২৯ জানুয়ারি ২০২৬
Rahat Khan (19 December 1940 – 28 August 2020) was a Bangladeshi journalist and litterateur. He wrote more than 32 novels. He won Bangla Academy Literary Award in 1973 and Ekushey Padak in 1996 by the Government of Bangladesh. Ahmad Mazhar's analysis of Rahat Khan's literary works, 'Rahat khanke khujte giye', Meghchil
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
আহমাদ মাযহার
প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক
71

আহমাদ মাযহার
প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক

71

রাহাত খানকে খুঁজতে গিয়ে

বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে অনেককেই এমন ধারণা পোষণ করতে দেখি, ঠিকমতো অনুবাদ হয় না বলে আমাদের সাহিত্য আন্তর্জাতিক পরিসর পাচ্ছে না। যেন বেশি করে ইংরেজিতে অনুবাদ হলেই আমাদের সাহিত্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পঙক্তিভুক্ত হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে এমনটা কমই উল্লিখিত হতে শুনি, কোনো একটা দেশের সাহিত্য যদি নিজেদের দেশেই সমাদরমূলক বিশ্লেষণ না পায় তাহলে আন্তর্জাতিক পরিসর পাওয়ার পথ খোলার উপায় থাকে না সে দেশের সাহিত্যের! সমালোচনা-সাহিত্য সম্পর্কে এমন ধারণাও পোষণ করতে দেখা যায়, তা দ্বিতীয় শ্রেণির সৃজনশীলতা। এমন ধারণা পোষণ করতেও দেখেছি অনেককে যে, তাঁরা অপেক্ষায় থাকবেন ভবিষ্যতের কোনো মহান সাহিত্য-সমালোচকের জন্য যিনি তাঁর প্রতিভাকে সনাক্ত করে তাঁর নিজের দায় মোচন করবেন। কিন্তু একজন লেখক যে সমসাময়িক কারো রচনা সম্পর্কে আত্মতাগিদ থেকে কিছু লিখবেন তার অনুপ্রেরণা পান না। নিজের রচনা পঠিত হবে এমন প্রত্যাশা করলেও সমসাময়িক অন্যের রচনা সম্পর্কেও নিজের মতামত যে নিজেরও উৎকর্ষের উৎস হতে পারে তা অনুধাবন করেন না। আর তারা লক্ষ করেন না, সাহিত্য সমালোচনা কেবল নান্দনিক উৎকর্ষ অনুসন্ধানেরই বিষয় নয়, বিষয় সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-ইতিহাস ভিত্তিক নানা অনুসন্ধানেরও। সমালোচনা পাঠ করে একজন লেখক হয়তো নিজের উৎকর্ষ ঘটাতে পারেন না, কিন্তু যদি কোনো সৃষ্টিকর্মের উৎকর্ষ অব্যাখ্যেয় রয়ে যায় তার অনুসন্ধানের জন্য সমালোচনা-সাহিত্য থাকা যে জরুরি তা স্বীকার না করার কারণ নেই। প্রকৃতপক্ষে সমালোচনা-সাহিত্যও এক ধরনের সৃজনমননশীল সাহিত্যই।

আরেক দিক থেকে দেখলে সাহিত্য-সমালোচনা হতে হলে সাহিত্যতথ্যের প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ থাকা জরুরি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাথমিক দায়িত্বও পালনে সমর্থ নয়! কোনো প্রতিষ্ঠান গঠনের সময় উচ্চ মানের প্রত্যাশা থাকলেও তা নীতি অনুসারে অনুশীলিত হয় না! যেসব প্রাথমিক তথ্যাদি সরবরাহ সমালোচনা সাহিত্যের ভিত্তি আমাদের সমাজে তারও উৎস নেই। আবার এ কথাও ঠিক যে, উৎকর্ষ বিচারে কোনো কোনো লেখকের ভাগ্যে সমালোচনা জোটে বটে কিন্তু এর জন্য উৎকর্ষই কেবল অনুঘটক নয়, রাজনীতিসহ আরো নানা প্রাসঙ্গিকতা থাকতে হয়। এ নিয়ে হয়তো আরো অনেক বিস্তার করা যায় কিন্তু তা এই রচনার মূল উদ্দেশ্যকে পরিহসিত করবে বলে বিরত থাকা হলো।

কথাগুলো মনে পড়ল রাহাত খান প্রসঙ্গে। রাহাত খান লেখক হিসাবে অজ্ঞাতকুলশীল কেউ ছিলেন না। কথাসাহিত্যিক হিসাবে তাঁর একটা পরিচয় ও প্রতিষ্ঠা ছিল। এমনকি বাংলাদেশে সাহিত্যের জন্য সম্মানজনক পুরস্কারগুলোও পেয়েছিলেন তিনি। যেমন সাহিত্যে অবদানের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৩), এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক (১৯৯৬) ইত্যাদি পেয়েছেন। এমন যে লেখক রাহাত খান তাঁর বইগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্যও পাওয়া সহজ নয়। আমার এই রচনাটি অনেকটা তাঁর সম্পর্কিত প্রাথমিক কৌতূহল মোচনের চেষ্টা। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে ভবিষ্যতে প্রাপ্য মনোযোগ দিয়ে লেখার ইচ্ছে জারি রেখে এই রচনাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছি।

২.
রাহাত খান নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকা বেতারের সূত্রে। তিনি সেসময় ‘শিক্ষার্থীদের আসর’ নামে (স্মৃতি থেকে লিখছি বলে এই নামটিই ছিল কিনা নিশ্চিত নই) একটা অনুষ্ঠান করতেন। সেটা ১৯৭৬ বা ৭৭ সাল হতে পারে। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল মন্দ্রতার দিকে, স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ ও প্রমিত। কথা বলতেন ছোট ছোট বাক্যে সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায়। সে সময় যাঁরা মোটামুটি প্রমিত উচ্চারণ করতে পারতেন, যথা ঘোষধ্বনি ও অঘোষধ্বনি উচ্চারণে যাঁদের স্পষ্টতা থাকত বেতার টিভির অনুষ্ঠানে তাঁরা অগ্রাধিকার পেতেন। সমাজে অনেকটা এমন ধারণা চালু ছিল, কেউ প্রমিত উচ্চারণে কথা বললে তাঁকেই মনে হতো তিনি উচ্চরুচি অনুশীলনের মানুষ। রাহাত খানের কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণও আমাকে সেরকম ধারণাই দিয়েছিল। যে সময়ের কথা বলছি তখনো আমি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে যাতায়াত শুরু করিনি। বেতারই ছিল আমার সংস্কৃতিকতা আস্বাদনের একমাত্র মাধ্যম। দারিদ্র্যহেতু বাসায় টেলিভিশনও ছিল না। ফলে টেলিভিশন দেখার সুযোগ মিলত কালেভদ্রে। বেতারের অনুষ্ঠান শোনার সূত্রে রাহাত খানের কথা ভালো লাগত। স্কুলপড়ুয়া কালে রোকনুজ্জামান খান সম্পাদিত ‘ঝিকিমিকি’ নামে একটি গল্প-সংকলনে রাহাত খানের ‘স্ট্যান্ডোফোবিয়া’ নামে একটি হাসির গল্প পড়ে পাঠক হিসাবে আমি ছিলাম অভিভূত। নিজের বুদ্ধিতেই দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে বুঝে নিয়েছিলাম বেতারে রাহাত খান নামে যাঁর কণ্ঠ শুনি তিনিই এই গল্পেরও লেখক! ‘স্ট্যান্ডোফোবিয়া’ গল্পটি পড়ার পর থেকে এই নামটির দিকে লক্ষ্য রাখতে শুরু করেছিলাম। তখন তিনি সাংবাদিকতা করলেও এক সময় যে কলেজে শিক্ষকতা করতেন ততদিনে তা জেনে গিয়েছি। ঈদসংখ্যা বিচিত্রা ও রোববার সূত্রে তাঁর লেখার সঙ্গেও মোটামুটি পরিচিত হয়েছি সত্তরের দশকেই। তাঁর উপন্যাস ‘এক প্রিয়দর্শিনী’ (বইরূপ:১৯৮৩), ‘ছায়া দম্পতি’ (বইরূপ:১৯৮৪) পড়ে ফেলেছিলাম ঈদসংখ্যাতেই! ১৯৭৯ সালে অনুশীলন সংঘের নিয়মিত সাহিত্য সভায় আসার পর সেখান থেকে জানতে পারলাম রোকনুজ্জামান খান সম্পাদিত ‘কচি ও কাঁচা’ পত্রিকায় বিভিন্ন পর্ব গল্প আকারে বের হলেও বইরূপ পাওয়ার সময় এটা (‘দিলুর গল্প’) নামে উপন্যাস আকারে বিন্যস্ত হয়! বাংলা ভাষার হাসির গল্পের ধারায় কি ছোটদের কি বড়দের সব ধারার বিবেচনাতেই রাহাত খানের ‘দিলুর গল্প’ তুলনাবিহীন! বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্কুল কর্মসূচির জন্য বইটিকে অন্তর্ভুক্ত করার সময় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদও এমনটিই বলেছিলেন এর স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করে। রাহাত খান আমার কাছে তাঁর এই সহপাঠীর সমাদরের খবর শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন মনে পড়ছে। অবশ্য আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিজেও সরাসরি তাঁর কাছেও বইটির প্রশংসা করেছিলেন।

সমালোচনা পাঠ করে একজন লেখক হয়তো নিজের উৎকর্ষ ঘটাতে পারেন না, কিন্তু যদি কোনো সৃষ্টিকর্মের উৎকর্ষ অব্যাখ্যেয় রয়ে যায় তার অনুসন্ধানের জন্য সমালোচনা-সাহিত্য থাকা যে জরুরি তা স্বীকার না করার কারণ নেই। প্রকৃতপক্ষে সমালোচনা-সাহিত্যও এক ধরনের সৃজনমননশীল সাহিত্যই

আমি রাহাত খানের ছোটদের লেখা পছন্দ করতাম। তিনি চাইতেন তাঁর আরেক ছোটদের বই ‘হাসিকান্নার চিকিৎসা’ (১৯৮৩) নিয়ে কিছু লিখি। তাঁর ধারণা ছিল, লিখবার উদ্দেশ্যে আবার পড়লে বইটা আমার আরো ভালো লাগবে এবং এটি ‘দিলুর গল্পে’র মতোই সমাদর পাবে। লিখব লিখব করেও বইটি নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় লেখা হয়ে ওঠেনি বলে একটা দুঃখবোধও কাজ করে আমার। এই লেখা লিখতে বসে তাঁর ছোটদের কাহিনি ‘হবু রাজা গবু মন্ত্রী’ (১৯৭৭), তাঁবুর জগৎ (?), ‘ছোটচাচা এবং আমরা’ (?), ‘গুপ্তধন নিয়ে ঝামেলা’ (২০০১), ‘স্বর্ণ ত্রিভুজে হাঙ্গামা’ (?) বইগুলোর খোঁজ পেয়েছি! আর ‘শাদা কাকু ও কালো কাক’ (বইরূপ: ২০০৯) তো লুৎফর রহমান রিটন তাঁর ‘ছোটদের কাগজ’ পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশ করেছিলেন আমার চোখের সামনেই ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে। এটাও মনে আছে অনেক বছর বিরতির পর ছোটদের জন্য লুৎফর রহমান রিটনের তাগাদায় ছোটদের জন্য লিখেছিলেন এই কাহিনিটি!

রাহাত খানের যে একটি অন্তঃশীল কৌতুকপরায়ণ মন ছিল এটা তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানেন। মনে পড়ছে নব্বইয়ের দশকে একবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকার সময় রেজাউদ্দিন স্টালিনের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে শিবরাম চক্রবর্তী রচনাবলি পড়তে নিয়েছিলেন। তখন জেনেছিলাম, মাঝেমাঝেই তিনি শিবরাম পড়েন। কিন্তু তাঁর হাস্যরস সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য শিবরাম চক্রবর্তী বা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের চেয়ে আলাদা। তাঁর শিশুসাহিত্য নিয়ে হয়তো আলাদা করে কিছু একটা লিখব। তখন এ বিষয়ে হয়তো গভীরতর পর্যালোচনা সম্ভব হবে।

গল্প লেখা দিয়ে রাহাত খানের সাহিত্য চর্চার শুরু। পরে তো উপন্যাসেই বহুপ্রজ হয়েছেন। আধুনিক বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনায় তাঁর বিশেষত্ব আমাদের সাহিত্য সমাজে সত্তরের দশকেই যথেষ্ট স্বীকৃত ছিল। আশির দশকে তিনি ছিলেন বেশ পরিচিত ও সরব লেখক। আমাদের সমাজে রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো জাজ্বল্যমান প্রসঙ্গ না থাকলে কোনো বিশেষ সাহিত্য নিয়ে কম আলোচনা হয়। ফলে ২০২০ সালে তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গেই যেন খানিকটা বিস্মৃতিতে চলে গেছেন তিনি। তরুণ লেখকদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেমন সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল তাতে তাঁকে নিয়ে আরো অভিনিবিষ্ট বিশ্লেষণ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তাঁর মতো লেখকের বেলায় এটা স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া যায় না!

৩.
সংক্ষেপে রাহাত খানের জীবনের কিছু খুঁটিনাটি এখানে থাকুক। তাঁর জন্ম ১৯৪০ সালের ১৯ ডিসেম্বর। বেড়ে উঠেছেন জাওয়ার নামে কিশোরগঞ্জের একেবারেই প্রান্তিক এক গ্রামে। তখন জাওয়ার মাইনর স্কুলে পড়তেন তিনি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, সাহিত্যিক-রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদসহ অনেক খ্যাতিমানই এই স্কুলে পড়েছেন বলে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে সুযোগ পেয়েও ওখানে ভর্তি না হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে। তখন ঐ এলাকার ঐটিই ছিল সবচেয়ে নামকরা স্কুল। পরে স্কুলটির শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রধান অতিথি করায় বেশ অবাক ও খুশি হয়েছিলেন তিনি। বিদ্যায়তনিক পড়াশোনার চেয়ে গল্পের বইই পড়তেন বেশি। লেখক হিসেবে সুবোধ ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন তাঁর প্রিয় ও অনুসরণীয়। অনেকেই জানেন, যেমনটা মনসুর হেলাল জানাচ্ছেন, সুবোধ ঘোষের ‘জতুগৃহ’, ‘অযান্ত্রিক’ গল্পগুলো তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অনুপ্রাণিত করেছিল নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্পটিও। ‘নিভু নিভু’ নামে আনন্দমোহন কলেজ বার্ষিকীতে প্রকাশিত তাঁর গল্পের জন্য লেখক হিসাবে প্রথম অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশ্য ‘আজাদ’ পত্রিকায় তাঁর একটি লেখা ছাপা হয়ে গিয়েছিল এর আগেই।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে ময়মনসিংহ শহরে থাকতে শুরু করেন। অর্থনীতি ও দর্শন নিয়ে শহরের আনন্দমােহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকায় আসেন তিনি। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন থাকতেন ফজলুল হক হলে। এখানেই তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জিয়া হায়দার, কাজী আনোয়ার হোসেন প্রমুখকে পান সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বছরের পাঠ শেষে ১৯৬১ সালে এমএ পাশ করেন। প্রথমেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ময়মনসিংহের একটি কলেজে। প্রায় আট বছর ঢাকার জগন্নাথ কলেজসহ বেশ ক’টি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ততদিনে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত লেখক হিসেবে পরিচিত তিনি। সাহিত্য সমাজে রাহাত খান যে কিছুটা তরঙ্গ তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন তার সামান্য পরিচয় আমরা মনসুর হেলাল সূত্রে একটি ঘটনার উল্লেখ থেকে জানতে পারি। কামাল বিন মাহতাব সম্পাদিত ‘ছোটগল্প’ পত্রিকার অফিসে এক দিন আহমদ ছফা তাঁকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আপনার সব গল্প পড়েছি। ঠিকানা জোগাড় করতে পারিনি বলে চিঠি লিখতে পারিনি।’

বাংলাদেশের গত শতাব্দীর ষাটের দশকের সাহিত্যিক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার ও ঔপন্যাসিক রাহাত খান। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে, তাঁর সমকালের সমাজ ও পরিবেশ সম্পর্কে নিজের দার্শনিক উপলব্ধিকে প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় প্রকাশ করেছেন। আমাদের জীবন যাপনের সকল অনুষঙ্গের–যথা আনন্দ ও বেদনা, প্রাপ্তি ও হাহাকার, সুখ ও দুঃখ–সবকিছুরই আপাত সরল রূপকার তিনি

জগন্নাথ কলেজে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আজহারুল ইসলাম ও শামসুজ্জামান খানকে। রাহাত খান ও শামসুজ্জামান খান ব্যাচেলরস কোয়ার্টারের এক রুমেই থাকতেন। পাশেই থাকতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ১৯৬৯ সালে গণ-আন্দোলনেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল। সেই অপরাধে তাঁকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। তখন দিন-রাত তিনি সময় কাটাতেন কাজী আনোয়ার হোসেনের অফিসে। কাজী আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানার একটি চরিত্র রাহাত খান নামের উৎস লেখকের বন্ধু প্রকৃত রাহাত খানই! ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের পর দৈনিক ইত্তেফাক যখন নতুন করে বের হলো, তখন ইত্তেফাকের বার্তা ও নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন। বলতে গেলে তাঁর হাত ধরেই রাহাত খানের প্রকৃত অর্থে সাংবাদিকতার সম্পন্ন পেশাজীবন শুরু। যদিও ঐ বছরই ‘দৈনিক সংবাদে’ কাজের সামান্য অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। ইত্তেফাকে প্রথমে ছিলেন সহকারী সম্পাদক, সম্পাদক হন ২০০৭ সালে। তার আগে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন প্রায় ১৫-১৬ বছর। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রাহাত খান বলেন, তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তখন ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদক। তাঁর সাহসের কাছে কোনো কিছু দাঁড়াতে পারত না। তাঁর রুমেই ছিল সম্পাদকীয় বিভাগ। ঠিক ১০টায় অফিসে এসে আমাকে ছাড়া আর কাউকে পেতেন না। দু-তিন মাস পর এক দিন সিরাজ ভাইকে বললেন, ‘এই ছেলেটির ওপর একটু চোখ রেখো। ওর ভবিষ্যৎ ভালো।’ ১৯৭৮ সালে ইত্তেফাক থেকে তখন বের হয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘রোববার’। এর নেপথ্যে ছিলেন তিনি। কবি রফিক আজাদসহ অনেককেই সাপ্তাহিকটিতে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ইত্তেফাকের পর ‘দৈনিক বর্তমান’ ও শেষে ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ছিল মোটামুটি তাঁর পেশাগত জীবনের পরিচয়। আশি বছর পূর্ণ হবার আগেই ২০২০ সালের ২৮ আগস্ট মহামারির কালে তাঁর মৃত্যু হয়।

৪.
গদ্য ভঙ্গির স্মার্টনেস ও নিজস্বতার কারণে আকর্ষণীয় তাঁর গল্প-উপন্যাস। জীবনকে দেখারও একটা নিজস্ব ভঙ্গি ছিল তাঁর। বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান মধ্যবিত্ত সমাজের শিরাস্পন্দ অনুভবে তীক্ষ্ণ সমাজসচেতনতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অনেক লেখায়। তাঁর মৃত্যুত্তর শোকলেখনে ফরিদ কবির যথার্থই বলেছিলেন, তাঁর ‘গদ্যভঙ্গি ও সংলাপ ছিলো আমাদের এ অঞ্চলের নাগরিক মধ্যবিত্ত জনমানুষের মুখের ভাষার সবচাইতে কাছাকাছি।’ তাঁর গদ্যরীতি বাহুল্যবর্জিত শব্দে বিন্যস্ত। বাক্য ব্যবহারেও এক ধরনের পরিশীলিত সরল্য আছে। তাঁর চোখ-কান ছিল খোলা। প্রায় সারা পৃথিবী ঘুরেছেন বলেই হয়তো মানুষের জীবনবৈচিত্র্য অনুভবে তিনি ছিলেন এতটা তীক্ষ্ণ। জীবন যাপনেও ছিলেন মুক্তমনা। নিজের লেখা গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের মতাে যেন একটু বেহিসেবী ও বেপরােয়া।

বাংলাদেশের গত শতাব্দীর ষাটের দশকের সাহিত্যিক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার ও ঔপন্যাসিক রাহাত খান। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে, তাঁর সমকালের সমাজ ও পরিবেশ সম্পর্কে নিজের দার্শনিক উপলব্ধিকে প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় প্রকাশ করেছেন। আমাদের জীবন যাপনের সকল অনুষঙ্গের–যথা আনন্দ ও বেদনা, প্রাপ্তি ও হাহাকার, সুখ ও দুঃখ–সবকিছুরই আপাত সরল রূপকার তিনি। তাঁর কথাসাহিত্যে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ তাদের অন্তর্জীবন ও বহির্জীবনের সমস্তকিছু নিয়ে যেমনভাবে উপস্থিত হয় তাতে পাঠকদেরও এ-কথা ভাবতে প্ররোচিত হতে হয় যে তিনিও এদেরই একজন।

সংখ্যায় খুব বেশি নয় তাঁর গল্পের সংকলন। প্রথম গল্পের বই ‘অনিশ্চিত লোকালয়’ বেরিয়েছিল ১৯৭২ সালে; অল্প ব্যবধানেই ‘অন্তহীন যাত্রা’ (১৯৭৫) ও ‘ভালোমন্দের টাকা’ (১৯৭৭) বের হলে সাহিত্য মহলে তাঁর অবস্থান দৃঢ় হয়। পরের গল্প-সংকলনের সঙ্গে ব্যবধান অবশ্য কিছুটা দীর্ঘ। ‘রাহাত খানের গল্প’ বেরিয়েছিল প্রায় দুই দশক পরে, ১৯৯৬ সালে। আরো দীর্ঘ বিরতিতে বের হয় ‘রাহাত খানের সেরা গল্প’ (২০২২)। বৈশ্বিক ও দেশীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতে স্ব-সমাজের মানুষের প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়ার ছাপ আছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে। তাঁর গল্প ‘ইমান আলীর মৃত্যু’, ‘ভালোমন্দের টাকা’, ‘আমাদের বিষবৃক্ষ’ বেশ বিখ্যাত হয়েছিল। এ ছাড়াও ‘চুড়ি’, ‘মধ্যিখানে চর’, ‘অন্তহীন যাত্রা’, ‘উদ্বেল পিপাসা’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘শরীর’, ‘বাবার চিঠি’, ‘নারী’, ‘এই বাংলায়’, ‘মুক্তিযোদ্ধার মা’, ‘মধ্যরাতে’ ও ‘চুপি চুপি বাঁশি বাজে’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প।

রাহাত খানের কথাসাহিত্যের মৌলিক জিজ্ঞাসা বাংলাদেশের গঠমান নতুন সমাজ জীবনের দ্বন্দ্বসংঘাত। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম কথাসাহিত্যিক যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পাকচক্রে বদলে যাওয়া বৈচিত্র্যময় সমাজ জীবনের ক্রোধ-লোভ-হতাশা-যৌনতা-প্রত্যাশা এসব কিছুকেই গল্প-উপন্যাসে ধারণ করতে চেয়েছেন। আহমাদ মোস্তফা কামাল যথার্থই বলেছেন তাঁর উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য-নিরূপক কথা–তাঁর উপন্যাসগুলো ‘ক্যামেরা দৃষ্টি সম্পন্ন’।

রাহাত খানের কথাসাহিত্যের মৌলিক জিজ্ঞাসা বাংলাদেশের গঠমান নতুন সমাজ জীবনের দ্বন্দ্বসংঘাত। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম কথাসাহিত্যিক যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পাকচক্রে বদলে যাওয়া বৈচিত্র্যময় সমাজ জীবনের ক্রোধ-লোভ-হতাশা-যৌনতা-প্রত্যাশা এসব কিছুকেই গল্প-উপন্যাসে ধারণ করতে চেয়েছেন

রাহাত খানের প্রথম উপন্যাস ‘অমল ধবল চাকরি’ (১৯৮২) পড়েছিলাম বের হবার পরপরই। ‘এক প্রিয়দর্শিনী’ (১৯৮৩) ও ‘ছায়া দম্পতি’ (১৯৮৪) পড়েছিলাম ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ বা ‘রোববারে’র ঈদসংখ্যায়, বইরূপ পাওয়ার আগেই। ‘ব-দ্বীপের ভবিষ্যৎ’ও (১৯৮২) ঐ সময়েরই উপন্যাস। ‘এক প্রিয়দর্শিনী’ লেখা হয়েছিল জার্মানির বার্লিন শহরের মানুষ ও বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসের আখ্যান গড়ে উঠেছে সাংবাদিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ১৪ জন মানুষের প্রাত্যহিকতা ঘিরে; তাদের সম্পর্ক, ভাব বিনিময় প্রেম, মনোজগতের ভাঙচুর ও পাস্পরিক খুনসুটি উপন্যাসের কাহিনিতে তরঙ্গিত হয়েছে। একজন বাংলাদেশির চোখে পাশ্চাত্য জীবনের খোলামেলা মেলামেশা, মদ খাওয়া ও সমাজ বিশ্লেষণ ওই উপন্যাসে উপজীব্য হয়েছে। এমন বিষয়কে সামাল দেয়ার জন্য যে ধরনের জীবনাভিজ্ঞতা থাকা দরকার তেমন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ আমাদের লেখালিখির ভুবনে ছিলই না বলতে গেলে। গ্রামজীবন ভিত্তিক বিষয় ছিল তখনকার সাহিত্যের প্রধান গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রবণতা। ঘটনাক্রমে ঈমান আলীর মৃত্যু গল্পটি ঐ ধারার বলে এবং একটি সফল গল্প বলে তিনি মনোযোগের পঙক্তির বাইরে পড়েননি।

‘হে অনন্তের পাখি’ (১৯৮৬) উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে বের হচ্ছিল ‘সাপ্তাহিক রোববার’ পত্রিকায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসের সমান্তরালে। ধারাবাহিকভাবে বের হবার সময়ই উপন্যাসটি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটি বিশিষ্ট। এর কাহিনি মূলত উনিশশো পঁচাত্তরের বিয়োগাত্মক ঘটনার পরের সামরিক শাসনামলের সমাজ ও রাজনীতির পটভূমিতে সংস্থাপিত। ঘটনাবলির গভীরে সত্তর-আশির দশকের নগরবাসী মানুষের মর্মপীড়া এ উপন্যাসে মূর্ত। এই উপন্যাসের অন্তর-প্রবাহে এক দিকে রয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতি; অন্য দিকে এতে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নতুন গজিয়ে উঠছে এমন উচ্চবিত্ত শ্রেণির বিকাশের ইতিহাস। অর্থাৎ সামরিক ও রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ায় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও মেরুকরণ তথা ক্ষমতার নতুন সমীকরণ; বণিকপুঁজির প্রভাবে গঠমান ধনিক শ্রেণির যাপিত জীবন তথা যৌনতা, সন্ত্রাস ও ব্যক্তিত্বের পারিবারিক সংঘাত এতে সমাহৃত হয়েছে। বৈচিত্র্যময় শ্রেণির সমাহারে শহরের প্রবহমান জীবনপ্রণালিকেই বাস্তবভাবে তুলে ধরেছেন এ উপন্যাসে। রাজনৈতিক ঘটনাবর্ত কীভাবে বদলে দেয় শহরে বসবাসকারী মানুষদের জীবনকে, কাহিনির পরতে পরতে সেই অনুভব বুনে দিয়েছেন তিনি। যথার্থ উপন্যাসে যেমন নিরাসক্তি কাঙ্ক্ষিত, ‘হে অনন্তের পাখি’ উপন্যাসে তা আছে। যে মনোযোগ এই উপন্যাসের জন্য রাহাত খানের প্রাপ্য তা এখনো তিনি পাননি।

বেশ পরের দিকের উপন্যাস ‘আমার সময়ে’ (২০০৫) স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাক্রম, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপস্থাপিত হয়েছে। আরো পরের দিকে লেখা ‘এখন যেখানে দাঁড়িয়ে’ (২০১৬) উপন্যাসে তিনটি বাংলাদেশীয় চরিত্রের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে গোটা বাংলাদেশের গতিধারা। এই উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ভাষাটি ব্যবহার করেছেন তিনি তা অত্যন্ত বিষয়োপোযোগী। ভাষা ও গল্প নির্মাণের শক্তি-সামর্থ দুই-ই লেখকের মৌলস্বভাবকে চিনিয়ে দেয়। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন চিরকালের একটি গল্পই, কিন্তু লেখকীয় হৃদয়স্পর্শে তা যেন হয়ে উঠেছে আমাদেরই সাধারণ পরিচিত জীবনেরই গল্প।

‘হে মাতঃ বঙ্গ’ (১৯৯৭) উপন্যাসের উপজীব্য মুক্তিযুদ্ধ এবং ‘হে মহাশূন্য’ (?) লেখা হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির পটভূমিতে। বিভিন্ন ঈদসংখ্যায় লেখা প্রকাশের চাহিদা মেটাতে একটার পর একটা উপন্যাস লিখে গেছেন তিনি বেশ দ্রুততায়। তবে কোনো কোনোটির আরো উৎকর্ষের সম্ভাবনা থাকলেও সেগুলো বিষয়বস্তুর দিক থেকে এবং লেখকীয় জীবনবোধের দিক থেকে একেবারেই যে তাৎপর্যহীন তা নয়। নিজের লেখা সম্পর্কেও তিনি ছিলেন নির্মোহই। জনপ্রিয়তায় মোহগ্রস্ত ছিলেন না। লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে পারতেন খুব সহজে। কারণ তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। মন একদিকে যেমন ছিল সংস্কারমুক্ত ও উদার তেমনি ছিলেন মননশীল। স্বচ্ছন্দেই স্বীকার করেছিলেন নিজের দুর্বলতাকেও; বলেছিলেন,

‘কিছু উপন্যাস চাপে পড়ে লিখেছি, সেগুলো ধর্তব্যের মধ্যে রাখি না। একসময় দেখলাম, খুব জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছি। কেউ কেউ আমাকে জনপ্রিয় লেখকদের তালিকায় তুলে দিচ্ছে। আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। আমি তো সাহিত্য করতে চাই। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ধারার পথটি বেছে নিয়েছি।’

তাঁর অন্য উপন্যাসগুলোর নাম উল্লেখ করে রাখছি: ‘সংঘর্ষ’ (১৯৮৪), ‘শহর’ (১৯৮৪), ‘হে শূন্যতা’ (১৯৮৬), অগ্নিদাহ (১৯৯৬), ‘আকাঙ্ক্ষা’ (১৯৯৬), ‘কয়েকজন’ (১৯৯৬), ‘প্রতিপক্ষ’ (১৯৯৮), ফিরে আসা (১৯৯৯), ‘আইবেকের দৈত্য’ (২০০০), ‘দিন যায় দিন আসে’ (২০০১), ‘মধ্য মাঠের খেলোয়াড়’ (২০০২), ‘আকাশের ওপারে আকাশ’ (২০০৪), ‘ছায়াপাত’ (২০০৫), ‘জহুরার বাড়ি’ (২০০৮), ‘ভালোমন্দ মানুষ’ (২০১০), ‘দেশ বিদেশ’ (২০১০), দুই নারী (২০১১), ‘কল্পনা’ (২০১৫), ‘এখন যেখানে দাঁড়িয়ে’ (২০১৬), ‘যা যা ঘটেছিল’ (২০১৬), ‘আবার ফিরে আসব’ (২০২৫), ‘কোলাহল’ (?), ‘গন্তব্যে’ (?), ‘ছায়াজীবন’ (?), মন্ত্রিসভার পতন’ (?), এবং ‘হেরে যাওয়া জিতে যাওয়া’ (?), ‘বন্ধনহীন গ্রন্থি’ (?), ‘ভয়াল অমনিবাস’ (২০০১); ‘নিউইয়র্কে কয়েকদিন’ (?) নামে একটা ভ্রমণসাহিত্যও আছে তাঁর।

৫.
গত কয়েকদিন ধরে অন্তর্জাল উৎসে অনুসন্ধান চালিয়ে রাহাত খানের নানা সময়ের কিছু রচনা পড়ে, পূর্বপঠিত রচনা নিয়ে নানাজনের সঙ্গে স্মৃতিচারণা করে রাহাত খানের সৃজনকর্মের সুবাসকে নিজের মধ্যে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলাম। বহু চেষ্টা করেও তাঁর সবগুলো বইয়ের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি অনেকগুলো বইয়ের প্রকাশনাতথ্য জানা। ফলে প্রকাশ কালের জায়গায় প্রশ্নচিহ্ন দিয়ে রাখতে হয়েছে। রাহাত খানের মতো সৃজনশীল ও বহুল সক্রিয় মানুষের জীবন ও কর্মের প্রাথমিক তথ্যাদিও মৃত্যুর অল্পকালের মধ্যেই আমাদের সমাজ কিভাবে বিস্মৃতিতে ঠেলে দেয় এই রচনাটি লিখতে গিয়ে আবারও অনুভব করলাম। তাঁর সম্পর্কে একটি প্রাথমিক পরিচয়ও ভালোভাবে তুলে ধরা গেল না!

[পাঠকদের প্রতি আহ্বান: এই রচনায় রাহাত খানের যেসব বইয়ের নামের পাশে প্রশ্নচিহ্ন দেয়া আছে তার কোনোটি যদি আপনাদের কারো কাছে থাকে তাহলে তার প্রকাশসাল অনুগ্রহ করে আমাকে জানাবেন। এই রচনায় উল্লিখিত তথ্যের কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তা সংশোধনেও আমি উদগ্রীব। তাঁর আরো কয়েকটি বইয়ের নাম বাদ পড়েছে বলে আমার ধারণা। সেগুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা গেলে তা এই রচনাটিতে সংযোজিত ও হবে।]

তথ্যসূত্র:

১. উইকিপিডিয়া
২.‘গল্পের জাদুকর রাহাত খান’, মাসুদ সিদ্দিকী, সমকাল, ১৭ ডিসেম্বর ২০২০
৩. ‘অনন্তের পাখি রাহাত খান’, আন্দালিব রাশদী, দেশ-রূপান্তর, ৩০ আগস্ট ২০২০
৪.‘স্মৃতিতে রাহাত খান’, মঞ্জু সরকার, প্রথম আলো, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
৫. ‘রাহাত খান আমাদের যৌবনে ছিলেন যৌবনেরই প্রতীক’, ফরিদ কবির, আর্টস.বিডিনিউজ২৪.কম, ৩০ আগস্ট ২০২০
৬. রাহাত খান : বাংলা ছোটগল্পের আধুনিক অবতার, মনি হায়দার, বাংলা ট্রিবিউন, ৩০ আগস্ট ২০২০
৭. ‘হে অনন্তের পাখি’, মনসুর হেলাল, প্রতিদিনের সংবাদ, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০
৮. শ্রেষ্ঠ গল্প, রাহাত খান, সম্পাদনা: আহমাদ মোস্তফা কামাল, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা, (২০০৮)
৯. ‘সময়ের অনন্য ভাষ্যকার রাহাত খান, সাইফুজ্জামান, কালবেলা, ৩০ আগস্ট ২০২৪
১০. হে অনন্তের পাখি, মিল্টন বিশ্বাস, জাগো নিউজ, ৩০ আগস্ট, ২০২০
১১. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন, সমকাল, ২৮ অক্টোবর ২০২০
১২. মজিবর রহমান, ভোরের কাগজ, ৩০.০৫.১৯৯৭

কৃতজ্ঞতা: মজিবর রহমান

মন্তব্য লিখুন

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত