হিব্রু কবিতার ইতিহাসে ইয়াননাই (Yannai) একটি গৌরবোজ্জ্বল নাম। তিনি শুধু একজন সাধারণ কবি নন, বরং প্রার্থনার ভাষাকে কাব্যের গভীরতা, ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন ও মানবিক আবেগে নতুনভাবে রূপ দেওয়া এক স্রষ্টা। তিনি ছিলেন প্রাচীন ইহুদি পিয়্যুত (piyyut: এক প্রকার ধর্মীয় সঙ্গীত) কবিদের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর কবিতাগুলো মূলত সিনাগগের প্রার্থনায় ব্যবহারের জন্য রচিত, যা বাইবেলের কাহিনীগুলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে ইহুদি ধর্মীয় জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কাজ ছাড়া হিব্রু লিটার্জিক্যাল অর্থাৎ প্রার্থনামূলক কবিতা পিয়্যুতের বিকাশ কল্পনাই করা যায় না। এই জন্য তাঁকে ‘পিয়্যুতের পিতা’ বলা হয়। তাঁর রচনাগুলি হিব্রু ধর্মীয় সাহিত্যের একটি নতুন ধারার সূচনা করেছিল এবং পরবর্তীকালের বহু কবিকে প্রভাবিত করেছিল।
তাঁর জীবন সম্পর্কে সরাসরি ঐতিহাসিক তথ্য খুবই সীমিত। তবে ধারণা করা হয়, তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে তৎকালীন বাইজান্টাইন শাসনাধীন প্যালেস্টাইনে, সম্ভবত তিবেরিয়াস বা জেরুজালেমের মতো কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাব্বিনিক কেন্দ্রে বসবাস করতেন।
তাঁর কবিতার ভাষা, ধর্মতাত্ত্বিক ইঙ্গিত ও লিটার্জিক্যাল কাঠামো থেকে বোঝা যায়, তিনি ছিলেন একজন গভীরভাবে শিক্ষিত ইহুদি পণ্ডিত। সিনাগগভিত্তিক উপাসনার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ‘তানাখ’ (হিব্রু বাইবেল), ‘মিদ্রাশ’ (এক ধরনের ইহুদি ধর্মীয় সাহিত্য, যা বাইবেলের পাঠ্যের গভীর ব্যাখ্যা এবং রাব্বিনিক শিক্ষার পদ্ধতিকে বোঝায়), ও ‘তালমুদ’ (ইহুদি ধর্মের একটি কেন্দ্রীয় ধর্মীয় গ্রন্থ, যা তাদের মৌখিক আইন এবং ধর্মীয় আলোচনা, ব্যাখ্যা, ও বিতর্কের একটি বিশাল সংকলন) তাঁর চিন্তার মূল ভিত্তি।
তিনি এমন এক সময়ে কাব্যচর্চা করতেন যখন ইহুদি সম্প্রদায়ের উপর বাইজেন্টাইন সরকারের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা তাঁর রচনায় পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই সময়টি প্যালেস্টাইনের ইহুদি-অঞ্চলে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও লিটার্জিকাল পরিবর্তনের সময়। তখন ইহুদি সম্প্রদায়ের উপাসনালয় সিনাগগ ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুশীলনের প্রভাব অনুভূত হচ্ছিল। তাঁর কাজ সেই প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে।
ইয়াননাই-এর দর্শন তাঁর কবিতার মূল ভিত্তি। এটি মূলত ইহুদি ধর্মতত্ত্ব, আইন (হালাখা) ও ঐতিহ্যবাহী আখ্যানের (আগাদা) উপর প্রতিষ্ঠিত। ইয়াননাইয়ের দর্শনের কেন্দ্রে আছে ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্কের নাটকীয়তা। তাঁর কবিতায় ঈশ্বরের অসীম মহিমা, সৃষ্টিতে তাঁর কর্তৃত্ব এবং তাঁর সার্বভৌমত্বের উপর গভীর বিশ্বাস প্রকাশ পায়। তিনি ঈশ্বরকে ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে ঈশ্বর ইতিহাসের বাইরে নন, ইতিহাসের মধ্যেই কাজ করেন। ঈশ্বর ন্যায়বান, কিন্তু একই সঙ্গে করুণাময়। তিনি বিচার করেন, আবার আহ্বানে সাড়া দেন। তাঁর দর্শন আশাবাদী, যেখানে ইহুদিদের কষ্টকে ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হয়, যা শেষ পর্যন্ত মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।
ইয়াননাই মানুষের দুর্বলতা আড়াল করেন না। তাঁর কবিতায় মানুষ পাপী, বিভ্রান্ত, ভীত আবার অনুতপ্ত, প্রার্থনাকারী ও আশাবাদী:
এই দ্বৈততা তাঁর কাব্যের প্রাণ। তিনি ধর্মীয় আইন (হালাখা) কঠোরভাবে পালনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিতেন। তাঁর পিয়্যুতগুলো প্রায়শই নির্দিষ্ট ধর্মীয় আদেশের উপর ভিত্তি করে রচিত হতো।
ইয়াননাই ইহুদি জাতির নির্বাসনের দুঃখ এবং ঈশ্বরের কাছে মুক্তির জন্য আকুতিকে তাঁর রচনার একটি কেন্দ্রীয় থিম করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ইহুদি জনগণের সহনশীলতা ও বিশ্বাসের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি ইহুদি ঐতিহ্যের আখ্যান থেকে ব্যাপকভাবে উপাদান নিয়েছেন। এই আখ্যানগুলি ব্যবহার করে তিনি ধর্মীয় ধারণাগুলিকে আরও মূর্ত ও শিক্ষামূলকভাবে উপস্থাপন করতেন।
ইয়াননাইয়ের প্রধান অবদান ধর্মীয় কবিতা বা স্তোত্র রচনা, যা প্রার্থনার অংশ হিসেবে গাওয়া হতো। তিনি এমন এক সময়ে লিখেছেন, যখন প্রার্থনা ছিল প্রায় সম্পূর্ণ গদ্যনির্ভর। তাঁর কাজ সেই কাঠামোকে ভেঙে কবিতাকে প্রার্থনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে
ইয়াননাইয়ের প্রধান অবদান ধর্মীয় কবিতা বা স্তোত্র রচনা, যা প্রার্থনার অংশ হিসেবে গাওয়া হতো। তিনি এমন এক সময়ে লিখেছেন, যখন প্রার্থনা ছিল প্রায় সম্পূর্ণ গদ্যনির্ভর। তাঁর কাজ সেই কাঠামোকে ভেঙে কবিতাকে প্রার্থনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তিনি সিনাগগের প্রার্থনায় কবিতাকে প্রায় নাট্যরূপ দেন। তাঁর কবিতাগুলি ইহুদিদের প্রধান উৎসব ও বিশেষ সাবাথের প্রার্থনায় ব্যবহৃত মাহজর (উচ্চ ছুটির দিনের প্রার্থনার বই)-এর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তাঁর প্রায় ১৫০টিরও বেশি কবিতা সংরক্ষিত আছে, যা তাঁর সময়ের জন্য এক বিশাল সাহিত্যকর্ম। এই কবিতাগুলি মূলত মিশরের কায়রো জেনিজা-তে আবিষ্কৃত হয়।
ইয়াননাই পিয়্যুতের আনুষ্ঠানিক গঠনে বড় ধরনের উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি প্রায়শই অ্যাক্রোস্টিক ব্যবহার করতেন, অর্থাৎ কবিতার প্রতিটি পঙক্তি বা স্তবকের প্রথম অক্ষর দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ হিব্রু বর্ণমালা (আলেফ-বেত) বা কখনও কখনও কবির নাম, যেমন ‘ইয়াননাই’, তৈরি করতেন। এটি তাঁর কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তিনি অন্ত্যমিল ও ছন্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুনত্ব এনেছিলেন, যা পিয়্যুতের গীতিময়তা বাড়িয়েছিল।
তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনগুলির মধ্যে একটি হলো ‘কুদেশতা’ নামক পিউত চক্রের বিকাশ, যা ‘আমিদা’ প্রার্থনার অংশ হিসাবে পাঠ করা হতো। এই চক্রে সাধারণত সৃষ্টি, নৈতিকতা ও মুক্তির প্রত্যাশার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা হতো।
ইয়াননাই-এর কাব্যশৈলী ছিল তাঁর সময়ের জন্য অত্যন্ত পরিশীলিত ও জটিল। তিনি হিব্রু ভাষার একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ রূপ ব্যবহার করতেন, যা তাঁর কবিতাকে মহিমা এবং ধর্মীয় গভীরতা প্রদান করত। তাঁর ভাষায় প্রায়শই বিরল শব্দ ও নতুন শব্দাবলি দেখা যায়।
তিনি নিপুণভাবে বাইবেলের গল্প, তালমুদিক আলোচনা ও মিদ্রাশিক মন্তব্যগুলিকে কবিতার কাঠামোতে একীভূত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর অনেক কবিতায় ইসহাকের বাঁধন, মিসর থেকে মুক্তি, এবং সিনাই পর্বতে তোরাহ প্রাপ্তির মতো বিষয়গুলি উঠে এসেছে।
ইয়াননাই-এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী ও অপরিসীম। তিনি ছিলেন পরবর্তীকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পিয়্যুত কবি, যেমন এল’আজ়ার বিরাব্বি কিল্লির-এর সরাসরি অগ্রদূত। কিল্লির ইয়াননাইয়ের শৈলী গঠনের উপর নির্ভর করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাঠামো এবং থিমগুলি মধ্যযুগে হিব্রু ধর্মীয় কবিতার আদর্শে পরিণত হয়েছিল। তাঁর রচনাগুলিই হিব্রু কবিতার ইতিহাসে বাইজেন্টাইন যুগের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়।
ইয়াননাই-এর কাজের কারণে ‘ক্লাসিকাল পিয়্যুত যুগ’ শুরু হয়, যা আনুমানিক ৫ম থেকে ৮ম শতকের ইহুদি লিটার্জির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর পিয়্যুতগুলি আধুনিক যুগে লিটার্জিকাল গবেষণায়, মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ও কবিতা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর সাহিত্য-কর্ম তাঁর সময়ের ইহুদি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিবেশকে বোঝার জন্য একটি মূল্যবান জানালা।
ইয়াননাই শুধু একজন প্রাচীন কবি নন, বরং এক গভীর চিন্তক, যিনি ভাষা দিয়ে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যকার দূরত্বটুকু মেপে দেখার সাহস করেছিলেন। তাঁর কাজ প্রমাণ করে যে পিয়্যুত শুধুই ধর্মীয় গীত নয়, বড় পরিসরে ভাষা-সৃজন, কবিতা-শৈলী ও ধর্মীয় ভাবনার এক সেতু ছিল। তিনি ছিলেন হিব্রু ধর্মীয় সাহিত্যের একজন স্থপতি, যিনি তাঁর উন্নত ও জটিল কবিতার মাধ্যমে তাঁর সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও ইতিহাসকে অমর করে গেছেন।

ই য়া ন না ই য়ে র পি য়্যু ত থে কে
১.
স্বর্গ থেকে স্বর্গের স্বর্গ পর্যন্ত,
স্বর্গের স্বর্গ থেকে অন্ধকার মেঘের কাছে,
অন্ধকার মেঘ থেকে বসতবাড়িতে,
বসতবাড়ি থেকে নিবাসস্থলে,
নিবাসস্থল থেকে আকাশে,
আকাশ থেকে সমভূমিতে,
সমভূমি থেকে সিংহাসনের উচ্চতায়,
আর সিংহাসনের উচ্চতা থেকে রথে—
কে তোমার সমতুল্য,
কে তোমার সমান?
কে তোমাকে দেখেছে,
কে তোমার কাছে পৌঁছেছে?
কে মাথা উঁচু করতে পারে,
কে চোখ তুলে তাকাতে পারে?
কে প্রশ্ন করতে পারে?
কে তোমার বিরুদ্ধে যেতে পারে?
কে তোমাকে মাপতে পারে?
কে তোমার পথ হিসাব করতে পারে?
কে অহংকারী হতে পারে?
কে গর্বিত হতে পারে?
কে তোমার মতো?
তুমি চেরুবের উপর চড়ে ওড়ো,
বাতাসের মতো মৃদু বা ঝঞ্ঝার মতো বেগবান;
তোমার পথ ঘূর্ণিঝড়ে,
তোমার রূপান্তর ঝড়ে;
তোমার পথ জলের মধ্য দিয়ে।
আগুন তোমার দূত—
হাজার হাজার
আর কোটি কোটি,
যারা মানুষের রূপ নেয়,
নারীর রূপ নেয়,
হাওয়ার রূপ নেয়,
দানবের রূপ নেয়;
যারা সকল রূপ ধারণ করে
আর প্রতিটি দায়িত্ব পূর্ণ করে,
ভয়, দারুণ ভয়, শ্রদ্ধা, কাঁপুনি, আতঙ্ক, উদ্বেগের সঙ্গে
তারা খুলে দেয়…
তোমার আদেশে তারা চলে;
তুমি যেখানেই যাও, তারা অনুসরণ করে।
তোমার গতি চমকপ্রদ, অচিন্তনীয়,
তুমি অসীমে প্রবাহিত, সীমাহীন,
যে স্থানে আলো বা অন্ধকার,
সেখানে তোমার উপস্থিতি বিদ্যমান।
তোমার পিছে মিলিত হয়
সকল সত্তা, সকল শক্তি,
যা স্বর্গে, যা পৃথিবীতে, যা নীলিমায়,
সব মিলিত হয় তোমার মহিমায়।
তুমি এক এবং একমাত্র,
তুমি সমস্ত সৃষ্টি এবং সমস্ত প্রাণের উৎস।
২.
প্রভুর এক দূত মুসার কাছে আগুনের আলোর মধ্যে প্রদর্শিত হল—
এমন একটি আগুন যা আগুনকেও খেয়ে ফেলে;
এমন একটি আগুন যা শুকনো ও ভেজা সবকিছুতে জ্বলে;
এমন একটি আগুন যা বরফ ও তুষারের মাঝে উজ্জ্বল হয়;
এমন একটি আগুন যা লুকানো সিংহের মতো;
এমন একটি আগুন যা নিজেকে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ করে;
এমন একটি আগুন যা থাকে এবং কখনো নেভে না;
এমন একটি আগুন যা ঝলমল করে ও গর্জে;
এমন একটি আগুন যা জ্বলে ও স্ফুলিঙ্গ ছোঁড়ে;
এমন একটি আগুন যা ঝড়ের হাওয়ায় ওড়ে;
এমন একটি আগুন যা কাঠ ছাড়াই জ্বলে;
এমন একটি আগুন যা প্রতিদিন নিজেকে নবায়ন করে;
এমন একটি আগুন যা অন্য আগুন দ্বারা ওড়ানো হয় না;
এমন একটি আগুন যা খেজুরের পাতা মতো ঢেউ খায়;
এমন একটি আগুন যার স্ফুলিঙ্গ বিদ্যুতের ঝলক;
এমন একটি আগুন যা কাকের মতো কালো;
এমন একটি আগুন, মোচড়ানো, যার রঙ যেন রংধনুর রঙের খেলা!
৩.
তুমি আলোকে নাম দিলে,
অন্ধকারকে দিলে তার সীমানা।
তুমি আকাশকে দাঁড় করালে,
আর পৃথিবীকে দিলে নীরব ভার।
আমি কে,
যে তোমার সামনে কথা বলি?
ধূলি,
তবু ধূলির ভেতর শ্বাস রেখেছ তুমি।
আমার কণ্ঠ কাঁপে,
কিন্তু তোমার নাম উচ্চারণ না করে পারি না।
কারণ নীরব থাকলে
আমি আর থাকি না।
৪.
আমার কাজগুলো আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে,
চোখ বন্ধ করলেও তারা চলে যায় না।
দিন আমাকে দেখায়নি,
রাত আমাকে আড়াল করেনি।
হে বিচারক,
তুমি জানো আমার ভাঙন,
তবু আমাকেই ডাকো
ফিরে আসতে।
আমি পালাইনি দূরে,
আমি শুধু ভুলে গিয়েছিলাম পথ।
আজ তোমার নাম ধরে
আবার হাঁটতে চাই।
৫.
আমরা তোমার শহরের কথা বলি
বিদেশি আকাশের নিচে।
আমাদের গানগুলো থেমে যায়
অচেনা নদীর ধারে।
তুমি কি ভুলে গেছ আমাদের?
না—
আমরাই ভুলে গিয়েছিলাম
তোমার ডাক।
তবু দেখো,
আমাদের চোখ এখনো দরজার দিকে।
যদি তুমি আসো,
আমরা চিনে নেব।
৬.
তুমি দূরে নও,
আমরাই দূরে দাঁড়িয়ে আছি।
এক পা এগোলে
তোমার নামেই ঠেকে যাই।
আমাদের মুখে ভাষা নেই,
তাই কবিতা হয়ে উঠি।
আমাদের চোখে আলো নেই,
তাই তোমার দিকে তাকাই।
আমাদের গ্রহণ করো—
যোগ্য বলে নয়,
ডাকা হয়েছে বলে।
৭.
রাত দীর্ঘ হয়েছে,
আমরা তা অস্বীকার করি না।
কিন্তু রাতের ভেতরেই
ভোরের চিহ্ন থাকে।
আমাদের প্রার্থনা দুর্বল,
তবু থামে না।
কারণ আশা থেমে গেলে
নামটাও মুছে যায়।
হে করুণার উৎস,
শেষ কথা তোমারই হোক।
৮.
আলো জেগে উঠল—
কিন্তু অন্ধকার এখনো প্রশ্ন করে।
তুমি বললে, “হোক”—
আর পৃথিবী কাঁপল,
কারণ উচ্চারণের ভেতরেই ছিল বিধান।
মানুষ দাঁড়িয়ে রইল দুই আগুনের মাঝে—
একদিকে আদেশ,
অন্যদিকে স্বাধীনতার ছাই।
আমরা কার দিকে যাব,
যদি তুমি না ডাকো?
৯.
আমাকে তুমি বেছে নিয়েছিলে
কাঁটার ভেতর থেকে।
আমি শিখেছিলাম হাঁটতে
উজাড় মরুর ভাষায়।
আমি পড়েছি, উঠেছি,
রক্তে আমার ইতিহাস লেখা।
তবু প্রতিদিন ভোরে
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি—
কারণ পতনই শেষ কথা নয়।
১০.
অক্ষরগুলি আগুনে গড়া,
কিন্তু স্পর্শ করলে জ্বলে না—
আলো হয়ে ছড়ায়।
আমি যখন পড়ি,
শব্দ আমাকে পড়ে।
আমি যখন প্রশ্ন করি,
আইন আমাকে শেখায় কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়।
তোরাহ কোনো বই নয়—
এ এক শ্বাস,
যা না নিলে আত্মা থামে।
১১.
আমার পাপ সংখ্যা জানে,
আমার জিহ্বা জানে না।
আমি বলেছি “ফিরব”,
কিন্তু পা থামেনি।
তবু তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
দরজার ওপারে—
চাবি হাতে।
যদি দরজাই তুমি হও,
তবে প্রবেশ কোথায়?
১২.
আমরা তোমার শহর দেখেছি
স্বপ্নে।
ইট পড়ে গেছে,
কিন্তু নাম পড়েনি।
আমাদের ঘর ছিল অস্থায়ী,
কিন্তু স্মৃতি ছিল পাথরের।
যে ভূমি আমাদের ছুঁড়ে ফেলেছিল,
সেই ভূমিই আমাদের ডাকছে আবার।
১৩.
সে আসবে—
তলোয়ার ছাড়া।
সে আসবে—
ঘোষণা ছাড়া।
তার পায়ের শব্দে
ভাঙা সময় জোড়া লাগবে।
নদী ভুলে যাবে তার তীর,
আর ইতিহাস নত হবে বর্তমানের কাছে।
১৪.
তুমি নীরব,
কিন্তু নীরবতা ফাঁকা নয়।
আমরা যখন চিৎকার করি,
তুমি শোনো শব্দের পেছনের ফাটল।
আমরা যখন থেমে যাই,
তুমি কথা বলো অপেক্ষার ভেতর।
১৫.
তুমি ডাক দিলে—
আর সময় কুঁকড়ে গেল।
ঘণ্টা বাজেনি,
তবু বিচার শুরু হল।
১৬.
আমি দাঁড়ালাম আইনের সামনে,
আইন দাঁড়াল আমার ভেতরে।
কে কাকে ধারণ করে—
তা আজও মীমাংসা হয়নি।
১৭.
স্বর্গ দূরে নয়,
কেবল দৃষ্টির দায় বদলালেই হয়।
১৮.
আমরা বলি: “শোনো, হে ইসরায়েল”,
কারণ শোনা মানেই আজ্ঞা নয়—
শোনা মানে বদলে যাওয়া।
১৯.
আমার নাম মাটিতে লেখা,
তোমার নাম আগুনে।
তবু দুটোই বাতাসে টিকে থাকে।
২০.
আমি ইতিহাস নই,
আমি স্মৃতি।
আর স্মৃতি কখনো শেষ হয় না।
২১.
তুমি আকাশে নও,
তুমি দূরত্বে।
যে কাছে আসে,
সে-ই বুঝতে পারে।
২২.
আমি তোমাকে ডাকলাম বিপদে,
তুমি উত্তর দিলে নীরবতায়।
নীরবতাই ছিল সবচেয়ে কঠিন বাক্য।
২৩.
মরু আমাদের শাস্তি ছিল না—
মরু ছিল প্রশিক্ষণ।
২৪.
যে আইন আমাকে বাঁধে,
সেই আইনই আমাকে দাঁড় করায়।
২৫.
তুমি ক্ষমা করো—
কিন্তু ভুলে যাও না।
স্মৃতিই তোমার ন্যায়।
২৬.
আমাদের শহর ভাঙা,
কিন্তু তার ছায়া অটুট।
ছায়াতেই আমরা প্রার্থনা করি।
২৭.
আমি পড়ে গেলাম,
তুমি সংখ্যা লেখোনি।
তুমি পথ খুলে দিলে।
২৮.
তোরাহ পড়লে বোঝা যায়—
প্রশ্ন করাও এক ধরনের উপাসনা।
২৯.
আমার কণ্ঠ কাঁপে,
কারণ তুমি উত্তর দাও।
৩০.
আমরা নির্বাসনে আছি—
কিন্তু শব্দ এখনো বাড়ি ফেরে।
৩১.
তুমি রাজা,
তবু দরজায় দাঁড়াও।
এই লজ্জাই তোমার মহিমা।
৩২.
সময় এগোয় না—
সময় অপেক্ষা করে।
কে জাগবে,
সে-ই সিদ্ধান্ত নেয়।
৩৩.
আমাদের পাপ ব্যক্তিগত,
কিন্তু প্রার্থনা সমষ্টিগত।
এখানেই মুক্তির শুরু।
৩৪.
শেষে কিছুই থাকে না—
শুধু নাম।
আর সেই নাম উচ্চারণ করলেই
পৃথিবী আবার শুরু হয়।





































































































































































