সোহান ছিল কিশোর কবি। গাছের মরা পাতা বাতাসে পাক খেতে খেতে নিচে পড়ছে… দেখলেও তার হৃদয়ে কবিতার বাণী উথলে উঠত। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার কবিতার গলা টিপে ধরে জীবনবাস্তবতা — আর তার স্বপ্নাতুর চোখ দু’টো হয়ে যেতে থাকে ভোঁতা ভোঁতা। অর্ধ-শিক্ষিত বেকার কবি নিরুপায় হয়ে পাশের বাজারে ওষুধের ছোট্ট একটা দোকান দিয়ে বসে। নতুন ডাক্তার-ফার্মেসী… বিকিসিকি হবে তো? তবু পরিচিত কেউ কেউ নাপা-এন্টাসিড কিনতে আসে। ঘরে ঘরে প্রবাসী, নানা পদের চাকরিজীবী… চাষবাস নাই বললেই চলে। ফিশারীর মাছ, পোলট্রির আণ্ডা-মুরগী, হাইব্রিড ধান-পান-গান… তাই চল্লিশ পেরুবার আগেই তাদের আলসার পুরোনো হয়, বহুমুত্র, উচ্চ রক্তচাপ… ভাত-মাছের মতো ওষুধ খেতে খেতে গ্রামের অধিকাংশ নর-নারী এখন আধা-ডাক্তার। এন্টিবায়োটিক অষুধের মতো জিনিসের নাম-কাম ও সেবন-মাত্রা তাদের অনেকেরই জানা। তাই দিন শেষে বিকিসিকি মন্দ হয় না।
তো দিনের পর দিন কবিতা নাই! মাঝে মাঝে বুকটা মুচড়ায়। মন টনটন করে। কী এক আজব অনুভব-উত্তাপ যেন হৃদয় থেকে বেরিয়ে শতদিকে ছড়িয়ে পড়তে চায়!
পৃথিবীর সব ধর্ম বাজারকে নিকৃষ্টতম স্থান হিসাবে বয়ান করেছে। তো সেই-ই রকম একটা বাজার। গাজীপুর থেকে একটা পাকা সড়ক আঁকাবাঁকা ভঙ্গিতে এসে বাজারটাকে দু’ভাগ করে সোজা চলে গেছে মৈমনসিং। তাই রাজধানীর হাওয়া, উন্নয়নের ধোঁয়া-দূষণ-দুর্গন্ধ ফার্মেসির প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেই পাওয়া যায়।
বিকাল হলেই চারপাশের গ্রামগুলো থেকে প্রাবাসীদের বউ-কন্যারা শপিং করতে চলে আসে। নানা রঙ-ঢংয়ের বোরকা-হিজাব, বিদেশি সেন্টের গন্ধ… এভাবেই হঠাৎ একদিন সে আবিষ্কার করে: এই ঝলমলে সংসার সাগরে কত রকম তরঙ্গ ওঠে, তরঙ্গ মিলায়। এক জ্বালা শেষ হতে না হতেই দুঃখের নির্দয় চোখটি আবার কটমট করে তাকায়। ছলনা-বঞ্চনা-বেদনার যন্ত্রণা আর শুধু স্বার্থপরতা।
অর্থ-চিন্তার একটা স্থায়ী সমাধানের পর সোহানের মনটা আবার ভাবের ফেনা তুলতে থাকে কিন্তু কবিতা আসে না। শুধু চারপাশের চলমান জগতটাকে ছায়ার মতো একটু একটু দেখা যায়: বাজারের গলিতে শাক-সবজি-ফল, রুই-কাতল-পাঙ্গাস… নতুন-পুরাতন টাকা… অইযে কলা বেচছে আধা-বুড়ো টিপু মুন্সি, পাশে বসে শাক-সবজি বেচছে বীরের মতো বলশালী আর চকচকে কালো নিতাই পাল, ধর্ম ভিন্ন হলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় অভিন্ন কেন? এইভাবে নতুন নতুন ভাব আসে। তরুণ ডাক্তার একাই চালাচালি করে। কাছে-দূরে কিংবা বহুদূর থেকে তার চিন্তা ধরে নিয়ে আসে মানুষের লম্বা ইতিহাস। সে একটার পর একটা গ্রন্থির পাশে গ্রন্থি সাজায়। অসহায়ের মতো ভেতরে ভেতরে কাতরায়, অন্তরের বিশ্বাসগুলো ওলটপালট হতে থাকে তবু কবিতা আসে না। তার বদলে অসংখ্য প্রশ্নে তার হৃদয়টা আলোড়িত হয়: কেন মানুষ খুন করে, ছেলেরা লাখ লাখ টাকা বিদেশ থেকে আনলেও কেন ফরিদ চাচা শেষ বয়েসে কলা নিয়ে বাজারের গলিতে বসে থাকে?
হঠাৎ এক অলস দুপুরে তার শিল্পী মনটা থরথর করে জেগে ওঠে। অষুধ কোম্পানির প্যাডে টুকটুক করে লিখে ফেলে একটা গল্প! লোভকে কেন্দ্র করে সম্পদ সংগ্রহের লড়াইয়ে মানুষ কীভাবে পশুত্ব অর্জন করছে; গল্প এগিয়ে যায় সেই দিকে। একজন নারী চরিত্র খুন হয়। তারপর লেখা শেষ হলে সে বারবার পড়ে আর বাক্য-শব্দ নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ গল্পের নাম দিয়া দেয়, ‘নাগরিক ইঁদুরদের হালচাল’। তার বিবেচনায় এখন বাংলাদেশে কোনও গ্রাম নাই।
তো বছরে এক-আধটা গল্প তৃতীয় শ্রেণির কোনও অনলাইন পত্রিকায় ছাপা হয়। দুই-চারজন কাছের মানুষ না পড়েই বাহবা দিয়ে কমেন্টস করে। তার উৎসাহ দেখে কে? নতুন নতুন গল্পের খোঁজে মাঝে মাঝে দোকান বন্ধ করে আশপাশে ঘুরতে থাকে। কোনও কোনও দিন বেরিয়ে পড়ে দূরে। ভাত-পানি আর নারীর তৃষ্ণার চেয়েও তীব্র এখন গল্পের পিপাসা।
তো কঠিন একটা গল্পের খোঁজে আজ সে এসেছে জেলা শহরের খারাপ পাড়ায়। অন্ধকার জগতের প্রত্যক্ষ এলেম অর্জনের মধ্য দিয়ে যদি মনমতো কিছু একটা পেয়ে যায়?
গলির ভিতর পা দিতেই একটা বদ গন্ধ তাকে অভিনন্দন জানায়। এক নজরে সে দেখতে পায় অসংখ্য নারী-পুরুষ রাস্তার ওপর; দুই পাশে মদ, পান-সিগারেটের দোকানের ঝাঁপের নিচেও ঘেষাঘেষি করে বসে আছে মানুষ। মেয়েরা এমন ভাবে সেজে, এইরকম পোশাক ও ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অঙ্গ-সৌষ্ঠব দেখাচ্ছে যেন দৃষ্টি পড়ামাত্র পুরুষরা কামাসক্ত হয়।
লম্বা লম্বা চুল-দাড়ি-গোঁফ আর মোটা মোটা হাড়ের দেহটাতে বাঘের শক্তি এবং কটা রঙের বড় বড় চোখ দু’টো এক নজর পরখ করেই পাড়ার মেয়েরা পথ ছেড়ে দেয়। আশপাশে বসে-দাঁড়িয়ে থাকা কেচকি মস্তানরা সমীহের চোখে তাকায়। সে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। চোখে কালো চশমা, কাঁধে ছোট্ট একটা ব্যাগ। লাল টিশার্ট কামড়ে ধরে আছে চাষার মতো শক্ত-পুক্ত দেহটাকে। ময়লা জিন্স আর সাদা কেটস্-এ তাকে যার যা ইচ্ছা তাই ভাবতে উৎসাহ যোগায়। কেউ আন্দাজ করে সাংবাদিক; কেউ কেউ ঠাওরে বসে খুনি-মস্তান কিংবা বেপরুয়া মাগীবাজ-মাতাল। তাতে গল্পকারের কী?
বাঁ হাতের আঙুলে গোঁফ মুচড়াতে মুচড়াতে, কখনও উলুংগা যুলুংগা চুল-দাড়ি টানতে টানতে, একটা চিন্তিত-বিষণ্ণ আবহে সে হাঁটতেই থাকে। বিশাল গলিটার দু’পাশ দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এঁকেবেঁকে সেঁধিয়ে পড়েছে আরও অসংখ্য উপগলি। থকথকে লালচে রঙের শ্যাওলা ধরা দালানগুলোর পিঠ থেকে খাবলা খাবলা প্লাস্টার খসে পড়েছে বলে দেখায় ক্যান্সারের ঘা’র মতো। ধ্বংস-উন্মোখ বাড়িগুলোর দেহে কতশত বছরের উত্তাপ ও ইতিহাস শ্যাওলার মতো জড়িয়ে আছে?
তরুণ ডাক্তার একাই চালাচালি করে। কাছে-দূরে কিংবা বহুদূর থেকে তার চিন্তা ধরে নিয়ে আসে মানুষের লম্বা ইতিহাস। সে একটার পর একটা গ্রন্থির পাশে গ্রন্থি সাজায়। অসহায়ের মতো ভেতরে ভেতরে কাতরায়, অন্তরের বিশ্বাসগুলো ওলটপালট হতে থাকে তবু কবিতা আসে না
পাড়ার প্রধান রাস্তা দিয়ে এমাথা-সেমাথা দুই চক্কর দিয়ে সে একটা দোকানের ঝাঁপের নিচে বসে। বেঞ্চটায় আরও দুইজন আগে থেকেই বসে কলকি দিয়ে গাঁজা সেবন করছিল। গল্পকারের ইচ্ছা হলো খুব কাছ থেকে দেখতে: ওরা কীভাবে বানায়, কলকি ধরে, টান দেয়?
বেঞ্চে বসতেই মাঝ বয়েসী দোকানদারনি একটু নড়েচড়ে জিজ্ঞেস করে; বাবাজি কি সাম্বাদিক?
না।
তাইলে কী?
এই-ই…একটু-আধটু লেখালেখি করি।
খারাপ পাড়া তো, অপরাধীদের স্বর্গোদ্যান। তাই লেখালেখি শব্দটা অনেককেই চমকে দেয়। অপর দিকে মাঝ বয়েসী দোকানি কাম-প্রাক্তন দেহজীবিনী তাকে ডাকে; আয়েন বাজান, গদিতে আমার পাশে আইয়েন। মাথার উপ্রে ফ্যান আছে… এইসব বলতে বলতে থলথলে মোটা শরীরের মহিলা তার ব্যাগের দিকে গলা বাড়ায়। সে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে। গদিতে বসা সর্দারনি গলা টানটান করে ব্যাগের ভিতর নজর চালিয়ে দেয়। সেখানে গল্পের নোট খাতার রঙিন কভার চকচক করছে।
সে অনেকক্ষণ বসে থাকে। সিগারেট টানে, ভাবে। এখানে কতরকম শব্দ, কী বিচিত্র সব মানুষ! আর গলির গন্ধটা? মেয়েদের শরীরের কমদামা পাউডার, মদ-গাঁজার মিলিত ঘ্রাণটুকু… গল্পকারকে বিষণ্ণ দেখায়।
সে বসা থেকে উঠে পড়ে। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। চোখ দু’টো অবিরত ঘুরছে: শতবর্ষী দালানগুলোর ধ্বসে পড়া কার্ণিশ, ভেঙ্গে যাওয়া রেলিং, ড্রেনের নোংরা পানিতে ভেসে থাকা ব্যবহৃত কন্ডম, কন্ডম, কন্ডম এবং তার পাশেই একটি মরা বিড়াল পড়ে আছে। লোমশ-কালো চামড়া ফেটে বেরিয়ে পড়েছে পচা ভুড়ি; ভোমা ভোমা নীল মাছিরা খুব খুশি। কেউ কাশির হলুদ দলা ছুড়ে মারে, কেউ ফেলে দেয় পানের পিক। বিরক্ত মাছির ঝাঁক ভোম-ম-ম করে উড়াল দিয়ে হয়ে যেতে চায় ভ্রমর!
ঈগলের মতো গলা উঁচিয়ে, নির্বিকার দৃষ্টিতে গল্পকার দীর্ঘ গলিটাতে একটা চক্কর দেয়। তারপর ঈশ্বরের মতো আধা-বোঁজা চোখে খুটিনাটি দেখে। কখনো ঝাঁপের নিচের বেঞ্চে বসে টুকটাক নোট লয়। কখনও বা কোনও প্রাচীন বাড়ির ভাঙ্গা সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু ভাবে। কেউ তাকে বিরক্ত করে না। দুঃখী প্রেমিক, হয়তো প্রেয়সীর কাছে অনেকদিন পর এসেছে। তাই ঘরটা খুঁজে পাচ্ছে না। এমনটা তো এখানে প্রায়-ই ঘটে থাকে।
গল্পকারের চোখ দু’টো উদাস, মুখ থমথমে! নতুন গল্পকার তো, তাই নারী জনমের এতো লাঞ্ছনার কথা ভেবে হৃদয়-মন-মগজ সম্ভবত এক সাথে বেঁকে বসেছে?
সে হাঁটতেই থাকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা ‘একজন কড়া’ ধাতের নবাগত মস্তানকে সমীহের সাথে পথক দেয়। গলির শেষ মাথায় এসে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে একটি মেয়ে তার পথে অচেতনের মতো দাঁড়িয়ে আছে! দবদবে ফর্সা, রুগা রুগা একহারা গড়ন। চমৎকার সুন্দরী বেচারির পেটটা এক হাত উঁচু। কালো টানাটানা চোখের পেরেশানি দেখে তার আন্দাজ হয়; অসুস্থ মেয়েটি এক্ষণি ঢলে পড়বে!
আ রে, তুমি তো পড়ে যাচ্ছ? সে মেয়েটির একটা হাত ধরে ফেলে। আসন্ন মাতৃত্বের চাপে মেয়েটি সত্যিই অসুস্থ্য। তবু বেঁচে থাকার তাগিদে পথে এসে দাঁড়িয়েছে। কী সুন্দরী! কোন বাপের আদরের দুলালি কর্মদোষে ঠাঁই নিয়েছে নরকে? তরুণ গল্পকারের চোখের পাতা ভিজে উঠতে চায়।
মেয়েটির হাত ধরেই পল্লীচিকিৎসক সাহেব রুগিনীর লক্ষণগুলোর বিষয়ে নিজের সাথে আলোচনা শুরু করেন: দেহ একটু একটু কাঁপছে। শ্বাস পড়ছে ঘনঘন। তাপমাত্রাও একটু বেশি। জ্বর সম্ভবত একশ এক কিংবা দুই। তারপরেই সে জিজ্ঞেস করে; তোমার ঘর কোনটা?
ওইটা…। মেয়েটি অসহায় ভঙ্গীতে হাত তুলে দেখায়।
দু’হাতে আলগোছে ধরে গল্পকার মেয়েটিকে নিয়ে রুমে যান। আশপাশের মেয়েরা চোখ ঠারাঠারি, হাসাহাসি করে।
বাল্বের সুইচ টিপতেই দৈর্ঘ্য-প্রস্থে কবরতূল্য স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কুঠোরিটা বিশ্রী দাঁতের মতো খেঁকিয়ে ওঠে। জমাটবদ্ধ একটা চিমসে গন্ধে সে সচেতন হয়। একটা মাত্র ছোট্ট চৌকি-বিছানা আর ছোট্টতর একটা টেবিলেই বুঝি রুমটা হাঁপিয়ে উঠেছে?
মেয়েটিকে বসিয়ে সে নিজেও তার পাশে ঘনিষ্ট হয়ে বসে। নড়বড়ে চৌকিটা মটমট করে কয়েকবার হাসে। মেয়েটির শরীর থেকে বিনবিন করে এগিয়ে আসে মা মা গন্ধটা। চারপাশ থেকে চেপে রাখা স্যাঁতসেঁতে-নোংরা দেওয়ালের গহ্বরে দু’টো নিষ্পাপ মুখ। একটি ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ও কোমল। পবিত্র গ্রন্থের পৃষ্ঠার মতো সুন্দর দু’টো চোখ এবং একজন অসহায় মা! ভাবছিল গল্পকার।
মেয়েটি বিছানা থেকে নেমে, অনেক কষ্টে বসে, গল্পকারের জুতায় হাত দেয়, ফিতা খুলে, জুতা-মোজা খুলে। তারপর একটা আধা-ভেজা-পরিষ্কার গামছা দিয়ে পা দু’টো যত্ন করে মুছে দেয়। ঠান্ডা পরশের আরামে চোখ দু’টো বুজে আসে আর গল্পকারের মনে পড়ে ছোট বোনদের স্মৃতি। শৈশব!
হঠাৎ গল্পকার ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়; বোন তোমার সম্মানি কত?
মেয়েটি মুখ নিচু করে আস্তে আস্তে জানায়, আপনের যা ইচ্ছা।
পাঁচশ টাকার একটা নোট তার হাতে গুঁজে দিয়ে গল্পকার ছিটকে বেরিয়ে আসেন। তবু তার দেহ-মনে লেগে থাকে বদ্ধ ঘরের মায়া আর সেই মা মা গন্ধটা!





























































