২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভাষা ও মরমিতা তথা মিস্টিসিজম বা মরমিবাদের সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর আবার একই সাথে দ্বন্দ্বপূর্ণ। মরমিবাদ হলো সেই পথ, যেখানে মানুষ তার পঞ্চেন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এক পরম সত্য বা ডিভাইন সত্তার সাথে একাত্ম হতে চায়। আর ভাষা হলো সেই মাধ্যম, যা দিয়ে আমরা সীমাবদ্ধ জগতের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করি।
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক
65

সৈয়দ তারিক
কবি, ভাবুক

65

ভাবের দেশ

ভাষা ও মরমিতা

১.
ভাষা ও মরমিতা তথা মিস্টিসিজম বা মরমিবাদের সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর আবার একই সাথে দ্বন্দ্বপূর্ণ। মরমিবাদ হলো সেই পথ, যেখানে মানুষ তার পঞ্চেন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এক পরম সত্য বা ডিভাইন সত্তার সাথে একাত্ম হতে চায়। আর ভাষা হলো সেই মাধ্যম, যা দিয়ে আমরা সীমাবদ্ধ জগতের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করি।

ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে মরমি বা মিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিজ্ঞানের কাছে ভাষা একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া, কিন্তু মরমিবাদীদের কাছে ভাষা হলো ‘ঐশ্বরিক শ্বাস’ বা ‘আদি স্পন্দন’। ​ভারতীয় দর্শনে মনে করা হয়, সৃষ্টির শুরুতে কোনো বস্তু ছিল না, ছিল কেবল শব্দ। এই দর্শনে ‘শব্দব্রহ্ম’ আর ‘অক্ষর ব্রহ্ম’ নামে দুটো অভিধা রয়েছে।

‘শব্দব্রহ্ম’ অর্থ হলো শব্দই ঈশ্বর। মিস্টিকদের মতে, এই দৃশ্যমান জগৎ সৃষ্টির আগে একটি আদি কম্পন বা নাদ বা ধ্বনি ছিল। বিজ্ঞান যেমন ‘বিগ ব্যাং’-এর কথা বলে, মরমিরা বলেন আদি ধ্বনির কথা। এই ধ্বনিই হলো ব্রহ্ম। একে বলা হয় ‘অনাহত নাদ’ —অর্থাৎ যে শব্দ কোনো দুটি বস্তুর ঘর্ষণে তৈরি হয় না, যা মহাবিশ্বে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেজে চলেছে। ​

ঈশ্বর প্রথমে শব্দের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেন, তারপর সেই শব্দ ঘনীভূত হয়ে বস্তুতে পরিণত হয়। ​’অক্ষর’ শব্দটির দুটি অর্থ আছে: একটি হলো ‘বর্ণ’, আর অন্যটি হলো ‘যা ক্ষয়হীন’। মরমি দর্শনে যা কিছু সৃষ্টি হয় তার ধ্বংস আছে, কিন্তু যে ‘আধার’ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে তা অবিনশ্বর। এই অবিনশ্বর পরম সত্তাই হলো ‘অক্ষর ব্রহ্ম’।

অক্ষর ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ প্রতীক হলো ‘ওঙ্কার’ বা প্রণব। এটি অ, উ, এবং ম-এর সমষ্টি। ‘অ’ জাগ্রত অবস্থা এবং সৃষ্টির প্রতীক, ‘উ’ স্বপ্নাবস্থা ও স্থিতির প্রতীক, এবং ‘ম’ সুপ্তাবস্থা বা লয়ের প্রতীক। ‘ম’ উচ্চারণের পর যে নীরবতা নেমে আসে, সেটিই হলো ‘তুরীয়’ বা পরম অবস্থা। অনির্বচনীয়তা ঠিক এই নীরবতাতেই অবস্থান করে। মরমিরা মনে করেন মহাবিশ্বের সমস্ত শব্দ এবং সমস্ত জ্ঞান এই একটি অক্ষরের ভেতরে সংকুচিত হয়ে আছে।

​তন্ত্রমতে, সংস্কৃত বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর (অ থেকে ক্ষ) একেকটি আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। এদের বলা হয় ‘মাতৃকা’ বা ‘ছোট মা’। তন্ত্রের ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে ৫০টি আদি স্পন্দন থেকে, যা আমাদের বর্ণমালার ৫০টি বর্ণ। এই বর্ণগুলো যখন নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানো হয়, তখন তা ‘মন্ত্র’ হয়ে ওঠে। তান্ত্রিক মরমিবাদে মনে করা হয়, প্রতিটি মন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট কম্পন আছে যা সাধকের ভেতরের সুপ্ত কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। শব্দ এখানে কেবল অর্থ নয়, এটি একটি শক্তি।

​মরমি দর্শনে বাণীর চারটি স্তর আছে: পরা, পশ্যন্তি, মধ্যমা, বৈখরী। আমরা যা কানে শুনি তা হলো সবচেয়ে স্থূল রূপ (বৈখরী)। কিন্তু ‘পরা’ বাক বা আদি অক্ষর সাধক তার হৃদয়ের গহীন নীরবতায় অনুভব করেন। ​সহজভাবে বললে, শব্দব্রহ্ম হলো ঈশ্বরের ‘সগুণ’ বা সক্রিয় রূপ তথা সৃষ্টির স্পন্দন, আর অক্ষর ব্রহ্ম হলো ঈশ্বরের ‘নির্গুণ’ বা স্থির রূপ যা অপরিবর্তনীয়।

শব্দব্রহ্মের চরম লক্ষ্য হলো সাধককে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেখানে শব্দ থেমে যায়। অর্থাৎ, শব্দ ব্যবহার করে শব্দহীনতায় বা নীরবতায় পৌঁছানো। যখন শব্দব্রহ্মের অনুভূতি পূর্ণ হয়, তখন সাধক অক্ষর ব্রহ্মে বিলীন হয়ে যান। এই বিলীন হওয়ার মুহূর্তটিই হলো ‘অনির্বচনীয়তা’, যা মরমি অভিজ্ঞতার মর্মশাঁস। ​

শব্দ হলো সেই সিঁড়ি, যা আমাদের এমন এক ছাদে পৌঁছে দেয় যেখানে পৌঁছানোর পর সিঁড়িটার আর প্রয়োজন থাকে না। মাতৃকা বা অক্ষর ব্রহ্মের সাধনার লক্ষ্য হলো ‘বর্ণমালা বর্জন’। ​প্রথমে সাধক মন্ত্রের শব্দ দিয়ে মনকে স্থির করেন। ​তারপর শব্দের অর্থ বা ভাবে নিমজ্জিত হন। ​সবশেষে শব্দ এবং অর্থ দুই-ই হারিয়ে যায় এক পরম অনুভূতিতে।

ইহুদি মরমিবাদ কাবালা (Kabbalah)-তে অক্ষর কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এগুলো হলো সৃষ্টির মূল উপাদান বা মহাজাগতিক ডিএনএ। কাবালাতত্ত্ব অনুযায়ী, ঈশ্বর এই হিব্রু অক্ষরগুলো ব্যবহার করেই আকাশ, পৃথিবী এবং সমস্ত অস্তিত্ব নির্মাণ করেছেন।

​কাবালার অন্যতম প্রধান গ্রন্থ ‘সেফের ইয়েতজিরাহ’ অনুযায়ী, ঈশ্বর ২২টি হিব্রু অক্ষর এবং ১০টি সেফিরত (ঐশ্বরিক গুণাবলি) দিয়ে মহাবিশ্ব খোদাই করেছেন। এখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি নির্মাণ কৌশল। কাবালাবিদেরা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি অক্ষরের পেছনে একটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক শক্তি বা কম্পন কাজ করে। এই অক্ষরগুলো যখন ভিন্ন ভিন্ন বিন্যাসে মিলিত হয়, তখন ভিন্ন ভিন্ন জাগতিক বস্তুর সৃষ্টি হয়। প্রতিটি অক্ষরের একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক গঠন আছে যা মহাজাগতিক শক্তির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শব্দ হলো সেই সিঁড়ি, যা আমাদের এমন এক ছাদে পৌঁছে দেয় যেখানে পৌঁছানোর পর সিঁড়িটার আর প্রয়োজন থাকে না। মাতৃকা বা অক্ষর ব্রহ্মের সাধনার লক্ষ্য হলো ‘বর্ণমালা বর্জন’

কাবালার একটি অনন্য দিক হলো প্রতিটি অক্ষরের একটি সংখ্যাগত মান আছে। একে বলা হয় গেমাট্রিয়া। যদি দুটি ভিন্ন শব্দের সংখ্যাগত মান একই হয়, তবে কাবালাবিদেরা মনে করেন সেই শব্দ দুটির মধ্যে একটি গভীর মিস্টিক সংযোগ আছে। ​যেমন, হিব্রু শব্দ ‘এহাদ’ (একত্ব) এবং ‘আহাভা’ (ভালোবাসা)—উভয়ের মান ১৩। এর মিস্টিক অর্থ হলো—ভালোবাসাই হলো একত্বে পৌঁছানোর পথ।

​কাবালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অক্ষর হলো ‘আলেফ’। এটি প্রথম অক্ষর এবং এর মান ১। আলেফ উচ্চারণের সময় কোনো শব্দ হয় না, এটি কেবল একটি নিশ্বাস বা নীরবতা। মিস্টিকরা মনে করেন, এই নীরবতা থেকেই সমস্ত শব্দের জন্ম। এটি ঈশ্বরের অদ্বৈততা এবং অসীমের প্রতীক। আলেফ অক্ষরের আকৃতি এমন যা নির্দেশ করে উপরের জগত এবং নিচের জগতকে একটি তেরছা রেখা (মনুষ্যত্ব) দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে।

​কাবালাবিদেরা ‘অক্ষর ধ্যান’ বা ‘শেরুফ’ নামক একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ​তাঁরা অক্ষরের বিভিন্ন বিন্যাস নিয়ে মনে মনে খেলা করেন বা সেগুলো ভিজ্যুয়ালাইজ করেন। বিশ্বাস করা হয়, অক্ষরের সঠিক বিন্যাস জানা থাকলে একজন সাধক সরাসরি উচ্চতর জগতের শক্তির সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।

কোরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে ব্যবহৃত ‘হুরুফে মুকাত্তাআত’ অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ ইসলামি মরমিবাদ বা সুফিবাদের অন্যতম রহস্যময় জগত। এটি ভারতীয় দর্শনের শব্দব্রহ্ম এবং কাবালা-র অক্ষর তত্ত্বের সাথে একটি চমৎকার সংযোগ স্থাপন করে।

​সুফি মিস্টিকরা মনে করেন, এই অক্ষরগুলো কেবল বর্ণমালা নয়, বরং এগুলো সরাসরি ঐশ্বরিক উপস্থিতির ‘শর্টহ্যান্ড’ বা ‘মহাসংকেত’। ​হুরুফে মুকাত্তাআতকে একটি আধ্যাত্মিক পাসওয়ার্ড হিসাবে গণ্য করা হয়। ​হুরুফে মুকাত্তাআত (যেমন: আলিফ-লাম-মীম, হা-মীম, ইয়া-সীন) এর আক্ষরিক কোনো অর্থ নাই। এটি মহান আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয় রাসুলের মধ্যকার এমন এক কথোপকথন যা সাধারণের বুদ্ধির অগম্য। এটি যেন এক প্রেমিক ও প্রেমিকার মাঝখানের ইশারা, যা কেবল তাঁরাই বোঝেন। এগুলো পাঠ করার সময় একজন মানুষের বুদ্ধি যখন থমকে যায়, তখন তার হৃদয়ে এক ধরনের বিনয় বা ‘ফানা’ তথা অহং-এর বিনাশ তৈরি হয়। এই আত্মসমর্পণই মিস্টিক অভিজ্ঞতার মূল চাবিকাঠি।

ইবনে আরাবির মতে, মহাবিশ্ব হলো পরমেশ্বরের একটি দীর্ঘশ্বাস বা ‘নফসে রহমানি’। তিনি মনে করতেন প্রতিটি অক্ষর আসলে আল্লাহর এক একটি গুণের প্রকাশ। আল্লাহ ছিলেন গুপ্ত ভাণ্ডারে নিহিত। যখন তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলেন, তখন সেই ইচ্ছার তাপে তাঁর নিশ্বাস অক্ষর ও শব্দ হয়ে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল।

​ইবনে আরাবির মতে, প্রতিটি অক্ষর আল্লাহর এক একটি গুণ বা সিফাতকে ধারণ করে।​ আলিফ পরম একত্ব বা ‘আহাদ’-এর প্রতীক। এটি সোজা এবং অখণ্ড, যা সবকিছুর শুরু কিন্তু নিজে অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল নয়।​ লাম ‘লতিফ’ (সূক্ষ্ম) বা ঐশ্বরিক করুণার প্রতীক যা সৃষ্টিজগতকে আলিঙ্গন করে। ​মিম ‘মজিদ’ (মহিমান্বিত) বা রাসুলের (মুহাম্মদ সা.) সত্তাকে নির্দেশ করে, যিনি স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যস্থতাকারী।

​কাবালার গেমাট্রিয়ার মতো ইসলামি মরমিতায়ও ‘আবজাদ’ নামক একটি পদ্ধতি আছে, যেখানে প্রতিটি অক্ষরের মান আছে। মিস্টিকরা এই অক্ষরগুলোর সংখ্যাগত মান বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গূঢ় রহস্য বের করেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সূরার শুরুতে এই অক্ষরগুলোর যোগফল সেই সূরার মূল বার্তার সংখ্যাতাত্ত্বিক সারাংশ বহন করে। তাঁরা মনে করেন, এই অক্ষরগুলো দিয়েই মহাবিশ্বের অদৃশ্য কাঠামো বা ‘মালকুত’ নির্মিত।

সুফি সাধকরা এই অক্ষরগুলোকে জিকির বা মন্ত্রের মতো বারবার উচ্চারণ করেন। বিশ্বাস করা হয়, বিশেষ করে ‘হা-মীম’ বা ‘ক্বাফ’-এর মতো অক্ষরের গম্ভীর ধ্বনি মানুষের হৃদপিণ্ড এবং মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলোকে (লতিফা) স্পন্দিত করে, যা আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটায়। ​ধ্যানে মিস্টিকরা এই অক্ষরগুলোকে আলোর হরফে হৃদয়ের পর্দায় ভাসতে দেখেন।

২.
এতক্ষণ আমরা ধ্বনি ও অক্ষর নিয়ে আলোচনা করলাম। এখন শব্দের দিকে যাওয়া যাক। বাইবেলে সাধু জনের সুসমাচারে বলা হয়েছে, ​”আদিতে শব্দ ছিল, সেই শব্দ ঈশ্বরের সাথে ছিল এবং সেই শব্দই ছিল ঈশ্বর।” (Gospel of John 1:1)। এই অমোঘ বাণীটি বিশ্ব মরমিবাদের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় স্তম্ভ। এটি নির্দেশ করে যে, ​শব্দ বা কালাম বা লোগোস এবং স্রষ্টা অভিন্ন: সৃষ্টির আগে চিন্তা ও শব্দের মধ্যে কোনো ব্যবধান ছিল না। শব্দই হলো সেই প্রথম ‘স্পন্দন’ যা অদৃশ্যকে দৃশ্যমান জগতে নিয়ে এসেছে। এই বাণীর মাধ্যমেই খ্রিস্টীয় মরমিবাদ দাবি করে যে, মানুষের ভাষা যখন পবিত্র স্তরে পৌঁছায়, তখন তা স্বয়ং স্রষ্টার সাথে যুক্ত হওয়ার সেতু হয়ে দাঁড়ায়।

এখানে ‘শব্দ’ বলতে কেবল কোনো কথ্য শব্দ বোঝানো হয়নি। গ্রিক দর্শনে একে বলা হয় লোগোস (Logos)। এটি একই সাথে ‘শব্দ’, ‘যুক্তি’, ‘পরিকল্পনা’ এবং ‘মহাজাগতিক নিয়ম’। সৃষ্টির আগে ঈশ্বর যখন অব্যক্ত ছিলেন, তখন সৃষ্টির প্রথম প্রকাশ ঘটে একটি ‘স্পন্দন’ বা ‘ইচ্ছা’র মাধ্যমে। এই ইচ্ছাই হলো ‘Word’। অর্থাৎ, এটি ঈশ্বরের মনের সেই প্রথম কম্পন যা সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করে।

বাইবেলের জেনেসিস বা আদিপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের তিন নম্বর আয়াতে আছে: “ঈশ্বর বললেন, ‘আলো হোক,’ আর অমনি আলো হলো।” এই উক্তিটি কেবল আলোর গল্প নয়, এটি ইচ্ছা, শব্দ ও বাস্তবতার মধ্যকার সরাসরি সম্পর্কের এক চূড়ান্ত বিবরণ। ঈশ্বর আলো তৈরি করতে হাত বাড়াননি, বরং তিনি কথা বলেছিলেন। এর অর্থ হলো, শব্দই হলো সেই কাঁচামাল যা দিয়ে মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে।

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, শুরুতে পৃথিবী ছিল অন্ধকার, শূন্য এবং বিশৃঙ্খল। ঈশ্বর যখন সৃষ্টি শুরু করতে চাইলেন, তখন তিনি কোনো শারীরিক শ্রম ব্যবহার করেননি, বরং তিনি কেবল একটি আদেশ উচ্চারণ করেছিলেন: ‘আলো হোক।’ মিস্টিক দর্শনে ‘অন্ধকার’ মানে হলো ‘সম্ভাবনা’ যা এখনো রূপ নেয়নি। আর ‘আলো’ হলো প্রথম প্রকাশ বা মেনিফেস্টেশন। এই আলো কিন্তু সূর্যের আলো নয়— কারণ সূর্য সৃষ্টি হয়েছিল আরও পরে, এটি হলো ‘আদি জ্যোতি’ বা ‘প্রিমরডিয়াল লাইট’ বা মহাজাগতিক চেতনা।

সৃষ্টির আগে সবকিছু সুপ্ত ছিল; এই আদেশের মাধ্যমে সেই সুপ্ত চেতনা প্রকাশিত হলো। ​ঈশ্বর ‘বললেন’ — অর্থাৎ চিন্তা থেকে শব্দে রূপান্তর ঘটল। মরমি দর্শনে বিশ্বাস করা হয় যে, মহাবিশ্ব আসলে একটি ঘনীভূত শব্দ বা স্পন্দন। মরমি দৃষ্টিতে মহাবিশ্ব কোনো জড় বস্তু নয়, এটি একটি জীবন্ত কবিতা বা গান। ঈশ্বর নিজেকে শব্দের মাধ্যমে গেয়ে চলেছেন। যখন আমরা এই ‘শব্দ’ বা মহাজাগতিক স্পন্দনের সাথে নিজেকে মেলাতে পারি তখনই আমাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে।

ইসলামি মরমিতা বা সুফিবাদের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো ‘কুন ফায়া কুন’। এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা এবং সৃষ্টির আদি রহস্যের এক চাবিকাঠি

ইসলামি মরমিতা বা সুফিবাদের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো ‘কুন ফায়া কুন’। এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা এবং সৃষ্টির আদি রহস্যের এক চাবিকাঠি।

​’কুন ফায়া কুন’ একটি আরবি বাক্যাংশ। এর আক্ষরিক অর্থ হলো, ​’কুন’: ‘হও’, ‘​ফায়া কুন’: ‘আর অমনি তা হয়ে যায়’। পবিত্র কোরআনে এই বাক্যাংশটি মোট আটবার এসেছে (যেমন—সূরা বাকারা: ১১৭, সূরা আল-ইমরান: ৪৭, ৫৯; সূরা মারইয়াম: ৩৫)। এটি মূলত স্রষ্টার সেই মুহূর্তের বর্ণনা যখন তিনি কোনো কিছু সৃষ্টি করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।​ এখানে ইচ্ছাশক্তি ও শব্দের মিলন ঘটেছে।

​সুফি দর্শনে ‘কুন’ শব্দটিকে মহাবিশ্বের ‘আদি গর্জন’ হিসেবে দেখা হয়। ​’লোগোস’ এর মতো, এখানেও ‘শব্দ’ হলো সৃষ্টির মাধ্যম। স্রষ্টা কোনো কিছু তৈরির জন্য হাত বা অন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহার করেন না, তাঁর ‘ইচ্ছা’ যখন ‘শব্দে’ (কুন) রূপান্তরিত হয়, তখনই অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বের জন্ম হয়।

মরমিরা ‘কুন’ শব্দটির দুটি অক্ষরের মধ্যেও রহস্য খুঁজে পান। ​কাফ আল্লাহর ‘কুফউ’ (সমকক্ষহীনতা) বা ‘কুদরত’ (ক্ষমতা)-এর প্রতীক এবং
​নুন ‘নুর’ (আলো) বা ‘নাফাস’ (নিঃশ্বাস)-এর প্রতীক। যখন ক্ষমতা (কাফ) এবং জ্যোতি (নুন) মিলিত হয়, তখনই সৃষ্টির প্রকাশ ঘটে। অনেক মরমি মনে করেন, ‘নুন’ অক্ষরের আকৃতি একটি দোয়াতের মতো, যা মহাবিশ্বের সব জ্ঞান ধারণ করে আছে।

মিস্টিকদের মতে, এই ‘কুন’ একবার উচ্চারিত হয়েই থেমে যায়নি। মহাবিশ্বের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি নিশ্বাসে ঈশ্বর ‘কুন’ বলে চলেছেন, আর সৃষ্টি অনবরত হয়ে চলেছে। এটি একটি অনন্ত প্রবাহ। আবার, এই কুনের শক্তি মানুষের রুহে বা আত্মায় সুপ্ত রূপে বিদ্যমান থাকে। সাধক যখন তার অহং বা আমিত্বের লোপ ঘটিয়ে আল্লাহর সাথে একীভূত হয়ে যান, তখন সেই শক্তি জাগ্রত হয়। তখন তার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত হয়। তখন তিনি যা ইচ্ছা করেন, বা দোয়া করেন, বা বলেন— সেটাই বাস্তবায়িত হয়। মরমিবাদে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা হলো সৃজনশীল শক্তি।

৩.
এবার আমরা মরমি ধারায় ভাষার প্রকাশ বিষয়ে একটু আলাপ করতে পারি। মরমিবাদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অনির্বচনীয়। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার যে আনন্দ বা উপলব্ধি, তা সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। ভাষা তৈরি হয়েছে জাগতিক বস্তু বোঝানোর জন্য। কিন্তু যখন একজন সাধক ‘পরম শূন্য’ বা ‘একাত্মতা’ অনুভব করেন, তখন প্রচলিত শব্দভাণ্ডার তার ভার সইতে পারে না।

মরমি অভিজ্ঞতা আস্বাদ করবার পর মানুষের ভাষা, যুক্তি এবং বর্ণনা করার ক্ষমতা স্তব্ধ হয়ে যায়। সহজ কথায়, এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা কেবল অনুভব করা যায়, কিন্তু শব্দে প্রকাশ করা যায় না। ​ভাষা মূলত আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের (দেখা, শোনা, ছোঁয়া) অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হয় অতীন্দ্রিয়।

যা​ সসীম বা যার নির্দিষ্ট সীমানা আছে, ভাষা এমন বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু ‘পরম সত্তা’ বা ‘ঈশ্বর’ অসীম। অসীমকে সসীম শব্দের খাঁচায় বন্দি করতে গেলেই তার প্রকৃত রূপ হারিয়ে যায়। ​ভাষা চলে দ্বৈততার ওপর — আমি ও তুমি, আলো ও অন্ধকার। কিন্তু মরমি অভিজ্ঞতার চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘আমি’ এবং ‘পরম সত্তা’ এক হয়ে যায়। যেখানে কোনো পার্থক্য নেই, সেখানে বর্ণনার কোনো ভাষাও নেই।

তারপরও মরমিগণ তাদের ভাব নিশ্চয়ই প্রকাশ করেন স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে, কবিতায়, উপদেশে, দর্শনে। এই প্রকাশের ভাষায় রূপক ও প্রতীক ব্যবহার করেন তারা। মরমিবাদে রূপক বা মেটাফোর এবং প্রতীক বা সিম্বল কেবল অলঙ্কার নয়, বরং এগুলো হলো অনির্বচনীয় সত্যকে ধরবার উপকরণ।

মরমি অভিজ্ঞতা যেহেতু সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরের কিছু, তাই পরিচিত কোনো অনুভূতির মাধ্যমে তাকে বোঝাতে হয়। ​প্রেমের রূপক মিস্টিসিজমের সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপক। ঈশ্বরকে ‘প্রিয়তম’ এবং নিজেকে ‘প্রেমিকা’ বা ‘বিরহী’ হিসেবে কল্পনা করা হয়। ভারতীয় ভক্তিবাদে আন্দাল কিংবা মীরাবাই ​ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্বামী হিসেবে দেখেছিলেন। জাগতিক বিয়ের রূপক ব্যবহার করে তারা আসলে আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের কথা বলেছেন।
​ত্রুবাদুরদের ক্ষেত্রে তাদের ‘Fin’amor’ বা বিশুদ্ধ প্রেম ছিল জাগতিক নারীর প্রতি, কিন্তু তার অন্তরালে ছিল আধ্যাত্মিক পূর্ণতার ব্যাকুলতা।

​সুফি মরমিতায় ‘মদ’ হলো ঐশ্বরিক প্রেম বা জ্ঞান, আর ‘সাকি’ হলেন সেই গুরু যিনি সেই জ্ঞান দান করেন। এখানে মাতাল হওয়া মানে কাণ্ডজ্ঞান হারানো নয়, বরং আমিত্ব বিসর্জন দেওয়া।

এভাবে ​প্রতীক হলো একটি দৃশ্যমান বস্তু যা একটি অদৃশ্য ও গভীর সত্যকে ধারণ করে। যেমন ​আলো: প্রায় সব ঐতিহ্যে আলো হলো জ্ঞান বা চেতনার প্রতীক। ভারতীয় মরমিবাদে পদ্ম হলো বিশুদ্ধতার প্রতীক। কাদা থেকে জন্ম নিলেও তা যেমন কাদা মাখে না, তেমনি সাধক জগন্ময় থেকেও জগতের মোহমুক্ত থাকেন।
আইসিস কাল্ট এবং যোগ সাধনায় সাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এটি কুণ্ডলিনী শক্তি বা সুপ্ত চেতনার প্রতীক, যা জাগ্রত হয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়। গোলাপ হলো হৃদয়ের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের প্রতীক।

প্রতীক বিবৃতিমূলক ভাষার চেয়ে শক্তিশালী। ​ভাষা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু প্রতীক স্থিতিশীল থাকে। একটি ছবি বা একটি প্রতীক — যেমন ‘ওঁ’ বা ‘ক্রুশ’ — যা বোঝাতে পারে, হাজার পৃষ্ঠার বইও তা পারে না। মিস্টিকরা মনে করেন, প্রতীক সরাসরি মানুষের অচেতন মনে আঘাত করে, যা বুদ্ধির চেয়েও গভীর। বলা হয়, প্রতীক হলো সেই আঙুল যা চাঁদের দিকে নির্দেশ করে। নির্বোধরা আঙুল নিয়ে পড়ে থাকে, কিন্তু মিস্টিকরা চাঁদের দিকে তাকান।

মরমিবাদে প্যারাডক্স বা আপাতবিরোধী বক্তব্য থাকে প্রচুর। এগুলো কোনো ভুল বা বিভ্রান্তি নয়, বরং এটি ভাষার একটি উচ্চতর কৌশল। যখন সত্য এতোটাই বিশাল হয় যে সাধারণ লজিক বা যুক্তি তাকে ধারণ করতে পারে না, তখন মিস্টিকরা পরস্পরবিরোধী দুটি কথাকে মিলিয়ে এক নতুন সত্য তৈরি করেন।

​সাধারণ যুক্তি চলে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর ভিত্তিতে। কিন্তু মিস্টিক অভিজ্ঞতা হলো ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর এক অদ্ভুত সমন্বয়। মানুষের মস্তিষ্ক যখন কোনো প্যারাডক্সের মুখোমুখি হয় — যেমন ধরা যাক: “আমি তাকে পেয়েছি যখন আমি নিজেকে হারিয়েছি” — তখন তার চেনা যুক্তি থমকে যায়। এই স্তব্ধতাই সাধককে অনুভবের গভীরে নিয়ে যায়।

মরমিবাদীরা মনে করেন সত্য একাক্ষিক নয়। সত্যে একই সাথে আলো এবং অন্ধকার, মৃত্যু এবং জীবন মিলেমিশে থাকে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক: ​”যিনি নিজেকে রক্ষা করতে চান, তিনি নিজেকে হারাবেন; আর যিনি আমার জন্য নিজেকে হারান, তিনি নিজেকে খুঁজে পাবেন।” এটি প্রায় সব মরমি ধর্মেই দেখা যায়। নিজের অহং বা ‘আমি’কে বিসর্জন দিলেই কেবল পরম সত্তাকে পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, হারানোই এখানে প্রাপ্তি।

​ভারতীয় দর্শনে ঈশ্বর সম্পর্কে বলা হয়, “তদেজতি তন্নৈজতি” — অর্থাৎ তিনি চলেন, আবার চলেন না; তিনি দূরে, আবার তিনিই অতি নিকটে। শব্দব্রহ্ম বা ওঙ্কার-এর ক্ষেত্রেও এটি সত্য—শব্দটি মহাবিশ্বে অবিরাম বাজছে (গতি), অথচ তা পরম শান্ত ও স্থির (স্থিরতা)।

মরমিবাদীরা বলেন, “তুমি যখন নীরব হও, তখনই তুমি শুনতে পাও।” যখন মানুষের তৈরি কোলাহল থামে, তখনই সে প্রকৃতি, নক্ষত্র এবং স্রষ্টার সূক্ষ্ম কম্পনগুলো অনুভব করতে পারে

​অনেক মরমিবাদী বলেন, ঈশ্বরের মহিমা এতোটাই উজ্জ্বল যে তা আমাদের সাধারণ চোখে অন্ধকার মনে হয়। একে বলা হয় ‘দ্য ডিভাইন ডার্কনেস’। খ্রিস্টীয় মরমিতা কিংবা প্রাচীন মিসরীয় আইসিস কাল্টের গোপন রহস্যগুলোতেও এই ধরনের প্রতীকী অন্ধকারকে পরম জ্ঞানের উৎস হিসেবে দেখা হয়।

ত্রুবাদুর ঐতিহ্যে ‘সুইট পেইন’ তথা সুখদায়ক বেদনার কথা আছে। প্রেমের যে বিরহ, তা যন্ত্রণাদায়ক হলেও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তা মধুর। যোগধারায় ‘শব্দহীন নাদ’ ধ্যানের এমন স্তর যেখানে কোনো কান দিয়ে শোনা শব্দ নেই, কিন্তু আত্মা এক অখণ্ড ধ্বনি অনুভব করে। ভারতীয় ভক্তিবাদে মানুষ হয়ে ঈশ্বরকে স্বামী বরণের ধারণা দেখায় যে সসীম মানুষ যখন অসীমকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কে বাঁধে, তখন সেখানে সব লজিক ভেঙে যায়।

​প্যারাডক্স হলো অনির্বচনীয়তা-র প্রবেশদরোজা। যখন ভাষা আর সোজা পথে চলতে পারে না, তখন সে উল্টো পথে হেঁটে সত্যকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে। মিস্টিকরা মনে করেন, যদি কেউ আধ্যাত্মিকতায় কোনো প্যারাডক্সের মুখোমুখি না হন, তবে তিনি সম্ভবত এখনো বুদ্ধির স্তরেই আটকে আছেন। বলা হয়েছে, ​”সত্য এতোটাই অদ্ভুত যে, তাকে সরাসরি বললে মিথ্যা মনে হয়; তাই তাকে প্যারাডক্সের মোড়কে বলতে হয়।”

অনেক মরমি সাধক মনে করেন, সত্যকে প্রকাশের একমাত্র নির্ভুল উপায় হলো নীরবতা। ​প্রাচীন উপনিষদে বলা হয়েছে, মন যা ধারণ করতে পারে না এবং কথা যেখান থেকে ফিরে আসে, সেটিই ব্রহ্ম। রুমির মতে, “প্রেমের কথা বলতে গিয়ে ভাষা অনেক কিছু বললেও, প্রেমে যখন আত্মা নিমজ্জিত হয়, তখন নীরবতাই শ্রেষ্ঠ বর্ণনা।” নেটিভ আমেরিকান মরমিবাদে আছে ‘নীরবতার কণ্ঠস্বর’: প্রকৃতি যখন নীরব থাকে, তখনই সে সবচেয়ে বড় সত্যগুলো বলে।

​যখন কোনো কিছু ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তখন সাধকরা ‘নেতিবাচক ভাষা’ ব্যবহার করেন। একে বলা হয় Apophatic theology। ​ঈশ্বর কেমন তা না বলে, তিনি কী নন—তা বলা হয়। যেমন: “তিনি জন্মহীন, তিনি অন্তহীন, তিনি রূপহীন।”

যখন একজন মানুষ বলে “আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না”, তখনই বোঝা যায় তিনি জাগতিক অভিজ্ঞতার দেয়াল টপকে এক বিশালত্বের মুখোমুখি হয়েছেন। উক্তি আছে,​”সত্যকে যখন মুখে বলা হয়, তখন তা মিথ্যা হয়ে যায়। কারণ ভাষা সত্যকে টুকরো টুকরো করে ফেলে, কিন্তু সত্য হলো অখণ্ড।”

সুতরাং মরমিবাদের ভাষার লক্ষ্য হলো নীরবতায় তথা ভাষাহীনতায় পৌঁছানো। নীরবতা বা মৌনতা কেবল শব্দের অনুপস্থিতি নয়; মরমি দর্শনে এটি একটি ‘সক্রিয় উপস্থিতি’ এবং সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র নিখুঁত মাধ্যম। কেউ যখন শব্দের সীমানা পার হয়ে যান, তখনই নীরবতার সেই আদি ভাষা শুরু হয়। জালালউদ্দিন রুমি বলেন: “মৌনতা হলো ঈশ্বরের ভাষা, বাকি যা দেখছ তা কেবল দুর্বল তর্জমা।”

​শব্দ সবসময় দ্বৈততা তৈরি করে—’আমি’ এবং ‘তুমি’, ‘ভালো’ এবং ‘মন্দ’। কিন্তু পরম সত্য হলো অদ্বৈত। সেই অদ্বৈততাকে প্রকাশ করার কোনো ভাষা মানুষের নেই। তাই যখন কোনো মরমিবাদী সত্যের পরম শিখরে পৌঁছান, তিনি তখন নির্বাক হয়ে যান। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘মৌন ব্যাখ্যা’।

​মরমিগণ নীরবতাকে তিনটি প্রধান ধাপে বিভক্ত করেছেন। ​জিহ্বার মৌনতা হলো অনর্থক বা জাগতিক আলাপ বন্ধ করা। এটি সাধনার প্রাথমিক ধাপ, যা শক্তি অপচয় রোধ করে। এরপর ​মনের মৌনতা; যখন মস্তিষ্কের ভেতরের অবিরাম চিন্তা বা অভ্যন্তরীণ বকবকানি থেমে যায়। মানুষ মুখে চুপ থাকলেও মনে মনে কথা বলে। ধ্যানের মাধ্যমে এই ভেতরের কোলাহল থামানোই হলো আসল মৌনতা। সবশেষে​ অস্তিত্বের মৌনতা। এটি চূড়ান্ত স্তর বা ‘ফানা’। এখানে সাধকের নিজের অস্তিত্বের পৃথক কোনো আওয়াজ তথা স্পন্দন থাকে না। সে তখন মহাবিশ্বের আদি স্তব্ধতার সাথে এক হয়ে যায়।

​বিভিন্ন মরমি ঐতিহ্যে নীরবতার বিবিধ প্রয়োগ রয়েছে। ​জেন বৌদ্ধধর্মে মৌনতা হলো বুদ্ধত্বের স্বরূপ। তাদের মতে, একটি খালি পাত্র যেমন তার শূন্যতার কারণেই মূল্যবান, মানুষের মনও যখন মৌন বা শূন্য হয়, তখনই তাতে মহাজাগতিক জ্ঞান প্রবেশ করতে পারে। জেন গুরুরা অনেক সময় কোনো উপদেশ না দিয়ে কেবল শিষ্যের সামনে মৌন বসে থাকতেন, যা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা।

​সুফি তত্ত্বে নীরবতাকে বলা হয় ‘সমত’। সুফিরা বিশ্বাস করেন, মানুষের ভেতরে ‘সির’ নামে একটি লতিফা ব ‘গোপন হৃদয়’ আছে। এই গোপন কক্ষের দরজা কেবল নীরবতার চাবি দিয়েই খোলা সম্ভব। নীরবতা সাধকের হৃদয়ে ‘নুর’ বা ঐশ্বরিক আলো ধারণের ক্ষমতা বাড়ায়।

​ভারতীয় মরমি দর্শনে ওঙ্কার (ওঁ) ধ্বনির শেষে যে দীর্ঘ নীরবতা থাকে, তাকেই বলা হয় প্রকৃত ব্রহ্ম। মাণ্ডুক্য উপনিষদ অনুযায়ী, জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তির পর চতুর্থ স্তরটি হলো ‘তুরীয়’, যা সম্পূর্ণ নীরব এবং যেখানে সব দ্বৈততা মুছে যায়।

​নীরবতা মানে স্থবিরতা নয়, বরং এটি প্রচণ্ড শক্তিশালী। এটি ​সৃষ্টির আধার। যেমন একটি সাদা ক্যানভাস নীরব বলেই তাতে ছবি আঁকা সম্ভব, তেমনি আদি মৌনতা থেকেই ‘লোগোস’, ‘কুন’ বা ‘ওঙ্কার’-এর জন্ম। ​মরমিবাদীরা বলেন, “তুমি যখন নীরব হও, তখনই তুমি শুনতে পাও।” যখন মানুষের তৈরি কোলাহল থামে, তখনই সে প্রকৃতি, নক্ষত্র এবং স্রষ্টার সূক্ষ্ম কম্পনগুলো অনুভব করতে পারে।

​আমরা কিছুক্ষণ আগে ‘কুন’, ‘লোগোস’ এবং ‘সৃষ্টির শব্দ’ নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু সেই শব্দের জন্ম এবং শেষ আশ্রয় হলো এই ‘নীরবতা’। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র সম্পন্ন করল: নীরবতা → শব্দ → সৃষ্টি → পুনরায় নীরবতা। অনুপম শুনশান।

Bhaber Desh-Special Sufi Series by Poet Syed Tarik-Meghchil

ভা ষা  ও  ম র মি তা র  সং যো গে  ক বি তা

এখন আমরা ভাষা ও মরমিতার সংযোগে রচিত কিছু কবিতার ভাবানুবাদ পাঠ করতে পারি।

​১.
জালালউদ্দিন রুমি (সুফি: পারস্য)

শব্দেরা হলো কেবল সেই ছায়া যা দেয়ালের ওপর পড়ে,
অথচ আসল সত্য হলো সেই আলো যা ছায়া তৈরি করে।
আমি যখন আমার মুখ বন্ধ করি,
তখন আমার ভেতরে একশটি নতুন কণ্ঠস্বর জেগে ওঠে।
তুমি যদি সত্যকে শুনতে চাও,
তবে শব্দের এই শোরগোল থেকে বেরিয়ে এসো,
কারণ সমুদ্রের গভীরতা বুঝতে হলে তোমাকে ঢেউয়ের গর্জন ছাড়িয়ে গভীরে ডুব দিতে হবে।

​২.
লাও ৎসে (তাওবাদ: চীন)

​যে পথ (তাও) ভাষায় প্রকাশ করা যায়, তা আসল পথ নয়।
যে নাম মুখে উচ্চারণ করা যায়, তা সেই চিরন্তন নাম নয়।
নামহীনতা হলো আকাশ ও পৃথিবীর আদি উৎস;
আর নাম হলো কেবল সেই জননী, যা দৃশ্যমান হাজারো বস্তুর জন্ম দেয়।
তাই সর্বদা আকাঙ্ক্ষাহীন হয়ে আমরা সত্যের রহস্য দেখি,
আর আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে আমরা দেখি কেবল তার বাইরের রূপ।

​৩.
টি. এস. এলিয়ট (আধুনিকতাবাদ: আমেরিকা-ব্রিটেন)

​শব্দগুলো কেঁপে ওঠে, ভেঙে যায় যন্ত্রণায়,
তারা আর স্থির থাকতে পারে না তাদের ওজনের নিচে,
তারা কেবল পিছলে যায়, ধ্বংস হয়, অস্পষ্ট হয়ে যায়।
কারণ শব্দ দিয়ে যখনই আমি অসীমকে ছুঁতে চাই,
তখনই শব্দেরা হয়ে পড়ে এক একটি অর্থহীন ধাঁধা।
কেবল সেই চরম নীরবতার মধ্যেই শব্দেরা প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়।

৪.
আন্দাল (তামিল ভক্তি আন্দোলন)

​হে আমার সখী, আমি তাঁর নাম মুখে নিতেই আমার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যায়,
আমার চোখের জল সব অক্ষরকে ধুয়ে মুছে দেয়।
আমি যে গান গাই, তা কি কেবল শব্দ?
না, এটি আমার আত্মার সেই নিঃশ্বাস যা তাঁর চরণে পৌঁছাতে চায়।
যখন তিনি সামনে দাঁড়ান, তখন সব স্তোত্র ফুরিয়ে যায়,
কেবল হৃদস্পন্দনই তখন একমাত্র ভাষা হয়ে বাজে।

​৫.
সন্ত কবির (ভারতীয় মরমিবাদ)

​শব্দই হলো আদি, শব্দই হলো অন্ত,
শব্দই মহাবিশ্বের সব চাবিকাঠি।
অথচ সেই ‘শব্দ’কে সাধারণ জিহ্বা দিয়ে চেনা যায় না।
যেখানে কোনো অক্ষর নেই, কোনো বাণী নেই,
সেখানেই সেই পরম শব্দের বাস।
পন্ডিতেরা কিতাব পড়ে ক্লান্ত হয়, কিন্তু সেই অখণ্ড ধ্বনি শোনে না।
কবীর বলে, শোনো হে সাধু,
যখন তোমার আমিত্বের চিৎকার থামবে, তখনই সেই নীরব শব্দ শুনতে পাবে।

৬.
সেন্ট জন অফ দ্য ক্রস (খ্রিস্টীয় মিস্টিক: স্পেন)

আমি সেই পরম অন্ধকারে প্রবেশ করলাম,
যেখানে আমার চোখ আর কিছু দেখছিল না, আমার বুদ্ধি আর কিছু বুঝছিল না।
আমি সেখানে কোনো কথা বলিনি, কারণ কোনো শব্দই সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।
অথচ সেই নীরবতার ভেতরেই আমি সব পেয়ে গেলাম।
এটি এমন এক জানা, যেখানে কোনো ‘তথ্য’ নেই;
এটি এমন এক দেখা, যেখানে কোনো ‘দৃশ্য’ নেই।
যখন আমি নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেললাম, তখনই আমি সত্যকে আলিঙ্গন করলাম।

৭. ​
হাফিজ শিরাজি (সুফি: পারস্য)

​এই প্রেম কোনো সাধারণ গল্প নয় যা আমি তোমাকে শুনিয়ে দেব,
এটি এমন এক সুরা যার স্বাদ জিভ দিয়ে নয়, আত্মা দিয়ে নিতে হয়।
কবিরা অনেক সুন্দর শব্দ সাজাতে পারে,
কিন্তু সেই প্রিয়তমে যখন সামনে আসেন, তখন শব্দেরা লজ্জায় লুকিয়ে পড়ে।
যারা কেবল বইয়ের পাতা ওল্টায়, তারা প্রেমে মাতাল হওয়ার রহস্য বুঝবে না।
কারণ সত্য কথাটি হলো—সেটি বলাই যায় না,
সেটি কেবল হয়ে উঠতে হয়।

​৮.
রাইনার মারিয়া রিলকে (জার্মান কবি ও মিস্টিক)

​আমার শব্দগুলো তোমার মহিমার কাছে খুবই ক্ষুদ্র, হে প্রভু।
আমি যখন তোমাকে কোনো নামে ডাকি, তুমি যেন দূরে সরে যাও।
আমি চাই তোমাকে কোনো নাম ছাড়া ভালোবাসতে,
যেমন রাতের অন্ধকার ভালোবাসে গভীর নিস্তব্ধতাকে।
ভাষা দিয়ে যখন আমি তোমার চারপাশে দেয়াল তুলি,
তখন আমি আসলে নিজেকেই বন্দি করি।
আমাকে সেই আদিম ভাষাটি শিখিয়ে দাও,
যা কোনো অক্ষর দিয়ে লেখা হয়নি, যা কেবল হৃদস্পন্দনে বাজে।

​৯.
মীরাবাঈ (ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন)

​আমি সেই প্রেমের স্বাদ পেয়েছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
যেমন একজন জন্ম-বোবা মানুষ মিষ্টি খেলে তার স্বাদ কেবল মনেই অনুভব করে,
কিন্তু মুখে বলতে পারে না।
আমার ভেতর এক অখণ্ড আনন্দ কাজ করছে,
কিন্তু আমি যখনই তা বর্ণনা করতে যাই, আমার শব্দগুলো হারিয়ে যায়।
সেই প্রিয়তমের রূপ এতোটাই উজ্জ্বল যে,
চোখের পলক পড়লে মনে হয় আমি অন্ধকার দেখছি,
আর চোখ বন্ধ করলে মনে হয় আমি আলোয় ডুবে আছি।

​১০.
ইউনুস এমরে (তুর্কি সুফি কবি)

​আমরা কিতাব পড়ে অনেক শব্দ শিখেছি,
আমরা অনেক লম্বা লম্বা বয়ান দিয়েছি।
কিন্তু যখন প্রেমের এক ফোঁটা আমাদের হৃদয়ে পড়ল,
তখন আমাদের সমস্ত ব্যাকরণ আর জ্ঞান অর্থহীন হয়ে গেল।
মানুষ বলে আমি ভাষা জানি, আমি সত্য জানি—
কিন্তু যে নিঃশব্দে ডুব দিয়েছে, সে জানে কোনো ভাষাই তাকে ছুঁতে পারে না।
আসল শব্দটি হলো সেই, যা কোনো ঠোঁট নড়লে বের হয় না।

১১.
উইলিয়াম ব্লেক (ইংরেজ মিস্টিক কবি)

​একটি বালুকণার মাঝে যদি তুমি গোটা জগতকে দেখতে পারো,
আর একটি বুনো ফুলের পাপড়িতে যদি খুঁজে পাও স্বর্গকে;
তবে জানবে—তোমার হাতের তালুতে তুমি অসীমকে ধরে আছো,
আর একটি মুহূর্তের মধ্যেই তুমি বাস করছো অনন্তকাল।
সেখানে আমাদের সাধারণ ভাষার কোনো প্রবেশাধিকার নেই,
কারণ সেই অসীমকে বর্ণনা করার মতো বড় কোনো শব্দ পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি।

​​১২.
দাত্তাত্রেয় (অদ্বৈতনাদ: ভারত)

​আমি কীভাবে সেই পরম সত্তাকে প্রণাম জানাবো?
কারণ আমি যা দিয়ে প্রণাম জানাবো, সেই শব্দটিও তিনি, আর যাকে জানাবো তিনিও তিনি।
তিনি পবিত্র নন, অপবিত্রও নন; তিনি যুক্ত নন, বিযুক্তও নন।
আমি যে কথা বলছি, সেই কথার ভেতরেও তিনি আছেন, আবার কথার বাইরের নীরবতাতেও তিনি।
যখন কোনো বিভেদ নেই, তখন ভাষা কার সাথে কথা বলবে?
আমিই সেই অখণ্ড আনন্দ, আকাশের মতো যার কোনো সীমা নেই।

​১৩.
আত্তার নিশাপুরী (সুফি: পারস্য)

​সাতটি সমুদ্র আর সাতটি উপত্যকা পেরিয়ে যখন পাখিরা সেই পরম রাজপ্রাসাদে পৌঁছাল,
তারা দেখল সেখানে কোনো বর্ণনা নেই, কোনো শব্দ নেই।
তারা যখন নিজেদের বীরত্ব আর কষ্টের কথা বলতে চাইল,
দেখল তাদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তারা যখন ‘তাঁকে’ দেখতে চাইল,
দেখল আয়নায় কেবল তাদের নিজেদেরই প্রতিফলন।
তখন তারা বুঝল—সেই পরম সত্তা কোনো বাইরের বস্তু নন যা ভাষায় বলা যায়,
তিনি হলেন সেই নীরবতা যা আমাদের অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকে।

১৪. ​
মেইস্টার একহার্ট (খ্রিস্টান মরমি: জার্মানি)

​ঈশ্বরকে কোনো নাম দিও না, কারণ তিনি সব নামের ঊর্ধ্বে।
তুমি যদি বলো তিনি ‘ভালো’, তবে তুমি আসলে তাকে সীমাবদ্ধ করলে।
কারণ ভালো আছে বলেই মন্দের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু তিনি তো দ্বৈততার অতীত।
তাই তার সম্পর্কে সবচেয়ে বড় কথা হলো—কিছুই না বলা।
তুমি যখন তোমার মনকে সব চিন্তা আর শব্দ থেকে খালি করবে,
কেবল তখনই সেই শব্দহীন ঈশ্বর তোমার হৃদয়ে কথা বলবেন।
সেই কথা শোনার জন্য তোমাকে কান নয়, বরং তোমার অস্তিত্বকে বন্ধ করতে হবে।

​১৫.
হিকুয়িন একাকু (জেন: জাপান)

​এক হাতে তালি বাজলে কেমন শব্দ হয়?
তুমি কি সেই শব্দ শুনতে পাও?
যদি তুমি তা তোমার বুদ্ধি দিয়ে খুঁজতে চাও, তবে তুমি চিরকাল হারাবে।
কারণ সেই শব্দের কোনো অক্ষর নেই, কোনো স্বর নেই।
যখন তুমি সব কিতাব পুড়িয়ে ফেলবে, আর সব তর্ক থামিয়ে দেবে—
তখনই সেই শব্দহীন শব্দের গর্জন তোমার হৃদয়ে আছড়ে পড়বে।
জেন হলো সেই পথ, যেখানে কথা বলা মানেই হলো পথ হারানো।

১৬.
দাতা গঞ্জ বখশ (সুফি: লাহোর)

​আমি যখন নিজেকে জ্ঞানী ভাবতাম, তখন হাজারো শব্দ আমার মুখে খেলা করত।
কিন্তু যখন সেই চিরন্তন সত্যের এক চিলতে আলো আমার ওপর পড়ল,
আমি দেখলাম আমার সমস্ত ভাষা ভস্ম হয়ে গেছে।
এখন আমি এক অদ্ভুত অবস্থায় আছি—
আমি জানি, কিন্তু আমি বলতে পারি না;
আমি চিনি, কিন্তু আমি বর্ণনা করতে পারি না।
যে জানে, সে বোবা হয়ে যায়; কারণ সত্যের ভাষা হলো এক গভীর বিস্ময়।

​১৭.
আকালি নিহাং (শিখ: ভারত)

​তুমি কোনো বর্ণ নও, তুমি কোনো চিহ্ন নও,
কোনো জাত বা কুল দিয়ে তোমাকে চেনা যায় না।
তোমার কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই, কোনো পোশাক নেই,
অথচ জগতের প্রতিটি শব্দের ভেতরে তোমারই প্রতিধ্বনি।
মানুষ কিতাব পড়ে তোমার নাম দেয়,
কিন্তু তুমি সেই সব নামের ঊর্ধ্বে এক অনন্ত প্রকাশ।
তুমি নিজেই শব্দ, তুমি নিজেই সেই শব্দহীনতা যা সৃষ্টির আগে ছিল।

১৮.
লাল দেদ (শৈব: কাশ্মীর)

​আমি মন্ত্র জপ করতে করতে নিজের জিহ্বাকে ক্লান্ত করে ফেলেছিলাম,
আমি কিতাব পড়তে পড়তে নিজের বুদ্ধিকে করে ফেলেছিলাম ভারাক্রান্ত।
কিন্তু হঠাৎ একদিন আমি দেখলাম, আমার ভেতরের আকাশটা খুলে গেছে।
সেখানে কোনো কথা নেই, কোনো মন্ত্র নেই, কোনো প্রার্থনা নেই।
আমি কেবল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম—
দেখলাম, আমিই সেই প্রশ্ন, আর আমিই সেই উত্তর।
সেই মুহূর্তে আমার সব ভাষা একটি দীর্ঘশ্বাসে বিলীন হয়ে গেল।

​১৯.
ওমোরি সোজেন (জেন মাস্টার ও ক্যালিগ্রাফার)

আমি যখন তুলি দিয়ে একটি বর্ণ লিখি, আমি আসলে শব্দ লিখি না;
আমি লিখি আমার হৃদয়ের সেই শূন্যতাকে যা কোনোদিন পূর্ণ হবে না।
যখন তুলিটি কাগজের ওপর দিয়ে যায়, তখন সেখানে কোনো ‘আমি’ থাকে না,
থাকে কেবল একটি গতি, একটি স্পন্দন।
যদি তুমি সেই বর্ণের অর্থ বুঝতে চাও, তবে তুমি ভুল করবে।
তার বদলে সেই সাদা কাগজের দিকে তাকাও যা অক্ষরটিকে ধরে রেখেছে—
সেই সাদা শূন্যতাই হলো আসল মিস্টিক বাণী।

​২০.
যোহান উলফগ্যাং ফন গ্যোটে (জার্মান মরমিবাদ)

​সব ক্ষণস্থায়ী বস্তু আসলে কেবল এক একটি রূপক বা প্রতীক মাত্র।
যা কিছু এখানে অপ্রাপ্তি বলে মনে হয়, উচ্চতর জগতে তা-ই পূর্ণতা।
যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এখানে তা-ই শেষ পর্যন্ত ঘটে দেখায়।
চিরন্তন নারীত্ব
আমাদের সেই অসীম স্তরের দিকে টেনে নিয়ে যায়—
যেখানে পৌঁছানোর পর মানুষের সব কবিতা আর সব দর্শন স্তব্ধ হয়ে যায়।

​২১.
হিল্ডেগার্ড অফ বিনগেন (মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান মিস্টিক)

​আমি যখন সেই জীবন্ত আলোর শিখায় নিমজ্জিত হই,
তখন আমার সমস্ত দুঃখ আর স্মৃতি বিলীন হয়ে যায়।
আমি যা দেখি তা আমি কোনো মানুষের ভাষায় বর্ণনা করতে পারি না।
এটি কোনো সাধারণ দেখা নয়, এটি হলো এক প্রকার ‘হওয়া’।
সেখানে কোনো নির্দিষ্ট শব্দ নেই, কিন্তু সেখানে আছে এক মহাজাগতিক সংগীত—
যা কান দিয়ে নয়, যা কেবল আত্মার প্রতিটি রন্ধ্র দিয়ে শোনা যায়।

২২.
দাদূ দয়াল (ভারতীয় মিস্টিক কবি)

​পণ্ডিতেরা কাগজের পাতায় ঈশ্বরকে খোঁজে,
আর মিস্টিকরা তাঁকে খোঁজে হৃদয়ের নিভৃতে।
সেখানে কোনো কলম নেই, কোনো কালি নেই, কোনো বর্ণমালা নেই;
অথচ সেখানে এক অনন্ত কাহিনী লেখা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
তুমি যখন বাইরের সব চিৎকার থামাবে,
তখনই সেই অলিখিত অক্ষরগুলো তোমার ভেতরে জ্বলজ্বল করে উঠবে।
দাদূ বলে, সেই ভাষাই শ্রেষ্ঠ—যা ঠোঁট দিয়ে নয়, প্রাণ দিয়ে পড়া যায়।

২৩.
উৎপলদেব (শৈববাদ: কাশ্মীর)

​হে প্রভু, তুমি যখন আমার হৃদয়ে কথা বলো, তখন সব জাগতিক শব্দ বিষের মতো মনে হয়।
আমি যখন তোমার নাম ডাকি, তখন আমার জিহ্বা অমৃতের স্বাদে ভিজে যায়।
কিন্তু যখন তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও, তখন আমার ডাক স্তব্ধ হয়ে যায়।
কারণ তখন ডাকার মতো আর কেউ থাকে না, শোনার মতোও কেউ থাকে না।
সেই পরম শূন্যতা আর পূর্ণতার মিলনকে আমি কী নাম দেব?
আমি কেবল এক বিস্ময়কর মৌনতায় তোমার দিকে চেয়ে থাকি।

​২৪.
ইক্কিউ (জেন: জাপান)

দশ বছর আমি বৌদ্ধ শাস্ত্রের জঙ্গলে পথ হারিয়েছিলাম,
আমি হাজারো মন্ত্র আর সূত্রের ভারে নুয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু আজ যখন আমি একটি শুকনো পাতাকে মাটিতে পড়তে দেখলাম,
আমার সব কিতাব অর্থহীন হয়ে গেল।
সত্য কোনো ব্যাকরণে নেই, সত্য কোনো তর্কে নেই।
এটি কেবল এই মুহূর্তের একটি দীর্ঘশ্বাস—
যা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলেই হারিয়ে যায়।

​২৫.
হাসান আল-বাসরি (সুফি)

​জ্ঞানী মানুষের জিহ্বা থাকে তার হৃদয়ের পেছনে,
সে আগে অনুভব করে, তারপর যদি প্রয়োজন হয় তবে কথা বলে।
আর মূর্খ মানুষের হৃদয় থাকে তার জিহ্বার পেছনে—
সে আগে কথা বলে ফেলে, তারপর বোঝার চেষ্টা করে সে কী বলেছে।
কিন্তু মিস্টিক বা সাধক হলেন তিনি, যার হৃদয় আর জিহ্বা এক হয়ে গেছে—
তিনি যা দেখেন তা বলতে পারেন না, আর যা বলেন তা তাঁর দেখা সত্যের সামান্য এক কণা মাত্র।

​​২৬.
মনসুর হাল্লাজ (সুফি)

​আমিই তিনি, যাঁকে আমি ভালোবাসি;
আর যাঁকে আমি ভালোবাসি, তিনিই আমি।
আমরা দুটি আত্মা, যারা একই দেহে বাস করি।
তুমি যদি আমাকে দেখো, তবে তুমি তাঁকেই দেখলে;
আর যদি তাঁকে দেখো, তবে আমাদের দুজনকেই দেখলে।
এই অবস্থায় পৌঁছানোর পর আমার জিহ্বা স্থব্ধ হয়ে গেছে,
কারণ প্রেমের এই একত্ব কোনো বর্ণমালার দাস নয়।

​২৭.
লল্লেশ্বরী বা লাল দেদ (শৈব: কাশ্মীর)

​আমি অনেক খুঁজেছি, অনেক ঘুরেছি,
আমি বাইরের জগতের শব্দে সত্যকে খুঁজেছি।
কিন্তু যখন আমি নিজের ভেতরে তাকালাম,
দেখলাম সেই পরম সত্তা আমার হৃদয়ের নিভৃতে বসে আছেন।
তখন আমার সব পূজা, সব মন্ত্র আর সব শ্লোক ফুরিয়ে গেল।
আমি এখন কী বলব? কার কাছে বলব?
যখন আমি নিজেই সেই সত্য হয়ে গেছি, তখন বলার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

​২৮.
উইলিয়াম ব্লেক (মরমি কবি: ইংল্যান্ড)

​যদি আমাদের উপলব্ধির দরজাগুলো পরিষ্কার করা হতো,
তবে প্রতিটি বস্তুকে আমাদের কাছে মনে হতো অসীম—ঠিক যেমনটি সে আসলে।
কিন্তু মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে,
যতক্ষণ না সে সবকিছুকে দেখছে কেবল তার সংকীর্ণ ইন্দ্রিয়ের ছিদ্র দিয়ে।
আমরা যে ভাষায় কথা বলি, তা সেই সংকীর্ণ ছিদ্রেরই অংশ।
কিন্তু মিস্টিকরা সেই দেয়াল ভেঙে এমন এক জগত দেখেন
যা কোনো ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

​২৯.
কবীর (ভারতীয় ভক্তিবাদ)

​পুথি পড়ে পড়ে সারা জগত শেষ হয়ে গেল,
কিন্তু কেউ সত্যিকারের পণ্ডিত হতে পারল না।
কেবল সেই আড়াই অক্ষরের ‘প্রেম’ শব্দটি যে পড়তে পেরেছে,
সেই প্রকৃত জ্ঞানী।
অক্ষর তো অনেক আছে, শাস্ত্রও অনেক আছে,
কিন্তু সেই নামহীন প্রেমের সাগরে ডুব না দিলে
সব শব্দই কেবল শুষ্ক ধুলোর মতো মনে হয়।

​৩০.
একজন জেন মিস্টিক (জাপান)

​বুদ্ধের বাণী হলো কেবল একটি ফাঁকা মুঠি,
যা দিয়ে শিশুদের কান্না থামানো হয়।
যখন তুমি কান্না থামিয়ে শান্ত হবে,
তখন তুমি দেখবে সেই হাতের ভেতরে আসলে কিছুই নেই।
সেই ‘কিছুই না’ বা ‘শূন্যতা’ই হলো পরম প্রাপ্তি।
শব্দগুলো হলো কেবল ইশারা,
যখন তুমি গন্তব্যে পৌঁছাবে, তখন ইশারা করার আঙুলটি ভুলে যেও।

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত