প্রচ্ছদ ব্যাপারটা আসলে কী? প্রচ্ছদের ইংরেজি কভার, কভার মানে যা মূলত ঢেকে রাখে। মলাট, মোড়ক ইত্যাদি। বালিশের কভার, বিস্কুটের প্যাকেট ইত্যাকার সবই মূলত প্রচ্ছদই, বইয়ের প্রচ্ছদ যেমন।
২.
শুরুতে বইয়ের প্রচ্ছদ ব্যাপারটা ছিল কোনো ভাবে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য একটা আবরণ, যেন পাণ্ডুলিপির কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়। সঙ্গে আলাদাভাবে বহু পাণ্ডুলিপির মধ্য থেকে বিশেষটিকে চিনে নেবার জন্যও প্রচ্ছদের দরকার ছিল।
প্রথম যুগে প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোমে পাণ্ডুলিপিগুলোকে কাঠের পাত বা চামড়ার আবরণে মুড়িয়ে রাখা হত। এইসব আবরণে সাধারণত সোনার ছাপ বা মূল্যবান পাথরের খচিত আভরণ থাকত।
মধ্যযুগে ধর্মীয় পাণ্ডুলিপিগুলিকে খুবই যত্নের সঙ্গে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হত। কাঠখোদাই, ধাতুর অলঙ্করণ ও মূল্যবান পাথরের ব্যবহার এই যুগের পাণ্ডুলিপির প্রচ্ছদগুলিকে অত্যন্ত বিলাসবহুল করে তুলত।
গুটেনবের্গের মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের পর থেকে পাণ্ডুলিপিগুলি ছাপা হয়ে বইয়ে পরিণত হতে থাকে, ফলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু প্রথমদিকে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন খুব সাদামাটা ছিল। কিন্তু রেনেসাঁ যুগে এসে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনে নতুন এক মাত্রা যোগ হয়। ডিজাইনাররা ক্লাসিকাল গ্রিক ও রোমান শিল্পের অনুপ্রেরণায় বইয়ের কভার ডিজাইন করতে শুরু করেন।

আঠারো শতকে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনে আরো বৈচিত্র্য আসে। বিভিন্ন ধরনের কাগজ, চামড়া ও কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয় প্রচ্ছদ তৈরি করতে। এর পরের শতকে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন আরো জনপ্রিয়তা পায়। ডিজাইনাররা নানা ধরনের ছবি, অলঙ্করণ ও লেখা ব্যবহার করে বইয়ের কভারকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে থাকেন। কুড়ি শতকে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনে আধুনিকতার ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। অ্যার্ট ডেকো, আর্ট নুভো ও আবস্ট্রাক্ট আর্টের প্রভাব বইয়ের কভার ডিজাইনে স্পষ্ট লক্ষ করা যায়।
৩.
ইদানীং নানা প্রযুক্তি যেমন কম্পিউটার গ্রাফিক ব্যবহারের ফলে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন আরো সৃজনশীল হয়ে উঠেছে। প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে মিনিমাল, জটিলতা কমিয়ে সরলতা ও স্পষ্টতা এখন বেশ লক্ষ করা যায়। শাদা পটভূমি, সহজ লাইন ও স্পষ্ট ফন্ট ব্যবহার করে এই ধরনের ডিজাইন বইয়ের বিষয়বস্তুকে সহজে প্রকাশ করে। কেবল ফন্টের সাহায্যে একটি আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ তৈরি করা সম্ভব। বিভিন্ন ফন্টের সমন্বয়, আকার ও রং ব্যবহার করে একটি প্রচ্ছদকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়।
দ্বিমাত্রিক ডিজাইন থেকে বের হয়ে তিন মাত্রার ডিজাইনও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আলো, ছায়া ও টেক্সচার ব্যবহার করে প্রচ্ছদকে আরো বাস্তবসম্মত করা হচ্ছে। ফটোরিয়েলিজম থেকে সরে এসে আধাবিমূর্ত ও বিমূর্ত ছবি দিয়েও প্রচ্ছদ তৈরি হচ্ছে। স্বপ্নের মতো, অদ্ভুত এবং রহস্যময় আঁকা সেইসব ছবি বইয়ের বিষয়বস্তুকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। নির্দিষ্ট একটি কালার প্যালেট ব্যবহার করে বইয়ের মুড এবং টোন তৈরি করা হয়। থ্রিলারের জন্য গাঢ় রং এবং রোমান্সের জন্য নরম রং ব্যবহার করা হয়।
৪.
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম অবধি বাঙলা অঞ্চলে ছাপা বইয়ে প্রচ্ছদ দেখা গেলেও সেইসব প্রচ্ছদের এক পলকেই চোখে পড়বার মতো কোনো বিশিষ্টতা গড়ে ওঠেনি। কেবল নানা আকারের বাঙলা ও ইংরেজি অক্ষরের সঙ্গে কতিপয় ছাপাযোগ্য নকশার সমন্বয় করে সেইসব প্রচ্ছদ ডিজাইন হত। ছাপা বই আসবার আগে এই অঞ্চলে লিপিবদ্ধ অবস্থায় তালপাতায় লেখা বা অন্যকিছুতে লেখা যত পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে, দেখা গেছে তা সাধারণত লালসালু বা মোটা-কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হত। আর খুব সম্ভবত এই উপায়ই ছিল বইয়ের প্রচ্ছদের প্রথমদিককার সংস্করণ। এর বাইরে যেইসব পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে তা বেশিরভাগই দুটো কাঠের পাতলা তক্তার মলাট মানে প্রচ্ছদে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এইসব মলাট হত অনেক রং ও নকশায় আঁকা।
৫.
এই অঞ্চল মানে বাঙলা-ভাষাভাষী অঞ্চলে ছাপা বইয়ের প্রচ্ছদের প্রথমদিকের ডিজাইনারদের মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু প্রমুখ অন্যতম। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিকল্পনায়ও অনেক প্রচ্ছদের ধারা তৈরি হয়, যেমন বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত বইপত্র। তারপর সত্যজিৎ রায়, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, খালেদ চৌধুরী, পূর্ণেন্দু পত্রী, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পী।
বাঙলাদেশের বইয়ের প্রচ্ছদচিত্রের পথিকৃৎ বলা যায় দুইজন শিল্পীকে। তাদের একজন জয়নুল আবেদিন, আর অন্যজন কাজী আবুল কাশেম। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত জসীম উদ্দীনের ‘বেদের মেয়ে’ বইয়ের জন্য জয়নুল আবেদিন প্রচ্ছদ রেখায় এঁকেছিলেন নারীমুখ। আবুল কাশেমের আঁকা প্রচ্ছদও ছিল প্রাচ্যরীতিতে আঁকা রেখানির্ভর। তবে আমাদের দেশের প্রচ্ছদচিত্রের প্রধান ডিজাইনার হিসেবে যদি দুইজনের নাম নিতে হয়, সেই দুইজন হলেন কামরুল হাসান আর কাইয়ুম চৌধুরী।
আমাদের দেশের প্রচ্ছদচিত্রের পটপরিবর্তন হয় মূলত আশির দশকে। সেই সময়ের ডিজাইনারদের মধ্যে সৈয়দ ইকবাল, মাহবুব আকন্দ, শেখ আফজাল, খালিদ আহসান, অশোক কর্মকার, মাসুক হেলাল, সমর মজুমদার, উত্তম সেন, শিশির ভট্টাচার্য প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

তবে বাঙলাদেশের প্রচ্ছদচিত্রে যিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, তিনি ধ্রুব এষ। বহুমাত্রিক মাধ্যমকে মিশিয়ে এই শিল্পকে টেনে নিয়ে তিনি দিয়েছেন অন্য মাত্রা। তার আগে এই দেশে ওই অর্থে কম্পিউটার গ্রাফিক করে কেউ প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন বলে আমার জানা নেই। তিনি কোলাজ করে, ফটোগ্রাফি ব্যবহার করে প্রচ্ছদ করেছেন। এর আগে বেশিরভাগ প্রচ্ছদই ছিল হাতে আঁকা।
৬.
ইদানীং দেশে যারা নিয়মিত প্রচ্ছদ ডিজাইন করেন তারা প্রত্যেকেই একাডেমিকভাবে শিক্ষিত, আগের যুগের ডিজাইনারদের মতোই। একাডেমিক শিক্ষার ভূমিকা যে আছে, তা শিক্ষিত ডিজাইনারদের কাজ দেখলেই বোঝা যায়, বোঝা যায় যে, তারা অবশ্যই ডিজানেইর আগে কেমন করলে কেমন হবে তা নিয়ে ভাবেন। যে-প্রচ্ছদগুলি আপাত দৃষ্টিতে আমাদের চোখে ভালো লাগে না খোঁজ নিয়ে দেখলে জানা যাবে সেইসব প্রচ্ছদে লেখক বা প্রকাশকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
যারা প্রচ্ছদ আঁকেন তারা প্রচ্ছদের বাইরে ছবি আঁকেন না বলেই অনেকের ধারণা। তাদের এই ধারণা সত্য নয়। প্রচ্ছদ-ডিজাইনাররাও নিয়মিত ছবি আঁকেন। যতদূর জানি প্রচ্ছদ ডিজাইন করাকে একমাত্র পেশা হিসেবে নিয়েছেন ধ্রুব এষ। সেই ধ্রুব এষও কিন্তু ছবি আঁকেন, লেখালেখিও করেন নানা বিষয়ে। অনেকেই আরও একটা ব্যাপার মনে করেন যে বড়ো ক্যানভাসে রং গুলে ছবি না আঁকলেও ছবি আঁকাকে ছবি আঁকা বলে না। এটাও কিন্তু ভয়ানক ভুল ধারণা। ড্রইং, স্কেচ, ওয়াটার কালার, কিংবা যেকোনো মিডিয়ায় যেকেনো সাইজের সারফেসে আঁকলেই ছবি আঁকা হয়। সাইজ বা মিডিয়া কোনো ব্যাপার নয়।
প্রচ্ছদচিত্র নিয়ে আলাদাভাবে কোথাও পড়ানো হয় কি না আমার জানা নেই। তার দরকারও নেই। কারণ যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই কৌশল শেখানো হয়, সৃজনশীলতা শেখানো হয় না, শেখানো যায়ও না। সৃজনশীলতা তৈরি হয় মূলত শিল্পীর মগজে নিরন্তর কাজ, পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই আর্টের কৌশল জানা একজন মানুষ যদি সৃজনশীল চিন্তা করতে পারেন তবে শিল্পের যেকোনো মাধ্যমে তিনি কাজ করতে পারবেন। তাই কৌশল আর সৃজনশীলতা পরস্পরের পরিপূরক।
বাঙলাদেশের বই ভালো হোক বা মন্দ হোক, সেইসব বইয়ের বেশিরভাগ প্রচ্ছদই দৃষ্টি নন্দন হয়। সার্বিক বিচারে বাঙলা বইয়ের প্রচ্ছদ হিসেবে আমাদের দেশের প্রচ্ছদের মান ভালো বলেই আমি মনে করি। ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা। এছাড়া দেশ কিংবা ভারত মানে পশ্চিমবাঙলার বাইরে আর কোনো দেশের বইয়ের খুব কম প্রচ্ছদই আমার ভালো লাগে।
আবার অনেকের বিখ্যাত বইয়ের প্রচ্ছদও ভালো লাগে না। যেমন সত্যজিৎ রায়ের ডিজাইনকৃত বেশিরভাগ প্রচ্ছদ আমার ভালো লাগলেও তাঁর করা জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার ভালো লাগে না। রেখাগুলি সুন্দর। তবে আমার মনে হয় সত্যজিৎ রায় প্রচ্ছদটা ভেবে-চিন্তে করেছেন বলে আমার মনে হয় না। কারণ বনলতা সেন মূর্ত কেউ নয়। জীবনান্দ দাশের কল্পনা, বা অধরা বা গোপন। তাকে ধরতে হত বিমূর্ত বা আধা বিমূর্ততায়, আলোছায়ার ভেতর। সত্যজিতের বনলতা আসলে জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে যায় না। ওইটা বড়োজোর গল্পের বইয়ের প্রচ্ছদ বানানো যায় কিংবা প্রেমের কবিতার বইয়ের। বনলতা সেন তো ওই অর্থে প্রেমের কবিতার বই নয়। শুনেছি জীবনানন্দও প্রচ্ছদটা পছন্দ করেননি।
আমাদের দেশের বর্তমান প্রচ্ছদশিল্পে অনেক সংকট বিরাজমান ও বিবাদমান। তারমধ্যে প্রধান সংকটা হল সৃজন, মনন ও কৌশলগতভাবে পেশাদার নয় এমন কতিপয় লোকজন প্রচ্ছদ করতে শুরু করেছেন। যেমন লেখক বা প্রকাশক নিজেই প্রচ্ছদ করা শুরু করেছেন। এছাড়া কাজ ঠিকঠাক জানে না, এমন লোকজনকে কম্পিউটার গ্রাফিক্স করে প্রচ্ছদ করতে দেখা যায়। ফটোশপে একটা ফটোকে ভেঙে অনায়াসে প্রচ্ছদ করার কারণে মান পড়ে যায়।

আবার অনেক সময় দেখা যায় ইন্টারনেট থেকে সুন্দর একটা ফটোগ্রাফ বা আঁকা ছবি নামিয়ে অনেকেই প্রচ্ছদ বানিয়ে নেন। জনপ্রিয় কোনো কবি বা কথাশিল্পীর কোনো রচনা থেকে ফ্রেইজ বা বাক্য নিয়ে নিজের বইয়ের নাম দিয়ে দিলে যে-ব্যাপারটা ঘটার সম্ভাবনা থাকে তা হল একই নাম আরেকজনও নিতে পারে তার বইয়ের জন্যে। অথচ একটু মাথা খাটালেই নিজের বইয়ের জন্যে নিজের তৈরি সুন্দর একটা নাম হতে পারে। প্রচ্ছদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কেউ যদি ইন্টারনেট থেকে দেখতে সুন্দর কোনো ছবি বা বিখ্যাত কোনো পেইন্টারের আঁকা ছবি অবিকল ব্যবহার করে প্রচ্ছদ বানিয়ে ফেলেন, দেখা যায় একই ছবি অন্যের বইয়ের প্রচ্ছদেও শোভা পাচ্ছে।
অথচ কেউ চাইলেই যার ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা আছে, যেকোনো ছবি বা এই জাতীয় বিষয় যা দিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি হবে, তা নিজের মতো করে সম্পাদনা করে নিতে পারে। ধরা যাক, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা সেই কালজয়ী ছবি ‘মোনালিসা’, এই ছবিটাতে মোনালিসার একটা চোখ মুছে দিয়ে কেউ কোথাও ব্যবহার করল বা শো করল। সেটা কিন্তু তার নামেই চালাতে পারবে। কারণ চোখ মুছে দিয়ে সে ছবিটার বক্তব্যই পালটে দিয়েছে। তখন সেটার অথরশিপ তার।
এইভাবে একটা বইয়ের জন্যে কোন ছবিটা নেওয়া যেতে পারে সেটা মাথা খাটিয়ে নির্বাচন করতে হয়। ধরা যাক, কুড়িটা ছবি ঘেটে একটা ছবি নেওয়া হল, তারপর সেটা দিয়ে প্রচ্ছদ বানানো হল। বানাতে সেটা প্রচ্ছদের ফ্রেইমে ফেলতে গিয়ে এডিট করা লাগল। ওখান থেকে কোন অংশটা বাদ দিতে হবে তা ডিজাইনারই ঠিক করবেন। ওপরে নাম বসানো থেকে শুরু করে সবকিছু। কম্পোজিশন তো ডিজাইনারের। মূলত এইভাবে বিনির্মাণ হয়। তখন কোন ছবি অবলম্বনে করা, বা কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে তা বিবেচ্য থাকে না, ক্রেডিট তখন প্রচ্ছদ ডিজাইনারের।
এই অবিনির্মাণের যুগে এসে এরটা নিল কেন, ওরটা নিল কেন, এই জাতীয় চিন্তা এক প্রকার সংকীর্ণতা। এইসব চিন্তা মূল বিষয় থেকে মানুষকে সরিয়ে দেয়। এই কারণেই সবকিছু সহজভাবে চিন্তা করতে হয় শুরু থেকেই। আমরা এমন একটা কালখণ্ডে আছি, যেখানে ওই অর্থে অথরশিপ বলতে তেমন কিছু নেই। আর কোনো চিন্তাই নিত্য নয়। সকল চিন্তাই মুহূর্তেই পালটে যেতে পারে।
বাঙলাদেশে বইমেলা কেন্দ্র করেই বেশিরভাগ বই প্রকাশ হয়। ফলে একজন প্রচ্ছদ-ডিজাইনারকে একই সঙ্গে দিনে কখনও দশ-বারোটা প্রচ্ছদও ডিজাইন করতে হয়, তাই মান ভাগ হয়ে যায়। দেশের প্রচ্ছদ-ডিজাইনারের সংখ্যার তুলনায় প্রতিবছর বই প্রকাশিত অনেক বেশি। ধরা যাক পাঁচ হাজার বই প্রতিবছর প্রকাশ হয়। এরমধ্যে বেশিরভাগই বইমেলায়। সবগুলি বইয়েরই তো প্রচ্ছদ লাগে।
আরও একটা গুরুতর সংকট হল লেখক-প্রকাশক বা যারা প্রচ্ছদ একজন আর্টিস্টকে দিয়ে করান তারা আর্টিস্টকে ঠিকমতো মজুরি দেন না, অনেক ক্ষেত্রে দেবে বলে ঘোরাতে থাকেন। এইসব বিষয় যখন আর্টিস্টের মাথায় থাকে আর্টিস্ট-এর অন্তর থেকে কাজ বের হয় না। আমাদের প্রকাশকদের বেশিরভাগই প্রেসে, বাইন্ডারকে টাকা দিতে পারেন, কাগজ কিনতে পারেন, লেখকের কাছ থেকে টাকা নিতে পারেন, আবার দিতেও পারেন। কিন্তু ডিজাইনারকে টাকা দেবার বেলায় নানা জটিল সমস্যা এসে হানা দেয়, যেন বা নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। এমন কি দয়া করে আর্স্টিট-কপি হিসেবে বইটা পাঠাতেও বেশিরভাগ প্রকাশকের গায়ে লাগে।
মাঝে মাঝে দেখা যায় বই ছাপা হবার পর প্রচ্ছদে একটা রং নাই। এর কারণ হচ্ছে চার কালারের কভার ছাপা হয়েছে তিন কালারে। না, ভুলের কারণে এমন হয়নি। এটা ইচ্ছাকৃত। টাকা বাঁচানোর জন্যে। চারটা প্লেইটের জায়গায় যদি তিনটা প্লেইটে ছাপা হয়, তবে একটা প্লেইট, ছাপা, কালির যা খরচ তা বাঁচানো যায়। এই কাজ ছাপার সঙ্গে জড়িত যারা মানে লেখক, প্রকাশক, ছাপাইকার সকলের সম্মতিক্রমে হতে পারে। আবার প্রেসচালকের অদক্ষতার কারণেও হতে পারে।
এমন হলে প্রচ্ছদ-ডিজাইনার বা বইয়ের ডিজাইনারের সঙ্গে অন্যায় করা হয়। একজন ডিজাইনার আন্দাজে রং ব্যবহার করেন না। প্রত্যেক রং আর রেখার আলাদা অর্থ, ভাবার্থ রয়েছে। এই বিষয়ে ডিজাইনারের দীর্ঘসময়ের পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা ও চর্চা থাকে।
৭.
যেহেতু আমি নিজেও বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করি, তাই নিজের অভিজ্ঞতার কথাও এইখানে খানিকটা জানাই।
আমি যখন সেভেনে পড়ি, সেইটা ১৯৯৩ সাল। আমি আমার কবিতার একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করি। ওইটার নাম দিই ‘জন্মান্ধ রাতের আঁধার’। আমি সেই পাণ্ডুলিপির জন্যে কিছুদিন পরপরই প্রচ্ছদ ডিজাইন করতাম, কাগজ কেটে কেটে, রং লাগিয়ে। যদিও ওই প্রচ্ছদ ছাপা হয়নি তবু ওটাও এক প্রকার প্রচ্ছদই।
পূর্ণেন্দু পত্রীর করা প্রচ্ছদ দেখে আমার মধ্যে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন তৈরি করার বাসনা তৈরি হয় প্রথম। সৃজন ও মননশীলতার দিক থেকে পূর্ণেন্দু পত্রী ছিলেন বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন সেই আদিযুগের পুথিঁচিত্রী আর মধ্যযুগের বাঙালি পটচিত্রীদের আধুনিক উত্তরাধিকারী। তাই হয়তো তিনি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিলেন।
আমার করা প্রথম প্রচ্ছদে জড়ানো বই ছাপা হয় ২০০২ সালে। ওইটা আমি করি ২০০১ সালের শেষের দিকে, যেই বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় ভর্তি হই। ওটা ছিল একটা কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ। তখন আমার কম্পিউটার ছিল না। তাই হাতে এঁকে, কাগজ কেটে কোলাজ করে প্রচ্ছদটা ডিজাইন করেছিলাম।
লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক ইবরাহীম মুহাম্মাদ প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ঋতবর্ণ প্রকাশন থেকে। বইটা ছিল আমাদের পাশের গ্রামের খুবই প্রবীণ একজন কবির প্রথম কবিতার বই। কবির নাম জওয়াদুল হক চৌধুরী। কবিতার বইয়ের নাম ‘প্রেমমদিরা হাতে নাও’।

৮.
প্রচ্ছদ ডিজাইনের কাজের জন্য কোনো লেখক বা প্রকাশকের কাছে আমি যাই না। কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রচ্ছদ করে দিই। লেখক-প্রকাশকরাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমি প্রতিবছর কিছু প্রচ্ছদ ডিজাইন মজুরির বিনিময়ে করি। যদিও এর মধ্যে অনেকেই আজ দেবে, কাল দেবে বলেও শেষে টাকা দেয় না। কিছু প্রচ্ছদ ডিজাইন আমি স্বেচ্ছায় বিনা মজুরিতে করে দিই। সেইমতে আমি বছরে যত লেখক-সম্পাদককে তাদের বই-ছোটোকাগজের প্রচ্ছদ বিনা মজুরিতে করে দিই, তারা প্রত্যেকেই যদি আমার লেখা একটা করে বই কিনত তবে প্রকাশকের ছাপার খরচ উঠে যেত।
আবার এমন অনেকেই আছেন, প্রচ্ছদ নিয়ে বই ছাপিয়ে দেওয়া তো দূরে থাক বলার কথাও ভুলে যান। যেন তাদের বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করে দেওয়াই আমার অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আবার অনেকেই আছেন আমাকে না জানিয়ে আমার ডিজাইন সম্পাদনা বা নতুন কিছু যোগ করে দেন, দেখা গেল ব্যাক-কভারে তাদের ইচ্ছামতো ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে একটা ছবি ছাপিয়ে দিয়েছে, কিংবা নামের ফন্টের রং পালটে দিয়েছে। কিংবা আমাকে না জানিয়ে পুরা প্রচ্ছদই বাতিল করে আরেকজনকে দিয়ে আরেকটা করিয়ে সেটা দিয়ে বই ছাপিয়ে ফেলেছে। আবার এমনও দেখেছি আমার করা প্রচ্ছদের ক্রেডিট আমার নামে না দিয়ে নিজের শাশুড়ি বা শ্যালিকার নামে দিয়ে বই ছাপিয়ে ফেলেছে। নামের বানান ভুলভাল ছাপানোর কথা আর নাই বা বললাম।
একটা সময় ছিল, একটা প্রচ্ছদের জন্যে লেখক-প্রকাশকগণ মাইল মাইল পাড়ি দিয়ে আর্টিস্টের বাড়িতে ধর্না দিয়ে পড়ে থাকত। আর এখন ফেইসকুকে নক করে প্রচ্ছদ নিয়ে চলে যায়। একটা উদাহরণ দিই, কবি ফরিদ কবির তাঁর কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ পূর্ণেন্দু পত্রীকে দিয়ে করাবেন বলে ভিসা বানিয়ে বাঙলাদেশ থেকে বারো থেকে চৌদ্দো ঘণ্টা ট্রেনে-বাসে চড়ে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন।
প্রচ্ছদ করবার আগে পাণ্ডুলিপি সবক্ষেত্রে পড়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে লেখক একটা সারাংশ লিখে দিয়ে দেন সেটা পড়লেই বোঝা যায়। এবং সেটা পড়েই করি। আর কবিতা বইয়ের ক্ষেত্রে নাম কবিতাটা পড়লেই চলে। আর প্রবন্ধ বা গদ্যের বইয়ের কমন একটা ফরমেট আছে তাই পড়া তেমন দরকার হয় না। একটু উলটে-পালটে দেখলেই প্রচ্ছদের আইডিয়া পাওয়া যায়।
বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। তবে স্বাধীনতা আমি নিজেই নিয়ে নিই। বলি, আমি কারও নির্দেশনায় কাজ করি না। পাণ্ডুলিপি বা সারাংশ পড়ে নিজের মতো করে করি।
তবে দুয়েকজন প্রতিবছর পাওয়া যায়, যাদের আইডিয়া থেকে এমন কিছু উপাদান বা ইংগিত পাওয়া যায়, যা আমার মাথায়ও ছিল। এছাড়া লেখকের নির্দেশনায় কাজ করতে গেলে সেই কাজ অতিশয় বাজে হয়। এবং পারতপক্ষে আমি তা করি না। যদি কঠিন অনুরোধে করতেই হয় তবে তার ক্রেডিট আমার নামে না দিতে অনুরোধ করি। কিন্তু আমার সেই অনুরোধ দেখা যায় শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয় না।
আমি মনে করি, বইয়ের প্রচ্ছদ আর পেইন্টিং দুটো আলাদা শিল্প। একটা প্রচ্ছদের প্রথম শর্ত হল অবশ্যই সেটা দৃষ্টিনন্দন হতে হবে। আর একটা পেইন্টিং দৃষ্টিনন্দন হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। তাই প্রচ্ছদকে আমি পুরোপুরি আর্টের মধ্যে ধরি না। এইটা আর্টের খুবই ক্ষুদ্র একটা শাখা
প্রচ্ছদ ডিজাইন আমি স্বাচ্ছন্দ্যে আনন্দ নিয়েই করি, ডিজাইন করবার ক্ষেত্রে রংটাকে প্রাধান্য দিই। বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিলিয়ে রং ব্যবহার করি। ফলে আমি নিজে থেকে কোনো বইয়ের প্রতি অবিচার করি না। অবিচার হলে সেটা লেখকের কারণেই হয়। কারণ দেখা গেল, আমি অনেক যত্ন করে একটা প্রচ্ছদ ডিজাইন করলাম আর সেটা লেখকের পছন্দ হল না, আমাকে অনুরোধ করলেন আরেকটা প্রচ্ছদ ডিজাইন করে দিতে, তখন আমি তার জন্য খুব অল্প সময়ে, অল্প চিন্তা করে লালের আধিক্য রেখে কালারফুল একটা ডিজাইন করে দিই। দেখা যায়, সেটা তার খুবই পছন্দ হয়ে গেল। আমাদের দেশের লেখক-প্রকাশক, হয়তো পাঠকও কালারফুল মানে মনে করেন লালের আধিক্য।
প্রতিবছর অনেক নিম্নমানের বইয়ের প্রচ্ছদও আমাকে করতে হয়, সেক্ষেত্রে বরং সেইসব বইয়ের প্রতি আমি সুবিচারই করি।
৯.
আমি মনে করি, বইয়ের প্রচ্ছদ আর পেইন্টিং দুটো আলাদা শিল্প। একটা প্রচ্ছদের প্রথম শর্ত হল অবশ্যই সেটা দৃষ্টিনন্দন হতে হবে। আর একটা পেইন্টিং দৃষ্টিনন্দন হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। তাই প্রচ্ছদকে আমি পুরোপুরি আর্টের মধ্যে ধরি না। এইটা আর্টের খুবই ক্ষুদ্র একটা শাখা। দৃষ্টি নান্দনিকতাই প্রচ্ছদের প্রথম শর্ত। তবে যেহেতু ক্ষুদ্র হলেও প্রচ্ছদ আর্টেরই আত্মজ তাই আর্টে বেসিক শর্তগুলি তাকেও পূরণ করতে হবে। তা ছাড়া প্রচ্ছদের ধরনও হয় বিষয়ানুসারে। গল্প বা উপন্যাসের প্রচ্ছদ এক রকম হতে হবে, কবিতার প্রচ্ছদের ধরন আরেক রকম। এইভাবে গদ্য বা প্রবন্ধ ইত্যাদি। তবে বইয়ের প্রচ্ছদ পুরোটা বইকে উপস্থাপন করবে এমন কোনো শর্ত নাই। বইয়ের ভেতরকার বিষয়ের সঙ্গে সংগতি থাকলেই হয়।
একটি দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ বইয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বইটি কিনতে উৎসাহিত করে। প্রচ্ছদ কখনো বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।
১০.
অনেকে মনে করেন প্রচ্ছদ বইয়ের মূল্যমান নির্ধারণ করে, কিন্তু আমি তা মনে করি না। বইয়ের ভেতরের বস্তু মানে লেখাপত্র ভালো না হলে সুন্দর প্রচ্ছদের বই কেউ কেনার কথা না, আমি নিজে অন্তত কখনও কিনি না। একটা বইয়ের প্রথম বিষয় প্রচ্ছদ নয়, ভেতরকার বস্তু। কিন্তু প্রচ্ছদ তো অনেকাংশে বইয়ের জামা। আর ডিজাইনার সেই জামাটাকে যতটা সম্ভব সুন্দর করে বানানোর চেষ্টা করেন। আর খানিকটা অবশ্যই বিজ্ঞাপন। যে-বিজ্ঞাপনের আকর্ষণে পাঠক বইটাকে স্পর্শ করবেন, উলটে-পালটে দেখবেন, আর ভেতরের বস্তু ভালো বলে মনে হলে কিনবেন বা লেখকের নাম দেখে কিনবেন। যে-অর্থে বেশিরভাগ লেখক বা প্রকাশক আর্ট বোঝেন না, সেই অর্থে তাদের পছন্দ-অপছন্দের দাম দিতে গেলে জিনিসটা ভালো হয় না।
কতিপয় লেখক আছেন যারা নিজের বইয়ের প্রচ্ছদের পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদ-ডিজাইনারের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না, এমন কি নিজের ওপরও তাদের আস্থা আছে বলে আমার মনে হয় না। জনতার ওপর দায়িত্ব দিয়ে দেন, ভোট চান কেমন হল জানতে চেয়ে। তারপর জনতা তাকে বিভ্রান্ত করা শুরু করে। কেউ বলে ‘ভালো’, কেউ বলে ‘লালটা আরেকটু নীল হলে ভালো হত’ জাতীয় মতামত। এমন এক লেখককে একদিন আমি বললাম, ‘ভাই, আমজনতার ভোটে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়া আর কিছু নির্বাচিত হয় না। সুতরাং তাদের ওপর ভরসা করলে ধরা খাবেন। আপনার নিজেকেই ঠিক করতে হবে নেবেন কি নেবেন না’।
কিন্তু কুকুরের লেজ আর অপেশাদার লোকজন চিরদিনই বঙ্কিম রূপ পরিগ্রহ করে।
লেখক আর প্রচ্ছদ-ডিজাইনারের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন লেখকের ছবির রং, কম্পোজিশন, ধরন এইসবের জ্ঞান তেমন থাকে না। না থাকাই স্বাভাবিক। তিনি হয়তো প্রচ্ছদ কেমন হবে তার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু তা দেখতে কেমন হবে তা ভাবতে পারেন না। তাই লেখকের উচিত ডিজাইনারের ওপর নির্ভর করা। কারণ একজন ডিজাইনার এই লাইনে আসেন দীর্ঘদিনের একাডেমিক পড়াশোনা, জানাশোনা আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই একজন ডিজাইনারই জানেন কোনটা দেখে পাঠকের ভালো লাগবে বা লাগবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে ডিজাইনার পেশাদার।
●


































































































































