১৫ মার্চ ২০২৬
আহমাদ মোস্তফা কামালের বই 'যৎসামান্য'
বইপ্রচ্ছদ :
সব্যসাচী হাজরা
সফিক ইসলাম
প্রাবন্ধিক
63

সফিক ইসলাম
প্রাবন্ধিক

63

যৎসামান্য নিয়ে যৎসামান্য আলাপ

বহুদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল আহমাদ মোস্তফা কামাল-এর এক বা একাধিক গ্রন্থ নিয়ে, কিংবা তাঁর সামগ্রিক লেখালেখি নিয়েই, একটি বড় প্রবন্ধ লিখব। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও তা হয়ে ওঠেনি। এর জন্য দায় যতটা না আমার, লেখকের দায়ও তার চেয়ে কম নয়। বিষয়টি বুঝিয়ে বলছি।

আহমাদ মোস্তফা কামাল–এর বইয়ের একটি অদ্ভুত সমস্যা আছে। তাঁর বইগুলো এক বসায় পড়ে শেষ করা যায় না। কারণ বইয়ের প্রতিটি লেখার মধ্যে এমন সব চিন্তার উপাদান থাকে, যা পাঠককে দীর্ঘ সময় ধরে ভাবতে বাধ্য করে। একটি প্রবন্ধ নয় কেবল, প্রবন্ধের এক একটি অনুচ্ছেদ, কিংবা এক একটি বাক্য, শেষ করার পরও তার রেশ মাথা থেকে সহজে সরে যায় না; বরং অনেক দিন ধরে তা পাঠকের ভেতরে কাজ করতে থাকে। এমন প্রভাববিস্তারকারী গ্রন্থের জন্য একটি উপযুক্ত আলোচনা করার জন্য যতটা নিরবচ্ছিন্ন অবসর প্রয়োজন, এই ব্যস্ত জীবনে তা পাওয়া সত্যিই কঠিন।

আমার পড়া তাঁর লেখা প্রথম বইটির নাম ‘সংশয়ীদের ঈশ্বর’। বইটি পড়ে বিস্মিত হয়েছিলাম—বাংলা ভাষায় এমন গভীর, চিন্তাপ্রবণ একটি বই লেখা সম্ভব! সেই মুগ্ধতা দীর্ঘদিন মনে ছিল। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর আরও গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ পড়েছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

কাজেই আমার দায় হলো নিরবচ্ছিন্ন অবসরের অভাব আর লেখকের দায় হলো তার লেখার শক্তি। এই দুই দায়ে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, বই পড়া হয়—কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠে না।

ফলে তাঁর কোনো বই নিয়েই আলোচনা করা হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু এভাবে আর কতদিন?

সদ্য কেনা হলো তাঁর নতুন প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যৎসামান্য’। বইটি পড়তে শুরু করেই বোঝা গেল এটিও অন্য বইগুলোর মতোই চিন্তা জাগানিয়া একটি দারুণ বই। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো না। তাই দ্রুততম সময়েই লেখা হলো আহমাদ মোস্তফা কামাল–এর ‘যৎসামান্য নিয়ে যৎসামান্য আলাপ’।

আমাদের সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখকদের একজন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আমার কাছে অবশ্য মনে হয় অনন্য একজন। তিনি একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং বিজ্ঞান লেখক। তাঁর শক্তির জায়গা কোনটি—এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ সাহিত্যের প্রতিটি ধারাতেই তিনি অসামান্য স্বাচ্ছন্দ্য ও শক্তিমত্তার সঙ্গে লিখে চলেছেন।

২০২৬ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর প্রবন্ধের বই ‘যৎসামান্য’। এটি মূলত জীবন ও জগত নিয়ে তাঁর মরমি ও দার্শনিক ভাবনার একটি প্রবন্ধসংকলন। বইটিতে মোট ২৮টি প্রবন্ধ রয়েছে। বেশিরভাগ প্রবন্ধই ২০২২ সালের লেখা। কিছু আছে এর পরেরও। গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্য যেমন বিস্তৃত, তেমনি প্রতিটি লেখার মধ্যেই রয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত চিন্তার স্বাক্ষর।

জীবন ও জগৎ নিয়ে মরমি ও দার্শনিক চিন্তার যৎসামান্য by আহমাদ মোস্তফা কামাল
জীবন ও জগৎ নিয়ে মরমি ও দার্শনিক চিন্তার যৎসামান্য
by আহমাদ মোস্তফা কামাল
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা, প্রথম প্রকাশ: ২০২৬, প্রকাশক: কথাপ্রকাশ, মুদ্রণ মূল্য: ৪০০ টাকা।
সংগ্রহের লিংক: www.rokomari.com/book/530620
আলোকচিত্র: জাহরা জাহান পার্লিয়া

বইটির শুরুতেই আছে জীবনানন্দ দাশ–এর বিখ্যাত কবিতা ‘বোধ’ এর অংশবিশেষ। এই ‘বোধ’ই যেন বইটির মূল সুর। জীবন ও জগত সম্পর্কে লেখকের ভেতরে যে বোধ কাজ করে, সেই অনুভব ও চিন্তার প্রকাশই এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে।

বইটির শেষ প্রবন্ধ ‘কেন লিখি’ পড়া শুরু করেছিলাম সবার আগে। কারণ এই প্রশ্নটি সকল লেখকের মনেই আসে। ধারণা ছিল এই প্রবন্ধটিতে পাওয়া যাবে তাঁর দীর্ঘ লেখালিখির অভিজ্ঞতার গোপন খবর। পাওয়া গেল সে খবর। বাড়তি পাওনা হিসেবে পাওয়া গেল ‘প্রবন্ধ’ নিয়ে লেখকের নিজস্ব সংজ্ঞা। তিনি প্রবন্ধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—‘প্রবন্ধ হলো চিন্তার বিন্যাস, চিন্তার প্রকাশ এবং চিন্তার বিশ্লেষণ’।

গল্প বা উপন্যাসে যেমন ব্যক্তি ও সমষ্টির স্মৃতি এবং স্বপ্নের প্রতিফলন থাকে, তেমনি প্রবন্ধে থাকে লেখকের নিজস্ব চিন্তার চিহ্ন। তবে লেখকের দৃষ্টিতে ‘কেন লিখি’-র উত্তরে পাওয়া যায় ভাগ করে নেয়ার এক দুর্বার বাসনা। তাঁর কাছে লেখালেখির মূল অর্থই হলো—ভাগ করে নেওয়া; স্মৃতি, অনুভূতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা।

এই বইয়ের প্রবন্ধগুলোর বিষয় তাৎক্ষণিক নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে মানবজীবনে ঘুরে বেড়ানো চিরন্তন প্রশ্নগুলোই এখানে আলোচিত হয়েছে। লেখকের নিজস্ব বোঝাপড়া ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে এসব প্রশ্নের দিকে তিনি ফিরে তাকিয়েছেন।

গদ্যগুলো দেখতে মুক্তগদ্য হলেও এগুলো পুরোপুরি এলোমেলো নয়। সব লেখার মধ্যেই একটি সূক্ষ্ম সূত্র রয়েছে। তা হলো লেখকের গভীর সংবেদনশীলতা। এই সংবেদনশীলতার কারণেই তিনি একজন কৃষকের জীবনবোধ, প্রকৃতির প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা কিংবা ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবন নিয়েও ভাবতে পারেন।

একটি প্রবন্ধে এক জায়গায় তিনি প্রশ্ন তোলেন—
আমরা প্রতিদিন কত প্রাণী খাই, কত প্রাণী হত্যা করি। শুধু খাদ্যতালিকায় থাকা প্রাণীই নয়; আমাদের অজান্তে পায়ের নিচে পিষ্ট হয় অসংখ্য পিঁপড়া, কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি, ফড়িং। তখন মানুষের নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই নির্দোষ? এই প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘প্রকৃতির নির্বাচিত জীবনপ্রণালি’। এই ভাবনার মধ্যে লেখকের এক ধরনের সর্বপ্রাণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়।

প্রবন্ধগুলোতে তাঁর এমন মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, যা একদিকে কোমল ও অনুভূতিপ্রবণ, আর অন্যদিকে গভীরভাবে সমাজসচেতন ও রাজনীতি সচেতন

বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ‘হিরণ্ময় নীরবতা’। এখানে তিনি নীরবতার এক অভিনব সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পরমের সঙ্গে সম্পর্কের নামই নীরবতা’।

একটি প্রবন্ধে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের আমাজন অরণ্যে একাকী বসবাস করা এক মানুষের মৃত্যু সংবাদ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ছোট্ট সংবাদ থেকেই তিনি মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

কিছু প্রবন্ধে ব্যক্তিগত স্মৃতিও উঠে এসেছে—ভাড়া করা একটি বাড়ি, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা। কিন্তু এগুলো নিছক স্মৃতিকথা হয়ে থাকেনি; বরং স্মৃতির ভেতর দিয়ে জীবনদর্শনের দিকে এগিয়ে গেছে।

বইটির কয়েকটি প্রবন্ধে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির প্রতিও লেখকের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। যেমন ‘সব একই ইউটোপিয়া?’ প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— আমরা যে দুর্নীতিমুক্ত বা মাদকমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখি, তা কি কেবল কল্পনার ইউটোপিয়াতেই আটকে যাচ্ছে না?

আবার ‘অশ্রু উপত্যকা’ প্রবন্ধে সমাজ ও রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে একটি মুক্ত সমাজ গড়ে উঠতে না পারার বেদনা ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে ‘সর্বজনীন উৎসবের আকাঙ্ক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে উৎসব সত্যিকার অর্থে সবার হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লেখা ‘কখন আমাদের অবাধ্যতা প্রয়োজন’ প্রবন্ধটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে তিনি বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্বপরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি মার্কিন ইতিহাসবিদ ও চিন্তক হাওয়ার্ড জিন–এর একটি ভাবনার উল্লেখ করেন—অন্যায় শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি যেন ভবিষ্যদ্বাণীর মতো করেই বলেছেন, ‘যখন অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, তখন অবশ্যম্ভাবীভাবেই জন্ম নেয় অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ’।

১৬৭ পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধগ্রন্থটি পড়তে পড়তে এমন এক লেখকের সন্ধান পাওয়া যায় যিনি আমাদের অনেক দিনের চেনা, আবার এই চেনার মধ্য দিয়েও তিনি সবার থেকে আলাদা। প্রবন্ধগুলোতে তাঁর এমন মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, যা একদিকে কোমল ও অনুভূতিপ্রবণ, আর অন্যদিকে গভীরভাবে সমাজসচেতন ও রাজনীতি সচেতন। লেখকের মধ্যে একদিকে রয়েছে অসাধারণ এক দার্শনিক মন, আবার অন্যদিকে রয়েছে নীরব এক প্রতিবাদের সুর।

যৎসামান্য তাই কেবল একটি প্রবন্ধসংকলন নয়; এটি একজন লেখকের চিন্তা, বোধ ও সংবেদনশীলতার এক অন্তরঙ্গ নথি।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত