টিকেটটা সে হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু টিকেট কাউন্টারের জানালাটার সাদা শিকের পিছনে ওপাশে বসা টিকেট এজেন্ট তাকে আরেকটা টিকেট বিক্রি করতে চাচ্ছে না। ড্রয়ারে কোনো ভাংতি নেই এই অজুহাতে। বেঞ্চে বসে সে স্টেশনের চারিদিকের বিশাল শুষ্ক গ্রাম্য মাঠগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। পায়ের উপর পা তুলে সংবাদপত্রের পাতা উল্টে সময় কাটবে এই রকম লেখা খুঁজতে থাকে। আকাশ জুড়ে আধার নেমে আসে খুব দ্রুত, অনেক দূরে, রেল লাইন যেখানে অদৃশ্য হয়েছে, সেই কালো রেখার উপরে একটা কমলা আলো দেখে বোঝা যাচ্ছে পরের ট্রেনটা আসছে। গ্রুনার দাঁড়িয়ে যায়। তার হাতে ধরা পত্রিকাটা যেন একটা অকেজো অস্ত্র। টিকেট কাউন্টারের জানালায় সে দেখতে পায় একটা হাসিমুখ, যার অর্ধেক শিকের আড়ালে, তার দিকেই লক্ষ্য। খুবই হাড় জিরজিরে একটা কুকুর এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিল, এইবার উঠে দাঁড়ায়, সেও মনোযোগী। গ্রুনার জানালাটার দিকে এগিয়ে যায়, গ্রামীণ লোকজনের অতিথিপরায়ণতার উপর আস্থা সহকারে, পুরুষসুলভ একটা অন্তরঙ্গ ভাব নিয়ে, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করলে যেরকমের শুভ বুদ্ধির উদয় হয় তেমন একটা ভাব। সে বলতে যাচ্ছে, দয়া করে দেখুন না, কী এমন ক্ষতি হবে? ভাংতি খোঁজার সময় তো আর নেই। আর যদি তাতেও লোকটা রাজি না হয়, আর কী কী উপায় হতে পারে সেগুলি জিজ্ঞেস করবে, জি জনাব, আমি তো ট্রেনে উঠেও টিকেটটা কেটে ফেলতে পারি, বা গন্তব্যে পৌঁছে সেখানকার টিকেট অফিস থেকেও কাটা যাবে। আমাকে একটা কাগজে লিখে দিলেই তো হয় যে আমার টাকা বাকী আছে, আমি পরে টিকেটের টাকাটা দিয়ে দিলাম।
কিন্তু যতক্ষণে সে জানালার কাছে এসে পৌঁছেছে, ট্রেনের আলোর ছায়া অনেক লম্বা হয়েছে, হুইসেল আরও জোরালো, আরও কর্ণবিদারী হয়েছে, গ্রুনার আবিষ্কার করলো শিকের পেছনে কেউ নেই, শুধু লম্বা মতন চেয়ার আর সিল না মারা কিছু স্লিপে ভরে আছে টেবিলটা, বিবিধ গন্তব্যের সম্ভাব্য টিকেট। ট্রেনটা স্টেশনে ঢুকে পড়লে, গ্রুনার দেখল, রেল লাইনের এক পাশে, মাঠের দিকে, ঐ হাস্যমুখের লোকটা ট্রেনের কন্ডাক্টরকে ইশারা করছে, থামার দরকার নেই, কেউ টিকেট কেনে নি। এর পর বিশাল যান্ত্রিক শব্দটা দূরে সরে যেতে থাকলে, কুকুরটা আবার শুয়ে পড়লো, আর ট্রেনের একমাত্র বাতিটা একবার শুধু মিটমিট করে, একেবারে নিভে গেলো। মোচরানো পত্রিকাটা আবার গ্রুনারের কোলের উপর, সে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না ঐ হতচ্ছাড়া লোকটাকে খুঁজে বের করবে কিনা যে তাকে রাজধানীর সুখী সভ্যতা থেকে বঞ্চিত করেছে।
সবকিছু আবার নিস্তব্ধ ও নিথর হয়ে এলো। এমনকি গ্রুনারও বেঞ্চে বসে কোনও নড়াচড়া করছিল না, খুব শান্তভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, রাতের শীতলতা তার জামা-কাপড় ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করছে। খুঁটিগুলি আর চত্বরের মাঝে একটা ছায়ামানব, নড়াচড়া নেই, সে চিনতে পারলো, টিকেট কাউন্টারের লোকটা। এই মুহূর্তে মুখে হাসি নেই, বেঞ্চের আরেক ধারে বসে, একটা মগভরা ধোঁয়া ওঠা তরল এনে তার পাশে রাখলো। গ্রুনারের দিকে ঠেলে দিল, শরীরের ইঞ্চি কয়েক এর মধ্যে। গলা খাঁকারি দিয়ে লোকটা সামনের অনন্ত বিস্তৃত কালো প্রান্তরের দিকে তাকালো। মগটার ধোঁয়ায় গ্রুনারের রুচি জাগ্রত হলো, কিন্তু সে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করলো। ভাবছিল, যদি শেষমেশ রাজধানী পৌঁছতে পারে, তাহলে যা যা ঘটেছে সব নিয়ে নালিশ করে দিবে। কিন্তু তার হাত নিজে থেকেই মগটার দিকে গেলো, আঙুলের ফাঁকগুলির মধ্যকার গরম গরম অনুভূতি তার মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটালো। “এরকম আরও আছে, আনা যাবে”—লোকটা বলল, আর তখনই! না, গ্রুনারের এটা করার কথা ছিল না। গ্রুনারের হাত গরম পাত্রটা মুখের দিকে তুলে নিলো, যা একটা অলৌকিক ওষুধের মতন তার শরীরকে জাগিয়ে তুলল। শেষ চুমুকটা দিতে দিতে সে বুঝতে পারলো, এটা যদি একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়, তাহলে হতচ্ছাড়াটা এরই মধ্যে দুটো যুদ্ধে জিতে গেছে। বিজয়ী লোকটা উঠে দাঁড়ালো, শূন্য মগটা তুলে নিয়ে চলে গেলো।
কুকুরটা এখনো কুণ্ডলী পেঁচিয়ে শুয়ে আছে—থুতনিটা পেট আর পেছনের পায়ের মধ্যে গুঁজে দিয়ে, যদিও গ্রুনার এর মধ্যে বেশ কয়েকবার তাকে ডাকার চেষ্টা করেছে, কুকুরটা পাত্তা দেয় নি। হঠাৎ গ্রুনারের মনে হলো, মগের মধ্যে কুকুরের খাবার ছিল না তো! তার মনে হতে লাগলো কতটা দীর্ঘ সময় ধরে কুকুরটা এখানে আছে। হয়ত কুকুরটাও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভ্রমণ করতে চেয়েছিল, সে নিজে যেমনটা চাচ্ছিল বিকেলে। তার একটা ধারনা হলো, এই জগতের সব কুকুর রূপান্তরিত হয়েছে সেই সব মানুষ থেকে যারা তাদের কাঙ্ক্ষিত যাত্রা করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। সেইসব মানুষ, যাদের শুধু ধোঁয়া ওঠা তরল খাইয়ে রাখা হয়েছে, যাদের চুল বেড়ে গেছে, কান ঝুলে পড়েছে, আর লম্বা লেজ গজিয়েছে। আতঙ্ক আর ঠান্ডার অনুভূতি তাদের নিঃশব্দ রেখেছে, রেলস্টেশনের কোনো বেঞ্চের নিচে গোল হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা সেই মানুষেরা, যারা উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে নতুন আগন্তুকের দিকে, যে তাদেরই মতো, পার্থক্য শুধু এই যে আগন্তুকের মধ্যে এখনো আশা বেঁচে আছে। সেই আগন্তুক যে এখনো একটি ভ্রমণের সুযোগের অপেক্ষায়, দৃঢ় মনোভাব নিয়ে বসে আছে।
টিকিট অফিসে একটা ছায়ামূর্তি নড়ে ওঠে। গ্রুনার উঠে দাঁড়ায় এবং দৃঢ়ভাবে সেদিকে এগিয়ে যায়। সাদা শিকের ফাঁক দিয়ে হিটার থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আসে, সঙ্গে ভেসে আসে ঘরোয়া একটা গন্ধ। লোকটি সদয়ভাবে হাসে এবং গ্রুনারকে আরও গরম পানীয় অফার করে। গ্রুনার জিজ্ঞেস করে, “পরবর্তী ট্রেন কখন আসবে?” “এক ঘণ্টার মধ্যে”—বলে লোকটি, আর সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষুব্ধ হাতে জানালাটা বন্ধ করে দেয়। গ্রুনার আবারও একা।
ঘণ্টাখানেক পরের কথা। সবকিছু একটা প্রাকৃতিক চক্রের মতন আবর্তিত হয়, গ্রুনার ভাবছে, আরও কতগুলি রেলবগিকে চলে যেতে দেখল, না থেমে, ঠিক আগের বারের মতোন। যাই হোক, কোনো একদিন সকাল বেলা নিশ্চয়ই শ্রমিকেরা স্টেশনে আসবে টিকেট নিতে, আর তাদের অনেকের কাছেই হয়ত ভাংতি হবে। যদি রাজধানীর ট্রেন হয়, সেটা নিশ্চয়ই খুব সকাল সকাল আসে—এই যাত্রীদের নিতে যাদের প্রতিদিন ভ্রমণ করতে হয়। হ্যাঁ আমি সেখানে যাওয়া মাত্রই এই লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো। আর একদিন ফিরে আসবো ভাংতি সহ—এই হতচ্ছাড়ার কাছে, ও যাতে এখানে আর কাজ না করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে। এই রকম একটা নিশ্চিত ভাব নিয়ে সে বেঞ্চের উপর বসে অপেক্ষা করতে থাকে।
ট্রেনটা স্টেশনে ঢুকে পড়লে, গ্রুনার দেখল, রেল লাইনের এক পাশে, মাঠের দিকে, ঐ হাস্যমুখের লোকটা ট্রেনের কন্ডাক্টরকে ইশারা করছে, থামার দরকার নেই, কেউ টিকেট কেনে নি
সময় এগিয়ে যায়, রাতের সাথে গ্রুনারের চোখ মানিয়ে নিতে শুরু করে, এমনকি ভীষণ অন্ধকার জায়গায়ও অবয়ব গুলোকে চিনতে শুরু করে। এভাবেই সে স্ত্রীলোকটিকে আবিষ্কার করে, ওয়েটিং রুমের দরজায় হেলান দেয়া তার শরীরটা, মহিলা হাত নেড়ে তাকে ভেতরে যেতে বলছে। গ্রুনার নিশ্চিত, মহিলাটি তাকেই ডাকছে। দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলো, মহিলা হেসে তাকে ভেতরে নিয়ে যায়।
টেবিলের উপরে তিনটা প্লেট সাজানো। প্রত্যেকটায় খাবার দেয়া হয়েছে। ধোঁয়া উঠছে, তবে সেটা ওই তরল স্যুপ, ঝোল, বা কুকুরের খাবার থেকে না, একটা বেশ গন্ধযুক্ত সাদা ক্রিমে ডোবানো সসেজগুলো থেকে আসছে। ঘরটা থেকে বেশ গন্ধ আসছে, মুরগি, পনীর এবং আলুর। আর মহিলা যখন একটা সবজির ক্যাসেরোল নিয়ে এলো পাত্রে করে, গ্রুনারের মনে পড়লো এই ধরণের খাবার রাজধানীর সুখী সভ্যতার পরিচায়ক। এর মধ্যেই ঐ হতচ্ছাড়া টিকেট বিক্রেতা লোকটা, যাকে টিকেট বিক্রির সময় খুঁজেই পাওয়া যায় নি, সে ভেতরে ঢুকে গ্রুনারকে একটা আসনে বসতে দিল।
“প্লিজ বসুন। নিজের বাসা মনে করে বসুন।”
লোকটা আর মহিলাটা খেতে শুরু করলো পরম সন্তুষ্টি নিয়ে। গ্রুনার বসলো তাদের সাথে। তার প্লেটেও অনেক খাবার। সে জানে বাইরে ঠান্ডা-স্যাঁতস্যাঁতে এবং একেবারেই প্রতিকূল। এবং বুঝতে পারছে আরেকটা যুদ্ধ সে হেরে গেছে। এর পর আর দেরি না করে, কাঁটাচামচ দিয়ে সেই নিদারুণ মুরগির সসেজ মুখে পুড়ে দেয়। কিন্তু খাবারের মানে তো এই না যে সে স্টেশন থেকে খুব সহসাই বের হতে পারছে।
“কোনো কারণ কি আছে যে আপনি আমাকে টিকেট বিক্রি করবেন না?”, গ্রুনার জিজ্ঞেস করে।
লোকটা মহিলার দিকে তাকায় এবং মিষ্টি জাতীয় কিছু আনতে বলে। ওভেন থেকে একটা আপেল টার্ট এনে সেটিকে কতগুলি সমান অনুপাতের টুকরায় ভাগ করা হয়। গ্রুনার নিজের টুকরাটা যেভাবে গ্রাস করছিল, তা দেখে লোকটা আর মহিলাটা পরস্পরের দিকে একটা কোমল দৃষ্টি বিনিময় করে।
“পে, ওকে ওর ঘর দেখিয়ে দাও, ও নিশ্চয়ই অনেক ক্লান্ত”—মহিলাটা বলে। ঠিক সেই মুহূর্তে টার্ট টার দ্বিতীয় টুকরা গ্রুনারের মুখপানে ধাবিত হতে হতে থেমে যায় এবং অপেক্ষা করতে থাকে।
পে দাঁড়িয়ে যায় এবং গ্রুনারকে সাথে আসতে বলে।
“আপনি ভেতরে শুতে পারেন। বাইরে অনেক ঠান্ডা। আর সকালের আগে কোনও ট্রেন নেই।”
গ্রুনার ভাবছিল, আমার আর কোনো উপায়ও নেই। সে উঠে দাঁড়ায়, আর টার্ট টা কে ফেলে লোকটার পিছু পিছু গেস্ট রুমের দিকে যায়।
“আপনার রুম”, লোকটা বলে।
আমি এর জন্য কোনও টাকা দিব না—গ্রুনার ভাবছিল। একই সাথে সে দেখতে পেল তার নতুন বিছানায় দুটো কম্বল, বেশ নতুন এবং উষ্ণ মনে হচ্ছে। তারপরও সে অভিযোগ করবে; যা ঘটেছে সেটা এই আতিথেয়তা দিয়ে পূরণ করা যাবে না। পাশের ঘর থেকে দুইজনের কথাবার্তার খুবই ক্ষীণ আওয়াজ আসছিল। ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে সে শুনতে পায়, মহিলাটি পে-কে বলছে যে, তাকে আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে, লোকটা একা এবং এটা তার কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। পে বিরক্ত গলায় উত্তর দেয়, এই বাজে লোকটার শুধু একটাই ধান্ধা রিটার্ন টিকেট কেনা। শেষ যে শব্দটা তার কানে এলো তা হলো “অকৃতজ্ঞ”। শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আবার জেগে উঠে সকাল বেলায়, ট্রেনের হুইসেলের ধব্দে, এই গ্রামীণ দেশের নতুন দিনের সূচনায় তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে যায়।
“আমরা আপনাকে ডাকিনি, কারণ আপনি খুব গভীর ঘুমের মধ্যে ছিলেন”—মহিলাটি বলে। “আশা করি আপনি কিছু মনে করেন নি।”
গরম দুধ দেয়া কফি, সাথে দারুচিনি টোস্ট, মাখন আর মধু। গ্রুনার নীরবে নাস্তা করছিল আর চোখ দুপুরের খাবার তৈরি করতে থাকা মহিলাটিকে অনুসরণ করছিল। এরপর হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটলো। এশিয়ানদের মতোন দেখতে একজন অফিস কর্মচারী রান্নাঘরটায় প্রবেশ করে মহিলাটিকে অভিবাদন জানালো, লোকটার পোশাক গ্রুনারের মতন, সম্ভবত সে পরবর্তী ট্রেন ধরবে, এবং তার কাছে হয়ত দুটি টিকেট কেনার মতন যথেষ্ট ভাংতি আছে।
“শুভ সকাল, ফি”, লোকটা বলল, বেশ একটা পুত্রসুলভ আবেগ নিয়ে মহিলার গালে চুমু খেলো, “আমার বাইরের কাজ শেষ। আমি কি পে-কে মাঠের কাজে সাহায্য করব?”
ঠিক তখন দ্বিতীয়বারের মতন গ্রুনারের মুখের দিকে ধাবিত খাবার অর্ধেক গিয়ে থেমে গেল। হাওয়ার মধ্যে, এইবারের টোস্টের একটা টুকরা।
“না, চো”, ফি বলল। “গং আর গিল এর মধ্যেই গিয়েছে, তিনজন যথেষ্ট মাঠের কাজের জন্য। তুমি কি একটা খরগোশ ধরে আনবে রাতের খাবারের জন্য?”
“অবশ্যই”, চো উত্তর দেয়, এবং আপাত উৎসাহ নিয়ে চিমনির পাশ থেকে রাইফেলটা নামিয়ে চলে গেল।
গ্রুনারের টোস্টের টুকরা আবার প্লেটে ফেরত গেল এবং সেখানেই পড়ে থাকলো। গ্রুনার কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাবে, এমন সময় দরজা খুলে গেল এবং চো আবার প্রবেশ করল। সে প্রথমে গ্রুনারের দিকে চাইল এবং এরপর ফি কে জিজ্ঞেস করল:
“ও কি নতুন?”
ফি একটু হেসে খুব আদরমাখা একটা দৃষ্টি দিল গ্রুনারের দিকে।
“ও গতকাল এসেছে।”
ব্যর্থ হয়ে কান্না চোখে, তার সমস্ত টাকার বিনিময়ে শহরে যাবার একটি টিকেট কিনতে চায়। “ভাংতি লাগবে না”, সে হাত জোড় করে বলে, “সব টাকা রেখে দাও”
গ্রুনারের প্রথম দিনের কাজকারবার যারা এখানে এই একই দশায় পড়েছে তাদের মতোই। অপমানিত হয়ে দূরে থেকে, অর্ধেকটা সকাল টিকেট অফিসের পাশে কাটিয়ে দিয়ে।এমন এক অফিস যেখানে টিকেটও বিক্রি হয় না, ট্রেনও আসে না। এরপর দুপুরে খাবার খেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং বিকেলে লুকিয়ে লুকিয়ে বাকীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। পি’র নির্দেশক্রমে অফিসের কর্মচারীরা মাঠের কাজ করে। খালি পায়ে, প্যান্টগুলি হাঁটু পর্যন্ত গোটানো, তারা নিজেদের কৌতুকে নিজেরাই হেসে ওঠে, কিন্তু কাজের ছন্দ ব্যহত হয় না। এরপর ফি চা নিয়ে আসে সবার জন্য এবং তারা চারজন, পি, চো, গং এবং গিল-গ্রুনারকে তাদের সাথে যোগ দিতে বলে। গ্রুনার ভেবেছিল সে লুকিয়ে থাকায় কেউ তাকে দেখছে না।
কিন্তু আমরা যে গ্রুনারকে চিনি, সে ওদের সাথে যোগ দিতে রাজি হয় না। ওর চেয়ে বেশি ঘাউড়া অফিস কর্মী আর নেই। সে এখনো সেই পুরানো অফিস সংস্কৃতির লোক, সেই পার্টিশন বিহীন উন্মুক্ত অফিসগুলো। গোপনীয়তা নেই, কিন্তু নিজের একটা টেলিফোন আছে। এখন এই গ্রাম দেশে এসেও, তার ভেতরের গর্বটুকু রয়ে গেছে। বেঞ্চের উপরেই সে বসে থাকে। পুরোটা বিকেল ধরে সে নড়াচড়া না করার সংগ্রাম করে। ট্রেন না এলেও চলবে, সে ভাবে। দরকার হলে আমি এখানে পঁচে গলে যাব।
রাত এলে সবাই আবার একত্রিত হয় একটা উষ্ণ পারিবারিক ভোজের প্রস্তুতিতে। ঘরের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে আর যে ভোজের সূচনা হতে চলেছে তার প্রথম গন্ধ ঠান্ডা বাতাসে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে। গ্রুনারের সারাদিনের ধৈর্য ও অহংকার কিছুটা হলেও ক্ষয়প্রাপ্ত। অবশেষে কোনো অনুশোচনা ছাড়াই হাল ছেড়ে দিয়ে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে। একটি দরজা খুলে যায়, আর সেই নারী ঠিক আগের রাতের মতোই তাকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানায়। ভেতরে একটা পারিবারিক গুঞ্জন। পে অফিসকর্মীদের পিঠে ভ্রাতৃসুলভ চাপড় দিয়ে অভিবাদন জানায়। কর্মীরা কৃতজ্ঞতাভরে এমন একটি টেবিল সাজায় যা গ্রুনারের শৈশবের ঘরোয়া বড়দিনের উদযাপন মনে করিয়ে দেয়, এবং কেন নয়?—রাজধানীর সুখী সভ্যতার কথাও। চো, এক সফল সন্তুষ্ট শিকারি, বিজয়ীর মতো খরগোশ পরিবেশন করে। পে ও ফি বসে থাকে আয়তাকার টেবিলের দুই প্রান্তে। এক পাশে অফিসকর্মীরা, আর তাদের ঠিক উল্টো পাশে একা বসে থাকে গ্রুনার। গং ও গিলের বারবার অনুরোধে সে একদিক থেকে আরেকদিকে লবণের কৌটা বাড়িয়ে দেয়, যদিও সেটার ব্যবহার হয় না কখনোই। অবশেষে পে লক্ষ্য করে গং ও গিলের শিশুতোষ মুখে একরকম দুষ্টুমির ছায়া মেশানো উৎসাহী হাসি। তখন সে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আর গ্রুনারকে সেই ক্লান্তিকর খেলা থেকে মুক্তি দেয়, যাতে সে খাবারের প্রথম গ্রাসটুকু মুখে তুলতে পারে।
পরের দিনগুলিতে গ্রুনার নানান রকমের কৌশল চেষ্টা করে। প্রথমে সে ঘুষ দিয়ে পে ও ফি এর কাছ থেকে ভাংতি বের করার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে কান্না চোখে, তার সমস্ত টাকার বিনিময়ে শহরে যাবার একটি টিকেট কিনতে চায়। “ভাংতি লাগবে না”, সে হাত জোড় করে বলে, “সব টাকা রেখে দাও”। বার বার অনুরোধ করতে থাকে আর উত্তরে সে বার বার একই কথা শুনতে পায়— রেলের এক বিশেষ কোডের কথা, নৈতিকতা সংক্রান্ত, অন্য কারো টাকা রেখে দেয়ার অসম্ভাব্যতার কথা। ঐ দিনগুলিতে সে তাদের কাছ থেকে কিছু জিনিস কেনারও চেষ্টা করে। টিকেট এর দাম আর সাথে তারা যা খুশি বিক্রি করতে চায় তার দাম মিলে তার কাছে যে টাকা আছে তার সমান হবে, একেবারে নিখুঁত দরদাম। কিন্তু না, আবারও কর্মীদের গলা ফাটানো হাসি, এর পর আরেকটি পারিবারিক নৈশভোজ।
প্রথমে গ্রুনারের রুটিনে পরিণত হয় রাতের খাবারের পর থালা-বাসন ধোয়া, আর সকালে কুকুরটার খাবার প্রস্তুত করা। এরপর সে আবার অনুনয় করতে থাকে। সে প্রস্তাব দেয়, কাজের বিনিময়ে মূল্য পরিশোধ করবে। কিছু একটা কেনার দাম দিতে চায়। দুপুরের খাবারের দাম দিতে চায়। গ্রামীণ জীবনের অংশ হিসেবে ধীরে ধীরে কাজে অংশ নিতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে অফিসকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। গং-এর মধ্যে আবিষ্কার করে অসাধারণ দক্ষতা, দলীয় কাজ ও দক্ষতা তত্ত্ব বোঝানো ও ব্যখ্যা করতে পারা। গিল-এর মধ্যে খুঁজে পায় এক মর্যাদাপূর্ণ আইনজীবীকে। চো-এর মধ্যে প্রায় ঝানু হিসাবরক্ষক। আবার টিকিট অফিসের সামনে গিয়ে কাঁদে, আর রাতে প্রতিশ্রুতি দেয় পরদিন দুপুরের খাবার সে বানাবে। চো’র সঙ্গে মাঠে খরগোশ শিকার করতে যায়, আর পরিবারের কাছে থেকে যে সদয়তা পেয়েছে তার জন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অন্তত খাবারের দাম মেটানোর প্রস্তাব দেয়। সে শেখে কীভাবে এটা ওটা করতে হয়, আর চেষ্টা করে এই সব মূল্যবান তথ্যের জন্য দাম দিতে, যেমন ফসল তোলা হয় সকালে, যখন সূর্যের তাপ অতো যন্ত্রণাকর নয়, আর দুপুরের সময় গৃহস্থালির কাজের, এই সব তথ্য। আর মাঝেমধ্যে, টিকিটের খুচরো পাওয়ার আশায়, এমন এক আশা, কিছু বিশেষ বিশেষ দিনে নতুন করে জন্ম নেয়, সে বসে থাকে স্টেশনের বেঞ্চে, আর দেখে যায় আরও একটি ট্রেন, পে’র অবধারিত ইশারায় থামে না, চলে যায় সামনে দিয়ে।
এরপর অল্প অল্প করে সে বুঝতে পারে, এই সব অফিস কর্মীদের সুখী ভাবগুলি মেকি। সবকিছুতেই সন্দেহ জাগতে শুরু করে— চো এর নিষ্পাপ কৃতজ্ঞতা, গং এর প্রাণোচ্ছল আতিথেয়তা, আর গিলের অক্লান্ত আনুগত্য, সবকিছুতেই। তাদের প্রত্যেকটা কাজের পেছনে মনে হয় যেন একটা গোপন পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে, পে এবং ফি এর কথিত ভালোবাসার বিপরীতে। ঠিক তারপরই ঘটনাটা ঘটে। এমন একটা ব্যাপার যা সে আশা করেনি, খুবই অবাক হয়ে যায়। শুরুটা একটা আমন্ত্রণের মাধ্যমে, চো, গং এবং গিল মাতা ও পিতার জন্য বিছানা তৈরি করে দিবে। গ্রুনারকে তারা যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে। সবাই বড় শোবার ঘরটায় যায় এবং একসাথে বিছানার চাদরটাকে ছড়িয়ে সমান করে দেয়। এরপরেই ঘটনাটি ঘটে, যাতে সবকিছু বের হয়ে আসে, গং হাসে এবং গিলের দিকে তাকায়, এবং দুইজন মিলে বিছানার দুই ধারে দাঁড়িয়ে একটা করে বালিশ তুলে নেয়, এবং চো ও গ্রুনার কে অবাক করে দিয়ে বিছানার চাদরে থুতু ফেলে বালিশ চাপা দেয়।
সেই মুহূর্তে গ্রুনার বুঝতে পারে, ভেতরে ভেতরে এরাও বিদ্রোহ করছে, আসলেই বাইরের এত ভালোবাসা সত্যি হবার কথা না। গ্রুনারের সাহস বেড়ে যায়, সে জিজ্ঞেস করে,
“তোমাদের কাছে ভাংতি আছে?”
তিনজনেই খুবই অবাক হলো বলে মনে হয়। প্রশ্নটা মনে হয় খুব বেশি তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে কিনা, কিন্তু তার পরেও, উত্তর আসে—
“তোমার কাছে আছে?”
গ্রুনার বলে,
“তোমাদের মনে হয়, থাকলে আমি আর এই জায়াগায় রয়ে যাই?”
তারা উত্তর দেয়,
“থাকলে আমরা রয়ে যেতাম?”
কত মাস কেটেছে, কত বছর, তারা এখানে আটকে আছে; এখন তারা সন্দিহান, রাজধানীতে যা কিছু ছিল, সবই হয়ত নাই হয়ে গেছে। স্ত্রী, সন্তান, চাকরি, ঘরবাড়ি, সবকিছু। গিলের চোখ ভিজে ওঠে, একফোঁটা অশ্রু পড়ে টেবিলক্লথের ওপর
একটা লম্বা নীরবতার পর, সবাই একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, সবাই মিলে একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এখনো জানে না সেটা কেমন হবে, তবে এর পরে তাদের মধ্যে বেশ আন্তরিক ভাতৃত্ববোধের জন্ম নেয়। গিল মসৃণ বিছানার চাদর পুনরায় মসৃণ করতে থাকে, এই কাজটাই যেন তার না বলা কথাকে গোপন রাখবে। সেই রাতেই, যেদিন সেই উচ্ছ্বসিত ভালোবাসার নবজন্ম হয়, সেদিন গ্রুনার বুঝতে পারে, সে এখানে আসার বহু বছর আগেই এমন ছিল। এই গোটাটাই একটা প্রহসন। এরপর থেকে পে’র শিক্ষামূলক উপদেশ, বা ফি যখন ঘুমোতে যাবার আগে তাকে শুভরাত্রি বলার সময় কপালে চুমু দিয়ে যায়, এগুলি মেনে নিতে তার আর সমস্যাই হয় না। সকাল সকাল সে প্রাত্যহিক কাজগুলিতে ব্যস্ত হয়, এবং রাতে যখন সন্দেহের উদ্রেক হয় যে আসলেই এই পরিকল্পনা কী হবে নাকি পুরাটাই তার একটা কল্পনা মাত্র, তখন সে বুঝতে পারে যে শব্দটা তাকে বিরক্ত করছে সেটা আসলে কেউ একজন তার দরজায় অল্প অল্প ধাক্কা দিয়ে তাকে ডাকার চেষ্টা করছে। ঐ অল্প অল্প ধাক্কাগুলি এক ধরণের গুপ্ত সংকেতের মতন, এগুলির মানে হলো দরজা খোলো, সে দরজা খুলে দেখে বাইরে চো দাঁড়িয়ে আছে, খুবই অস্থির। গং-এর আদেশে সে এসেছে তাদের প্রথম সভায় গ্রুনারকে নিয়ে যেতে।
এই প্রথম সভা, সাধারণ টয়লেটে, টিকেট বিক্রির জানালাটার পাশে। গিল, তার স্বভাবসুলভ দক্ষতায় ভাঙা জানালাগুলো ঢেকে দিয়েছে কার্ডবোর্ড দিয়ে যেন ঠান্ডা ঢুকতে না পারে। সাথে নিয়ে এসেছে কিছু মোমবাতি আর হালকা খাবার। সবকিছু একটা টেবিলক্লথের ওপর গোছানো, ছড়িয়ে রাখা মেঝের মাঝখানটায়, টয়লেটেই। চৌকিতে বসে, সতর্ক অফিসকর্মীদের মতো মনোযোগী হয়ে। চারজন মিলে টেবিলক্লথ ঘিরে বসে তাদের টাকা গং-এর হাতে জমা দেয়। চারটা নোট, বড়, চকচকে। গ্রুনারের কাছে অদ্ভুত লাগে, সবার শিশু-সদৃশ মুখগুলিতে একটা নতুন অভিব্যক্তি দেখে। উদ্বেগ আর অবিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। কত মাস কেটেছে, কত বছর, তারা এখানে আটকে আছে; এখন তারা সন্দিহান, রাজধানীতে যা কিছু ছিল, সবই হয়ত নাই হয়ে গেছে। স্ত্রী, সন্তান, চাকরি, ঘরবাড়ি, সবকিছু। গিলের চোখ ভিজে ওঠে, একফোঁটা অশ্রু পড়ে টেবিলক্লথের ওপর। চো গিলের পিঠে কয়েকবার চাপড়ে নিজের কাঁধে মাথা রাখতে দেয়। গং তাকায় গ্রুনারের দিকে। তারা জানে, গিল আর চো দুর্বল, ক্লান্ত, হয়ত আর বিশ্বাস করে না মুক্তির সম্ভাবনায়, সামনে অপেক্ষা আরও কত করুণতর গ্রামীণ দিনগুলির। গং আর গ্রুনার, ওরা এখনো শক্ত, লড়তে হবে এই চারজনের জন্য। একটা নিখুঁত পরিকল্পনা করতে হবে, গ্রুনার ভাবতে থাকে। গং-এর চোখে সে খুঁজে পায় একজন বন্ধুকে, যে তার প্রতিটি চিন্তা গভীর মনোযোগে অনুসরণ করে। এদিকে গিল কাঁদতেই থাকে, আর হঠাৎ গলা ছেড়ে বিলাপ করে,
“এই সব টাকা দিয়ে আমরা একটু জমি তো কিনতে পারি, তাতে অন্তত স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারব…”
“ট্রেনটা থামাতেই হবে”, গং সমাধান দেয়, এর আগে তার মধ্যে এমন গুরুগম্ভীর ভাব দেখা যায় নি।
“কী করতে চাও?” গ্রুনার জিজ্ঞেস করে। “তুমি কীভাবে ট্রেন থামাবে? আমাদেরকে বাস্তব বুদ্ধি খাটাতে হবে। যে কোন পরিকল্পনার জন্য নৈর্ব্যক্তিকটা হলো মূল ভিত্তি।”
“গ্রুনার, তুমিই বলো, তোমার কী মনে হয়, ট্রেন কেন থামে না?” গং জিজ্ঞেস করে।
চো খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উত্তর দেয়,
“পে-এর জন্য, ও প্রত্যেকবার ইশারা করে যে কোনও যাত্রী নেই।”
“আমরা না থামার ইশারা জেনে গেছি, আমরা যেটা জানি না তা হলো, থামার ইশারাটা”, গং বলে।
“আচ্ছা”, গ্রুনার বলে। এরপর উত্তেজিত হয়ে বলে, “তুমি কি এর মধ্যে উল্টাটা করে দেখেছ?”
“উল্টাটা?” গং জিজ্ঞেস করে।
“যদি ঐ ইশারার মানে হয়, ‘থেমো না’, গ্রুনার বলতে থাকে, ‘তার উল্টাটা হবে”
“কোনো ইশারা না দেয়া!” চো প্রায় কেঁদে উঠে।
“খোদা, তাই যেন হয়”, গ্রুনার বলে।
“হ্যাঁ খোদা তাই যেন হয়”, গিল পুনরাবৃত্তি করে, একটা কাগজের রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে।
সবকিছু ঘটে ঠিক যেমনটা হওয়ার কথা ছিল সেই মোতাবেক। ঠিক যেমনটা তারা পরিকল্পনা করেছিল। প্রথমেই ভোর হয়। ফি রান্নাঘরের দরজা দিয়ে মাথা বের করে ডাকে, “সকালের নাশতা!” আর সমস্ত পরিবার জেগে ওঠে। ছোট অফিসকর্মীরা, প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমোচ্ছিল, পায়ে মোজা পরে, পাজামার ওপর জ্যাকেট চাপায়, আর মোজা পরা পায়ে গলায় স্লিপার। পে-ই সবার আগে টয়লেট ব্যবহার করে, তারপর একে একে বাকিরা, গং, গিল, চো, আর সবশেষে গ্রুনার। যেহেতু সে সবার শেষে, এই সময়টায় কুকুরটাকে খাবার দেয়। কুকুরটাও দরজার পাশে অপেক্ষা করে থাকে। ফি সবাইকে শুভ সকাল জানায় আর তাড়াতাড়ি বসতে বলে যেন খাবার ঠান্ডা না হয়। চো ফি-কে ব্যস্ত রাখে, জানালার কাছে নিয়ে যায় আর মাঠের দিকে কিছু একটা দেখায়। হয়তো এমন কোনো প্রাণী, যেটি সেদিনের দুপুর বা রাতের খাবার হতে পারে। এই ফাঁকে গং নজর রাখে টয়লেটের দরজায়, পে যেন বেরিয়ে না আসে। আর গংই এরপর টয়লেটে যাবে, তাই ওর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়। ঠিক তখনই, গ্রুনার আর গিল ফি’র নাইটস্ট্যান্ড থেকে চুরি করে আনা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয় পে’র বড় কফির মগে।
সবাই টেবিল ঘিরে বসে পড়ে, নাশতা শুরু হয়। শুরুতে অফিসকর্মীরা কিছুই করে না, শুধু পে’র মগের দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে পে আর ফি মনোযোগ দিয়ে নিজেদের খাবারে ব্যস্ত, ওরা কেউই টের পায় না সেই চাহনিগুলো। প্লেটে একে একে যত রকমের সুস্বাদু খাবার জমা হতে থাকে, তাতে মনে হয় অফিসকর্মীরাও একসময় বেমালুম ভুলে যায় আগের ব্যাপারটা। খাওয়া শেষে গিল টেবিল পরিষ্কার করে, চো বাসন ধোয়। গং আর গ্রুনার বলে, তারা ঘরগুলো গুছিয়ে দেবে আর বিছানাগুলো ঠিক করে দেবে। ফি’র সদয় হাসির মধ্যেই তারা উঠে যায়।
কিন্তু, সবসময়ই একটা “কিন্তু” থাকে, দরজার কাঁচে একটা জানালা আছে, সেই জানালা দিয়ে তারা এখনো দেখতে পাচ্ছে সেই স্টেশনটাকে। স্টেশন ভরা খুশিতে ফেটে পড়া মানুষ, অফিসের সরঞ্জামে ঠাসা, সম্ভবত ভাংতি টাকাতেও
তারা আগেই ঠিক করে রেখেছিল, পরিকল্পনার প্রথম অংশ সফলভাবে শেষ হলে চারজনেই গ্রুনারের ঘরে মিলিত হবে। সেখানে পৌঁছালে, অফিসকর্মীরা—বিশেষ করে গিল আর চো, একধরনের নস্টালজিয়ার আবেগে ভেসে যায়। গিল বলে, “এই কয়দিনে ফি যেন আমার মা-ই হয়ে উঠেছিল।” আর চো স্বীকার করে, “দেশজ জীবনের কত কিছু শিখেছি আমি পে এর মতন এমন একজন মানুষের কাছে।” ঘন্টার পর ঘন্টা একসাথে কাজ করা, সকালের পারিবারিক নাশতা, সব এমন স্মৃতি হয়ে গেছে, যা ভুলে যাওয়া সহজ নয়। এইসব স্মৃতিচারণ যখন চলছে, গং আর গ্রুনার থেমে নেই। ব্যাগ গোছাতে থাকে। কিছু ছোট্ট স্মারক, গিল আর চো এর জমানো ছোট পাথর আর নানা টুকিটাকি, সাথে ট্রেনে খাওয়ার জন্য কয়েকটা আপেল।
ঠিক তখনই গং-এর ঘড়ির অ্যালার্ম বেজে ওঠে, সময় হয়ে গেছে। ট্রেন আর একটু পরেই চলে আসবে। প্রতিদিন এই সময়েই পে উঠে পড়ে তার সকালবেলার পড়ার সোফা থেকে আর চলে যায় মাঠের ধারে, রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে সংকেত দিতে। গ্রুনার, গং দুজনেই উঠে দাঁড়ায়, এখন সবকিছু তাদের হাতে। গিল আর চো অপেক্ষা করবে স্টেশনের বেঞ্চে। লিভিং রুমে গিয়ে দেখে, পে এখনো সোফায় ঘুমিয়ে আছে। তারা জোরে, দৃঢ়ভাবে ডাক দেয়, “চম্প!” “সাবধান!” “পরীক্ষা করো!” কিন্তু ওষুধের ঘুমে ডুবে থাকা পে জেগে ওঠে না। গিল তার কপালে চুমু খায়, চোও তাই করে, বিদায়ের অশ্রু তাদের চোখে। গং নিশ্চিত করতে চায় ফি প্রতিদিনের মতো এই মুহূর্তে বাগানে গাছপালায় পানি দিচ্ছে কিনা, হ্যাঁ, ঠিক সেখানেই। “নিখুঁত”, তারা পরস্পরকে বলে, অবশেষে সবাই ঘর ছেড়ে বের হয়। গিল আর চো স্টেশনের দিকে যায়, গং আর গ্রুনার যায় মাঠের দিকে, রেললাইন ধরে ট্রেনের দিকে এগোয়। দিগন্তে ধোঁয়ার রেখা দেখা যায়, ট্রেনটা এখনও চোখে পড়ে না, কিন্তু তার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কয়েক পা চলার পর গং থেমে যায়। গ্রুনারের একাই এগোনোর কথা, সিগন্যাল না দেওয়ার কাজের জন্য একজন মানুষই যথেষ্ট। গং তার পিঠে কয়েকবার চাপড় দেয়, তারপর গ্রুনার আবার হাঁটা শুরু করে। খুবই কঠিন কাজ, ট্রেনটাকে আসতে দেখবে, থামাতে চাই, কিন্তু সেটার জন্য কিছু না করে, কোনো সিগন্যাল না দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু না করা, শুধু খোদার নাম স্মরণ করা, যেমন গিল বলেছিল, হয়তো সেটাই সেই ঈশ্বরের জন্য সিগন্যাল, যাতে ট্রেনটা থেমে যায়।
ট্রেনটা কাছে আসে, গ্রামগুলির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুঁয়ে চলে যাওয়া দুটি লাইনের একটায় গড়িয়ে আসে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যায় স্টেশনে। গ্রুনার মনোসংযোগ ঠিক রাখে। যতটা সম্ভব স্থির থাকে। ট্রেনটা যখন তাকে অতিক্রম করে, তখন বুঝতে পারে না গতি বাড়ানোর শব্দ, না কি থামার? এরপর চোখ নামিয়ে তাকায় রেললাইনের উপড়ে ঘুরতে থাকা চাকাগুলোর দিকে, আর দেখতে পায়, যে লোহার কব্জাগুলো ট্রেনটাকে ঠেলে এগিয়ে নিচ্ছিল, তাদের গতি ধীর হয়ে আসছে। সে গংকে দেখতে পাচ্ছে না, জানে না এই মুহূর্তে কোথায়, কিন্তু তার আনন্দময় চিৎকার শুনতে পায়। ট্রেনটা তাকে পার হয়ে যায়, এবং অবশেষে, স্টেশনে পুরোপুরি থেমে যায়। গ্রুনার বিজয়ের আনন্দে দেখতে পাচ্ছে স্টেশনটা যাত্রীদের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে গেছে, ঠিক তখন সে বুঝতে পারে মানুষের কোলাহলের মধ্যে গংয়ের চিৎকারগুলো আসলে ওর উদ্দেশেই, স্টেশন থেকে সে অনেক দূরে, আর ট্রেনের বাঁশি ইতোমধ্যে বিদায়ের সুর বাজাতে শুরু করেছে। গ্রুনার দৌড়াতে আরম্ভ করে।
স্টেশনে, ট্রেনে উঠতে গিল আর চো-কে ঠেলেঠুলে এগোতে হলো, ডজনের পর ডজন যাত্রী তখনো নামছে। মানুষ আর স্যুটকেসে ভরে গেছে প্ল্যাটফর্ম। প্রতিধ্বনির মতো কিছু বাক্য সমগ্র ট্রেনের মধ্যে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে—
“ভাবতেই পারিনি, আমরা সত্যি নামতে পারব।”
“বছরের পর বছর ধরে এই ট্রেনে ছিলাম, কিন্তু আজ, অবশেষে …”,
“শহরের নামটাও মনে পড়ে না আর, আর এখন হঠাৎ করে আমরা এসে গেছি …”।
মানুষ চিৎকার করছে, উল্লাস করছে, স্টেশনে আর জায়গা নেই বললেই চলে। এরপর আবার হুইসেল বাজে, ট্রেনের চাকা ধীরে ধীরে ঘোরে। গ্রুনার প্রায় পৌঁছে গেছে। প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে গং দাঁড়িয়ে, হাত বাড়িয়ে রেখেছে তাকে তুলে নেবার জন্য। গ্রুনার লাফিয়ে ওঠে সিঁড়ি বেয়ে। একদল মানুষ বাদ্যযন্ত্র খুলে একটা আনন্দের সুর বাজাতে শুরু করে, উৎসব যেন। গং আর গ্রুনার ঠেলে ঠেলে এগোয়। শিশু, পুরুষ আর নারী, সবাই মিশে গেছে সেই ভিড়ে। প্রথম দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই ট্রেনটা চলতে শুরু করে। আর তখনই গ্রুনার দেখতে পায়, সেই সুখী, সদ্য নামা যাত্রীদের ভিড়ে একটি ধূসর, শীর্ণ অবয়ব: সেই কুকুরটা।
“গ্রুনার!”, গং চিৎকার করে, এখন সে প্রথম দরজাটায় পৌঁছে গেছে।
“আমি কুকুর ছাড়া যাচ্ছি না,” ঘোষণা করে গ্রুনার। আর এই কথাগুলিই যেন তাকে প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায়। ফিরে যায় পশুটার কাছে, কোলে তুলে নেয়। কুকুরটা বাধা দেয় না, ভয়-ভরা চোখদুটি গ্রুনারের মুখের সাথে লেগে থাকে। গ্রুনার উল্লসিত মানুষগুলোর ফাঁক গলে এগিয়ে যায়, পৌঁছে যায় ট্রেনের শেষ কামরার পাশে। গতি বাড়ানো ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটে। গ্রুনার বুঝতে পারে, ট্রেনের জানালার একপাশ থেকে গিল আর চো উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে জানে, সে তাদের নিরাশ করতে পারে না। এরপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্রেনের পেছনের সিঁড়িটা আঁকড়ে ধরে, আর ট্রেনের প্রবল গতি তাকে তুলে নেয় প্ল্যাটফর্ম থেকে, ঠিক যেন একটা স্মৃতি উপড়ে ফেলার মতন। একটু আগে যেখানে তাদের পা গাঁথা ছিল মাটিতে, এখন সেটা ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে প্রান্তরের ভেতর।
ট্রেনের পেছনের দরজাটা খুলে যায়, আর গং হাত বাড়িয়ে তুলে নেয় গ্রুনারকে। ভিতরে, গিল আর চো কুকুরটাকে কোলে নেয় আর গ্রুনারকে অভিনন্দন জানায়। তারা চারজন ছিল, এখন পাঁচজন, সবাই একসাথে। তারা বাঁচল। কিন্তু, সবসময়ই একটা “কিন্তু” থাকে, দরজার কাঁচে একটা জানালা আছে, সেই জানালা দিয়ে তারা এখনো দেখতে পাচ্ছে সেই স্টেশনটাকে। স্টেশন ভরা খুশিতে ফেটে পড়া মানুষ, অফিসের সরঞ্জামে ঠাসা, সম্ভবত ভাংতি টাকাতেও। একটা ছোট অস্বস্তির মতন ব্যাপারটা, এই যে এত দিন যেখানে তারা এত ভয় আর অপমান সহ্য করে গেছে, হয়ত সেখানেই রয়ে গেছে রাজধানীর মতো সুখী কোনো সভ্যতার সম্ভাবনা। সবাই একসাথে অনুভব করে, একটা চূড়ান্ত ভয়, একটা আশঙ্কা, যেদিন তারা গন্তব্যে পৌঁছাবে, ওখানে হয়ত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

















































































































