২৬ মার্চ ২০২৬
'অগ্রন্থিত আবুল হাসান'। এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে আশিরও অধিক এযাবৎ অগ্রন্থিত কবিতা, ৮টি মননশীল গদ্য, ৪টি ছোটগল্প ও দুটি বিবিধ রচনা।
বইপ্রচ্ছদ :
সব্যসাচী হাজরা
মোশতাক আহমদ
কবি ও কথক
57

মোশতাক আহমদ
কবি ও কথক

57

প্যান্ডোরার সোনালি বাক্সো: অগ্রন্থিত আবুল হাসান

আবুল হাসানের অগ্রন্থিত রচনার একটি সঙ্কলন সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন মুহিত হাসান। আমরা জানি, জীবদ্দশায় আবুল হাসানের মাত্র তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল—১৯৭২, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় অগ্রন্থিত কবিতার একটি সংকলন, আরও পরে তরুণ বয়সে লেখা দুটি কবিতার খাতা গ্রন্থাকারে আসে। এছাড়া একটি গল্পের বই এবং দুটি কাব্যনাট্যও প্রকাশিত হয়েছিল। সংক্ষিপ্ত জীবনে মাত্র এক দশক লেখায় সক্রিয় থেকেও আবুল হাসান রেখে গেছেন বিস্তর সাহিত্য ভাণ্ডার। নিচের উক্তিগুলো তাঁর সৃষ্টিশীলতার সাক্ষ্য বহন করে—

“দুটি রক্তাক্ত চোখের আবুল হাসান ইতিমধ্যে প্রচুর কবিতা লিখেছেন… এক নিঃশ্বাসে তিনি দু-তিনটি পঙক্তি উচ্চারণ করতে পারেন।”— হুমায়ুন আজাদ (১৯৬৯)
“কবিতা ছিল হাসানের প্রতিমুহূর্তের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো।”— আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (২০২২)
“আবুল হাসান কবিতা লিখত নির্ঝরের মতো।”— আবদুল মান্নান সৈয়দ (২০১৬)

দৃষ্টিনন্দন ও রুচিসম্মত মুদ্রণশৈলীতে প্রকাশিত এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে আশিরও অধিক এযাবৎ অগ্রন্থিত কবিতা, ৮টি মননশীল গদ্য, ৪টি ছোটগল্প ও দুটি বিবিধ রচনা। বদিউদ্দীন নাজির একবার বলেছিলেন—লেখা চাইলে আবুল হাসান কাউকে ফেরাতেন না। তাই অনুমান করা যায়, তাঁর আরও কিছু লেখা হয়তো এখনো বাইরেই রয়ে গেল।

ষাটের শেষভাগ ও সত্তরের প্রথমার্ধের নানা পত্র পত্রিকা ঘেঁটে মুহিত হাসান তাঁর শ্রম ও একাগ্রতায় এই হীরে মানিকের খনি আবিষ্কার করেছেন; সেই ভ্রমণে আমিও তাঁর সহচর হতে পেরেছিলাম বলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা এই বইতে গ্রন্থিত হাসানের কবিতার সূত্রে বলেছেন, তিনি ছিলেন কবিতায় সমর্পিত এবং কবিতায় তাঁর সততা ছিল। সততা – অর্থাৎ বোধে যা সত্য নয়, বাইরে চটকদার হলেও তার কোনো মিশেল তিনি কবিতায় দিতেন না। জীবনের ক্ষণত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তাঁকে সবকিছু তুচ্ছ করতে শিখিয়েছে, তিনি আয়ত্ত করেছেন শিল্প সৃষ্টির জন্যে জরুরি নিস্পৃহতা। বেশি লিখলেও তিনি ভাবপ্রবণ ছিলেন না, বাস্তবতার জগতেই বিরাজ করতেন। কিন্তু তাঁর কবিতা ছিল এক ‘রহস্য প্রধান এলাকা’, যা তাঁর শৈল্পিক উৎকর্ষের কারণে ঘটতে পেরেছে।

'অগ্রন্থিত আবুল হাসান'
অগ্রন্থিত আবুল হাসান
সংকলন ও সম্পাদনা: মুহিত হাসান
ভূমিকা: সনৎকুমার সাহা, প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশক: কবি প্রকাশনী, প্রকাশকাল: ২০২৫, মুদ্রণ মূল্য: ৪০০ টাকা
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/486559

এই সঙ্কলনে সবচাইতে পুরনো কবিতাটি ১৯৬৫ সালের ২৭ জুনের তারিখ অঙ্কিত, যখন তিনি ‘আবুল হোসেন’ থেকে ‘আবুল হাসান’ হয়ে ওঠেননি; এবং সর্বসাম্প্রতিক কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল কবির মৃত্যুর আগের মাসে, ১৯৭৫ সালের ৫ অক্টোবর।

গদ্য অংশ শুরু হয়েছে অকালপ্রয়াত কবিবন্ধু হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর পরে পরিমিতিবোধ নিয়ে লেখা একটি স্মৃতিচারণ দিয়ে। নিজের আত্মউন্মোচনের এক বিবরণ এই লেখাটি। ডাবলু এইচ অডেনের মৃত্যুর পর কবিকে নিয়ে হাসান যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, তাতে বিশ্বকবিতায় তাঁর পঠন পাঠন ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমরা এই লেখা কয়টি পড়ে এক নতুন আবুল হাসানকে পাই, যদিও ইতিপূর্বে পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়গুলোর একটা সঙ্কলন আমরা হাতে পেয়েছি। চারটি গদ্য আছে, যেগুলোতে বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার সূত্রে বৈশ্বিক ও দেশের পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ পাই, যেখানে কবির দার্শনিক মননের পরিচয় পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, হাসানের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ভাষ্যও উপভোগ্য গদ্যে লিখিত। একটি গদ্যে তিনি সেকালের বাংলাদেশে ঘরোয়া রবীন্দ্রচর্চার কথা জানিয়েছেন।

এখানে কবির চারটি গল্প সংকলিত হয়েছে। তাঁর গল্পের বইয়ের গল্পগুলোর তুলনায়, ধনাত্মক অর্থে, এই চারটি গল্পে কাব্যিকতা কম–গল্পের মতো করেই গল্প লিখেছেন। এই গল্পগুলোতে সেই অস্থির, নিরালম্ব, কখনো স্বাধীনতা পরবর্তী নিরন্ন সময়ের চিত্র ফুটে উঠেছে।

সম্প্রতি শহীদ কাদরীর একগুচ্ছ বই সম্পাদনা ও প্রকাশের পর মুহিত এবারের আবুল হাসান জন্মজয়ন্তীতে সাহিত্য রসিকদের হাতে যুগল উপহার তুলে দিয়েছেন— একটি ‘অগ্রন্থিত আবুল হাসান’, অন্যটি ‘সুরাইয়া খানম রচনাসমগ্র’। এছাড়াও হুমায়ুন আজাদের অগ্রন্থিত রচনাগুচ্ছ আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায়। কেবল সৈয়দ মুজতবা আলীর চিঠিপত্রের প্রকাশই নয়, মুজতবার পানশিরের সেই আবদুর রহমানের অফুরান ভাঁড়ারের মতো মুহিতের হাতে ও মাথায় আরো অনেক শিল্প সাহিত্যের চমক আছে। আমরা প্যান্ডোরার সোনালি বাক্স খুলে নতুন নতুন আশায়, অপেক্ষায়।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত