূপ প্রকাশিত হয়েছে ‘পৌরাণিক পালক’ গল্পে। কুমু বা অগ্নি চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক এক স্বাধীনচেতা নারীর চিত্র এঁকেছেন। আলমানের প্রতি তার ভালোবাসা কোনো সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা করে না। মাকাল ফল, স্বর্ণলতা বা কালমেঘের পাতা এনে দেওয়ার মতো অদ্ভুত আবদারগুলো আসলে আলমানকে নিজের বশে রাখার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। বৈশালি গ্রামের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত ও নির্জন টং-ঘর তাদের প্রেমের সাক্ষী।
লেখকের বর্ণনাভঙ্গি ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন জায়েদ ফরিদের গদ্য চিত্রকল্পে ভরপুর। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো রক্তমাংসের মানুষ। তারা হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করে
অগ্নির প্রেম অত্যন্ত অধিকারবোধ সম্পন্ন। সে আলমানকে সমাজ, পরিবার এমনকি লোকলজ্জার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। টং-ঘরে আলমানের বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর দৃশ্যটি প্রকৃতির সঙ্গে মানবীয় অনুভূতির একাত্মতা প্রকাশ করে। অগ্নির সংলাপে সমাজের প্রতি এক ধরনের চরম অবজ্ঞা ও নিজস্ব এক পৃথিবী সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে। সে একাকী সন্তান লালনপালন করার সাহস রাখে। তার কাছে সন্তানের লিঙ্গ বা শারীরিক গঠন মুখ্য নয়, আলমানের সন্তান হওয়াই সবচেয়ে বড় পরিচয়। প্রেমের এই নিঃশর্ত, নির্ভীক ও আদিম রূপ বাংলা সাহিত্যে বিরল।
জীবপ্রেম ও মানবিকতার গভীর দর্শন
‘অধিমূল’ গল্পটি প্রকৃতি ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবের প্রতি মানুষের অসীম মমত্ববোধের এক অনন্য দলিল। শহরের প্রান্তসীমায় অবস্থিত জরাজীর্ণ ‘সিটি মডেল স্কুল’-এর বর্ণনা দিয়ে গল্পের শুরু। এই ধ্বংসপ্রায় ভবনের সামনে একটি সজীব ফুলের বাগান রয়েছে। দাশু পাগল নামক এক মালি এই বাগানের পরিচর্যা করে। দর্শনার্থীরা দাশুকে পাগল মনে করে উপহাস করে। কাঁধে ভার নিয়ে পানি দেওয়ার সময় দাশু হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়, পানি ছলকে পড়ে। মানুষের হাসাহাসি তাকে নিবৃত্ত করতে পারে না।
অম্রা নামক এক কৌতূহলী মেয়ে দাশুর এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জানতে চায়। দাশু তাকে সরু পথে সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যাওয়া পিঁপড়ে দেখায়। পিঁপড়েদের রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ দিতেই সে থমকে দাঁড়ায়। ক্ষুদ্র এক কীটের প্রতি এই গভীর মমতা অম্রাকে বিস্মিত করে। দাশুর বক্তব্য, ‘কিন্তু পিঁপড়ের তো প্রাণ আছে!’—সমস্ত জীবের প্রতি এক সর্বজনীন অহিংসা নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নামের আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণ করে দাশু নিজেকে দশরথের পুত্র রামচন্দ্র এবং অম্রাকে গৌতম বুদ্ধের শিষ্যার মর্যাদায় ভূষিত করে। এই গল্প প্রমাণ করে, তথাকথিত ‘পাগল’ বা সমাজের চোখে তুচ্ছ মানুষের ভেতরেও এক গভীর দার্শনিক সত্তা ও মানবিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে।
লোকজ বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার রহস্য
গ্রামীণ লোকজ জীবন, কুসংস্কার ও রহস্যময়তার এক অদ্ভুত মিশেল ‘তিনতিরিক্কের মৌ-সন্ন্যাসী’ গল্পটি। তিনটি বিশাল বটগাছের নিচে গড়ে ওঠা ‘তিনতিরিক্কের হাট’ এই গল্পের পটভূমি। উত্তর হিমু ও দক্ষিণ হিমু নামক দুই সন্ন্যাসীর জীবনযাপন, তাদের গাঁজার নেশা এবং সাধারণ মানুষের তাদের প্রতি অন্ধ ভক্তি—পল্লি বাংলার চিরচেনা দৃশ্য।
গল্পের মোড় ঘোরে যখন বটগাছের ডালের বিশাল এক মৌচাকের নিচে এক ধ্যানে মগ্ন মেয়েকে আবিষ্কৃত হয়। গ্রামের মানুষ তাকে ‘মৌ-মাসী’ বা ‘মৌ-দিদি’ নামে ডাকতে শুরু করে। সে শুধু মধু পান করে বেঁচে থাকে। এই অদ্ভুত সন্ন্যাসিনীর উপস্থিতি হাটের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে দেয়। মাতুব্বর শ্রেণির মানুষ তার জন্য আস্তানা বানানোর প্রস্তাব দেয়। ধর্মান্ধতা, লোকজ বিশ্বাস এবং রহস্যকে পুঁজি করে গ্রামীণ সমাজের মনস্তত্ত্ব কীভাবে পরিচালিত হয়, লেখক তা অত্যন্ত সুচারুভাবে এই গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। মৌ-সন্ন্যাসীর নীরবতা ও ধ্যানমগ্নতা আসলে গ্রামীণ সমাজের নারীদের এক প্রকার আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেও পাঠ করা যেতে পারে।
আধুনিক জীবনের ট্র্যাজেডি ও মানসিক অভিঘাত
‘দিঘল সাঁতার’ ভৌগোলিক গণ্ডি পেরিয়ে গল্পটি পাঠককে নিয়ে যায় ইংলিশ চ্যানেলের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে। মবিন ও টিনা এই গল্পের প্রধান চরিত্র। টিনাকে ‘ডলফিন অব অয়িস্টার’ উপাধি দেওয়া হয়েছে। সাঁতারু হিসেবে তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। গল্পের শুরু হয় এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে। সাঁতার কাটার সময় টিনা পিছিয়ে পড়ে। মবিন তাকে উদ্ধার করে ক্লিনিকে নিয়ে যায়।
চিকিৎসকের কাছ থেকে গর্ভপাতের নির্মম সত্যটি জানার পর মবিনের মানসিক জগৎ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। টিনাকে সে ‘ব্রাউন ডল’ বা ‘পেঙ্গুইন’ হিসেবে কল্পনা করত। টিনার মৃত্যু মবিনের জীবনে এক গভীর শূন্যতা ও ট্রমার সৃষ্টি করে। বাড়িতে ফিরে ডাইনিং টেবিলে বসে ফ্রায়েড রাইসের ডিশে পানি ঢেলে দেওয়ার দৃশ্যটি মবিনের মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও নিদারুণ কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। একজন সফল সাঁতারু থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষে পরিণত হওয়ার এই আখ্যান আধুনিক জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও অনিশ্চয়তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র।

প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর, প্রকাশকাল: ২০২৫ প্রকাশক: বিদ্যা প্রকাশ, মুদ্রণ মূল্য: ২৮০ টাকা
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/463904
নগরজীবনের প্রেম ও অধিকারবোধ
‘পোড়োবাড়ির রূপকথা’ নগরজীবনের ব্যস্ততা ও প্রেমের অধিকারবোধ নিয়ে রচিত। রাশিক ও দোলনচাঁপার লং ড্রাইভ, কদম ফুল খোঁজার উন্মাদনা এবং পুরনো ইমারত সংস্কারের প্রচেষ্টা গল্পের মূল কাঠামো। দোলনচাঁপা অত্যন্ত যত্নশীল ও অধিকারবোধসম্পন্ন প্রেমিকা। সে রাশিকের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে চায়। অন্য মেয়েদের উপস্থিতি সে মোটেও সহ্য করতে পারে না।
রাশিক দোলনচাঁপাকে একটি জমি কিনে বাড়ি উপহার দিতে চায়। পুরনো সাঁকো ও বাড়ি সংস্কারের মধ্য দিয়ে সে তাদের সম্পর্কের এক শক্ত ভিত্তি স্থাপন করতে চায়। অপরদিকে, দোলনচাঁপা নিজের অলংকার বিক্রি করে হলেও জমি কেনার টাকা দিতে প্রস্তুত। তাদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বিবাহপূর্ব সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা, সন্দেহ, ভরসা ও নির্ভরতার এক চমৎকার রসায়ন ফুটে উঠেছে। দোলনচাঁপার সংলাপে মাতৃসুলভ যত্ন ও প্রেমিকাসুলভ ঈর্ষার যুগপৎ উপস্থিতি চরিত্রটিকে বাস্তবমুখী করেছে।
শিল্প, দারিদ্র্য ও ঐতিহ্যের সংকট
‘শঙ্খ পরম্পরা’ গল্পে লেখক হারিয়ে যাওয়া এক কুটিরশিল্প ও শিল্পীর জীবনসংগ্রামকে উপজীব্য করেছেন। ধীরেন বসাক একজন প্রবীণ শাঁখারি। শাঁখের করাত দিয়ে নিখুঁত নকশা তোলার কাজে সে অত্যন্ত দক্ষ। তার কর্মচারী গগেন সুর শিল্পের চেয়ে বাণিজ্যে বেশি আগ্রহী। মোটর লাগিয়ে দ্রুত শাঁখ কাটার জন্য সে ধীরেনকে চাপ দেয়। ধীরেনের মতে, যন্ত্র থেকে শিল্পের প্রাণহীন উৎপাদন সম্ভব, হৃদয়নিঃসৃত নকশা নয়।
শিল্প ও যন্ত্রের এই চিরন্তন দ্বন্দ্ব গল্পের মূল উপজীব্য। ধীরেন বসাকের নাতনি লীলাবতী কলেজে পড়ে। সে তার অধ্যাপকের কাছ থেকে কালিদাসের একটি শ্লোক লিখে আনে—‘অন্নচিন্তা চমৎকারা, কাতরে কবিতা কুতঃ’। অর্থাৎ, ক্ষুধার চিন্তায় যে কাতর, তার ভেতরে শিল্পের স্ফুরণ ঘটে না। এই শ্লোকটি ধীরেন বসাকের জীবনের চরম বাস্তবতা। দারিদ্র্য ও অভাব কীভাবে একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে, লেখক তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বর্ণনা করেছেন। পরম্পরাক্রমে চলে আসা একটি শিল্প কীভাবে আধুনিকতার আগ্রাসনে ও অর্থনৈতিক সংকটে হারিয়ে যেতে বসেছে, এটি তারই এক বিষাদময় আখ্যান।
প্রান্তিক লিঙ্গপরিচয় ও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা
‘জমক-দোলার রানি’ সংকলনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে শক্তিশালী গল্প হলো ‘জমক-দোলার রানি’। যাত্রাপালার নায়িকা মীনাকুমারীর জীবনের গভীর এক ট্র্যাজেডি এখানে চিত্রিত হয়েছে। নিরঞ্জন নামক এক দর্শক মীনাকুমারীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে সোনার চুড়ি উপহার দেয় এবং তার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে নৌকায় বসে মীনাকুমারী নিজের জীবনের সবচেয়ে গোপন সত্যটি নিরঞ্জনের কাছে প্রকাশ করে।
মীনাকুমারী জন্মগতভাবে পূর্ণাঙ্গ নারী নয়। শারীরিকভাবে পুরুষালী কিছু লক্ষণ থাকলেও মানসিকভাবে সে সম্পূর্ণ নারী। সমাজের চোখে সে এক অদ্ভুত সত্তা। অভাবের তাড়নায় সে যাত্রাদলে যোগ দেয়। তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো একটি সাধারণ সংসার ও একজন মায়ের স্নেহ পাওয়া। নিরঞ্জন তাকে নিজের মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। শুক্লা দ্বাদশীর রাতে ঘাটে বসে মীনাকুমারী নিরঞ্জনের জন্য অপেক্ষা করে। তার বুকে আশা ও নিরাশার দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে পড়া জোছনার মতো তার হৃদয়ও ভেঙে যায়। প্রান্তিক লিঙ্গপরিচয়ের মানুষের প্রতি সমাজের অবহেলা এবং তাদের একটি স্বাভাবিক জীবনের আকুতি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন।
লেখকের বর্ণনাভঙ্গি ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন জায়েদ ফরিদের গদ্য চিত্রকল্পে ভরপুর। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো রক্তমাংসের মানুষ। তারা হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করে। গল্পের পরিবেশ নির্মাণে তিনি অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। গ্রামীণ জনপদ, নদীর ঘাট, শহরের কোলাহল বা ইংলিশ চ্যানেলের উত্তাল জলরাশি—সব জায়গাতেই তার কলম সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেছে।
তাঁর গল্পে নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপন সুচারুভাবে উঠে এসেছে। ফুলমতি, দাশু পাগল বা মীনাকুমারীর মতো চরিত্রগুলো সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও মানবিকতায় অনেক উঁচুতে অবস্থান করে। লেখক কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি কেবল একজন নীরব পর্যবেক্ষকের মতো মানুষের জীবনকে তুলে ধরেছেন।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন যাপন করা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ও বাঙালি সমাজের শেকড়ের সঙ্গে তার গভীর সংযোগ এই গল্পগুলোর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। প্রবাসে বসেও দেশের মাটির গন্ধ, শঙ্খ কাটার শব্দ, বাঁশঝাড়ের তিলেঘুঘুর ডাক তিনি বিস্মৃত হননি। বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের কাছে এই গল্পগুলো এক অমূল্য সম্পদ।





















































