২৬ এপ্রিল ২০২৬
শাংগ্রিলার খোঁজে, পরিমল ভট্টাচার্য
আলোকচিত্র :
শুভেন্দু চাকী / দেশ
সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম
গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
155

সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম
গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

155

শাংগ্রিলার খোঁজে

লেখক যেভাবে সভ্যতার কাছে দায় শেখান

পারিমল ভট্টাচার্য (জ. ১৯৬৪) একজন দ্বিভাষিক লেখক ও অনুবাদক। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতে তাঁর পনেরোর বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মধ্য ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম থেকে শুরু করে আন্দ্রেই তারকোভস্কির চলচ্চিত্র—তাঁর লেখালেখি জুড়ে রয়েছে বিষয়বৈচিত্র্যের বিস্তৃত পরিসর। কল্পকাহিনি, স্মৃতিকথা, ভ্রমণ-আখ্যান ও ইতিহাসের উপাদান মিলিয়ে নিজস্ব রচনাশৈলীতে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণ করেছেন। সম্প্রতি ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ উপন্যাসের জন্য আনন্দ পুরস্কার ১৪৩২-এ ভূষিত হয়েছেন তিনি। শেকড়লগ্ন এই কথাসাহিত্যিককে আমাদের শুভেচ্ছা। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘শাংগ্রিলার খোঁজে’ এবং লেখকের সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতি নিয়ে কথাসাহিত্যিক সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমামের এই গদ্য। স.

আড়াইশ বছর আগে ‘সাংপো’র পাড় দিয়ে এগিয়ে, ‘দিহাং’ নামতে নামতে আকস্মিক যখন ‘ব্রহ্মপুত্র’ হয়ে যায় বা শরৎ দাসের জন্য সেংচেন দোর্জেচেনের মৃত্যুদণ্ড হলো; সাংপোর জলে পাথর বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হলো এক জ্ঞান পিপাসু কিন্তু অজান্তে দ্রেশদ্রোহী হয়ে যাওয়া এই লামা’কে—তখন গোটা শিগেতসে শহরটা ভেঙে পড়েছিল নদীর পাড়ে। আর শরৎবাবু ওই সময় আবার ফিরে এসে নিজের ডেরায় বসে শিখছেন বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব।

পাঞ্চেন লামা মানুষের চোখ তুলে নিয়ে শেকল দিচ্ছেন গলায় যে গুপ্তচরকে সহযোগিতার অপরাধে, সে গুপ্তচর তখন ‘লাসা’ নাম দিচ্ছেন নিজের বাড়ির আর শিখছেন তিব্বতি ভাষা। তুষার ধবল চাঁদের আলোয় যে নারীর (রিনপোচে) হাতের রেখা দেখেছিলেন নদীর সাথে মিলিয়ে, সে নারীকে তখন অন্ধকূপে নিক্ষেপ করেছে সরকার; শরৎ জানতেন না একটু দূরে বসেই? জানতেন। এই পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাসই প্রথম আবিস্কার করেছিলেন, অতীশ দীপঙ্কর ভারতবর্ষে নয় শুধু, বর্তমানে আমাদের এই বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জের ততকালীন বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মেছিলেন। শরৎ পণ্ডিত নিজেই ছিলেন চট্টগ্রামের। তাঁর মতো তিব্বতি অভিধান আর কেউ রচনা করেনি। তবুও সব মিলিয়ে আমাকে পেয়ে বসলো ‘কেন্টুপ দর্জি’। শুধু স্মৃতিতে একটা টপোগ্রাফি সম্পূর্ণ করায়ত্ব করে চার বছরবাদে ফিরে এসে আবার যখন নিজের জীবন ‘রিফু’ করবার সুযোগটা হারালেন, বুকের ভেতর কেমন ভাঙচুর হয়ে আসে পাঠকের।

ইতিহাস তো পরাজিতকে মনে রাখে না। কিন্তু জিতে যাওয়া কি শুধুই অক্ষরে বা সম্পদে লিপিবদ্ধের সাথে তুলনীয়? যারা নিজের সমস্ত আয়ুস্কাল তুলে দেন? কিন্টুপই আমার কাছে শাংগ্রিলার পথে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গুপ্তচর। আমার ধারণা লেখককেও এ ভাবনা কখনো কখনো দ্বিধান্বিত করেছে। তাই দার্জিলিংয়ের ম্যলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একাকীত্ব, নোড়েবু স্যারের বিদায় বা কিন্টুপের স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত হয়েছেন। একাকীত্ব তাকে এমন করে পেয়ে বসেছিল যে তিনি মুখোমুখি হতে শুরু করলেন ‘ব্রোকেন স্পেক্টার’-এর। মাঝে মাঝে তিনি সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় কিন্টুপের দেওয়া রিপোর্টের সাথে মিলিয়ে নেন জর্জ বোগেলের দেখা তাশিলিম্ফুর তামায় মোড়ানো প্রশস্ত মন্দির ছাদ। এ সমস্ত কিছুর প্রস্তুতিই কিন্তু তখন এগিয়ে চলেছে পৃথিবীর ছাদ হিসেবে খ্যাত নিষিদ্ধ তিব্বতের দ্বার উন্মোচনের পথে। আর তারই কিছুদিন পর ম্যাকমোহন টেনে যাবেন তাঁর লাল দাগ — সেই কিন্টুপের দেখানো, সাংপোর পাড়-পথ ধরেই বলা যায়। সাংপোর পর দিহাং যখন আকস্মিক হাজার ফুট নেমে ব্রহ্মপুত্র হয়ে যায় তখন আমিও যেন কিন্টুপের সাথে উপস্থিত হয়ে সেই অলৌকিক রঙধনু দেখলাম।

বহুক্ষণ ধরে ম্যাকমোহনের টেনে যাওয়া লাল দাগের মানচিত্র যা এখন ইন্টারনেটে পাওয়া যায় তাই খুলে বসে রইলাম। বহু সময় নেট থেকে বের করে দেখলাম ভূ-উপগ্রহ থেকে নেয়া ‘লাসা’ শহরের ছবি। সেখানকার দোকানপাটের নামগুলোও চাইলে পড়া যায় এখন। বছর কয়েক আগে নিজের দার্জিলিং সফরের ছবিতে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করলাম উইন্ডামেয়ার হোটেলের দরজার সবুজ ঝাপিটা, হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেন। তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্পের বাচ্চাদের মুখ আর মহাকাল মন্দিরের উল্টো দিকে সেন্ট পলসের রাস্তা ধরে যেয়ে পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের বাড়ি খুঁজে বের করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুর পথে ভয়ানক কায়িক শ্রম আর তা খুঁজে পেয়ে যেন পাকা জহুরির দৃষ্টি নিয়ে সে ভগ্ন বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা, একটা বই এমন করে দিতে পারে! আমাকে দিয়েছে তো।

সেই জালে আটকে পড়েছেন লেখক। সিমলায় পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে সিঙ্গালিলার জঙ্গল, পার্ক স্ট্রিটের গোরস্থান থেকে অরুণাচলের প্রত্যন্ত জনপদে হাতড়ে বেড়িয়েছেন সেই জালের গিঁট, যা খুলতে পারলে মিলে যেতেও পারে শাংগ্রিলার ঠিকানা

আজ আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো খুব ভোরে। সারারাত একটা টিলা মতো জায়গায় ছিলাম। খুব ক্লান্ত চোখে ভোর ঠিক পাঁচটায় একা হাঁটতে বের হলাম। আলো হয়নি আবার আধাঁরও নেই। ঘাসের ভেতর নীল রঙের নাম না জানা ভেলভেটের প্রজাপতির মতো ফুল ফুটে আছে। আগে দেখিনি, এরই নাম কি meconopsis baileyi যার বাংলা নাম হিমালয়ান পপি? মাত্র কাল রাতেই নামটা পড়লাম বইয়ে। বেইলির আবিস্কার বলে এর সাথে তাঁর নাম জুড়ে দেয়া হয়েছিল সেই ফুলের প্রজাতির? বর্ণনা বলে একই রকম।

আপাতত আমি সেই সকল নারী-পুরুষদের নিয়ে আর ভাবছি না যারা অন্ধকূপে থেকে সরিসৃপের মতো হয়ে গিয়েছিল আর বহুবছর পর সূর্যের আলো পেতেই ডিম ভাঙা ভ্রুণের মতো ফেটে গিয়েছিল যাদের শরীর। সেই রিনপোচে, যে দুজন স্বামী থাকতেও (সে সময় তিব্বতে পরিবারের একাধিক পুরুষ মিলে একজন নারীকে বিয়ে করতে পারতেন) জীবনের ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার কাছে আত্মসমর্পণ করে বাড়িতে আসা নবীন পণ্ডিতকে বলেছিলেন (শরৎ) তাকে বাবার বাড়ি (ভুটান রাজপরিবার) নিয়ে যেতে, সেই নারীও মৃত্যুকূপে পড়েছিল। তাকে নিয়েও ভাবছি না বা উপেক্ষিত কিন্টুপকে। আমি ভাবছি স্রেফ ইতিহাসের একটা ফুলের নামকরণ নিয়ে কেননা শাংগ্রিলার সত্য চরিত্র পেয়ে বসলে ভয়ানক সংকট শুরু হচ্ছে। এই সকল সত্য চরিত্র পরিমল ভট্টাচার্য যেমন করে বুনন করেছেন, যে দক্ষতায় এঁকেছেন সে বর্ণনা দেওয়া আমার সাধ্য নয়। একটা জপমালা হাতে সম্পূর্ণ টপোগ্রাফি করায়ত্ব করে আসা কিন্টুপরা কখনোই হারিয়ে যান না। থাকেন সময়ের সাথে মিশে।

শাংগ্রিলার খোঁজে পাঠককে তিব্বত ও হিমালয়ের রহস্যের গভীরে নিয়ে যাবে এবং একই সাথে অজানা এক ইতিহাসকে নতুনভাবে চেনাবে। লেখক নিজে শিংলিলার জঙ্গল, সিমলা, কলকাতা ও অরুণাচলের পথ ধরে সেই কাল্পনিক ও রহস্যময় ‘শাংগ্রিলা’র খোঁজে পাড়ি দিয়েছেন।

কথাসাহিত্যিক পরিমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম
কথাসাহিত্যিক পরিমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে লেখক। ২০১৮ সালে কলকাতায়

এই বইটির একটা ধাঁধা হচ্ছে কোনখানি ফিকশন আর কোথায় ইতিহাস মাঝে মাঝে ব্যবধানটা ধরা কঠিন। এ নিশ্চয়ই আবার লেখকের দক্ষতাও বটে, তবে ভ্রান্তিরও সুযোগ থাকে পাঠকের। আর প্রসঙ্গান্তরটা এত দ্রুত ঘটছিল যে আমি কখনো কখনো খেই হারাচ্ছিলাম, এখন তবে তিব্বতের পথে কে যাচ্ছে? এরিক বেইলি না আন্সোন্দ্রার ডেভিড নীল নামক নারী পর্যটক? কার কথা বলছেন লেখক— ডাল্টন হুকার না ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ড-এর ভ্রমণ? এ আমারও অতি প্রত্যাশা থেকে ঘটতে পারে। সুধীর চক্রবর্তীর ‘গভীর নির্জন পথে’ পড়ার পর এমন ভয়ানক হাহাকার পেয়ে বসেছিল, এখন আমি ঠিক এই মাপের আরেকটা ঘোর লাগানো বই কি পড়ি? আরেকটা এমন বিবশ করা বই? হিমালয় নিয়ে রামানন্দ ভারতীর ‘হিমারণ্য’ আর প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘হিমালয় পারে কৈলাস ও মানাত সরোবর’ নামে দুটো বইয়ের নাম পেলাম। কেন যেন মনে হচ্ছে ওই বইগুলো পড়তে গেলে ঠিক এরকম ‘ওম মানি পদ্মে হাম’ আমি কান পেতে শুনতে পারবো না। এরকম নেশা ধরানো কোন বই পড়া ও তা শেষ হয়ে যাওয়া এক রকম অভিশাপ। ইতিহাসের সকল পরাজিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস জড়ো হয়ে এসে একটা বাতাস ছোটে বুকের ভেতর।

শাংগ্রিলার খোঁজে বইটির বিষয়বস্তু যদি পরিচিত করতে চাই পাঠকের কাছে তাহলে এভাবে বলতে হয়; হিমালয়ের মাঝে ছিল এক দেশ-নিষিদ্ধ, রহস্যে ঘেরা। ১৮৭৯ সালে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় যাওয়া এক বাঙালি যুবককে বৌদ্ধ পণ্ডিত সাজিয়ে পাঠাল ব্রিটিশ সরকার। ঠিক তখন দার্জিলিঙের এক নিরক্ষর দর্জি চলেছে সেখানে বিশ্বের দুর্গমতম গিরিখাতের ভেতর বয়ে চলেছে যে নদী, তার অজানা পথের সন্ধানে। তবে সেই অবিশ্বাস্য যাত্রার কাহিনি চাপা পড়েছিল সরকারি মহাফেজখানার ধূলোয়। সেই গল্প যেন নতুন করে উঠে এলো একবিংশ শতকে। সেই জালে আটকে পড়েছেন লেখক। সিমলায় পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে সিঙ্গালিলার জঙ্গল, পার্ক স্ট্রিটের গোরস্থান থেকে অরুণাচলের প্রত্যন্ত জনপদে হাতড়ে বেড়িয়েছেন সেই জালের গিঁট, যা খুলতে পারলে মিলে যেতেও পারে শাংগ্রিলার ঠিকানা।

আমি শাংগ্রিলার খোঁজে পড়েছি ২০১৭ সালে। বই নিয়ে আমার পাঠের অনুভবটুকুও তখন লেখা। জানতাম না এর পরের বছরেই কলকাতায় পরিমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার দেখা হবে। যাদবপুরের এক রেস্তোরাঁয় বসে চা পান এবং কুমারপ্রসাদের ম্যহ্‌ফিল বইটি খুঁজে পাওয়ার মতো অপূর্ব অভিজ্ঞতা ঘটবে। পরদিন পার্ক স্ট্রিটের এক ছোট্ট দোকান হতে কিনেছিলাম তাঁর আরও চারটি বই। আমার প্রিয় লেখকদের একজন পরিমল ভট্টাচার্য। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা উপন্যাসের জন্য তিনি আনন্দ পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর এই সম্মাননার উদযাপনে বুকশেলফ থেকে আবারও খুঁজে বের করলাম শাংগ্রিলার খোঁজে। সভ্যতার কাছে দায়বদ্ধ লেখকের প্রতিশ্রুতি পালনের এই আখ্যান পাঠকের জন্য অনবদ্য উপহার ‘শাংগ্রিলার খোঁজে’।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত