যেখানে লির্বাটি মানে স্ট্যাচু

সংশ্লেষণ: সাংবাদিকের (সাহিত্যিকের) যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার নিরিখে

ভালোবাসার মতো স্বাধীনতার জন্যও আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়; ভালোবাসার মতো স্বাধীনতাকেও প্রতিদিন নতুন করে জয় করে নিতে হয়। আমরা সর্বদা ভালোবাসার মতো স্বাধীনতাকেও হারাচ্ছি, কারণ প্রত্যেক বিজয়ের পর আমরা ভাবি আর কোনো সংগ্রাম ছাড়াই বিজয়ের ফল স্থিরচিত্তে উপভোগ করা যাবে… স্বাধীনতার যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না, কেননা এ হল এক নিরন্তর সংগ্রাম।
—হেনরী ডব্লিউ লেভিনসন

গ্রন্থকীটের মতো পুরনো বইপত্র, পত্র-পত্রিকা ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে সাজ্জাদ শরিফের লেখার সঙ্গে পরিচয় সম্ভবত ২০০৫ সনের শেষের দিকে কিংবা ২০০৬-এর শুরুতে, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে—পারভেজ হোসেন ও শহিদুল আলমের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্যপত্র সংবেদ-এর ৪র্থ সংকলন, নভেম্বর ৮৬ সংখ্যায়। ‘কবিতা: সাম্প্রতিক ভাবনা’ শিরোনামের কবিতা-বিষয়ক একটি গদ্য এবং গোটাছয়েক কবিতা (‘ছাড়পত্র’, ‘প্রেতের উল্লাসে এক মগ্ন কবি’, ‘প্রস্তর গুহার চাঁদ’, ‘বিপ্রতীপ’, ‘চুপপাঠ’) ছিল তাতে। কবিতা-সংক্রান্ত গদ্যটি ছিল চিন্তাশ্রয়ী! তার কিয়দাংশ উল্লেখ করা যেতে পারে—

[…] অতি অগ্রসরমান বিজ্ঞান ইতিমধ্যেই এক নিরঞ্জন অনভিঘাতী বিস্ময়হীন জগতে নিক্ষেপ করেছে আমাদের; কোনো কিছুই আর অবিশ্বাস্য নয় আমাদের কাছে, সমস্ত রহস্যের পেছনে রয়েছে এক জড় যান্ত্রিক নিয়ম জেনে গেছি আমরা প্রায় ঈশ্বরসম্ভব নিপুণতায়। ফলে, পূর্ণতা প্রাপ্তির সাথে সাথে বরং অবশ্যম্ভাবী এক কর্ম হয়ে দাঁড়াবে শিল্পসম্ভোগ।

সেই থেকে তাঁর কবিতা-সংক্রান্ত ভাবনার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতাম। তাঁর কবিতার রসাস্বাদনের তাগিদও যে একেবারে ছিল না তা নয়। পরবর্তীকালে বইয়ের জগৎ-এর পঞ্চম সংকলন, নভেম্বর ২০১০ সংখ্যা থেকে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ, যৌথভাবে সম্পাদিত একটি শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন ও আমাদের আজকের আলোচ্য লিবার্টি মানে স্ট্যাচু Text-এর খোঁজ পাই। এছাড়াও একটি দৈনিকে তাঁর কয়েকটি কলাম ও Text-সংক্রান্ত আলোচনাও চোখে পড়েছিল । কিন্তু আমার চাহিদার—তাঁর কবিতা-সংক্রান্ত ভাবনা— সঙ্গে সেগুলো সামঞ্জস্য বিধান করেছে সামান্যই। অনেকটা ‘মধ্বাভাবে গুড়ং দদ্যাৎ’—এই প্রবাদের মতোই তাঁর কাব্যভাবনা না পেয়ে সাম্প্রতিক কালের (২০০৫-২০০৭খ্রি.) বিশ্বভাবনা (রাজনৈতিক) আস্বাদন, অতঃপর এই উদ্‌গিরণ।

১.
অধুনা সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফের ‘দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার’ কিছু সাংবাদিকের একজন হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকালে ‘রাজনীতিক-আমলা-বুদ্ধিজীরী-সমাজকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, গণমাধ্যম আর ধর্মশালা পরিদর্শন, ঐতিহাসিক ও অভিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় ভ্রমণ’ ইত্যাদি অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ছয়টি প্রবন্ধের সমন্বয়ে এই Text রচিত।

Textটি রচনাকালে লেখক সাংবাদিকতার নীতি-কৌশল, সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বিশেষভাবে সজাগ ছিলেন বলেই মনে হয়। কেননা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে একজন সাংবাদিক সংঘটিত ঘটনা শুধুমাত্র উপস্থাপনই করতে পারেন, সাধারণীকরণ করতে পারেন না। এছাড়াও তাঁকে সাংবাদিকতার কিছু নীতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হয়। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে তিনি অনুপুঙ্খভাবে বিষয়গুলো মেনে চলেছেন। একজন তথ্যদাতার নাম তাঁর অমতে পরোক্ষভাবে কৌশলে উল্লেখ (মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশ নিয়ে কয়েক পশলা) এমনই একটি ব্যতিক্রম।

অবশ্য প্রত্যেকটি প্রবন্ধেই তিনি বিভিন্ন সাংবাদিকের মুখনিঃসৃত বক্তব্যের উপস্থাপনার মাধ্যমে যে তথ্য পাঠকদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন তা সন্দেহাতীতভাবে বিষয়ানুগ ও বাস্তবঘনিষ্ঠ। যেমন: ‘এশীয় মুসলমানদের চোখে আমেরিকা রাষ্ট্রটি কেমন’ প্রবন্ধে তিনি বিবিসি পেশোয়ারের প্রযোজক আশরাফ আলীর মারফত বলেন—

[…] অষ্টম শতকে আরবরা মুসলিম সাম্রাজ্য টেনে নিয়ে গিয়েছিল মধ্য ফ্রান্স অবধি। একাদশ শতকে শুরু হওয়া ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে জেরুজালেম পর্যন্ত পশ্চিমা খিষ্ট্ৰীয় শাসন ঠাঁই গাড়ে। ইউরোপের হৃৎপিণ্ডে, বিশেষত বলকানে, চতুর্দশ শতকে আবার মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের মাধ্যমে। যেন বা এরই প্রতিশোধ নিতে ১৯ শতক অবধি উপনিবেশ কায়েম করতে করতে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়ার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে ইউরোপ। পরের শতাব্দীতে এসে দ্বিতীয় মহাসমরের পর প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের এই চিরন্তন বিরোধই যেন গরিব দেশগুলোয় আত্মপ্রকাশ করে ধনতন্ত্র বনাম সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ের মোড়কে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর, ঠাণ্ডাযুদ্ধের অধ্যায় শেষে, যুক্তরাষ্ট্রের নবরক্ষণশীলদের বেগবান নেতৃত্বে সে সংঘর্ষ ফিরে এসেছে আবার এক নতুন চেহারায়। সমাজতন্ত্রের শূন্য সিংহাসনে এবার শত্রু হিসাবে অভিষেক ঘটেছে ইসলামের। তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে নয়া সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় কাতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
[পৃ. ১০-১১]

পরক্ষণেই লেখক এতে হান্টিংটনের দুই ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্বের গন্ধ খুঁজে পান। এই সংক্রান্ত কিছু প্রসঙ্গ অবতারণার উল্লেখপূর্বক লেখক মুসলিমদের আত্মানুসন্ধানের বয়ান উপস্থিত করেন—

[…] মুসলমানেরা ইতিহাসজুড়ে ভুল নেতাই বাছাই করে গেল। উগ্রবাদীরা তাদের আপন স্বার্থের লড়াই আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, আর আমরাও তাই নিয়ে হুল্লোড়ে মাতি…। …নানা ছলে ও বলে যে জনগোষ্ঠীকে এত দিন ধরে মাটির সঙ্গে চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, জান বাঁচানোই যার দায়, তার আর আত্মসমালোচনার অবকাশ কোথায় !
[পৃ. ১৪]

‘ইরাকের অতীত আছে, ভবিষ্যৎ নেই’ প্রবন্ধে তিনি বলতে চান অতীত ও বর্তমান নিতান্তই বাইনারি অপজিট নয়। এমন অনেক রাষ্ট্রই থাকতে পারে যাদের সমৃদ্ধ অতীত থাকলেও ভবিষ্যৎ তেমন আশাপ্রদ নয়। ইরাক তেমনই একটি রাষ্ট্র। এই প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কথা মনে পড়ে। তিনিও বাংলাদেশ সম্পর্কে অনুরূপ একটি মন্তব্য করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের সম্ভাব্য কারণগুলো—

১. […] বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেলের খনি ইরাকে এবং অত্যন্ত কম খরচে সেসব উত্তোলনযোগ্য। বিশ্লেষক ও জ্বালানি কর্মকর্তারা আগেই দেখিয়েছিলেন, ইরাককে কব্জা করা গেলে সুবিধামত আইন প্রণয়ন করে সেখানকার জ্বালানিশিল্প পুনরুদ্ধারের সূচনাপর্বেই লাভের তিন-চতুর্থাংশ তুলে আনা সম্ভব। [পৃ. ১৭-১৮]

২. […] মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান সংহত করা, ডলারের বিপরীতে সে সময়ে ইউরোর ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি রোধ, ইউরোপীয় জোটের দ্রুত উত্থানের পটভূমিতে বিশ্বব্যবস্থার ওপর নিজেদের একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা। [পৃ. ১৮]

৩. […] ইরাকের মধ্য দিয়ে আরব ঐক্যের আদর্শ ও প্রতীকটিকে তছনছ করে দেওয়া…। [পৃ. ১৮]

—উল্লেখ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও প্রভাবশালী থিংক ট্যাংকদের ইরাককে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে একটি ‘কোমল’ বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রসঙ্গও আলাপ করেছেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ইরাক এখনও পর্যন্ত অ-বিভাজিতই আছে (প্রবন্ধটি ১৩ জুন, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে লিখিত)। ‘সত্য, তথ্য ও মত্ত গণমাধ্যম’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক বলছেন—

১. […] পত্রিকাগুলো বাণিজ্যের কাছে তাদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছে। তাদের এখন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে টেলিভিশনের মারদাঙ্গা সাংবাদিকতার সঙ্গে। সত্য কথা বলে জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি নেওয়ার মতো সাহস তাদের বুকে আর নেই। [পৃ. ২৫]

২. […] বহু গুরুত্বপূর্ণ খবর তারা পরিবেশন করেন না শুধু এ কারণে যে দর্শক-শ্রোতাদের তাতে রুচি নেই।… মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত খবরের বেলায় মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির ছায়াতল থেকে নিজেদের তারা সরিয়ে আনতে পারে নি। [পৃ. ২৬]

মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলির News দেওয়ার চাইতে Views তৈরির মাধ্যমে পাঠকপ্রিয়তা অর্জনের কিছু তথ্যও তিনি উপস্থাপন করেছেন—

[…] হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ‘ইসলামী জঙ্গি’ বা ‘মুসলমান জঙ্গি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বরের পর মার্কিন পত্রিকায় সে রকম খবর বেরিয়েছে মোট ১১ হাজার। প্রতিবছর গড়ে ১,৬০০ থেকে দুইহাজার। অথচ ১১ সেপ্টেম্বরের এক বছর আগে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৬৮টি। [পৃ. ২৩]

এর ফলাফলও হাতেনাতে মিলছে—

[…] ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক দ্য কাউন্সিল অন অ্যামেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস মুসলমানদের ভেদনীতি, বিদ্বেষ ও হিংসার শিকার হওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি রেকর্ড করেছিল ১৯৯৫ [?] সালে [হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালে—লেখক]। ওই বছর তাদের লিপিবদ্ধ ঘটনার সংখ্যা ছিল ১,৯৭২টি। পরের বছরই অর্থাৎ ২০০৬ সালে, এ সংখ্যা লাফ দিয়ে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। [পৃ. ২৩-২৪]

যেখানে লির্বাটি মানে স্ট্যাচু সাজ্জাদ শরিফ
যেখানে লির্বাটি মানে স্ট্যাচু by সাজ্জাদ শরিফ
প্রকাশকাল: ২০০৯, প্রকাশক: সন্দেশ

এই রকম বাস্তবতায় গণমাধ্যমের আরো ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রেক্ষিতে আহমাদ মাযহারের ‘যে কোনও শক্তিমানেরই শক্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতার দিকও রয়েছে, আর তা রয়েছে শক্তির কারণেই। সুতরাং গণমাধ্যম সে হিসাবের বাইরে থাকতে পারে না।’—এই উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য।

‘ধর্মে ধর্মে কথাবার্তা’ প্রবন্ধটি বিষয় হিসেবে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের আন্তঃধর্মীয় সংলাপ অনুষঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীগণ তাদের নিজেদের ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে অন্য ধর্ম সম্পর্কেও জানতে পারবে। ফলে ধর্ম-রাজনীতিবিদগণ ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে সুস্থ মানসিকতার পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলতে পারবে না। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ থাকলে ক্রমান্বয়ে তা হ্রাস পাবে।

‘রাষ্ট্র আর ধর্ম ঘোষিত ভাবে আলাদা করতে পেরেছে বলে যে দেশ গর্ব করে’, যেখানে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চর্চিত হচ্ছে সেখানেও এটি, বিভিন্ন ধর্ম তো অনেক পরের কথা, নিজ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই বিরোধ সার্থকভাবে নিষ্পত্তি করতে পারেনি। লেখক দৃষ্টান্ত দিয়েছেন—

১. […] সুপ্ত এসব বিভক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের পরে আরো প্রকাশ্য হয়ে পড়ে, পলকা এ যৌথতা ভেঙে যায়, যখন লেবানিজ ও ইরাকি শিয়া আর খ্রিষ্টানেরা হামলার পক্ষে এবং সুন্নিরা বিপক্ষে মিছিলের পর মিছিল তরঙ্গ তুলতে থাকে। [পৃ. ৩৩]

২. […] আন্তধর্ম সংলাপের নেত্রী ও আমাদের অন্যতম আমন্ত্রণকর্ত্রী শ্যারোনা শাপিরো জায়োনিজমের রক্তাক্ত ও নৃশংস ইতিবৃত্তকে আধ্যাত্মিক মোড়কে পেশ করেন। [পৃ. ৩৩]

অবশ্য এই সকল ক্ষেত্রে বিরোধের কারণ চৈতন্যগত না হয়ে স্বার্থগত (ঐহিক) হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।

আন্তঃধর্মীয় সংলাপের এই প্রায়োগিক ফলাফল দেখে হতাশ লেখকের মত—

১. […] মানুষের ওপর মানুষের বর্বরতার পেছনে ফণার মতো উঁচিয়ে থাকে যে রাজনৈতিক দর্প ও হিংসা, তার মূলটি না উপড়ে তখন পরিত্রাণ খোঁজা হয় ধর্মীয় সংলাপের ভেতরে। এ ধরনের সংলাপে তাই মানুষতো বটেই, মূল সমস্যাটিকেও খর্ব করে ফেলা হয়।

এত দূর এসে এরকমও মনে হয়, যেন এ ধরনের ধর্মীয় সংলাপের ভিত্তি স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাতের সংকীর্ণ তত্ত্ব। কিন্তু পরিকল্পিত অব্যাহত আক্রমণ করতে করতে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মা বিক্ষত করে তুলতে থাকলে তার যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে আত্মীয়বন্ধনে জড়ানো মানুষের নানা প্রান্তে। মূল সমস্যাকে পেছনে ফেলে শুধু প্রান্তে প্রান্তে আলাপণে (হওয়ার কথা আলাপনে—লেখক) তখন ক্ষতটির প্রকৃত উপশম কি আর আদৌ সম্ভব? দুনিয়ার সমস্যার আদি তো আর কেবলই সভ্যতায় সভ্যতায় সংলাপের অভাব নয়। তাহলে কোনোমতে শুধু সেটুকুর ব্যবস্থা করতে পারলেই হতো। এ পথেই ঘটত সমস্ত আদির ইতি। [পৃ. ৩৪]

‘মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশ নিয়ে কয়েক পশলা’ প্রবন্ধটিতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান আলোচিত হয়েছে।

রাজনৈতিক সংস্কারে সেনাবাহিনীর ভূমিকা-সংক্রান্ত আলোচনায় পেশোয়ারের বিবিসির প্রযোজক আলী আশরাফের জবানিতে লেখক জানাচ্ছেন—

[…] রাজনৈতিক সংস্কার করতে গিয়ে কোথায় সামরিক বাহিনী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েনি…। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যই এটা ভালো হতে পারে না। তা ছাড়া যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে রাষ্ট্র চলে, তাদের কর্তৃত্বও সামরিক বাহিনী তারপর আর মানতে চায় না। ক্ষমতার টানাপোড়নে তাদের মধ্যে ভেদবুদ্ধি ঢোকে, ভেতর থেকে তাদের ঐক্যে ফাটল ধরে।
[পৃ. ৩৬-৩৭]

দেশের ভূ-রাজনৈতিক পটভূমি সম্পর্কে লেখকের তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য—

১. […] অর্থনীতিতে পেশীবহুল রাষ্ট্র হিসাবে চীন ও ভারতের দানবীয় উত্থানের পটভূমিতে… বাংলাদেশ (হবার কথা ‘বাংলাদেশের’— লেখক) ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন তাৎপর্যে ফিরে এসেছে।… বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত শতচ্ছিদ্র। এমনকি এর নৌ-সীমান্তও অরক্ষিত। [পৃ. ৪০]

২. […] যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এখন আর অতীতের মতো শীতল নয়। ভারত তার বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর সেখানে মার্কিন পুঁজির বিপুল লগ্নী ঘটেছে। এর পেছনে পেছনে ছুটে গেছে দুই দেশের মধ্যে সামরিক-বেসামরিক দ্বিপক্ষীয় নানা সহযোগ। অন্যদিকে চীন বিদেশী পুঁজির পথ খুলে দিলেও তার স্বতন্ত্র বিদেশনীতি এখনো আঁকড়ে ধরে আছে। চীনের আশেপাশে ভিয়েতনাম, কম্পুচিয়া, লাওস বা উত্তর কোরিয়ার মতো মার্কিন বিরোধী রাষ্ট্রগুলোর কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার দাঁত ভালোমতো বসাতে পারেনি। বাংলাদেশের সীমান্তে চীন-সমর্থিত মিয়ানমারও তাদের প্রতি বড় অবন্ধুপ্রতিম। ঐ বৈরিতা আরো বিস্তৃত হয়ে নেমে এসেছে বাংলাদেশের প্রায় উপাত্তে, কেন্দ্রের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ রাজ্যগুলোয়। ভারত তার প্রতিরক্ষা নীতিতে অশান্ত উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সাপেক্ষে চীনকে নজরে রেখে আসছে। এক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ প্রায় অভিন্ন। আর এত সব তাবড় রাষ্ট্রের নিরাপত্তাস্বার্থের তলায় বাংলাদেশ টলমল করছে উত্তাল সাগরে পলকা ভেলার মতো।
[পৃ. ৪০ -৪১]

Text-এর শেষ প্রবন্ধ ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভেদ’। এটি লেখকের ‘হনলুলুর ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টারে ২৫ মে ২০০৭ তারিখে দেওয়া বক্তব্যের সরল বাংলা তর্জমা’। প্রবন্ধটির মূল বক্তব্যের সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের (সলিডস্টেট ফিজিক্স) সূত্রের চৈতন্যগত মিল লক্ষণীয়। সলিডস্টেট ফিজিক্স মোতাবেক বস্তুর প্রত্যেকটি কণাই একে অপরকে আকর্ষণ করে। আবার একই সঙ্গে বিকর্ষণও করে বটে । এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণ বলের পারস্পরিক অনুপাতের ক্রান্তিক হারে বস্তুর আয়তন নির্ধারিত হয়। যদি বিকর্ষণকারী বল না থাকত তাহলে একটি বস্তুকণা অপর বস্তুকণার ভিতর পুরোপুরি প্রবিষ্ট হয়ে যেত। এর ফলে বস্তুর ভর হত অসীম। আর যদি আকর্ষণকারী বল না থাকত তাহলে কঠিন পদার্থ তার বস্তুগত অবয়বই পেত না । তদ্রূপ ব্যক্তির সার্বভৌম ইচ্ছার সর্বোচ্চ সমুন্নত বহিঃপ্রকাশ ঘটে গণতন্ত্রে। কিন্তু রাষ্ট্রের নিকট জনগণ তাদের সার্বভৌম ইচ্ছার কিছু অংশ জমা রাখতে বাধ্য হয়। এভাবেই গণতন্ত্রে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নিরূপিত হয়। অথচ ইসলাম ও কমিউনিজমে ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির ইচ্ছার প্রতিফলনই প্রধান। তাছাড়া গণতন্ত্র, ইসলাম ও কমিউনিজমের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ভিন্ন। এইসব বিষয় মাথায় রেখে লেখকের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য—

১. […] গণতন্ত্রের জন্ম ব্যক্তির সার্বভৌম ইচ্ছায়। অথচ ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির অধিকারই কি ইসলামে বেশি নয়? দুজনার দুটি পথ তো দুটি দিকে গেছে বেঁকে। গণতন্ত্রের মূল্যে যারা আস্থা রাখেন, তাদের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তি প্রবল (অবশ্য ইসলামেও সিনিয়রিটির ভিত্তিতে এক ধরনের নির্বাচন প্রথা ছিল— লেখক)। এ প্রশ্নও হয়তো কেউ তুলতে পারেন, ইসলামি দুনিয়ায় আমরা কি স্বাধীনভাবে কখনো গণতন্ত্রের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে? (এই বাক্যের সর্বশেষ শব্দটি হওয়ার কথা ‘পেয়েছি’– লেখক) সত্য এই যে, গণতন্ত্রও আমরা পেয়েছি উপনিবেশের উত্তরাধিকার হিসাবে। আমাদের জীবন, সম্পর্ক ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ধর্মও উপনিবেশের জাঁতাকলের নিচে পিষ্ট হয়েছে। পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিশ্বায়নের আগে, কথিত মধ্যযুগে, বিশ্বের নানা প্রান্তে গণতন্ত্রের যে চকিত স্ফুরণ ঘটেছিল, মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চল সেখানে একেবারে গরহাজির ছিল না। ইস্তাম্বুল, কার্দোবা এবং বাগদাদ গণতন্ত্রের সেই ক্ষুদ্র আলোর মিছিলে ছোট ছোট পিদিম সরবরাহ করেছিল। জ্ঞানভিত্তিক সেই উজ্জ্বল ইতিহাসের গণেশ পরে পুরোপুরি উল্টে দেয় পশ্চিমের সমরভিত্তিক উপনিবেশ। গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার কোনো অবকাশ, এরপর, আমরা আর পাই নি। [পৃ. ৪৩-৪৪]

২. […] যাকে আমরা ‘ইসলামি মৌলবাদ’ বলে চিহ্নিত করি, তার গোড়া ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গভীরে। কারণ উপনিবেশের বদ্ধ গণ্ডির ভেতর থেকে ইসলামও বিকাশমান ইতিহাসের সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে নি, তার সঙ্গে দেওয়া-নেওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি। [পৃ, 88]

Textটি রচনাকালে লেখক সাংবাদিকতার নীতি-কৌশল, সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বিশেষভাবে সজাগ ছিলেন বলেই মনে হয়। কেননা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে একজন সাংবাদিক সংঘটিত ঘটনা শুধুমাত্র উপস্থাপনই করতে পারেন, সাধারণীকরণ করতে পারেন না

কথিত আছে, আমেরিকা যার বন্ধু তার শত্রুর অভাব হয় না। এই যার বহির্বিশ্বে নিজের ভাবমূর্তি, সেই রাষ্ট্র কীভাবে বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় একমাত্র পরাশক্তি, তার ভবিষ্যৎই-বা কী—ইত্যাকার প্রশ্নে নানা মুনির নানা মত আলোচনা করে অনেকটা অক্টাভিও পাজ-এর অনুকরণে তাঁর প্রায় দার্শনিক অভিমত—

[…] বিশ্বের নানা কোণ থেকে বিচিত্র জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি, গোষ্ঠির লোক এসে এই মহান মার্কিন মোজেইকটি গড়ে তুলেছে। সে অর্থে আমেরিকা পৃথিবীর বিপুল অবদানে গড়ে ওঠা এক দেশ। তারপরও মোজেইক শেষপর্যন্ত মোজেইকই। এর অনুপম বিন্যাস বুঝতে হয় কিছুটা দূরত্বে থেকে। কাছে ঘেষলে জল বা তেলরঙের সূক্ষ্ম মিশেল এতে আর মেলে না। মোজেইকের খুদে খুদে একক টুকরোর মাঝখানে বিভাজনের রেখাগুলো ফুটে উঠতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে এই ভেদ লক্ষ্য করা যায় নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা আর রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে; সাংবাদিকদের বাসনা আর গণমাধ্যমের প্রকাশনায়; এমনকি সেইসব গোষ্ঠীর সভ্যদের মধ্যে, যারা আন্তধর্ম সংলাপে নিবিড়ভাবে লিপ্ত। [পৃ. ৪৫-৪৬]

এই মার্কিন মোজাইক-এর নিরাপত্তা সম্পর্কে তাঁর মতামত—

১. […] অথচ প্রশ্ন হচ্ছে, চারপাশের রাষ্ট্রগুলো ভেঙে, গুঁড়িয়ে দিয়ে, তাদের নিরাপত্তা তছনছ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও কি আদৌ কোনো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব? যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, তার ভবিষ্যতের সুরক্ষাও শেষ অবধি নির্ভর করছে পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা একটি ঐক্যসূত্রে গেঁথে তোলার ওপরই।
[পৃ. ৪৭]

পরিশেষে তিনি উপস্থাপন করেছেন তাঁর মার্কিন মুলুক পর্যবেক্ষণের সার—

২. […] মার্কিন ‘আমি’ এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে দুই টুকরো হয়ে; মার্কিন সরকার ও মার্কিন জনতায়। বহুবিজ্ঞাপিত গণতন্ত্রের এই জমানায় ঠিক এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ এবং অপরাপর বহুরাষ্ট্রের মধ্যে আদতে কোনো মূল পার্থক্য নেই। [পৃ. ৪৭]

মোটামুটি এই হল সাজ্জাদ শরিফের Text-এর Way to Truth-এর বিস্তারিত বয়ান। এবার Way of Opinion-ও একটু দেখে নেওয়া যাক ।

২.
ক. এই Text-এর বক্তব্য উপস্থাপন কৌশল Ethico-Cognitive Parallelism দোষে দুষ্ট। যেমন—

[…] ক্ষমতার হাতে তা ভাষা পেয়েছে… [পৃ. ১০]

লাইনটি কাব্যিক সন্দেহ নাই কিন্তু ওখান থেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ/তথ্য পাওয়া যায় না।

[…] সঙ্গত জিনিসটা… [পৃ. ১০]

সঙ্গতি কি জিনিস/বস্তু?

১. […] মুসলমান উগ্রবাদীদের কি হিসাবে উল্লেখ করলে জিনিসটা খারাপ শোনাবে না…. [পৃ. ২৬]

২. […] ঘৃণার লাভাস্রোত… [পৃ. ২৯]

৩.[…] ফণার মত উঁচিয়ে থাকে যে রাজনৈতিক দর্প ও হিংসা…. [পৃ. ৩৪]

৪. […] ভবিষ্যতে অনেকের আস্থা, সেটি কি পদার্থ? [পৃ. ৪৫]

অনেকে (যারা মুখ্যত সাহিত্যিক মনস্তত্ত্বের মানুষ) বক্তব্য উপস্থাপনের কৌশলে Ethico-Cognitive Parallelism-এর দোষকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাইবেন না। কিন্তু একটি রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধের অনুপুঙ্খতার স্বার্থে এটি জ্ঞানতাত্ত্বিক কারণেই অতি জরুরি।

খ. এই Text-এ বক্তব্য উপস্থাপনের সময় উদ্ধৃতির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। এই উদ্ধৃতিগুলো নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ Text থেকে, যা মার্কসীয় স্কুলের বহুল চর্চিত কৌশলের অনুকরণ ছাড়া কিছুই নয়। ছয়টি ছোট ছোট প্রবঙ্গের এই Text-এ কম করে হলেও দশটি উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে উদ্ধৃতিগুলো বেশ দীর্ঘও। কোথাও কোথাও এই উদ্ধৃতির ওপর দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা হয়েছে। যেমন ‘ধর্মে ধর্মে কথাবার্তা’ প্রবন্ধটিতে অমর্ত্য সেনের উদ্ধৃতির ওপর দাঁড়িয়েই লেখক আন্তঃধর্মীয় সংলাপ বিষয়ে তাঁর মতামত দিয়েছেন। এমনকি Text-টির নামকরণ করা হয়েছে চিলির প্রতিবাদী কবি নিকোনোর পাররা-র একটি প্রতিকবিতা থেকে।

গ. Text-এ উপস্থাপিত তথ্যের কোনো পুনরাবৃত্তি না থাকলেও আমাদের মনে রাখতে হবে ঐতিহাসিকের ইতিহাসচর্চা, রাজনীতির বয়ানের সঙ্গে সাংবাদিক কিংবা সাহিত্যিকের ইতিহাস-রাজনীতির ঘটনার উপস্থাপনে পদ্ধতিগত ফারাক আছে। একজন ঐতিহাসিক ঘটনার বয়ানে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যে পরিমাণ নিস্পৃহ হন কিংবা হতে পারেন অন্যের পক্ষে সেটা হওয়া কষ্টকর বৈকি। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্ধসত্য, অসত্য, এমনকি মিথ্যার প্রভাবেও মানবমন পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারে। তাই একজন ঐতিহাসিক তাঁর নিজের মতের বিরুদ্ধমতের কোনো তথ্য, যা তাঁকে মানসিকভাবে তৃপ্তি দেওয়ার কথা নয় মোটেই—তাকেও তিনি তাঁর চর্চায় অবলীলায় ব্যবহার করেন, করতে পারেন। এখানেই জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির (Epistemology) মাহাত্ম্য, সৌন্দর্য। আমাদের আলোচ্য Text-এর লেখক কি তাঁর মতের বিরুদ্ধ মত, যা তাঁকে মানসিকভাবে তৃপ্তি দেয় না কিন্তু তাঁর বিভিন্ন সাংবাদিক বন্ধু উল্লেখ করেছেন তা তাঁর রচনায় ব্যবহার করেছেন? খুব সম্ভবত কবিতার সঙ্গে দর্শনের (প্রবন্ধ) এখানেই মৌলিক ফারাক।

ঘ. ধর্ম কিংবা জিরাফ যেকোনো একদিকে হেলে না পড়ার প্রসঙ্গে (ফ্ল্যাপে উল্লিখিত) উপস্থাপিত বক্তব্য লেখকের নিতান্তই ব্যক্তিগত বা স্বতন্ত্র হলেও উপস্থাপনের কৌশল অনেকটাই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কাব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ঙ. সবশেষে বলা যায়, একটি ঘটনাকে উপরিতল (Surface) থেকে দেখা, আর ভেতর থেকে দেখা—দেখার পদ্ধতি কিংবা যোগ্যতা মোটেই এক নয়। যে কোনো আর্থ-সামাজিক কিংবা আর্থ-রাজনৈতিক ঘটনার বয়ানে, বিশ্লেষণে, ভবিষ্যৎ অবস্থা বা ব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্বানুমানে নিশ্চিতভাবেই ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞরাই সবচেয়ে যোগ্যতম ব্যক্তি, সাংবাদিক কিংবা সাহিত্যিকেরা নন ৷

আমরা আমাদের আলোচনা শুরু করেছিলাম তাঁর কবিতা ভাবনা’ সংক্রান্ত একটি টেক্সটের উদ্ধৃতি দিয়ে, শেষও করছি সেই টেক্সটেরই অন্য একটি অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে—

[…] অতি প্রসাধনের তলায় মানুষ তার স্বকীয় সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ, মূলত অন্যান্য প্রাণীরই মতো জন্তু—সভ্যতার গুণ্ঠনের আড়ালে যা সে লুকিয়ে রাখে। প্রকৃত মানুষ, অন্যান্য জন্তুরই মতো, হননকামী, স্বার্থপর, অত্যাচারী, বীভৎস, জান্তব, হিংস্র। আমাদের দায়িত্ব হবে হারিয়ে যাওয়া মৌল সত্তার মানুষটিকে আবিষ্কার করা।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত