২৬ এপ্রিল ২০২৬
বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসে আমন্ত্রণ
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
67

নেলসন
কবি

67

বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসে আমন্ত্রণ

সেই দীঘিটির পাশেই আমাদের সবার বাড়ি। কিংবা স্থান ও সময় নির্বিশেষে আমাদের বসতির পাশেই থাকে সেই দীঘি। অথবা এও বলা যায় যে, একটা কাটা ফসলের জমির পাশ ঘেঁষে থাকা একটু উঁচু যে সাংবাৎসরিক কুয়াশাঘেরা জমিন, তা আমাদের সবার আপন পৈঠার ঠিক অদূরেই থাকে। সেই জমিনের গাছ থেকে শুরু করে ভাঙা ডাল, মাকড়সার জাল সবই সুন্দর না হোক, আকর্ষণীয়। সে জমিনে পড়ে থাকা ফল, সেখানকার হাওয়া সবই সুস্বাদু। সেখানে থাকে এক বয়ঃসন্ধির অন্ধকার।

মানুষ এক আশ্চর্য মদ। তার ছিপি খোলার মন্ত্র লুকানো থাকে সেই বয়ঃসন্ধির অন্ধকারে। যেখানেই যায় সে, যত উঁচু বা নিচু, যে ভাষা, গানই তার মনে বাজুক, যা কিছু করুক, যেখানেই পায় সে ঘুমের অবসর, তার পাশবালিশ হয়ে তার সাথেই ঘুমায় এ অন্ধকার।

ফলে রাজধানী নামের এই বিশাল গ্রাম ঢাকায় আমরা প্রত্যেকে একটা দেও-দীঘি নিয়ে ঘুরি। আমাদের সবার গল্প ও স্মৃতিতে ঢুকে বসে আছে এক ছাড়া-বাড়ি। এইসব ছাড়া-বাড়ি কিংবা দীঘি এবং এদের গল্প তাদের সমস্ত জলহাওয়াসমেত আমাদের সাথে সাথে ঘোরে, হাঁটে, ঘুমায়, এমনকি মঞ্চে দাঁড়িয়ে লেকচার বা বক্তৃতা দেওয়ার সময় গায়ের সাথে লেপটে দাঁড়িয়ে থাকে।

আমরা বাংলাদেশ বা ব্রুনাই বা বলিভিয়া কি বানিয়াচং, যেখানেই থাকি এমন প্রিয় প্রিয় অন্ধকার, যা আসলে ছায়ারও আরেক নাম, তা আমাদের সাথেই থাকে। এটা অনেকটা ঘুমপাড়ানি গানের মতো, যার গুনগুন অনেকটা পুতুলের আঁকা চোখের মতো। ঘুমপাড়ানি গানের স্মৃতি ছাড়া, তার সুরটি ছাড়া আমরা তো আসলে চোখহীন পুতুলই।

ফলে মানুষ মূলত সেই পানীয়, যার জন্ম হয়েছে ইষৎ অন্ধকারে। এই মানুষ মিজানের মতো ব্রুনাই থাক, বা সুমিতের মতো রাজধানীর কোনো গলিতে আশ্রয় নিক, মুশার মায়েরা তার দিকে চেয়ে মাঝেমধ্যেই মুচকি হাসবে। এই মিজান, সুমিত বা মুশার মা আমাদের চেনা। তবে হয়তো অন্য কোনো নামে।

অলাতের গল্পগুলো দিনশেষে নিঃশেষ হয় না। তার চরিত্রগুলো অনেকটা বিচরণশীল মেঘের মতো ঘিরে রাখে, ঘোরে রাখে। অলাত একটা জগৎ তৈরি করেন। ষষ্ঠ দরজার ওপাশে থাকা জগতটি দেখতে দারুণ দক্ষতায় আহ্বান জানান

অলাত এহ্‌সান এই চরিত্রগুলোকে সামনে এনেছেন। এই চরিত্রগুলো দিয়ে তিনি গল্প বলেছেন। বিচিত্র গল্প। কবি থেকে শ্রমিক বনে যাওয়া মিজানের সাথে ইঁদুর ও বিড়ালের সম্পর্ক, নীরবতা, ফেরা ও ফিরে দেখা। আসলে মিজান কি সেই শ্রমিক নয়, যে নিজের সম্ভাবনার মৃত্যু দেখেছে, যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া খাদটি একজীবন ধরে পূরণ করবে বলে মাটি জোগাড় করে যাচ্ছে?

কিংবা মুশার মায়ের গল্পটি কি আমাদের সবার স্মৃতিতে নেই, যাকে নিয়ে হাজারটা গল্প ওড়ে, যাকে দেখা যায়, ধরা যায় না? অলাত এহ্‌সান এমনই এক চরিত্রকে তুলে এনেছেন। ফলে গ্রামে বা লোকজীবনে ছড়ানো হাজার রকম কিংবদন্তির মধ্যে একটির সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। আমাদের মনে পড়ে যায় সেই বয়ঃসন্ধির অন্ধকারকে, যেখানে এমন সব কিংবদন্তি ঘাপটি মেরে থাকে।

কিংবা বিদঘুটে চেহারার কাঠগোলাপ কুড়োনো ছেলেটির কথা বলা যায়, অথবা নাজিবউদ্দিন রোডের পাশে আঙুলে মোরগ বেঁধে বসে থাকা ছেলেটির জীবনের কথা বলা যায়, যা আসলে আমাদের মতো, যারা সবাই সেই প্রতিশ্রুত ঝড়ের অপেক্ষায় বসে, যা আসবার পরই একটি সুন্দর সকাল আসতে পারে। কিন্তু তা আর আসে না। ছোট ছোট হাজারটা ঝড় যায়, কিন্তু প্রলয়াকাঙ্ক্ষী মানুষ তাতে তুষ্ট হয় না। তার কেবলই মনে হয়, আরও আরও বড় কোনো ঝড়ের পরই তো সব ঠিক হওয়ার কথা। এ বোধ হয় সুন্দর সংসার গড়বার মতো উপযুক্ত বড় কোনো ঝড় নয়। আবার যদিওবা সেই ঝড় কখনো চেনা যায়, তবে আমরা অধিকাংশের মতোই পালাতে থাকি। এটা অনেকটা আমাদের এই সময়ের মানুষের আলোচনায় ফিরে ফিরে আসা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার মোড়কে থাকা একটা আকাঙ্ক্ষার মতো, যা হাজারো মানুষের মৃত্যুকে, একের পর এক আঞ্চলিক সংঘাত বা যুদ্ধকে আড়াল করে মানুষকে বলতে থাকে—এখন নয়, আরও বড় প্রলয়ের পর সব ঠিক হবে। ফলে মানুষ নিষ্ক্রিয়তা থেকে বের হয় না। প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা তাকে কোনো চিহ্ন পাঠের সুযোগ পর্যন্ত দেয় না। ফলে সে এক স্তরিভূত ষষ্ঠ দরজার আড়ালে আড়াল নেয়। নিরুদ্দেশ হয়। উত্তর প্রজন্মের সামনে রেখে যায় এক অহেতুক ধাঁধা, পৌরুষিক প্রহেলিকা।

বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি ও অলাত এহ্সান
বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি
by অলাত এহ্‌সান
প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ, প্রকাশক: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, মূল্য: ৪০০ টাকা
আলোকচিত্র: মুম রহমান

অলাত এহ্‌সান তাঁর গল্পে এমন সব চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা ভাবতে বাধ্য করে। বর্ণানাধর্মী প্রকরণে অধিক অভ্যস্ত অলাতের উপমা ও চিত্রকল্পের ওপর নির্ভরতা সুস্পষ্ট। এই নির্ভরতা কখনো কখনো বর্ণনাকে আড়ষ্ট করেছে, অপ্রয়োজনীয় ঠেকেছে। অলাতের চরিত্রগুলো সাবলীল বটে। কিন্তু তার বাক্য গঠনের কৌশল মোটাদাগে পুরো বইয়ে একই রকম। ফলে ব্রুনাইয়ে থাকা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে আবহাওয়া অফিসের মঞ্জুকে অবচেতনে খুঁজে বেড়ানো, কিংবা মুশার মায়ের আখ্যান তুলে ধরা বা চট্টগ্রাম থেকে চাকরি হারিয়ে ঢাকায় কফি হাউসের চক্করে আটকে পড়া লোকটির বর্ণনা একই রকম। গল্পের কথক ও চরিত্রকে আলাদা করার সুযোগটিও আবার এহ্‌সান আমাদের দিতে চান না, তার একমুখী উত্তমবচনের কারণে। ফলে শেষের ফ্ল্যাশ ফিকশন ধাঁচের গল্পগুলো বাদ দিলে কোনো গল্পেই এমন কথক পাওয়া যাবে না, যে গল্পটির একটি চরিত্র নয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, লেখক তার চরিত্রকে অহেতুক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

অলাতের বাক্য গঠন সরল ও জটিলে মাখামাখি। উপমা ও চিত্রকল্পের অত্যধিক প্রয়োগ কখনো কখনো আড়ষ্ট ভাব আনলেও তার ভাষাভঙ্গি আনন্দ দেয়। গল্পের প্লটগুলো ভাবতে বাধ্য করে। নানা তথ্য ও দেখার ভঙ্গি গল্পের খাঁজগুলোতে এমনভাবে গুঁজে দেওয়া যে, তা এক বিরাট আখ্যানে ডুব দেওয়ার স্বাদ দেয়। মঞ্জুর ঝড়, মুশার মা, কফি হাউসের সেই বুড়োগুলো ক্রমশ দাপুটে হয়ে উঠতে থাকে। তবে অন্তত একটি প্লটকে আমার কাছে আরোপণ মনে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে লেখা সে গল্প বলবার কারণটি বোধগম্য নয়। এটা অনেকটা জনস্বার্থে নাটিকার মতো মনে হয়েছে। গল্প আছে, চরিত্র আছে, তারা চলে ফেরে, কথা কয়, কিন্তু কোনো প্রাণ নেই। যেন এক প্রত্যাদেশ পালনের জন্যই সে এসেছে, শুধু এ গল্পটি বলবার স্বার্থে। এই গল্পের উপস্থিতি এই বইয়ের খুঁত বলে মনে হয়েছে। এ তালিকায় দ্বিতীয় গল্পটি হচ্ছে সুমিত বিষয়ক। একেও মনে হয়েছে কিছুটা দায়বোধ থেকে লেখা। কিন্তু সে দায় গল্পের প্রতি নয়।

সংলাপের সাথে অলাতের কি আড়ি আছে? কে জানে? না হলে কিছু স্থানে সংলাপ বিকল্প বুননের উপায় হতে পারত। অলাতের নারী চরিত্ররা এতটা নিষ্প্রভ না হলেও পারত, আরেকটু প্রকট, কখনো নারী চরিত্রটিই কথক হতে পারত।

অলাতের গল্পগুলো দিনশেষে নিঃশেষ হয় না। তার চরিত্রগুলো অনেকটা বিচরণশীল মেঘের মতো ঘিরে রাখে, ঘোরে রাখে। অলাত একটা জগৎ তৈরি করেন। ষষ্ঠ দরজার ওপাশে থাকা জগতটি দেখতে দারুণ দক্ষতায় আহ্বান জানান।

অলাত-পাঠ মুগ্ধকর। ওতে যা একটু খচখচ তার কিছু তো ওপরেই লিখলাম। অবশ্য তার গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর একটা অংশ ব্যক্তিগত সূত্রে আগেই পড়া থাকায়, আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত ছিল। ফলে এটাও অনেক কিছু নজরে আসার কারণ হতে পারে। বাকি কথাটা অবশ্য অলাতকে নয়, জ্ঞানকোষকে বলতে চাই। এমন একটি বই কেন, প্রতিটি বই অবশ্যই সতর্ক সম্পাদনার দাবিদার। বানান সম্পর্কিত ভুল কখনো কখনো দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকাশনীগুলোর আরও পেশাদার হওয়া উচিত। তবে সে চাওয়ার সাথে বাস্তবতার তফাত সহজে ঘুচবার নয় বোধ হয়। তাই অলাতকেই বলব বরং লেখক হিসেবে চূড়ান্ত সম্পাদনায় আরও মনযোগী হতে।

সে যাক, ফিরে যাই বয়ঃসন্ধির সেই অন্ধকারে। আমাদের গায়ের সাথে গন্ধ হিসেবে লেপ্টে থাকা সেই অন্ধকার বা ছায়া আমরা হয়তো ভুলতে বসি নানাভাবে। স্থান ও সময়নিরপেক্ষ সেই ‘আমি’ বা আশ্রয়ের সাথেই অলাত পুনরালাপ করিয়ে দেন। একটা আত্মসমীক্ষণ, একটা চোখফোটা গল্পের সারণীতে ডাকেন। বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসে যাওয়ার সেই সারণীতে ঘুরে আসতে পারেন, যেখানে সব খেলা নির্ধারিত জেনেও, ঘোষিত পুরস্কারটি আসলে ভাঁওতা জেনেও মানুষ কামে ও ক্রোধে মত্ত থাকে।

1 Comment. Leave new

  • দীপ্তি
    26 April 2026 9:28 pm

    নেলসনকে ধন্যবাদ বইয়ের রিভিউ লেখার ক্ষেত্রে শুধু স্তুতিগাথা না লিখে গঠনমূলক আলোচনার করার জন্য। অলাত এই প্রশংসার মূল দাবিদার, সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতার জন্য। এটা লেখকের বড় শক্তি।

    Reply

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত