ধুর সুমিন্দি, কী বালের শরবত বানাইছির!
স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে ঘোলাটে লেবুর শরবত মুখে না দিতেই চিরিক করে বাইরে উগড়ে দিয়ে এভাবেই খেকিয়ে ওঠে মন্তাজ আলী। অথচ রহমত মিঞা খুব যত্ন করেই শরবত গুলে দিয়েছিল। প্রথমে প্লাস্টিকের বালতিতে রাখা কিঞ্চিৎ ময়লা হয়ে আসা পানিতে কাচের গ্লাসটি একবার চুবিয়ে নিয়ে স্পেশাল ফ্রেশ পানিতে সেটি আবার ধুয়ে নিয়েছিল। তারপর তাতে সামান্য বিট লবণ ছড়িয়ে দিয়ে দুই কাঠের ফাঁকে কাগজি লেবুর অর্ধাংশ রেখে হালকা চাপ দিয়ে ঘোলাটে রস নিংড়ে নিয়েছিল গ্লাসে। ফিল্টারে রাখা বরফ শীতল জল ছেড়ে পূর্ণ করে নিয়েছিল গ্লাসের বাকী অংশ। অতঃপর কাচের গ্লাসের মুখ বরাবর অন্য একটি স্টিলের গ্লাস স্থাপন করে খুবই সাবধানে দু’বার ওলট-পালট করেই মন্তাজ আলীর সমুখে এক গ্লাস বরফ-শীতল লেবুর শরবত পরিবেশন করেছিলো রহমত মিঞা। প্রস্তুতি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত কোনো খুঁত ছিল না রহমত মিঞার কাজে। কিন্তু তারপরও মন্তাজ আলীর এভাবে খেকিয়ে ওঠার কারণ ভেবে পায় না সে। তাই মন্তাজ আলী বরাবর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় রহমত,
কী অইলো মন্তাজ ভাই? এইরোম কইরা উঠলা কি জন্যি?
চিনি দিস নাই? এইরোম কইষ্টা শরবত মাইনসি খাতি পারে?
তুমিই না তোমার শরবতে চিনি দিতি বারণ করিছো! ভুইলা গ্যাছো?
এবার মন্তাজ আলী কিছুটা নরোম হয়। তার হয়তবা মনে পড়ে যায় যে, সে নিজেই একদা রহমত মিঞাকে নিষেধ করেছিলো তার শরবতে চিনি দিতে। কিন্তু কেন নিষেধ করেছিলো সেটা আর মনে করতে পারে না। তার কি ডায়েবেটিস আছে? মন্তাজ আলী ভাবে একবার। কিন্তু এ ভাবনা তার মনে স্থায়ী হয় না। একটা উৎকট হাসি দিয়ে ডায়েবেটিস জনিত ভাবনা সে মন থেকে তাড়িয়ে দেয়। একবার নিচু স্বরে বলেও ওঠে ‘গরীব মাইনসির আবার ডাইবিটিস!’
চৈত্র দিনের এমন আগুন ঝরা দুপুরে রহমত মিঞা ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করে। গ্লাসের পর গ্লাস তাকে তৃষিত পথচারীর হাতে তুলে দিতে হয়। তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ এখন কাগজি লেবু, বিট লবণ আর গ্লাসভর্তি বরফ-শীতল জলের মধ্যে। এর ভেতরেও সে মন্তাজ আলীর ওপর নজর রাখে। মন্তাজ আলীকে আপন মনে হাসতে দেখে বিষণ্ন হয়ে ওঠে রহমত মিঞা। ভাবে— মন্তাজ ভাইয়ের কি শরীর খারাপ! হইবো না! দিনভর যে খাটুনি খাটে মানুষটা! শরীর আর কত্ত নিতি পারে!
একটা নাতিদীর্ঘ শ্বাস ফেলে কাজে মন দেয় রহমত মিঞা।
২.
বেলা এগারোটার বেনাপোল এক্সপ্রেস এসে থামে। শূন্য গেলাশটা ফেলে রেখে সেটাকে লক্ষ করে ছুটে যায় মন্তাজ আলী। ট্রেনে আজ অত্যধিক ভীড়। পা ফেলার যায়গা নাই। আজ কী বার! মনে করতে পারে না মন্তাজ। ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। দু’হাত ভর্তি বই নিয়ে সামান্য দুলতে থাকে সে। বাম হাত পেটের ওপর আড়াআড়িভাবে ফেলে রেখে তার ওপর থরে থরে বুক সমান সাজিয়ে রেখেছে মোটা বইগুলি। সোলেমানি খাবনামা, ত্রিশ দিনে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, সচিত্র নামাজ শিক্ষা সহ হরেক রকমের বই দেখা যায় মন্তাজ আলীর বুকের জমিনে। অন্যহাতে তারার মতো ফুটিয়ে রেখেছে বাচ্চাদের অক্ষর শেখার বই। দু’হাত ভর্তি বই নিয়ে সামান্য টলতে থাকে মন্তাজ আলী। অন্য দিনের ছন্দটা আজ তার পদচারণার ভেতর অনুপস্থিত। ধীর লয়ে বগির এ মাথা থেকে ও মাথার দিকে এগোতে থাকে বই বিক্রেতা মন্তাজ আলী।
ভিড়ের ভেতর থেকে সাপের মতোন লিকলিকে দুটি হাত এগিয়ে আসে মন্তাজ আলীর দিকে। একটানে মন্তাজ আলীর বুকের মাঝখান থেকে সচিত্র নামাজ শিক্ষা বইটা বের করে নেয়। লম্বা সারির মধ্যখান থেকে হেঁচকা টানে বই বের করার ফলে লম্বমান সম্পূর্ণ সারিটি কেঁপে ওঠে একবার। সারিটি ভেঙে গিয়ে বগির জমিনে ছড়িয়ে পড়তে পারতো। কিন্তু মন্তাজ আলীর শরীর বাঁকিয়ে বিশেষ অভিজ্ঞ এক প্রক্রিয়ায় সামলে নেবার ফলে তা আর গড়িয়ে পড়ে না। অন্যদিন হলে এমন নাদান ক্রেতার ওপর একচোট তম্বি দেখিয়ে নিত সে। কিন্তু আজ তার চোখে কোনো বিরক্তি ফুটে ওঠে না। সে বরং গভীর আকুতি জড়ানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাপের মতোন লিকলিকে হাত জোড়ার মালিকের দিকে। কিন্তু না, সে ঠিক ক্রেতা নয়। এমনিই দেখার জন্য কৌতুহল থেকে বইটা টেনে নিয়েছিলো। ফলে অল্প সময় পেরোতেই, দু’চার পাতা উল্টেই সচিত্র নামাজ শিক্ষা বইটি আবারও রেখে দেয় মন্তাজ আলীর বুকের ওপর।
মন্তাজ আলী হাঁক ছাড়ে। একে একে সোলেমানি খাবনামা, ত্রিশদিনে ইংরেজি ও কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা, সচিত্র নামাজ শিক্ষা ইত্যাদি বইয়ের ফায়দা ও উপকারিতা বর্ণনা করে যেতে থাকে গলা ফুলিয়ে। আর কোনো হাত তার দিকে এগিয়ে আসে না। মন্তাজ আলী মনে মনে কিছুটা হতাশ হয়। তবে এবারের হতাশা তার বই বিক্রি হয়ে দু’চার পয়সা রোজগার হওয়া সংক্রান্ত নয়; এবারে মন্তাজ আলী হতাশাক্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবে— এ জাতির উন্নতি কিভাবে হবে! যে জাতি বই পড়ে না তাগের কি কোনো উন্নতি হবার পারে! বই হইলো গিয়ে জ্ঞানের আধার। বই না কিনলি, বই না পড়লি মানুষ এই জ্ঞান পাবে কইত্থেকে!
মন্তাজ আলীর মাথায় যেন আসমান ভেঙে পড়ে। উঠোন থেকে ভেসে আসা হাসনাহেনার তীব্র গন্ধ এবারে যেন মন্তাজ আলীকে ফালি ফালি করে চিরে দিতে থাকে। সুঁচ ফোটানোর মতো তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা বোধ হতে থাকে মন্তাজ আলীর
হঠাৎই মন্তাজ আলীর মন ভরে যেতে থাকে গহীন গাঢ় বিষাদে।
মনে পড়ে, প্রথম যখন রেলস্টেশনে বই বিক্রি শুরু করে তখন সে দুরন্ত এক কিশোর। অন্যরা বিভিন্ন খাবারের পসরা সাজিয়ে বসলেও মন্তাজ আলী ট্রেনে ওঠে বইয়ের সারি বুকে করে। নিজে সে শিক্ষিত নয়। অক্ষর জ্ঞান তার সামান্যই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বইয়ের প্রতি তার গভীর মমতা। বই পড়ুয়াদের প্রতি তার অসীম টান। কেউ যখন তার কাছ থেকে বই কিনে পড়তে শুরু করে, মন্তাজ আলী দূর থেকে একদৃষ্টে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে সেই নিমগ্ন পাঠকের দিকে। কেন যেন কাউকে বই পড়তে দেখলে মন্তাজ আপ্লুত হয়ে পড়ে। আবেগে থরথর কাঁপতে থাকে।
ত্রিশ বছর ধরে সে বই বিক্রি করছে। এই দীর্ঘ সময়ে কত পাঠকের আবেগ সে প্রত্যক্ষ করেছে। গল্পের বই পড়ে কতজনকে হাসতে দেখেছে, ভাসতে দেখেছে চোখের জলে! এখন আর কাউকে সে বই পড়তে দেখে না। আনমনা সেই হাসিমুখগুলো, ক্রন্দনরত পাঠকের আপ্লুত সেই চোখগুলো আজ আর সে দেখতে পায় না। হাসতে হাসতে চোখের কোন ভিজে উঠছে—আজও ট্রেনে ট্রেনে বই ফেরির ফাঁকে ফাঁকে মন্তাজ আলী তেমন পাঠক খুঁজে ফেরে। কোথাও তাকে পায় না। মন্তাজ আলী ভাবে—পাঠকের মৃত্যু ঘটে গেছে কি তবে! তাইলে বই বিক্রেতা মন্তাজ আলীরা বেঁচে থাকে কোন উপায়ে!
পরের স্টেশনে পৌঁছতেই কম্পিত পায়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে মন্তাজ আলী।
৩.
এক চিলতে উঠোনের কোনায় একটা হাসনাহেনার ডাল পুঁতে দিয়েছিলো হালিমা। সে অনেককাল আগে। মাঝেমধ্যেই সেই হাসনাহেনা গাছটায় ছোপ ছোপ ফুল ফোটে। আর আসমান ভেঙে যেন সুবাস নেমে আসে। তীব্র গন্ধে ম ম করতে থাকে চারপাশ। বাড়ির আঙিনায় পা ফেলতেই মাথার ভেতর ঝিম মেরে ওঠে মন্তাজ আলীর। মনে হয় যেন, হাসনাহেনার তীব্র গন্ধ মাথার খোল ফুটো হয়ে একেবারে মস্তিষ্কে গিয়ে বিদ্ধ হলো।
মন্তাজ আলী কড়া গন্ধের ভেতর দিয়ে হেঁটে বারান্দায় পেতে রাখা মাদুরের ওপর গিয়ে বসে। ক্লান্তিতে দু’চোখ বুজে আসতে থাকে তার। হাতের কালো পলিথিনটা একপাশে রেখে খুঁটিতে হেলান দিয়ে দম ফেলে। ক্লান্তি আর হাসনাহেনার গন্ধ—দুই মিলে জাপটে ধরতে থাকে মন্তাজ আলীকে। চোখের পাতা বুজে ফেলার আগে মৃদু স্বরে ‘হালিমা’ বলে আওয়াজ দেয় একবার। তার ডাক শুনে ঘরের ভেতর থেকে হালিমা এসে বারান্দায় দাঁড়ালে কালো পলিথিনটা সে হালিমার হাতে তুলে দেয়। হালিমা পলিথিনের মুখ খোলে। ভেতরটা একবার দেখে নিয়ে খেকিয়ে ওঠে সে—
মাইয়াডা আনারস মুখে দিতে চাইছিলো। আপনে কমলা আনছেন ক্যান? আমিও তো আপনারে বারবার কইরা কইয়া দিলাম আনারসের কথা। আমাগের একটা কথা যদি আপনি গ্রাহ্যি করতেন!
স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে মন্তাজ আলী নীরব থাকে। হালিমার খেদের কোনো প্রতিউত্তর করে না। তার ঝিমুনি ক্রমশ বাড়তে থাকে।
বাজারে আনারস নাই। জ্বর মুখে কমলা খাইতে ভালো লাগবো। কমলাটা একটু চিইপ্যা রস কইরা ওর মুখে দেও।
ক্লান্তিতে শ্লেষ জড়ানো কণ্ঠে বলে মন্তাজ আলী। পরক্ষণেই ভাবে, মিথ্যাটা সে না বললেও পারতো। শুধু শুধু একটা মিথ্যা কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। বাজারে আনারস ছিলো। একটা আনারসের যা দাম চায় তাতে আর কেনার কথা চিন্তা করা যায় না। এই সত্যিটা সে হালিমাকে বললেই পারত। কেন যে বললো না! আর তাতেই হালিমার দ্বিতীয় খেদোক্তি শুনতে পাওয়া যায়—
তামাম মাইনসে বাজার থেকে আনারস নিয়াসতেছে। আর আমার মানুষটা বাজারে আনারস দ্যাখে না!
মন্তাজ আলী হালিমার কথায় গা করে না। টাকি মাছের মতোন পিছলে বেরিয়ে যায় হালিমার বেষ্টনী থেকে। খুঁটিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পদক্ষেপে পা ফেলে ঘরের ভেতর। গুমোট একটা গন্ধ এসে ঝাপটা দেয় মন্তাজ আলীর নাকে। ‘মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে ঘরের ভিতর। অথচ ঘরটাকে ভাগাড় বানায়ে রাখছে যেন। দ্যাখো দিনি, তামাম ময়লা কাপড়-চোপড় খ্যাতা-কম্বল লাট কইরা রাখছে বিছানার উপর!’ মনে মনে ভাবলেও মুখে উচ্চারণ করা হয় না। মন্তাজ আলী নীরবে খাটের কিনারে গিয়ে বসে। মেয়েটার দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। প্রাণোচ্ছ্বল হাসি খুশি মেয়ে তার। ঘরের সকল কাজবাজ একাই গুছিয়ে রাখে। সারাদিন তার কত ব্যস্ততা! কত দৌড়ঝাঁপ। যতক্ষণ জেগে থাকে লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে যেন। সেই মেয়ে কেমন কোমরভাঙা বিড়ালের মতোন মিশে আছে বিছানার সাথে!
মন্তাজ আলী মেয়ের কপালে হাত রাখে একবার। জ্বরে মেয়েটার কপাল পুড়ে যায় যেন। বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো চমকে ওঠে মন্তাজ আলী। সকাল বেলা যখন মেয়েকে দেখে কাজে বের হয় সে তখনও তার শরীরের উত্তাপ এত অসহ্য ছিল না। সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের মতোই ছিলো। শরীরের সব ক্লান্তি সব বিবমিষা যেন তার মুহূর্তেই কর্পুরের মতো উবে যায়। খেদোক্তি করে ওঠে হালিমার উদ্দেশে—
হারামজাদি, মাইয়াডার এরোম জ্বর কবি না আমারে! বারান্দায় খাড়ায়া পলিথিন নিয়া কি তামশা করো!
জাবাবে হালিমাও যেন কি সব বলে ওঠে। মন্তাজ আলীর আর তা শোনা হয় না। ততক্ষণে সে বাড়ির বাইরে পা ফেলেছে।
মন্তাজ আলী শয্যাশায়ী ঘুমন্ত কন্যার চোখে চোখ রাখে। কন্যার চোখের তিরতির কাঁপুনি পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু চোখের সে-ভাষার কোনো পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয় না সে, আমাদের বই বিক্রেতা মন্তাজ আলী
খানিকবাদে মহল্লার ফার্মেসী থেকে ডাক্তার নিয়ে ফেরে মন্তাজ আলী। প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে আঁতকে ওঠেন চিকিৎসক। আতঙ্কগ্রস্ত চোখে বিছানায় পড়ে থাকা রোগী এবং রোগীর চারপাশ দেখতে থাকেন। হালিমার কাছে কিছুটা বিস্তার জানতে চান। হালিমার শরীরেও ততক্ষণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এসে ভর করেছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সে ডাক্তারকে জানায়—
মাইয়াডা সারাদিন মুখে দেয় নাই কিছু। জ্বর তো আইজ তিনদিন। আইজ দুপুরে বমি করছিলো দুইবার। আমরা তো ভাবছি ঠাণ্ডা লাইগা জ্বর আইছে। মায়্যাডা খালি পানি ছ্যানে। বারন করলেও শোনে না। খারাপ কিছু হইছে ডাক্তার!
ডাক্তার হালিমার শেষোক্ত কৌতুহল কিংবা উদ্বেগের কোনো জবাব দেন না। ধনুকের মতো কোমর বাঁকিয়ে বিছানার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ে কি যেন পরীক্ষা করতে থাকেন। খানিক বাদে মাথা তুলে মন্তাজ আলীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
লক্ষণ তো ভালো ঠেকতিছে না। মাইয়ার হাতে পায়ে গায়ে গতরে তো ফুসকুরি উঠছে। ঠ্যাকে যেন ডেঙ্গু হইছে। দ্রুত সদরে ন্যান।
মন্তাজ আলীর মাথায় যেন আসমান ভেঙে পড়ে। উঠোন থেকে ভেসে আসা হাসনাহেনার তীব্র গন্ধ এবারে যেন মন্তাজ আলীকে ফালি ফালি করে চিরে দিতে থাকে। সুঁচ ফোটানোর মতো তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা বোধ হতে থাকে মন্তাজ আলীর।
মন্তাজ আলী তার করণীয় বুঝে উঠতে পারে না। কেমন ইতস্তত ভঙ্গিতে ঘর-বারান্দা, বারান্দা-ঘর করতে থাকে। হালিমা প্রতিবেশি বাকের মিঞাকে খবর দেয়। বাকের মিঞা তার ভ্যানগাড়ি নিয়ে এলে মন্তাজ আলী আর হালিমা তাদের মেয়েকে ভ্যানের ওপর লম্বালম্বি করে শুইয়ে দেয়।
বাকের মিঞার ভ্যান হাসনাহেনার তীব্র গন্ধ পেছনে ফেলে মন্তাজ আলী হালিমা আর তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে সদর হাসপাতালের দিকে ছুটতে থাকে।
৪.
একটু ঝিমুনি মতোন পেয়েছিলো মন্তাজ আলীর। চোখের পাতা জোড়া লেগে আসছিলো। কখন যে গাঢ় গভীর ঘুম এসে তাকে এভাবে কাবু করে ফেললো একদমই টের পায় নাই। ঘুম ভাঙে কাছেই কিছু মানুষের কোলাহল শুনে। গুমোট কান্নাও ভেসে আসছে কোত্থেকে যেন। কোলাহল ধ্বনি এবং কান্নাস্বর মিলে কেমন ভীতিকর আবহ তৈরি হয়। এই আবহ মন্তাজ আলীকে কেমন ত্রস্ত করে তোলে যেন। সে কান খাড়া করে কান্নাধ্বনির উৎসস্থল খুঁজতে চায়। টের পায়, কোলাহল কিংবা শোরগোলের দিক থেকেই তা ভেসে আসছে। এবারে মন্তাজ আলী স্পষ্ট শুনতে পায়। তার কানে ভেসে আসে—
কিসির জন্যি এত টাকা বিল হবি! একটা বেড দিবার পারলেন না আপনেরা! ছাওয়ালডা আমার তিন দিন মেঝেতে পইড়ে কাতরালো। ঠিকমতো চিকিৎসা দিলেন না, তিন দিন হয়ে গেলি পারাও একজন ডাক্তার ভুলুক মাইরেও দেইকলো না। কয়ডা স্যালাইন ধরাইছেন খালি। তা বাদেই আমার থেকে এতগুলোন টাকা চাচ্ছেন! আপনেরা কি মানুষ! আমার মনিডারেও যদি বাঁচাতি পারতেন…
শেষোক্ত উচ্চারণ মন্তাজ আলীর বুকের ভেতর যেন হাতুরি পেটা করলো। আহারে, কার না বুকের মানিক চলে গেল! কার না আদরের কোল খালি হলো! মন্তাজ আলী শুনতে পায়, দূরের কোলাহল থেমে গিয়ে সেখানে কেবলই আর্তস্বর শোনা যায়। থেমে থেমে একটি নারী কণ্ঠের বিলাপ ধ্বনি ক্রমশ উচ্চকিত হতে থাকে। হাসপাতালের আকাশ যেন বিদীর্ণ করে ফেলবে।
মন্তাজ আলী মনযোগ সরিয়ে তার মেয়ের দিকে তাকায়। শক্ত মেঝের উপর জবুথবু হয়ে পড়ে আছে। মোটা ভারী কম্বলটা সে চারপাশ থেকে খানিক গুজে দেয়। অসুস্থ মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মন্তাজ আলী। তার বুকের ভেতরে কেমন হু হু করে ওঠে। মেয়েটার মুখের ওপর বেশিক্ষণ দৃষ্টি স্থির রাখতে পারে না।
মন্তাজ আলী মোবাইলের সুইচ টিপে সময় দেখে। রাত বারোটা বেজে পঁচিশ মিনিট। তারা এখানে এসেছেন সন্ধ্যা সাতটার দিকে। পাঁচ ঘন্টার অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও ডাক্তার-নার্স কিংবা হাসপাতালের অপরাপর দায়িত্বশীল কেউ তাদের দিকে একবার উঁকি পর্যন্ত দেয়নি। তারা হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশের পর দু’জন ওয়ার্ডবয় বিছানা পাতার জন্য এই যায়গাটা দেখিয়ে দিয়ে গেছে শুধু। আর তারপরই ফুরুৎ। হাসপাতালের এ প্রান্তে ওয়ার্ডবয় দুজনেরও আর ছায়া দেখা যাচ্ছে না।
মন্তাজ আলী গিয়েছিলো একবার দায়িত্বরত ডাক্তারের রুমে। ডাক্তারকে পাওয়া যায়নি সেখানে। একজন নার্স অতীব কর্কশ স্বরে তাকে জানিয়েছে, ‘রোগীর পরিমাণ বানের জলের মতোন করে বাড়তিছে। ডাক্তার সাহেব ভিজিটে গেইছেন। আপনি অপেক্ষা করেন। ডাক্তার সাহেব সময় মতোন যাবিনি আপনার রুগিকে দেখতি।’
অপেক্ষায় থেকে থেকে পাঁচ ঘন্টা পেরিয়েছে। অপেক্ষা ভীষণ যন্ত্রণার। রোগাক্রান্ত কন্যার পাশে বসে চিকিৎসকের অপেক্ষা যেনবা আরও দ্বিগুণ যন্ত্রণার।
মন্তাজ আলী উঠে দাঁড়ায়। উঠে দাঁড়াতেই তার আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে। বিগত ক’দিন ধরে শরীরের যে উত্তাপ সে টের পাচ্ছে আজকের দিনে এসে তা যেন আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তার মাথার মগজ যেন ফুটন্ত জলের মতো টগবগ করছে। জগদ্দল পাথর চাপানো হয়েছে মাথার ওপর—এমন ভারী মনে হতে থাকে।
টলতে থাকে মন্তাজ আলী।
মেয়ের মাথার কাছে বসে আছে হালিমা। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখের পাতা জোড়া বন্ধ করে বসে আছে। ঘুমিয়েই আছে বোধহয়। মন্তাজ আলী হালিমার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলে চমকে ওঠে হালিমা। একবার চমকে উঠে চোখের সামনে তাকে দণ্ডায়মান দেখে আবারও দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখের পাতা বুজিয়ে ফেলে। বিরক্তিতে চোখ ও মুখের চামড়া কুচকেও নেয় খানিক। বুঝিয়ে দেয়, সে এখন ঘুম থেকে বের হতে চায় না। মন্তাজ আলী আর নাড়ে না তাকে। মৃদুস্বরে জানায়,
মড়ার মতো ঘুম যাইওনা খালি। মায়্যাডার দিকে খেয়াল রাইখো। সজাগ থাইকো। আমি ইকটু দেখি, ডাক্তার আইলো কিনা!
ধীর কম্পিত পদক্ষেপে দায়িত্বরত চিকিৎসকের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে মন্তাজ আলী।
৫.
ক্লান্ত অবসন্ন উত্তপ্ত শরীরটা বরফ-শীতল কংক্রিটের গায়ে এলিয়ে দেয় মন্তাজ আলী। পা দু’টো সামনের দিকে ছড়িয়ে দেয়। মেলে দেয়া দুই পা এবং শরীরের ওপর কাঠামো সমেত তাকে এখন ঠিক ঘড়ির কাটার মতো দেখাচ্ছে। কংক্রিটের শক্ত দেয়ালের সাথে লেপ্টে আছে সময়-ঘড়ির তিনটি কাটা, টিক-টক টিক-টক।
ডাক্তার এখনও তার অবধারিত কর্তব্য থেকে ফেরেননি। ডাক্তার জেনারেল বেড এবং কেবিনে নিষ্ঠার সাথে কর্তব্য পালন করে চলেছেন। হাসপাতালের বারান্দায় উঁকি দেয়ার সময় এখনও তার হয়নি। নার্স মন্তাজ আলীকে অপেক্ষা করতে বলে দিয়েছেন। নার্স জানিয়েছেন ‘ডাক্তার যাবেন। সময় হলেই ডাক্তার যাবেন।’
মন্তাজ আলী দেয়ালের গায়ে শরীর এলিয়ে দিয়ে দু’পা সামনের দিকে ছড়িয়ে সময়-ঘড়ির কাটার মতো অপেক্ষার কক্ষপথে ঘুরতে থাকে।
মন্তাজ আলীর আবারও ঘুমঘুম বোধ হয়। চোখের পাতা বুজে আসতে থাকে। শরীরে মৃদু ঝাঁকুনি দিতে চেষ্টা করে মন্তাজ আলী। তার ঘুমানো চলবে না। তাকে জেগে থাকতে হবে।
মন্তাজ আলী শয্যাশায়ী ঘুমন্ত কন্যার চোখে চোখ রাখে। কন্যার চোখের তিরতির কাঁপুনি পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু চোখের সে-ভাষার কোনো পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয় না সে, আমাদের বই বিক্রেতা মন্তাজ আলী।
বারান্দার সীমানা পেরিয়ে মন্তাজ আলীর চোখ চলে যায় খোলা আকাশের দিকে। আকাশে আজ কত শত নক্ষত্র ফুটে আছে। মন্তাজ আলী নির্দিষ্ট একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি স্থির রাখতে চেষ্টা করে। ধীরে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। মন্তাজ আলীর হঠাৎই মনে হয়, বহুদূর কোনো উঠোনের কোণ থেকে যেন হাসনাহানের গন্ধ ভেসে আসছে। হাসনাহেনার তীব্র গন্ধে ভরে উঠছে চারপাশ। বই বিক্রেতা মন্তাজ আলী ক্রমশ সেই তীব্র গন্ধের ভেতর তলিয়ে যেতে থাকে।























































