রেনে মারিয়া রিলকে জার্মানির কবি। আমার কাছে শুধু একজন কবি নন, বরং এক নীরব সহচর। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে একাকীত্ব, আত্মঅন্বেষণ, ঈশ্বর, শিল্প আর অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন আর অদ্ভুতভাবে সেই প্রশ্নগুলোই যেন আমার নিজের ভেতরের কথাগুলো হয়ে ওঠে। মন খারাপের দিনগুলোতে তাঁর কবিতা খুললেই মনে হয় কেউ খুব ধীরে, খুব শান্তভাবে আমার পাশে এসে বসেছে।
একসময় বইকে আমি বালিশের নিচে রাখতাম, বুকের ওপর তুলে নিয়ে পড়তাম যেন শব্দগুলো শরীরের উষ্ণতা পায়। এখন জীবন অন্য দেশে, সময় কম, ব্যস্ততা বেশি। তবু বইয়ের অভাব নেই—কমিউনিটি লাইব্রেরিতে গিয়ে বই অর্ডার করলেই কয়েক দিনের মধ্যে ফোন আসে, বই এসে গেছে। মনে হয় পৃথিবীর বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার হাতের নাগালে দাঁড়িয়ে আছে, দরজা খুললেই পাওয়া যায়। টাকার অভাব এখানে বড় বাধা নয়; ইচ্ছে থাকলেই বই আপনার কাছে পৌঁছে যাবে।
এই সুযোগে আমি আমার প্রিয় কবির কবিতাগুলো আবার নতুন করে পড়ি, ভাবানুবাদ করি, নিজের ভাষায় নিজের মতো করে বুঝে নিই। কখনও মনে হয় রিলকে আমাকে বুঝতেন। এমনভাবে বুঝতেন, যেভাবে মানুষ খুব কমই আরেকজন মানুষকে বুঝতে পারে। তাঁর শব্দগুলো আমার ভেতরের অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালায়, আবার কখনও সেই অন্ধকারের পাশে চুপচাপ বসে থাকে।
রিলকে আমার জীবনের এক কোণে স্থির হয়ে থাকা এক নীরব উপস্থিতি। তিনি উচ্চস্বরে কিছু বলেন না, তবু তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে আমি বারবার নিজের কাছেই ফিরে আসি। একজন পাঠক হিসেবে, একজন লেখালেখি করা মানুষ হিসেবে এই সংযোগ আমার কাছে গভীর, ব্যক্তিগত এবং গভীরভাবে কৃতজ্ঞতার! Rainer Maria Rilke আধুনিক ইউরোপীয় কবিতার এক অনন্য কণ্ঠ। তাঁর কবিতায় একাকীত্ব, আত্মঅন্বেষণ, ঈশ্বর, শিল্প ও অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে।
Letters to a Young Poet আসলে কোনো কবিতা নয়। তরুণ কবি ফ্রানৎস জাভের ক্যাপুসকে লেখা দশটি চিঠির এক অনন্য সংকলন। বইটি বেশ বড় কিন্তু এর প্রতিটি চিঠির ভেতর এমন কিছু অংশ আছে, যেগুলো পুরো বইটিকে এক বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সেই অংশগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল—এ যেন কেবল একজন তরুণ কবিকে লেখা চিঠি নয়, বরং মানবজীবনের এক গভীর অন্তরঙ্গ আলাপ।
একটা মজার কথা বলি। এই বইটি পড়ার সময় মনে মনে কী অদ্ভুত এক ইচ্ছে জন্মেছিল। ভাবতাম, যদি সত্যিই এমন একজন মানুষ আমার জীবনে থাকত! এমন একজন, যার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, রুচি পরিশীলিত, দর্শন গভীর, মানবিকতা উজ্জ্বল একজন শিল্পবোদ্ধা বন্ধু, যে আমাকে এমন চিঠি লিখত। কতটা ভাগ্যবানই না হতাম! চিঠিগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়, রিলকে যেন কেবল ক্যাপুসকে নয় আমাদের প্রত্যেককে লিখছেন। প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছেন, অপেক্ষা করতে শেখাচ্ছেন, একাকীত্বকে ভয় না পেতে শেখাচ্ছেন। মনে হয় কেউ খুব শান্তভাবে বলছে নিজের ভেতরের আওয়াজটাকে বিশ্বাস করো, তাড়াহুড়া কোরো না, জীবন ধীরে ধীরে নিজেকে ওপেন করে দেবে। এই কারণেই বইটি শুধু পড়া হয় না, অনুভব করা হয়। মনে হয়, কোথাও কেউ আমাদের জন্যও এমন একটি চিঠি লিখে রেখেছে।
কখনও মনে হয় রিলকে আমাকে বুঝতেন। এমনভাবে বুঝতেন, যেভাবে মানুষ খুব কমই আরেকজন মানুষকে বুঝতে পারে। তাঁর শব্দগুলো আমার ভেতরের অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালায়, আবার কখনও সেই অন্ধকারের পাশে চুপচাপ বসে থাকে
রিলকের ১০টি চিঠির সংকলন। পুরো বইটি বেশ বড় আমি চিঠিগুলোর মূল অংশগুলো ধারাবাহিকভাবে দিচ্ছি, যেগুলো আমার পছন্দের কোট। পুরো বইয়ের ভাব, দর্শন ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি পাওয়া গেলে যেতেও পারে। অবশ্য আমার মতো সবার চিন্তা বা আবেগের সাথে নাও মিলতে পারে।
প্রথম চিঠি
আপনি জানতে চান আপনার কবিতা ভালো কি না
কিন্তু এর উত্তর কেউ দিতে পারে না
নিজের ভেতরে ফিরে যান।
খুঁজে দেখুন আপনি কি লিখতেই বাধ্য?
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন
আমি যদি লিখতে না পারি, তবে কি আমাকে মরতে হবে?
যদি উত্তর হয় হ্যাঁ,
তবে আপনার জীবনকে সেই প্রয়োজন অনুযায়ী সাজান।
শিল্প সমালোচনা দিয়ে জন্মায় না।
শিল্প জন্মায় প্রয়োজন থেকে।
Paris, 17 February 1903
দ্বিতীয় চিঠি
একাকীত্বকে ভয় পাবেন না।
একাকীত্বই সৃষ্টির ভূমি।
মানুষের সম্পর্কগুলো কঠিন,
কারণ প্রত্যেক মানুষই এক একটি বিশাল একাকী জগৎ।
Viareggio near Pisa (Italy), 5 April 1903
তৃতীয় চিঠি
ধৈর্য শিখুন।
সবকিছুকে ঘটতে দিন।
প্রশ্নগুলোকে ভালোবাসুন
যেন তারা বন্ধ ঘর,
অথবা অজানা ভাষায় লেখা বই।
একদিন আপনি
অজান্তেই উত্তরগুলোর ভেতরে বাস করতে শুরু করবেন।
Viareggio near Pisa (Italy), 23 April 1903
চতুর্থ চিঠি
প্রেম মানে দুইজন মানুষ একে অপরকে পূর্ণ করা নয়।
বরং দুইটি একাকীত্ব
যারা একে অপরকে রক্ষা করে।
At present in Worpswede near Bremen, 16 July 1903
পঞ্চম চিঠি
দুঃখ ও বিষণ্ণতা এলে ভয় পাবেন না। এগুলো আপনার জীবনের নতুন কক্ষ। আপনি এখনো সেগুলোতে প্রবেশ করতে শেখেননি।
আপনার জীবন বদলাচ্ছে।
Rome, 29 October 1903
ষষ্ঠ চিঠি
শিল্পের জন্য কোনো তাড়াহুড়া নেই। গাছ যেমন ফল ধরতে সময় নেয়, তেমনি শিল্পও ধীরে জন্মায়।
গ্রীষ্মকে ত্বরান্বিত করা যায় না।
Rome, 23 December 1903
সপ্তম চিঠি
শিল্পী হওয়ার মানে সবকিছু গ্রহণ করা। সৌন্দর্য ও ভয়
দুটোই একই জীবনের অংশ।
এই নিয়েই তো আমাদের রোজকার বাঁচা মরা।
Rome, 14 May 1904
অষ্টম চিঠি
ভালোবাসা কঠিন কাজ।
এটি মানুষের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। প্রেম মানে অধিকার নয়।
বরং পরিপক্ব হওয়া।
Borgeby gård, Fladie, Sweden, 12 August 1904
নবম চিঠি
আপনি নিজের জীবনকে বিশ্বাস করুন। যে পথই হোক,
সেটাই আপনার পথ।
কোনো জীবনই ভুল নয়। ভুল থেকে যদি ভালো কিছু শেখেন তবে ভুল হয়ে যায় ফুল।
Furuborg, Jonsered, Sweden, 4 November 1904
দশম চিঠি
আপনি যেখানেই থাকুন
নিজের ভেতরের পৃথিবীকে রক্ষা করুন। আগলে রাখুন। ভেতরের সেই সুপ্ত কণ্ঠকে অনুসরণ করুন।
কারণ শেষ পর্যন্ত আপনার জীবন
আপনাকেই বাঁচতে হবে।
Paris, on the second day of Christmas 1908
এই বইটি পড়ে আমি আসলে তিনটি জিনিস শিখেছি—
১. নিজের ভেতরের কণ্ঠে বিশ্বাস করা। আত্মার পাঠ মুখস্থ করা!
২. একাকীত্বকে গ্রহণ। মানুষ সবার সাথে থেকেও একা। মানুষ যুক্ত থেকেও বিচ্ছিন্ন।
৩. ধৈর্য ও সময়ের উপর আস্থা রাখা।
Letters to a Young Poet কেন এত মানুষের মুখে মুখে ফেরে জানেন, ভাবলে উত্তরটা খুব মানবিক। এই বইটা আসলে উপদেশের বই নয়, বরং এক মানুষের আরেক মানুষের কাছে লেখা গভীর, আন্তরিক চিঠির সংকলন। এখানে কোনো জোর নেই, কোনো শো আপ নেই। আছে ধৈর্য, অপেক্ষা, একাকীত্বকে বোঝার শিক্ষা, আর নিজের ভেতরের আওয়াজটাকে বিশ্বাস করার সাহস। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাবের আদান-প্রদান আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব প্রিয়। তাই বড় লেখকদের চিঠি আর ভ্রমণকাহিনি আমাকে সবসময় টানে। সেখানে মানুষকে খুব কাছ থেকে পাওয়া যায় তাদের সংশয়, দুর্বলতা, আশা, ব্যর্থতা, ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার গল্প। এই ধরনের লেখা পড়লে মনে হয় কেউ আমার হাত ধরে বলছে, “তুমি একা নও।”
এই বইটাও ঠিক সেই কাজটাই করে। কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে শক্তি দেয়, মনকে শান্ত করে, পথ দেখায়। নিজের মতো হয়ে উঠতে, নিজের জীবনকে নিজের মতো করে গ্রহণ করতে অদ্ভুতভাবে সাহায্য করে। তাই বইটি শুধু পড়া হয় না, মানুষ এটাকে বাঁচার সঙ্গী বানিয়ে নেয়। আমার তো তাই মনে হয়েছে।


















































































































































































