১৭ এপ্রিল ২০২৬
দ্য লিভিং কসমস
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
কৈজাশ কোয়েঝা
কবি ও গল্পকার
2353

কৈজাশ কোয়েঝা
কবি ও গল্পকার

2353

দ্য লিভিং কসমস

ফিসফাস শব্দ শোনা যাচ্ছে। এটি এখানকার প্রাত্যহিক ঘটনা। সমভূমি থেকে দেখলে মনে হবে বিরাটাকৃতির কতগুলো প্রাণ স্পন্দিত হচ্ছে, দুলে উঠছে স্বমহিমায়, স্বেচ্ছায়। এখানে কারও কোনো ফোড়ন নেই। কোনো অযাচার অঙ্গ-উপাঙ্গ নেই। চারপাশের ফিসফাসটা মৃদু থেকে মৃদুতর। এমন নৈসর্গিক আবহ প্ল্যান করে তৈরি করা যায় না। এমন একটা ছন্দ, যে ছন্দের আবির্ভাব বহু বহু শতাব্দীর ঘটনা। মেনচুই, রুংচিপা, পাঞ্জাই, গার্জিং — নগাচী গাছেদের সারি। নিজেদের অস্তিত্বে অপার অহমে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে পর্বতশ্রেণিসহ সমভূমিগুলোতে। শব্দটা একটা নগাচী গাছের দিক থেকেই আসছে। খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, পুরো ভূমিটা জুড়ে এক প্রশান্তির স্রোতধারা কতো ভেতর থেকে, কতো গভীর থেকেই না প্রবাহিত হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো শব্দ দিয়ে সে অবস্থান, স্থান বা সময়কে ব্যাখ্যা করা যায় না।

একজোড়া বার্গী পাখি নগাচি গাছের পাশে তিত্তি বেতের ঝোপটার উপরে বসা। পাশেই পাহাড়ের অন্তর্ভেদী উল্লাসের জলরাশি এক সনাতন সুরবল্লরী গেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে জীববৈচিত্র্যের প্রাণ-পদে। যেন অপার করুণার জলধারা তিরতির করে ছড়িয়ে যাবে পরমাপ্রকৃতির মূলাধার ভেদ করে। যেন কতশত নাম জানা-না জানা অণুজীব, পরাজীবের জীবনদায়িনী এ জলধারা।

সেই ঝর্ণার জলে অবগাহন করে তিত্তি বেতের ঝোপটাতে বসেছে বার্গীজোড়া। নগাচীর পাতার ফাঁক গলে একটা তির্যক কিন্তু দীর্ঘকায় সূর্যরশ্মি বেতের ঝোপটাকে আলোর পুলকে উদ্ভাসিত করে বিদীর্ণ করে দিয়েছে সবুজের কোমল নরম আভা। বেতের সবুজ যেন বন্দনা সংগীতে নিজের তারুণ্য-লাবণ্য সমর্পণ করে স্পষ্টতায়, স্বচ্ছতায় এলিয়ে আছে। ঠিক সেখানে বসে বার্গীজোড়া ফিসফাস করছে। অগাধ কথার এক মহাহিল্লোল যেন তাদের পেয়ে বসেছে। ব্রহ্মাণ্ডের কোনো প্রাণই এতো ব্যাকুলতা নিয়ে কথা বলেনি পূর্বে। পাখিজোড়া নির্ভার, নির্জলা মোহনীয়তায় সমগ্র অস্তিত্বের সুরে নিজেদের এলিয়ে দিয়ে আরও যুক্ত এক অনুরণন ঘটিয়ে ব্রহ্মাণ্ডকে পুলকিত করে তুলছে। এখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেও চতুর্পাশে যে অর্কেস্ট্রা চলছে, তা অনায়াসে ইন্দ্রিয়কে একই সুতায় গেঁথে ফেলবে। বিশেষ করে কানের যে প্রকৃত কাজ, তা অবধারিতভাবে সম্পাদিত হয়ে চলবে। আড়িউড়ি, নীলকণ্ঠ, ময়না, বাদোই, তিতির — আরও নানান পাখির আপন খেয়াল গাওয়ার শ্বাস নগাচী, বেতের লতার গুল্মের পাতায় অপূর্ব নাচন ধরিয়েছে। পাতাগুলো যেন এই মহাসুরে নিজেদের খোলস ভেঙে অভূতপূর্ব ধ্যানে নেচে চলছে। যেন কারও সাথে কারো লয়-তালের কোনো পতন নেই, বাঁধা নেই। সবাই সবাইকে এক অনন্য স্পেস দিয়ে রেখেছে। নাহ, ঠিক স্পেস না — এটা তাদের বৈশিষ্ট্য। ব্যাপারটা এতোটাই নান্দনিক, হারমনিক যে মনে হবে এমনই তো হয় প্রাণের বৈশিষ্ট্য। সেই ফিসফাস শব্দই শোনা যায়। ভূমির সুর, ভূমিসন্তানের অবারিত জীবনের সুর এটা। শুধুমাত্র ভূমিসন্তানের স্পন্দনে স্পন্দন যে প্রাণ মিলাতে পারবে, তারাই শুনবে এ স্রোতধারার প্রকম্পিত মাধুর্য। এই প্রকাশ জগতে আজ অধিকাংশ আবৃত। কিছু কিছু দেখা যায়, অনেকখানি দেখা যায় না। পৃথিবী সৃষ্টির আদিযুগে ভূমণ্ডল ঘন বাষ্প-আবরণে আচ্ছন্ন ছিল। তখন এখানে সেখানে উচ্চতম পর্বতের চূড়া অবারিত আলোকের মধ্যে উঠতে পেরেছে। আজকের দিনে তেমনি অধিকাংশ প্রকৃতি প্রচ্ছন্ন — আপন স্বার্থে, আপন অহংকারে, অবরুদ্ধ চৈতন্যে। যে সত্যে আত্মার সর্বত্র প্রবেশ, সেই সত্যের বিকাশ তাদের মধ্যে পরিণত, কখনো বা অপরিণত। তবুও যে চরাচরের বিষয়ে দাঁড়িয়ে আছি — এ চরাচর বঙ্গের অংশ। বহু বহু পূর্বে, ধরা যেতে পারে খ্রিষ্টপূর্বাব্দের তিন কি দুই শতক হবে।

দক্ষিণাঞ্চলের পর্বতশ্রেণির কথা। তখন ভূষণছড়া কিংবা লংগদুর অন্য নাম। এ ভূমি বহু পুরাকালের সাক্ষী বহন করেই সময়ের পাখায় ভর করেছে অজানার গহিন অরণ্যে।
বার্গীজোড়া পাখা ঝাড়া দিয়ে নিজেদের ছড়িয়ে দিয়েছে তিত্তি বেতের শাখা-প্রশাখায়। লোমকূপের প্রতিটি রন্ধ্রে ঢুকিয়ে নিচ্ছে রোদের একেকটি আলোকণা। এক এক করে, খুব যত্ন এবং আভিজাত্যের ভঙ্গিমায়, প্রত্যেক পালকে ঠোঁট লাগিয়ে বের করে নিচ্ছে শরীরের সমস্ত জড়া-জবড়জং অনুকম্পা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে যেন এক বহু সনাতন যোগের অংশ এ কাজ। শরীরকে অণু অণু করে খুঁটিয়ে দেখা প্রাচীন শাস্ত্রবিধি মোতাবেক এ অনায়াস সহজাত কর্ম। হঠাৎ একটি শব্দ হলো। ঘাড় সোজা করে সতর্ক দৃষ্টি — যতোটা দ্রুত করা যায়। পরক্ষণেই একটা হরিণছানা পায়ে একদল গুল্মের গিট লাগিয়ে খুঁড়িয়ে লাফাতে লাফাতে আসতে দেখা গেল। পাখিজোড়া অবস্থা নির্ণয় করে পূর্বের যোগে আবার মনোনিবেশ করেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন একটি বিরাট আকারের অবয়ব তার বিশাল ডানা ছড়িয়ে আছে এ মাতৃকা প্রকৃতির আদুরে বুকে। হরিণছানাটির চোখ দুটি বিশেষ লক্ষণীয়। এই যে সে গুল্মে গুল্মে জড়িয়ে হাচড়-পাচড় খাচ্ছে, এটা যেন তার নিত্য খেলা। এমন আনন্দের খেলা বোধহয় আর নেই। পাশেই একটা সদরক ফুলের ঝোপে নিজেকে ছেড়ে দিল হরিণছানাটি। এ ছানাটি বল্গাহরিণের প্রজাতি। আনন্দে উদ্ভাসিত চোখে সদরক ফুলের দিকে তাকিয়ে দেখছে একটি রঙিন পোকা। পোকাটি আকারে একটা ছোট কড়ির মতো। সারা গায়ে সবুজের প্রলেপ, তার উপর হালকা মেরুন ফোটা ফোটা দাগ। মনে হয় যেন যুদ্ধের বর্ম পরে আছে। ষোড়শপদী। বর্মের দুপাশ দিয়ে মিহি রেশম কাপড়ের মতো ছোট্ট দুটি পাখা। পাখা দুটি এতো দ্রুতগতিতে চলছে যা পৃথিবীর যেকোনো দ্রুতগতির মোটরকে হার মানাবে। পাখার এ ঘূর্ণন থেকে আবির্ভূত হচ্ছে এক মাদকীয় মন্দ্র সুর। এতো সূক্ষ্ম ও ক্ষুরধার সুর পৃথিবীর কারও দ্বারা তৈরি সম্ভব নয়। এ সুর প্রতিটি শ্বেত রক্তকণিকা, নিউরন, ডিএনএ সুতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মস্তিষ্কের প্রতিটি সেলকে সজাগ, সচেতন করে দেয়। হরিণছানাটি এ সুরঝংকারের বিহ্বলতার মহাউল্লাসে অনুরণিত হয়ে আছে। অগলক পাখির গগনবিদারী ডাক এ অরণ্যরাজি পর্বতশ্রেণির সমস্ত নীরবতাকে জাগিয়ে দিলো আবার। সে বলছে — তোমাদের বহু প্রাণের মহাহৃদয়ের ভেতরে আমিও আছি। শুনতে পাচ্ছো? আমার কাছে এসো। আমরা আরও গভীর অরণ্যের গহিনে যাই। ভূমি-উৎসারিত জীবনীরস খুঁজে আনি এবং ছড়িয়ে দেই ব্রহ্মাণ্ডের আগামী দিনগুলোর উদ্দেশ্যে — যারা এ প্রাণধারা থেকে চলে যাবে বহু বহু দূরের কোনো প্রতীকী পথে।

অগলক পাখিটি প্রখর গভীর অরণ্যে থাকে। সময়ে সময়ে ডেকে ওঠে। তবে অস্তমিত সময়কে দেখলেই সরব, সজাগ, সতেজ করা ডাকের বান নিয়ে সে গেয়ে ওঠে জীবনের অনুচ্চারিত প্রচ্ছন্ন শ্লোক। ডাকগুলো আগম-আরতি দিয়ে শুনলে ঠিক এমনটাই মনে হয়।

লোকটা প্রতিদিন আসে পূর্বের একটা কিয়াং থেকে। ছড়াটার পাশে একটা গর্জন গাছের নিচে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যানমগ্ন থাকে। অনেক সময় দেখলে এমন মনে হয়, ছড়ার সমস্ত জলগতিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে লোকটার সাথে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে

এ বিশাল বৃহৎ প্রকৃতিরাজির প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে আছে হাজারো কথা-গাঁথার প্রচুর প্রবল মহাল। সুউচ্চ পাহাড়ের কাঁধে দাঁড়ালে একজনকে প্রায়ই দেখা যায়। যে ছড়াটা ঠিক চেঙ্গি নদীর বহমান তলীয় স্রোতের অন্তরে প্রতি মুহূর্তে নতুনতর তাৎপর্যের মৈথুনে স্বস্ব ব্যস্ত, সে ছড়ার পাশে তাকে বসে থাকতে দেখা যায়। এ পার্থক্যে লোকটাকে দেখলে এমন অভিসম্ভাবী এক প্রাণ অবলোকন করা যায়, যে অবলোকিতেশ্বরের প্রব্রজ্যা পরিহিত। যে কথা বলে ছড়ার সাথে, জলের সাথে — সমস্ত প্রাণের হার্দিক হৃদয়ে তার বাস এবং প্রতিটি প্রাণ তার হৃদয়ে বাস করে। আজ লোকটাকে একটু বিচলিত, একটু চঞ্চল দেখায়। কী যেন খোঁজ করছে। কী এক অমোঘ টানের উপলব্ধি তাকে ভূমি থেকে শূন্যে ভাসিয়ে আবার ভূমিতে ফিরতে দিচ্ছে না। প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি পাতা, প্রতিটি রঙ-রূপ-জীবনের কাছে যেন তার প্রশ্ন। লোকটা প্রতিদিন আসে পূর্বের একটা কিয়াং থেকে। ছড়াটার পাশে একটা গর্জন গাছের নিচে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যানমগ্ন থাকে। অনেক সময় দেখলে এমন মনে হয়, ছড়ার সমস্ত জলগতিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে লোকটার সাথে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। অরণ্যরাজির সব পাখি, পশু, লতাগুল্ম, সুর-ছন্দ স্তূপাকৃতি হয়ে বসে গেছে ধ্যানে। নিজের অনন্ত গহিন সেলে ঢুকে গেছে। বুঝতে চেষ্টা করছে — কোথায়, কেন, কীভাবে এমন হয়। এমন মদোন্মত্ততা যেন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্ল্যাকহোল ঘুরে আবার ফিরতে হবে নিজের ভূমিতে, নিজের একান্ত চিত্তের বহমান মণিকোঠায়। এছাড়া যেন আর কোনো উপায় নেই। উপায় থাকে না।

আজকের চঞ্চলতা একটু ভিন্ন। এরকম প্রায়ই দেখা যায়। মনে হয় মাটি খুঁড়ে, প্রকৃতি খুঁড়ে, নিজের চৈতন্য খুঁড়ে বের করে নিয়ে আসবে আরও অসংখ্য নিজেকে। লোকটা ধীরে ধীরে একটা নগাচী গাছকে ধরে দাঁড়ালো। পিঠ গাছে ঠেকিয়ে গাছটার শ্বাস-প্রশ্বাস শুনবার চেষ্টা করলো বোধহয়। চোখ বন্ধ। দেখে মনে হবে কিছু কথা গাছ বিড়বিড় করছে, সে শুনতে পাচ্ছে। এ গাছ বহু প্রাচীন কথকথার একটি বয়ানকারী। বহু বহু শতাব্দীর স্মৃতি থেকে, স্পষ্ট দেখা থেকে বর্ণনা করবে যেন। এ বিশাল অরণ্যরাজির সহস্র শতাব্দীর ইতিহাস বর্ণনা করবে। লোকটা এবার নিজের হৃদপিণ্ডের স্বচ্ছ সহজ তরঙ্গ বৃহদাকার গাছটির কোষের সাথে সংযোগ ঘটালো। এমনভাবে ঘটালো যেন সুতীক্ষ্ণ সূক্ষ্ম ফাঁক নেই, যেন এক হয়ে মিশে গেছে। লোকটি অনুভব করলো পরমাপ্রকৃতির অপার অনুরণন। এতো গভীর, এতো আনন্দময়তা এর আগে কখনো তার অনুভূত হয়নি। গাছের শরীরের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় যত প্রাণ হাঁটাচলা করছে — যত জীব, অনুজীব, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ফোটা ফুল, পাখি, ফল — গাছটির গায়ে যা যা আছে, যতো আগাম ভূত-ভবিষ্যৎ জানা, যেন সে সব বুঝতে পারছে, হৃদয়াঙ্গম করতে পারছে। কতোটা ধীমান, স্থিতধী হলে এতোসব ধারণ করা যায়, লোকটি যেন সব বুঝতে পারছে। গাছটির শিরে যে একগোছা বাহারি রঙের ফুল — যা সূর্যের আলোয় পাপড়িগুলো ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হচ্ছে, আর সেখান থেকে এমন এক অজানা মোহনীয় মাদকীয় সৌরভ বাতাসের সর্বাঙ্গে ঢুকে যাচ্ছে এবং বাতাস বলে যাচ্ছে সর্বত বার্তাধ্বনি। এই যে আলাপন, এ আলাপনে তৈরি হচ্ছে মধুর সঙ্গীত। এ এমন এক সঙ্গীত যা শুধু এ নগাচীর ফুল ফুটলেই তৈরি হয়। লোকটা তার বিমোহিত অস্তিত্ব দিয়ে সব সব শুষে নিচ্ছে, টের পাচ্ছে সমস্ত অণু-পরমাণু দিয়ে। গাছটি পরম আদরে যেন লোকটির বিমুগ্ধ বিমোহিত অস্তিত্বে নিজের মৈত্রী-মৈথুনের পরাভব স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

গাছটি এবার মন্দ্র স্বরে বলে উঠলো —
যে ভূমিতে তুমি দাঁড়িয়ে আছো, বা তোমার চরাচর বা আমাদের — তুমি কি জানো কতশত মহীরুহ চিন্তার সম্মিলন শুরু থেকেই এ ভূমিকে আপন আয়ু ক্ষয় করে প্রাণদান করে গেছে? কতশত সহস্র শতাব্দীর পূর্বের এসব কথা?
লোকটি বললো — জানাও!
গাছটি বলা শুরু করলো —
বহু যুগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এ ভূমির একদল নিশ্চিত হয়েছেন যে মহাবিশ্বের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় শক্তি ক্ষুদ্র মানবদেহেই বিদ্যমান রয়েছে। মানুষই সৃষ্টির চূড়ান্ত রূপ, তাই মানুষকে বুঝতে পারার মাধ্যমে মহাবিশ্ব সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান লাভ করতে হবে। এ লক্ষ্যে শব্দের শক্তি (মন্ত্র), রূপ, বর্ণ, আকৃতি (যন্ত্র) নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানব ও প্রকৃতির বিভিন্ন দিকের ওপর তাদের প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা প্রাণিকুল, ঔষধি জিনিসপত্র এবং খনিজ পদার্থের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যসমূহ অধ্যয়ন করেছেন এবং মন্ত্র ও যন্ত্রকে সক্রিয় করে মনের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করার উপায় খুঁজে বের করেছেন। এ পদ্ধতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাধনায় সিদ্ধি লাভ — এই সাধনা কোনোভাবেই প্রার্থনা-পূজা-উপাসনা নয়, বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অধ্যয়ন ও অনুশীলনের মাধ্যমে জাগতিক সাফল্য অর্জনের সঙ্গে যুক্ত।

এবং এখানে পালকাপ্য মুনি একাত্মতা করেছেন হস্তির সাথে। বৃহৎ অরণ্যরাজির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুঁ মেরেছেন। তাদেরই পাশে, তোমার পাশে পাবে মহাচার্য কপিল মুনিকে। যাঁদের তুখোড় চিন্তার আলোকচ্ছটায় এ মুহূর্তে আমরা ও তুমি একজন অন্যজনের কোষে কোষে একাকার হয়ে আছি।

লোকটি স্পষ্ট দেখতে পেল — একদল ম্যামোথের বিশাল পাল। নাদধ্বনি দিয়ে হেঁটে চলেছে। পালের সমস্ত হস্তীর দৃষ্টিতে পেছনের কোনো একটা কিছুর নির্দেশ আছে। শত হাতির পেছনে একটি হাতির পিঠে একজন সুদর্শন যুবক বসে আছে। যুবকটির হাতে একটি হাড়ের অঙ্কুশ। কিন্তু অঙ্কুশের আগায় কোনো ধারালো আংটা নেই। এ অঙ্কুশ আঘাত করবার জন্য নয়। এটি মূলত যুবকটিকে সমস্ত প্রাণের একতাকে ধারণ করবার ইঙ্গিত দেয়। খুব যত্নের প্রবীণ একটি মৃত হস্তির শরীর থেকে খুলে রাখা স্মারক এ হাড়। বিস্তৃত অরণ্যরাজির সমস্ত হস্তীকুল যেন এ যুবকের মস্তকমণি। এবং এ হাড়টি একই সাথে পরমাপ্রকৃতির পরিবর্তনের অমোঘ চিহ্নও। যুবকটির দেহসৌষ্ঠব, মুখভঙ্গি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে — শুধু হস্তীকুল নয়, এ ভূমির প্রতিটি স্তরের সঙ্গে, শৃঙ্খলের সঙ্গে তার কতোটা নিবিড় অন্তরঙ্গতা।

গাছটি বলে উঠলো — হ্যাঁ, তুমি যা ভাবছো তা সঠিক। সেই হস্তিকুলের পরম বন্ধুকেই তুমি দেখলে।
আমরা আমাদের ধীর দিশায় সমস্ত আগাম-নিগম, ভূত-ভবিষ্যৎ, জড়া, শোক, রোগ — সমস্তই টের পাই। আমাদের এ অরণ্যভূমিতে আড়ারকলম, পঞ্চশিখ সকলেই ধ্যানী ছিলো। তাদেরই মুখনিঃসৃত চিন্তারাজ্য — তন্ত্র, সাংখ্য, যোগ। যা আমরা প্রথমেই বলে নিয়েছি। যাদের কথা আরও বলবো। এমন সব কথা যে সব কথা সকলের, যে সব কথা ভবিষ্যৎ ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি প্রাণের। আজ হতে যতো কোটি বছরই তুমি অগ্রগামি থাকো না কেন, এ ভূমির মূল আধার দিয়ে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর গতি, প্রকৃতি, প্রযুক্তি নির্ধারিত হবে। এখনও হচ্ছে। অন্যরূপে, অন্যভাবে — কিন্তু তা সেই তন্ত্র, যোগ, সাংখ্য চিন্তারই সারাৎসার।

লোকটি এবার অবলোকন করলো এ ভূমির সেইসব সন্তানদের যারা ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর ইতিহাসকে কতোটা পাল্টে দিলো, কতোটা উসকে দিলো। সেইসব সন্তানদের যারা এ মাটির বুকে আজ স্মৃত ও বিস্মৃত এবং ভবিষ্যতে যারা স্মৃত ও বিস্মৃত হবে। যারা কখনো ভোগ করেনি, ত্যাগের এক একটি স্তূপায় দাঁড়িয়ে এ ভূমিকে পলিলায়িত করে গেছেন। চেঙ্গির কলকল প্রবহমান টের পাচ্ছে। কত মানুষের, কত প্রাণীরই জীবন-মরণ, বেড়ে ওঠা এ নদীর কূলে। চেঙ্গি অসংখ্য চড়াই-উতরাই পার হয়ে মিশে গেছে কর্ণফুলীর ভোলা জলে। কর্ণফুলী আবার বহমান সমুদ্রাভিমুখে। গাছের কাণ্ডে একটা পাখি দূর পাহাড় থেকে এসে বসেছে। গাছটা যেন পাখিটার সমস্ত ওড়াউড়ির ক্লান্তি শুষে নিচ্ছে। এ বিষয়টা লোকটা টের পাচ্ছে। সমস্ত অবসাদ-ক্লান্তি শুষে নিয়ে পাখিটাকে এক নির্ভয় আশ্রয় দিয়েছে। লোকটা বুঝতে পারলো, যখনই গাছের সাথে কোনো প্রাণের সংযোগ হয়, তখনই ঐ প্রাণ এবং গাছের স্পন্দন এক হয়ে ওঠে। গাছটি সম্পূর্ণভাবে এ সংযোগ স্থাপন ঘটায়। লোকটি নানা বিষয় বুঝতে পারছে, দেখতে পারছে এমন অনেক অজানা দৃশ্য যা সে খুঁজছিলো। যা খুঁজবার জন্য সে সদা প্রস্তুত ছিলো। বঙ্গের এমন সব ভূমিসন্তানদের খোঁজ এখানে পাওয়া যায় যাদের বিস্তৃতি বহু বহু বহু শতাব্দীর পূর্বের। যখন পৃথিবীর অনেকাংশ অন্ধকার, তারও বহু আগে এ অঞ্চলের সন্তানেরা পরমাপ্রকৃতির প্রাণ-ভোমরার হদিস জানতো। যেকোনো সময়ে যে কেউ জানতে পারবে, যদি কেউ এ পরমাপ্রকৃতির ভেতরে নিজেকে সংযোগ করাতে চায় বা পারে। এখানের প্রতিটি প্রাণ সে সাক্ষী বহন করে। এ প্রকৃতির বৃক্ষ, লতাগুল্মের প্রতিটি দানায়, পাখি, নদী-নালায়, প্রতিটি স্পন্দনে সেসব ভূমিসন্তানদের চিহ্ন লেগে আছে। যে কেউ যেকোনো সময় তা দেখার ক্ষমতা রাখে।

সব সবই যেন লোকটি অনুভব করছে সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে। সেই তন্ত্র থেকে বুদ্ধের প্রতীত্যসমুৎপাদ, বুদ্ধ থেকে সে নিজে — সমগ্র অনিত্যতার, পরিবর্তনের স্রোতধারাকে লোকটি নিয়ে চলে যাচ্ছে সে সুউচ্চ পূর্বের পাহাড়টায়। সমভূমি থেকে দেখলে মনে হয় এ পাহাড়টাতে সূর্য ঘুমায়

লোকটি এবার অনুভব করলো আরও বিস্তারিত কিছু বিষয়। মনশ্চক্ষু দিয়ে আবছা দেখলো যেন।

অনুভূতিটা অনেকটা এমন যে, জন্মমুহূর্তেই স্থান গ্রহণ করেন মহাযুগে, চলমান কালের অতীত কালেই তাঁরা বর্তমান, দূরবিস্তীর্ণ ভাবী কালে তাঁরা বিরাজিত। দূর থেকে সমুদ্র পার হয়ে একজন দরিদ্র মৎস্যজীবী এসেছে কোনো দুষ্কৃতির অনুশোচনা করতে। সায়াহ্ন উত্তীর্ণ হলো, নির্জন নিঃশব্দ মধ্যরাত্রিতে সে একাগ্রমনে করজোড়ে আবৃত্তি করতে লাগল — আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম। কতশত শতাব্দী হয়ে গেছে — একদা শাক্যরাজপুত্র গভীর রাত্রে মানুষের দুঃখ দূর করবার সাধনায় রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে বেরিয়েছিলেন; আর সেদিনকার সেই মধ্যরাত্রে দূর থেকে এলো তীর্থযাত্রী, গভীর দুঃখে তাঁরই শরণ কামনা করে। সেদিন তিনি ঐ পাপপরিতপ্তের কাছে পৃথিবীর সকল প্রত্যক্ষ বস্তুর চেয়ে প্রত্যক্ষতম, অন্তরতম — যা ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে ঐ মুক্তিকামীর জীবনের মধ্যে। সেদিন সে আপন মনুষ্যত্বের গভীরতম আকাঙ্ক্ষার দীপ্তশিখায় সম্মুখে দেখতে পেয়েছে তাঁকে যিনি প্রাণোত্তম। যে বর্তমান কালে বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল, সেদিন যদি তিনি প্রতাপশালী রাজরূপে, বিজয়ী বীররূপেই প্রকাশ পেতেন, তাহলে তিনি সেই বর্তমান কালকে অভিভূত করে সহজে সম্মান লাভ করতে পারতেন; কিন্তু সেই প্রচুর সম্মান আপন ক্ষুদ্র কালসীমার মধ্যেই বিলুপ্ত হতো। প্রজা বড়ো করে জানতো রাজাকে, নির্ধন জানতো ধনীকে, দুর্বল জানতো প্রবলকে — কিন্তু মনুষ্যত্বের পূর্ণতাকে সাধনা করছে যে মানুষ, সেই স্বীকার করে, সেই অভ্যর্থনা করে মহানমানবকে। মানবকর্তৃক মহামানবের স্বীকৃতি মহাযুগের ভূমিকায়। তাই আজ বুদ্ধকে দেখছি যথাস্থানে মানব মনের মহাসিংহাসনে, মহাযোগের বেদীতে — যার মধ্যে অতীত কালের মহৎপ্রকাশ বর্তমানকে অতিক্রম করে চলেছে। আপনার চিত্তবিকারে, আপন চরিত্রের অপূর্ণতায় পীড়িত মানুষ আজও তাঁরই কাছে বলতে আসছে — বুদ্ধের শরণ কামনা করি। এই সুদূর কালে প্রসারিত মানবচিত্তের ঘনিষ্ঠ উপলব্ধিতেই তাঁর যথার্থ আবির্ভাব।
লোকটির সমস্তই যেন উদ্ভাসিত।

গাছটি বললো —
সাধারণ লোক পরস্পরের যোগে আপনার পরিচয় দিয়ে থাকে; সে পরিচয় বিশেষ শ্রেণির, বিশেষ জাতির, বিশেষ সমাজের। পৃথিবীতে এমন লোক অতি অল্পই জন্মেছেন যাঁরা আপনাতে স্বতই প্রকাশবান, যাঁদের আলোক প্রতিফলিত আলোক নয়, যাঁরা সম্পূর্ণ প্রকাশিত আপন মহিমায়, আপনার সত্যে। মানুষের খণ্ড প্রকাশ দেখে থাকি অনেক বড়ো লোকের মধ্যে; তাঁরা জ্ঞানী, তাঁরা বিদ্বান, তাঁরা বীর, তাঁরা রাষ্ট্রনেতা; মানুষকে চালনা করেছেন আপন ইচ্ছামতো; তাঁরা ইতিহাসকে সংঘটন করেছেন আপন সংকল্পের আদর্শে। কেবল পূর্ণ মনুষ্যত্বের প্রকাশ তাঁরই, সকল দেশের সকল কালের সকল মানুষকে যিনি আপনার মধ্যে অধিকার করেছেন, যাঁর চেতনা খণ্ডিত হয়নি মুহূর্তেও।
দেখো — চক্ষু অধোনিমিলিত করে দেখো। প্রাণ, মন, কায় ব্যাপ্ত করে দেখো সেইসব যা কখনো কেউ দেখেনি।

লোকটি দেখছে, উপলব্ধি করছে সমস্তই। দেখছে —
বুদ্ধ কীভাবে ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে ব্যাপ্ত হলো দেশে দেশান্তরে। বৃহৎ বঙ্গ তীর্থ হয়ে উঠল, অর্থাৎ স্বীকৃত হলো সকল দেশের দ্বারা, কেননা বুদ্ধের বাণীতে বাংলা সেদিন স্বীকার করেছে সকল মানুষকে। সে কাউকে অবজ্ঞা করেনি, এইজন্যে সে আর গোপন রইল না। দুস্তর গিরিসমুদ্র পথ ছেড়ে দিলো অমোঘ সত্যবার্তার কাছে। দূর হতে দূরে মানুষ বলে উঠলো, মানুষের প্রকাশ হয়েছে। এই ঘোষণাবাক্য অক্ষয় রূপ নিল। মরুপ্রান্তরে প্রস্তরমূর্তিতে অদ্ভুত অধ্যবসায়ে মানুষ রচনা করলো বুদ্ধ-বন্দনা — মূর্তিতে, চিত্রে, স্তূপে। মানুষ বলেছে, যিনি আলোকসামান্য, দুঃসাধ্য সাধন করেই তাকে জানাতে হবে ভক্তি। অপূর্ব শক্তির প্রেরণা এলো তাদের মনে; নিবিড় অন্ধকারে গুহাভিত্তিতে তারা আঁকলো ছবি, দুর্বহ প্রস্তরখণ্ডগুলোকে পাহাড়ের মাথায় তুলে তারা নির্মাণ করলো মঠ, শিল্পপ্রতিভা পার হয়ে গেল সমুদ্র, অপরূপ শিল্পসম্পদ রচনা করলো, শিল্পী আপনার নাম করে দিলো বিলুপ্ত।

তার প্রত্যেকটিতে আছে কারুনৈপুণ্যের উৎকর্ষ; কোথাও লেশমাত্র আলস্য নেই, অনবধান নেই — একে বলে শিল্পের তপস্যা, একই সঙ্গে এই তপস্যা ভক্তির — খ্যাতিলোভহীন নিষ্কাম কৃচ্ছসাধনায় আপন শ্রেষ্ঠ শক্তিকে উৎসর্গ করা চিরবরণীয়ের, চিরস্মরণীয়ের নামে। কঠিন দুঃখ স্বীকার করে মানুষ আপন ভক্তিকে চরিতার্থ করেছে; তারা বলেছে — যে প্রতিভা নিত্যকালের সর্বমানবের ভাষায় কথা বলে, সেই অকৃপণ প্রতিভার চূড়ান্ত প্রকাশ না করতে পারলে কোন উপায়ে যথার্থ করে বলা হবে ‘তিনি এসেছিলেন সকল মানুষের জন্যে, সকল কালের জন্যে?’ তিনি মানুষের কাছে সেই প্রকাশ চেয়েছিলেন যা দুঃসাধ্য, যা চিরজাগরূক, যা সংগ্রামজয়ী, যা বন্ধনচ্ছেদী। তাই সেদিন পূর্ব মহাদেশের দুর্গমে দুস্তরে বীর্যবান নিষ্ঠার আকারে প্রতিষ্ঠিত হলো তাঁর জয়ধ্বনি — শৈলশিখরে, মরুপ্রান্তরে, নির্জন গুহায়। এর চেয়ে মহত্তর অর্ঘ্য এলো বুদ্ধের পদমূলে যেদিন রাজাধিরাজ অশোক শিলালিপিতে প্রকাশ করলেন তাঁর পাপ, অহিংসার মহিমা ঘোষণা করলেন, তাঁর প্রণামকে চিরকালের প্রাঙ্গণে রেখে গেলেন শিলাস্তম্ভে। এতো বড়ো রাজা কি জগতে আর কোনোদিন দেখা দিয়েছে? বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এ ধরাতল।

লোকটির চোখের সামনে ঘটছে যেন সব। নগাচির গায়ে বাতাসের দোলা লাগলো — মৃদু শীতল বাতাস। ঝর্ণা-ঝিরির অন্তর্গত উৎসবের ঝংকার এ বাতাস। নগাচী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে পূর্বের দিকে, যে পাহাড়ের চূড়ায় লোকটা থাকে, যে দিকে তাকে দেখা যায় প্রায়ই, সে পথে হাঁটা শুরু করেছে। শরীরটা যেন এক নতুন শরীর পেয়েছে। মস্তিষ্ক, শিরা-উপশিরায়, তার চতুর্পাশ যেন সংযুক্ত। সে যেমন একটি জলকণাকে অনুভব করতে পারছে, তেমনি সে বিগত এক হাজার লক্ষ বছর পূর্বের পদচিহ্নে, পদছাপে পা রেখে চলতে পারছে। এবং দেখতে পারছে ভবিষ্যৎ পদচারণার জন্য কিরকম ভূমির প্রয়োজন।

এইতো অশোক এখানকার জলরাশিতে নিজের ক্লান্তি ঘুচিয়ে, তৃষ্ণা মিটিয়েছে। অশোক দূতেরা চেঙ্গির পার্শ্ববর্তী ছড়াগুলোর গাছ থেকে ফলমূল সংগ্রহ করেছে। সব সবই যেন লোকটি অনুভব করছে সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে। সেই তন্ত্র থেকে বুদ্ধের প্রতীত্যসমুৎপাদ, বুদ্ধ থেকে সে নিজে — সমগ্র অনিত্যতার, পরিবর্তনের স্রোতধারাকে লোকটি নিয়ে চলে যাচ্ছে সে সুউচ্চ পূর্বের পাহাড়টায়। সমভূমি থেকে দেখলে মনে হয় এ পাহাড়টাতে সূর্য ঘুমায়। ঝিরি-ছড়া, ঝর্ণা, পাখি, ফুল, প্রকৃতির উন্মাতাল ছন্দে ঘুম ভেঙে গেলে ঐ পুবের পাহাড়ের সিথান থেকে সূর্য মাথা তোলে। এ চরাচরকে তার সাথে টেনে নিয়ে চলে আবার অস্তাচলে, নতুন কোনো ঘূর্ণনের প্রারম্ভে।

6 Comments. Leave new

  • নাহার
    17 April 2026 11:48 pm

    লেখাটি এক ধরনের ধ্যানের মতো। প্রকৃতি, সময় আর চেতনার যে মেলবন্ধন এখানে তুলে ধরা হয়েছে, তা ভীষণ মুগ্ধকর। যা এক ধরণের অন্তর্দর্শনের দরজা খুলে দেয়।
    লেখকের জন্য শুভকামনা!

    Reply
    • কৈজাশ কোয়েঝা
      23 April 2026 12:32 am

      প্রিয় পাঠক, ভালোবাসা জানবেন…

      Reply
  • Rabioul Alam Nabi
    22 April 2026 9:24 pm

    কী ঝরঝরে গদ্য! কল্পনাশক্তির কী বিপুল বিস্তৃতি! চিরপুরাতনকে পুরাণ থেকে টেনে বের করে নূতনভাবে উপস্থাপন! বিমুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে পাঠ শেষ হলো।

    Reply
    • কৈজাশ কোয়েঝা
      23 April 2026 12:31 am

      প্রিয় পাঠক, ভালোবাসা জানবেন।

      Reply
  • Arny Tasmira
    25 April 2026 10:58 am

    একটি শব্দ আরেকটি শব্দে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কী চমৎকার শব্দের গাথুনী, কী অপরূপ চিত্রকল্পের ব্যবহার যেন পাহাড় ময়না তিতির হরিণ ছানা রঙিন পোকা সবটাই অন্তর নয়নে ভেঁসে উঠলো।

    Reply
  • কৈজাশ
    25 April 2026 5:08 pm

    পাঠক আপনাকে ধন্যবাদ…

    Reply

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত