মার্পা চোইকি লোড্রো (১০১২–১০৯৭) বিশ্বজুড়ে মার্পা লোৎসাওয়া বা ‘অনুবাদক মার্পা’ নামে পরিচিত। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন অনুবাদক, গুরু ও কাগ্যু ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চল থেকে তিনবার পদব্রজে ভারতে এসে মহামুদ্রা ও বজ্রযানের গূঢ় শিক্ষা তিব্বতে নিয়ে এসে প্রচার করেন।
আরেক বিখ্যাত সাধু মিলারেপার গুরু হিসেবেও তিনি সমধিক পরিচিত। তাঁর জীবন একাধারে কঠোর পরিশ্রম, আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং জাগতিক ও পারমার্থিক জীবনের এক অপূর্ব সমন্বয়। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি তিব্বতের আধ্যাত্মিক মানচিত্রটাই বদলে দিয়েছেন। তাঁর জীবন নাটকীয়, তাঁর সাধনা কঠিন, আর তাঁর উত্তরাধিকার গভীর।
মার্পা ১০১২ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের দক্ষিণাঞ্চলের ল্হো-ব্রাগ অঞ্চলের ছু-খ্যের নামক স্থানে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি প্রখর মেধা ও স্বাধীনচেতা স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। পিতামাতা তাঁকে শান্ত করার জন্য লেখাপড়া শেখান। তিনি সংসারী জীবনের প্রতি আকর্ষণ না দেখিয়ে বৌদ্ধধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। সংস্কৃত শেখার জন্য তিনি এক বৌদ্ধ পণ্ডিতের কাছে তিন বছর শিক্ষা লাভ করেন।
মার্পা বুঝতে পারেন যে, গভীরতম তান্ত্রিক উপদেশ ভারতেই রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহে মার্পা নিজের সম্পত্তি সোনায় রূপান্তরিত করে ভারত যাত্রার প্রস্তুতি নেন। তিনি প্রথমে নেপাল গিয়ে নারোপার দুই শিষ্য পৈণ্ডাপা ও ছিথেরপার কাছে সংস্কৃত ও চতুঃপীঠতন্ত্র সম্বন্ধে তিন বছর শিক্ষা লাভ করেন।
এরপর তিনি ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী পুল্লহারিতে নারোপার সান্নিধ্যে পৌঁছান। সেখানে তিনি বারো বছর ধরে নারোপা, মৈত্রীপা, জ্ঞানগর্ভ, শান্তিভদ্র প্রমুখ মহাসিদ্ধাদের কাছে অনুত্তরযোগতন্ত্র, মহামুদ্রা, হেবজ্র তন্ত্রসহ বজ্রযানের গূঢ় শিক্ষা লাভ করেন। মার্পা মোট তিনবার ভারত ও তিনবার নেপাল ভ্রমণ করে এই শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। এই যাত্রাগুলো ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক—হিমালয় পার হয়ে, ডাকাত-জঙ্গল-রোগের মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা।
নারোপা (১০১৬–১১০০) ছিলেন মার্পার সর্বপ্রধান গুরু। নালন্দার মহান পণ্ডিত তিলোপার শিষ্য নারোপার কাছে মার্পা পান ছয় যোগ, মহামুদ্রা, চক্রসংবর, হেবজ্র, মহামায়া প্রভৃতি গভীরতম তন্ত্রের উপদেশ। নারোপা তাঁকে ‘মার্পা লোৎসাওয়া’ নাম দেন এবং তিব্বতে এই উপদেশ প্রচারের দায়িত্ব দেন। মৈত্রীপা তাঁকে মহামুদ্রা ও অপ্রতিষ্ঠ যোগ বিষয়ে শিক্ষা দেন। কুক্কুরিপা, শবরিপা প্রমুখ মহাসিদ্ধদের কাছেও তিনি বিভিন্ন সাধনা গ্রহণ করেন।
ভারত থেকে ফিরে এসে মার্পা ল্হোদ্রাকের দ্রো-লুং অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন একজন গৃহী সাধক। সংসার ও জাগতিক কর্মের মাঝেই তিনি নিজের ভেতরের আগুন ধরে রাখতেন। তিব্বতীয় বৌদ্ধধারায় এটাই ছিল এক অনন্য ব্যাপার।
তিনি একাধিক বিয়ে করেন এবং সন্তান লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত পুত্র ছিলেন দার্মা দোদে, যিনি অল্প বয়সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান। এই দুঃখ মার্পাকে আরও গভীরভাবে মহামুদ্রা সাধনায় নিমগ্ন করে।
মার্পার দর্শনের সার কথা সহজ। তাঁর মতে, চেতনার প্রকৃতি স্বচ্ছ। সেটা খুঁজে পেতে আলাদা কোনো সাজসজ্জার দরকার নেই। শুধু নিজের মন দেখার একাগ্রতা দরকার। তাঁর মতে, শিক্ষার প্রকৃত রেখাচিত্র শব্দে ধরা যায় না। সেটা চলে আসে গুরু-শিষ্যের ভেতরের সাযুজ্য দিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন জীবন ও সাধনার মধ্যে কোনো দেয়াল না থাকুক। তাঁর নিজের জীবনই ছিল এর উদাহরণ—কৃষিকাজ, পরিবার, ব্যবসা আর গভীর সাধনা একই স্রোতে। তিনি ভাববাদী নন, তিনি কার্যবাদী। তাঁর মূল শিক্ষা: সাধনা করো, অভিজ্ঞতা নাও, সত্য আসবে আপনাতেই।

মার্পার তান্ত্রিক শিক্ষাই তাঁকে তিব্বতি বৌদ্ধধারার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী রূপকার বানিয়েছে। তান্ত্রিক মানে এখানে কোনো রহস্যময় আচার নয়; বরং মনের গঠন, শক্তির প্রবাহ আর জাগরণের সরাসরি অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করা। এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মহামুদ্রা। এটাই মার্পার শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্র। মহামুদ্রা বলতে তিনি বোঝান: মন যেমন, বিশ্ব ঠিক তেমন।
নিজের মনকে এটি ঠিক যেমন, তেমন ভাবেই দেখা তার দর্শনে একটি জরুরি ব্যাপার। এটা দেখা মানে, নিজেকে নিজের স্তরবিন্যাস অর্থাৎ ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, সাদা-কালো, বিদ্বান-মুর্খ, ধনী-গরিব, সুখী-দুঃখী ইত্যাদি শ্রেণিকরণ ছাড়াই দেখা। এই দেখা থেকেই মনের নিস্তরঙ্গ অবস্থায় পৌঁছানো যায়। মার্পা বলেন, ধ্যান মানে মনকে চুপ করানো নয়; মনকে তার প্রকৃত রূপে দেখা।
নারোপার ছয় যোগ হলো তান্ত্রিক সাধনার গভীর অংশ। ছয়টি যোগ হচ্ছে: ১. তুম্মো – ভেতরের আগুন জাগানো। ২. গিউ লু – মায়ার দেহ দেখা, কঠিনতা ভেঙে ফেলা। ৩. স্বপ্ন যোগ – স্বপ্নকে সচেতনভাবে দেখা। ৪. বারদো যোগ – মৃত্যুর মাঝখানের অবস্থাকে বোঝা। ৫. শূন্য শরীর – আলো-দেহের অভিজ্ঞতা। ৬. ফোওয়া – মৃত্যুর মুহূর্তে সচেতন সরে যাওয়া। মার্পার কাছে এগুলো কোনো রহস্যময় বিভ্রম ছিল না, বরং এগুলো অভিজ্ঞতার পরিস্কার বিজ্ঞান।
গুরুর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হলো তান্ত্রিক শিক্ষার প্রয়োজনীয় অংশ। কারণ এখানে শব্দই প্রধান মাধ্যম নয়, মনের রূপান্তরই মূল কাজ। মার্পা নিজে নারোপার সামনে নিজেকে পুরো খুলে দিয়েছিলেন। তাই তিনি তার শিক্ষাকে ‘শক্তির ধারাবাহিক সঞ্চালন’ বলতেন। যাকে আমরা গুরু-শিষ্য সম্পর্ক বলি, ওটা তাদের কাছে ছিল এক প্রকার রসায়ন।
দেহকে পথ হিসেবে দেখা তাঁর শিক্ষার আরেকটি উপকরণ। মার্পার শিক্ষা দেহবিদ্বেষী নয়। তিনি বলতেন, দেহ হলো পরম জাগরণের যন্ত্র। শ্বাস, নাসিকা-বদল, শরীরের তাপ, হৃদস্পন্দন— সবই শিক্ষার উপকরণ। তিনি মনে করতেন, আধ্যাত্মিকতা যদি দেহকে এড়িয়ে চলে তবে তা অসম্পূর্ণ।
স্থিরতার সঙ্গে গতিকে মিলিয়ে ফেলা তাঁর সাধনায় গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মহামুদ্রা নীরব। অন্যদিকে নারোপার যোগ তীব্র। মার্পা দুটোকে এক স্রোতে বেঁধে দেন। তাঁর মতে, স্থিরতা দিয়ে মন পরিষ্কার হয়, গতি দিয়ে শক্তি জেগে ওঠে। দুটো মিললে জাগরণের দরজা খুলে যায়।
মার্পা ছিলেন একই সঙ্গে গৃহী, কৃষক, ব্যবসায়ী, অনুবাদক, মহান যোগী ও কবি। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, সংসারের মধ্যে থেকেও মুক্তি সম্ভব। তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে তিনি ‘পিতা’ ও ‘মূল গুরু’ হিসেবে সম্মানিত। তাঁর গান আজও হিমালয়ের উপত্যকায় গাওয়া হয়, তাঁর উপদেশ আজও লক্ষ লক্ষ সাধককে পথ দেখায়
জীবনকে তান্ত্রিক উপায় হিসেবে ব্যবহার করাই মার্পার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা। তাঁর শিক্ষা বই থেকে নয়, জীবন থেকে উঠে আসে। তিনি নিজেও কোনো সন্ন্যাসী বা ভিক্ষু ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বিবাহিত গৃহী — সন্তান ছিল, জমি চাষ করতেন, ব্যবসা করতেন। তাঁর কাছে সরল কাজও তান্ত্রিক অভ্যাস। লাঙল তোলা, ফসল দেখা, সন্তানের কান্না, স্ত্রীর সঙ্গে দৈনন্দিন কথাবার্তা — সবকিছু থেকেই মন জেগে ওঠার উপায় ছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সংসারের ভেতর থেকেও সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভ করা সম্ভব। তান্ত্রিকতা মানে তাই কোনো বিচ্ছিন্ন আশ্রম নয়, বরং জীবনকে পুরোমাত্রায় আলোকিত করা।
তাঁর শিক্ষাদর্শনে জাগিয়ে তোলার জন্য আঘাতেরও প্রয়োজন আছে। মিলারেপার সঙ্গে তাঁর কঠোর আচরণ থেকেই এটা বোঝা যায়। তিনি ভেবেছিলেন, শিষ্যের নির্গুণ শক্তিকে জাগাতে হলে অহংয়ে আঘাত করা ছাড়া উপায় নেই। এটা নিষ্ঠুর নয়; এটা ছিল অস্ত্রচিকিৎসার মতো। আঘাতের লক্ষ্য ছিল শিষ্যকে ভাঙা নয়, শিষ্যের ভ্রান্ত ধারণাকে ভাঙা।
মার্পার তন্ত্র সংক্ষেপে তিনটি কথা বলে: ১. নিজ মনকে দেখো, ২. দেহকে সেতু হিসেবে ব্যবহার করো, ৩. গুরুর মাঝে নিজের চেতনারই প্রতিবিম্ব খুঁজে নাও। তাঁর ভাষায়, “সত্য দূরে নয়, কেবল চোখ সরল হলে দেখা যায়।”
ভারত থেকে ফিরে মার্পা তিব্বতে মহামুদ্রা ও নারোপার ছয় যোগের শিক্ষা বিস্তার করতে থাকেন। তিনি বহু সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন, যা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি তৈরি করে। তিনি লাদাখের জাংস্কার উপত্যকায় স্তোংদে বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত কাগ্যু বংশ পরবর্তীতে তিব্বতের চার প্রধান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটিতে পরিণত হয়।
মার্পার চার প্রধান শিষ্যের একজন ছিলেন মিলারেপা। মিলারেপাই তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিষ্য, যিনি পরবর্তীতে মহাসিদ্ধ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। মিলারেপাকে শুদ্ধ করার জন্য মার্পা যে নিষ্ঠুর পরীক্ষা নিয়েছিলেন, তা বৌদ্ধ ইতিহাসে প্রায় পৌরাণিক।
মার্পা ১০৯৭ খ্রিস্টাব্দে পরলোকগমন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত কাগ্যু বংশ পরবর্তীতে কারমা কাগ্যু, দ্রুকপা কাগ্যু, দ্রিকুং কাগ্যু প্রভৃতি শাখায় বিভক্ত হয়ে তিব্বত, ভুটান, সিকিম ও বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করে। তাঁর জীবনী, অনুবাদ ও গানগুলো আজও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অমূল্য সম্পদ।
মার্পা লোৎসাওয়া ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, যিনি অনুবাদক, গুরু, সাধক ও কবির ভূমিকায় তিব্বতি বৌদ্ধধর্মকে নতুন জীবন দান করেন। তাঁর জীবন শেখায় যে জ্ঞানার্জনের জন্য অদম্য আগ্রহ, গুরুভক্তি ও কঠোর সাধনা প্রয়োজন। মার্পার উত্তরাধিকার শুধু কাগ্যু বংশেই নয়, সমগ্র তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ।
মার্পা ছিলেন একই সঙ্গে গৃহী, কৃষক, ব্যবসায়ী, অনুবাদক, মহান যোগী ও কবি। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, সংসারের মধ্যে থেকেও মুক্তি সম্ভব। তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে তিনি ‘পিতা’ ও ‘মূল গুরু’ হিসেবে সম্মানিত। তাঁর গান আজও হিমালয়ের উপত্যকায় গাওয়া হয়, তাঁর উপদেশ আজও লক্ষ লক্ষ সাধককে পথ দেখায়। মার্পা লোৎসাওয়া চিরঞ্জীব হোন।

মা র্পা র ক বি তা
তাঁর আধ্যাত্মিক অনুভূতিগুলো প্রায়ই গানের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন, যাকে বলা হয় ‘দোহা’। মার্পা নিজে অসাধারণ দোহাকার ছিলেন। তাঁর গানগুলো আজও তিব্বতে গাওয়া হয়। তাঁর কবিতাগুলো ছিল দৃঢ়, বাস্তববাদী এবং তান্ত্রিক প্রতীকে পূর্ণ। ভাষা সরল, কিন্তু বক্তব্য গভীর। নিচে তাঁর ভাবনার রঙ ধরে কিছু নির্বাচিত অনুবাদ দিচ্ছি। এগুলো মূলত তাঁর আত্মোপলব্ধির গান—যেখানে শিক্ষা আর কবিতা মিশে যায়।
১.
আমার মনের আকাশে
যে ঝড় ছিল
গুরুর দৃষ্টিতে
সেটা শুকিয়ে গেল।
রইল শুধু বিস্ময়ের নীলিমা।
২.
যে পথ আমি খুঁজতাম বাইরে
তা ছিল আমার নিজের নিঃশ্বাসে।
নারোপা বললেন—
এই নিশ্বাসকে চিনে নাও,
এটাই মুক্তির দরজা।
৩.
শরীর নদী, মন তার স্রোত।
যেখানে থেমে যাই
সেখানে জাগে ভ্রম।
যেখানে দেখি
সেখানেই জাগে মহামুদ্রা।
৪.
আমি কৃষকের ছেলে।
লাঙল হাতে জমি কাটতে কাটতে
যে স্থিরতা পেয়েছি
ধ্যানেও কখনও পাইনি।
দুটোই সত্য।
দুটোই আমার পথ।
৫.
শিষ্যকে গড়তে
কখনও হাতুড়ি হতে হয়
কখনও আগুন।
মিলারেপাকে আমি তাই দিয়েছি—
তার ভেতরের অন্ধকার ভাঙার শক্তি।
৬.
যে মুহূর্তে আমি
সব প্রশ্ন ছেড়ে দিলাম
সেই মুহূর্তে উত্তর এল।
উত্তরটা ছিল—
কিছুই আলাদা নয়।
৭.
এই জীবন নদীর মতো।
থামাতে গেলে কাদা জমে।
ছাড়লে মুক্তি।
আমি ছেড়ে দিয়েছি—
তারপরই সত্যি দেখতে পেলাম।
৮.
যে আগুন আমি খুঁজেছি
গুহায়, মঠে, দূর দেশের গুরুদের কাছে—
শেষ পর্যন্ত দেখি
সেটা ইতিমধ্যেই জ্বলছিল
আমার বুকের ঠিক মাঝখানে।
৯.
মুক্তি মানে দরজা খোলা নয়।
মুক্তি মানে দেখা যে
আদৌ কোনো দরজাই নেই।
দেয়ালে ঠোকাঠুকি করতে করতে
একদিন হঠাৎ বাতাস এল—
দেখলাম আমি তো বাইরে ছিলাম সবসময়।
১০.
রাতের আকাশ যত গাঢ়
ধ্যানের নীরবতা ততই গভীর।
গাঢ় অন্ধকারে
গুরুর কণ্ঠ যেন দূরের বজ্র—
একটা শব্দ,
আর মন ভেদ হয়ে যায়।
১১.
আমি দেহকে অস্বীকার করিনি।
এটাই আমার সেতু,
এটাই আমার উপায়।
হাড়-মাংসের এই ঘরটিতে
মহাজাগতিক আলো ঢোকে
যদি তাকাতে জানো।
১২.
বিরক্তি, রাগ, ভয়—
সবকেই একদিন দেখলাম
পথের তিন অতিথি।
তাদের বসতে দিলাম,
চা দিলাম,
আর তারা আপনাআপনি উঠে চলে গেল।
১৩.
নারোপা বলতেন,
‘যাকে খুঁজছ, সে তুমিই।’
যাওয়ার কী আছে?
কোথায় যাবে?
পথ তো নিজের ভেতরেই পাক খাচ্ছে।
১৪.
আমি যখন প্রথম সত্যটাকে দেখলাম
দুনিয়াটা ভেঙে পড়েনি।
বরং আরো স্বাভাবিক হয়ে গেল—
মাটি যেমন মাটি,
নদী যেমন নদী,
মন যেমন মন।
১৫.
যে-শক্তি দিয়ে মানুষ ঘর তোলে
সেই শক্তিতেই সে আত্মা গড়ে।
আমি ইট তুলেছি,
দেয়াল বানিয়েছি,
মিলারেপাকে শিখিয়েছি—
এক কাজেই দুই ফল।
১৬.
আনন্দ আর দুঃখ
উভয়েই দরজায় কড়া নাড়ে।
আমি শিখেছি
দু’জনকেই অতিথির মতো স্বাগত জানাতে।
যে আসে, তাকে আসতে দাও;
যে যায়, তাকে যেতে দাও।
১৭.
যে ধ্যান চুপচাপ বসে থাকার মধ্যে আটকে যায়
সেটা ধ্যান না।
ধান কাটার শব্দে
আমি যেমন স্থির থাকি
নিডার পাহাড়ে বসেও
তেমনই থাকি।
১৮.
মহামুদ্রা কোনো কৌশল নয়।
এটা দেখা—
বিশ্ব নিজের মতো যেমন আছে
ঠিক তেমনি।
নদীতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি
ধরতে যাবার মতো বোকামি না করাই ভালো।
১৯.
আমি শক্তি খুঁজেছি।
তারপর বুঝলাম
সত্যিকারের শক্তি আসে
যখন নিজের দুর্বলতাকেও
স্বীকার করতে পারি নির্ভয়ে।
২০.
সবশেষে যা রইল
তা হলো এই নিখাদ বিস্ময়—
সত্য এত সোজা,
এত কাছে,
এত স্বাভাবিক—
তবু দেখতে
জীবন লেগে যায়।
২১.
যেদিন মনকে থামানোর চেষ্টা ছাড়লাম
সেদিনই প্রথম শান্তি পেলাম।
মন তো নদী—
বাঁধ দিলে ফুলে ওঠে,
ছাড়লে স্বচ্ছ হয়।
২২.
গুরু যখন প্রথম আমাকে দেখলেন
আমি ছিলাম আগুনের মতো বিক্ষুব্ধ।
তিনি হাসলেন,
বললেন,
এই আগুনই তোমার শক্তি,
এটা ঠান্ডা করতে নয়,
উজ্জ্বল করতে শেখো।
২৩.
আমি বহু বছর ধরে
মোক্ষকে ভবিষ্যৎ ভেবেছি।
একদিন হঠাৎ
নারোপার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম—
মোক্ষ তো ইতিমধ্যেই এখানে,
এখন,
এই নিঃশ্বাসের ভেতর।
২৪.
শরীর ব্যথা করে,
মন দুলে ওঠে,
জীবন ভেঙে পড়ে—
তবু সত্য টিকে থাকে
কারণ সত্য কখনো ভাঙে না।
ভাঙে কেবল আমাদের ধারণা।
২৫.
কখনো কখনো
আমি পথ হারিয়ে ফেলতাম।
তখন গুরুর একটি শব্দ—
‘দেখো’—
সকল দিক খুলে দিত।
দৃষ্টিই ছিল মন্ত্র।
২৬.
পাহাড়ে বসে ধ্যান করো
বা মাঠে লাঙল ধরো—
যদি মন পরিষ্কার হয়
দুটোই একই সাধনা।
আমি দুটোই করেছি,
এবং জানি,
পৃথিবী নিজেই শিক্ষক।
২৭.
শূন্যতার ভয় কাটাতে
আমি শূন্যতার দিকে তাকালাম।
তাকাতে তাকাতে
দেখলাম ভয়টাই গলে গেল
ভোরের কুয়াশার মতো।
২৮.
যে ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরা থাকে
সেটা দুঃখের জন্ম দেয়।
যে ভালোবাসায় ছেড়ে দেওয়া হয়
সেখানে পথ খুলে যায়।
আমি ছেড়ে দিতে শিখেছি
কারণ সত্য ধরা যায় না।
২৯.
অনেকেই জ্ঞান চায়,
কিন্তু জ্ঞান মানে
নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।
আমি বহুবার ভেঙেছি,
তবু দাঁড়িয়েছি—
এই দাঁড়ানোই ছিল আমার সাধনা।
৩০.
সবশেষে যা বলার
তা খুব কম—
মনকে দেখো,
দেহকে ব্যবহার করো,
গুরুর প্রতি আস্থা রাখো,
এবং যা আসে তাকে স্বাগত জানাও।
এটাই শুরু,
এটাই শেষ।
৩১.
যখন আর কিছু করবার থাকে না
তখনই আসল কাজ শুরু হয়।
মন দাঁড়িয়ে থাকে
নিজের মুখোমুখি।
কোনো প্রশ্ন নেই।
এই নীরবতাই শিক্ষা।
৩২.
আমি চোখ বন্ধ করিনি।
চোখ খোলা রেখেই
দেখতে শিখেছি—
দেখা আর দেখা যায় এমন
আলাদা নয়।
৩৩.
শ্বাস ঢোকে,
শ্বাস বেরোয়।
এর মাঝখানে
আমি নেই,
তবু সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।
এই না থাকাতেই
অপরিসীম স্বস্তি।
৩৪.
যে মুহূর্তে
ধ্যান করতে চাই না
ঠিক সেই মুহূর্তেই
ধ্যান ঘটে যায়।
ইচ্ছা চলে গেলে
দরজা খুলে যায়।
৩৫.
শূন্যতা কোনো গভীর গর্ত নয়।
এটা সীমাহীন খোলা মাঠ।
ভয় লাগে কারণ
আমরা দেয়াল খুঁজে পাই না।
৩৬.
আমি শক্ত হয়ে বসিনি।
আমি ছেড়ে দিয়েছি।
এই ছেড়ে দেওয়াতেই
দেহ নিজে নিজে
সোজা হয়ে বসে গেল।
৩৭.
চিন্তা উঠছে—
আমি দেখি।
চিন্তা মিলিয়ে যাচ্ছে—
আমি দেখি।
দেখার মাঝখানে
কোনো বিচার নেই।
এটাই মহামুদ্রা।
৩৮.
গুরুর মুখ মনে পড়লে
আর কিছু মনে পড়ে না।
এটা স্মৃতি নয়,
এটা মিলন।
৩৯.
আমি কোথাও পৌঁছাইনি।
পৌঁছানোর ধারণাটাই
ভুল ছিল।
যা ছিল,
তা কেবল
এখানেই থাকা।
৪০.
শরীর কাঁপে।
মন হালকা হয়।
এই কাঁপনেই
পথ খুলে যায়।
স্থিরতা মানে
মৃত হওয়া নয়।
৪১.
নাম, রূপ, শিক্ষা—
সব ঝরে পড়ছে।
শেষে যা থাকে
তা কোনো পরিচয় নয়।
এটা নিছক উপস্থিতি।
৪২.
আমি যখন বলি
‘আমি জানি’
তখন অন্ধকার নামে।
আমি যখন বলি
‘আমি জানি না’
তখন আলো আসে।
৪৩.
ধ্যান মানে
ভালো হওয়া নয়।
ধ্যান মানে
যা আছে
তাকে এড়ানো বন্ধ করা।
৪৪.
নীরবতারও
একটা শব্দ আছে।
যে শুনতে পায়
সে আর প্রশ্ন করে না।
৪৫.
এই মুহূর্তে
কিছু যোগ করার নেই,
কিছু বাদ দেওয়ার নেই।
এই সম্পূর্ণতাই
সবচেয়ে ভয়ংকর
এবং সবচেয়ে সুন্দর।
৪৬.
শেষ শ্বাসটা
যখন নিজের থেকে ছাড়ে
আমি তাকে ধরিনি।
ধরা মানেই
আবার জন্ম।
৪৭.
মৃত্যু এলে
আমি দরজা বন্ধ করিনি।
দরজাই ছিল না—
শুধু একটানা খোলা আকাশ।
৪৮.
বারদোতে
কোনো আলো নেই,
কোনো অন্ধকারও নেই।
যে দেখে
সে বুঝে—
দুটোই নামমাত্র।
৪৯.
দেহ পড়ে গেল
পোশাকের মতো।
আমি তাকালাম—
কেউ পড়ে নেই।
শুধু দেখা আছে।
৫০.
ভয় উঠল
শেষবারের মতো।
আমি তাকে জায়গা দিলাম।
জায়গা পেয়ে
ভয় নিজেই গলে গেল।
৫১.
যে আলোকে
মানুষ স্বর্গ বলে
সেটা আসলে
চেতনার নিজস্ব ঝলক।
আঁকড়ে ধরলে
অন্ধ হয়ে যাও।
৫২.
বারদোতে
নাম ডাকলে সাড়া দিও না।
যে নামে সাড়া দেয়
সে আবার বাঁধা পড়ে।
৫৩.
আমি কিছু স্মরণ করিনি।
স্মরণ মানেই
আবার গল্প।
আমি শুধু দেখেছি
যা উদিত হচ্ছে
যা মিলিয়ে যাচ্ছে।
৫৪.
শূন্যতা
কোনো শেষ নয়।
এটা সেই জায়গা
যেখানে শেষ আর শুরু
দুজনেই ক্লান্ত হয়ে বসে।
৫৫.
আলো, শব্দ, রূপ—
সব পরীক্ষা।
যে পাস করতে চায়
সে ফেল করে।
যে দেখেই ছেড়ে দেয়
সে মুক্ত।
৫৬.
আমি ভাবিনি
‘এটাই মৃত্যু’।
ভাবনাই ছিল
শেষ বন্ধন।
৫৭.
বারদোতে
গুরু দূরে নয়।
যে দেখা দেখছে
সেই-ই গুরু।
৫৮.
এক মুহূর্ত
একেবারে উন্মুক্ত।
এই মুহূর্তে
কিছু বেছে নিও না।
এই না-বাছাই
সবচেয়ে সূক্ষ্ম দীক্ষা।
৫৯.
যে শূন্যতাকে
কিছু বানাতে চাও
সে শূন্যতা সরে যায়।
যে শূন্যতাকে
শূন্যই থাকতে দাও
সে-ই সবকিছু।
৬০.
সবশেষে
কিছু থাকে না
বলবার মতো।
তাই আমি চুপ থাকি।
এই চুপই
আমার শেষ গান।



























































































































































































