ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান
১৯৬০-এর দশকের উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘বাইশ পরিবার’ বিরোধী স্লোগান। সে সময় পাকিস্তানের অর্থনীতি, শিল্প এবং রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক মাত্র ২২টি ধনিক পরিবারের হাতে। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সম্পদ শোষণ করে এই পরিবারগুলো গড়ে তুলেছিল তাদের সম্পদের পাহাড়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল এই বৈষম্য, শোষণ এবং সম্পদ কেন্দ্রীভবন ভেঙে একটি সাম্যভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এসে মেহেদী হাসানের লেখা ‘বাইশ পরিবারের অতীত ও বর্তমান’ গ্রন্থটি আমাদের এক রূঢ় ও বেদনাদায়ক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
গ্রন্থটিতে লেখক অত্যন্ত দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, পাকিস্তান আমলের সেই ২২ পরিবার আজ বাংলাদেশে মহীরুহ আকার ধারণ করেছে; সংখ্যায় তারা বাইশ থেকে হাজার ছাড়িয়েছে। শোষণের ধরনে এসেছে ভয়াবহতা, আর রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে উঠেছে এই নব্য ধনিক শ্রেণির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষাকবচ। বইটির পেছনের গল্পটিও বেশ চমৎকার। লেখক ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও অ্যাকটিভিস্ট অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে এক ট্রেন যাত্রার আলাপচারিতা থেকে এই গবেষণার বীজ রোপিত হয়েছিল। সেই দীর্ঘ গবেষণার ফসল আজকের এই গ্রন্থ, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে ‘সর্বজনকথা’য়।
পাকিস্তান পর্ব: বৈষম্যের আঁতুড়ঘর
গ্রন্থটির প্রথম অংশে লেখক অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে পাকিস্তান আমলে পুঁজিবাদের বিকাশ এবং ২২ পরিবারের উত্থানের প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এই ধনিক শ্রেণির উদ্ভব কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বা কাকতালীয় অর্থনৈতিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রত্যক্ষ ফসল।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও আইনি কাঠামো পাকিস্তান রাষ্ট্র উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। আইয়ুব খানের শাসনামলে ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজিবাদ’ বিকাশের নামে ব্যাংক, বিমা এবং শিল্পঋণ গুটিকয়েক পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আদমজী, দাউদ, সায়গল, বাওয়ানি কিংবা ইস্পাহানদের মতো পরিবারগুলো রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে ফুলেফেঁপে ওঠে। রাষ্ট্র তাদের জন্য উদার হাতে ঋণ দিয়েছে, কর মওকুফ করেছে এবং প্রটেকশনিস্ট পলিসির মাধ্যমে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করেছে। লেখক দেখিয়েছেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ছিল এই কাঠামোর প্রধান ভুক্তভোগী। পূর্ব বাংলার পাট ও চা রপ্তানি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নে, করাচি বা লাহোরের জৌলুস বাড়াতে।
তবে লেখক কেবল পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকদের কথাই বলেননি, তিনি অত্যন্ত সততার সঙ্গে অনুসন্ধান করেছেন সেই সময়কার বাঙালি ধনিক শ্রেণির উদ্ভবকেও। এ. কে. খান, জহিরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন বা ওবায়দুল হকের মতো বাঙালি উদ্যোক্তারা কীভাবে পাকিস্তান আমলেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুযোগ নিয়ে নিজেদের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ বইটিতে উঠে এসেছে। লেখক দেখান যে, আইয়ুব খানের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বা বুনিয়াদি গণতন্ত্রের আমলে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য পূর্ব পাকিস্তানেও একটি অনুগত ধনিক শ্রেণি তৈরির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ফলে বাঙালি ধনিকদের একটি অংশও লাইসেন্স-পারমিট এবং ঋণের সুবিধা পেয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, পুঁজির চরিত্র আসলে জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে শ্রেণিগত পরিচয়েই বেশি প্রকট। পুঁজি যখন বিকশিত হয়, তখন সে শোষণের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করে, মালিকের ভাষা বাংলা না উর্দু, তাতে খুব একটা তফাত হয় না।
বাংলাদেশ পর্ব: সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন বনাম লুটেরা পুঁজির উত্থান
গ্রন্থটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্লেষণধর্মী এবং সম্ভবত সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ হলো বাংলাদেশ পর্বের আলোচনা। স্বাধীনতার পর সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’কে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হলেও আদতে কীভাবে লুম্পেন বা দুর্বৃত্ত পুঁজির বিকাশ ঘটল, লেখক তা নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পরিত্যক্ত পাকিস্তানি সম্পত্তি দখল, লাইসেন্স-পারমিট বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ বা ‘ফড়িয়া’ শ্রেণির উত্থান ঘটে। লেখক এদের উল্লেখ করেছেন ‘ব্রিফকেস ক্যাপিটালিস্ট’ হিসেবে। এদের কোনো কারখানা ছিল না, উৎপাদনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না; কেবল একটি ব্রিফকেস হাতে রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে তারা সরকারি দপ্তরের বারান্দায় ঘুরতো এবং লাইসেন্স বাগিয়ে নিত। পরবর্তীতে সেই লাইসেন্স চড়া দামে বিক্রি করে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার সংস্কৃতি চালু হয়। লেখক দেখিয়েছেন, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের একাংশ এবং আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে কীভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের মহোৎসব শুরু হয়েছিল, যা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনেও এই মজুতদার ও ফড়িয়া শ্রেণির কারসাজি এবং বণ্টনের অব্যবস্থাপনাকে লেখক দায়ী করেছেন।

প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর, প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০২৫, প্রকাশক: বাঙ্গালা গবেষণা, মুদ্রণ মূল্য: ৭০০ টাকা।
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/531393
১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সামরিক শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া হয়। ‘উদারীকরণের’ নামে রাষ্ট্রীয় কলকারখানা পানির দরে ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রেসক্রিপশনে গৃহীত এসব নীতি দেশে একটি স্থায়ী লুটেরা ধনিক শ্রেণি তৈরির পথ প্রশস্ত করে। শিল্পঋণ সংস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য শিল্পায়ন ছিল না, ছিল পকেট ভারি করা। লেখক দেখান, এই সময়ের ঋণগুলোর অধিকাংশই আর ফেরত আসেনি, যা খেলাপি ঋণের সংস্কৃতির জন্ম দেয়। এই নব্য ধনিকরা পাকিস্তান আমলের ২২ পরিবারের চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, কারণ এদের শেকড় ছিল দুর্নীতির গভীরে।
১৯৯০-এর পরে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলেও অর্থনীতির লুণ্ঠনতন্ত্র বন্ধ হয়নি, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের আমলেই ব্যাংক লুট, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি এবং অর্থপাচার জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। রাষ্ট্র এখন আর কেবল পুঁজির পৃষ্ঠপোষক নয়, রাষ্ট্র নিজেই পুঁজির পাহারাদারে পরিণত হয়েছে।
কেস স্টাডি: পুঁজির আদি সঞ্চয়ন ও বিকাশের রূপরেখা
আলোচ্য গ্রন্থে লেখক ঢালাও মন্তব্যের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পগোষ্ঠীর কেস স্টাডি বা ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন, যা গবেষণাকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্য করেছে। এই কেস স্টাডিগুলো আমাদের দেখায় কীভাবে শূন্য থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় কেবল রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।
আনোয়ার গ্রুপ ও এ. কে. খান
এই পরিবারগুলোর উত্থান পাকিস্তান আমল থেকেই। এ. কে. খান নিজে আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন এবং সেই ক্ষমতার ব্যবহার করে শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। আনোয়ার গ্রুপও পাকিস্তান আমল থেকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিকশিত হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, রাজনীতি এবং ব্যবসার এক জৈবিক সম্পর্ক বা ‘নেক্সাস’ এদের টিকিয়ে রেখেছে দশকের পর দশক ধরে। সরকার বদল হলেও এদের ক্ষমতার খুব একটা হেরফের হয়নি।
স্কয়ার ও আকিজ
সাধারণত স্কয়ার বা আকিজ গ্রুপকে ‘ভালো’ বা উৎপাদনমুখী পুঁজির উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। স্যামসন এইচ চৌধুরী বা শেখ আকিজ উদ্দিনের শূন্য থেকে শীর্ষে ওঠার গল্পগুলো মিথের মতো প্রচলিত। কিন্তু লেখক মেহেদী হাসান এই মিথের পেছনের বাস্তবতাও অনুসন্ধান করেছেন। আকিজ সাহেবের বিড়ি শ্রমিক থেকে শিল্পপতি হওয়ার গল্পের আড়ালে ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে হিন্দু ব্যবসায়ীদের দেশত্যাগ এবং তাদের সম্পত্তি পানির দরে কিনে নেওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার ভূমিকা লেখক উন্মোচন করেছেন। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা এবং কর সুবিধাও এদের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।
বেক্সিমকো ও এস আলম
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বেক্সিমকো এবং এস আলমে’র উত্থানকে লেখক ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদের চরম ও নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখিয়েছেন। সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ কীভাবে শেয়ার বাজার থেকে বারবার টাকা তুলে নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করেছে এবং ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেয়নি, তার বিস্তারিত বিবরণ বইটিতে রয়েছে। অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপ কীভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক ব্যাংক দখল করেছে এবং ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংককে তারল্য সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা লেখক তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে এসব অনিয়মের সুযোগ করে দিয়েছে, তা পাঠ করলে শিউরে উঠতে হয়।
লেখক দেখিয়েছেন, বসুন্ধরা গ্রুপের লুটপাট প্রায় শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। সামিট গ্রুপ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আইন ব্যবহার করে কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে জনগণের পকেট থেকে নিয়ে গেছে, তা এই গ্রন্থে উঠে এসেছে। একইভাবে ওরিয়ন ও নাসা গ্রুপের ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি এবং বিদেশে সম্পদ গড়ার তথ্যও লেখক তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্র যখন লুটেরা পুঁজির পাহারাদার
গ্রন্থের শেষ অধ্যায়গুলোতে লেখক ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপট এবং বিগত সরকারের (২০০৯-২০২৪) আমলকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আর ‘লেনদেনের’ নয়, বরং তারা ‘একাকার’ হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এবং ব্যবসা এখন সমার্থক।
লেখক পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের সংসদে যেখানে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ, ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬৭ শতাংশে। যখন আইন প্রণেতারা নিজেরাই ব্যাংকের মালিক, গার্মেন্টসের মালিক বা ভূমি দস্যু, তখন আইনগুলো যে তাদের স্বার্থেই তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে একই পরিবারের চারজন পরিচালক থাকার সুযোগ বা দীর্ঘমেয়াদে পরিচালক থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে কেবল এই লুটেরা শ্রেণির স্বার্থে।
এ গ্রন্থে অর্থপাচার বা মানি লন্ডারিং নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সামিট, বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, এস আলম, নাসা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ওভার-ইনভয়েসিং (আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো) এবং আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের (রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো) মাধ্যমে এই অর্থ পাচার করেছে, তার কারিগরি দিকগুলো লেখক সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। দুবাই, সিঙ্গাপুর, কানাডা বা লন্ডনের বেগম পাড়ায় গড়ে ওঠা সম্পদ এই পাচারকৃত অর্থের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত—রাষ্ট্রযন্ত্রের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং ধনিক তোষণ নীতি একই ধারায় প্রবহমান। লেখক যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতি যখন ‘মুনাফা সংবর্ধন’ হয়, তখন জনস্বার্থ, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা মানবাধিকার গৌণ হয়ে পড়ে
জনগণের জমানো টাকা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বের করে নিয়ে আর ফেরত না দেওয়াটা বাংলাদেশে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। লেখক দেখান, এই খেলাপিরা কেবল টাকা মেরে দিয়েই ক্ষান্ত হন না, তারা উল্টো রাষ্ট্র থেকে ‘ভালো গ্রাহক’ হিসেবে পুরস্কার পান, সুদ মওকুফ পান এবং ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা পান। এটি একটি পরিকল্পিত ডাকাতি, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই ডাকাতদের পাহারাদার।
‘উন্নয়ন’-এর বয়ানে দেশে যে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট) গ্রহণ করা হয়েছে, তার রাজনৈতিক অর্থনীতিও লেখক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রয়োজনীয়তা বা জনস্বার্থের চেয়ে প্রকল্পের আকার এবং ব্যয় বৃদ্ধিই এখানে মুখ্য। কারণ, ব্যয় বাড়লে ঠিকাদার ও তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের কমিশন বাড়ে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ বা কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পগুলোতে কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর পকেট ভারি করা হয়েছে এবং দেশকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে ফেলা হয়েছে, তা বইটিতে স্পষ্ট করা হয়েছে।
লুম্পেন পুঁজি বনাম উৎপাদনশীল পুঁজি
মেহেদী হাসানের এই গবেষণাটি গতানুগতিক ইতিহাস চর্চা বা সাংবাদিকতা নয়; এটি একটি পলিটিক্যাল ইকোনমি বা রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণ। লেখক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এবং শাহ্ আতিউল ইসলামের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত, যা তাঁর বিশ্লেষণকে শাণিত ও তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী করেছে।
লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পার্থক্য সামনে এনেছেন—‘উৎপাদনশীল পুঁজি’ এবং ‘লুম্পেন পুঁজি’র মধ্যে। ইউরোপ বা আমেরিকায় পুঁজিবাদের বিকাশের সময় বুর্জোয়া শ্রেণি সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে যে ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছে, তারা কোনো লড়াই বা উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে আসেনি; তারা এসেছে লুণ্ঠন, দখলদারি এবং রাষ্ট্রের আনুকূল্যে। এরা কারখানায় উৎপাদনের চেয়ে শেয়ার বাজারের জুয়া, ব্যাংকের টাকা লোপাট বা জমি দখলে বেশি আগ্রহী। লেখক এদের নাম দিয়েছেন ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ বা দুর্বৃত্ত ধনিক শ্রেণি।
গ্রন্থটির মূল প্রতিপাদ্য হলো—কেবল শাসক পরিবর্তন বা দল পরিবর্তন করে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ, সমস্যাটি ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত—রাষ্ট্রযন্ত্রের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং ধনিক তোষণ নীতি একই ধারায় প্রবহমান। লেখক যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতি যখন ‘মুনাফা সংবর্ধন’ হয়, তখন জনস্বার্থ, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা মানবাধিকার গৌণ হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে বৈষম্যহীন সমাজের ডাক দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হলে এই লুটেরা কাঠামোর মূলে আঘাত করতে হবে।
‘বাইশ পরিবারের অতীত ও বর্তমান’ কেবল একটি গ্রন্থ নয়, এটি বাংলাদেশের লুণ্ঠনের ইতিহাসের এক দালিলিক প্রমাণপত্র বা ‘শ্বেতপত্র’। লেখক দেখিয়েছেন, পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে তা প্রশমিত তো হয়ইনি; বরং তা হাজারও লুটেরা পরিবারের জন্ম দিয়েছে। ঢাকা শহরের চাকচিক্য, ফ্লাইওভার আর আকাশচুম্বী অট্টালিকার নিচে চাপা পড়া বৈষম্যের হাহাকার এই গ্রন্থের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে।
এ গ্রন্থ পাঠ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, কেন ঢাকায় ধনী বৃদ্ধির হার বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়, আবার কেন এ শহরেই বায়ুদূষণ, যানজট আর জীবনমানের নিম্নগতি চরম আকার ধারণ করেছে। কেন জিডিপি বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় বাড়ে না, কেন দ্রব্যমূল্য সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়। যারা বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলকে গভীরভাবে বুঝতে চান, তাদের জন্য এই গ্রন্থটি সহায়িকা হিসেবে কাজ করবে।
লেখক হতাশার বাণী শুনিয়ে শেষ করেননি। তিনি পথ দেখিয়েছেন। লেখকের ভাষায়, ‘মুষ্টিমেয় তন্ত্রের বিপরীতে জীবন, জমি, জল, জঙ্গলের ওপর সর্বজনের সামাজিক মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই’ হতে পারে এই চক্র থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ। তিনি এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন, যা মুষ্টিমেয় ধনিকের স্বার্থ না দেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের স্বার্থ দেখবে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লড়াইয়ে এ গ্রন্থ বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ জোগাতে সক্ষম।





















































