মানুষ! নারী ও পুরুষ!
পুরুষ যেমন নারীর প্রতি আকর্ষিত, বিমোহিত, মুগ্ধ; নারী কি ততটা পুরুষের প্রতি প্রলুব্ধ, নিবেদিত? নারী ও পুরুষের সম্পর্কের মধ্যখানে কপাটের মতো স্থির শরীর ও মন। মন ও শরীর—একটা না থাকলে অন্যটি মাকাল ফল। আমরা সবই জানি, কিন্তু এক ধরনের পুরুষ বিধাতার নামে নারীদের আটকে রাখছে চার দেয়ালের মধ্যে। নারীর স্বাভাবিক সত্তার প্রকাশ ও বিকাশকে করেছে অবরুদ্ধ।
এই করুণ বাস্তবতায় সাহসী ও শিল্পরূপময়তায় বিশিষ্ট গল্পকার আয়েশা জাহান একটি বইয়ে দুটি গল্পের আখ্যানে নিয়ে এসেছেন একেবারে ভিন্ন কিন্তু প্রণত বয়ান।
একজন নারী নিবেদিত একজন রুচিস্নিগ্ধ পুরুষের প্রতি। এবং নিজেই উপস্থিত হয়ে নিবেদন করে। পুরুষ একটু বিস্মিত হলেও গ্রহণ করে। নারীর মনে হয়, আমি যেভাবে যতটুকু চাই, ঠিক তত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না পুরুষের কাছ থেকে। এক ধরনের নিয়মতান্ত্রিক খোলসের মধ্যে আটকে রাখছে পুরুষ।
সর্বনাশের আশায় গল্পে আয়েশা জাহান লিখেছেন—
‘আপনি এমন ওড়না জড়িয়ে বসে আছেন কেনো?… আমি আলতো হাসলাম। মনে মনে বললাম— আপনার হাতদুটো কি চলৎশক্তি রহিত? এই সামান্য আবরণ খুলে নিতে পারছেন না! অনেকটা সময় গড়িয়ে গেলো। তিনি এমন মায়াজড়ানো চোখে তাকিয়েছিলেন, খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার চোখের পাতায় চুমু খেয়ে মুখটা আমার বুকের মাঝখানে ঠিক স্তনযুগলের মধ্যিখানে নিবিড়ে জড়িয়ে রাখি।
বললাম— আমি কি আপনাকে কয়েকটা চুমু খেতে পারি?
তিনি মায়াভরা দৃষ্টিতে মিনতির কণ্ঠে বললেন— সেটা কি প্রশ্নের অপেক্ষা রাখে?
আমি হাঁটু গেড়ে বসে তার পায়ের আঙ্গুল সিক্ত করলাম আমার অধরস্পর্শে। মনে সংশয় জেগেছিল— আমার অধর কি তার চরণ স্পর্শ করবার যোগ্য! তিনি দ্রুত হাতে আমার মুখ তুলে ধরে বললেন— সেকি, পায়ে ময়লা যে! বুকে জড়িয়ে নিলেন।’
এইভাবে একজন নারী নিজেকে নিবেদনের ডালায় মেলে ধরলেন একজন পুরুষের কাছে। বাংলা ভাষার কোনো উপন্যাসে, গল্পে এমনটা কী আগে কেউ লিখেছেন? আমাদের বাংলা ভাষাটা এক ধরনের পুরুষালি পৌরুষের মধ্যে বন্দী থাকলো। গল্প-উপন্যাসে অসংখ্য পুরুষ চরিত্র আছে, কিন্তু কোনো লেখক, গবেষক, পণ্ডিত, অভিসন্দর্ভ রচনাকারী পুরুষ চরিত্র নিয়ে দু’কলম লিখেছেন চোখে পড়েনি। অথচ বিশ্লেষণের নতুন একটা ডাইমেনশন হওয়া উচিৎ ছিল, বা এখনও হতে পারে, যদি কেউ পুরাতন ডালপালায় বাসর না সাজিয়ে নতুন করে উন্মেষ করে দিতে পারেন দরজা।
আয়েশা জাহান যে পুরুষকে কেন্দ্র করে ‘সর্বনাশের আশায়’ অপেক্ষা করছিলেন, সেই পুরুষ আবার অতিশয় ভদ্রলোক। নিজেকে আটকে রাখতে পারে অবদমনের দক্ষতায়। তখন নারীটির কি হয়?
নারীটি বলছেন—
‘আমাকে বারংবার চাইতে হয়েছে, আপনি নিতান্তই চাননি বলে। আমার দুভার্গ্যই হোক কিংবা ব্যর্থতাই হোক আপনার কাছে আমার বিন্দুমাত্র জায়গা হয়নি।’
নারী ও পুরুষের চাওয়া পাওয়ার মধ্যে থাকে দুস্তর ব্যবধান। আবার থাকে না বিন্দু পরিমাণও। এই থাকা ও না থাকার সূত্রে আয়েশা জাহান দেখাতে চেয়েছেন— পুরুষের মতো নারীও চায় বাসনায়, তীব্র কামনায় পুরুষকে। কিন্তু নির্বাচনে ভুল হলে, কিংবা দূরাগত মুগ্ধতায় পড়লে, শেষে পতিত হতে হয়।

by আয়েশা জাহান
প্রকাশক: শিখা প্রকাশনী, মূল্য: ২০০ টাকা
আয়েশা জাহান গল্পের শেষের দিকে দীর্ঘ সংলাপের এক জায়গায় লিখেছেন—
“আমায় যদি প্রশ্ন করেন বেলীফুলের গন্ধ আমার কেমন লাগে, আমি বলবো ভালো লাগে। কিন্তু ‘ভালো লাগে’ কথাটা দিয়ে আদৌ প্রকাশ পায় না গন্ধটা কেমন লাগে!”
নারীর সঙ্গে পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্বের যে কাঁটা— এই লাইনকটা হতে পারে দিকদর্শন।
স্বাভাবিকভাবে, সেই সুরম্য এবং কেতাদুরস্ত পুরুষটির সঙ্গে আয়েশা জাহানের অংকিত নারীর সম্পর্ক টিকে থাকে না। টিকে নাই থাকুক কিন্তু নারীর শরীর ও মনের কোণের মধ্যে থাকা অসীম তৃষ্ণা ও সাহসের এক লোলুপ তরবারির সন্ধান পেয়ে যাই। সমাজ, সংসার, প্রেম, ভালোবাসা, শরীর কেবল একচেটিয়া পুরুষের নয়, নারীও পুরুষের শরীরের ঘাম, ঘ্রাণ, অর্গাজমের পোস্টমর্টেম করতে পারে, উদ্যত ফণায়।
‘মরব বলেই জন্মেছি বাঁচব বলে নয়’— গল্পের চরিত্র যে নারী সে বারবনিতা, বেশ্যা। সেও মুগ্ধ পুরুষের শরীরে। নিজের জীবনের তিক্ত কিন্তু সুরাসুর অভিজ্ঞতার আলো জ্বালিয়ে অবলীলায় বলে যাচ্ছে অপমান লাঞ্ছনায় সিদ্ধ আত্মনিবেদনের গৌরব।
নিজের মুখে বেড়ে ওঠার জম্পেশ অভিজ্ঞতার বয়ানে লিখেছে চরিত্র—
‘ছোটবেলায় সিনেমা দেখতাম যখন, মনে হত নায়িকাদের বুকের উপরাংশ খুলে দেখায় অথচ নায়কদের গলা পর্যন্ত ঢেকে রাখে কেনো? ছেলেরা কেবল নায়িকাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে চাইবে, মেয়েরা নায়কদের প্রতি নয়?’
এই প্রশ্নের করাতকলে অসংখ্য মানুষ—নারী-পুরুষ পুড়েছে, পুড়ছে কোটি কোটি বার। কিন্ত কেউ লেখেনি। সমাজের রাষ্ট্রের এক ধরনের শুচিবাইগ্রস্ততার কারণে পর্দা ছিঁড়ে বের হয়ে আসেনি, সেখানে লেখক গল্পকার আয়েশা জাহান অনন্য ব্যতিক্রম। তিনি পর্দার আড়ালে পুরুষ শরীর ও মানস কাঠামোর উপর নির্দ্বিধায় চালিয়েছেন মনযাতনার করাত। ফলে, রক্তের সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে পুঁজ, ঘৃণ্য মাছির গন্ধ।
এভাবেই আয়েশা জাহান খুলে দেন, দরজার পর দরজা মুখ ও মুখোশের। আঁকতে থাকেন নির্মম ছবি—নারীর অস্তিত্বে পুরুষের মুখ – পুরুষের চরিত্র নিপুণ কারুময়তার সঙ্গে
নারী কতভাবে যে পুরুষের আরাধনা করে, পুরুষেরা জানতেও পারে না। সেই না জানার মিথ ভেঙ্গে নতুন এক তোরণ নির্মাণ করেছেন আয়েশা জাহান, এই গল্পে—
‘পরিণত বয়সে এ কথা ক্ষণে ক্ষণে উচ্চারণ করেছি যে, হায় বিধাতা! কি দিয়ে বানিয়েছ পুরুষের ঐ পশমঘন প্রশস্ত বক্ষ, বলিষ্ঠ বাহু, তাতে আবদ্ধ হলে কেনো মরে যেতে ইচ্ছে করে! আর কিছু না, কোন আদর না, কোন শোষণ না, কোনো লেহন মৈথুন না, কেবলমাত্র একটি পুরুষমানুষ তার আলিঙ্গনে বেঁধে তার সমস্ত ভার ছেড়ে বুকের উপর শুয়ে থাকলে কেমন লাগে–সে বলবার নয়। নিঃশ্বাস আপনি বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় কোনোদিন যেন আমার বুকের উপর থেকে সে না সরে। এমন করে তার বুকের চাপে যেন মরে যেতে পারি।’
এই নারী শরীর বিক্রি করে কিন্তু চিন্তায় ও ধারণে কতটা সাবলীল, সাহসী এবং বাস্তবানুগ— ধারণা করি, বাংলা ভাষায় এমন চরিত্র ইতঃপূর্বে নির্মিত হয়নি।
বিচিত্র মানুষের সংসার। ঘৃণা এবং ভালোবাসা পাশাপাশি বসবাস করে, হাসিমুখে। ‘মরব বলেই জন্মেছি বাঁচব বলে নয়’—আয়েশা জাহানের নতুন উপলব্ধির বুনিয়াদ। নিজেকে নারী একটু একটু করে পুরুষের সকল রিপুর সঙ্গে যুক্ত করে উপভোগের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যায়, তারই আগুন আলেখ্য।
নারীর চোখে মুখে শরীরে ও অনুভব সত্তায় পুরুষদের এমন ব্যাকরণসম্মত ব্যবচ্ছেদ বাংলা ভাষায় বিরল। হয়তো অনেকে নাক কুচকাবেন, ঘৃণায় মুখ ভেংচাবেন, কিন্তু সত্যের গরল অস্বীকার করতে পারবেন না।
নারী বলছেন—
‘সব মন্দেরই একটা ভালো দিক থাকে। তীব্র বেদনার একটা অমূল্য দান থাকে। তেমনি দুশ্চরিত্রার একটা শক্তি আছে। সে পুরুষ চিনতে পারে। প্রেম সতীর কাছে মূল্যহীন বেশ্যার কাছে অমূল্য, সারাজীবনের আরাধনা। তুমি যে প্রেমিক এটা সচ্চরিত্র ততটা বুঝবে না, যতটা বুঝবে দুশ্চরিত্ররা। দশজনের সঙ্গে শুতে শুতে এক সময়ে সে মুখ দেখলেই বুঝতে পারে, কোন পুরুষ কোন জাতের।’
এভাবেই আয়েশা জাহান খুলে দেন, দরজার পর দরজা মুখ ও মুখোশের। আঁকতে থাকেন নির্মম ছবি—নারীর অস্তিত্বে পুরুষের মুখ – পুরুষের চরিত্র নিপুণ কারুময়তার সঙ্গে।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল আয়েশা জাহানের নির্মল সঙ্গী। পুরুষ চরিত্রের ছাল বাকল তুলতে তুলতে তিনি আচমকা তুলে আনেন রবীন্দ্রনাথের বয়ান, নজরুলের সাহেসের মালকোষ রাগ। ফলে, আয়েশার বর্ণনায় জেগে থাকে আশা ও রাশি রাশি সৌন্দর্য।
ডি. এইচ. লরেন্সের লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার উপন্যাসের কনি এবং অলিভারের মধ্যে সম্পর্কের সূত্র শরীর! আল মাহমুদের গল্প জলবেশ্যায়ও নারী ও পুরুষ সম্পর্কের মূল সূত্র অনবদ্য কামনাকাতর শরীর কিন্তু বিপরীতে নারী সাপুড়ের অর্থ আত্মসাতের খেলা। একই সূত্রে সংযোজিত সৈয়দ শামসুল হকের খেলারাম খেলে যা উপন্যাসও।
প্রেম ও অপ্রেম—আমরা যা-ই বলি বা লিখি— মূল সূত্র শরীর কারখানা! আয়েশা জাহান সেই কারখানার বয়ান উপস্থাপন করেছেন দীর্ঘ দুটি গল্পের আখ্যানে, অমিত বীক্ষণে।































































