১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
অলংকরণ :
রাজীব দত্ত
রোমেল রহমান
কবি ও গল্পকার
116

রোমেল রহমান
কবি ও গল্পকার

116

সবুজ আপেল

সুরাইয়া নার্গিসকে দেখতে এক বা দেড় কেজি আপেল নিয়ে আসে তার ভাসুরের বউ! সুরাইয়া নার্গিসের বয়স ৬৫ এবং তার ভাসুরের বউ যার নামও নার্গিস তার বয়স ৭০! ফলে তারা একজন অন্যজনকে আপনি এবং তুমি বলে সম্বোধন করে। সুরাইয়া নার্গিস মস্তিকের অসুখে আক্রান্ত থাকায় কাউকে ঠিকঠাক চিনতে পারেন না! নিয়মিত তার চারপাশে যারা থাকে তাদেরকে তিনি চিনতে পারেন, এবং তাদের খোঁজ খবর নেন যে, অমুক খাইছে কিনা… তমুক অফিস গেছে কিনা… নমুক ঘুমাইছে কিনা… কিংবা টমুক ফিরছে কিনা ইত্যাদি! স্মৃতি তার মস্তিকে আছে কিংবা নাই অথবা তালগোল পাকায় আছে; নাকি স্মৃতি তার ডুবো চরের মতন? যার ফলে কিনা প্রায় প্রায় স্মৃতি জেগে ওঠে! যেমন সেদিন সে বলে ওঠে, ইলিশ মাছ দিয়া ভাত খাবে! ফলে তার ছোট পুত্র কিংবা পুত্রবধূ ইলিশ মাছ কিনতে বাজারে যায় এবং বাড়ি ফিরে যখন জিজ্ঞেস করে, আম্মা মাছ কি কড়কড়া কইর‍্যা ভাইজ্যা দিবো নাকি সরিষা ইলিশ করবো নাকি ঝাল মশলা দিয়া ভুনা করবো নাকি কাঁচকলা দিয়া পাতলা ঝোল কইরা দিবো? এতো লম্বা প্রশ্ন শুনে সুইরাইয়া নার্গিস বলে ওঠে, কিসের মাছ? তার পুত্রবধূ কিংবা পুত্র বিস্ময় নিয়ে বলে, ক্যান ইলিশ মাছ? ইলশা মাছ দিয়া ভাত খাবা বল্লা না এট্টু আগে? সুরাইয়া নার্গিস হয়তো মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন, আমি কি মাছ খাই? পাগলের মতন কথা কইস ক্যান? ফলে হতাশ কিংবা অভ্যস্ত তার পুত্র এবং পুত্রবধূ রান্না ঘরের দিকে যায় ইলিশের নিয়তি সাব্যস্ত করতে!

এর কিছুদিন পর বড় নার্গিস অর্থাৎ সুরাইয়া নার্গিসের ভাসুরের স্ত্রী অর্থাৎ যার নামও নার্গিস তিনি আসেন এক বা দেড় কেজি আপেল সহ সুরাইয়া নার্গিসকে দেখতে! এবং আশ্চর্য বিষয় সুরাইয়া নার্গিস অর্থাৎ ছোট নার্গিস তাকে ঠিকঠাক মনে করতে পারে এবং তাকে বলে, বসেন! তারপর বড় নার্গিস স্মৃতি তর্পণ শুরু করে, তাদের যৌবন এবং মধ্য বয়স কিংবা সংসার শুরুর দিনগুলোর নানান হাসি কান্নার ফিরিস্তি যাপনের পর বড় নার্গিস কান্না জড়িত কণ্ঠে ছোট নার্গিসকে জড়িয়ে ধরে এবং বলে, আর দেখা হয় কিনা জানি না বয়স তো কম হইল না আমাদের! ছোট নার্গিস বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, মরলে আপনি মরেন, আমারে টানেন ক্যান!? ফলে উপস্থিত সবাই টাস্কি খায়! এবং বাড়ির ছোট বউ খিলখিল করে হেসে ফেলে এবং ব্যাপারটা হাল্কা হয়ে যায় এই জন্য যে সবার মনে পড়ে, সুরাইয়া নার্গিসের মস্তিষ্কে আজকাল ব্যামো! ফলে বড় নার্গিস বিদায় নেবার পর, সুরাইয়া নার্গিসের স্বামী তার ভাবির আনা প্যাকেট খুলে দেখতে পায় আপেল! ফলে সে একটা আপেল বের করে বাথরুমের দিকে যায় এবং একটু পর ধুয়ে এনে সুরাইয়া নার্গিসকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, খাও! সুরাইয়া নার্গিস বলে, সরো দিনি! আমি কি এই আপেল খাই? ফলে সবার তখন মনে পড়ে যে সুরাইয়া নার্গিস সবুজ আপেল ছাড়া খান না! ফলে সুরাইয়া নার্গিসের স্বামী তার পুত্রবধূদের মধ্যে আপেল বাটোয়ারা করে দেয় এবং একটা আপেল কাজের মেয়েটাকে দিয়ে বলেন, নে খা! এবং হাতে থাকা ধোয়া আপেলটা তিনি নিজে কচকচ শব্দে খেতে খেতে বলেন, বালে স্বাদ নাই! ফলে সুরাইয়া নার্গিসের বড় পুত্র তার ঘরে আপেল নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে না ধুয়েই খেতে শুরু করে এবং তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে, চাষের আপেল, স্বাদ কম! মিষ্টি না। ফলে তার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলে, ফাউ জিনিসে মধু খুঁজতি নেই, যা পাইছো খাও! তারপর বড় পুত্রের স্ত্রী মোবাইল টিপতে টিপতে বলে, তোমার মা পাগল হলি কি হবে আসল ঠিক আছে, দেহো না সবুজ আপেল ছাড়া খাই না, এইটে ঠিক মনে আছে! পাগল না ঢং! শেষ বাক্যে তীব্র শ্লেষ উচ্চারণে বড় পুত্র অর্থাৎ বড় পুত্রবধূর স্বামী আপেল চাবাতে চাবাতে থেমে কিঞ্চিত হা হয়ে তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে! স্ত্রী দ্বিগুণ বিরক্তি নিয়ে বলে, খাও দিনি বাড়া! বালের এক আপেল নিয়ে নক্সা! বলেই সে দপ্‌ করে ক্ষেপে আচানক ছুঁড়ে ফেলে দেয় বাকি আপেল গুলো মেঝেতে! ফলে ঘটনার আকস্মিকতায় কিংবা অযথা এইসবের জন্য তাব্দা খেয়ে যায় বড় পুত্রে এবং সে বলে ওঠে, এগুলা কি হইলো? বড় পুত্রবধূ বলে, চোখ নেই দেখতিছো না? ভুদার আপেল নিয়ে আদিখ্যেতা! বড় পুত্র আহত চোখে বলে বসে, তোমার বাড়ির কেউ আনলি কি তুমি ফেইলে দিতা? ব্যাস, এই বাক্যের পর আগুন লেগে যায় সংসারে! বড় পুত্রবধূ বলে ওঠে, ক্যান আমার বাড়ির লোক আনে নাই? কী আনে নাই ক? খালি আপেল হাতে আইছে কোনদিন? দুই তিন পদের নিচে আনিছে কিছু কোনোদিন? তোগে মতন ফকির নাকি? এইসব বাক্যবাণে বড় পুত্র আংশিক আপেল হাতে হা হয়ে থাকে! এবং তার মস্তিষ্ক ঘটনার আগামাথা কিংবা পেটি কিছুই বুঝতে সফল হয় না! কিন্তু তালাশ করতে থাকে এখানে তার ভূমিকা কি বা কেন এমন হচ্ছে অথবা কারণ কি এই ক্ষোভের?

সুরাইয়া নার্গিসের স্বামী তার পুত্রবধূদের মধ্যে আপেল বাটোয়ারা করে দেয় এবং একটা আপেল কাজের মেয়েটাকে দিয়ে বলেন, নে খা! এবং হাতে থাকা ধোয়া আপেলটা তিনি নিজে কচকচ শব্দে খেতে খেতে বলেন, বালে স্বাদ নাই!

ঠিক একই সময়ে অন্য ঘরে মেজো পুত্র এবং মেজো পুত্রবধূরাও আপেল নিয়ে ব্যস্ত! মেজোপুত্রবধূ তাদের ভাগের আপেল গুলো একটা গাম্লার জলে ছেড়ে দিতে দিতে বলে, দেখিছো তোমার বাপ বুড়ো হলি কি হবে আসল ঠিক আছে! বলি না যে ছোট ছেলে আর ছেলের বউরে বেশি ভালোবাসে? দেখিছো বড় আপেল গুলোন অগেরে দেছে! বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে মেজো পুত্র বলে ওঠে, কি বলো আউল ফাউল? ছোটরে তো আরও কম আপেল দেলো আব্বা! দুইটে দেলো, আমাগে সবাইরে তিনটে কইরে দেছে! মেজো পুত্রবধূ বলে ওঠে, সেইটে যদি বোঝার ক্ষমতা তোমার থাকতো তাইলে তুমি আইজকে বাপের লুঙ্গি ধইরে এইখানে বইসে থাইক্তে না! মেজো পুত্র বলে ওঠে, মানে কি? তখন মেজো বধূ বলে ওঠে, ওগের দুইটে চাইটে আপেলের সমান! মেজো পুত্র টাস্কি খেয়ে তাকিয়ে পড়ে বউয়ের যুক্তি শুনে! তখন মেজো বধূ বলে, সব গেঞ্জামের মূল হচ্ছে তোমার মা! মেজো পুত্র বলে, মানে? তখন তার স্ত্রী বলে, উনি আপেল খালি তো আর গেঞ্জাম লাগতো না! আমাগেও ভাগ কইরে দেতো না! তখন মেজো পুত্র বলে ওঠে, তোমার সমস্যা কি? খামাখা প্যাঁচাচ্ছ ক্যান? মেজো পুত্রবধূ ছুরি দিয়ে আপেল কাটতে কাটতে বলে, প্যাঁচাই কি আর সাধে? একটু শান্তির জন্যই প্যাঁচাই! তাও তোমার সহ্য হয় না, নেও খাও আপেল! এবং তারা দুজন আপেল খেতে থাকে! যদিও মেজো পুত্র ভ্রু কুঁচকে এইসবের কার্যকারণ তালাশ করতে থাকে এবং মেজো পুত্রবধূ সেটা টের পেয়ে আড় চোখে তাকিয়ে নিজের স্বামীকে দেখে আর মজা নেয়!
ঠিক একই সময়ে সুরাইয়া নার্গিসের ছোট পুত্রের ঘরে দেখা যায় ছোট পুত্রের স্ত্রী একজোড়া আপেল হাতে ঘরে ঢুকছে, তার স্বামী অর্থাৎ ছোট পুত্র দেয়ালে পা ঠেকিয়ে চিৎ হয়ে ছিল এবং স্ত্রীর প্রবেশে সে জিজ্ঞেস করে, চাচি গেছেন? ছোট বধূ বলে, হ্যাঁ! তুমি তো সামনে গেলা না! তোমার কথা কচ্ছিলো! ছোট পুত্র বউয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাগের আপেল? বউ হেসে দিয়ে বলে, হু! আব্বা দিলো! নেও! ছোট পুত্র বলে, নাহ! ভাল্লাগে না আমার ফলটল! তার স্ত্রী অর্থাৎ ছোট বধূ বলে, সিংগারা পুরি হলি তো কপাকপ খাতা! ছোট পুত্র বলে, তুমি খায়ে ফেলাও! তখন ছোট পুত্রবধূ বলে, উঁহু! দেখলিই আমার মনে হচ্ছে ফরমালিন ফরমালিন! ছোট পুত্র বলে, ও খালি কিচ্ছু হয়না! এহন মেডিসিন ছাড়া কিচ্ছু নেই! ধুইয়ে খাও! কিন্তু তার স্ত্রী ফল দুটো টেবিলে রেখে দেয়! তখন ছোট পুত্র বলে, না খালি নেলা ক্যান? কাজের মেয়েটারে দিয়ে দিতে? ছোট বউ বিরক্তি নিয়ে বলে, না নিয়ে উপায় আছে? তোমার বাপ ক্যাঁক কইরে ওঠতো না? তার উপর না নিলি আবার অন্য দুজন নেকি কথা শুনোয় দেতো! ফলে ছোট পুত্র আসন্ন কড়া কথার জোয়ার ঠেকাবার জন্য বউকে বলে, একটা আপেল ধুইয়ে আনো দিনি? স্ত্রী তার বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বলে, এসব বিদেশি ফল খাওয়ার চাইয়ে পেয়ারা, বাতাবি লেবু, পেঁপে টেপে খাওয়া বেশি ভালো! অবশ্য পেয়ারা আনলি আবার মান ইজ্জত থাকে না! বলতে বলতে সে আপেল ধুয়ে এনে স্বামীর সামনে রাখে! তখন তার স্বামী অর্থাৎ ছোট ছেলে না ধোয়া আপেলটাও চায়! তারপর সে সুতো দিয়ে দুটো আপেলের বোঁটায় বেঁধে শূন্যে ঝুলিয়ে দুলাতে থাকে এবং স্ত্রিকে বলে, আসো বাজি ধরি! স্ত্রী বলে, কিসের বাজি? ছোট পুত্র বলে, কোন আপেলটা আগে পচবে, ধোয়াটা না আধোয়াটা? ফলে স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলে, ধুর এমন বাজি হয় নাকি? তখন তার স্বামী বলে, হয় হয়! হয়ালিই হয়! তখন তারা দুই রকম বাজি ধরে, প্রথম বাজি হয় ১০০ টাকার যে, কোন আপেলটা আগে পচবে এই বাক্যের উপ্রে, আর দ্বিতীয় বাজি ধরা হয়, কতো দিনে পচবে আপেল? ৭ দিন, ১৫ দিন নাকি ১ মাসে? দ্বিতীয় বাজির অর্থমূল্য ৫০০ টাকা! বাজি ধরার পর ছোট পুত্র দড়িতে বাঁধা আপেল দুটোকে গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে হেসে ফেলে! তার স্ত্রী বলে, আপেল দুইটা আলমারির আড়ালে ঝুলায় রাখো অইখানে রাখলি আব্বা ক্যাঁক ক্যাঁক করবে! তখন ছোট পুত্র আলমারি আর দেয়ালের মাঝের ফাঁকের পেরেকে ঝুলায়ে রাখতে রাখতে আবার হেসে ওঠে! তখন তার স্ত্রী বলে ওঠে, ঘটনা কি হাসো ক্যান খামাখা? ছোট পুত্র বলে, আপেল দুইটে দেইখে মনে হচ্ছে হোলের বিচি! ফলে নিত্য ফিচলে কথাবার্তায় ঝাঁকা খেয়ে অভ্যস্ত ছোট বউ বলে ওঠে, আচ্ছা সব হোলের বিচিই কি একটা একটু ছোট্ট আরেকটা একটু বড় সাইজের হয়? ফলে ছোট পুত্র চিন্তায় পড়ে যায় এবং শৈশবে দেখা ন্যাংটো বন্ধুদের হোল বা হোলের বিচি ইয়াদ করার পেরেশানে ডুবে যায়!

ঠিক এই সময়ে বুটের শব্দ শুনতে পায় সবাই। এবং বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই দেখে বাড়ির মধ্যে পুলিশ এবং কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ বাড়ির বড় পুত্রকে ধরে নিয়ে যায় এবং অন্যদের বলে যায় থানায় আসতে! সুরাইয়া নার্গিসের স্বামী অর্থাৎ পুত্রদের বাপ যখন আরজ করে ঘটনা কি তখন জানা যায় যে, বড় পুত্র এবং বড় পুত্রবধূ রুটিন মাফিক ঝগড়া করতে করতে, এক সময় অতিক্রুদ্ধ পুত্রবধূ হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশ ডেকে ফেলে এবং হয়তো পুলিশ ধারেকাছে থাকায় মুহূর্তের মধ্যে তারা জ্বীনের মতন হাজির হয় এবং যেহেতু নারী নিপীড়ন টাইপ কেস সেহেতু পুলিশ কাল বিলম্ব বা মিমাংসা প্রস্তাবের হুজ্জতে না গিয়ে দ্রুতই অভিযুক্তকে নিয়ে গাড়িতে ওঠায় কেননা এইসব কেসে ঘুষের চান্স একশতে একশত; ফলে আকালের বাজারে হাতছাড়া করা যাবে না! কিন্তু পাড়ার সবাই দেখতে পায়, হাতে আধ খাওয়া আপেল নিয়ে বাড়ির বড় পুত্র পুলিশ ভ্যানে উঠছে এবং তারা ফিসফাস, ফুচুরফুচুর কিংবা গুজুরগুজুর করে যে, যা হওয়ার তাই হইসে, রোজ রোজ ঝগড়ার চাইতে এবার শান্তিঘরে যাইয়ে ঠাণ্ডা থাহো বাপ! ফলে এই ঘটনার মিনিট ৩০ এর মধ্যে মেজো পুত্র বউ সহ বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি রওনা হয় এবং তারা বলে যায়, আমরা ভাই ঘাই-ঘিচিংয়ের মধ্যি নেই! ফলে ছোট পুত্র যখন তার বড় ভাবিকে বোঝাতে যায় যে, থানায় গিয়ে যেন সে বলে উত্তেজনায় পুলিশ ডেকে ফেলায় দুঃখিত, আসলে তেমন কিছুই হয়নি; রোজই আমরা ঝগড়া করি! এই জাতীয় কথাবার্তা বলতে! কিন্তু বড় বধূ দেবরের এই জ্ঞান শুনে খেঁকিয়ে উঠে বলে, গুষ্টি শুদ্ধ থানায় ঢুকায় দেবো কলাম, নারী নির্যাতনের মামলা দেবো সবার নামে! ফলে ছোট বধূ খেঁকিয়ে উঠে বলে, বেশি হয়ে যাচ্ছে ভাবি! আমি কলাম আপনার নামে অন্য অভিযোগ দেবো থানায় যদি আমার স্বামীর কিছু হয়! ফলে এই হাউকাউয়ের মধ্যে তাদের শ্বশুর হাউমাউ স্বরে কাঁদতে থাকে তার বড় পুত্রের জন্যে! এবং সুরাইয়া নার্গিসের অসুস্থ মস্তিষ্ক থেকে বাৎসল্যের তীব্রতা হেতু, অশ্রাব্য সব গালি এবং অভিসম্পাত নাজিল হতে থাকে পুলিশ বাহিনীর নামে! কিন্তু সেদিন রাত্র ১০টার দিকে ছোট পুত্রের ঘরের দরজার কড়া নাড়ে তার বড় ভাবি এবং ছোট বধূ যখন দরজা খুলে তাকে দেখতে পায় এবং ভ্রু কুঁচকে তাকায় তখন দেখা যায় যে, বড় বধূ কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমার স্বামীরে আইনে দেও, মায়া লাগতিছে ওর জন্যি! লোকটা খাতি পছন্দ করে, থানায় দুপুরে খাতি দিছে কিনা খিডা জানে! ফলে তারা সবাই থানায় যায় এবং থানাওয়ালারা মুর্গি বাগে পেয়ে দাম হাঁকায়, এবং বলে, যদি তাদেরকে খুশি না করা হয় তবে বড় পুত্রেকে কোর্টে চালান দিয়ে দেয়া হবে আগামীকাল সকালে! শেষমেশ রাত সারে ১১টার দিকে ১০ হাজার টাকায় দফারফা হয়! এবং বাড়ি ফিরতে ফিরতে স্তব্ধ বড় পুত্রকে যখন তার স্ত্রী বলে, আমার ভুল হইসে! তখন বড় পুত্রে বলে, আপেলের কেজি কতো? ১০ হাজার টাকায় কতো আপেল হয়?

দিনে দিনে আপেল চারা এবং ঢোঁড়া দুজনকে বেড়ে উঠতে দেখা যায় আর বস্তির হাওয়ায় কিংবা বেড়া ফুঁটা করে দেখা লোকজনেরা বলে, আপেল গাছের যত্ন নিতে নিতে তারা ঘরের মইধ্যে সাইন্দা ল্যাংটা-লেংটি খেলে! খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক!

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে তারা অর্থাৎ বড় পুত্রের পরিবার ছুঁড়ে ফেলা বাকি আপেল দুটো কাজের মেয়েটাকে কুড়িয়ে নিয়ে যেতে বলে, এবং সেদিন রাতে কাজের মেয়েটা যার নাম কলমি, সে তার ভাগের আপেল সহ মোট তিনটে আপেল নিয়ে বস্তিতে তার ঘরে ফেরে এবং তার শিশু পুত্র যার নাম ঢোঁড়া, সে কিনা কোন এক ফাঁকে আপেল তিনটে খেয়ে ফেলে বিচি সহ! এবং সেদিন রাত্রে ঢোঁড়া নামক শিশুটির প্রচুর পেট ব্যথার পর বিপুল পরিমাণে হাগা হয়! বস্তির পাশের ঝোপে যেখানে শিশুরা পায়খানা করে সেখানে কলমি তার শিশুকে কয়েক দফা নিয়ে যায় এবং দেখা যায় পায়খানার সঙ্গে ছাবা ছাবা আপেল পরতে! ফলে শেষরাতে কলমিকে শিশু হাসপাতালে রওনা দিতে হয় পুত্রকে বাঁচাতে! ফলে তার কয়েকদিন পর বাচ্চা সুস্থ হলে কলমি বস্তিতে ফেরে এবং তার পরদিন কাজে ফেরে! কিন্তু এর কয়েকদিন পর একদিন বস্তিতে থাকা এক মালি আবিষ্কার করে বস্তির একপাশের ঝোপের যেখানে বাচ্চারা হাগে সেইখানে কয়েকটা আপেল চারা গজিয়েছে! এবং ঠিক সেইসময়ে কলমি তার বাচ্চাকে নিয়ে হাগাতে আসে এবং মালি লোকটার এই উচ্ছাসে জল ঢেলে দিয়ে কলমি দাবি করে যে, আপেলের চারা গুলো তার, কেননা চারা গুলো তার পুত্রের গোয়া দিয়ে বের হয়েছে, যেহেতু অইখানে তার পুত্র ঢোঁড়া হেগে থাকে! এবং হাগাসূত্রে সে ঐ আপেল চারার মালিক, যেহেতু পুত্র নাবালক সেহেতু এই চারার গোয়াসূত্রে মালিক কলমি! এই আলাপ এক কথা দুই কথা চার কথা থেকে আট কথার পর তুমুল ঝগড়ায় রূপ নেয়! তুই তোকারি থেকে মাগি/লুচ্চা/ভাউরা/শুয়োর জাতীয় চতুষ্পদ ইত্যাদি থেকে আরও নান্দনিক গালিতে উঠতে থাকে এবং কলমির হাঁপানি রোগী স্বামী এসে যোগ দেয়ার পর হাতাহাতিতে চলে যায় এবং শেষ বিকেলে বস্তি মালিকের সালিশে সাব্যস্ত হয় যে, যেহেতু চারটা চারা দেখা গেছে সেহেতু পুত্রের হাগাসূত্রে বা গোয়া মালিকানায় কলমি দুটো চারা পাবে তার পুত্রের নামে, এবং ঝোপে আপেল চারা আবিষ্কারের সূত্রে মালি পাবে একটা, আর বাকি একটা জমির মালিকানাসূত্রে বস্তি মালিক পাবে! কিন্তু যেহেতু গুয়ের মধ্যে এই চারা জন্মেছে সেহেতু সে এই চারা বিক্রি করে দিতে চায়! ফলে কলমি এবং মালি দুজনেই চারাটা কিনতে আগ্রহ দেখায়! এবং বস্তি মালিক কলমির প্রতি সামান্য আকর্ষণ থাকার পরও আপেল চারার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মালি লোকটার কাছেই বিক্রি করতে রাজি হয়! ফলে মালি এবং কলমি দুজনের কাছে দুটো করে চারা চলে যায়, তারা পরস্পরকে তির্যক নজরে দেখে এবং কমলির স্বামীর হাঁপানির গমক উঠে যায়! ফলে নিজেদের যায়গা না থাকায় এবং আপেল গাছের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কলমি এবং মালি লোকটা টবে তাদের ভাগের আপেল চারা লাগায় এবং সে বচ্ছর শীত বেশি পড়ায় কলমির হাঁপানিওয়ালা স্বামী হাঁপাতে হাঁপাতে মরে শক্ত হয়ে থাকে! ফলে এরপর থেকে কলমি এবং মালি লোকটাকে প্রায় দেখা যায় ঘরের সামনে এনে রাখা আপেল চারা নিয়ে আপেল চারার স্বাস্থ্য-পুষ্টি ও নিরাপত্তা বিষয়ক লম্বা কিংবা খুচরো আলাপ করতে! এবং দিনে দিনে আপেল চারা এবং ঢোঁড়া দুজনকে বেড়ে উঠতে দেখা যায় আর বস্তির হাওয়ায় কিংবা বেড়া ফুঁটা করে দেখা লোকজনেরা বলে, আপেল গাছের যত্ন নিতে নিতে তারা ঘরের মইধ্যে সাইন্দা ল্যাংটা-লেংটি খেলে! খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক! ফলে আবার সালিস বসে, এবং কলমি আর মালির নিকা দিয়ে দেয় বস্তি মালিক! ফলে লোকে বলে, দুই বজ্জাৎ এক হইলে ঘরের খাট-পালঙ্ক আস্ত থাকে না! এরপর থেকে দেখা যায় চারটে আপেল চারা নিয়ে ঢোঁড়া বারান্দায় ঘুমায় আর তার নতুন বাপ মায়ের সঙ্গে ঘরের মধ্যে চকি নাচায়! কলমির নতুন স্বামী পাকা হাতের মালি! কিছুদিনের মধ্যে তাদের চারটা আপেল গাছ তরতর করে বাড়তে থাকে! এবং এর কয়েকবছর পর যখন ঢোঁড়া কিশোর তখন তাদের আপেল গাছে ফুল আসে! এবং কিছুদিন পর চারদিকে চাউর হয়ে যায় বস্তিতে আপেল ধরেছে! ফলে লোকের ভিড় জমে আপেল দেখতে! এবং ইউটিউবারদের বদান্যতায় এই খবরের ভিডিও ছড়িয়ে যায় দিকেদিকে! ফলে কলমির নতুন স্বামীর খ্যাতি বাড়ে মালি হিসাবে! বড়লোক বাড়ি থেকে অফার আসতে থাকে! ঢোঁড়া পালে হাওয়া পায়, বস্তির সমবয়সী মেয়েরা যারা তাকে পাত্তা দিত না উল্টো ঢোঁড়াসাপ বলে টিটকারি মারত তারা পাত্তা দিতে থাকে! কিন্তু সে বচ্ছর তেমন কিছু না ঘটলেও পরের বচ্ছর চারটা গাছ জাঁকিয়ে ফল ধরে! এবং বস্তিতে ড্রামে আপেল দেখতে কৃষি কর্মকর্তারাও আসে এবং তারা আপেল চাষের সম্ভাবনা নিয়ে কথাবার্তা সরকারি টেলিভিশনে বকে!

কিন্তু এরমধ্যে ঢোঁড়া ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে! বস্তির এক ডবকা সুন্দরি যে কিনা ঢোঁড়ার থেকে বছর চারেকের বড় তাকে বিয়ে করে এক সন্ধ্যায় ঢোঁড়া ঘরে ফেরে এবং মুহূর্তে হুলুস্থুল শুরু হয়ে যায়! কেননা কলমি বলে, ঐ মেয়ে কালনাগিনী এবং সে তার ভোলাভালা ছেলেকে ফাঁসিয়েছে! কিন্তু শেষমেশ দেখা যায় মাঝরাত্রে কলমি এবং ঢোঁড়ার নতুন বাপকে বারান্দায় ঘুমাতে এবং ঘরের মধ্যে ঢোঁড়া তার কালনাগিনীকে নিয়ে চকি নাচাতে থাকে! ফলে সে বচ্ছর বাম্পার আপেল ফলনের মধ্যেই ক্যাচাল লেগে যায়! কালনাগিনী তার স্বামীর হিস্যা দাবি করে এবং বলে যে, তার ভোলাভালা স্বামীকে তার মা এবং নতুন বাপ ফাঁকি দিচ্ছে! এবং তুলকালাম ঝগড়ার পর বাটোয়ারা হয়ে যায় যে, দুটো গাছ ঢোঁড়ার এবং বাকি দুটো কলমি এবং তার স্বামীর! কিন্তু কালনাগিনী এটা মানতে নারাজ, কেননা সে বলে, এই গাছ তার স্বামীর গোয়া দিয়ে বের হয়ে জন্ম নিয়েছে! ফলে সব গাছ তার স্বামীর যেহেতু সে এখন আর নাবালক নাই! পাল্টা যুক্তিতে কলমি ক্ষেপে গিয়ে বলে, আমার ভোদা দিয়া জন্মাইছে তর স্বামী ঢোঁড়া! এহন ক দিনি গাছটা আসলে কার? তখন মালি হয়তো বলে বসে, আমার গাছ একটা, পরে একটা বস্তি মালিক দিছিলেন, মোট দুইটে; যা আগেই মিমাংসা হইসে; বাকি দুইটে বিবাহ সূত্রে পাইছি! তখন কালনাগিনী বলে, আপনে খোঁজা মানুষ, আপনে তো হিসাবের মইধ্যে নাই! তখন হয়তো মালি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, আর কালনাগিনী বলে, পোলা তো আপনের না, বউও আছিল আরেকজনের, হাট করলেন বিনা খর্চায়! ফলে মালি বস্তি মালিকের কাছে শালিস দেয় এবং বস্তি মালিক ইতিহাস ঘেঁটে বলে, গাছ দুইটা দুইটা কইরা ভাগ হবে! নাইলে আমার বস্তি থিকা বিদায় নিবা তোমরা! যেহেতু এই বস্তিতে আপেল গাছের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে গেছে সেহেতু তারা মেনে নেয়! এবং দেখা যায় দুটো নতুন ঘরের চাল খুলে তার মধ্যে দুটো দুটো গাছ রাখা হয় আর তার বারান্দায় পর্দা দিয়ে স্বামী স্ত্রী নিয়ে বসবাস করতে থাকে ঢোঁড়া এবং তার মা! কিন্তু সে বচ্ছর আপেলের সিজন শেষ হতে না হতে মালি লোকটা মরে যায়! এর একদিন পর কলমিকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়! কেনোনা, শ্বশুর হত্যার মামলা করে কালনাগিনী কলমির নামে! এবং ঢোঁড়া চারটে গাছের মালিক হয়ে বসে থাকে ঘরে! এবং শহরের লোকেরা কয়েকগুণ বেশি দামে তাজা আপেল কিনতে আসে তার ঘরে! ফলে প্রচুর পয়সা আসতে থাকে কালনাগিনীর সংসারে! কিন্তু একদিন ঢোঁড়া টের পায় তার শ্বাসকষ্ট অনুভব হচ্ছে! এবং এর কিছুদিনের মধ্যে ডাক্তার কবিরাজ করে দেখা যায় ঢোঁড়ার উচ্চতর হাঁপানি, যা তার পিতার থেকে তার মধ্যে এসেছে! ফলে সব কিছুর নিরব সাক্ষী ঢোঁড়া অনুভব করতে থাকে তার ভাগ্যও কি তবে তার বাপের মতন? ফলে সে কালনাগিনীকে ভয় পেতে শুরু করে!

এরমধ্যে হয়তো কেটে যায় ১৫ বছর! সুরাইয়া নার্গিসের বাড়িতে কোন অদল বদল ঘটে না! বরং দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া ছাড়া আর তেমন কিছুই ঘটে না! ফলে একদিন বিকেলে দেখা যায়, সুরাইয়া নার্গিসের বড় ভাসুরের স্ত্রী যার নামও নার্গিস তিনি সুরাইয়া নার্গিসকে দেখতে আসেন রংপুর থেকে! এখন তার বয়স ৮৫ এবং সুরাইয়া নার্গিসের বয়স ৮০; ফলে বড় নার্গিস হাতে করে এক বা দেড় কেজি আপেল নিয়ে আসে ছোট নার্গিসকে দেখতে! দেখাদেখি আলাপ সালাপ শেষ হলে তারা দুজন দুজনাকে জড়িয়ে কান্দে এবং বড় সুরাইয়া বলে, আর দেখা হয় কিনা জানি না! তখন ফস করে ছোট নার্গিস বলে, আপেলের রঙ কি সবুজ? ফলে বড় নার্গিস ভাবে যে ছোট নার্গিসের মাথায় সমস্যা থাকায় সে এইসব বলে! এবং তিনি চলে যাওয়ার পর সুরাইয়া নার্গিসের স্বামী ঠোঙ্গা খুলে দেখে এবার সবুজ আপেল এনেছে তার ভাবি তার বউয়ের জন্য! কিন্তু সুরাইয়া নার্গিস বলে যে, আপেল খাবো না, দাঁত নাই! বাড়ির বড় বউ বলে, জুস বানায় দিই আম্মা? সুরাইয়া নার্গিস বলে, আমারে কি পাগল ঠেকে তোমার? ফলে সুরাইয়া নার্গিসের স্বামী সবাইকে ভাগ করে দেয় সবুজ আপেল! কেননা তার নিজেরও দাঁত নেই যে আপেল খাবে! ফলে বড় বউ আপেল পাওয়া মাত্রই স্বামীর দিকে তাকাতেই টের পায় স্বামীর মুখ শুকিয়ে গেছে ফলে সে বাড়ির নতুন কাজের মেয়ে হেলাঞ্চিকে দিয়ে দেয় ভাগের আপেল! মেজো বউ আপেল পাওয়া মাত্র ঘরের দরজা দেয় এবং না ধুয়েই খেতে শুরু করে! যেহেতু তার ধারনা এই আপেল খেলে তিনি গর্ভবতী হবেন আবার! কেননা গতবারও তাই ঘটেছিলো! ঐ আপেল খাওয়ার পরের মাসেই ব্যাপারটা নজরে আসে যে তিনি পজেটিভ! ফলে ছোট বউয়ের হাতে যখন আপেল দেয়া হয় তখন ছোট পুত্র এবং স্ত্রী দুজন আলমারির পাশের ফাঁকা যায়গায় গিয়ে দেখতে পায় সেই আপেল দুটো যাদের কথা তারা এই এতকাল বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো, তারা আজও ঠিকঠাক আছে, তবে একটু ঢিলা হয়ে গেছে চামড়া! কিন্তু এতো বছর না পচার রহস্য কি? ফলে কাজের নতুন মেয়ে হেলাঞ্চি বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো আপেল হাতে মুচকি মুচকি হাসে! অবিবাহিত এই তরুণীর হাসির রহস্য আয়নায় দৃশ্যমান আপেলময়তার মধ্যে টের পাওয়া সম্ভব না! আমরা শুধু আশা রাখি তার যেহেতু কোন পুত্র বা কন্যা নেই সেহেতু কেউ আপেল খেয়ে হেগে চারা জন্ম দেবে না!

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত